#NABC2024
সকল শুরু মধ্যেই শেষের বীজ নিহিত থাকে। সকল শুরুকেই মহাকাল স্মৃতির তকমা লাগিয়ে একদিন অতীত করে দেয়। তেমনই দিয়েছে NABC অর্থাৎ উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সম্মেলনকে। অতিথি অভ্যাগত এবং আমন্ত্রিত শিল্পীরা আজ একযোগে বলছেন, যে গত কয়েক দশকে NABC কেনো, অন্য কোনো সাংস্কৃতিক উদ্যোগেই এরকম নজিরবিহীন সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা নাকি দেখা যায় নি। বলছেন, best NABC ever. ডক্টর কুণাল সরকার তো বলেই ফেললেন, আপনারা বাঙালি তো? আমার মনে হচ্ছে আপনারা জেনেটিকালি মডিফায়েড কোনো স্পিসিস। বাঙালি ঝগড়াঝাঁটি না করে একযোগে কাজ করতে পারে, এমনটা তো কখনো দেখি নি!
আমরা বাঙালিরা নিজেদের বলি, কাঁকড়ার জাত। অর্থাৎ কিনা একজন উঠতে চাইলে অন্যজন টেনে নামায়। কিন্তু NABC24 প্রমাণ করল, আমরা পারি… আমরা কাঁকড়ার জাত না হয়ে মৌমাছি কিম্বা পিঁপড়ের জাত হতে পারি যেখানে প্রত্যেকে ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সমষ্টির জন্য শ্রম দেয়। এমনটা কিভাবে হল? অনুষ্ঠানের যে স্কেল, তা যেকোনো বড় মাপের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকেও দুঃস্বপ্ন দিতে পারত। চার হাজারের কাছাকাছি অতিথি, একশ সত্তর জনের মত দেশ থেকে আগত শিল্পী। এত মানুষের খাওয়া দাওয়া, আপ্যায়ন, আবদার। এতগুলো complex production, এতগুলো অতিথির দেখভাল, এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার, এমন অনবদ্য ডেকরেশান, টিনএজার এবং ছোটদের জন্য এমন সুন্দর প্রোগ্রাম লাইন আপ। চারশোর মত স্বেচ্ছাসেবক হাসিমুখে এমন একটা হারকিউলিয়ান টাস্ক করে ফেলল একটি মানুষকেও একটিও অভিযোগ করার সুযোগ না দিয়ে। না, অনায়াসে নয়, অল্প আয়াসেও নয়। রীতিমত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। কেমন করে হল? কোনো জীন কি পরী কিম্বা গোঁসাইবাগানের ভুত নেমে এসেছিল কি?
না আসেনি। অথবা বলা যেতে পারে, এসেছিল। সেই জীন কি পরীর কি গোঁসাইবাগানের ভুতের নাম স্বার্থশুন্যতা। পরিবর্তে কি পেতে পারি, সে চিন্তা মুছে দিয়ে যে দান করা যায় সে দান প্রকৃত অর্থেই ঐশ্বরিক। সে দেওয়াই আসল দেওয়া যে দেওয়া হয়ে যায় না দেওয়া-নেওয়ার খেলা, হয়ে যায় না transaction। এই অনুষ্ঠান এরকম সর্বাঙ্গসুন্দর হয়েছে কারণ প্রতিটা স্বেচ্ছাসেবক নিজের সময় ও শ্রম দান তো করেছেন, কিন্তু আশ্চর্য, বদলে কিচ্ছুটি চান নি। ব্যষ্টি সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে সমষ্টি সত্তায় মিশে গেছেন, ব্যক্তি চেতনাকে উহ্য রেখে সামগ্রিক চেতনায় নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন। তাই এই সাফল্য। তাই এত সব অভ্যাগতদের মুখে এমন অনাবিল হাসি। নিষ্কাম কর্ম এক ধরণের win-win situation. যে সেবা দেয় আর যে সেবা লাভ করে, দু পক্ষই আনন্দ পায়।
ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া ছাড়াও আমার মতে আর একটা ফ্যাক্টর ছিল এই সামগ্রিক সাফল্যের পেছনে। আর তা হল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, decentralization of authority. কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, central leadership কাজ গুলোকে বিভিন্ন বিভাগে (tower) ভেঙে দেওয়ার পর সেই টাওয়ারের ওপর রেখেছিলেন অবিচলিত আস্থা। তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করা বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন নি। একনায়কতন্ত্র (autocracy) ছিল না কোনোখানে। ফলে ফলেই প্রতিটা বিভাগ এবং তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা নিজের কাজের মালিকানা (ownership) নিয়েছে এবং সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করেছে। কেমন করে হয় এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ? উত্তর হল, অহমনাশ। অহমকারাবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতিমন্যতে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অহংকারের বশবর্তী হয়ে মানুষ নিজেকে কর্তা বলে মনে করেন। আমাদের central leadership অহংকারের মোহ জয় করে নিজেদের অকর্তা বলে মনে করেছেন। প্রেসিডেন্ট ইমেইলে বলেছে, I urge the community to get to know these volunteers (not the ‘leaders’ like me for instance)…These are the faceless individuals who should be celebrated, applauded, recognized and most importantly respected.
শিকাগো। এই শহর থেকেই এক গৈরিকধারী বীর সন্ন্যাসী এক শতাব্দী আগে বাঙালির হৃতপ্রায় জাত্যাভিমানকে উদ্ধার করার কাজে অগ্রণী হয়েছিলেন। বিশ্বের দরবারে বাঙালির নাম উজ্জ্বল করেছিলেন। আজ সেই শহর থেকেই বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারের কাজটা যদি শুরু হয়, তবে তা আনন্দের কথা বই কি!
ভবিষ্যতে যাঁরা NABC-র দায়িত্বভার প্রাপ্ত হবেন, সেই সব শহরকে বলি, আপনাদের সঙ্গে শিকাগোর কোনো প্রতিযোগিতা নেই। আপনার বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান, বঙ্গ সম্মেলনের মান আরও বৃদ্ধি করুন, NABC Brandকে আরও উজ্জ্বল করুন, এ আমরা সর্বতোভাবে কামনা করি।
শুধু টিপস হিসেবে এটাই বলব, ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে উঠে নিষ্কাম সেবা আর অহমশুন্যতা এই দুটো উপাদান আপনাদের সাফল্যের রেসিপিতে অবশ্য করে দিতে ভুলবেন না।
Like this:
Like Loading...