কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ২

May 20, 2019, Morning

বচ্ছরভরকার মত দেশে ফিরলে তড়িঘড়ি স্টুডিওতে ছুটতে হয় প্রায় প্রতিবারই। না না টলিউড পাড়ার নয়, আমাদের পাড়ার শিপ্রা স্টুডিও। উদ্দেশ্য নিজের ছবি তোলা। নিজের মুখের প্রতি কোন বিশুদ্ধ প্রেমজনিত কারণে নয়, তার জন্য তো সেলফি ক্যামেরাই আছে (হৈ হৈ করে সেলফি কনটেস্ট হচ্ছে এন্তার), বিভিন্ন জায়গায় প্রমাণপত্র দাখিলে, ভিসা স্ট্যাম্পিং নামক বাৎসরিক উৎসব ইত্যাদি সবেতেই প্রয়োজন পড়ে আমার মুখচ্ছবি। বেরোতেই পলিটিকাল পোস্টার – “মিলে মিশে লুটে খায় বুঝে গেছে জনতা / ও পাড়ার মোদী আর এ পাড়ার মমতা”। বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না কোন পার্টি। অজস্র “এই চিহ্নে ভোট দিন”-এর ভিড়ে এমন চমৎকার পোয়েট্রিকে দু নম্বর দিতেই হয়। কাস্তের ধার না থাকলেও কথার ধার আছে বইকি।        

শিপ্রা স্টুডিওর দাদা বহু পুরনো যাকে সেই স্কুল জীবন থেকে দেখে আসছি। কখনো নামটা জানা হয় নি। তবু কুশল বিনিময় হয় দেখা হলেই। প্রথাগত “কবে এলে?” প্রশ্নের উত্তর করে ভেতরে যখন ঢুকলাম সেই চেনা ছবি। একটা সাদা কাপড়ের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা বেঞ্চি। ওইখানে সাবজেক্ট বসবে। আর তার দিকে তাক করা আছে দৈত্যাকৃতি তিনটে লাইট। কখনো কখনো কোন একটা দৃশ্য কি কোন এক গন্ধ টাইমমেশিনে করে ফিরিয়ে নিয়ে যায় গত জন্মে। প্রাচীন সুগন্ধী অতীতে। 

তখন আমার বয়স পাঁচ। আর সেদিন আমার জন্মদিন। যেন কোন অনন্ত অতীত। সময়ের রেখাগুলো সমান্তরাল হয়ে গেছে তাই। ছোঁয়া যায় না শুধু দেখা যায়। আমি তখন খড়গপুর। আমি তখন কিশলয়। জন্মদিন তখন এক অদ্ভুত আনন্দ-মৌতাত বয়ে আনত। আজ যখন জন্মদিন আসে সে সাথে করে নিয়ে আসে কি একটা হারিয়ে ফেলার একটা যন্ত্রণা – নিজের ছেলেবেলাই হবে বোধ হয়। আমার কিশলয়-আমিকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা প্রতি মুহূর্তে আমাদের জীর্ণ করতে থাকে। কিন্তু বয়স যখন পাঁচ, জন্মদিন মানেই এক অবিমিশ্র আনন্দ। বিশেষ দিনটিতে নো বকাবকি। নো পড়াশুনো। মায়ের হাতের পায়েস আর “আমি ভীষণ মহার্ঘ্য” এইধরনের একটা অনুভূতি দিনভর। আমার জন্য মা মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছে। আমার জন্য পায়েস রাঁধছে। মহাকালের গর্ভ থেকে একখানা দিন শুধু আমার জন্যই কাস্টম-মেড করে বানানো হয়েছে। শুধু আমারই জন্য আজ সূর্য উঠেছে, দোয়েল পাখি ডেকেছে, জানালার পাশের শিউলি গাছ ফুল ঝরিয়েছে। রাতভর। আমার জন্য কৃষ্ণচূড়া গাছ রঙ-মাতাল। ভাবতে ভালো লাগত। 

এখনকার মত কেক কেটে লোক খাইয়ে ঘটা করে পাঁচ বছরের জন্মদিন পালন করার রীতি তখন ছিল না। সভ্যতা তখনও কিছু শম্বুক-শ্লথ, সম্মোহিত। সেই বয়সে আমি কিছু ঠিক করতাম না। বাড়ি থেকে বোধ হয় ঠিক করা হয়েছিল আমার আমার পঞ্চম বর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমার ছবি তোলা হবে। সময়, হা সময়। প্রতি মুহূর্তে যে পিছলে গলে বেরিয়ে যায় এক মুঠো জলের মত,  সেই সময়কে স্থাণু করে রাখার কি অদম্য মানবিক আগ্রহ! বাড়িতে ক্যামেরা ছিল না। তখন ক্যামেরা খুব একটা বিলাসদ্রব্য যা ধনীদের বাড়িতেই থাকত। আর সরস্বতী লক্ষ্মীর রেষারেষি খুব। যে বাড়িতে সরস্বতী সে বাড়িতে লক্ষ্মী পা রাখেন না। আমার মা স্কুলে পড়ায়। বাবা কলেজে। তাই ক্যামেরা কেনার সঙ্গতি ছিল না। স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলা হবে ঠিক হল। আমাকে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হল। স্পেশ্যাল ট্রিটমেন্ট পেয়ে আমি সুপার এক্সাইটেড। দাদা আর আমি বাবার হাত ধরে গেলাম চিত্রালি স্টুডিও। ইন্দা মোড়ে। দুটো গোড়ের মালা। একটা দাদা, একটা আমি পরে বসলাম। স্টুডিওর কাকু ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাথা দুটোকে ডানদিকে, বাঁ দিকে, ওপরে, নিচে, ঈশান, নৈঋত কোণে ঘোরালেন যতক্ষণ না মুখের সব হাসি অন্তর্হিত হয়ে মুখটা বেশ গোমড়া গোমড়া হয়। ইনস্ট্যান্ট নুডলের দিন নয় সেটা। ফিল্মে তোলা ছবিও ইনস্ট্যান্ট দেখা যায় না। ডার্করুমে ডেভেলপ হয়ে তবে তার দর্শন মিলবে। ফটোগ্রাফার নিজেও দেখতে পাবে না। আজকের চোখ দিয়ে দেখলে প্রায় অসম্ভব মনে হয়। খড়গপুরের চিত্রালি স্টুডিওর কাকু সময়ের হাত ধরে আজ রামরাজাতলার শিপ্রা স্টুডিওর দাদা হয়ে গেছে। তবে মুখ ক্রমাগত ওপর নীচ করতে বলে হাসি মারার টেকনিক এখনো আছে। 

ছবি তুলে বেরোলাম যখন, দেখলাম আকাশ কালো করে এসেছে। জ্যোৎস্নাস্নাত টাঁড়ভূমির সঙ্গমরতা, কামোন্মত্তা যুবতী সম্বর হরিণীর চোখের কাজল কে যেন চুরি করে এনে মুঠো মুঠো ছড়িয়ে দিয়েছে। আকাশময়। জ্বোরো রুগীর ঘন ঘন নিঃশ্বাসের মত হাওয়া চলছে। কালবৈশাখী।  অত্যাচারী জমিদারের মত তেজীয়ান নিষ্ঠুর সূর্যটা কোন অপরূপ জাদুবলে ছাপোষা গৃহস্থ স্বামীর মত মুখ লুকিয়েছে মেঘের আঁচলে। উড়নচণ্ডী প্রেমিকার মত হাওয়া কোনপথে যাবে নিজেই ঠিক করতে পারে নি। একবার দু পা সামনে যাচ্ছে তো তারপর তিন পা পেছনে। চিতায় পুড়তে থাকা শব যেমন শেষকালে এক বালতি জল পেয়ে শীতল হয়, তেমন করেই শীতল হবে এ শহর। আজ। হাওয়ায় হাওয়ায় তারই কানাকানি। আমি হাঁটতে হাঁটতে দেখি রাশি রাশি হলুদ কল্কে ফুল ঝরে পড়েছে রাস্তায়। অনাদরে। কেউ দলিত, বিগলিত। কেউ অনাহত, ফুটফুটে। একখানা অক্ষত ফুল তুলে নিলাম। সানাই হল গে “ফুলোফিলিক”। না, এমন কোনো শব্দ অভিধানে নেই। শব্দটা আমার বানানো। মানে হল সানাই ফুল খুব ভালবাসে। ফুলটা পেলে যত্ন করে রাখবে ওর ইউনিকর্ন পার্সে।

কৌলীন্যহীন কল্কে ফুল। পাপড়ির বাহার নেই, তবু গাঢ় হলুদ রঙা। আমাদের সারা জীবনটাই তো রঙের খোঁজ। আহার-নিদ্রা-মৈথুন-ফেসবুক অন্তে ক্রমাগত আমরা জীবনে রঙের পোঁচ দেওয়ারই চেষ্টা করছি। কিন্তু ভ্যানিশিং কালারের মতই এই রঙ দিলাম আর এই ভ্যানিশ। সবে রঙের প্যালেট থেকে এ রঙ ও রঙ মিশিয়ে মনোমত উজ্জ্বল রঙ বানিয়ে কালার ব্রাশ দিয়ে এই মাখালাম জীবনের গায়ে তো প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার চাপে এই আবার বর্ণহীন। আবার খোঁজ, খোঁজ, রঙের খোঁজ। অথচ কত অজস্র রঙের উপাচার আমাদের আশেপাশে। আমরা দেখতে পাই না। সভ্যতা আমাদের বর্ণান্ধ করেছে। এই আপাত বেরঙ দুনিয়ার রঙ-মিলন্তি খেলায় আমি তুমি সবাই সামিল। এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে যখন বাড়ি ঢুকলাম তখন জলপরীরা ডানা মেলেছে। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে।   

পর্ব ১ লিংকঃ https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

Facebook Comments

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ১

কেমন আছেন যযাতির বন্ধুরা? অনেকদিন দেখা নেই বলে ভাবছেন যযাতি বুড়ো পটল তুলেছে নাকি? পটল তুলিনি ঠিকই কিন্তু ভাবনার বীজ রুয়ে-বুনে-চাষ-করে ফসল ঘরে তুলতে সময় লাগে বই কি! দেড় বছর পরে প্রায় মাস দেড়েকের জন্য গেছিলাম আমার নিজের শহরে। প্রতি মুহূর্তেই তো আমাদের মনোমধ্যে অন্তর্বিপ্লব ঘটে যায় নিঃশব্দে। তাই সেই পুরনো শহর নতুন চোখে ধরা পড়ল। তাই কতক লিপিবদ্ধ করেছি।

আপনাদের জন্য তাই রইল এই কলকাতা ডায়েরী। পড়ুন। হয়তো দেখবেন এর অনেক মুহূর্ত আপনিও যাপন করেছেন। উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও উদ্দেশ তো আমাদের কম বেশি একই। 

****      

May 18, 2019, Evening

গতকাল ভোর রাত্রেই এসে পৌঁছেছি আমার শহরে। কুসুম কোমল লাজুক সূর্যটার ঠোঁটে লেখা ছিল, “স্বাগতম”। কেউ দেখতে পায়নি। আমি পেয়েছি। বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কাঠবিড়ালি আনন্দরা। স্নেহের সুসিক্ত আবেশে ভারি হয়েছিল বাতাস। অনেককটা প্রত্যাশী মুখে ফুটে উঠেছিল হাসি। প্রিয়জন মিলনের এক অমোঘ আগ্রহ তাড়া করে ফেরে আমাদের। প্রত্যহ।

আমার তিন বছরের ডানা লোকানো ছোট্ট পরীর হাসিতে-কান্নায়-অভিমানে-দুঃখে-আনন্দে-উৎসাহে-বিড়ম্বনায় মর্মর, বিহ্বল তার দুই দিদি, মানে আমার দুই প্রিয় ভাইঝি। কাকা-কাম্মা-সানাইয়ের আসার অপেক্ষা করছিল তারা ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে। চিটেগুড়ে লেগে থাকা লোভাতুর পিঁপড়ের মত পান করি স্বজন সুখ। সারাদিন। দিনভর। বুদ্ধপূর্ণিমা কাল। চতুর্দশী চাঁদ তাই সন্ধেবেলা যৌবন বিলোচ্ছে অকৃপণ। ভোলানাথ আশ্রমে একবার যেতে হবে। বাবা বলে গেছে। আমিও বেরিয়ে পড়ি। মা বলেছিল টোটো করে নিতে। আমি ভাবলাম, হাঁটিনা খানিক। এ শহর তো রোজ রোজ আসে না আমার কাছে। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহে হাহুতাশ করতে থাকা আমার শহর। বাস-বাইক-কার-টোটো উদ্গত ধূলিধূসরিত আমার শহর। ক্যান্সারকোষের মত দ্রুত বাড়তে থাকা উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ির চাপে নিঃসঙ্গ হতে থাকা আমার শহর। তবু আজ কোকিল শুনেছি ভোররাতে। কে বলে – “কোকিল শুধু বসন্তের, উহারা শীত গ্রীষ্মের কেহ নহে”। আজকে বৈশাখী ভোরেও কোকিলের কণ্ঠ চালিয়েছে সঙ্গিনীর খোঁজ। এখন সন্ধেবেলা শব্দহীন ধোঁয়াহীন টোটোরা সর্বত্রগামী। আমি লুব্ধ দৃষ্টি হানি। কিন্তু না এগারো নম্বর বাস অর্থাৎ হাঁটাই শ্রেয়। শহরের গল্পরা তো অনাদরে পড়ে থাকে হাঁটা রাস্তায়। সঙ্গিনীকে চিনতে যেমন মধুচন্দ্রিমার রাত্রিনিবাস, শহরকে চিনতে তেমন তার হাঁটা রাস্তা। আমি হাঁটতে থাকি। আমি দেখতে থাকি। শুষে নিতে থাকি আমার অতীতকে। চেখে দেখি পরিবর্তন। বর্তমানকে। বুড়ো শিবমন্দিরের পাশ দিয়ে যাই। মন্দিরের চাতালে তিনটে বৃদ্ধ খালি গায়ে বসে। আগের বছরেও যেন ওরা ওখানেই ওরকম করে বসেছিল। ঠায়। নিশ্চুপ। অনন্তকাল ধরে ওরা ওখানে ওরকম করেই বসে আছে। আজ থেকে অর্বুদ কল্প পরেও ওরা ওরকম করেই ওখানে বসে থাকবে বাক্যহীন। আমি পাশ কাটিয়ে ডানদিকে চলি। গল্পেরা চলে সাথে সাথে। এইসব গল্পগাছা কুড়িয়ে বাড়িয়েই তো জীবন। দু চারটে চারপেয়ে জীব ঘুরে বেড়ায় উদ্দেশহীন। শীর্ণ, মন্থর। দু একটি বসে। এই তাপপ্রবাহের সাথে যোঝবার শক্তি সংগ্রহ করছে ক্ষণিকের জন্য। চোখে ক্লান্ত বিষণ্ণতা। মাসখানেকের মধ্যে  এ শহরে এসে পড়বে বর্ষার সজল সঘন উচ্ছ্বাস। ওদের চোখে সেই মৌসুমী সজীবতারই নিরবধি প্রতীক্ষা। 

শর্টকাট নিতে বাঁদিকে বাঁকি। কিছুদূর যেতেই পথ রূদ্ধ। কিন্তু এখান দিয়ে তো রাস্তা ছিল! শ্যাওলাধরা মৈনাকদের বাড়ির পাশ দিয়ে সোজা বেরোনো যেত ক্যাঁচাল সঙ্ঘ ক্লাবের কাছে। ক্যাঁচাল সঙ্ঘের একটা ভালো নাম ছিল কিন্তু বড় বেশি ক্যাঁচাল করে এই উপাধি পেয়েছে তারা। সেই চেনা পথ এমন করে পথহারা হল কেমন করে? এক শূন্যদৃষ্টি লোক বসে বৈশাখী তাপে ভাজা ভাজা হচ্ছে। জিগেস করলাম – দাদা এখান দিয়ে হাওড়া হোমসের দিকে বেরোনো যেতো না? “কোথা থেকে এসেছ হে পথিকবর” টাইপ একটা দৃষ্টি হেনে বলল, “সে অনেকদিন বন্ধ। পার্ক হয়েছে। যান না। পার্কের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যান।” জন্মাবধি দেখে আসছি নামগোত্রহীন যে পুকুরটাকে, সেটাকেই বংশমর্যাদা দান করে তৈরী হয়েছে বাচ্চাদের পার্ক আর রামকৃষ্ণ উপাসনা মন্দির। ভারি মনোহর। তবে সেই কৌলীন্যবৃদ্ধির দায়ে পায়ে-হাঁটা পথ পড়েছে কাটা। আমার অতীত কি তবে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে? মন্দাক্রান্তা চালে বয়ে চলে সময়। তার রথারূঢ় বিজয়গৌরবে কাটা পড়েছে কত কত রাজ্যপাট –  নীলনদ, সিন্ধুনদের পার্শ্ববর্তী সভ্যতা। এ তো সামান্য হতভাগা পায়ে-হাঁটা পথ। 

পরিবর্তিত ভূগোলের মধ্যে দিয়ে পথ করে নিয়ে বড় রাস্তায় পড়ি। ডান দিকে আশ্রমের গলি। নির্বাচনের গরম নিঃশ্বাস বাতাসে। পাঁচিলে ছোটো ছোটো পতাকায় শোভা পাচ্ছে জোড়াফুল, পদ্ম, কাস্তে-হাতুড়ি। চিহ্নধারীরা যেখানে একে অপরকে বাক্যবাণে কুচিকুচি করছে, চিহ্নগুলো একে অপরের গায়ে ঢলে পড়েছে পরম বিশ্বাসে। ওদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ওরা ঘাতকের ভয়ে ভীত নয়। আশ্রমের মধ্যে একটা প্রাচীন আমগাছ অজস্র ডালপালা বিস্তার করে মাতৃস্নেহে ধারণ করছে পুরোনো বাড়িটাকে। ফলভারে ন্যুব্জ। দূরে একটা তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মাথা দোলাচ্ছে হা-হা-উষ্ণ বাতাসে।

দেখি আর ভাবি এখনো তো সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায় নি। এই তো আমার দেশ, আমার শহরতলি। এখনো তো প্রাণ জেগে আছে লালসাক্লিন্ন শরীরে। আজ সকালেই এক টোটোওলাকে খুচরো কুড়ি টাকা দিতে না পেরে দশ টাকার একটা নোট দেওয়াতে বলেছিল, “কোনো ব্যাপার না। পরে দেখা হলে বাকি দশ টাকা দিয়ে দেবেন।” তবু জোর করে দাঁড় করিয়ে খুচরো করে এনে দিলাম। কারণ জানি দেখা হবে না। যেমন করে দেখা হয় নি শিশুবয়সের প্রাণের বন্ধু বুবুনের সাথে আর কোনোদিন। দেখা হয় নি শিপ্রা এক্সপ্রেসে ইন্দোর যাওয়ার পথের বালিকা সহচরীর সাথে। এই ব্যস্তসমস্ত গতিবান সভ্যতায় কারু সাথে কারু আর দেখা হয় না। একই ছাদের তলায় থাকা দুজনের মধ্যেও অনেক সময় অনন্ত ছায়াপথ। তবু কোকিল ডাকে, তবু অকারণে হৃদয় খুলে ধরে কেউ আচম্বিতে। রাজনৈতিক রক্তপাত, ঘৃণা, হানাহানি থেকে দূরে এ আমার স্নেহসিঞ্চনে সুসিক্ত স্নেহার্দ্র স্বভূমি।

পর্ব ২ লিঙ্ক – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

Facebook Comments

ভাষা – ছোটগল্প

[প্রকাশিত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত দখিনা পত্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, একটি আনন্দধারা উদ্যোগ

https://anandodhara.com/wp-content/uploads/2019/03/Dakhina.pdf  ]

ঠাম্মার একটা আঙুল নিজের আঙুলে জড়িয়ে নদীর বাঁধানো ঘাটটায় বসেছিল কাহিনী। তখন সবে সন্ধে নামছে। নদীর ওপারে ঐ দূরে লাল তামার চাকতির মত সূর্যটা গাছগাছালির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে আহ্লাদে আলো আর রঙের খেলায় মেতেছে। আকাশে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা মেঘখন্ডগুলোকে কখনো লাল, কখনো কমলা রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যেন কোন খেয়ালী চিত্রকর সমগ্র পরিবেশটাকে আরক্তিম করে তুলেছে। এইরকম সময়গুলোতে যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তি মানুষকে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়ে যায়। ষোলো বছরের ফুটফুটে মেয়ে কাহিনী, সারাক্ষণ যার মুখে ফুলঝুরি ছোটে, সে অব্দি চুপ করে দেখছিল নদীর জলে আকাশের থেকে ঝরে পড়া সোনা আলো আর তার আবীর রঙের ঝিকিমিকি। কলকাতা থেকে কদিনের জন্য দেশের বাড়িতে দিদার কাছে এসেছে সে। তার কোমর লম্বা চুল মোটা ডাঁটো বিনুনি হয়ে তার সদ্যোদ্ভিন্ন বুকের ওপর আলগোছে পড়ে আছে। সন্ধের মৃদুমন্দ হাওয়ায় বিনুনির শেকল থেকে মুক্তি নিয়ে দু এক গুচ্ছ অবাধ্য চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে। চোখের ওপর থেকে চুল সরাতে সরাতে কাহিনী জিগ্যেস করে উঠল

“আচ্ছা গ্র্যানি, শুনেছি, হোয়েন উ ওয়্যার এ কিড, তুমি আর তোমার গ্র্যানিও এই নদীর পাশে এসে বসতে।”

“হ্যাঁ রে। আমিও ঠিক তোর মত আমার ঠাম্মার হাত ধরে এই নদীর ধারে বসে কত বিকেল থেকে সন্ধে হতে দেখেছি। কিন্তু আজকাল আর এই নদীটাকে ঠিক চিনতে পারি না। অনেক বদলে গেছে।”

“কেন? সেই ছোটবেলা থেকে দেখছ। তাও চিনতে পারো না কেন?”

“আসলে নদীরা তো বহতা। সময়ের সাথে সাথে ওরা গতি পরবর্তন করে। ক্রমাগত রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যায়। আগে এর জল কেমন হাল্কা নীল ছিল। এখন কেমন ছাইরঙা হয়ে গেছে। ওপর থেকে জলের মধ্যে যে মাছগুলো দেখতে পাওয়া যেত তারও রঙ, আকৃতি, প্রকৃতি বদলে গেছে।”

“বহতা? ইউ মীন ফ্লোয়িং রাইট? কাম অন্ গ্র্যানি, তুমি না? মাঝে মাঝে কোন ভাষায় যে কথা বলো বুঝতেই পারি না। এনিওয়েজ, আচ্ছা একটা কথা বলো। তোমার গ্র্যানির সাথে তোমার গ্র্যানপার পারহ্যাপ্স লাভ ম্যারেজ তাই না?”

“ধুর বোকা। তখনকার দিনে এই আজকালকার মত প্রেম টেম হত না। আমরা, আমাদের মা ঠাকুমারা তোদের মত, ওই তোদের ভাষায়, আল্ট্রামডার্ন ছিল না। বুঝলি? কেন বল তো? তোর কেন মনে হল আমার দাদু ঠাকুমার প্রেম করে বিয়ে?”

“না মানে তোমার গ্র্যানি তো আই গেস বাঙালি না। তাই ভাবছিলাম।”

“ও মা। দিদিমা বাঙালি নয় কেন রে? দিব্যি নৈহাটির মেয়ে। অবাঙালি হতে যাবে কোন দুঃখে?”

“বারে তুমিই তো বলেছিলে তোমার গ্র্যানির নাম, লেট মী রিমেম্বার, কুমুদিনী। রাইট? তো সেটা তো আর বাংলা নাম নয়। ইন ফ্যাক্ট বাংলাতে এরকম কোন শব্দই নেই।”

“ধুর বোকা। কুমুদিনী একদম বাংলা শব্দ। এক ধরণের ফুল। যেমন আমার নাম কথা। তোমার মায়ের নাম যেমন করবী সেরকম।”

“রিয়েলি? উ মীন কুমুদিনী ইজ এ বেঙ্গলি ওয়ার্ড? তোমার নাম, মায়ের নাম – কথা, করবী একসেটরা বাংলা শব্দ জানি। কিন্তু কুমুদিনী?” অবিশ্বাসী চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে কাহিনী।

বিরক্তিতে মাথা নাড়েন বৃদ্ধা কথা সান্যাল। “হ্যাঁ রে। সত্যি কি দিনকাল এলো। তোরা, মানে তোদের প্রজন্ম বা তার পরের পরের প্রজন্ম, তোরা কি বাংলা ভাষাটাকে পুরোপুরি ভুলে যাবি? আজ থেকে আর একশ বছর পর ভাষাটা কি সত্যিই থাকবে? তুই তো ইংরেজি শব্দ ছাড়া এক মিনিটও কথা বলতে পারিস না। আর বাংলার অর্ধেক শব্দ অব্যবহারে অপ্রচলিত হয়ে পড়ছে দেখছি। তোর দাদুর নাম ভাস্কর। সূর্যের প্রতিশব্দ। ভাস্কর তো দূরে থাক তোরা সূর্য কথাটাই ভুলতে বসেছিস।  রৌদ্রোজ্জ্বল দিন হলে সেটাকে বলিস সানি ডে। কে জানে বাবা এই বাংলা ভাষাটা থাকবে তো?”

কাহিনী মুখে মিচকে ফাজিল হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে কথার গলা জড়িয়ে ধরল। গাঢ়স্বরে ডাকল “ঠাম্মা”। সে জানে গ্র্যানিকে ঠাম্মা বলে ডাকলে তার সব রাগে জল ঢালা হয়ে যায়। কথা কপট রাগ দেখিয়ে বললেন “বল”।

“তোমায় কে বলেছে এগুলো ইংরেজি শব্দ। এই যে সানি ডে, লাভ ম্যারেজ, গেস যে শব্দগুলো আমি ইউজ করেছি এতক্ষণ, এগুলো তো বাংলা শব্দই ঠাম্মা।”

“আবার ফাজলামি করছিস? এগুলো কবে থেকে বাংলা শব্দ হল শুনি?”

“ধরো যদি বলি, আজ থেকে ঠাম্মি? একটা কথা বলো। আক্কেল, আসল, এলাকা, ওজন এই শব্দগুলো বাংলা তো ঠাম্মা?

“হুম”

“আর, আর আওয়াজ, আন্দাজ, আয়না, খারাপ?”

“ও মা, ওগুলো বাংলা হবে না কেন? তুই কি বলছিস আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“এই ওয়ার্ডসগুলো ঠাম্মা বাংলার পার্ট ছিল না ফর ইটার্নিটি। প্রথম চারটে শব্দ আরবি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে এসেছে। পরের চারটে ফার্সী ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে এসেছে। এলাকা শব্দের আসল আরবি শব্দ ইলাকাহ, খারাপ শব্দের ফার্সী শব্দ খারাব।”

“তুই কি বলতে চাইছিস?”

“বেঙ্গলি যদি এতদিন ধরে অন্য অন্য ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে ওয়ার্ড রিসিভ করে এসেছে তবে আজ কেন তার এক্সসেপশান হবে বলো তো? দাদু তো বলে স্যাংস্কৃট এক সময়ে এত রিজিড হয়ে গেছিল যে ইট রিফিউজড টু অ্যাডপ্ট। তাই সাধারণ মানুষ স্যাংস্কৃটে নয়, প্রাকৃতে কথা বলত। স্যাংস্কৃট থেকে যায় লেখার ভাষা হিসেবে। আর স্পোকেন ল্যাঙ্গুয়েজটা, তোমরা যেটাকে কথ্য ভাষা বলো, সেটা গ্র্যাজুয়ালি বদলাতে থাকে। আর তার ফলেই স্যাংস্কৃটের ইভেনচুয়াল ডেথ।”

“তার মানে…”

“তার মানে, ” কাহিনী ঠাম্মার গালে একটা চুমু খেয়ে বলে উঠল “ইংলিশ ওয়ার্ডগুলোকে রিজেক্ট করে নয়, অ্যাক্সেপ্ট করেই তোমার আদরের বাংলা ভাষা বাঁচবে, মাই ডিয়ার ঠাম্মি।”

“কি বলছিস? এই এত এত ইংরেজি শব্দ আমাদের শব্দ বলে মেনে নিতে হবে?”

“ওরাও নিচ্ছে ঠাম্মা। প্রতি বছর ইংরেজিতে ঢোকে ক্লোজ টু ফাইভ টু টেন ওয়ার্ডস। ইয়োগা, বাজার, জাংগল এগুলো অক্সফোর্ড ডিকশানারিতে জায়গা পেয়েছে। ট্রু দ্যাট, ইংলিশ যত ওয়ার্ড বরো করে তার থেকে বেশি ওয়ার্ড লেন্ড করে। কিন্তু তবু নিচ্ছে তো। বাংলাও কেন নেবে না? তাছাড়া কান বন্ধ করে বসে থাকলে ভাষার ইনফিল্ট্রেশান তো তুমি স্টপ করতে পারবে না ঠাম্মা? একটা ল্যাঙ্গুয়েজের পাওয়ারের কাছে আমরা ওয়ে টু উইক। সে এক নদীর মত। নিয়ম মেনে চলা তার স্বভাব নয়। কখনো তার এক জায়গায় চড়া পড়ে, শুকিয়ে যায় আবার অন্য জায়গায় সে পাড় ভেঙ্গে নতুন পথ করে নেয়। কখনো অন্যান্য শাখানদীর জলধারা এসে মেশে। সেটাকে কনটামিনেশান না ভেবে এক্সপ্যানশান ভাবলে প্রবলেম সলভ হয়ে যায়। আমাদের বাংলার বলার ভাষা আর লেখার ভাষা যদি প্রচণ্ড ডিফারেন্ট হয়ে যায়, ঠাম্মা, তবেই বাংলা ভাষার মৃত্যু হবে। তাই স্নবের মত মুখ ঘুরিয়ে বসে না থেকে চলো এই ওয়ার্ডগুলো আমরা নিজেদের শব্দ বলে গ্রহণ করে নিই। এই আমদানি করা শব্দগুলোকে লেখার জন্য প্রপার স্পেলিং ডিভাইস করি। চলো“শব্দ” আর “ওয়ার্ড”-কে আমরা সিনোনিম, তোমরা কি যেন বলো, হ্যাঁ, সমার্থক শব্দ বলে অ্যাক্সেপ্ট করে নিই। করা যায় না ঠাম্মা?”

“কথাটাতে তোর যুক্তি আছে।”

“যুক্তি আছে। আমি লজিকাল কথাই বলছি। এই যে আমি লজিকাল ওয়ার্ডটা ইউজ করলাম, লিখতে গেলে কেন এর বাংলা ট্রান্সলেশান মনে করতে মাথার চুল ছিঁড়ব? লজিকাল ওয়ার্ডটা বহু ব্যাবহারে এখন আমাদেরই শব্দ হয়ে গেছে। লেখার ভাষা আর বলার ভাষার মধ্যে প্যারিটি থাকতে হবে, সামঞ্জস্য থাকতে হবে। আমি অলরেডি বেঙ্গলি নভেলের অনেক শব্দ বুঝতে পারি না। কারণ প্রচলিত ইংলিশ শব্দ ব্যাবহার না করে তার অভিধান স্বীকৃত বাংলা শব্দ ইউজ করা হয়। এটা তো একধরনের ইউজলেস শভিনিজম বা তোমার ডিকশানে যাকে বলে অপ্রয়োজনীয় বিদগ্ধতা। তুমি এই নদীটাকে চিনতে পারো না বললে না? যদি চিনতে পারার জন্য এই নদীটার পাড় ধরে ধরে শক্ত বাঁধ দিয়ে নদীটাকে বদলাতে না দিতে তবে কে বলতে পারে হয়তো নদীটা শুকিয়ে যেত, আমরা নদীটা দেখতেই পেতাম না। তোমার সাথে নদীটার পাড়ে বসে এই সানসেটটা দেখতেই পেতাম না। তাই বলি কি…বাংলা ভাষার সো কলড ফ্ল্যাগ বিয়ারার বা ধ্বজাধারীদের বলো যে ভাষাটাকে এক্সপ্যান্ড করতে দিতে। এই নতুন শব্দগুলোকে বাঙলারই শব্দ বলে স্বীকৃতি দিতে। কথা দিচ্ছি আমার ঠাম্মির ভাষাকে আমি, আমরা মরতে দেব না। অনেক বকে ফেলেছি। এবারে আমার সুইট ঠাম্মি আমার এই গালে, হ্যাঁ ঠিক এইখানে, একটা কিসি দিয়ে দাও তো।”

কাহিনীর দৃষ্টিকোণটা দেখে অশীতিপর বৃদ্ধা কথার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বাংলা ভাষা বাঁচবে। তার আদরের নাতনি কাহিনীর, কাহিনীদের হাত ধরেই বাঁচবে। বিদেশী শব্দ গ্রহণ করে ওরা বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। ওরা ওদের মাতৃভাষা, মাদার টাঙকে মরতে দেবে না। পরম আদরে চুমু খান তিনি তার চোখের মণি নাতনিটিকে।

ঠাকুমা-নাতনি, কথা ও কাহিনী, অনেকক্ষণ গললগ্ন হয়ে থাকে। ততক্ষণে গোধূলির আলোর খেলা মিলিয়ে গিয়ে সন্ধে নেমেছে। নদী সংলগ্ন গাছগুলো স্থির হয়ে কোন সুগম্ভীরের ধ্যানে নিমগ্ন হয়েছে। ঠাম্মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে কাহিনী বলে ওঠে “ঠাম্মা এই রিভারটার নাম কি বলেছিলে?”

“এটা তো একটা ছোট নদী। সেরকম কোনো নাম নেই। আমাদের এই লক্ষীকান্তপুরে এটাকে সবাই ভাসা নদী বলে। অন্য গ্রামে অন্য নাম।”

ইয়ার্কির লেশমাত্র নেই এমন একটা গাঢ়, প্রায়-অচেনা স্বরে কাহিনী বলে ওঠে “গ্র্যানি আমার মনে হয় লোকমুখে নদীটার নাম ভাসা হয়ে গেছে। নদীটার আসল নাম বোধ হয় ছিল “ভাষা”।”

কথা চোখ তুলে নদীটার দিকে তাকান। যেন এক নতুন আঙ্গিকে দেখতে পান নদীটিকে। তারপর অপলক দৃষ্টিতে নাতনির দিকে চেয়ে থাকেন আর তার ঘন ঝালর চুলের মধ্যে বিলি কাটতে থাকেন।

Facebook Comments

শোক ৫

দেখো আমার আনন্দধন
   উথলে পড়ে সুরার মতন
      শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার ফান-ভান্ড
    চাখছে পিঁপড়ে একি কান্ড
      শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার প্রেমপিরিচি
   উপচে পড়ে মিছিমিছি
      শোক তোমাকে কোথায় রাখি

পূর্ণ আমি ভালবাসায়
   বিক্ষত নই গোলাপ কাঁটায়
      শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার সেলফি শহর
   অষ্টপ্রহর আনন্দঘোর
      শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার প্রেমপ্লাবনে
   প্রাণ ভেসে যায় ক্ষণে ক্ষণে
      শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার মোহনবাঁশি
   বাজছে সুরে দিবানিশি
      শোক তোমাকে কোথায় রাখি

শোক তুমি আজ সাত সকালে
   কেনই বা দরজায় দাঁড়ালে
      শোক তুমি যাও অন্তরালে
Facebook Comments

রয়েছ নয়নে নয়নে

মানুষের বেঁচে থাকার কি অদম্য আগ্রহ , কি অপ্রমিত ইচ্ছা ! এই যে আমার চেতন সত্তা, এই যে আমার আপন কক্ষপথে আমার সাথে হাত মিলিয়ে চলতে থাকা মানুষগুলো , আমার দাদা , বোন , স্ত্রী , সন্তান , বাবা , মা , মিত্রস্বজন এদের প্রতি কি অনির্বচনীয় মমত্ববোধ , এদের পাশাপাশি এদের কাছাকাছি থাকার কি হৃদয়মর্মী কাতরতা । “আমি আছি” এই বোধ – এ যেন এক ভরসাপ্রদায়ক স্বস্তিবাচন , এক অনুপম বিশ্বাস । এই যে আমি জীবনের সুমিষ্ট পয়োনিধি থেকে প্রতিনিয়ত এক পেয়ালা জল পান করছি তার কি আনন্দঘন অনুভূতি । এই যে আমি দেখছি , স্পর্শ করছি , ভালবাসছি , প্রিয়জনের সঙ্গকামনা করছি , এই যে “আমি এবং আমার” এর নামই জীবন !

তবু এক অনিবার্য বিশ্রামের সম্ভাবনা আমাদের স্বততঃ অনুসরণ করে । মৃত্যুলোকের তমিস্রাময় ছায়া আমাদের পিছু পিছু ঘোরে সর্বদা। হঠাৎই অতর্কিতে ছুঁয়ে ফেলে প্রিয় কোনো মানুষকে । সহসা অলঙ্ঘ্য অন্ধকারে হারিয়ে যায় কোনো প্রিয় মুখ । নিত্যদিনের হাসি খেলায় তখন সে অনুপস্থিত । হৃদয়ে হৃদয়ের যোগসূত্র ছিন্ন করে তার তখন এক অনুদ্বিগ্ন অনঘ উপস্থিতি । সূর্য তবু আপন বলয়ে প্রদক্ষিণ করতে থাকে । পৃথিবী তবু নিজের কক্ষপথে ছুটতে থাকে। তবু শীত গ্রীষ্ম বর্ষা আসে । তবু পাখিদের কলকাকলিতে মুখর ভোর আসে । তবু সন্ধ্যা নামে আসন্নপ্রসবা গাভীর মত ধীরে । নবজাতক তবু ভূমিষ্ঠ হয় । আহার নিদ্রা মৈথুন হয় । তবু নির্বাচন হয় । উষ্ণ বক্তৃতা হয় । জীবন চলতে থাকে আপন ছন্দে । তার যে মৃত্যুর জন্য থামার সময় নেই !

শুধু কিছু হৃদয়ে ব্যাথা জেগে থাকে । কিছু আঁখি থেকে অশ্রুবিসর্জন হয় গোপনে একান্তে । ছোট ছোট কথা , ছোট ছোট ব্যাথা , ছোট ছোট সঙ্গসুধাকণিকা কোনো একলা দুপুরে টুকরো স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে । মহাকাল তার যাদুদণ্ড বোলাতে থাকে ক্ষতস্থানে । কালের প্রলেপ লেগে শুকোয় ঘা । সম্পর্কের যে মায়াশিকড় মাটির গভীরে বিস্তৃত হয়েছিল , যা  পুষ্ট হত রোজকার সংলাপে , রোজকার হাসি-কান্নায়-আদরে-অভিমানে সে ধীরে ধীরে শুকোতে থাকে । তবু যেন নিঃশেষ হয় না মানুষটার অস্তিত্ব । ভূমায় উড়তে থাকা ঘুড়ি যেমন ভূমির সাথে এক প্রায়-অদৃশ্য সুতো দিয়ে জোড়া থাকে , মুক্ত বিহঙ্গের মত কোনো অনাবিল আনন্দলোকে বিচরণ করতে থাকা মানুষটিও তেমন ভালবাসার এক অচ্ছেদ্য , প্রায়-অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকে মর্ত্যলোকে। সুতোয় যেমন টান পড়লেই বোঝা যায় আকাশে ওই দূরে ছোট্ট কুট্টি হয়ে যাওয়া ঘুড়িটা এখনো আছে , ভোকাট্টা হয় নি , সেরকমই স্মৃতির দড়িতে টান পড়লেই বোঝা যায় মানুষটা আছে । মানুষটা আছে তার সমগ্র অস্তিত্ব নিয়ে , তার আপনজনেদের প্রতি স্নেহ-মমতা-ভালবাসা নিয়ে , তার সন্তানের প্রতি মঙ্গলকামনা নিয়ে , স্ত্রীয়ের স্বাস্থ্যের প্রতি উদ্বেগ নিয়ে , কোনো স্বজন কি বান্ধবের সাফল্যের গৌরব নিয়ে , কোনো অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুশ্চিন্তা নিয়ে , কোনো এক সুস্থ হিংসাহীন পৃথিবীর স্বপ্ন চোখে নিয়ে ,  মানুষটা আছে – শুধু নয়নসমুখে আর নেই, নয়নের মাঝখানে সে গড়ে নিয়েছে তার চৌখুপী ঘর ।

Facebook Comments

পাঠক

ইনি আমার এক প্রিয় বন্ধুর দিদিমা। বয়স নয় নয় করে তিরানব্বই! ছোটবেলা থেকেই মুদ্রিত অক্ষর থেকে রস আহরণ করার বদ অভ্যাস ওনার। এ বছর পত্রভারতী থেকে আমার “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” নামে যে বইটি বেরিয়েছে সেটা উনি মন দিয়ে পড়েছেন মলাট থেকে মলাট এবং শুভেচ্ছা জানিয়েছেন লেখককে। ব্যাপারটা জেনে মনটা এক অদ্ভুত গর্বে ভরে গেল। কারণ দুটো। এক, আমার ছোটগল্পগুলো যে একজন নবতিপর বৃদ্ধার সাথেও যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছে সেটা লেখক হিসেবে আমার জন্য ভীষণই একটা আনন্দের অনুভূতি। কারণ আমি মূলত কিশোরদের জন্য লিখেছিলাম গল্পগুলো।

আর দ্বিতীয় কারণ হল, ওনার যেহেতু সারা জীবনই বই পড়ার বদ অভ্যাস ছিল তাহলে একটু হিসেব করলেই দেখা যাবে রবীন্দ্রনাথ যখন দেহ রাখছেন তখন তিনি ষোড়শী। অতএব ওনার গল্পকবিতার ঝুলিতে আছে রবি, জীবনানন্দ, পরশুরাম, শিবরাম, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমর, সুভাষ, শঙ্খ, শক্তি, ত্রৈলোক্যনাথ। তারপরেও যে উনি আমার লেখা পড়েছেন এবং ভালোবেসেছেন সেটা আমার জন্য খানিকটা ভরসার কথা বই কি! যারা দেশে আছেন এবং বইয়ের এক কপি সংগ্রহ করতে চান ফ্লিপকার্টে গিয়ে “Jojatir Jhuli” নাম দিয়ে সার্চ করবেন। সারা বছরই অনলাইন (এবং কলেজস্ট্রীটের বইপাড়ায়) পাওয়া যাবে এমন ভরসা দিয়েছে আমায় আমার প্রকাশক পত্রভারতী।

এছাড়াও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন স্টোরে। যেখানে সস্তায় পাচ্ছেন সেখানেই কিনুন।

https://www.flipkart.com/jojatir-jhuli/p/itmfddfjpdqtqggg?pid=RBKFDCGMBJTKZAZN&lid=LSTRBKFDCGMBJTKZAZNVGGGS4&marketplace=FLIPKART&srno=s_1_1&otracker=AS_Query_HistoryAutoSuggest_0_2&fm=SEARCH&iid=417238ca-99f3-46d0-895a-dc5694f1347f.RBKFDCGMBJTKZAZN.SEARCH&ppt=Homepage&ppn=Homepage&ssid=nzouf4tfq80000001549471830883&qH=463fb7b5b874e6b9

https://readbengalibooks.com/index.php/jajatir-jhuli.html

https://www.boichoi.com/jojatir_jhuli

https://www.booksfort.com/product/jojatir-jhuli/

Facebook Comments

প্রাণের ভাষা

যে ভাষায় প্রদোষ মিত্র সমাধান করেন বাক্স রহস্য আর ফুল্লরা কহেন তাঁর বারমাস্যা, টেনিদা বলেন “ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফেলিস” আর মনের মত কেকের নাম মন-জিনিস, যে ভাষায় মেঘ গাভীর মত চরে আবার খোকাবাবু যায় লাল জুতো পায়, যে ভাষায় কুচবরণ কন্যার মেঘবরণ কেশ আর পত্রিকার নাম সন্দেশ, যে ভাষা কখনো সরব হয় পথের দাবীতে আবার নীরব হয় পথের পাঁচালিতে, যে ভাষায় তারিণী খুড়ো গল্প বলেন আর লালমোহন গাঙ্গুলী লেখেন রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাস, যে ভাষায় ফুলে নাম পাথরকুচি আর নাচের নাম ধুনুচি, ঘাসের নাম মধুকুপী আর ছিনাথ সাজেন বহুরূপী, যে ভাষায় পথিক হয় পথভোলা আর কিশোরী হয় চঞ্চলা, সে ভাষার নাম বাংলা।

যে ভাষায় নাচের নাম ছৌ আর মধুপের নাম মৌ, যে ভাষায় ফাঁদ দেখে নি ঘুঘু আর ডাকাতের নাম রঘু, বাড়ির মেয়ে গৌরী আর ত্যাগের রঙ গৈরিক, কাঁথার নাম নকশী আর গোয়েন্দার পদবী বক্সী, যে ভাষায় গাছের পাতা হিজল আর চোখের পাতায় কাজল, ফুলের নাম শিউলি আর ডালের নাম বিউলি, যে ভাষায় ঘনাদা দেয় গাঁট্টা আর খেলার নাম সাট্টা, যে ভাষায় ক্যারাম পিটিয়ে আড্ডা আর পরীক্ষাতে গাড্ডা,  স্কুলের বাইরে চুরমুর আর ফুচকা স্টলে হুড়মুড়, যে ভাষায় রাজ্যের নাম হল্লা আর অংক খাতায় গোল্লা, মাঠের নাম ভুবনডাঙা আর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তে রাঙা, যে ভাষায় সাপের নাম তক্ষক আর যে রক্ষক সেই ভক্ষক, স্টেশানের নাম ঘুম আর চাষের নাম ঝুম, যে ভাষায় পৌষমাসে পার্বণ আর কয়লা কালো কার্বন, যে ভাষায় নায়ক মানেই উত্তম আর চাল দেবে যেই মোক্ষম, যে ভাষায় জীবন মানে যাপন আর মৃত্যু মানে তর্পণ, যে ভাষায় “গল্প হলেও সত্যি” আর ছোটরা একরত্তি, যে ভাষায় সোনায় থাকে সোহাগা আর সোহাগ না পেলে অভাগা, যে ভাষায় প্রমাণের সাথে তথ্য আর ওষুধের সাথে পথ্য, ভাতের সাথে শুক্তো আর মণির সাথে মুক্তো, যে ভাষায় পেছনে দিলেই বাঁশ আর উৎসব বারোমাস, যে ভাষায় পিঠের সাথে পুলি আর চুলোর সাথে চুলি, গোলার সাথে গুলি আর মজুরের সাথে কুলি, চৈত্রসেলে ঝুলোঝুলি আর বিজয়ায় কোলাকুলি, স্মৃতিবোঝাই ভেলা আর মিলনবোঝাই মেলা, যে ভাষায় একলা হলেই দুপুর আর বৃষ্টি টাপুরটুপুর, যে ভাষায় ঘুড়ির নাম পেটকাটি আর বাড়ির নাম ভিটেমাটি, আকাশে থাকে গঙ্গা আর লেবুজল খেয়ে চাঙ্গা, মিলের নাম জুট আর খেলার নাম গোল্লাছুট, যে ভাষায় নদীর নাম কাঁসাই আর ইসকাপনের বিবি পাশাই, পাখির নাম শুক আর জ্যোৎস্না রাতে মূক সে আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা।

যে ভাষায় পিসির নাম পদী আর সুবর্ণরেখা নদী, গোয়েন্দা হন ভানু আর গায়ক কুমার সানু, যে ভাষায় উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে আর লিচুচুরি হয় পুকুর পাড়ে, অলির কথা শুনে বকুল হাসে আর সন্তান সুরক্ষিত মাতৃবাহুপাশে, ব্যাঙের নাম সোনা আর মাছের নাম পোনা, চুলেতে বেলফুল আর রূপেতে মশগুল, সাঁওতাল রাজার নাম দোবরু আর হর্ষবর্ধনের ভাই গোবরা, যে ভাষায় প্রিয়ার নাম রাজলক্ষ্মী আর বারবণিতার নাম মধুমক্ষী, যে ভাষায় ছাদনাতলায় বসিয়ে…”আমি যামিনী তুমি শশী হে”, যে ভাষায় আমের থাকে শিষ আর যা উনিশ তা বিশ, বাঙাল থাকলে ঘটি আর আঁশ থাকলে বঁটি, পানের থাকে বরজ আর প্রেমিকের থাকে গরজ, পাটির সাথে সাপটা আর ঝড়ের সাথে ঝাপটা, বাঁশের নাম মুলি আর স্টেশান শ্যাওড়াফুলি, যে ভাষায় গাছে ওঠে গল্পগরু আর ছক্কা হাঁকালে “চলবে গুরু”, ফুলের নাম মহুল আর গানের নাম বাউল, টেনিদার চ্যালা প্যালা আর টিফিনে কুমীরডাঙা খেলা, যে ভাষায় রবিবারেতে পাঁঠা আর পিরিতি কাঁঠালের আঠা, মাছের দোকানে জটলা আর ফটিক, বাপ্পা, পটলা, যে ভাষায় ফুলপিসি আর বড়কা, আর চাদের বুড়ির চড়কা, যে ভাষায় কাগজে হয় নৌকো আর চালাক চতুর চৌকোস, পানে থাকে জর্দা আর গল্প বলেন বড়দা, পুজোয় থাকে ফর্দ আর মেয়ে থাকলেই মর্দ সে আমার প্রাণের ভাষা গানের ভাষা বাংলা ভাষা।  

Facebook Comments

শোক ৪

শোক তোমাদের কোথায় বাড়ি কোন নগরে?
শোক তোমাকে আজ খুঁজে পাই কেমন করে?
শোক তুমি আজ কোথায় গাইছ মৃত্যুর ধুন
শোক তুমি আজ বুক ফুঁড়ে দাও…লাল হারপুন

শোক তুমি আজ পাথরকুচি পাতার মতন
পাতায় তোমার রক্ত ধরো। সন্ধ্যা শকুন
খুবলে খাবে আজকে হৃদয় খুবলে খাবে
শোক তুমি আজ রক্তনদে নাইতে যাবে

শোক তোমার আজ হোক বনবাস চোদ্দ বছর
আমার তো এই সাজিয়ে রাখা স্বপ্নশহর
শোক তোমার আজ এই শহরে প্রবেশ মানা
শোক তুমি যাও অন্য কোথাও। মৃত্যুডানা

দাও মেলে দাও। আমার তো কেউ হয়নি সামিল  
ওই দূরে যায়  অনেক দূরে মৃত্যুমিছিল..

 

Facebook Comments

শোক ৩

শোক এসেছে, শোক এসেছে, উলু দে রে
রশনচৌকি…সানাই বাজুক শোক শহরে
শোক খেতে দাও, শোক বেঁটে দাও গরম গরম
শোক উপহার হোক। না থাকুক লজ্জাশরম

শোক সাজানো আজকে থাকুক ফুলদানিতে
“হেঁইয়ো” চলুক শোকের মিছিল রাজধানীতে
শোক পড়ুক আজ ঝরুক পড়ে জোর কলমে
শোক জ্বলুক আজ মোমবাতিতে মধ্যযামে

শোক তুমি আজ কথার কথা…এমনি এলে?
যে বাড়িতে ফিরল না আজ বাড়ির ছেলে
শোক ধুয়ে খাক – শোকের মত উপাদেয়
কিই বা আছে? ঘৃণা তো নয় শোকই শ্রেয়

শোকের থেকে বড় সুজন আর কে কারো?
রুপোর থালায় শোক বিনিময় শ্রেষ্ঠতর  

Facebook Comments

শোক ২

শোক ফুটেছে পথের ধারে মৃত্যুভারে
শোক জমেছে ইস্তাহারে শব্দহারে
শোক নটরাজ নয়, নাচে আজ উন্মাদিনী
ওই ছেলেটা আজকে ঘরে আর ফেরে নি

শোক শোকালো শোক শোকালো চোখের কোণে
বোকা হৃদয় ব্যর্থ আশায় প্রহর গোণে
শোক তুমি আজ পাথর হলে পাথর হলে
আজ ছেলেটা ফিরবে না আর মায়ের কোলে

শোক তুমি আজ বৃথাই তোমার সওয়াল করো
শোক তুমি আজ বৃথাই স্মৃতির সৌধ গড়ো
শোক শহরের সিংহদুয়ার আজ খোলা নেই
ঐ ছেলেটা কালকে ছিল আজ বেঁচে নেই

শোক তুমি আজ নির্বাসিত নির্বাসিত
কাল ছিল ফুল, আজ ঝরেছে, আজ প্রয়াত

Facebook Comments