কলমকারি


ফাইনালি কবিতাটা কমপ্লিট করলাম। ছন্দ নিয়ে একটু নাড়া চাড়া, পরীক্ষা…

সবজে-নরম জড়াজড়ি
বাদলা ভোরের কলমকারি
কাজ

ভাবনা কতক এলোমেলো
লাজুকলতায় মন হারালো
আজ

বৃষ্টি বাদল সঙ্গে নিয়ে
একলা সকাল রিমঝিমিয়ে
চুপ

মন যেনো হয় বনপলাশী
চোখ চুরোলো অপূর্ব সেই
রূপ

অস্ত রাঙা রোদ বিকেলে
খোলা চুল সামনে এলে
যেই

তোমার ওই কাজললতা
থামাল সব কথকতার
খেই

বিস্ময়


বিস্ময় মনের অতি উচ্চভাব আর উচ্চ বলিয়াই সহজলভ্য নয়। সত্যকার বিস্ময়ের স্থান অনেক ওপরে – বুদ্ধি যাহার খুব প্রশস্ত ও উদার, মন সবসময় সতর্ক – নূতন ছবি নূতন ভাব গ্রহণ করিবার ক্ষমতা রাখে, সেই প্রকৃত বিস্ময়রসকে ভোগ করিতে পারে। যাদের মনের যন্ত্র অলস, মিনমিনে, বিস্ময়ের মতো উচ্চ মনোভাব তাদের অপরিচিত থাকিয়া যায়।

— বিভূতি বাবু লিখেছেন অপরাজিত উপন্যাসে।

পড়তে পড়তে মনে হলো এর থেকে বেশি সত্য বুঝি আর নেই। নাট্যশাস্ত্রের নবরস অনুযায়ী বিস্ময় রস হলো “অদ্ভুত রস”, feeling of awe or wonder or marvel. পৃথিবীর সমস্ত মহান সৃষ্টির মূলে প্রেরণা হিসেবে আছে একে গভীর বিস্ময়। এই মহান বিস্ময় থেকেই আঁকা হয় আলতামিরা গুহায় পলায়নরত বাইসনের দৃপ্ত দেহ ভঙ্গিমা, এই বিস্ময় রস থেকেই সৃষ্টি ইলোরার অদ্ভুত ভাস্কর্য, এই বিস্ময়ই ক্যানভাসে The Starry Night আঁকে, এই বিস্ময় রস থেকেই লেখা পথের পাঁচালী, এই বিস্ময় রস থেকেই লেখা হয় “রোড নট টেকেন” কিংবা “দ্য লিসনার্স” কিংবা “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”-এর মতো কবিতা। মাধ্যাকর্ষণ থেকে আপেক্ষিকতাবাদ আবিষ্কারের মূলেও সেই বিস্ময়। উপনিষদের আত্মানুসন্ধানের মূলেও সেই আদি বিস্ময়, আমি কে? বিজ্ঞান, দর্শন, অধ্যাত্মবাদের সকলেরই জননী এক, সকলই এই বিস্ময় প্রসূতা।

অধিকাংশ মানুষের মন মরে আসে বয়সের সাথে সাথে। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হয় লুপ্তপ্রায়। প্রতিটা বিস্ময় মুহূর্ত আসলে একটা আমি-লোপের মুহূর্ত। শিশুর আমি প্রচ্ছন্ন, তেমন প্রকট নয়, তাই সে বিস্মিত হতে জানে। বয়সের সাথে সাথে আমি যত প্রকট হয়, কমে বিস্ময় বোধ।

প্রথম যেদিন এক পেখম তোলা ময়ূর দেখে বলেছিলেন, আহা কী সুন্দর, সেই মুহূর্তে ক্ষণকালের জন্য আপনার আমি ডুবে গেছিল রূপের চিরন্তন বিশ্বজনীনতায়। সেই আমি যা আমাদের কয়েদ করে রাখে এই শরীর-মনের জেলখানায়। যে আমির শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারলেই মুক্তি, মোক্ষ। বিস্ময়বোধ সেই আমির বাহুপাশ থেকে আমাদের দেয় ক্ষণিকের নিস্তার। মন এবং তার ক্রমাগত চিন্তা স্রোতকে থামিয়ে দিয়ে বিস্ময় আমাদের নিয়ে আসে চিরন্তন বর্তমানে, eternal present-এ যা সমস্ত সৃজনশীলতার উৎস, যা নিজের স্বরূপকে জানার প্রথম পদক্ষেপ। বিশালের কাছে গেলে, তারা ভরা আকাশের নিচে দাঁড়ালে, সমুদ্রসৈকতে বসে সেই বিপুল অনন্ত জলরাশির দিকে তাকালে, সুউচ্চ পর্বত শিখরে দাঁড়িয়ে অনেক নিচের সবুজ উপত্যকার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া কোনো পাহাড়ি নির্ঝরিনীর দিকে তাকালে, মন সেই বিশালকে ধারণা করতে না পেরে থেমে যায়। we experience a moment of no-mind. বিস্ময় আমিত্ব নাশক।

কালের যাঁতাকলে ধরা দিতে না চাইলে মহৎ উদার শিশুসুলভ মনকে ধরে রাখতে হয়। আর শিশুমন মানেই বিস্মিত হওয়ার সহজাত ক্ষমতা। বিস্ময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলো স্মৃতি। আগে দেখা কোনো কিছুর সাথে এখন দেখা কিছুর তুলনা করা হলো বিস্ময়ের প্রধান বাধা। শিশু তুলনা করে না। প্রতি দেখাই তার প্রথম দেখা। প্রতি অনুভবই তার প্রথম অনুভব। বৃদ্ধ মন কেবল তুলনা করে আর তাই এমন কিছু খুঁজে পায় না যা নূতন, যা অভূতপূর্ব, যা বিস্ময়সূচক।

যে বড় হতে হতে বিস্মিত হতে ভুলে যায় নি, সে-ই শিল্পী, সে-ই বিজ্ঞানী, সে-ই দার্শনিক, সে-ই মুমুক্ষু, সে-ই আত্মসন্ধানী।

টর্নেডো আর সানাই উপাখ্যান


পিপু ফিশুর গল্পটা মনে আছে তো? দুই ভাই। মহা কুঁড়ে। যাকে বলে নড়ে ঘাস খায় না। আদর্শ বাঙালি আর কী। দুক্কুরবেলা ভাত ঘুম দিচ্ছে দুই ভাই। এমন সময় বাড়িতে আগুন লেগেছে। তো আগুনের যা ধর্ম। তাতাচ্ছে পোড়াচ্ছে। এক ভাই বলল, পিপু। মানে হলো, পিঠ পুড়ছে। খুব কুঁড়ে কিনা। তাই গোটা “পিঠ পুড়ছে” বলে জিভ আর কণ্ঠনালীর ওপর অযথা চাপ দিতে চায় না। তাই বলছে, পিপু। ছোট ভাইও কুঁড়েমিতে কম যায় না। উত্তর দিচ্ছে ফিশু। মানে, ফিরে শুই। অর্থাৎ কিনা, পিঠ পুড়ছে তো কী আর করা যাবে, ফিরে শুই। আগুনের দাহিক শক্তিকে এর থেকে বেশি সম্মান জানানো সম্ভব না কুঁড়ে ব্রাদারের পক্ষে।

তা হয়েছে কি, কুঁড়েমিতে আমিও কিছু কম যাই না। পিপুফিশুকেও কমপ্লেক্স দিতে পারি। আমাদের এখানে গত রাতে এসেছিল টর্নেডো। আজ্ঞে যেমন তেমন টর্নেডো নয়, রীতিমতো গাছ উপড়ানো টর্নেডো। মোবাইলে এলার্ট ছাড়াও শহরে ঘুরে ঘুরে পুরসভার গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে বলে গেল, হালকা ভাবে নিলে পুরো ছবি হয়ে যাবেন। অতএব চ্যাংড়ামি না। যিনি আসছেন তিনি কুম্ভকর্ণের মতো গোটা গোটা বাড়িঘরদোর তুলে সাত গুটি খেলতে পারেন। কিন্তু আমায় নাড়ায় কার সাধ্যি। গ্যাঁট হয়ে বসে দন্তবিকশিত করছি। আর একটা রস মালাই জাতীয় নতুন আমদানি মিষ্টির দিকে লুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছি আর ভাবছি,

এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন বরষায়,
এমন দিনে তারে খাওয়া যায়..

হোয়াটসআপ বাহিত খবর এলো বন্ধুবান্ধবরা সব বেসমেন্টে আশ্রয় নিয়েছে। শরীর নাড়িয়ে এরকম একটা অঘটন ঘটাতে হবে? কি আপদ। কিন্তু যে ধরণের ভিডিও তারপর আসতে লাগল, টর্নেডোর সে তড়কা দেখে চোখে তাক লেগে যায়। অগত্যা বললাম সকলকে, চলো বেসমেন্টেই যাই।

কুড়িয়ে বাড়িয়ে বাড়ির সকল সদস্যকে নিয়ে তা গেলাম বেসমেন্টে। ভূগর্ভে আমরা সুরক্ষিত। কিন্তু আমার বাড়ি? একতলা? দোতলা? টর্নেডোর নাচন শেষ হওয়ার পর সেই না-চিজ থাকবে তো? মাম, মনে আমার স্ত্রী বললো, আমাদের ডকুমেন্টসগুলো ওপরে রয়ে গেল…সে যাক। কথায় আছে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। কিন্তু মাম কথা ফেলা মাত্র দেখলাম, আমার বড় মেয়ে, সে বয়সে নেহাতই অর্বাচীন, স্প্রিং এর মতো ছিটকে উঠে তড়িৎগতিতে ওপরে চলে গেলো। ভাবলাম জ্ঞানগম্যি হয়েছে। বাবা মার দুশ্চিন্তা দূর করতে ডকুমেন্টস আনতে গেছে। যেমন দৌড়ে দৌড়ে গেল, সেরকমই নাচতে নাচতে ফিরে এলো। এমন দায়িত্বশীল কন্যা থাকলে টর্নেডো কেন টর্পেডোরও সামনা করা যায়, ভেবে একতু গর্ব করবো ভাবছি, দেখি, ও হরি! ডকুমেন্টস তো আনে নি। একটা ঢাউস ট্র্যাশ ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে নিজের সমস্ত সফ্ট টয়! জিগেস করায় বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, টর্নেডোতে আমাদের বাড়ি উড়ে গেলেও সফ্ট টয় গুলো থাকবে, কারণ ওগুলো নাকি ভীষণ এক্সপেনসিভ। নেহাত অলরেডি বেসমেন্টে ছিলাম, নয়তো কুঁয়ো খুঁড়ে ডুবে মরতে ইচ্ছে করছিল! 🙂 🙂

ততক্ষণে ওপরে ক্রুদ্ধ বাতাসেরা মত্ত যূথ দলের মতো তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছে..

NABC 2024


#NABC2024

সকল শুরু মধ্যেই শেষের বীজ নিহিত থাকে। সকল শুরুকেই মহাকাল স্মৃতির তকমা লাগিয়ে একদিন অতীত করে দেয়। তেমনই দিয়েছে NABC অর্থাৎ উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সম্মেলনকে। অতিথি অভ্যাগত এবং আমন্ত্রিত শিল্পীরা আজ একযোগে বলছেন, যে গত কয়েক দশকে NABC কেনো, অন্য কোনো সাংস্কৃতিক উদ্যোগেই এরকম নজিরবিহীন সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা নাকি দেখা যায় নি। বলছেন, best NABC ever. ডক্টর কুণাল সরকার তো বলেই ফেললেন, আপনারা বাঙালি তো? আমার মনে হচ্ছে আপনারা জেনেটিকালি মডিফায়েড কোনো স্পিসিস। বাঙালি ঝগড়াঝাঁটি না করে একযোগে কাজ করতে পারে, এমনটা তো কখনো দেখি নি!

আমরা বাঙালিরা নিজেদের বলি, কাঁকড়ার জাত। অর্থাৎ কিনা একজন উঠতে চাইলে অন্যজন টেনে নামায়। কিন্তু NABC24 প্রমাণ করল, আমরা পারি… আমরা কাঁকড়ার জাত না হয়ে মৌমাছি কিম্বা পিঁপড়ের জাত হতে পারি যেখানে প্রত্যেকে ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সমষ্টির জন্য শ্রম দেয়। এমনটা কিভাবে হল? অনুষ্ঠানের যে স্কেল, তা যেকোনো বড় মাপের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকেও দুঃস্বপ্ন দিতে পারত। চার হাজারের কাছাকাছি অতিথি, একশ সত্তর জনের মত দেশ থেকে আগত শিল্পী। এত মানুষের খাওয়া দাওয়া, আপ্যায়ন, আবদার। এতগুলো complex production, এতগুলো অতিথির দেখভাল, এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার, এমন অনবদ্য ডেকরেশান, টিনএজার এবং ছোটদের জন্য এমন সুন্দর প্রোগ্রাম লাইন আপ। চারশোর মত স্বেচ্ছাসেবক হাসিমুখে এমন একটা হারকিউলিয়ান টাস্ক করে ফেলল একটি মানুষকেও একটিও অভিযোগ করার সুযোগ না দিয়ে। না, অনায়াসে নয়, অল্প আয়াসেও নয়। রীতিমত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। কেমন করে হল? কোনো জীন কি পরী কিম্বা গোঁসাইবাগানের ভুত নেমে এসেছিল কি?

না আসেনি। অথবা বলা যেতে পারে, এসেছিল। সেই জীন কি পরীর কি গোঁসাইবাগানের ভুতের নাম স্বার্থশুন্যতা। পরিবর্তে কি পেতে পারি, সে চিন্তা মুছে দিয়ে যে দান করা যায় সে দান প্রকৃত অর্থেই ঐশ্বরিক। সে দেওয়াই আসল দেওয়া যে দেওয়া হয়ে যায় না দেওয়া-নেওয়ার খেলা, হয়ে যায় না transaction। এই অনুষ্ঠান এরকম সর্বাঙ্গসুন্দর হয়েছে কারণ প্রতিটা স্বেচ্ছাসেবক নিজের সময় ও শ্রম দান তো করেছেন, কিন্তু আশ্চর্য, বদলে কিচ্ছুটি চান নি। ব্যষ্টি সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে সমষ্টি সত্তায় মিশে গেছেন, ব্যক্তি চেতনাকে উহ্য রেখে সামগ্রিক চেতনায় নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন। তাই এই সাফল্য। তাই এত সব অভ্যাগতদের মুখে এমন অনাবিল হাসি। নিষ্কাম কর্ম এক ধরণের win-win situation. যে সেবা দেয় আর যে সেবা লাভ করে, দু পক্ষই আনন্দ পায়।

ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া ছাড়াও আমার মতে আর একটা ফ্যাক্টর ছিল এই সামগ্রিক সাফল্যের পেছনে। আর তা হল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, decentralization of authority. কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, central leadership কাজ গুলোকে বিভিন্ন বিভাগে (tower) ভেঙে দেওয়ার পর সেই টাওয়ারের ওপর রেখেছিলেন অবিচলিত আস্থা। তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করা বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন নি। একনায়কতন্ত্র (autocracy) ছিল না কোনোখানে। ফলে ফলেই প্রতিটা বিভাগ এবং তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা নিজের কাজের মালিকানা (ownership) নিয়েছে এবং সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করেছে। কেমন করে হয় এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ? উত্তর হল, অহমনাশ। অহমকারাবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতিমন্যতে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অহংকারের বশবর্তী হয়ে মানুষ নিজেকে কর্তা বলে মনে করেন। আমাদের central leadership অহংকারের মোহ জয় করে নিজেদের অকর্তা বলে মনে করেছেন। প্রেসিডেন্ট ইমেইলে বলেছে, I urge the community to get to know these volunteers (not the ‘leaders’ like me for instance)…These are the faceless individuals who should be celebrated, applauded, recognized and most importantly respected.

শিকাগো। এই শহর থেকেই এক গৈরিকধারী বীর সন্ন্যাসী এক শতাব্দী আগে বাঙালির হৃতপ্রায় জাত্যাভিমানকে উদ্ধার করার কাজে অগ্রণী হয়েছিলেন। বিশ্বের দরবারে বাঙালির নাম উজ্জ্বল করেছিলেন। আজ সেই শহর থেকেই বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারের কাজটা যদি শুরু হয়, তবে তা আনন্দের কথা বই কি!

ভবিষ্যতে যাঁরা NABC-র দায়িত্বভার প্রাপ্ত হবেন, সেই সব শহরকে বলি, আপনাদের সঙ্গে শিকাগোর কোনো প্রতিযোগিতা নেই। আপনার বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান, বঙ্গ সম্মেলনের মান আরও বৃদ্ধি করুন, NABC Brandকে আরও উজ্জ্বল করুন, এ আমরা সর্বতোভাবে কামনা করি।

শুধু টিপস হিসেবে এটাই বলব, ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে উঠে নিষ্কাম সেবা আর অহমশুন্যতা এই দুটো উপাদান আপনাদের সাফল্যের রেসিপিতে অবশ্য করে দিতে ভুলবেন না।

Happy New Year 2024


বছর গড়ায় বছর গড়ায়
বছর রে তোর চোখের গোড়ায়
ধুলো দিয়ে চলে যাব
ঠনঠনে তোর হিসেব খাতায়
ঢ্যারা দিয়ে চলে যাব

নতুন বছর রুপোর থালায়
সাজাচ্ছে তার রূপের ডালি
তার সাথে আজ প্রেম পিরিতি
তার কাছে সব প্রতিশ্রুতি

তোর আর দেওয়ার আছে টা কি?
একলা বসে কাঁদবি তো কি?
কয়েক প্রহর শুধু বাকি
প্রেম বিরহ টুকিটাকি
যা আছে তোর ভাঁড়ারে আজ
থাক পড়ে সব
চাই না ওসব

আমার এখন মন মজেছে
নতুন খেলায়, নতুন মেলায়
নতুন ভেলায় করে আমি
নাইতে যাব দিল দরিয়ায়
নতুন চাদের চুপ জোছনায়
ভিজবে বসে মন বেহায়া
নতুন নতুন ভালবাসায়
পুড়ব আমি, জুড়বো আমি
নতুন লাইন ভুল কবিতায়
পড়বে না কেউ? তোর তাতে কি?
তোকে মনে রাখব নাকি?
কক্ষণো না..মৃত্যু দিলি
প্রাণের সাথে তোর ছেনালি
হত্যালীলা জুজুবুড়ি
গাজা স্ট্রিপ আজ মৃত্যুপুরী

ও বছর তুই যত্নে রাখিস
যে সব তরুণ দিল না শিষ
নতুন ভোরে, বীণার ছড়ে
দিল না তান, গেল বছর,
ওদেরকে তুই যত্নে রাখিস!!

May New Year be less violent. Happy New Year!

স্বৈরিণী


সে এক নাগিনী
জীবনের অপচয়ে সব বিকিকিনি
শেষ হলে স্তিমিত চন্দ্রালোকে
অমোঘ লালসা নিয়ে আসে…
বেঁধে নিয়ে শত নাগ পাশে
নির্বাসন দেয় চিরতরে
অনুজ্জ্বল ক্ষয়াটে অতীতে।

সেই সে নাগিনী
বুভুক্ষু সেই স্বৈরিণী
দিনলিপি জীর্ণ হলে
বুকে হেঁটে আসে গিলে নিতে।

হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে


ভালবাসার কথাই যখন হল…Happy Valentines Day!

তোমার জন্য বিরাম রেখেছিলাম
সময় করে নিও
দুপুর বেলায় স্মৃতির ভেলায় ভাসো
যদি কখনো প্রিয়


তোমার জন্য শিশির রেখেছিলাম
ঘাসের সমাদরে
ভোরবেলাতে কুড়িয়ে নিও যদি
আমায় মনে পড়ে


তোমার জন্য শাপলা ফুলের ঘাটে
জলতরঙ্গে রেখেছি জলছাপ
সময় করে বোসো, শুনতে পাবে
তোমার আমার নিহত সংলাপ


আমার শঙ্খ চুপটি পড়ে আছে
ইচ্ছে হলে ফুঁ দিও কখনো
দেখবে কেমন মধুর সমারোহে
উঠবে বেজে তোমার কঙ্কণও

বই প্রকাশঃ বনধুতরোর ফুল


এক বন্ধু বলছিল, তুমি তো এত ভাল গল্প লেখো, তবে কবিতার বই প্রকাশ করলে কেন? কবিতা তো কেউ পড়ে না। আমি বললাম, ধরো, যদি ঠিক সেই জন্যই। যাতে হ্যাজাকের সূর্যসম প্রভায় নরম কথাগুলো ঝলসে না যায়, যাতে জয়ী হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল না হয়ে পরম সুখে পরাজিত হতে পারে আমার আত্মকথন, যাতে যুক্তিবাদী ও মস্তিষ্কসর্বস্ব মানুষের পরখ-করা-নখের নিষ্পেষণে রক্তাক্ত হতে না হয়, যাতে অষ্টমীর জগন্নাথ ঘাটের ফুলের বাজারে ফুলের মত মূল্য নির্ধারণ করার জন্য পাঠক ও পঠিতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি দরাদরি না হয়…

বইটি পাওয়া যাবে কবিতা আশ্রমের স্টল 252 তে। 6 নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে সোজা গিয়ে লাস্ট স্টল। এটিই বইমেলার শেষ সপ্তাহান্ত। যদি বন্ধুদের কেউ স্বপ্ন সাজাও, যদি বন্ধুদের কেউ বইমেলায় যাও, ঘুরে দেখো কবিতা আশ্রমের স্টলটি। এর বেশি মার্কেটিং আমি করতে জানি না। বরং একটা কবিতা দিই আমার সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “বনধুতরোর ফুল” থেকে। এ বইয়ে আমার কথা লেখা আছে। হ্যাঁ এ আমারই কথা। কোনো পাতায় হয়তো বা ধরা আছে কোকিলকূজিত নয়ানজুলির চর, কোথাও বা পলাশ রাঙানো বনমর্মর, কোথায় আমার চোখে ধরা পড়া সন্ধে নামার ক্ষণ, কোথাও আমারই আহত হৃদয় ক্রন্দন।

অভিমান


তুমি আমার কসাইখানা দেখতে পেলে
খুঁজে পেলে আমার হর্ম্যপ্রাসাদ
তোমার চোখে চেয়ে দু দণ্ড বাসর জাগল আমার চিলেকোঠা ছাদ

কিন্তু আমার মরু প্রান্তরের সন্ধান পেলে না
আমার হাত ধরে ঝিনুকের দেশে গেলে না
সহস্র বছরের একটানা বর্ষার পর
শোনা যায় যে ঝিল্লী মর্মর
আমার বুকের মধ্যে তার ধ্বনি অনুক্ষণ
সুপ্রিয়ে, কান পেতে শুনো কোনো দিন…

মানুষ তো চিরকালই অবয়বহীন।

পাঠান


স্ব বাবু যযাতিকে বললেন, মহারাজ, আপনি প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ।
মহারাজ যযাতি বললেন, সে ব্যাপারে আমি সম্যক রূপে অবগত। আগে বলো।
স্ব বাবু বললেন, শুনেছি মহান আর্যাবর্তে একটি নতুন ছায়াছবি প্রকাশ পেয়েছে। সেই নিয়ে খুব হৈ হৈ রৈ রৈ। নাম পাঠান।
মহারাজ যযাতি বললেন, অতি আশ্চর্য। ছবি হৈ হৈ করে চলছে অথচ তার নাম নির্ধারণ করা হয় নি? আমাকে নাম পাঠাতে বলছে?
আজ্ঞে না না। ছবির নামই পাঠান।
সে বুঝেচি। কিন্তু তারা নিজেরাই তো ছবির নাম ঠিক করতে পারে। তারা তো আর পাঁঠা নয় যে তাদের ছবির নাম আমায় পাঠাতে হবে!
মহারাজ, ছাড়ুন। শুনেছি সে ছবি নাকি নয় শো কোটি টাকার ব্যাবসা করেছে।
নয় শো কোটি মানে কত? এক পদ্ম না এক মহা পদ্ম?
আজ্ঞে, নয় পদ্ম। এক পদ্ম মানে হলে গে একশ কোটি।
সে আর এমন কি। বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে যে দাক্ষিণাত্য আছে, সেই স্থলে ছবি শুনতে পাই প্রায়শই এক মহাপদ্ম কি এক জলধি পর্যন্ত ব্যাবসা করে।
মহারাজ সর্বজ্ঞ। তবে অদ্দুর করে না মনে হয়। হাজার পদ্মে এক মহাপদ্ম। বাহুবলী বলে একটি ছবি পনের পদ্ম ব্যাবসা করেছিল। অর্থাৎ কিনা পনের শো কোটি।
বটে? তবে কোনো ছবি এর থেকে বেশি ব্যাবসা করে নি?
আজ্ঞে করেছে। সে ছবি এখন ছবি হয়ে গেছে। নাম আদানি।
ও। আদানি? সে কি আদার ব্যাপারী?
না না আদা না। আদানির আদান প্রদান বহুবিধ। একে বলে বিজনেস কংগ্লোমারেট। সে যাগগে। মহারাজা, যাবেন নাকি পাঠান দেখতে? চমৎকার ছবি। তবে মাথাটি শুনেছি হলের বাইরে খুলে রেখে যেতে হয় দেখতে।
তুমিই দেখো এসো বৎস। আমার এই বুড়ো হাড়ে আর জোর নেই তেমন। তার ওপর আমার মাথা আমার পরম প্রিয়। তা খুলে রাখতে রাজি নই। গল্পটি শুনিও দেখে এসে। যদি কিছু থাকে…

কাব্যগ্রন্থ প্রকাশঃ বনধুতরোর ফুল


আমি কোনো কবিতা লিখি নি কখনো। আমার এই শরীর ও মন দোহন করে কোনো এক অমিত শক্তি যা বর্ণনাতীত এবং শব্দাতীত, যা essentially nonverbal, তেমনই এক শক্তি শব্দের সীমিত পরিসরে নিজেকে বর্ণিত করেছে মাত্র। কবিতা আসলে কোনো চিন্তা বা ভাবনা নয়, কবিতায় ধরার চেষ্টা করা হয় বোধ। কবিতায় লেগে থাকে অনুভব। আর এই বোধ বা অনুভব শব্দ দ্বারা অনুচ্ছিষ্ট। শব্দ তাকে ছুঁতে পারে নি কখনো। তবে প্রয়াস করেছে সতত। আর তাই কবি যুগে যুগে প্রহরে প্রহরে অপূর্ণতায় পীড়িত হয়েছেন। ঠিক যা বলতে চাই, তা যেন বলতে পারলাম না, এই সঙ্কট।

তবু কথা জমে ওঠে চুপি চুপি বর্ষা ঋতুর আকাশপটে বিন্দু বিন্দু বারিবিন্দুর মত। তবু কে যেন এক আমাদের সব চেয়ে অপ্রস্তুত সময়ে, মধ্যরাতে কি অফিস মীটিং এর মাঝে, নৃত্যরত ঝর্ণা ধারার মত শব্দ সায়র ভরে দেয় গভীরে গহনে। আর বলে আমায় সালঙ্কৃতা করো। আমায় জন্ম দাও। অব্যক্ত স্বেচ্ছায় ব্যক্ত হতে চায়। আমি অক্ষম। আমি অকিঞ্চিৎকর সেই ইচ্ছাশক্তির কাছে। তাকে রূপ দিই। অলঙ্কার দিই। ক্ষয়হীন অক্ষরকে অক্ষরে ধরি। এই আমার কবিতা। এর বেশি কিছু না। এ বোধ হয় পৃথিবীর সমস্ত কবিরই আত্মকথা।

সেই সব শব্দমালা পুস্তকাকারে প্রকাশ করব কখনো ভাবি নি। বড় ভয় হয় নিজেরই কর্মের আসক্তিতে জড়িয়ে না পড়ি। কিন্তু বন্ধুবর অমিত উৎসাহ দিল। আমিও সম্মত হলাম। মনে ভয় কবিতার কাছে পৌঁছতে পেরেছি তো। তবে এক কবিবন্ধু বলেছিলেন কবিতা আদতে একা। পাঠকের সঙ্গে যুক্ত হলেই তার দ্বিত্ব ঘটে। হয়তো এই এক থেকে দুই, এক থেকে বহু হওয়ার ইচ্ছে নিয়েই আমার কবিতাগুচ্ছ পাঠকের দরবারে পৌঁছতে চায়। কবিতার আত্মার কাছে পৌছতে পেরেছি কিনা এখন তো সে সিদ্ধান্ত পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি। কারণ বই মুদ্রণা হয়ে গেছে। এখন শুধুই প্রকাশের অপেক্ষা। বিভিন্ন জনারের কবিতা নিয়ে প্রস্তুত সঙ্কলনটি। আশা রাখছি, এবং দুরাশা রাখছি তার অন্তত কিছু শব্দবন্ধ আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। যদি কোনো একটি কবিতা আপনার বছর ঘোরার পরেও ফিরে গিয়ে পুনঃপাঠ করতে ইচ্ছা হয়, তখন জানব যে পরীক্ষায় আমি উত্তীর্ণ হয়েছি। পরীক্ষা কথাটি একটু ক্যাজুয়ালি বললাম। আমি মনে করি না এ কোনো পরীক্ষা। এই কবিতাগুচ্ছ আমার একান্ত আত্মকথন। তবে নিশ্চয়ই চাই এই আত্মকথন লোককথা হয়ে উঠুক। পাওয়া যাবে বইমেলা স্টল নাম্বার ২৫২।