শুভ মহালয়া

কথা নিয়ে খেলা এ নয় হেলাফেলা!!!

দুর্গাপুজো এবার কাটাবো নিজের শহরে। সে কথা যখন জানালাম এক বন্ধুকে, তিনি বললেন, আমার শহরে কবিকে স্বাগত।

আমি বললাম, প্রিয় ব্যর্থ কবি বলো। কবি দুই প্রকারের, জানো না? অর্থ কবি আর ব্যর্থ কবি। 

উত্তর তিনি বললেন, ও বুঝলাম, এবার আপনার বিনয় আসছে।

আমি বললাম, হ্যাঁ সে আসছে বইকি। বাদল আর দীনেশ আসা বাকি শুধু। তিনে মিললেই বিবাদী বাগ হবে।

তিনি বললেন, বাদল এসেছেন তো। শুধু আসেনই নি, তিনি তো যেতেই চান না। ঘরঘাট সব ভেসে গেল।

আমি বল্লুম, হ্যাঁ সে খবর পেয়েছি। তাহলে চলুন আমরা দীনেশের নয়, দিনেশের আরাধনা করি যাতে পুজোর দিনগুলি রৌদ্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। 

শুভ মহালয়া সকলকে!!!

তা তা থৈ থৈ

আহা কি অনবদ্য নৃত্যশৈলী! যেন রাম তেরি গঙ্গা মইলি! যেন কালবৈশাখী উঠেছে পাগলপারা, যেন শ্রাবণঘন বাদল দিনে ঝরোঝরো বৃষ্টি ধারা! ফেঁপে উঠেছে বাঙালিয়ানা, নেচে উঠেছে মন মাতাল, কেঁপে উঠেছে ত্রাসে টেরাস (terrace) এবং স্বর্গ-মর্ত-পাতাল! যেন স্বয়ং নটরাজ ভর করেছেন প্রতি অঙ্গে, প্রত্যঙ্গে, আহা অঙ্গে! আহা কি প্রেম সাজিল আজি বঙ্গে! মুরারী দাঁড়াইল ত্রিভঙ্গে। ঘেরিয়া ঘেরিয়া নাচে গোপীজনশ্রেষ্ঠা রণরঙ্গে!

প্রভু কন, ওরে প্রভু কন। তিনি নিজেই ফ্যাশন আইকন! তাই বাজিল নুপুর, কঙ্কণ! মাথা ঝনঝন ঝন ঝনঝন! রাঙা ধুতি চড়িল শ্রী অঙ্গে! ষষ্ঠীর সাজে শ্রীমতী সে সঙ্গে! ওহে বাঙালি, তুমি কাঙালি। তাই তোমায় দেখাল দ্য ওয়াল, কাহারে বলে দ্য বাওয়াল। তা তা থই থই রনোথম্বোর। মন টই টই টই টম্বুর। আহা মিস্টি, আহা কৃষ্টি, এ তো হিস্ট্রি, অনাসৃষ্টি। আজ এ সকলই হল শুদ্ধ। বাক্রুদ্ধ। বাক্রুদ্ধ। আহা লাবণ্যে প্রাণ পূর্ণ। শুধু মন ভেঙেচুরে চূর্ণ। রবিসন্ধ্যা রবিসন্ধ্যা। বাংলা কি তবে বন্ধ্যা? আজ দেবী দুর্গার আগমনী গানে নেমে পড়ে মদ-অনদা। তা তা থৈ থৈ। এ কি হৈ হৈ। আমি মনকেই বলি পই পই – মন রে, ওরে মন রে, ওরে বিকচকুসুম মন রে, আজ মেনে নাও তুমি, মেনে নাও আজ, এসকলই শোভন রে।

Any resemblance to actual events or locales or persons, living or dead, is entirely coincidental – মানে আমার তাই মনে হচ্ছে আর কি। আপনার কি মনে হচ্ছে বলতে পারব না।

Jojatir Jhuli – Baro Kahon, a feedback

In the field of writing fiction, unbiased feedbacks are hard to get. I write for different magazines both printed and digital without a clue if anyone has ever read any of my body of works. It is hard work to make a palatable story, so feedback motivates. All authors, famous or rarely read (like me), have to resort to social media to promote his work. We put our stories verbatim in our facebook wall in order to earn some readership. Most of your friends and families ignore. Some reacts with a word of praise or two. But you are never sure if that appreciation is colored based on your social status, personal warmth or your chemistry with the person. An objective evaluation of art can never be done if the art connoisseur knows the artist personally.

But rarely, very rarely, comes moments which rekindles your passion of writing. Today was such a day. I keep checking google ranking of my literary website “Jojatir Jhuli” from time to time. This motivates me because google’s world class ranking algorithm consistently attributes a fairly good page index to my website.

Today while searching for google rank of my website “Jojatir Jhuli”, I found that I got an entry in goodreads August, last year. A person named Ranjan Ganguly who apparently read my published short story collection “Jojatir Jhuli: Baro Kahon” gave a feedback in goodreads. Ranjan, I dont know you and may be I will never know you but that is precisely why your word of appreciation truly motivates me. I don’t know if some of my stories are as good as Ray’s or not but I will leave it to posterity to judge that.

ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা

“ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা” পড়লাম। শিবরামের আত্মচরিত। শিবরামের হাসির রচনাগুলির কথা সকলেই জানে। পড়েছেন আপনিও। আমিও। কিন্তু এ একেবারে অন্যরকম। এই আত্মজীবনীটিতে হাসির উপদান থাকলেও এমন গভীর তত্ত্বকথা আছে যে পড়লে যারপরনাই বিস্মিত হতে হয় যে এ কি সেই একই লোকের কলম থেকে নিঃসৃত হয়েছে? আমার সেই বালক বয়সে আমার দাদু বলেছিল এই বইটির কথা। কি আশ্চর্য দেখুন চল্লিশটা বসন্ত পার করে সেই বইয়ের ধার আমায় ধারতে হল। পড়লাম এসে এতদিনে এক দাদার রেকমেন্ডেশানে। দেবাশিসদা। এ বইতে শিবরামের জ্ঞান ও বুদ্ধিচ্ছটাতে প্রতিটা বাক ও বাক্যাংশ যেন হীরক খণ্ডের মত ঝলমল করছে। এমনই তার লেখনীর মধু যে মধুমক্ষীর মত তাতে মজে রইলাম। এমন বর্ণনা যে এক বর্ণ না পড়ে থাকতে পারলাম না। সাড়ে চারশো পাতার পথ সাড়ে চারদিনে ধুলো উড়িয়ে গেলাম। ধূলিবিজড়িত অবস্থায় শেষ পাতা অব্দি পড়ে তবে পরিত্রাণ। নিজেরই গল্প এত সরস করে বলা যায়, নিজেকেই একটি মহাকাব্যের প্রোটাগনিস্ট করে এমন ধারা দাঁড় করানো যায়, এ বই পড়ার আগে তা শুধু একবারই দেখেছি। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতকে। সেটিও তাঁর আত্মচরিত।

মহাস্থবির জাতক বইটির সঙ্গে আমার পরিচয় কিছু নাটকীয়। আসল কথায় আসার আগে সেইটি বলে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। বইটার নাম আমি কোনোদিন শুনি নি আগে। কেমন করে যে এমন একটা বহুলচর্চিত বই আমাকে রীডার করে নি, আমার রাডার এড়িয়ে ছিল বহুদিন, তা জানি না। কয়েক বছর আগের কথা। একদিন কলেজ স্ট্রীটে একটি বইয়ের দোকানে ঢুকেছি দু একটি বই সংগ্রহ করতে। বইয়ের তাক থেকে একটু চোখ সরাতে দেখি কোন ফাঁকে পাশে ঝলমল করছে এক ছিমছাম সুন্দরী। সেই রমণীয় রমণী কোন বই সংগ্রহ করেন বইয়ের আড়তে দাঁড়িয়ে আড়চোখে তাই দেখতে থাকি। রূপই তো তছরুপ করি আমরা বইয়ের পাতায়। সে রূপ যদি অমনি এসে পাশে দাঁড়ায় তবে বই খোঁজা কিছুক্ষণ বন্ধ রাখা যায় বই কি! তো তিনি কিনলেন একটি এক মণ ওজনের বই। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতক। আমি তখন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। যেমন ধীরে তিনি এসেছিলেন তেমনই ভিড়ে মিলিয়ে গেলেন। আমায় কিছু অধীর করে হয়তো। তো দোকানদার জিগ্যেস করল, আপনার কোন বইটা চাই যেন। কোনটা চাই তখন কি ছাই মনে পড়ে! বললাম ওই। ওই মানে কোনটা? মানে ওই। মানে উনি। মানে উনি যেটা কিনলেন। বইটা হাতে পেলাম এভাবেই। হাজার পাতার বই। সে বই পড়ে আতর্থীবাবুর  জীবনের সিনেমার অলীক কল্পলোকে যখন বিচরণ করেছি, তখন মনে মনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছি সেই ক্ষণিকাকে। 

কিন্তু কথা হচ্ছিল “ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা” নিয়ে। মহাস্থবির জাতকের জাত আর “ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা”-র জাত এক হলেও মানুষ দুটো জাতে এক নয়। প্রেমাঙ্কুর অঙ্কুর বেলা থেকেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন শহর থেকে শহরে। আর শিবরাম জাত ঘরকুনো। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস না করে পাশ কাটিয়ে সেই যে কলকাতার একটি মেসবাড়িতে এসে ঢুকেছিলেন ওখান থেকেই গেছেন অনন্তের পথে। তবু সেই ঘরকুনো জীবনও যে এমন একঘর হতে পারে তা শুধু পড়লে বোঝা যাবে। আনন্দবাজার পত্রিকা বিক্রি করে এবং অর্জিত সামান্য টাকায় আনন্দ করে ম্যাটিনি শোয়ে আর নাইট শোয়ে শয়ে শয়ে ছবি দেখে আর রাবড়ি খেয়ে যে জীবনের শুরু সেই জীবনেরই উত্তরণ সেই আনন্দবাজারেরই কলাম রাইটার হিসেবে যার হকারই তিনি করতেন। মাঝখানে ইংরেজ সরকারের হাতে দেশদ্রোহের নামে জেলে যাওয়া, দেশবন্ধুর ইচ্ছায় আত্মশক্তি কাগজের সম্পাদনা আর সুভাষচন্দ্রের হাতে চাকরি নট, বিধানাবাবুর কাছে রোগের অজুহাত নিয়ে চাকরির একটা রেফারেন্স পেতে যাওয়া কত যে মজার ঘটনা সে বলার মত না। এক চোর তাঁর ঘরে এসে এক ফোঁটা কিছু চুরি করার জিনিস না পেয়ে দশটা টাকা রেখে গেল। সঙ্গে চিঠি। “তুমি ভাই লেখো টেখো দেখছি। কিন্তু খেতে পাও না মনে হয়। তাই এই টাকা কটা দিয়ে ধুপ কিনে এনে বেচো। অন্নসংস্থান হবে।” সব ঘটনা মজার হয়তো না যেমন জীবনের প্রারম্ভে দিনের পর দিন ফুটপাথে শোয়া আর দিনের পর দিন উপবাসের জঠর জ্বালায় ভোগা খুব মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা নয়, কিন্তু বলার গুনে বা বৈগুণ্যে তা এত রসসিঞ্চিত হয়েছে যে জামবাটি ধরে ধরে খাওয়া যায় সে রস। তবে এ লেখার অবতারণা পাঠ প্রতিক্রিয়া নয়, বলা যেতে পারে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। 

প্রথমটি হল, দুটো আত্মচরিত দেখেই একটা জিনিস মনে হচ্ছিল সেই কথাখানাই লিখি। প্রেমাঙ্কুর শিবরাম দুজনেই বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে তবে দুজনেই বাউন্ডুলে। আর সেই বাউন্ডুলেপনাই তাদের বাউন্ডারি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক। যে কথাটি দুজনেই লেখেন নি, কিন্তু লেখার মধ্য দিয়ে ফল্গুর মত প্রবাহিত সেটা হল, স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় পরধর্মো ভয়াবহঃ। সত্যিই তাই। মানে অন্যের ধর্মের প্রতিপালন করার থেকে নিজের ধর্মে মরা ভাল। এ ধর্ম হিন্দু কি ইসলাম নয়। এ ধর্ম স্বধর্ম। ধৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন ধর্ম মানে যা আমাদের ধারণ করে। শিবরামের অনুকরণে বলতে গেলে বলতে হয় ধর্ম মানে যা ধারণ করে মানে ধার অন করে আমাদের ধারালো করে দেয়। শিবরামের আত্মচরিতে দেখি একটা অংশে ভদ্রলোকের বহুদিন অন্নসংস্থান নেই। মল্লিকবাড়ির লঙ্গর খানায় ভিখিরিদের সঙ্গে খেয়ে জীবনধারণ। এমন সময়ে কেউ একজন তাকে একটি বিজ্ঞাপন লিখিয়ের চাকরি দিচ্ছে। মাস মাইনে খারাপ না। শিবরাম বাড়ি বয়ে সে চাকরি প্রেমেন মিত্তিরকে দিয়ে এলো। প্রেমেন জিগেস করছে, তুমি তো খেতে পাচ্ছ না। করো না কিছুদিন চাকরিটা। শিবরাম বলছেন, না ভাই, আমি দশটা পাঁচটা চাকরি করতে পারব না। এক পেটের অধীন হয়ে নিজের বাকি সব স্বাধীনতা খোয়াতে পারব না। চিন্তার এই স্বচ্ছতা, clarity of thought ছিল বলেই শিবরাম খেতে না পেয়েও বেঁচে গেলেন। মানে শুধু জীবনকালে বাঁচলেন না। মরার পরে বেঁচে রইলেন আপামর বাঙালির জনমানসে। যে কাজে তাঁর মন লাগে না, শত মন্দার দিনেও তেমন কাজে তাঁকে কলুর বলদের মত জুড়ে দিতে পারে নি সমাজের জাঁতাকল।

অনেক লেখকেরই জীবনে এরকম সংগ্রাম দেখা যায়। প্রকাশকরা তাঁর সাহিত্যশ্রমের দাম দেবে না, অন্য লেখকেরা গুঁতো দেবেন, লেখক খেতে পাবেন না ইত্যাদি। আজকে যখন ফেসবুকে অনেক সখের লেখককে দুঃখ করতে দেখি আমার লেখা কেউ পড়ে না, আমায় কেউ লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিল না ইত্যাদি তখন মনে হয় বলি, আপনি আপনার জীবনের পান থেকে চুন খসালেন না, সংগ্রাম দূর অস্ত এক গ্রামও ত্যাগ স্বীকার করলেন না, অথচ অমরত্বের খাতায় নাম লেখানোর প্রত্যাশী তা কি হয়? আপনি স্ট্রাগল করবেন না, স্মাগল করে যশ খ্যাতি নিয়ে যাবেন পাঠককুল তেমন ছাগল নয়।     

আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি লক্ষ্য করলাম সেটা আতর্থীর ব্যাপারেও লক্ষ্য করেছিলাম। কথাটা কিছুদিন আগে চন্দ্রিলও বলেছিল মনে হয়। বাঙালি এক সময় একটু আলগোছে বাঁচতে জানত। মানে প্রথাগতভাবে পড়াশুনো, চাকরি, বিবাহ সন্তানাদি করা ছাড়াও আরও একটি অল্টারনেটিভ পথ খোলা ছিল আগেকার দিনে বাংলায় (অন্যান্য প্রদেশ বা দেশের খবর জানি না)। ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী হয়েও তখনকার দিনে কেউ কেউ সেই পথে হাঁটত। মানে পরীক্ষায় কিছুতেই পাশ হবে না জেনে যারা স্কুল পালায় সেই ধারার নয়, বরং কলেজের প্রথম দ্বিতীয় পদাধীকারীদের কলিজায় ব্যাথা হলে পারে এরকম ধরণের প্রতিভাশালী কিছু লোকও প্রথাগত শিক্ষার ধার না ধেরে, মানে বাংলায় বলে নিজেকে ধেড়িয়ে দিয়ে বসেছিলেন। তাদেরই কেউ কেউ হয়তো অমরাবতীর পথে যাত্রা করার পরেও জনমানসে অমর হয়ে রয়ে গেছেন । আজকের দিনে সেই সম্ভাবনা কোথায়? রবীন্দ্রনাথকেই দেখুন। প্রপার স্কুলিং হলে তাঁর প্রতিভার এমন স্ফুরণ হত কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অলীক অসম্ভবের সব সম্ভাবনা নিকেশ করে দেওয়ার নাম এডুকেশান। পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন সব নিউক্লিয়াসকে বৃত্তাকারে ঘুরছে ঠিকই। ওরা আমার আপনার মত কলুর বলদ। কিন্তু থাকে কিছু ফ্রী আয়ন। তারাই বিদ্যুৎ পরিবহন করে। এই শিবরাম চক্কোত্তির মত মানুষগুলো তখন ছিল এইরকম ফ্রী আয়ন। কেউ ধরে বেঁধে ধরাবাঁধার গণ্ডীতে আনতে পারে নি। তাই ইনি নিজের সম্পূর্ণ আত্মশক্তিটা দিতে পেরেছেন ভাষার একটু সম্পূর্ণ নতুন ধারার প্রণয়ন করতে। কিন্তু আজকের দিনে সম্ভাবনাময় কোন ছাত্র স্কুল কি কলেজ পালিয়ে ভ্যাগাবন্ড হয়ে যাচ্ছে তার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। প্রায় শূন্যই হয়তো। তাই সাহিত্য কি শিল্পেও সম্পূর্ণ একটা গোলামাল কিছু হওয়ার চান্সও ওই গোল্লা।

যাই হোক মহাস্থবির জাতক আর ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালবাসা পড়ে ফেলুন। এমন কাহিনি, জীবন নিয়ে এমন ছিনিমনি, এমনটা আর পাবেন না। পড়তে ল্যাদ লাগে জানি, কিন্তু পড়তে আরম্ভ করলে গল্পের মধ্যে এমন লেদিয়ে যাবেন যে কখন শেষ পাতায় পৌঁছবেন বুঝতেই পারবেন না।  

নির্জন

চোখ অনন্তের নির্জনতম সৃষ্টি মনে হয়
কত অস্তগামী সূর্য সলিল
কত ফুল, কত পাখি মরকত নীল
সে ধরেছে তার গহিন তারায়
তবু যেন ক্ষণে ক্ষণে সকলই হারায়
সব কিছু হয়ে যায় ক্ষয়
কিছুই সে রাখে না সঞ্চয়

এটুকুও জানেনা সে হায়
দু আঙুল দূরে বসে ঠায়
তারই মত আরও এক শুন্য আর উপোসী হৃদয়...

বাংলা লাইভে প্রকাশিত আমার কবিতাগুচ্ছ

১)

বলো সমারোহ
ফুঁড়ে দিলে বল্লমের ফলা
কদর্য বিশ্রী সব ছলাকলা
দিয়ে দীন হৃদয় ভরালে
আমাকে রাখলে তুমি আমার আড়ালে

হাসো সমারোহ
খল খল হাসো
তোমার অগ্নিতে দগ্ধ কতশত অপূর্ণ হৃদয়
তোমারি তো হয়েছে আজ জয়
ক্রূর বাদ্যে নৃত্য করো অভুক্ত জঠরের মতো
যা কিছু নান্দনিক সুস্থ সংযত
লোভ আর স্পৃহা দিয়ে সবই লেপে দিলে
পৃথিবী ভাগাড় হবে, কুড়ে খাবে শকুনে ও চিলে

অন্য কবিতাগুলি পড়তে আসুন বাংলা লাইভে। 

https://banglalive.com/poetry-of-emotions/

ইরাবতীতে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধ

গল্প কিভাবে লেখা হয়, ভাল গল্পের বৈশিষ্ট্যই বা কি এই বিষয়ে আমার একটি প্রবন্ধ। প্রকাশিত হল ইরাবতী ওয়েবজিনে।

দাও

তাথৈ বলল “দাও”। শুনেই আমার থরহরি কম্পমান হল। আসলে পোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় কথা আছে। আমার তাই অবস্থা। এর আগে যতবার দাও শুনেছি ততবারই ভারি গোল বেঁধেছে। এবারেও বাঁধবে সন্দেহ নেই। কারণ মনুষ্যেতর প্রাণীরা দাও বলে না আর মানুষেরা দাও বললে কি দিতে হবে সেটাও সাথে বলে দেয়। তাথৈ নাম্নী প্রাণী তার ধার ধারে না। দাও বলেই সে যথেষ্ট পরিমাণে আত্মবিশ্বাসী থাকে যে সে মনের ভাব পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রকাশ করতে পেরেছে। এবং সে যেটা চাইছে সেটা তাকে কেন দেওয়া হচ্ছে না এ ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ (এবং এটা আমার অনুমান) ও যেটা চায় সেটার ছবিটা ওর মনে স্পষ্ট কিন্তু তার শব্দরূপ জানে না।

শুধু দুটি জিনিস চাওয়ার ক্ষেত্রে ও বিশেষ্য (নাকি বিধেয়) টা ঠিকঠাক বসাতে পারে। সেটা হল, হ্যাঁ আপনার অনুমান সত্যি। প্রথমটা চকলেট। আর একটা আছে অবিশ্যি সেটা হল জল। দ্বিতীয়টি প্রাণদায়ী হলেও শুনি প্রথমটা প্রাণঘাতী। সে যাই হোক, এই দুটি ছাড়া অন্য কিছু চাওয়ার থাকলে শুধু দাও বলেই ক্ষান্ত হয়। এবার বোঝ ঠেলা। কি দিতে হবে সে ব্যাপারে তোমার অনুমান শক্তিই তোমার একমাত্র গাইড। নিউটনের সূত্র থেকে গোমূত্র সব কিছু ট্রাই করে দেখি এক এক করে। ট্রায়াল অ্যান্ড এরর। একটা লাগবেই। তবে ভুলের মাসুল আছে। একটি করে দিই আর তাথৈ বলে “না”। পরে এই না-এর টোনাল কোয়ালিটি বদলাতে থাকে। মুদারা থেকে তারায় যায়। এবং প্রথম পাঁচ ছটা চেষ্টায় ঠিক ওর যা চাই সেইটি দিতে না পারলে হাত টাত চালাতেও সংকোচ বোধ করে না। গান্ধিগিরির শেখানোর কোন ভাল কোচিং সেন্টার থাকলে জানাবেন। ওকে ভর্তি করে দেব।

দিনের বেলা দাও বললে তাও ভাল। যদি মনে রাখতে পারো, কিছুক্ষণ আগে অব্দি ওর হাতে ঠিক কি ছিল (সম্ভবত একটা পাজলের পিস কি দের ইঞ্চি সাইজের একটা প্লাস্টিকের হাস কি ছোট কোন পাথর ইত্যাদি) সেইটি খুঁজে পেতে হাতে ধরিয়ে দিলে নিশ্চিন্তি। কিন্তু মাঝে মাঝে এই দাও এর জ্বালা হয় রাতে ঘুমের মধ্যে। রাত আড়াইটের সময় ঘুম থেকে উঠে কেউ যদি দাও বলে ভয়ঙ্কর কান্না জোড়ে, তবে প্রশান্ত বুদ্ধ মূর্তি হয়ে যে থাকা যায় না সেটা বলা বাহুল্য। বিশেষ করে এখন হাতে কিছু দিয়েই লাভ হবে না কারণ তিনি স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছেন। সেম স্বপ্নটা না দেখতে পারলে কি করে জানব স্বপ্নে ওর হাতে কি ছিল? অগত্যা অন্ধকারে কিছু বাকবিতণ্ডার পর ওর পাছুতে চটাস শব্দ শুনতে পাই। বোধ হয় ওর মায়ের স্নেহ আশিস। তখন উচ্চৈঃস্বরে কান্না এবং পুনরায় ঘুমিয়ে পড়া। মোটের ওপর তাথৈ-এর দাও এর জ্বালায় ইদানীং অস্থির। হে দেবী সরস্বতী, হে কুচযুগশোভিতা ওকে ভাষাশিক্ষা দাও যাতে ও দাও বলার সাথে সাথে কি দিতে হবে সেটা পরিষ্কার করে জানানর ক্ষমতা অর্জন করে।

জন্মদিনের সকালে

ফিরতে আমার রাত্রি হতে পারে
ঘুমিয়ে তুমি পড়বে না তো মা?
আমার অনেক কথা বলা বাকি
তুমি কিন্তু শয্যা নিও না

তোমার পাশে পাশে হেঁটেছিলাম
ভোরের নরম শিশির ভেজা ঘাসে
এখন ধুলোয় ওষ্ঠাগত প্রাণ
আমার বুঝি সন্ধ্যা নেমে আসে

তোমার আঁচল অমনি পাতা আছে
বুকের মাঝে নদীর ছলো ছলো
পথে পথে অনেক ঘুরে ঘুরে
আজ কিভাবে পথ খুঁজে পাই বলো?

আমার ফিরতে রাত্রি হতে পারে
একটু আলো জ্বালিয়ে রেখো ঘরে
ভালই ছিলাম গর্ভে, অন্ধকারে…
এখন আঁধার দেখলে ভয় করে

দেখেছো, বলতে ভুলেই গেছিলাম
যতবারই গিয়েছি নদীতীরে
দেখেছি হংস ঐ সুদূরে যায়
নিস্তরঙ্গ জলের বুক চিরে

লঙ্কাকাণ্ড

শিকাগো সামার মানেই আউটডোর ফান। ওদের মা কোথায় বেরিয়েছে। সানাই আর তাথৈ নামক দুটি বিচিত্র জীবের দায়ভার আমার ওপর অর্পণ করে। আমি এক কাপ কফি সহযোগে আমার বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডে বসে  ল্যাপটপে একটি গল্প সাজানোর চেষ্টা করছি। আমাদের জীবনের কত গল্পই তো আখের রসের মত জীবনের ইক্ষুগাছে জমে জমে ওঠে। সেইসব দোহন করে শব্দের প্রাকারে সাজানো, গল্প মানে তো তাই।

সানাই এসে বলল, তুমি সারাক্ষণ অফিস করো। আমার সাথে খেলো না। সানাইয়ের অভিমানী স্বরে শ্রাবণ। আমি তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ বন্ধ করে বলি, চলো খেলি। সানাইয়ের খেলার স্বভূমিতে বিভিন্ন নাটক, যাত্রাপালা, চলচ্চিত্র অভিনীত হয়। তবে কিনা সে নিজেই ডিরেক্টর, স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং প্রধান চরিত্রে নিজেই অবতীর্ণ হয়। আমরা নেহাত এলেবেলে সাইড রোলে। মানে মৃত সৈনিক টাইপ আর কি! আজকের পালা রামায়ণ। তবে আগাস্টের ফুরফুরে হাওয়ায় সানাইয়ের মন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতই দক্ষিণাপন আজ। তাই আমি একটা প্রধান চরিত্র পেয়ে গেছি। শ্রীরামের ভূমিকায় আমায় কাস্ট করা হয়েছে। হনুমানের রোলটা নিজে নিয়েছে। ও সাধারণভাবে যে পরিমাণ লম্ফঝম্প করে থাকে, তাতে পবনপুত্রের রোলে ওকে খুব একটা প্রয়াস করতে হবে বলে মনে হয় না। নিজ চরিত্রগুণেই ও হনুমানের চরিত্রে মানিয়ে যাবে। মহাকাব্য রামায়ণ অভিনীত হতে হলে সীতা দরকার। আমি সানাইয়ের বোনু অর্থাৎ আমার দ্বিতীয় কন্যা তাথৈকে সীতার রোল দেওয়ার জন্য আর্জি করি। সানাই শোনামাত্র আর্জি খারিজ করে দেয়। তাথৈয়ের বয়স এখনও দুই হয় নি। সীতার মত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাথৈয়ের মত বালখিল্য স্বভাবের একজন মানুষকে কাস্ট করতে ওর ডিরেক্টর সুলভ মন কেমন যেন কু গায়। শেষমেশ সীতা হলেন সিন্ড্রারেলা। মানে সিন্ড্রারেলার পুতুল। পুতুলেরা নিজেদের স্বভাববশত হাত পা নাড়ে না বা কথা বলে না স্বেচ্ছায়। কিন্তু তার প্রক্সি তো আমাদের সানাই দিতেই পারে। বোনু নেহাত কোনো রোল না পেয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছিল, আমি ফট করে তাকে লক্ষ্মণের রোলে কাস্ট করে দিলাম। সানাই দেখলাম তাতে বিশেষ আপত্তি করলো না।

পালা এদিকে জমে উঠেছে। আদি কাণ্ড আর অযোধ্যা কাণ্ড শেষ হয়ে অরণ্য কান্ড শুরু হয়ে গেছে।  মহারাজা দশরথ পুত্রশোকে প্রাণত্যাগ করেছেন। মানে সানাইএর ভাষায় ডাই হয়ে গেছেন। রাম লক্ষ্মণ সীতা অনেক ঘুরেটুরে পঞ্চবটির আশ্রমে আস্তানা গেড়েছেন। পাঁচ পাঁচখানা বট গাছ পাওয়া দুষ্কর। তাই আমাদের ব্যাকইয়ার্ডের তিনখানা বড় ব্ল্যাক চেরী ট্রীকেই মনে মনে বটবৃক্ষ হিসেবে কল্পনা করে নিয়েছি। শূর্পণখার নাসাচ্ছেদ হয়ে গেছে। এবার তবে রাবণকে আসতে হয় মারীচকে সাথে করে। কিন্তু বাড়িতে তো মোটে তিনখানি প্রাণী। তারা মুখ্য চরিত্র রাম লক্ষ্মণ হনুমান হয়ে বসে আছে। চতুর্থ প্রাণী নেই যে রাবণের ভূমিকার নামবে। সমস্যার সমাধান করতে সানাই নিজেই ডাবল রোলে। হনুমান রাবণ হয়ে গেল চোখের নিমেষে। এই ধরণের চরিত্র বদলে মৃদু আপত্তি জানানোয় সানাই যুক্তি দিল, রাবণ হলে আমি পুষ্পক রথে করে আসতে পারব, বাবা। ব্যক্তিগত বিমান পাওয়ার লোভেই এই পার্টি বদল। সেতো আমাদের মুকুলও…না থাক।  

হরিণরূপী মারীচকে কোথায় পাওয়া যায় জিগেস করতেই সানাই বিদ্যুৎগতিতে দোতলায় চলে গিয়ে ওর খেলার ঘর থেকে একটা ইউনিকর্ন নিয়ে চলে এল। ইউনিকর্নকে হরিণ হিসেবে ভাবতে একটু বেগ পেতে হলো ঠিকই। কিন্তু নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। হরিণেরও চারটে পা। ইউনিকর্নেরও। হরিণের দুটো শিং। ইউনিকর্নের একটা। চলে যাবে। সীতারূপী পুতুল সিন্ড্রারেলার প্রক্সি সানাই রামরূপী আমাকে আদেশ দিল ইউনিকর্ন থুড়ি সোনার হরিণ ধরে আনতে। আমি তো পরম বিক্রমে অদৃশ্য ধনুক টনুক বাগিয়ে ক্রমাগত অদৃশ্য তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে সিংহগর্জন করে ছুটলাম হরিণ ধরতে (আসলে অধিকাংশ দিন আমি বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট পালায় বীস্টের চরিত্র পেয়ে থাকি। তাই হাঁউ মাউ করাটা আমার, কি যেন বলে, হ্যাঁ, ওই ম্যানারিজমে পরিণত হয়েছে)। বাগানের এক কোনায় গিয়ে মারীচের গলায় রামের স্বর নকল করে আমি এস ও এস পাঠাই – বাঁচাও বাঁচাও। সীতার আড়াল থেকে সানাই তখন লক্ষ্মণকে হাঁক দিয়েছে রামকে সাহায্য করতে যেতে। হিসেব মত লক্ষ্মণের তখন লক্ষ্মণরেখা কেটে দিয়ে রামের সন্ধানে বনে যাওয়ার কথা। কিন্তু লক্ষ্মণ অর্থাৎ তাথৈ জন্ম ইস্তক এই ধরণের যাত্রাপালায় চরিত্রের ধার মোটেই ধারে না। মার্জিত ভাষায় বললে অবাধ্য আর অপরিশীলিত ভাষায় বললে ঢ্যাঁটা, তাথৈ হল তাই। বাংলায় যাকে বলে, আপনি মর্জিকা মালিক। সে মাটিতে পড়ে থাকা গাছের ডালপালা পাতামাতা তুলে পরমানন্দে নিজের ওপরেই পুষ্পবৃষ্টি করছে। 

লক্ষ্মণের আমাকে উদ্ধার করতে আসার কোনো লক্ষণ নেই দেখে আমি স্বপ্রবৃত্ত হয়ে নিজেই ফিরে এসে দেখি রাবণরূপী সানাই সিন্ড্রারেলা সীতাকে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ঠিক উড়ছে না, একটা গাছের ডাল ধরে বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে আছে। আশু বিপদের সম্ভাবনায় আমি রাম, রাবণকে চ্যাংদোলা করে নামিয়ে দিই। রাবণ ওরফে সানাই তাতে খুব খুশি না হলেও এই টেন্সড মুহূর্তে সেই নিয়ে মাথা গরম করে না। তার আদেশে আমাকেই রাম থেকে জটায়ু হয়ে যেতে হয়। ঘেঁটে পুরো ঘ হয়ে গেছি। কে রাম, কে হনুমান, কে জটায়ু, কে রাবণ , কে সীতা, কে লক্ষ্মণ কিচ্ছু ঠিক নেই। রাবণের সঙ্গে জটায়ুর এদিকে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রথমে হাতাহাতি। সানাই-এর হাতের চটাস চটাস মার খেয়ে চটকে যাই বেশ। তারপর গদাযুদ্ধ। জটায়ুকে গদাযুদ্ধ করতে হবে কেন সে প্রশ্ন করতে গিয়ে পশ্চাদ্দেশে গদাম করে গদাবাড়ি খেলাম। সানাই-এর রামায়ণ। এখানে রাম রাবণে এক ঘাটে জল খায়। যুদ্ধ করতে করতে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে রাবণ মারীচ ওরফে খেলনা ইউনিকর্নকে জটায়ুর দিকে অর্থাৎ আমার দিকে ছুঁড়ে মারে। পুরো স্পাইডার ম্যান ওয়ানের স্টাইলে ইউনিকর্নের শক্তিশেলের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বলি, সানাই, এটা হচ্ছেটা কি? লেগে যাবে না? সানাই পরম বিক্রমে জানান দেয়, সে সানাই নয় রাবণ। সে তুমি রাবণই হও আর পতিত পাবনই হও, একটা হৃষ্টপুষ্ট ইউনিকর্ন ছুঁড়ে মারবে এ কেমন অভদ্রতা।    

কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড হাল্কা করে স্কিপ মেরে সুন্দর কাণ্ডে পৌঁছে যাই। সানাই এইবার তার আসল রোলে কাস্ট হয়েছে। এক লাফে সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কায় যাবে বলে তার ভীষণ উত্তেজনা। যাকগে যাক, সে সব তো হল। ফাইনালি লঙ্কাকাণ্ড টা তো হতে হবে। যাকে বলে সিনেমার ক্লাইম্যাক্স। লক্ষ্মণকে না পেলে রাম রাবণের যুদ্ধটা নেহাত ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে ভেবে লক্ষ্মণের খোঁজে গিয়ে দেখি কেলেঙ্কারী টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। লক্ষ্মণ সারা মুখে মাটি মেখে শিব সেজে দাঁড়িয়ে আছে। মাটি ছাড়াও শুকনো পাতা, গাছের ডাল, শিকড় বাকড়, জড়িবুটি কি নেই শেই ক্ষুদ্র শরীরে?  তার ওপরে পাখিদের খাওয়ার জন্য যে জল রাখা হয়, পরিপাটি করে নিজের মাথায় ঢেলেছে। ভিজে সপসপে জামা প্যান্ট। দুটো চোখ আর খুদে দাঁতের সারি ছাড়া তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভদ্র ঘরের ভদ্র সন্তান বলে কেউ দূর কল্পনাতেও ভাববে না। লক্ষ্মণ নয় একে জাম্বুবানের রোলে কাস্ট করা উচিত ছিল। ওর মা এই অবস্থায় তাথৈকে অর্থাৎ লক্ষ্মণকে দেখতে পেলে রাম, হনুমান আর লক্ষ্মণের বনবাস তো নিশ্চিতই, স্বর্গবাস হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।   

কিছু মানুষ জন্মে ধীরে বাঁদরে পরিণত হয়। আর কিছু জন্মসূত্রেই বান্দর হয়। তাথৈ দ্বিতীয় গোত্রের। নিজের ভাগ্যকে ছাড়া কাকেই বা দুষি। এই মুহূর্তে সমস্ত অপরাধের চিহ্ন গায়েব করার তাগিদে আমি রাম, লক্ষ্মণরূপী তাথৈকে চ্যাংদোলা করে তুলি। লক্ষ্মণ এমন একটা কিছু আশা আগেই করেছিল। তাই পিতৃপ্রতিম দাদার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্ভ্রম প্রদর্শন না করে একটা ঝেড়ে লাথি কষায়। ব্যাক কিক। সে লাথি কোথায় গিয়ে লাগে বললে সম্পাদক মহাশয়/মহাশয়া নিশ্চয়ই কাঁচি করে দেবেন, তাই আর লিখলাম না। চোখে দু দন্ডের জন্য সর্ষে ফুল দেখি। লক্ষ্মণের লাথির হাত থেকে বাঁচতে ওকে পাঁজাকোলা করে ধরি। হনুমানরূপী সানাই এদিকে নেহাত অধৈর্য হয়ে জামা ধরে টানাটানি শুরু করেছে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার জন্য। দাঁড়াও সানাই, দেখছ না বোনু মাটি মেখেছে, বলাতে হনুমানরূপী সানাই তার পরমারাধ্য শ্রীরামচন্দ্রকে চড়াম করে মেরে বলে, আমি সানাই নই, হনুমান। তোমাকে যুদ্ধ করতেই হবে। এদিকে লক্ষ্মণ কোলে উঠে ইস্তক মাথা দিয়ে দুম দুম করে হেড মারছে কুশলী কুস্তিগীরের মত। মাথা তো নয় একটা ঝুনো নারকেল! ধনুকের ছিলার মত উল্টোদিকে বেঁকে গেছে আর তারস্বরে চেঁচিয়ে জানান দিচ্ছে ওর মাটি মাখায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে আমি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি। লঙ্কাকান্ড প্রায় পণ্ড হয় দেখে হনুমানও চটাচট মারছে রামকে। আক্ষরিক অর্থে লঙ্কাকান্ড বেঁধে উঠেছে, মানে মঞ্চে নয়, বাস্তবে। আমি রাম না রাবণ, জটায়ু নাকি শূর্পনখা কিচ্ছু মনে পড়ছে না। এর থেকে বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট পালা অভিনীত হলে ভাল ছিল। শেষমেষ হনুমান ওরফে সানাইকেও আর এক হাতে কোলে তুলে নিই। হনুমান ওরফে রাবণ ওরফে সানাই এবং লক্ষ্মণ ওরফে তাথৈ, দুজনকে দু কোলে নিয়ে আমি ঘরে ঢুকে সোজা বাথরুমে চলে যাই। গৃহিণী ফেরার আগে দুটোকে স্নান করিয়ে নিতে হবে। 

মাথায় খানিক জল ঢালায় সানাইয়ের মাথা ঠান্ডা হল। তবে দেখলাম রাবণবধ না হওয়ার শোকটা পুরো ভুলতে পারে নি। দুখী দুখী মুখে বলে, বলেছিলাম বোনুকে খেলায় না নিতে।