সেল্ফি স্বরূপ

selfie

স্ব-বাবু মহারাজ যযাতিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মহারাজ এই যে দিন-রাত অনবরত সকলের মুখে একটাই শব্দ শুনতে পাচ্ছি। “সেল্ফি”। এটি কি রূপ? এটি খায় না অঙ্গে মর্দন করে?”

মহারাজ যযাতি বললেন –

উত্তম প্রশ্ন বৎস। খুবই রুচিকর আর আকর্ষণীয় এই বস্তু। ইহার পেছনে ইতিহাসও অতি মনোরঞ্জক। ধরাধামে কলিকালে এক ধরনের প্রাণির উদ্ভব হয়েছে যারা নিজেদের মানুষ বলে দাবি করে। আকৃতিগত ভাবে মানুষদের সাথে সাদৃশ্য থাকলেও বাকি সকলই ভীষণরকম বিসদৃশ। আসল মানুষ যেখানে ফুল, পাখি, গাছ, পাহাড়, নদী দেখতে ভালবাসত এই মনুষ্য-সদৃশ জীব শুধু নিজেদেরই দেখতে ভালোবাসে। আমার অনুমান এরা বেদান্তের “আত্মানং বিদ্ধি” অর্থাৎ “নিজেকে জানো” এই মহান শ্লোকটির অনুসারি। তাই এরা নিজেকে জানার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন কোণ থেকে, বিভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে দেখতে উৎসাহী। এই নতুন প্রজাতির মানুষকে উত্তরমানব বা প্রায়-মানব বলা হয়। নিজেকে জানার এই ইচ্ছা এদের মধ্যে ক্রমে ক্রমে প্রবল থেকে প্রবলতর এবং অনধিক্রম্য হয়। প্রথম প্রথম এরা নিজেকে দেখার সাধ পুর্ণ করতে চিত্রকরকে দিয়ে নিজেদের চিত্রিত করাতো। অর্থাৎ নিজের ছবি আঁকাত। কিন্তু সে অতি সময় সাপেক্ষ ও ব্যায়-বহুল বলে বেশিরভাগ প্রায়-মানবকেই আয়ানায় নিজের মুখ দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হত। পরে এরা এদের উর্বর মস্তিষ্ক খাটিয়ে এক ধরনের যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলে যার নাম “চিত্র বন্দি যন্ত্র”। অর্থাৎ এটা এক ধরণের ছবি ধরার ফাঁদ। এই অত্যাশ্চর্য যন্ত্রের সাহায্যে যে কোন দৃশ্যকে ফাঁদে ফেলে বাক্স-বন্দি করা যায়। কোন কিছুর দিকে এই যন্ত্র তাক করে একটি বোতাম টিপলেই ব্যাস। সুড় সুড় করে সে দৃশ্য এসে বাক্সের মধ্যে ঢুকে যাবে, সাথে সাথে বাক্সের দরজা বন্ধ আর ছবি বাক্স-বন্দি। সে ছবি তখন বাক্সের মধ্যে যতই ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার করুক না কেন, বাক্স থেকে বেরোনর কোন পথ নেই।

কোন কিছুর দিকে এই যন্ত্র তাক করে একটি বোতাম টিপলেই ব্যাস। সুড় সুড় করে সে দৃশ্য এসে বাক্সের মধ্যে ঢুকে যাবে, সাথে সাথে বাক্সের দরজা বন্ধ আর ছবি বাক্স-বন্দি। সে ছবি তখন বাক্সের মধ্যে যতই ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার করুক না কেন, বাক্স থেকে বেরোনর কোন পথ নেই।

কিন্তু প্রথম প্রথম সে যন্ত্র আয়তনে বৃহৎ হওয়ায় নিজের দিকে তাক করে বোতাম টেপার সুবিধে হত না। তখন সাগরে, পাহাড়ে জাদুঘরে, বাজারে সর্বত্র যেকোন চেনা-অচেনা-অর্ধচেনা লোক দেখলেই এই প্রায়-মানবদের বলতে শোনা যেত “দাদা, আমার একটা ছবি তুলে দিন না” বলে তার অনুমতির অপেক্ষা না করেই সেই ছবি বন্দি করার কলটা তার হাতে তুলে দিয়ে হাসিমুখে, ঘাড় বেঁকিয়ে বিভিন্ন নৃত্য বিভঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ত। এই ভাবেই কিছুকাল ধরে এরা নিজেকে দেখার এবং জানার তৃষ্ণা মেটাচ্ছিল। কিন্তু অপরের সাহায্যের প্রয়োজন থাকায় সর্বতোভাবে নিজেকে জানতে পারছিল না অর্থাৎ যথেস্ট পরিমাণে নিজের ছবি তুলতে পারছিল না এবং তদহেতু অবসাদে ভুগছিল। ক্রমে ক্রমে এই যন্ত্র ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে একটি আঙ্গুর ফলের মত ছোট হল। এবং প্রায়-মানবদের আর এক আবিষ্কার দুরভাস যন্ত্রের মধ্যে স্থান পেল। তখন ঐ যন্ত্র নিজের দিকে তাক করেও নিজের চিত্র বাক্স-বন্দি করা সম্ভব হল। তখন প্রায়-মানবেরা সর্বপ্রকারে নিজেকে জানতে প্রয়াসী হল। সময়-অসময়, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নায় এরা নিজেদের পানে ঐ যন্ত্র তাক করে নিজেদের ছবি তুলতে লাগল। ইহাই “সেল্ফি”। অন্যের সাহায্য ব্যাতিরেকে নিজের স্বরুপ উদঘাটন করতে পেরে ইহাদের আনন্দের অবধি থাকল না। তখন মন্ত্রিমশাই থেকে মুচি-কসাই, টাটা-বিড়লা থেকে গরিব চা-ওয়ালা, রাজনীতিকার থেকে চোর পকেটমার, রাজা-গজা থেকে ভুমিহার প্রজা, কেস্ট-বিস্টু থেকে পটল, কেয়া, মিস্টু সকলেই ঘুমনোর সময়টুকু ছাড়া সর্বক্ষন সেল্ফি তুলতে থাকল।

তখন মন্ত্রিমশাই থেকে মুচি-কসাই, টাটা-বিড়লা থেকে গরিব চা-ওয়ালা, রাজনীতিকার থেকে চোর পকেটমার, রাজা-গজা থেকে ভুমিহার প্রজা, কেস্ট-বিস্টু থেকে পটল, কেয়া, মিস্টু সকলেই ঘুমনোর সময়টুকু ছাড়া সর্বক্ষন সেল্ফি তুলতে থাকল।

এমনকি কিছু কিছু প্রায়-অতিমানব গতিমান ট্রেন-এর সামনে বা উঁচু ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে সেল্ফি দ্বারা নিজেকে জানার প্রয়াস করে হাসি মুখে প্রাণ বিসর্জন দিতেও পিছপা হল না। শুধু তাই নয়, ইহারা এই পর্বত প্রমাণ সেল্ফি বা নিজস্বি সকলকে ইহাদের আর একটি আবিষ্কার আন্তর্জালের মাধ্যমে মুহুর্তের মধ্যে মর্তলোকের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে একই সাথে এরা সকল ভুভাগে দৃশ্যমান হল। এবং এক ধরনের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সবাই একে অপরকে অপূর্ব সুন্দর কিম্বা সুন্দরী বলে বাহবা দিয়ে নিজেদের আত্মগরিমা পুনঃ পুনঃ উজ্জীবিত করতে থাকল। তখন প্রায়-মানবেরা স্বোহম অর্থাৎ “আমিই সেই ব্রহ্ম” সেই পরম বোধে উত্তীর্ণ হয়ে আত্মজ্ঞানী হল। সচ্চিদানন্দের কৃপায় সৎ অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে নিজের চিৎশক্তি অর্থাৎ ইচ্ছাশক্তির সহায়তায় সেল্ফি আবিষ্কার করে এই প্রায়-মানবেরা আনন্দ লাভ করল এবং অনন্ত-আনন্দ-কারণ-সাগরে নিমজ্জিত হল।

বিশ্বায়ান এসে কেড়ে নিয়ে গেছে সব রুপকথাদের। যা কিছু সুশীল, সুললিত, যা কিছু যত্নলালিত তার কঙ্কালের ওপরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি আমরা আর আমাদের অতৃপ্ত প্রেতাত্মারা। চোখে শুধু ঘৃণা, অবিমিশ্র ঘৃণা – বামেদের ডানেদের প্রতি, ডানেদের বামেদের প্রতি, বিশ্বাসীদের অবিশ্বাসীদের প্রতি, অবিশ্বাসীদের বিশ্বাসীদের প্রতি। ক্লান্ত নগর, তোমার ইঁট, কাঠ, সিমেন্টও বুঝি আমাদের থেকে বেশি প্রানবন্ত আজ। তারাও বুঝি উপহাস করে আমাদের এই মৃত অস্তিত্বকে।

বেয়াদব আওয়াজ

পাথর দিয়ে যত্ন করে বাঁধিয়েছি মনের ঘাট
রূপকথারা আসে না আর আজ
কান্না? সে তো মেয়েদের শোভা পায় –
এমনই শিখিয়েছে আমায় এই বেশ্যা সমাজ।
সামনে দিয়ে সোজা হেঁটে চলে গেলাম
যেন আমি “চির উন্নত শির”,
যেন আমি মিলিটারি “বুটের পরে বুট”
আমার উগ্র সুগন্ধে স্টেশানের বাতাস মদির।
“ক্যান ইউ প্লীজ হেল্প মী? আই নীড টু ইট”
এখন ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে …
খেতে পায় না? যত্ত রাবিশ…শালা বজ্জাতের দল
বাড়িতে গিয়েই পাউডার শুঁকবে প্রত্যেকে।
মাথার মধ্যে আর একটা আওয়াজ বলে
হয়ত পাউডার শুঁকবে কিন্তু খেতে বোধ হয় পায়না বারো মাস
হয়ত খেতে না পেয়েই ছোট্ট বয়সে
করেছিল পাউডার শোঁকার অভ্যাস।
খেতে পেলে কি স্টেশানের বাইরে দাঁড়িয়ে
শিকাগোর শীতে বরফ গলা হাওয়ার ঝাপ্টা নিত?
খেতে পেলে কি আমার মতো শুয়োরের বাচ্চার
কাছে মাথা নোয়াতো?
ট্রেনে এক সোনালি চুলের পেছনে বসে আলগোছে রূপপান করি
আর ফিদেল কাস্ত্রোর লেখার পাতা ওল্‌টাই

আওয়াজটাকে যে মারতে হবে। এখুনি মারা চাই।

শিরোধার্য দাড়ি

rabiএই যে বড়দা, হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই বলছি, এই একটু উজ্জয়িনীর রাস্তাটা বাতলে দিতে পারেন?

আমিও সেই দিকেই যাচ্ছি। জুড়ে পড় ইচ্ছে হলে। গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। তা তুমি বাপু কিসের খোঁজে? ভোজ খেতে চলেছ নিশ্চয়ই? পাত পেড়ে খুব করে মন্ডা মিঠাই খেতে চাও? ওই ধান্দাতেই আজ সবাই ও মুখো।

আজ্ঞে না না। আমার বাপের জমিদারি আছে। খাওয়া পরার চিন্তা নেই। আমি যাচ্ছি গান শুনতে। শুনলাম মহাকবি কালিদাস নতুন বই লিখেছেন, কুমারসম্ভব নামে। তো সেই বই তিনদিন তিন রাত ধরে কবি নিজে গান গেয়ে শোনাবেন আর ঠিকঠাক রাজ কর্মচারির হাত ভেজাতে পারলে কবির ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারও পাওয়া যাবে। তা ভাবলাম যাই একটা অটোগ্রাফ নিয়ে আসি আর যদি কোনভাবে কবির সাথে যদি একটা সেল্ফি ম্যানেজ করতে পারি। আপনিও কি উজ্জয়িনী যাচ্ছেন?

হ্যাঁ আমিও সে উদ্দেশেই। কিন্তু উদ্দেশ্য এক নয়। ছোঁড়াটা নতুন লেখাটা কেমন লিখলে সেটা একটু নিজের কানেই শুনে বিচার করব বলে যাচ্ছি। তা তোমার কি করা হয়?

দাদা, ঐ যে বললাম বাপের জমিদারি। তাই করতে কিছুই হয় না। তাই লিখি। আমি কিঞ্চিত লেখক।

বটে? তুমিও লেখ। আজকাল দেখছি এঁদিপেঁদি গেঁড়ি গুগলি সবাই লিখছে। যাকগে যাক। তা এ ছোঁড়ার লেখা পড়েছ?

পড়েছি। মেঘদুতম আমার ভীষণ প্রিয়। রসোত্তীর্ণ লেখা। যেমন ভাষার বাঁধুনি, তেমনি মন্দাক্রান্তা ছন্দ, তেমনি ভাব। “কাঙ্খিতকান্তা বিরহগুরুণা স্বাধিকারপ্রমত্ত…”

ওই লেখাটার জন্য আমি ওকে অবিশ্যি দশে সাত দিতে পারি। এরোটিক রোমান্টিসম বিষয়টাকে ভালই এক্সপ্লোর করেছে। কিন্তু ছোঁড়াটা বড্ড বেশি লিখেছে। একজন লেখক জীবনে একটা কি বড় জোর দুটো লিখবে। ভাল লিখবে যাতে হাজার বছর টেঁকে সে লেখা। এত গাদা গাদা লেখার দরকার কি? বিশেষত অনুপ্রেরণাহীন অর্ডারি লেখা লিখেছ তো ব্যাস। মাথা থেকে বেরুবে খড় বিচুলি। যতই চিবাও কোন রস নেই। যেমন তোমার এই “মহাকবি কালিদাসের” লেখা রঘুবংশম। রদ্দি মাল। আসলে দরকার হল অনুপ্রেরণা, ইনস্পিরেশান।

বাহ দারুন বলেছেন তো বড়দা। আপনিও লেখক নাকি? এত সুন্দর কথা বলেন?

আমায় চেনো নি বুঝি? অবিশ্যি তখনকার দিনে ঘটা করে বই-এর সাথে বই-এর লেখক এর ছবি ছাপত না। আর ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, রীডিং সেশান এসবও ছিল না। তাই, না চেনাই স্বাভাবিক। আমি একটা বিশাল মহাকাব্য লিখেছি। বহু বছর ধরে সেটা বেস্ট সেলার।

উরিব্বাস। অমন একটা লেখার ইনস্পিরেশানটা কি ছিল দাদা?

আমার ব্যাপারটা খুব নাটকীয়, ড্রামাটিক। আমি টীন-এজ বয়সে বিশাল বড় “পাড়ার দাদা” ছিলাম। গ্যাং লিডার। এলাকায় তোলা তুলতাম, চুরি ছিনতাই করতাম। তখন আমার নাম রত্নাকর। সে নামে সবাই থরহরি কম্পমান। তারপর কি করে একটা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মনটা নরম হয়ে গেলো। ওসব বাজে কাজ ছেড়ে দিলাম। নামটাও এফিডেভিট করে বদলে বাল্মিকী হলাম। গানটান করতাম। একদিন স্নান করতে গেছি। দেখি কি? একটা ক্রৌঞ্চ মানে সারস আর কি। জলে নেমে একটা সারসীর সাথে একটু ইয়ে ইয়ে করছিল। মানে ফোরপ্লে আর কি, বুঝলে না? হঠাৎ এক ব্যাটা আকাট মুখ্যু ব্যাধ তীর মেরে মদ্দা পাখিটাকে মেরে দিল। বললে বিশ্বাস করবে না, তার মেয়ে বন্ধুটিও বয় ফ্রেন্ড-এর শোকে খুব কান্নাকাটি করতে করতে আত্মহত্যা করল। আমি স্নান করতে নেমে নিজের চোখে সে দৃশ্য দেখলাম। সেই করুণ দৃশ্য দেখে চোখে জল এসে গেল। কিভাবে নিজের অজান্তেই রচনা করে ফেললাম একটা শ্লোক…”মা নিষাদ প্রতিষ্ঠা…” ঐটাই আমার লেখা রামায়নের প্রথম শ্লোক। আমি আদি কবি বাল্মিকী। দাঁড়াও তোমার জন্য আমার প্রথম শ্লোকটা বাঙলায় তর্জমা করে দিই। তোমার বুঝতে সুবিধে হবে।

“অসতর্ক মিথুনরত প্রেমিকবরের প্রাণটি চুরি করে
অয়ি আর্য, তুমি শান্তি পাবে না অনন্তকাল ধরে”

অসতর্ক মিথুনরত প্রেমিকবরের প্রাণটি চুরি করে
অয়ি আর্য, তুমি শান্তি পাবে না অনন্তকাল ধরে

আহা, সুন্দর, অদ্ভুত। দাদা আপনার দেখা পাব ভাবি নি। এ যে আমার পরম সৌভাগ্য। বেড়ে লিখেছেন কাব্যখানা। আমি পড়েছি। একদম খাস্তা মুচমুচে। কিন্তু আপনি তো দাদা এ জামানার নন? দাদা, ও দাদা, নখ খুঁটছেন কেন? বলছি আপনি তো অনেক আগেকার মানুষ?

অ্যাঁ, কি বলছ? ও আমি? হ্যাঁ, সে অনেক কাল আগে। নয় নয় করেও হাজার তিনেক বছর হবে। তবে কিনা আমি যোগবলে ত্রিকাল, ত্রিলোকের যেকোন জায়াগায় যেতে পারি। তুমিও তো দেখছি বাপু এ জামানার নও। হাজার দুয়েক বছর পরের মানুষ। তুমি এলে কি করে এখানে?

হ্যাঁ, আমি ভানু সিংহ। বিংশ শতাব্দি। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?

এই যে নখে আমার একটা আয়না আছে – নখ দর্পণ। আসলে আমি নখ খুঁটছিলাম না। তোমার পরিচয়টা একটু দেখে নিচ্ছিলাম। তুমি এলে কি করে এখানে? তুমিও যোগ টোগ করো নাকি।

আমি টাইম ট্র্যাভেল করে এসেছি। এখন থেকে হাজার তিনেক বছর পর মানুষ সেই কৌশলটি আয়ত্ত করে ফেলেছে।

কিন্তু তোমায় যেন দেখলাম হাজার দুয়েক বছর পরে এসেছ। নাকি ভুল দেখলাম। অনেকদিন নখটা পরিষ্কার করা হয় না। কি দেখতে কি দেখলাম?

না না দাদা, আপনি ঠিকই দেখেছেন। আপনার নখ একদম নির্ভুল। আসলে একটু ঘুর পথ নিতে হয়েছে। মহাকবির সাথে দেখা করতে হাজার খানেক বছর ভবিষ্যতে গিয়ে ওই টাইম ট্র্যাভেল টেকনোলজি ব্যাবহার করে তবে আসতে পারা।

বেশ বেশ। তুমি তো দেখছি বেশ বিখ্যাত। অনেক পুরস্কার টুরস্কার-ও পেয়েছ। এই পুরস্কারটা নিয়ে খুব হইচই দেখছি। নোবেল না কি?

না দাদা, আপনার কাছে আমি কিসসু না। হাতির কাছে পিঁপড়ে। নোবেল হল আমাদের জামানার সেরা পুরস্কার। প্রথমে তো আমার লেখা কেউ পড়ত না। পরে যবন ভাষায় অনুবাদ করে ওই পুরস্কারটা পেয়ে গেলাম। তখন দেশের লোকেরা আমায় মাথায় তুলে নাচানাচি করতে লাগল। বাঙালি বিশ্ববিধাতার এক আশ্চর্যতম সৃষ্টি। বুঝলেন না। ভাল করেছেন আপনি বাংলায় লেখেন নি। নোবেল না পেলে আপনাকেও কেউ পুঁছত না বাঙলায়।

বটে। কিন্তু তুমি বাপু তোমার ওই নোবেলটি একটু সামলে রেখো, মানে তোমার সাগরেদদের সামলে রাখতে বোলো। আমার নখদর্পণ বলছে ওটা কোন উর্বর মস্তিষ্ক বাঙালি পরবর্তী কালে ঝেঁপে দেবে। তবে সে ঘটনাটি বোধ হয় তোমার জীবন সীমার বাইরে। যাকগে যাক। তা তোমার লেখা দু একটা পাঠিও। পড়ব। কটা লেখা বেরিয়েছে এখনও অব্দি?

আজ্ঞে সে বললে আপনি খুব রাগ করবেন। অনেক লিখে ফেলেছি। আসলে কি করব? কিছুই করার থাকে না যে। জমিদারি টমিদারি আমার দ্বারা হয় না। ও সব দাদারাই সামলায়। সকলের ছোট ভাই। তাই সাত খুন মাপ। তা লিখেছি বলতে, এই ধরুন এক ডজন উপন্যাস, বেশ কিছু ছোট গল্প, হাজার তিনেক গান, ডজন দুয়েক কাব্য গ্রন্থ, কিছু প্রহসন, গীতিনাট্য, নাট্যকবিতা…

থামো, থামো, থামো। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে ভাই। যাকগে যাক। অন্য কথা বলি। একটা কথা কি জানো, লেখক যদি তারিফ পাওয়ার জন্য লেখে সে লেখার ষোল আনাই ফাঁকি। নিজের খুশিতে নিজের মনের কথাটি লেখার জন্য পেন ধরলে তবেই ওই কি যেন বললে “রসোত্তীর্ণ লেখা” বেরোয়। তোমার কি মত এ ব্যাপারে?

হ্যাঁ দাদা। একদম একমত। আমি তো সম্পুর্ণ নিজের খুশিতে লিখি। সব যে ছাপাই তাও নয়।

বেশ, বেশ। যাক কথা বলতে বলতে আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। ওই যে সূর্যতোরণ দেখা যায় ওইটে উজ্জয়িনী। তা নখ দর্পণে তোমার যে ছবি দেখলাম তাতে যেন তোমার আমার মতই বড় বড় দাড়ি দেখলাম। তুমি তো দেখছি রীতিমত ক্লীন শেভড। এমনটা কেন দেখলাম, তাই ভাবছি?

দাড়ি, দাড়ি তো আমি রাখি না বড়দা। আপনি কি অন্য কারু ছবি…?

—–

রবি, রবি, ওঠ। আর কতখন ঘুমুবি? কটা বাজে জানিস? আমাদের বজরার ডেকে গিয়ে দেখ, কেমন বৃষ্টি পড়ছে। আজ মেঘনা পেখম তোলা ময়ুরের মতই সুন্দর।

“এ হে, এতো দেরি হয়ে গেলো? আসলে কাল একটু রাত করে লিখছিলাম।” রবি উঠে কয়েক দিনের না-কাটা দাড়িতে হাত বোলায়। পাশে খোলা তার খেরো খাতা। তার পরের কাব্যগ্রন্থ মানসীর গুটি কতক কবিতা তাতে লেখা। কাল আষাঢ় মাসের পয়লা তারিখে মেঘনা বক্ষে ঝুম বৃষ্টি দেখতে দেখতে খুব মনে পড়ছিল তার প্রিয় লেখক মহাকবি কালিদাসের অমর কাব্য মেঘদুতের সেই বিখ্যাত লাইন “আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানু…”

তাই কবি কালিদাসের সম্মানেই চার লাইন লিখে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।

কবিবর, কবে কোন্‌ বিস্মৃত বরষে
কোন্‌ পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক

কবিবর, কবে কোন্‌ বিস্মৃত বরষে
কোন্‌ পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক

পেনটা তুলে নিয়ে পরের চারটে লাইন লিখতে গিয়ে হঠাৎ গত রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে থমকে গেলো রবি।

“স্বপ্নে মহাকবি বাল্মিকী বললেন যেন আমার বড় বড় দাড়ি দেখেছেন। দাড়িটা রেখেই দেখব নাকি? অত বড় একজন কবি বলেছেন যখন সে কথা আদেশ বই তো নয়। তায় আবার ভদ্রলোক ত্রিকালদ্রষ্টা। ঠিকই দেখেছেন নিশ্চয়ই। এ আদেশ শিরোধার্য। এখন থেকে দাড়িটা শিরে ধারণ করেই দেখি কেমন লাগে আমাকে।”

মেখলা তুমি

মেখলা, তুমি একলা বিকেলে আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজেছিলে

মনে পড়ে?

মেখলা, তোমার হাতের নরমে আমার হাতকে আশ্রয় দিয়েছিলে

যত্ন করে

মেখলা, তুমি অষ্টমীতে নীল শাড়িতে আকাশ হয়েছিলে

মনে আছে?

মেখলা, তোমার কস্তুরী মৃগী গন্ধ পেতে আসতে চেয়েছিলাম

আরো কাছে

মেখলা, তুমি স্নানশেষে খোলা চুলে কার অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলে

জানালাতে

মেখলা, সেই বৃষ্টিস্নাতা মিষ্টি তোমায় লুকিয়ে দেখেছিলাম

একা ছাতে

মেখলা, তোমার ঠোঁটের নরম ঠোঁটে নিয়েছিলাম

লুকিয়ে অন্ধকারে

মেখলা, তোমার বন জোছনা রুপ চোখে হারিয়েছিলাম

বারে বারে

মেখলা, তোমার কাঠবিড়ালী-লঘু পায়ের আলসেমিতে

নুপুর পরিয়েছিলাম

মেখলা, তোমার জীবন সাথী হবার

স্বপ্ন দেখেছিলাম

 

মেখলা, তোমার চড়ুই পাখি চোখ শান্তি দিয়েছিল

মেখলা, তোমার আলগা-খোঁপার বাঁধন খুলে বৃষ্টি নেমেছিল

মেখলা, তুমি পারো নি শেষে হিসেব করতে গিয়ে আমার নারী হতে

মেখলা, তবে আজ কেন কাঁদো উপুড় হয়ে শুয়ে প্রতিরাতে?

(প্রকাশিত)

ভুতদেখা

সন্ধ্যার অন্ধকারে বারান্দায় দাড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম
আর হিসেব করছিলাম,
বোনাসের টাকা দিয়ে গাড়িটা বদলানো যায় কিনা।
হঠাত ভুত দেখলাম, হ্যাঁ, ভুত, আমারি ভুত
ভুত মানে তো অতীত, আমার অতীত –

বিশ বছর আগের আমি, ওর হাতেও সিগারেট
আমার হাতে ক্লাসিক মাইল্ড, ওর হাতে সস্তা কি একটা, নাম ভুলে গেছি
ভুত দেখে ভয় পেতে হয়, তাই একটু পেলাম
কিন্তু পরক্ষনেই উপলব্ধি করলাম ভয়টা আমার নয় ভুতেরই পাওয়া উচিত
সামনে যে ভুত টা দাড়িয়ে আছে, আমার ভুত, ওটা তো একটা রোমান্টিক ফুল
স্বপ্ন দেখে শ্রেনিহীন সমাজ পত্তনের, স্বপ্ন দেখে মুক্তির
শোষণ থেকে মুক্তি, অনাবশ্যক শাসন থেকে মুক্তি
অশিক্ষা থেকে মুক্তি, বৈষম্য সৃষ্টি করা শিক্ষাব্যাবস্থা থেকে মুক্তি
ক্ষুধার থেকে মুক্তি, ক্ষুধিত পাষাণদের থেকে মুক্তি
আমি চল্লিশ বছরের সফল পোড় খাওয়া বেসরকারি সংস্থার চাকুরে
আমি স্বপ্ন দেখি না, হিসেব করি
চুলচেরা হিসেব করে নিজের মুল্য বৃদ্ধি করি,
দেশেরও করি, বলে কমপক্ষে মনে করি।
ও কতগুলো বস্তাপচা আবেগপ্রবণ ধারনা নিয়ে দেশোদ্ধার করবে বলে নেমেছিল
ও নিজেকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল
ক্ষুধার্ত মলিন মানুষের মত দেখতে মানুষেতর কিছু প্রাণীর জীবনে আনতে চেয়েছিল আলোকবর্তিকা
কিন্তু সমাজের নির্ভুল শৃঙ্খলা, অপ্রতিহত জয়রথ
ওই ভুতের মাথার ভুতটাকে মেরে বানিয়েছে আজকের এই মানুষটাকে
আমিও বিলোই কিন্তু মেপে,, সমাজসেবি সংস্থায় আমার ডোনেশান যায়
তফাত এটুকু যে নিজেকে বিলিয়ে দিই না
আমার আর আমার পরিবারের সামাজিক মর্য্যাদা বজায় রেখে দিই-থুই,
সত্যি কথা বলতে কি, আমার ডোনেশান-ও আমার
স্ট্যাটাস রক্ষার প্রয়াসেরি অংশবিশেষ।
ও বিপ্লব করতে চেয়েছিল
এই কপটচারি সমাজ যেটা, ছোটলোক আর বড়লোকের মধ্যে
পুরু কাচের দেওয়াল তুলে রেখে দারিদ্রকে মহান করতে কুমির কান্না কাঁদে
সেই নিঃশঙ্ক পদ্ধতিকে ভেঙ্গেচুরে নতুন করে গড়তে চেয়েছিল
ও বিত্তহীনদের অর্থহীন করে রাখার প্রকান্ড ষড়যন্ত্রের
হাটে হাড়ি ভাঙবার কথা ভেবেছিল
কিন্তু সে ভুতটা মরে গেছে, মরে এই মানুষটা হয়েছে
গভীরে কোথাও এই সফল মানুষটা বিশ্বাস করে

ওই পুরু কাচের দেওয়ালটা খুব কাজের
কাচের দেওয়ালটার ওদিকে খুব গোলমাল, রুষ্টতা, রিক্ততা, মরুঝড়
সেই বিশৃঙ্খলাকে আলিঙ্গন করব, তেমন মনের জোর কই
অর্থসামর্থ যত বেড়েছে, ব্যাস্তানুপাতিকভাবে কেড়ে নিয়েছে মানসিক সামর্থ
তাই বিপ্লব আমিও করি কিন্তু প্রধানত ফেসবুকে
ভণ্ড সমাজ ব্যাবস্থা, প্রতিকারহীন বিচারব্যাবস্থার বিরুদ্ধে গর্জে উঠি, ফেসবুকে।

আমার ভুতটা যতই গর্জাক কাচের ওপারে ঝড়ে দাঁড়িয়ে
আমি জানি ভুতগুলো মরেই হয়েছে কাচের এপারের মানুষগুলো
মৃত্যুর মতই দুর্ভেদ্য এই দেওয়াল, ও ভাঙতে পারবে না আমরণ
আর ভুত মরে মানুষ হবে
রোদ্দুর জল ঝড় পেছনে রেখে আসবে এধারে এই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে

তাই ভয় আমার নয়, আমার ভুতেরই পাওয়ার কথা
ওর আছে মন, আমার আছে বুদ্ধি
ওর আছে নীতি, আমার কুটনীতি
ওর আছে প্রাণের বন্ধু, আমার আছে প্রভাবশালী বন্ধু
ওর আছে বিস্মিত প্রাণ, আমার আছে হিসেবি মন
ওর আছে শেকল ভাঙার অভিলাষ, আমার আছে নিজেকে শৃঙ্খলিত করার মনোবল

আমি নিশ্চিত আমি স্বল্পায়াসেই এই ভুতটাকে মেরে ফেলতে পারব
আর তাতে আমার সমাজ, আমার মত দেওয়ালের এধারে থাকা সফল প্রবীণ মানুষেরা
আমায় সাহায্য করবে –
প্রাণপণ।

জীবন খাতার

সব ব্যক্তিগত মুহূর্ত বাজারি হয়েছে ফেসবুকের পাতায়

আর বাজারি হয়েছে আমার সুন্দরী কবিতারা

নিয়ন লাইটের আলোয় ঝলমলে শাড়ি পরে আমার দেওয়ালে দাঁড়ায়

আর লাইক খোঁজে তারা