আমার তুমি

তুমি দুর আকাশে ঝিনুক হয়ে ফোটো
আমি ঘুম চোখেতে বিভোর হয়ে দেখি
তুমি শিউলি ফুলে শিশির হয়ে ভেজো
আমি তোমার গন্ধ শরীর জুড়ে মাখি

তুমি ঢেউ হয়ে এসে আছড়ে গায়ে পড়ো
আমি নিষ্ঠুর সেই আঘাত বুকে পাই
তুমি ভিজিয়ে দিয়ে আবার ফিরে যাও
আমার একলা বিকেলে তোমার প্রতিক্ষাই

তুমি আকাশ জুড়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরো
আমি মাতাল হয়ে দু চোখ বুজে ভিজি
তুমি দুর পাহাড়ে অলকানন্দা হও
আমি অধীর হয়ে উৎসখানি খুঁজি

তুমি মেঘ-চুলেতে কলাবতি ফুল গোঁজো
আমি ঐ মেঘের দেশে হারিয়ে যেতে চাই
তুমি পুর্ণিমাতে জোৎস্না হয়ে জোটো
আমি প্রাণের পরে স্পর্শ তোমার পাই

তুমি নীল শরীরে শঙ্খিনি সাপ হও
আমি ছোবল পেতে জিভ এগিয়ে দিই
তুমি শীতের দুপুরে কুসুম গরম রোদ
মেখলা, আমি মাদুর পেতে গা এলিয়ে দিই

অহল্যাকে

আজ হেমন্ত।
মহানন্দা নদীর ঘাটে ফুটে আছে ঘেঁটু ফুল,
অনাদৃতা;
একটা তিতির পাখি তার অস্থির ডানায়
পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণ কমলা মেখে পথ ভুল,
অতন্দ্রিতা;
নদীর জলে পা ডুবিয়ে একলা বসে, মেখলা, তোমার কোমর ছড়ানো চুল।
আজ তুমি বিবাহিতা;
আজ তোমার আয়ত দুটি চোখ কান্না ধুধুল।
ওগো অবহেলিতা,
তোমার চোখের ভাষা বোঝেনি যে জন
তোমাতে তবু তারই আজ পূর্ণ অধিকার।
.
সেদিন ছিল ফাল্গুন।
সেদিন তোমার নরম আঙুল ছুঁয়েছিল আমার আঙুল,
তবুও সেদিন অপরিচিতা;
দুরে সুকনার জঙ্গলে ঘরে ফেরা পাখিদের গান আর অজস্র কুরচি ফুল,
অনাঘ্রাতা;
সেই বিকেলে আমার চোখে মহানন্দা, তবু ওই চোখেতে স্বপ্ন বিপুল।
এই ঘাটে বসে তুমি, আমি, না-বলা-কথা আর
আঙুল ছোঁয়া মুখর নীরবতা;
তুমি বাগদত্তা, ব্যথিতা, ভীতা তবুও বুঝি বা প্রতীক্ষায়
অনাগত, অচেনা সে কার চোখের ভাষা পড়বার !
.
হেমন্তের হিমেল হাওয়া হয়ে আজ যদি কাছে আসি,
আবার যদি ভালবাসি
মেখলা, তোমার মেঘলা চুলে জড়াই যদি বন ধুতরো ফুল
এই সূর্য-নেভা-রাতে
জ্বালতে পারো প্রাণের প্রদীপ আমার সাথে?
হতে পারো কলঙ্কিতা?
আজ খরস্রোতা, ভাঙন-পিয়াসী মহানন্দার ঘাটে
ভাঙতে পারো তোমার মিথ্যে সাজানো সংসার?

তোমায় আরও একবার

শ্যাওলার গন্ধের মত নিস্তেজ এক দুপুরবেলা
রূপনারাণের এক নির্জন বালুচরে
একটা ছাতিম গাছের ছায়ায়
তোমার কোলখানা মাথার বালিশ করেছি;
তোমার ভেজা শরীরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ভিজেছি,
সে বহুকাল হল।
.
তারপর বহুবার ওই বালুচর, এই বালুচর
বিধ্বংসী বন্যায় ভেসেছে;
সেই নিস্তেজ শ্যাওলা গন্ধা দুপুরগুলো
আজ নারকীয় আক্রোশে বিষ নিশ্বাস ফেলে;;
আজ প্রেতের মত আমার খুদিত শীতল উপস্থিতি।।
.
সেই ছাতিম গাছখানা গভীর সুষুপ্তি নিয়েছে
নদীটাও অনেক পা সরে গেছে
তবু আজ একটা জল চিঠি এসে বলে গেল –
রূপনারাণের জলে এখনও মিশে আছে তোমার অশান্ত চুম্বন।
.
তাই আজও বিশ্বাস করি
আরও একবার একটা শান্তির দুপুর পাব
আরও একবার তোমার মায়াবি উপস্থিতি রক্তে ছড়াবে উন্মাদনা।
আরও একবার তোমার চোখের শান্তিটুকু শুষে শ্রান্তি মেটাব;
আরও একবার মানুষ হব।
হবই।।

হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে!!!

শ্বাসকষ্ট

পৃথিবীর তাবড় তাবড় পরিবেশবিদদের ডেকে আনা হয়েছে। সাত দিনের চিন্তন শিবির খোলা হয়েছে। বিষয় পরিবেশ দুষণ নিয়ন্ত্রণ করা। পরিসংখ্যান বলছে গত এক সপ্তাহে কোটি কোটি ভারতবাসী শ্বাসকষ্টে ভুগছে। দু চারটে শ্বাসকষ্টে মৃত্যুর খবর-ও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায় নি। কিন্তু হঠাৎ কি করে বাতাসে এতটা দুষণ এল তার কারণটা খুঁজে বের করতে বড় বড় বিজ্ঞানীরা শক্ত শক্ত অঙ্ক কষছে আর দাঁড়ি চুলকোচ্ছে। ওজোন স্তরেই কি ছিদ্র হল না কি ফসিল ফুয়েল পোড়ানোর জন্য বাতাসে কার্বন কণার পরিমাণ বৃদ্ধি সেই নিয়ে জোরদার তর্ক লেগেছে। কেউ কেউ ম্যাটল্যাব সিমুলেশান বানিয়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাব প্রেডিক্ট করার চেষ্টা করছে। কেউ বা হ্যাডুপ ব্যাবহার করে একটা বিগডাটা ডাটাবেসে-এ বিশ্বের শেষ এক হাজার বছরের আবহাওয়া আর জলবায়ুর ডাটা ফীড করে হিউমিডিটি লেভেল-এর ওপর প্রেডিক্টিভ অ্যানালিসিস জব চালাচ্ছে। রাজনীতিকরা সব বলছে “এই নাকি আচ্ছে দিন?” এই দুষিত বাতাসের জন্য RAW পাকিস্তান অ্যাংগলটাও খতিয়ে দেখছে। কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না বাতাস হঠাৎ এত ভারী আর আর্দ্র হয়ে যাওয়ার কারণটা ঠিক কি? কেন শ্বাস নিতে গেলেই মনে হচ্ছে বাতাসে অক্সিজেন-এর সঙ্গে কি যেন মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। শেষমেষ একটা চ্যাঙড়া ছোঁড়া, সে কয়েকদিন যাবৎ এক ক্ষীণকটি সুন্দরীর বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছে কিন্তু ঠিক লাইন করতে পারেনি, সে বললে “আপনারা দেখছি বড়ই বেবুক। আমি জানি কি হয়েছে। সক্কলে সমস্বরে বলল “কি, কি, কি হয়েছে ভাই?” ছেলেটা বলল “ভয়ের কিছু নেই। সাময়িক সমস্যা। কেটে যাবে। 14th February-r পর। February মাসে রোজ রোজ এই রোজ ডে, টেডি ডে, চকলেট ডে, ভ্যালেন্টাইনস ডে এই সব সাপ-ব্যাঙ দিনের প্রভাবে বাতাসে ভালবাসার পরিমাণ একটু বেড়ে গেছে। তাই বাতাস একটু ভারি আর ভেজা। ভালবাসাটা কর্তব্য হয়ে গেলে সেটা পাপের থেকেও ভারি বোঝা। 14th February টা কেটে গেলেই দেখবেন দখিনা বাতাসের মত ফুরফুরে আর অ্যানুয়াল-পরীক্ষা-শেষ-হওয়া-মনের মত হালকা হাওয়া আবার বইবে।

ষড়যন্ত্র

নতুন দিল্লী থেকে পঞ্চাশ মাইল দুরে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন কক্ষে বসেছে আজ এই মীটিংটা। সর্বোচ্চ স্তরের গোপনীয়তা রাখা হয়েছে পুরো ব্যাপারটায়। গোপনীয়তা রক্ষার সব ব্যাবস্থা সুষমা স্বয়ং তদারকি করে নিয়ে মাথা নাড়লেন হালকা করে। দরজা খুলে দেওয়া হল। এক এক করে ঢুকছেন সকল মন্ত্রীরা আর সর্বোচ্চ পদাধিকারী আই-এ-এস অফিসাররা। তিন তিনটে চেকপয়েন্ট পেরিয়ে আসতে হচ্ছে সকলকে। একটায় বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ, পরেরটায় রেটিনা স্ক্যান আর তার পরেরটায় ডি-এন-এ পরীক্ষা করা হচ্ছে। একে একে এসে সবাই নিজের নিজের নির্দিস্ট আসন গ্রহণ করল। রাজু সকলকে সংক্ষেপে বলে দিল আজকের এই টপ সিক্রেট মীটিং-এর আলোচ্য বিষয়খানা। তারপরেই হাতে নমস্কার মুদ্রা নিয়ে তিনি ঢুকলেন। পাজামা, কুর্তা পরিহিত, ট্রিম করা ফ্রেঞ্চ-কাট দাঁড়ি। সঙ্গে সঙ্গে সব গুজগুজ ফিসফিস বন্ধ। গম্ভীর স্বরে বললেন


মিত্রঁ, আজকে আপনাদের এখানে আসার মহত্মপুর্ণ কারণ নিশ্চয়ই রাজু আপনাদের জানিয়েছে। মাথা নাড়ে সবাই। পরিকল্পনাটা সার্থক করতে আপনাদের কাউকে কাউকে হয়তো প্ল্যানটা না জেনেও কিছু কিছু কাজ অলরেডি করতে হয়েছে। রাজু সব রেডি তো?


হ্যাঁ, দাদা। সব ব্যাবস্থা হয়ে গেছে।


যাচ্ছেন যে সে খবর পাক্কা?


হ্যাঁ, দাদা। শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত। আমরা এয়ার ইন্ডিয়ার সাথে কনফার্ম করেছি।


হুমম, কটার ফ্লাইট?


দাদা, পরশু..দিল্লী থেকে উড়বেন রাত নটায়। সিধে ডি সি।


গুড। সুষমা? পাসপোর্ট -এর ব্যাপারটা?


ইয়েস স্যার। সব ব্যবস্থা হয়ে আছে। আমরা “ছেলে পাঠিয়ে” আসল পাসপোর্টটা বদলি করে সে জায়গায় জাল পাসপোর্ট রেখে দিয়েছি। দিল্লী থেকে উনি খেচর হলেই পাসপোর্ট বিভাগে আমাদের চর পাসপোর্টটাকে ইনভ্যালিড বলে ঘোষণা করবে।


আমাদের হাতে কত সময় আছে?


স্যার, মাস তিনেকের বেশি ইনভ্যালিড রাখতে পারা খুব মুস্কিল?


“তিন মাস। হুমম। ওটাকে ছয় করার চেস্টা করুন। আর ওদিকে?” রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংস -এর প্রধান-এর দিকে তাকান তিনি।


আমরা সব রকম চেস্টা করছি স্যার। ওনার একটা ছবি আর ওনার আঁকা একটা ছবি দেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্টকে। আমাদের গুপ্তচর কনফার্ম করেছে যে প্রেসিডেন্ট অনেকক্ষন ধরে ছবি দুটো দেখেছেন। মহিলাদের ওপর ওনার আবার চিরকাল-ই একটু ব্যথা। So we think we are on target, sir.


গুড। ওনার তো তৃতীয় পক্ষ আছে। চতুর্থ নেবেন? কি মনে হয়? আমাদের শুধু তিন মাস সময় আছে এই সম্পর্কটা দাঁড় করানোর জন্য।


স্যার, সাধ্য মত চেস্টা চালাচ্ছি। মেলানিয়া যাতে ওনাকে সতীন বলে মেনে নিতে পারে তার জন্য আমাদের বেস্ট ম্যান মনবীরকে লাগিয়েছি।


গুড। গুড। পুরো ব্যাপারটার গোপনীয়তা যেন সর্বোচ্চ স্তরে থাকে।


অরুণ বলল “দাদা, বিমুদ্রিকরণ-এর থেকেও বেশী গোপন রাখা হচ্ছে।”


এতক্ষণে হাসি ফোটে তাঁর মুখে। বলেন “রাজু, তাহলে কি মনে হয়, প্রেসিডেন্টের সাথে ওনার বিয়েটা হয়ে উনি ওখানেই সেটল করে গেলে, মমতাহীন অখিল ভারতে আমাদের জয়ধ্বজা ওড়াতে পারবো?”


“দাদা, অখিল ভারত দখলের পথে একটাই বাধা – অখিলেশ।” বললেন রাজনাথ।

“ও নিয়ে ভেবো না। মোলায়েম করে ওর পেছনে হাতা দেওয়ার জন্য ওর বাবা মুলায়মকে নিয়েছি টীমে।”

অমিয়র আত্মহত্যা

কাল সন্ধে থেকেই অমিয়-র মেজাজটা খিঁচড়ে আছে। সন্ধেবেলা পাশের বাড়ির পরাশর কাকু এসেছিল। সাথে মিনিও। পরাশর কাকু বলল ওরা কাল-ই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ওনার নাকি দিল্লি ট্রান্সফার হয়ে গেছে। একমাত্র মিনির সঙ্গই এ পাড়ায় ভাল লাগত অমিয়র। বেশ সুশ্রী আর ছিপছিপে। আর একটু শান্তশিষ্ট লাজুক মতন। ওদের দুজনের মধ্যে কত কথা হয়। লোকাল পলিটিক্স থেকে বলিউড পর্যন্ত। মিনির ওপর কেমন একটা অধিকার বোধ জন্মে গেছিল অমিয়র। এই তো সেদিন সে একটা পার্টিতে গেছিল। মিনিরাও ছিল সেখানে। অরিত্র বলে একটা হুমদো ছেলে খুব ঢলে ঢলে কথা বলছিল মিনির সাথে। একদম সহ্য হয় নি অমিয়র। পরে মিনিকে সে ঐ সব আটভাট ছেলেদের সাথে মিশতে বারণ-ও করে দিয়েছিল।  সেই মিনিরাই কিনা চলে যাবে আজ। আর কোন যোগাযোগ থাকবে না। ভেবে কাল রাতেও লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে সে।


সকালবেলা উঠে একটু গুটিসুটি মেরে বসে টিভিতে মিকি মাউস-এর একটা পর্ব দেখছিল অমিয়। কি বোকা বোকা গল্প…কোন মানে হয়? ভীষণ বিরক্তিকর। ছোটখাট বলে আমাদেরকে এরা কি ভাবে কে জানে? আনমনা হয়ে ভাবছিল অমিয়। রবিবারের সকালে ছুটির মেজাজটা ঘরের আনাচে কানাচে ফাল্গুনি হাওয়ার মত তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে।  অমিত কাকু বেরোচ্ছে বাজারে। কাকিমা চেঁচিয়ে বলছে “পাঁঠার মাংসটা দেখে নিও, গেল রোববার হাড়-ই সার ছিল। আর বুড়ো লাউ একদম আনবে না, আনলে ওটা তোমার মাথাতে ভাঙব।” প্রতি রবিবার এই এক-ই চিরাচরিত ছবি। কি বিরক্তিকর? উফফ…অমিয় আবার কার্টুনে মনোনিবেশ করে। সবে টিভিতে মিকি মিনিকে কি একটা পাকে ফেলেছে, এমন সময় অন্তুদা এসে, কথা নেই বার্তা নেই, বললো “কি মিস্টার হুলুস্থুলু, সকাল সকাল বসে বসে কার্টুন দেখা হচ্ছে। বলেই ওকে এক ঝটকায় তুলে নিয়ে সোফায় ওর জায়গাটাই দখল করে বসল। আর তারপর অমিয়কে কোলে বসিয়ে ওর গালে গাল ঘষতে লাগল। এই কোলে বসা আর গালে-গাল-ঘষা আদর একদম পছন্দ নয় অমিয়র। সেটা তাও মানা যায় কিন্তু এই হুলুস্থুলু নামটা? মোটেই পছন্দ নয় তার। সে খেলার সময় এমন কিছু হুলুস্থুলু কান্ড করে না যে তাকে হুলুস্থুলু বলে ডাকতে হবে। অন্তুদার বয়স কত আর? সাত হবে। অমিয়রও বয়স নয় নয় করে পাঁচ হয়ে গেছে। এই মাত্র দু-এক বছরের বড় দাদার এই জ্যাঠামো মোটেই সহ্য হয় না। অন্তুদা না হয় ছোটো। সে তো আর ছোটো নয়, রীতিমতো প্রাপ্ত বয়স্ক। কোল থেকে নেমে অমিয় এক ছুটে নিচের রান্না ঘরে। অনু কাকিমা মাছ ভাজছে। এই মাছ ভাজার গন্ধটা শুঁকলেই অমিয়র ভেতরটা কেমন একটা করে..খুব ভালবাসে ও মাছ ভাজা খেতে। খুব সাবধানে পা টিপে টিপে গিয়ে একটা মাছ ভাজা নেওয়ার চেস্টা করেছিল। কিন্তু অনু কাকিমা দেখতে পেয়েই এমন তাড়া দিল যে ওকে তর তর করে পালাতে হল। যাক গে যাক। পরে নিশ্চয়ই একটা পাওয়া যাবে। ও তো আর আদেখলে নয়। এখন গিয়ে কোথাও খেলা-টেলা যাক। রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে অমিয় ঠাকুরঘরে এল। এটা ওর ভারি প্রিয় জায়গা। অনেক ইন্টারেস্টিং জিনিস আছে এখানে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখার জন্য। ঠাকুরের থালা গ্লাস গুলো বেশ ছোট ছোট।

ঠাকুররা যদি এত বড়, তবে তাদের খাবারের থালাগুলো এত ছোট ছোট হয় কেন কে জানে? thinking

শুনেছে ঠাকুররা নাকি অনেক বড় হয়। সারা আকাশ জুড়ে থাকে। কিন্তু ওদের খাবার থালা বাসন এত ছোট হয় কেন বোঝে না অমিয়। যাকগে যাক। সে ছোটখাট মানুষ। তাই এই ছোট ছোট থালা গ্লাস গুলো তার পছন্দের। সে প্রথমেই পেড়ে ফেলল প্রসাদ রাখার ছোট্ট থালাটা। দুটো নকুলদানা গলে আটকে ছিল। নখ দিয়ে খুঁটে খেয়ে ফেলল। নকুলদানা বেশ ভাল খেতে। কিছুক্ষণ ওটা নিয়ে খেলার পর ঠাকুরের একটা সিংহাসন ছিল সেইটা পেড়ে ফেলল। সেটাকে নিয়ে উলটে পালটে কিছুক্ষণ খেলা হল। ঠাকুরের আসনটা গলায় জড়িয়ে আর খুলে আরও খানিকক্ষণ কাটলো। এরপর বোর হয়ে গেলো। বিরক্তিটা আবার ফিরে আসছে। মিনি চলে যাবে। ছাদে যাওয়া যাক। ছাদে গিয়ে মিনিকে ডাকলে নিশ্চয়ই ও ও বাড়ির ছাদে উঠে আসবে। কিন্তু বিধি বাম! ঠাকুর ঘর থেকে বেরনোর সময় কান্ডটা ঘটল। বসার ঘরের মধ্যে দিয়ে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি। হঠাৎ করে পায়ে লেগে বসার ঘরের দরজার সামনে থাকা দামি ফুলদানিটা পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে চুরচুর। আর যায় কোথায়? অনু কাকিমা ছুটে এল। সে কি বকুনি! একটা দুটো চড়-থাপ্পড়ও পড়ল পেছনে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। সবাই খারাপ। কেউ ভালবাসে না। অমিত কাকু ফিরে এসে ভাঙ্গা ফুলদানিটা দেখে তো রেগে আগুন। প্রচণ্ড বকাবকি করল। এমন কি শাস্তি স্বরুপ শোবার ঘরে এক ঘন্টা বন্ধ করে রাখলো। আর অন্তুদা ওর বকুনি দেখে কিনা পুরো সময়টা ফ্যাক ফ্যাক করে হাসল? অমিয় বুঝে গেছে। সে তো এ বাড়ির ছেলে নয়। তাই। অন্তুদার পায়ে লেগে ফুলদানি ভাঙলে এই ভাবে বকতে, শাস্তি দিতে পারতো ওরা? কক্ষনো না। বলত “কতই বা বয়স। পায়ে লেগে পড়ে গেছে। ছেড়ে দাও।” অমিয় জানে অনেক ছোটবেলায় তাকে এ বাড়িতে একটা অনাথ আশ্রম থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেই থেকে সে এই বাড়িতেই আছে ছেলের মত। মুখে যতই দেখাক না কেন, এরা কখনই অমিয়কে বাড়ির ছেলে ভাবে না। সৎ ছেলে সে। তাই এত বকুনি। অন্তুদারও সৎ ভাই। তাই অমন করে হাসতে পারল সে ওর দুর্দশা দেখে। ধুৎ, এই অনাথ, আশ্রিত মার্কা জীবন বাঁচার কোন মানেই হয় না। তাও মিনি চলে যাবে আজ। জীবনের কোন মুল্যই নেই আর। কার জন্য বাঁচবে সে? কিসের জন্য বাঁচবে?  আত্মহত্যা..হ্যাঁ আত্মহত্যা-ই করতে হবে। কোন একটা সিনেমায় দেখেছিল অমিয়। আত্মহত্যা। এই তো অমিয়দের এই বাড়িটাই তেতলা। চারতলার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলে নিশ্চয়ই মরতে পারবে সে। রাগটা থাকতে থাকতেই করতে হবে। নয়তো মনের জোরটা পাওয়া যায় না। এখনই অন্তুদা কিম্বা অনুকাকিমা এসে আদর করে দিলে রাগটা পড়ে যাবে। দেরি করা যাবে না। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে চার তলার ছাদে উঠে যায় অমিয়। ছাদের রেলিংটার ওপরে ওঠে একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে। ওপর থেকে নিচের রাস্তাটা একবার দেখে অমিয়। কি ছোট ছোট খুদে লাগছে সব কিছু। দূর থেকে দেখলে সবই ছোট। না, এসব ভাবলে চলবে না। অনু কাকিমার মারটা মনে পড়ে। অমিত কাকুর বকুনিটা। অন্তুদার হাসি। মিনির ঢলো ঢলো মুখটা। নাহ বেঁচে থাকা অনর্থক। মরতে তাকে হবেই। চোখ বুজে নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে দেয় অমিয়। তীব্র গতিতে তার তুলতুলে শরীরটা এসে মাটি ছোঁয়। ধুপ করে একটা শব্দ। তারপর সব চুপ।


মাটিতে পড়ার পর বিশ সেকেণ্ড মতো পড়ে থাকে অমিয়। হুমম, এতক্ষণে নিশ্চয়ই মরে গেছে সে। একবার উঠে দাঁড়াতে চেস্টা করলেই বোঝা যাবে। এক লাফে উঠে দাঁড়ায় অমিয়। ঠিক বুঝতে পারে না মরেছে কিনা। পরীক্ষা করতে নিজের গায়ে একটা আঁচড় কাটে। লাগছে। তবে কি সে বেঁচে আছে? নাকি মরা লোকেদেরও ব্যাথা বেদনা থাকে? বেঁচে থাকলে যন্ত্রণা হওয়া উচিত এত উঁচু থেকে পড়লে। হাতে পায়ে মাথায় সব জায়গায় ব্যাথা অনুভব করার চেস্টা করে। নাহ কোথাও কোন ব্যাথা নেই। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে সে বেঁচেই আছে।
“মরণ!!! আমার মরণ-ও নেই। বেড়ালরা বোধ হয় যমেরও অরুচি।” মনে মনে বলে অমিয়। আর ভেবে কি হবে? রাগটাও এবার বেশ পড়ে এসেছে। তাই আজ আর চেস্টা করা যাবে না। “যাইগে, মিনির সাথে একবার দেখা করে আসি। মানুষদের ফেসবুক-এর মত বেড়ালদের একটা social networking site আছে। কিটিবুক বলে। ওখানে মিনিকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিই। তাহলে ওর সাথে পরেও যোগাযোগ রাখা যাবে।” ল্যাজ দিয়ে গায়ের ধুলো ঝেড়ে অমিয় মিনির বাড়ির দিকে যায়। “ও হ্যাঁ, ওকে বলে দিতে হবে যেন কিটিবুকে ঐ হুমদো হুলো অরিত্রটার friend request একদম  accept না করে।” মনে মনে ভাবে সে।

সমাপ্ত

cat

হতচ্ছাড়া

Office যাওয়ার আগে নিত্যনৈমিত্তিক একটি ঘটনাকে এই মজার ছড়াটায় একটু ধরার চেষ্টা করেছি। আপনাদের সকলের জীবনেই এটি কখনো না কখনো ঘটেছে। তাই আশা করি relate করতে পারবেন।


মোবাইল মহাশয় বড়ই সদাশয়,
যখন দরকার হয়, ডাকলেই দিয়ে দেয় সাড়া
মানিব্যাগ হতচ্ছাড়া, যদি করেছ কাছছাড়া,
লুকোচুরি খেলে তবে তারা
অফিস যাওয়ার কাল, সক্কাল সক্কাল,
হন্যে হয়ে তারে খুঁজি
এর থেকে সোজা করা, সোনার হরিণ ধরা
ট্রেন খানা মিস হল বুঝি
ঘড়ি ঘড়ি দেখি ঘড়ি, বাড়িঘর মাথায় করি,
কেমনে পাইব তার দেখা
হাত পা-ই হল নাকি, নেই কোথা খোঁজা বাকি,
নাকি শেষে মেলে দিল পাখা
বৈঠকখানা ঘুরে খুঁজি তাকে অন্তপুরে,
স্নানঘরে যাই তারপরে
বুঝি বা হারাল তবে, “কার্ড গুলো কি যে হবে”,
বুক ভয়ে দুরু দুরু করে
শেষমেশ খুঁজেখাজে, সোফার গদির খাঁজে
পেয়ে তারে সুখে গান গাই
“নয়ন সমুখে প্রভু থেকো, নয়নের কভু
মাঝখানে নিয়ো নাকো ঠাঁই”

ডাবল খাওয়া দাওয়া

foodওগো শুনছ, হ্যাঁ, আমি তোমাকেই বলছি। বলি, আজকে বাটি চচ্চড়ি বানিয়েছ তো?  বাটি চচ্চড়িটার জন্যই আর একবার তোমায় বিয়ে করতে পারি।


হ্যাঁ বানিয়েছি গো বানিয়েছি..জানি না আবার। বাটি চচ্চড়ি না হলে তোমার তো জন্মদিনের খাবার মুখে রুচবে না। হাড়মাস তো সারা জীবন জ্বালিয়ে খেলে..

কি ঐ ভেজিটেবিল তেলে নাকি?

না গো, বাবা না। একদম কাচ্চি ঘানি সর্ষের তেলে কাঁচালঙ্কা ছিঁড়ে ফোড়ন দিয়ে বেশ কষিয়ে রেঁধেছি। তোমার যে রকম পছন্দ।। খুশি?

বাহ বেশ বেশ। আর আলু পোস্ত?

তাও হয়েছে। তোমার আর আজকের দিনে সাধ অপূর্ণ থাকে কেন? আলু খাওয়া তোমার মানা। তাও বানালাম। লোভের মাথায় এক বাটি খেয়ে বোসো না।

উফফ, জমে যাবে আজকের খাওয়াটা। ভাবতেই পারছি না। আর ছানার পায়েস?

সে আর বলতে। ছানার পায়েস তো তোমার বরাবরই হট ফেভারিট। সেই একুশ বছর বয়স থেকে নেই নেই করে আজ আমার হয়ে গেল চুরাশি। কোনো জন্মদিনে ছানার পায়েস পাওনি, এমনটা হয়েছে? আর আজ তো তোমার শুধু জন্মদিন নয় দু-দুটো স্পেশাল অকেশান। তাই ছানার পায়েস না করে উপায় কি বলো?

আহা ঐ একটি পদ তুমি মায়ের থেকেও ভাল রাঁধো..সেই আমার ২৮ বছর বয়স থেকে খেয়ে আসছি। তবে আজকাল তেমন স্বাদ হয় না। না, না তোমার দোষ নয়। সুগার-ফ্রী দিয়ে ছানার পায়েস যেন রায়তা দেওয়া ফুচকা..

তুমি বাপু বুড়ো ভাম হয়ে গেলে। তাও নোলাটা একটুও কমল না। বাচ্ছা ছেলের মত আবদার করছ। যাকগে যাক। আজ বেশ করে চিনি দিয়েই তোমার পসন্দমাফিক পায়েস বানিয়েছি, বুঝলেন মিস্টার হ্যাংলা??

উফফ, জিভে জল এসে যাচ্ছে। চনচনে খিদেটাও পাচ্ছে। কিন্তু তুমি বুড়ো ভাম কাকে বলছ হ্যাঁ? গেল সোমবার পর্যন্ত আমি দু ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে আসিনি।

সেটা কোন কৃতিত্বের কম্ম নয়। পরিতোষ ডাক্তার হাজার বার বারণ করেছে অত ভারি ব্যাগ বইতে..

প্রতি রবিবার পিকলু বাবুকে সাইকেলে করে ঘুরিয়ে নিয়ে আসিনা? তারপর আমাদের বাগানে ওর সাথে ঝাড়া ১০ ওভার-এর ক্রিকেট খেলি..ও ছোট বলে ওর দুটো আউট-এ আউট হয় আর আমি ওকে জেতাতে ইচ্ছে করে আউট হয়ে যাই। শুধু ওর খুশি মুখে “দাদু তুমি হেরে গেছো, হেরে গেছো” শোনার জন্য।

“দাদু তুমি হেরে গেছো, হেরে গেছো”

হুম, বিশাল বাহাদুরির কাজ করো। এই বয়সে অত দৌড়ঝাঁপ ভাল? আচ্ছা তুমি কোন আক্কেলে পিকলুকে কাঁধে তুলে গাছ থেকে বাতাবি লেবুটা পাড়তে গেলে বলো তো? যদি পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙতে, তাহলে কি হত হ্যাঁ? সেই তো এই শর্মাকেই সেবা শুশ্রুষা করতে হত নাকি?

আরে কি করব? জানো তো ওর আব্দারের কাছে আমি চিরকালই অসহায়..ওর মুখের খুশির ঝলকানিটা দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না। বায়না করল  “দাদু, বাতাবি লেবু পাড়ব চল না”। তাই গেলাম..অনেক চেষ্টা করেও আঁকশি দিয়ে ডালটার নাগাল পেলাম না..দাদুভাই এর মুখটা ছোট হয়ে গেল। তাই বললাম “দাদু ভাই, তুমি আমার কাঁধে চড়বে আর আমি বীর হনুমানের মত এক লাফাব। তুমি চট করে ডালটা ধরে টেনে আনবে নিচে। তারপর আমরা বাতাবি লেবুটা ছিঁড়ে নিয়ে তোমার দিম্মাকে দেব..দিম্মা ভাল করে নুন, লঙ্কার গুঁড়ো দিয়ে মেখে ফ্রীজে রেখে দেবে। আমরা সন্ধেবেলা খাব। কেমন আইডিয়া, দাদুভাই?

খুব মজা হবে দাদু..

তাহলে বলে দাও বাতাবি লেবুর ইংরেজি আর সংস্কৃত নাম কি..কি শিখিয়েছিলাম?

দাদু, ইংরেজি হল গ্রেপফ্রুট আর সংস্কৃত হল…উমম…মধুকর্কটিকা।

“That’s my boy” বলে ওকে কাঁধে তুলে লাফালাম উঁচু ডালটা লক্ষ করে। নামার সময় একটু বেসামাল হয়ে গেলাম। তাও দাদুভাইকে সাবধানে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম। ঠিক ডালটা ধরতে পারেনি দাদুভাই। তাই বাতাবি লেবুটা…বুকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল। তোমার মুখটা মনে পড়ছিল। দশ দিনের জন্য বিরানব্বইটা কমপ্লিট করতে পারলাম না। সে যাক। ”জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কথা কবে”। বিধান বাবুর শুনেছি জন্মদিন আর মৃত্যু দিন একই দিনে। আমার জন্মদিন আর কাজের দিনটা একদিনে হল। সে এক যা হোক ভালই হল। ডাবল খাওয়া দাওয়া।smoke