দর্পিত

আমাদের কৃত্রিম গতিময়তা, আমাদের নিত্যদিনের ব্যস্ত থাকার মানস বিলাস, আমাদের সামাজিক হওয়ার অনর্থক নিয়ত প্রয়াস যখন একটা আনুবীক্ষণিক বীজাণু এসে স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেল তখন চোখ ফুটলো আমার। যেমন করে পাখির ছানা চোখ ফুটেই দেখতে পায় অনন্ত সুনীল আকাশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, রুনুক ঝুনুক প্রসন্নতা ছড়িয়ে আছে আনাচে-কানাচে। যেমন করে বোধোদয় হয় শিশুর যখন সে বুঝতে পারে শব্দ শুধু কয়েকটা ধ্বনির সমষ্টি নয়, তার অন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে একটি অর্থ যা কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে উদ্দিষ্ট করে আর সেই উপলব্ধির গৌরবে সে ক্রমাগত উচ্চারণ করে চলে সেই শব্দ যেমন বাবা, মাম্মা, ক্যাট। এই সাময়িক স্থিতি আমাদের সেইরকম একটা গুরুবোধ দিয়ে গেল যে একটি বিকল্প জীবনপথ আছে, আমাদের বহির্মুখী জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের কাছাকাছি, নিজের কাছের মানুষের কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ আছে।

একটা প্রচণ্ড উন্নাসিক রথ পতপতিয়ে উত্তরাধুনিক সভ্যতার জয়ধ্বজা উড়িয়ে অশ্লীল গতিতে ছুটে চলেছিল আর কোমড়ে দড়ি বাঁধা আমার শরীর হেঁচড়ে হেঁচড়ে এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। প্রায়োন্মৃত রক্তাক্ত শরীর আমার অক্ষম কণ্ঠে বিশ্রাম ভিক্ষা করেছে বারংবার। বধির জয়রথ শুনতে পায় নি। অথবা রথচক্রের ঘর্ঘর ধ্বনির মদোন্মত্ততার সামনে সেইসব অক্ষম রোদন, বিলাপ নেহাতই দুর্বলের প্রলাপ মনে করে ক্রূর হাসি হেসে উপেক্ষা করেছে। হঠাতই সেই রথের গতি শ্লথ হয়ে এল। হঠাতই সময় হল দু দন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রেমিক প্রকৃতিকে গভীর ভাবে দেখা, বীক্ষণ করা। 

সামাজিকতা রক্ষায় আমি দিবারাত্রি সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে নৃত্য করেছি, মনের বাতায়ন খোলার সময় হয় নি দিনের পর দিন। সামাজিক কর্তব্য রক্ষার ডাক, কল অব ডিউটি তে সাড়া দিতে গিয়ে মনজমিন উষর হয়েছে, কালিঝুলি পড়েছে মনের দেওয়ালে, দেউলিয়া হয়েছি অন্তরে অন্তরে। সমাজ বড় দাম্ভিক। সে অসামঞ্জস্যের ধার ধারে না। আত্মগৌরব তার এমনই আকাশচুম্বী সে ব্যক্তির অনন্যতায় বিশ্বাসী নয়। সে যেন এক অনুভূতীহীন মেষপালক যার কাজ ভেড়ার দলকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নির্দিষ্ট পথে নিয়ে চলা। বিপথে চলা পশুটিকে ফিরিয়ে আনা লাঠির ঘায়ে। সেই সমাজ, সেই দোর্দন্ড প্রতাপশালী সমাজ, হঠাতই মাথা নিচু করে চুপ করে বসেছে, বসেছে নিজের সংবিধান পুনর্লিখন করতে। সামাজিক মিলনের নতুন পরিকাঠামো তৈরী করতে বসেছে। আর পৃথিবীর আদিমতম অধিবাসী মাতৃসমা বৃক্ষরা এই শ্লথগতি সভ্যতাকে দু হাত তুলে আশীর্বাদ করছে। আশীর্বাদ করছে নাকি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তার দর্প ঠিক  কতখানি অর্থহীন?

বাবার বিয়ে

শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে
ইবোলার নাকি বাবার বিয়ে?
করোনাকে পাত্র পেলে?
জানতে চাও সে কেমন ছেলে?
মন্দ নয়, সে পাত্র ভাল
মন যদিও বেজায় কালো
তার উপরে মুখের মুকুর
ঠিক যেন এক সুয্যি ঠাকুর
বিট্‌লে বুদ্ধি? বলছি মশাই
ধন্যি ছেলে অধ্যবসায়
হাজার তিনেক নামিয়ে চীনে
ইটালি ঘোরার টিকিট কিনে
এখন করছে ইউ এস ট্রিপ
শুনেই কেমন বুক ঢিপঢিপ
মান সম্মান? অনেক আছে…
দেখলে সবাই পালিয়ে বাঁচে

মানুষ তো নয় বোনগুলো তার
একটা নিপা, একটা শুয়ার –
ইংরেজিতে সোয়াইন ফ্লু গো
পালা পড়লে পুরো ঘেঁটে ঘ
কনিষ্ঠটির ই-কোলি নাম
পেটের রোগের ভোগান্তি দ্যান
কিন্তু তারা উচ্চ ঘর
সার্স (SARS) বংশের বংশধর
চিকেনগুনিয়া মধ্যমগাঁ-র
কি যেন কে হয় করোনার
যা হোক বাবার পাত্র পেলে,
এমন কি আর মন্দ ছেলে?

করোনা, এরকম কোরো না।

করোনা, লক্ষ্মী ভাইটি, এরকম কোরো না। এমন করে মাথার উপর চড়ো না। আমি তোমার থেকে বয়সে বড় না?…

এমনটাই বলতে ইচ্ছে করছিল সকাল সকাল। কারণ? শুনুন তবে। সকালবেলা রুজি রোজগারের তাগিদে স্টিয়ারিং ধরেছি। এমন সময় সামনে দেখি করোনা। সঙ্গে সঙ্গে ধাঁই করে ব্রেক টিপে পেছনে বদাম করে পেছনের গাড়ির ধাক্কা খেয়ে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি কান্ড! একটু বাড়িয়ে বললাম। এতকিছু হয় নি। তবে হ্যাঁ সামনের করোলা গাড়িটাকে দূর থেকে করোনা পড়েছিলাম। চোখের সামনে মূর্তিমান করোনা দেখলে মনের অবস্থা যে সদ্যবর্ষণস্নাতা প্রকৃতির মত স্নিগ্ধ শান্ত হয় না সেটা বলা বাহুল্য। করোনা ছড়াচ্ছে বসন্ত মলয় সমীরে, হাওয়ায় হাওয়ায়। তার থেকেও বেশি ছড়াচ্ছে করোনাভীতি। বিশ্ববিদিত আমাদের গুজবপ্রীতি।

তবে সামাজিক মাধ্যমে করোনাকে নিয়ে রসিকতাও কম ছড়াচ্ছে না। একটি জোকস পড়লাম, করোনা ভাইরাস থেকে দূরে থাকতে সকাল সকাল দু কুচি রসুনের কোয়া খান। তাতে করোনার কিছু যায় আসবে না, কিন্তু অন্য লোকেরা আপনার থেকে দূরে থাকবে। আবার একটা পড়লাম, আগে ইঞ্জিনিয়াররা পরীক্ষা করত, কোনো সফটওয়ারে ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। এখন (মেডিকাল) সফটওয়ার পরীক্ষা করছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। কিছু রামগরুড়ের ছানা আবার করোনা নিয়ে রসিকতা শুনলেই আগ্নেয়গিরি হয়ে যাচ্ছেন। মজার ব্যাপার নাকি? কতলোক মারা গেছে জান হে ছোকরা? তা আর জানব না দাদা। চীন চিরদিনই তাদের পরমাণু বোমার সংখ্যা বাড়িয়ে বলে আর দুর্ভিক্ষ, খরা, ভূমিকম্প এবং মহামারীতে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা কমিয়ে। তাই চীন যখন তিন হাজার বলেছে, আমি মনে মনে তিরিশ হাজার ধরে নিয়েছি। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে একটিও না। তাই নিয়েও রসিকতা কম বেরোয় নি। কেউ কেউ বলছে আমাদের রক্তে এমন সব দেশী ভাইরাস আছে যে সস্তার চায়না মেড করোনা ভাইরাস তার সামনে টিকতে পারছে না। তবে আমি কি বলি জানেন? ভাইরাস যদি করোনা না হয়ে করিনা হত, তবে তার আক্রমণে আমি মরতেও রাজি। করিনা কাপুর শুনলেই বুকের মধ্যে ধাঁই ধপাধপ ধাপুর হয়। তবে করোনা ভাইরাসকে বলা যেতেই পারে, করোনা তুমি কেন মরো না? কিম্বা করোনা, তোর মড়ামুখ দেখতে চাই।

তবে এইসব হাসি মজাগুলো শুধু ভয়টা যাতে চেপে বসতে না পারে, তার জন্য। নয়তো সত্যি বলতে পরিস্থিতি যথেষ্ট গন্ডোগোলিয়াস। সতর্কতা অবলম্বন অবশ্যই করুন। বাইরে বেরোলে আপনার মুখোশের ওপর আর একটি মুখোশ পড়ুন। বাইরে থেকে ফিরেই হাত ধুন। এ তো বেসিক হাইজিন। সবাই জানে। তবে হাত ধোয়ার কথায় মনে পড়ল। যাদের একটু হাতটান আছে মানে এই যারা ধরুন পকেট্মার, তাদের বলি, এই সময় কাজ বন্ধ রাখো ভায়া। কারণ পকেট মেরে হয়তো মানিব্যাগ বের করলে, কিন্তু বিনামূল্যে পেয়ে গেলে কিছু অদৃশ্য করোনা। অন্যের পকেট ফুরুত করতে গিয়ে নিজের প্রাণপাখি সুরুত করে খাঁচার বাইরে বেরিয়ে পড়া কোনো কাজের কথা না। তাই যদ্দিন করোনা তদ্দিন অন্যের পকেটে হাত দেওয়ার কাজটি কোরো না। রুজিরুটির ব্যবস্থা করতে রাজনীতিতে যোগ দিতে পারো। চোরেদের ও লাইনে ভালই সম্মান ও প্রতিপত্তি। শুধু কর্‌নার জায়গায় দিতে হবে ধর্ণা। করোনা না বলে বলতে হবে করছি না, করব না।

চাঁদ উঠেছিল গগনে

একজন খুব কাছের মানুষ দেখলাম মোবাইল ক্লিক পোস্ট করেছেন। একটি ছবি। দোল পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র রাশি রাশি চাঁদের হাসি ছড়াচ্ছে। ক্যাপশান দিয়েছেন “চাঁদ উঠেছিল গগনে”। যাক বাবা! অনেকদিন পরে চাঁদ নিজের বকধার্মিক সঙ্গীটিকে সাথে নিয়ে আকাশে ওঠেন নি দেখে চাঁদি ঠান্ডা হল। সঙ্গ পরিত্যাগ করার জন্য চন্দ্রমাকে এবং ওই দাদাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে চন্দ্রিলের একটি ভিডিওতে মনঃসংযোগ করলাম।
তবে কাকে দোষ দিই বলুন। বঙ্গসংস্কৃতি অঙ্গসংস্কৃতি বা গুহ্য-অঙ্গ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে অনেক দিন হল। সেই ব-সূচক শব্দ বাদ দিয়ে কোনো বাক্যই সম্পূর্ণ করেন না এমন পুরুষ বা নারী কম নেই। হঠাত করে সেই ‘ব’ যখন বন্যার মত সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে ফেলল, মনে হল মুখের সামনে কে যেন আয়না ধরেছে। আর সেই আয়নায় নিজের বিকট মুখব্যাদান দেখে ছিৎকারে ভরে উঠেছে আজকের ব-সন্ত। তাই চলুন না সবাই মিলে আর একবার বলি, “চাঁদ উঠেছিল গগনে” – হ্যাঁ, একা চাঁদ উঠেছিল গগনে। হ্যাঁ, শুধু চাঁদ উঠেছিল গগনে।


আর যে অমলকান্তি “রোদ্দুর” হতে পারে নি, তাঁকে বলি রোদ্দুরের কাছে একটা আলোর প্রতিশ্রুতি আমরা আশা করতেই পারি। রোদ্দুরের কাছে অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের পথের দিশা আমরা দাবী করতেই পারি।
শুভ দোল পূর্ণিমা সব বন্ধুকে।

নবীনগঞ্জ

শীত মানেই ভীড় করে আসে এক গুচ্ছ স্মৃতি। এক ঝাঁক বকম বকম পায়রার মতন অর্থহীন সংলাপে ভরে ওঠে মনের উঠোন। ছোটবেলায় শীত মানেই ছিল মায়ের হাতে উলের কাঁটায় বোনা উলটো ঘর। ব্যাডমিন্টন খেলতে থাকা সারা সন্ধে ভর। ছুটির দুপুরে বাবার হাত ধরে পৌঁছে যেতাম কখনো চিড়িয়াখানা, কখন বইমেলা। বয়সটা ছিল পড়া পড়া খেলার। শীত মানেই মনে পড়ে নতুন গুড়ের স্বাদ। ছুটির দুপুর একলা পেলেই ফেলুদা হাতে চিলেকোঠার ছাদ।

সরস্বতী পূজোর আগে কুল খেলে দেবী পাপ দেবেন সেই ভয়ে কক্ষনো চেখে দেখতাম না পাকড়াশি স্যার-এর বাগানের টোপা টোপা নারকোলি কুল। একটু বড় হবার পর বড়জোর একটা দুটো। মা কালির দিব্যি, পুজোর আগে তার বেশি কক্ষনো খাইনি…তাও মনে মনে দেবী হংসবাহিনীর কাছে মার্জনা ভিক্ষা করে। কুল খাওয়ায় দেবীর নিষেধ থাকলেও কুল চুরি করায় ছিল না। তাই এন্তার কুল চুরি করতাম আমি বাবু আর অনুপম মিলে। আমি ছিলাম বৃক্ষ বিশারদ। অর্থাৎ চোখের পলক ফেলতেই গাছে উঠে ফটাফট্‌ কুল ঝেড়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাকে বলে বামাল হাওয়া হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া থুড়ি মানে পাড়াজোড়া। তাই পাড়ার কুল পিপাসুরা শীত পড়লেই চুড়মুড়টা, চুরনটা দিয়ে আমায় যে হাতে রাখার চেষ্টা করত সে কি আর বুঝতাম না! কুল চুরি করে ধরা কখনো পড়িনি ঠিকই, তবে একবার প্রায় মারা পড়েছিলাম। আমাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পাকড়াশি স্যার এক পিস কেঁদো বাঘের বাচ্চা থুড়ি মানে অ্যালসেশিয়ান কুকুর এনেছিল কিন্তু আমার চুড়মুড় সাপ্লায়াররা সে খবর আমায় এনে দিতে পারে নি। তাই যেই না পাকড়াশি স্যার-এর গাছে ওঠা, সেই চতুষ্পদ মূর্তিমান মৃত্যুর কর্ণকুহরে সেই মধুর আওয়াজ প্রবেশ করল। তারপরে যা হয় আর কি..গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে আমিও দৌড়চ্ছি আর হাত পাঁচেক পেছনে আমায় দিয়ে আজকের লাঞ্চটা সেরে নেবার তাগিদে তিনিও দৌড়চ্ছেন। দৌড়তে দৌড়তে ভুবন ডাঙার মাঠ এল। নিশ্চিন্দিপুর এল..গোঁসাই বাগান এল। তারপর পাকড়াশি স্যার-এর কুকুরটা টিনটিনের সঙ্গী snowy হয়ে গেল..রাজলক্ষ্মী এল..ইন্দ্রনাথ..সাঁওতাল রাজকন্যা ভানুমতি এল.. কতবার প্রেমে পড়লাম.. কতবার কতবার মিঠে রোদ্দুরের ওম নিতে নিতে লেবুর খোসা ছাড়ালাম। কত শীতের দুপুরে স্নান না করার জন্য বায়না করলাম আর বাবার ধাঁতানি খেয়ে স্নান করতে গেলাম। আজ হয়তো কোনো ছুটির দুপুরে স্নান করি না। কিন্তু স্নান করতে বলার লোকগুলো কাছে নেই…

বড়বেলা, হে আমার ক্লান্ত বড়বেলা, আমায় নবীনগঞ্জে ফিরিয়ে দাও।

গোপন প্রেম

তুমি ছটফটিয়ে সামনে এলে
সহস্রবার। আড্ডা দিলে
এর সাথে আর ওর সাথে
আর সন্ধেবাসর মৌতাতে
চোখ চুরিয়ে দেখলে আমায়।
একফালি চাঁদ হৃদয় থামায়
সেই হাসি
হাসলে চেয়ে এর পানে আর ওর পানে
আর ময়ূর হয়ে উঠল নেচে তোমার কানের
ঝুমকোরা। তোমার চোখের কাজললতায়
দীঘির মত স্তব্ধতা – তাই
তোমায় খোঁজা হয় নি শেষ।
বিষণ্ণতার মিষ্টি রেশ
থাকল লেগে মনবাথানে
সঙ্গীবিহীন দুপুর জানে
একলা হলেই তোমার খোঁজ
আমার শহর রোজ খোঁজে রোজ
বৃষ্টিদিন। তোমার চুলের শ্রাবণধারায়
ঘুরতে ফিরতে চোখ চলে যায়…
“কি দেখছ?” – বলবে ভেবে চোখ নামিয়ে
গোপন প্রেমের দেরাজ নিয়ে
তোমার মনের ঠিক পাশেতে চুপকথাতে সমর্পণ।

কি হয় তাতে কি হয় বলো,
আমার একলা বিকেলগুলো
বলতে না হয় নাই পেরেছে…তুমিই আমার আপনজন।।

হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে

পৃথিবীর আদিমতম সত্য নারী পুরুষের ভালবাসা। পুরুষ কি চায় সে কন্দর্পদেবও জানেন কিনা জানি না, নারী চায় ভালবাসার সরব উদযাপন। ব্যতীক্রমী নারী থাকবেই কিন্তু ব্যতিক্রমই নিয়মকে প্রমাণ করে। আর সেই প্রেমের উদযাপন করতেই আসে ভ্যালেন্টাইন্স ডে। তাই একটা কার্ড, একটা নরম টেডি, আর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ইলু ইলু। ইলু কা মতলব আই লাভ ইউ। প্রাণের ঠাকুরের পুজোর উপকরণ যেমন গাঁদা,জবা প্রেমের ঠাকুরের পুজোর উপকরণ গোলাপ। তাই ফেব্রুয়ারী চতুর্দশী তিথিতে বাড়ি আসার সময় দেখি রাশি রাশি গোলাপ ফুটেছে ট্রেন জুড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে, “এই যা। ভুলেছি।” অতএব সেই মানুষটাকে টেক্সট করে বলে দাও হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে। যা থাকে কপালে। প্রাচিত্তির এই প্রকার।

কিন্তু প্রেম পুজোর গোলাপের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে আমাজন ওয়েব সার্ভিস। কেন? একটু খোলসা করি। আমাজনের অরণ্যে বিক্রিবাটা হয়। কিন্তু বিক্রিবাটার প্রধান সময় থ্যাঙ্কস গিভিং সপ্তাহান্ত। সেই সময় তার অনেক সার্ভার লাগে। বাকি সময় সেই সার্ভারগুলো করে কি? অতএব সেগুলোকে তারা ভাড়ায় দেয় অন্যকে। এই থেকেই তৈরী আমাজন ওয়েব সার্ভিস। পাড়ার ডেকরেটর যেমন প্যান্ডেল করতে ভাড়া দেয় বাঁশ, কাপড়, আমাজন ভাড়া দেয় হার্ডওয়ার। সে যাকগে। গোলাপের কথা হচ্ছিল। প্রেমপুজোর দিনে গোলাপের খুব চাহিদা আমাজনের থ্যাঙ্কস গিভিং উইকএন্ডের মত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গোলাপ গাছের ভ্যালেন্টাইন নেই। তাই নির্দিষ্ট দিনে তার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে না। তাই ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের ভজকট রুল মেনে বাড়ে গোলাপের দাম। দাম বাড়তে বাড়তে আকাশ ছোঁয়। আকাশে তখন “সুরজ হুয়া মধ্যম”। প্রেমিকার হাতে চুড়ি গলিয়ে দিয়ে গলির শাহরুখ খান বলে ওঠে “কুছ রিস্তে জিসকা কোই নাম নেহি হোতা, সিরফ অ্যাহেসাস হোতা। চুক তো নেহি রাহা”। বাতাস আদর পেয়ে বাঁদর। গলির কাজলের দু এক গোছা অবাধ্য চুল এসে পড়ে কপালে। বাতাসের বাঁদরামিতে।

গলির কাজলের কাজলচোখের গহনে বিকেল হারায়। সন্ধে নামে। চাঁদ তখন বাড়াবাড়ি রকমের নির্লজ্জ হয়ে ওঠে। গলে গলে নামে পৃথিবীর শহরঅরণ্যে জ্যোৎস্না হয়ে। তারপর গলির শাহ্রুখ আর কাজল কি কাণ্ড করে তা আমি দেখি না। চোখ মুদে থাকি। সে গোপন কম্ম ব্রহ্মা জানেন। আমি শুধু জানি, ভালবাসায় ঊষর মঙ্গল গ্রহও সবুজ হয়ে উঠবে একদিন। আমি শুধু বিশ্বাস করতে চাই, এ শহরে ভালবাসায় হেরে যে ছেলেটা আজ অ্যাসিড নিক্ষেপকারী, তার হৃদয়েও গোলাপ ফুটবে একদিন। জানি এ আমার অক্ষম কবিমনের কষ্টকল্পনা। তবু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। আর যে মেয়েটা পোড়া চামড়া নিয়েও করছে জীবন উদযাপন, বিশ্বাস করেছে তার জন্যও আছে এ পৃথিবীর জল, নদী, ফুল, পাখি, আকাশ, তাকে বলি,

হে অগ্নিবর্ণা, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে।

তোমার কথা

তোমার কথা বলে বেভুল অমলতাস ফুল
নবীন আকাশ, হিরন্ময় জল
তোমার কথা বলে অনর্গল

তোমায় খোঁজে কৃষ্ণ আঁখি রাতচরা এক পাখি
হেমন্তের হিমেল হাহাকার তোমায় খোঁজে
একলা দুপুর বোঝে তোমায় বোঝে

তোমায় জানে বনমর্মর, নয়ানজুলির চর
বর্ষামুখর ঝিঁঝিঁ ডাকার রাত
জানে তোমার নীরব সংঘাত

তোমায় ছুঁয়ে থাকে কথা, মেদুর বিষণ্ণতা
ভোরের বাতাস পাথরকুচি পাতা
তোমায় ছোঁয়ার ছলেই উদ্গতা

কবিতা প্রত্যেকে

কবিতাটি শুনতে চাইলে

শ্যামল রাত্রি তুমি এসো
আমায় নিয়ে যাও আগুনঝোরার বনে
যেখানে কোনো এক দুরন্ত ফাল্গুনে
ফুটেছিল রাশি রাশি অমলতাস ফুল।
ফুটেছিল? নাকি সে আমার মনের ভুল?
জানি না..জানি না ফুলেদের মৃতদেহ ঝরে
কেন ঘাসেদের চাদরে আদরে,
কেন মর্মব্যথা জেগে থাকে
পৃথিবীর বিজন প্রান্তরে,
কেন রুদ্ধ সঙ্গীত বাজে অন্তরে অন্তরে?
ক্ষুধা জেগে থাকে বুভুক্ষু মনে
মন পোড়ে, পোড়ে মন তুষের আগুনে।
রাতচরা পাখিদের গান
আর বুকভরা নীরব অভিমান
লেগে থাকে শিশিরের গায়,
আমি শুধু বসে থাকি ঠায়।
খোলা পরে থাকে সাদা পাতা
ব্যর্থ কোনো ব্যর্থ প্রেমগাথা
শরীর পেতে চায়। এক প্রাচীন পাখির
কণ্ঠে বিঁধে থাকে তীর,
রক্ত ঝরে বিধুর সঙ্গীতে।
বিষাক্ত কীটের মত দংশাতে
আসে কোনো বিষধর সাপ –
ঠোঁটে লেগে থাকে তার
সহস্র বছরের পুরাতন পাপ,
রক্ত মাংস মজ্জা মেদ
জুড়ে থাকে স্তূপীকৃত ক্লেদ।

ক্লিন্ন পৃথিবী, হে ক্লিন্ন পৃথিবী
রাত্রি সর্বজ্ঞ নয় এ আমার একান্ত বিশ্বাস।
প্রতি নিশ্বাসে তাই অভিসার অনাগত দিনে
যেখানে অরণ্যের গহনে গহীনে
অমল অরূপ এক আলো খেলা করে।
গাছেদের একান্ত জঠরে
জীবনের স্বাদ মাখামাখি জড়াজড়ি।
এইখানে এইখানে নিহত শর্বরী
এইখানে এসে আমি দুদন্ড বসি, খেলা করি।
অনলস ঝরে পরে অজস্র মেহুল।
তান ওঠে, ঐকতান, সুগভীর নাভীমূল থেকে –
“একা নই একা নই আমরা তো সুমধুর কবিতা প্রত্যেকে”

Beauty and the Beast

আমার তিন বছরের কন্যার ভারি টিভি দেখার নেশা বেড়ে যাচ্ছে। তাই আদর্শ বাবার মত ঠিক করলাম ওকে একটু বই পড়ে শোনাতে হবে। আমেরিকানরা তো সন্তানের জন্ম থেকেই বাচ্চার ঘুমোনোর আগে তাকে বই পড়ে শোনায়, তাতে নাকি সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুদের vocabulary বাড়ে। আমি সেই দুঃসাহস করি নি। কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে সানাইকে একটু স্টোরি রীড করে শোনাতে সচেষ্ট হই। তো আজকের গল্প Beauty and the Beast।


বেশ অনেকটা পড়ে ফেলেছি গল্পটা। এক ডাইনি রাজপুত্রকে অভিশাপ দিয়ে কদাকার পশুমানবে, অর্থাৎ একটা Beast-এ পরিণত করেছে। এদিকে Beauty-র বাবার খুব দুঃসময়। ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে ভাঁড়ে-মা-ভবানী হয়ে গেছে। তাও আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া। জাহাজ উদ্ধার করতে গিয়ে ফেরার পথে Beast-এর প্রাসাদে আশ্রয় নেয়। ভুড়িভোজ খেয়েটেয়ে, রাত্রে নরম বিছানায় ঘুমিয়ে টুমিয়ে সকালে যখন Beauty-র জন্য Beast-এর গোলাপ বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়ে নিয়েছে তখন Beast-এর মাথা যাকে বলে একেবারে ভিসুভিয়াস। Beauty-কে পাঠিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি দিয়েছে ওর বাবাকে। রুদ্ধশ্বাস ব্যাপার। বাড়িতে এসে সব ঘটনা বলায় Beauty স্বেচ্ছায় Beast-এর প্রাসাদের উদ্দেশে যাত্রা করছে। Beauty কাঁদছে। Beauty-র বাবা কাঁদছে। আকাশ বাতাস পাখি নদী সবাই কাঁদছে। সমস্ত ক্রন্দসী কাঁদছে বলা চলে। এরকম একটা ভয়ানক বিষণ্ণ মুহূর্তে সানাই জিজ্ঞেস করে বসল, Beauty কাঁদছে কেন বাবা? ও কি ভাতু খায় নি? মাম্মা বকেছে?
লে… সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি? ভাতু-না-খাওয়া-জনিত-মাম্মার-বকা ছাড়াও যে মানুষের দুঃখের আরো কারণ হয় বোঝাতে চেষ্টা করি। সিকুয়েন্স অফ ইভেন্টটা আবার একবার রিপিট মারি। কিন্তু সানাই অলরেডি Beauty-র কান্নার কারণ জানার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। শেয়ার মার্কেটের থেকেও তড়িৎ গতিতে মনের মতি বদলায় ওর। অতএব চরৈবেতি। পরে কি হল জানতে চায়। বাকি গল্পটুকুও পড়ে ফেললাম। Beast-এর Beauty-র প্রতি সহৃদয় ব্যবহার (সুন্দরী মেয়ে পেলে কে আর extra nice ব্যবহার করে না – মনে মনে ভাবছি)। কয়েকদিন Beast-এর প্রাসাদে থাকার পরে Beauty-র বাবার জন্য মন খারাপ। Beast Beauty-কে বাড়ি আসতে অনুমতি দেয়। Beauty বিরহে Beast-এর এই যায় সেই যায় অবস্থা। Beauty-র প্রত্যাবর্তন আর তার চোখের জলে Beast-এর শনির দশা কেটে আবার রাজকুমারে রূপান্তর। অতঃপর Beauty আর রাজপুত্রের বিয়ে-সাদি-সানাই (ইয়ে মানে এটা বাদ্যযন্ত্র সানাই। কথাযন্ত্র সানাই না) । গল্পটা সবাই জানে। কিন্তু মুস্কিল হল গল্পশষে সানাইয়ের প্রশ্নগুলোতে।

সব শুনেটুনে সানাই বলল বাবা, প্রিন্সের মাম্মা কই? খুব-ই চাপের প্রশ্ন। গল্পের লেখক ও পাঠককুল কেউ কোনদিন Beast-cum-রাজপুত্রের বাবা মা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। আগডুম বাগডুম একটা বললাম। পরের প্রশ্নগুলো এইরকম –


বিউটির বাবা কই?
বাড়িতে আছে।
কেন?
কারণ Beauty Beast-এর রাজপ্রাসাদে গেছে তাই।
রাজপ্রাসাদে গেছে। ও। কেন?
কারণ Beast-এর শরীর খারাপ হয়ে গেছে ( গল্পপাঠকালীন কিছুই বোঝাতে পারিনি ভেবে আমার রক্তচাপ বাড়ছে) ।
ও শরীর খারাপ? Beast ডক্করের কাছে যাবে? ইনজেকশান দেবে ডক্কর?
“সেটা দিতেও পারে। কিন্তু এখানে সেরকম লেখা নেই।” গল্পে ডাক্তার বদ্যি আমদানী হবার আগেই আমি তাড়াতাড়ি আর একবার ঘটনাপ্রবাহ বলে দিই। “Beauty-র বাবা Beast-এর বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়েছিল তো। তাই Beast রেগে গিয়ে Beauty কে আসতে বলেছিল।”
বাবা গোলাপ ছিঁড়েছিল? কেন?
আরে Beauty একটা red rose চেয়েছিল না? এই যেমন তুমি কিছু চাইলে বাবা এনে দেয় না?
Beauty red rose কেন চেয়েছে বাবা?
আরে বললাম না, বিউটির বাবা ওকে জিগেস করল, তুমি কি গিফট্ নেবে। তখন ও একটা রক্তগোলাপ চাইল।
ক্রিস্টমাস গিফট্?
হ্যাঁ, ক্রিস্টমাস গিফট্।
Oh. I see.
যাক বুঝেছে। গল্পটা বোঝাতে পেরেছি ভেবে আমি মনে মনে গর্বিত বোধ করি যাকে বলে basking in glory. পরে সানাই-এর থেকে শুনে দেখলাম, গল্পটা আসলে এরকম।


Beauty ভাতু খায় নি। তাই Beauty-কে তার মাম্মা বকেছে। তাই বিউটি কাঁদু করেছে। তখন বিউটির বাবা christmas gift দেবে বলেছে। Beauty-র বাবা Beast-এর বাড়ি গিয়ে ফুল ছিঁড়েছে। তাই Beast বিউটিকে timeout দিয়েছে (যাঃ বাবা, টাইম আউটের কথা বললাম কোথায়? Beauty and the beast-এর গল্পের সঙ্গে এ যে দেখছি নিজের original creation punch করে দিচ্ছে)। বিউটি timeout পেয়ে কাঁদু করেছে। Tears লেগে Beast প্রিন্স হয়ে গেছে। তখন প্রিন্স-এর মাম্মা এসেছে। এসে বিউটিকে ঠিক করে ভাতু খেয়ে নিতে বলেছে (যাক বাবা এটা বলে নি প্রিন্স-এর মাম্মা এসে প্রিন্সকে বলেছে Beauty-র সারা জীবনের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে)।

……এতক্ষণের পণ্ডশ্রমের কথা ভেবে ততক্ষণে আমার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।