কবি কীর্তন

তা হয়েছে কি, কবি লিখে ফেলেছেন, ভালবাসা কারে কয়। তা তৎক্ষনাৎ কবির ফ্যান, এসিরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বলতে আরম্ভ করেছে, অহো কবি, কি লিখলেন, কি লিখলেন! কি অপূর্ব ধ্বনি মাধুর্য। কি অপরূপ রচনাশৈলী! কি গভীর জীবনবোধ! কেউ বললেন, এ যেন জীবনের বাণী। কেউ বললেন, কথা কটা শুনে হালে পেলাম পানি। কেউ বললেন, কবি তোমায় ঈশ্বর আমি জানি।

কবি মুখরা লিখেছেন, ভালবাসা কারে কয়। তো কবির পো-রা কিম্বা পোঁ-ধরারা লিখতে বসে গেলেন, সঞ্চারী, অন্তরা। কোনো পো লিখলেন, ভালবাসা কারে খয়। কেউ লিখলেন, ভালবাসা কারে গয়। ভালবাসা কারে ঘয়। ভালবাসা কারে ঙয়। কবি ক লিখেছেন তো ফ্যানেরা চন্দ্রবিন্দু অব্দি লিখে তবে থামলেন।

এদিকে কবি ফ্যাসাদে পড়ে গেছেন। প্রথম লাইনটা মাথায় আসতেই ফেসবুকে পোস্টিয়ে দিয়েছেন কারণ পাঠকের পাহাড় প্রমাণ চাপ। ফেসবুকের দেওয়ালে রোজ রাখতে হবে গভীর ছাপ। এখন পরের লাইন খুঁজে পাচ্ছেন না। মাথা ঠুকছেন।

ভালবাসা কারে কয়?
কয়ের সাথে মিলিয়ে কি হয়?
কবির মনে সংশয়।
আরে যা হোক কিছু লিখে দিই বিশেষ্য, বিশেষণ, অব্যয়।
ফ্যানেরা লাইক দিয়েই দেবে…শ’য় শ’য়।

খোয়া যায় শৈশব

নদী সরে যায় দূরে আরো দূরে
একা ঘুরে ঘুরে ঠা ঠা রোদ্দুরে
বৃষ্টি নামবে এ শহর জুড়ে
ভেবেছি বল্গাহীন

এ শহর তবু একা হয়ে যায়
ঠোঁটের তিলেতে তৃষ্ণা সাজায়
একা কবিতারা কেঁদে কেঁদে যায়
আসে না বৃষ্টিদিন

আমাদের আজ হাঁসুলির বাঁক
তুলসী মঞ্চ সন্ধের শাঁখ
চুরনের গুঁড়ো ফেরিওলা হাঁক
হারিয়ে গিয়েছে সব

আমি বসে বসে একা হিমঘরে
সকালে দুপুরে রাত্রিতে ভোরে
শহরে নগরে গ্রামে বন্দরে
গুনি কবিতার শব

আমাদের রোজ চিলেকোঠা ঘরে
সকালে দুপুরে রাত্রিতে ভোরে
শহরে নগরে গ্রামে বন্দরে
খোয়া যায় শৈশব

বেবি সিটিং

[2018 Summer]

ঘরে একা বসে আমার প্রায় ছবি বিশ্বাস হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। কেন বলি। আমার কন্যারত্নটি তো আছেই, সঙ্গে এক বন্ধুপুত্র। এই দুই বিস্ময়কর প্রাণীর বেবি সিটিং-এর দায়িত্ব আমার ওপর। একেবারে যাকে বলে ডবল ধামাকা। এমনিতে বাচ্চাদের সঙ্গ আমার মন্দ লাগে না। ওদের মনস্তত্ত্ব স্টাডি করে আমি বেজায় আনন্দ পাই। 

এ যাত্রায় প্রথমেই ওদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করে দিই। কারণ আমার স্থির বিশ্বাস বন্ধুপুত্র হৃদুকে আমার কন্যা সানাই কয়েক মুহুর্ত আগে যেরকম উৎসাহের সঙ্গে বিগলিত হয়ে আপ্যায়ন করেছিল সেইরকম গদগদ সম্পর্ক আধ ঘণ্টা পরে থাকবে না। কারণটা একটাই। রিসোর্স কনস্ট্রেইন্ট। যে জিনিসটা এর চাই সেইটাই সেই মুহূর্তে অন্য জনেরও দরকার হবে। বড়দের মধ্যেও একই বিবাদ হচ্ছে বড় বড় জিনিস নিয়ে। ওদের মধ্যেও হয় ছোট ছোট জিনিস নিয়ে। যেমন ধরুন একটা ম্যাজিক স্টিক্ বা জাদুকাঠি। এ যদি নিলো ওরও চাই। দু কপি থাকলে যে খুব একটা স্বস্তি পাবেন তা না। কারণ এ যে কপিটা নেবে, অন্যটা ফেলে দিয়ে ওরও সেই কপিটা চাই। এ জন্যই এক জ্ঞানীগুণী দাড়িওলা ভদ্রলোক লিখে গেছে “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই যাহা পাই তাহা চাই না।” 

তাই প্রথমেই প্রিয়েম্প্টিভ মেজ়ার হিসেবে ওদের বলি “তাহলে আমরা ফ্রেন্ডস্ রাইট? নো ঝগড়া, কেমন?” দুজনেই খুব বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। আমিও ওদের নিজেদের মত খেলতে দিয়ে একটা উপন্যাসে ডুব দিই। কিন্তু বিধি বাম। কিছুক্ষণ পর থেকেই একবার এর থেকে আর একবার ওর থেকে নালিশ আসতে থাকে “সানাই মারছে”, “রিদু মারছে” ইত্যাদি। অন্যমনস্ক ভাবে একটাই বাক্য ফাটা রেকর্ডের মত বাজাতে থাকি। “দুজনকেই বকব, দুজনকে দু ঘরে দিয়ে দেব,” ইত্যাদি হুমকি দিতে থাকি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবার ওদের সখ্যতা স্থাপিত হয়। তারপর আবার যে কে সেই। 

যখন নালিশ করছে না তখনো যে শান্তি তেমন নয়। কারণ নালিশ করছে না যদি তাহলে নির্লিপ্ত চিত্তে কিছু না কিছু একটা অকাজ, কুকাজ করছে ধরে নেওয়া যেতেই পারে। যেমন সোফায় উঠে উদম নৃত্য বা সোফার হাতল ধরে বিপজ্জনকভাবে ওঠানামা। সেগুলো থেকে মাঝে মাঝে বকাঝকা দিয়ে বিরত করছি। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম রীতিমত গোল বেধে গেছে। অজস্র আনাইডেন্টিফাইড্ ফ্লাইং অবজেক্ট বা ইউ-এফ-ও ঘুরছে আমাদের বসার ঘরের আকাশে। কিম জং উন-এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কিনা কে জানে সানাইয়ের খেলার ব্লক্সগুলো মিশাইলের মত সাঁই সাঁই করে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে চলেছে। টিভির আশেপাশে সেগুলো বিপজ্জনকভাবে ল্যান্ড করছে। একটা আমার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। কাচের জানলায় ঠকাস করে লেগে তারপর অধঃপতন।  “নো থ্রোয়িং” বলে চেঁচাই। কিছুক্ষণের বিরতি।  

তারপর আবার সেই একই খেলা। সাথে যোগ হল নালিশ। সানাই ছুঁড়লে হৃদু নালিশ করে “সানাই ছুলছে’ আর ভাইস ভার্সা। আবার হুমকি ছাড়ি। “দুজনকে দু ঘরে রেখে দেব কিন্তু”। এর উত্তরে সানাই বলে “রিদুকে বকো। রিদু ছুঁলেছে”। রিদু বলে “সানাইয়ের কান মলে দাও। ও ছুঁড়েছে।” আমি কিন্তু ফিজিক্যাল ভায়োলেন্সের পথ মাড়াই না। কান মুলে দিলে সানাই এখন যে সানাই ধরবে সেটা হয়ে যাবে গোদের ওপর বিষফোঁড়া। বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমি রাহুল দ্রাবিড়ের মত সেফ খেলার চেষ্টা করি। কোন সাইডই নিই না। দুজনকেই চোখ রাঙাই। 

কিন্তু মুস্কিলটা হল আমি আমার ছোটবেলাটাকে পুরোটা ভুলে উঠতে পারিনি। তাই ওদের এইসব বালখিল্যপনার মধ্যে নিজেরই ফেলে আসা দিনগুলোকে খুঁজে পাই। তাই সেই অর্থে কাউকেই বেশি বকে উঠতে পারি না। আর বড়দের মুড আর টোন জাজ করার ক্ষমতা ওদের অসীম। তাই দুজনের কেউই সে অর্থে ক্ষান্ত দেয় না। 

একটার পর একটা নতুন দুষ্টুমি বুদ্ধি উদ্ভাবন করে দক্ষযজ্ঞ টাইপ একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড চালাতে থাকে। মাঝে মাঝেই সানাই “মাইন মাইন” বলে চেঁচাতে থাকে। এ মাইন কিন্তু ল্যান্ড মাইন নয়। এর অর্থ mine অর্থাৎ আমার। আমার আড়াই বছরের শিশুকন্যাকে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ পড়াতে পারি নি এখনো। তাই “আমি ও আমার এইটেই অজ্ঞান” – এই জীবনদর্শনে ওর বিশেষ আস্থা নেই। তাও বলি “সানাই শেয়ার করতে হয়। রিদু তোমার বন্ধু না?” বলি বটে কিন্তু খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি না। সত্যিই তো, আমরাই বা আমাদের যা আছে তার ঠিক কতটা শেয়ার করি যাদের নেই তাদের সাথে যে ও করবে। শেষমেশ তিতিবিরক্ত হয়ে আমি উপন্যাস থেকে বেরিয়ে এসে বলি “চলো এবারে আমি গল্প পড়ে শোনাব”। হাতের সামনে “দ্য বিউটি এন্ড দ্য বীস্ট্” বইটা নিয়ে খুব নাটকীয়ভাবে রিডিং সেশন শুরু করি। দুজনেই কোল ঘেঁষে আসে। তারপরের ঘটনা নিম্নরূপ। 

আমি বলি “দেন এ বিগ স্টর্ম হ্যাপেনড। দ্য বোট ক্যাপসাইজ়ড্।” সানাই বোটের দিকে আঙুল দেখিয়ে “নৌকো নৌকো” বলে উৎসাহ প্রকাশ করতে থাকে। কানের থেকে চোখের আবেদন বেশি আমাদের কাছে। ওদের কাছেও তাই। গল্প শোনার থেকে গল্পের বইয়ের ছবি দেখাতেই বেশি আগ্রহ। দমে না গিয়ে বলি “হ্যাঁ বোট। তারপর কি হল শোনো”। এর মাঝেই রিদু প্রশ্ন করে বসে “গোলাপ। মেসো গোলাপ কেন?” লে হালুয়া। সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি।  

“কি শুনলে তাহলে এতক্ষণ? বিউটির বাবাকে বিউটি একটা রক্তগোলাপ এনে দিতে বলেছিল। বললাম না আগে?” শুনে মাথা নাড়ে। ঠিক বুঝল বলে মনে হয় না আমার। সবে আবার রিডিং পড়তে পুরো দমে শুরু করেছি রিদু আমার কোন অনুমতি না নিয়েই নিতান্ত অবিবেচকের মত পাতাটা উল্টে দেয়। আগের পাতার গল্পে ওর আর বিশেষ উৎসাহ নেই। নো প্রব্লেম। ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে সিনেমা তো আমরাও দেখে থাকি – এই বলে মনকে প্রবোধ দিই। পরের পাতায় যা লেখা ছিল সেটাই উৎসাহের সাথে পড়তে শুরু করি। আমার উৎসাহ দেখে সানাই ততোধিক উৎসাহে বইটা একেবারে বন্ধ করে দেয়। হাসি হাসি মুখ করে বলে “অল ডান।” অর্থাৎ গল্প পড়া আপাতত মুলতুবি। 

গল্পটা ওদের জন্য তেমন উত্তেজনা উদ্দীপক হচ্ছে না। বলি “তোমরা ম্যাজিক দেখবে? ম্যাজিক?” আমরা সবাই জীবনে একটা ম্যাজিক চাই। ওরাও চায়। ম্যাজিক দেখার নামে গায়ের কাছে ঘন হয়ে আসে। আমি কোন পি সি সরকার নই। ম্যাজিকের ম জানিনা। সুবিধে হচ্ছে এই মুহূর্তে আমার অডিয়েন্সও তেমন সেয়ানা নয়। তাই একটা ব্লক হাতের তালুতে নিয়ে পরক্ষণেই পিছনে লুকিয়ে ফেলে বলি “ভ্যানিশ”। দুজনেরই চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা। উৎসাহ পেয়ে আবার করি। কিন্তু না ওদের খুলিতে খোল ভরা নেই। এই বারের বার হৃদু পেছন থেকে অদৃশ্য ব্লকটা বের করে নিয়ে এসে বলে “আমি করি?” বলে আমারই ম্যাজিক আমাকেই দেখিয়ে দেয়। 

এইসব নানারকম করে যখন বিধ্বস্ত ততক্ষণে হৃদুর বাবা, আমার বন্ধু বাড়ি চলে এসেছে। প্রাণে একটু বল পাই। মনে সাহস। এইবারে শুরু হয় ওদের খাওয়ানোর পালা। আর বাচ্চাদের খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা নিশ্চয়ই এক বাক্যে স্ব্বীকার করবেন যে সেটা ধর্মের পথে থাকার মতই শক্ত।  

সবুজ

মে মাসটা আমেরিকায় বৃষ্টিমাস। সকাল থেকে প্রায় দিনই ঝিরি ঝিরি করে ঝরতে থাকে শ্রাবণ। সূর্যের আলসেমি ছড়িয়ে যায় নিজের শরীরেও। চোখ খুলতে চায় না। কম্বলের তলায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে বর্ষার চপল পায়ের নিক্কণ শুনি। আবার এক এক দিন হয়তো প্রকৃতির সঙ্গলাভের ইচ্ছায় জ্যাকেট চড়িয়ে বাড়ির বারান্দায়। সারারাত বৃষ্টি হয়ে সবে হয়তো আকাশ একটু ফর্সা। সদ্যস্নাতা প্রকৃতির কি যে অদ্ভুত মাদকতা সে কেমনে ভাষায় ধরি? আমার যদি “শক্তি” থাকতো বলতাম, “এখানে মেঘ গাভীর মত চরে”। সত্যি আসন্নপ্রসবা নারীর মত সময় যেন শ্লথ হয়ে আসে। সময়। যা প্রতিদিন ছল করে আমায় আমার থেকে দূরে করে দিতে থাকে, যে প্রতিদিন আমায় মিথ্যে আশ্বাস দেয়, একদিন নীড়ে ফেরা হবে, সে যেন থমকে দাঁড়ায়। সে যে কি অনুভূতি, ঠিক বলা যায় না। ভাষা তুমি এত অসম্পূর্ণ কেন? শব্দ তুমি এত অপারগ কেন? অক্ষর তুমি এত সীমাবদ্ধ কেন? ভাবি। ভাবি আর দেখি একটা ত্রিমাত্রিক কুয়াশার মিহি জাল ঝুলে আছে আলগোছে। তার মধ্যে ঘুমে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে ভেজা বাতাস আর ঠান্ডার অদৃশ্য কোরক। আর থাকে পাখিদের কুহুগিতালী।  যে কল্পনাপ্রবণ কবিমন পাখিদের ডাকে প্রভাত রাগিণী খুঁজে পায় সে আমি নই। আমি দেখি ওদের মধ্যে লেশমাত্র হিউমান সিভিলিটি নেই। কেউ কারু কথা শোনার জন্য দু দন্ড চুপ থাকছে না। অনর্গল শুধু নিজের কথা। সবাই মিলে একসাথে বকর বকর করে এমন একটা শোরগোল তৈরী করেছে যে কারুর কথাই ঠাহর হয় না। আন্দাজে বুঝে নিতে হয় ওই বুঝি কোনো মা তার ছানাটিকে ওড়ার সহজপাঠ দিচ্ছে। ওইখানে কোনো নবীন প্রেমিক তার সদ্যপ্রেমিকাকে একটু মির্জা গালিব শুনিয়ে দিচ্ছে। ওইখানে হয়তো কয়েকটা ছোট ছোট পাখি-ছেলে-মেয়ে জীবনের পাঠ নিতে বসে অনর্গল নিজেদের মধ্যেই বকে চলেছে। সব মিলিয়ে মাছের বাজার। না। পাখির বাজার বলা চলে। এক অপার্থিব, অনাস্বাদিত, অলীক পাখির বাজার। জীবনের এমন কলরোল শুনতে শুনতে বুঁদ হয়ে আসি। 

আমার এক নামকরা কবি বন্ধুকে একবার এদেশের গাছ চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি উৎসাহিত হন নি তেমন। প্রথমে মনে হয়েছিল, এ কেমনে সম্ভব? কবি অথচ প্রকৃতিপ্রেমী নয়? পরে ভেবে দেখেছি, সে তাঁর দোষ নয়। নগর কলকাতায় বড় হয়ে ওঠায় তাঁর কখনো প্রকৃতির সাথে সখ্যতাই স্থাপিত হয় নি। আমার অন্য এক কবিবন্ধু বলেছিলেন, কলকাতায় বড় হয়ে ওঠায় তিনি গাছ বলতে দেখেছেন মানি প্ল্যান্ট আর পাখি বলতে দেখেছেন কাক। মফস্বলের কবিরা দেখি গাছ বাঁচানোর অ্যাক্টিভিজিমের সঙ্গে যুক্ত। সত্যি, এ হিসেবে আমরা যারা মফস্বলে মানুষ তারা কিছুটা গৌরব করতে পারি। আমেরিকার বৃষ্টিভেজা এক ভোরে কিচিরমিচির পাখিদের ডানায় ভর করে ছোটবেলায় উড়ে গিয়ে দেখি, বর্ষাকাল। এক প্রকান্ড কদম গাছ ফুলভারে নত। মাটিতে আলগোছে পড়ে কদম ফুল। তার পুষ্পিত কেশরগুলো নবঘন শ্যাম দর্শনে শ্রীরাধিকার মতই শিহরিত। ওই তো পাশেই একটা কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচুড়া জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। এখন তাদের ফুল নেই। গ্রীষ্মে ছিল তাদের পুষ্পগৌরব। লাল আর হলুদের আশ্চর্য হোলিখেলা শেষ হয়েছে বটে কিন্তু তাদের ভেজা ভেজা সঘন আচ্ছাদন কিছু কম মনোহর নয়। ওই তো, এক বিশাল বকুল গাছ এক প্রাচীন চিলের মত ডানা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বকুলের গন্ধ আরামদায়ক ঈষদোষ্ণ আলোয়ানের মত ছড়িয়ে আছে গাছের নীচে। এখনও দেশে গেলে যাই ছোটবেলার শহর খড়গপুরে। কিন্তু সে স্থানের সে রূপ আর নেই। আর পাঁচটা উঠতি শহরের মতই সে ঝরিয়ে নিয়েছে বৃক্ষমেদ। ইঁট-কাঠ-সুড়কির পেশী আস্ফালন দেখা যায় সর্বত্রই। এখন শহর আর শহরতলির পার্থক্য ঘুচছে। আসলে বোধ হয় সব প্রকার পার্থক্যই ঘুচেছে। লন্ডন প্যারিসের পার্থক্য ঘুচছে। আমেরিকা ভারতের পার্থক্য ঘুচছে। সভ্যতা যেন এক আত্মধ্বংসী সুষমার খোঁজে ছুটে চলেছে। দ্রুত। 

সে যাই হোক, পৃথিবীর একমাত্র দ্বিপেয় প্রাণীর চাপ কিছুটা কম বলেই হয়তো এখনও এ দেশে, আমেরিকায়, কিছুটা সবুজ আছে। এখনো ডালপালার শামিয়ানা টাঙিয়ে কিছু গাছ আছে। সে গাছে গাছে এখনও কিছু বাচাল অবিমৃষ্য পাখি আছে। আর এমন বৃষ্টি ভেজা দিনের ঘুমঘোর আছে। প্রকৃতির স্নেহময় বাহুডোর আছে। আর সবুজ কমে আসছে আমার শৈশবের ঘরে। ক্যাক্টাসের সেই গানটা আজ বোধ হয় প্রাসঙ্গিক। “কথা ছিল সব সবুজ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আমি দেব অমৃতের সন্ধান।” সবুজ ফুরিয়ে আসছে। কবি কবে আর, কবে আর, অমৃতের সন্ধান দেবে? 

চুপকথা

নিহত সময়।
স্মৃতি আলপথ ধরে এইক্ষণে হেঁটে আসা যায়।
.
স্তব্ধ প্রহর।
মুখোমুখি আমি আর আমি বসে। চিলেকোঠা ঘর।
.
মৃত্যু ভ্রমরী
বলে গেল, এইবার এইবার চুপিসারে নামবে শর্বরী।
.
রাত্রি নিঝুম।
কথকতা শেষ। আজ চুপকথাদের মরসুম।

বৃষ্টি পড়ে

নিকষ নিঝুম ঘুম শহরে
চুপকথাদের ওজন বাড়ে
বৃষ্টি পড়ে
সারা সকাল বৃষ্টি পড়ে

ঘুম জড়িয়ে চোখ জুড়িয়ে আকাশ জুড়ে
মেঘ-বালিহাঁস জলকে চলে। শব্দসুলুক।
টুপ টুপ টুপ জল-সোহাগী ঘাস চাদরে
মুখ নামিয়ে ভিজছে কথা। একলা ডাহুক

ডাকছে কাকে গহীন সুরে দিগন্তে।
মাটির ঘ্রাণে মন্মথ মন একান্তে
তোমার কথাই ভাবছে। সকাল বৃষ্টিলীন।
মেঘপিয়নের মন-কেমনে শব্দঋণ…

জীবন

করোনার ক্যারিস্মায় দুসপ্তাহ হল গৃহবন্দী।

বাড়িতে বেসমেন্ট আর তিনতলা মিলিয়ে কটা সিঁড়ি আছে গুনে ফেলেছি। Cosco আর Whole Foods-এর মধ্যে কাঁচা সব্জির দামের তুলনামূলক বিচার করে নিয়েছি। করোনা নিয়ে আড়াই হাজার Opinion Piece, আর তিনশ আটানব্বইটা “ভাইরাল ভিডিও” দেখে ফেলেছি। সমগ্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চার বছরে যা শিখেছি, গত দু সপ্তাহে করোনা এবং ভাইরোলজি সম্বন্ধে তার থেকে বেশি জেনে ফেলেছি। এই রিসেশানের বাজারে চাকরিটা গেলে নিশ্চয়ই Virologist হিসেবে ডক্টর ফসি’র সহকারী হিসেবে চাকরি বাঁধা। প্রতি আড়াই দিনে একবার করে সানাইকে পড়তে বসানোর একটা বিফল চেষ্টা করে ফেলেছি। দিনে পৌনে তিনখানা করে আমার ছোট মেয়ে তাথৈ আর বড় মেয়ে সানাইয়ের ঝগড়া সমাধান করে ফেলেছি। দেড়খানা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুএজ শিখে ফেলেছি। পৌনে দু খানা উপন্যাস শেষ করে ফেলেছি। যে ভাবে আগে ক্রিকেট সম্রাট শচীনের স্কোর ট্র্যাক করতাম সেরকম করে করোনায় লোকান্তরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ট্র্যাক করছি পাঁচ মিনিট অন্তর। তারপরেও তো সারাদিন সময় কাটে না। তাই সারাদিন খাই খাই করছি। কিচেনের আশেপাশে পোষা বিড়ালের মত ঘুরঘুর করছি নিজের অমতেই। Involuntary Motion-এর মত নিজের অজান্তেই হাত চলে যাচ্ছে ছোলার ডিব্বেতে, কেকের প্যাকেটে, কিম্বা চানাচুরের বোয়ামে। দু মাস এমন চললে “ছোটা হাতি” হয়ে বেরোবো সন্দেহ নেই। কিন্তু মুসকিলটা অন্য জায়গায়। আমার যদি “খাই খাই” রোগ লেগে থাকে তবে আমার ছোট কন্যার (আপাতত এক-বছর-কত-জানি-মাস বয়স তার) “খাও খাও” রোগে ভুগছে। রোগের লক্ষণ বা দুর্লক্ষণ এই যে, যেকোনো ধরণের জিনিস হাতে নিলেই আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলছে “খাও খাও”। শব্দটা নতুন আবিষ্কার করায় ব্যবহার করার ভীষণ তাড়া ওর। এমনটা মনে আছে স্কুল জীবনে নতুন ইংরেজি শব্দ শিখলে হত আমার। যেকোনো সেন্টেন্সেই শব্দটা ফ্যাটাক করে ঢুকিয়ে দিয়ে রিডারের হার্ট অ্যাটাক করিয়ে দেওয়ার মত আনন্দ কিছুতে ছিল না। সে যাই হোক। প্রসঙ্গে ফিরি। তো আমার মেয়ে যেসকল জিনিস আমায় খেতে অনুরোধ করছে সেগুলো হল এরকম – এক পাটি জুতো (কখনো মানুষের, কখনো পুতুলের), সোফার দুর্গম কর্নার থেকে বের করে আনা ক্ষয়রোগাক্রান্ত, ধসে-যাওয়া কর্নফ্লেক্সের টুকরো, কিচেনের ঘনান্ধকার কোনো গলিখুঁজি থেকে বের করে আনা আনুবীক্ষণিক সাইজের (মোস্ট লাইকলি ইঁদুরে কাটা) বিস্কুটের টুকরো, মাঝে মাঝে সোফিয়া কি রপাঞ্জেলের প্রতিমূর্তি বা ডল ইত্যাদি। আমি চাইনীজ নই। এমন অখাদ্য কুখাদ্য খাওয়ার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তাই বিনয়ের সঙ্গে সেই বদান্যতা প্রত্যাখ্যান করলে সেই দেড় ফুটিয়া তিরিশ পাউন্ডের অণু মানবীটি ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়। অনেক কটা খুব খারাপ গালাগালি দিয়ে (মনে হয় গালাগালিই হবে কারণ সেই শব্দগুলোর একটাও আমার বাংলা কি ইংরেজি অভিধানে নেই) সে আবার সেই “খাও খাও” কথাটি রিপিট মারে ভাঙা ক্যাসেটের মত। চোখে আশা আর হাতে অখাদ্য নিয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকে। সানাই খুব উৎসাহের সঙ্গে বুঝিয়ে দেয়, বাবা প্রিটেন্ড খাওয়া খেতে হবে। অর্থাৎ কিনা খাওয়ার অভিনয় করতে হবে। এমন একটা দুর্ঘট ঘটনায় সানাই যে যারপরনাই পুলকিত সে তার চোখ মুখের ঔজ্জ্বল্য দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। পড়তে বসার সময়টুকু ছাড়া ও সবকিছুতেই বেশ ফুর্তি পায়। বিশেষ ফুর্তি পায় বাবা বোনুর হাতে কি মায়ের হাতে নাকাল হলে। পড়তে বসানোর চেষ্টা করা ছাড়া এ জন্মে ওর পেছনে কোনো কাঠি করেছি বলে মনে পড়ে না। পূর্বজন্মের শত্রুতা হবে নিশ্চয়ই। যাই হোক। তাথৈর সেই বাড়ানো ছোট মাপের হাতটা মুখের কাছে টেনে এনে খাবার অভিনয় করতেই কচি মুখে এক মুখ হাসি ফুটে ওঠে এবং সাথে তার কিছু আশীর্বাণী বর্ষায় (আশীর্বাণীই হবে কারণ এ শব্দগুলোও আমার বাংলা বা ইংরেজি অভিধানে নেই)। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চ্যাংদোলা করে হাত ধোয়াতে নিয়ে গেলে সে চেঁচাতে থাকে তারস্বরে “ছেলে দাও। ছেলে দাও।” (না “ছেলে” চায় না, “ছাড়া” পেতে চায়)। আপাতত তার ভাষাশিক্ষা এই অবধি। পেছনে হাততালি দিতে দিতে সানাই অনুগমন করে আমার ও আমার কব্জায় থাকা অসন্তুষ্ট বোনুর।

গ্রহণের করাল ছায়ার মত বাইরে মৃত্যু কেড়ে নিতে থাকে জীবনের জমি। আর চার দেওয়ালের মধ্যে এমন করেই নতুন প্রাণ, নতুন কিছু শাখামৃগ নিজেদের শাখা প্রশাখা বিস্তার করতে থাকে। Death is the only constant. And life is the only derivative.

দর্পিত

আমাদের কৃত্রিম গতিময়তা, আমাদের নিত্যদিনের ব্যস্ত থাকার মানস বিলাস, আমাদের সামাজিক হওয়ার অনর্থক নিয়ত প্রয়াস যখন একটা আনুবীক্ষণিক বীজাণু এসে স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেল তখন চোখ ফুটলো আমার। যেমন করে পাখির ছানা চোখ ফুটেই দেখতে পায় অনন্ত সুনীল আকাশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, রুনুক ঝুনুক প্রসন্নতা ছড়িয়ে আছে আনাচে-কানাচে। যেমন করে বোধোদয় হয় শিশুর যখন সে বুঝতে পারে শব্দ শুধু কয়েকটা ধ্বনির সমষ্টি নয়, তার অন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে একটি অর্থ যা কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে উদ্দিষ্ট করে আর সেই উপলব্ধির গৌরবে সে ক্রমাগত উচ্চারণ করে চলে সেই শব্দ যেমন বাবা, মাম্মা, ক্যাট। এই সাময়িক স্থিতি আমাদের সেইরকম একটা গুরুবোধ দিয়ে গেল যে একটি বিকল্প জীবনপথ আছে, আমাদের বহির্মুখী জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের কাছাকাছি, নিজের কাছের মানুষের কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ আছে।

একটা প্রচণ্ড উন্নাসিক রথ পতপতিয়ে উত্তরাধুনিক সভ্যতার জয়ধ্বজা উড়িয়ে অশ্লীল গতিতে ছুটে চলেছিল আর কোমড়ে দড়ি বাঁধা আমার শরীর হেঁচড়ে হেঁচড়ে এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। প্রায়োন্মৃত রক্তাক্ত শরীর আমার অক্ষম কণ্ঠে বিশ্রাম ভিক্ষা করেছে বারংবার। বধির জয়রথ শুনতে পায় নি। অথবা রথচক্রের ঘর্ঘর ধ্বনির মদোন্মত্ততার সামনে সেইসব অক্ষম রোদন, বিলাপ নেহাতই দুর্বলের প্রলাপ মনে করে ক্রূর হাসি হেসে উপেক্ষা করেছে। হঠাতই সেই রথের গতি শ্লথ হয়ে এল। হঠাতই সময় হল দু দন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রেমিক প্রকৃতিকে গভীর ভাবে দেখা, বীক্ষণ করা। 

সামাজিকতা রক্ষায় আমি দিবারাত্রি সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে নৃত্য করেছি, মনের বাতায়ন খোলার সময় হয় নি দিনের পর দিন। সামাজিক কর্তব্য রক্ষার ডাক, কল অব ডিউটি তে সাড়া দিতে গিয়ে মনজমিন উষর হয়েছে, কালিঝুলি পড়েছে মনের দেওয়ালে, দেউলিয়া হয়েছি অন্তরে অন্তরে। সমাজ বড় দাম্ভিক। সে অসামঞ্জস্যের ধার ধারে না। আত্মগৌরব তার এমনই আকাশচুম্বী সে ব্যক্তির অনন্যতায় বিশ্বাসী নয়। সে যেন এক অনুভূতীহীন মেষপালক যার কাজ ভেড়ার দলকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নির্দিষ্ট পথে নিয়ে চলা। বিপথে চলা পশুটিকে ফিরিয়ে আনা লাঠির ঘায়ে। সেই সমাজ, সেই দোর্দন্ড প্রতাপশালী সমাজ, হঠাতই মাথা নিচু করে চুপ করে বসেছে, বসেছে নিজের সংবিধান পুনর্লিখন করতে। সামাজিক মিলনের নতুন পরিকাঠামো তৈরী করতে বসেছে। আর পৃথিবীর আদিমতম অধিবাসী মাতৃসমা বৃক্ষরা এই শ্লথগতি সভ্যতাকে দু হাত তুলে আশীর্বাদ করছে। আশীর্বাদ করছে নাকি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তার দর্প ঠিক  কতখানি অর্থহীন?

বাবার বিয়ে

শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে
ইবোলার নাকি বাবার বিয়ে?
করোনাকে পাত্র পেলে?
জানতে চাও সে কেমন ছেলে?
মন্দ নয়, সে পাত্র ভাল
মন যদিও বেজায় কালো
তার উপরে মুখের মুকুর
ঠিক যেন এক সুয্যি ঠাকুর
বিট্‌লে বুদ্ধি? বলছি মশাই
ধন্যি ছেলে অধ্যবসায়
হাজার তিনেক নামিয়ে চীনে
ইটালি ঘোরার টিকিট কিনে
এখন করছে ইউ এস ট্রিপ
শুনেই কেমন বুক ঢিপঢিপ
মান সম্মান? অনেক আছে…
দেখলে সবাই পালিয়ে বাঁচে

মানুষ তো নয় বোনগুলো তার
একটা নিপা, একটা শুয়ার –
ইংরেজিতে সোয়াইন ফ্লু গো
পালা পড়লে পুরো ঘেঁটে ঘ
কনিষ্ঠটির ই-কোলি নাম
পেটের রোগের ভোগান্তি দ্যান
কিন্তু তারা উচ্চ ঘর
সার্স (SARS) বংশের বংশধর
চিকেনগুনিয়া মধ্যমগাঁ-র
কি যেন কে হয় করোনার
যা হোক বাবার পাত্র পেলে,
এমন কি আর মন্দ ছেলে?

করোনা, এরকম কোরো না।

করোনা, লক্ষ্মী ভাইটি, এরকম কোরো না। এমন করে মাথার উপর চড়ো না। আমি তোমার থেকে বয়সে বড় না?…

এমনটাই বলতে ইচ্ছে করছিল সকাল সকাল। কারণ? শুনুন তবে। সকালবেলা রুজি রোজগারের তাগিদে স্টিয়ারিং ধরেছি। এমন সময় সামনে দেখি করোনা। সঙ্গে সঙ্গে ধাঁই করে ব্রেক টিপে পেছনে বদাম করে পেছনের গাড়ির ধাক্কা খেয়ে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি কান্ড! একটু বাড়িয়ে বললাম। এতকিছু হয় নি। তবে হ্যাঁ সামনের করোলা গাড়িটাকে দূর থেকে করোনা পড়েছিলাম। চোখের সামনে মূর্তিমান করোনা দেখলে মনের অবস্থা যে সদ্যবর্ষণস্নাতা প্রকৃতির মত স্নিগ্ধ শান্ত হয় না সেটা বলা বাহুল্য। করোনা ছড়াচ্ছে বসন্ত মলয় সমীরে, হাওয়ায় হাওয়ায়। তার থেকেও বেশি ছড়াচ্ছে করোনাভীতি। বিশ্ববিদিত আমাদের গুজবপ্রীতি।

তবে সামাজিক মাধ্যমে করোনাকে নিয়ে রসিকতাও কম ছড়াচ্ছে না। একটি জোকস পড়লাম, করোনা ভাইরাস থেকে দূরে থাকতে সকাল সকাল দু কুচি রসুনের কোয়া খান। তাতে করোনার কিছু যায় আসবে না, কিন্তু অন্য লোকেরা আপনার থেকে দূরে থাকবে। আবার একটা পড়লাম, আগে ইঞ্জিনিয়াররা পরীক্ষা করত, কোনো সফটওয়ারে ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। এখন (মেডিকাল) সফটওয়ার পরীক্ষা করছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। কিছু রামগরুড়ের ছানা আবার করোনা নিয়ে রসিকতা শুনলেই আগ্নেয়গিরি হয়ে যাচ্ছেন। মজার ব্যাপার নাকি? কতলোক মারা গেছে জান হে ছোকরা? তা আর জানব না দাদা। চীন চিরদিনই তাদের পরমাণু বোমার সংখ্যা বাড়িয়ে বলে আর দুর্ভিক্ষ, খরা, ভূমিকম্প এবং মহামারীতে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা কমিয়ে। তাই চীন যখন তিন হাজার বলেছে, আমি মনে মনে তিরিশ হাজার ধরে নিয়েছি। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে একটিও না। তাই নিয়েও রসিকতা কম বেরোয় নি। কেউ কেউ বলছে আমাদের রক্তে এমন সব দেশী ভাইরাস আছে যে সস্তার চায়না মেড করোনা ভাইরাস তার সামনে টিকতে পারছে না। তবে আমি কি বলি জানেন? ভাইরাস যদি করোনা না হয়ে করিনা হত, তবে তার আক্রমণে আমি মরতেও রাজি। করিনা কাপুর শুনলেই বুকের মধ্যে ধাঁই ধপাধপ ধাপুর হয়। তবে করোনা ভাইরাসকে বলা যেতেই পারে, করোনা তুমি কেন মরো না? কিম্বা করোনা, তোর মড়ামুখ দেখতে চাই।

তবে এইসব হাসি মজাগুলো শুধু ভয়টা যাতে চেপে বসতে না পারে, তার জন্য। নয়তো সত্যি বলতে পরিস্থিতি যথেষ্ট গন্ডোগোলিয়াস। সতর্কতা অবলম্বন অবশ্যই করুন। বাইরে বেরোলে আপনার মুখোশের ওপর আর একটি মুখোশ পড়ুন। বাইরে থেকে ফিরেই হাত ধুন। এ তো বেসিক হাইজিন। সবাই জানে। তবে হাত ধোয়ার কথায় মনে পড়ল। যাদের একটু হাতটান আছে মানে এই যারা ধরুন পকেট্মার, তাদের বলি, এই সময় কাজ বন্ধ রাখো ভায়া। কারণ পকেট মেরে হয়তো মানিব্যাগ বের করলে, কিন্তু বিনামূল্যে পেয়ে গেলে কিছু অদৃশ্য করোনা। অন্যের পকেট ফুরুত করতে গিয়ে নিজের প্রাণপাখি সুরুত করে খাঁচার বাইরে বেরিয়ে পড়া কোনো কাজের কথা না। তাই যদ্দিন করোনা তদ্দিন অন্যের পকেটে হাত দেওয়ার কাজটি কোরো না। রুজিরুটির ব্যবস্থা করতে রাজনীতিতে যোগ দিতে পারো। চোরেদের ও লাইনে ভালই সম্মান ও প্রতিপত্তি। শুধু কর্‌নার জায়গায় দিতে হবে ধর্ণা। করোনা না বলে বলতে হবে করছি না, করব না।