কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৪

May 25, 2019, Morning

ব্লগটা লেখা যখন শুরু করেছিলাম বছর তিনেক আগে, ভাবি নি সেটা এতো পাঠকের চোখ পাবে। তবু পেল যখন তখন যযাতির ঝুলিকে মুদ্রিত মাধ্যমে নিয়ে আসার কথা মাথায় এলো স্বভাবতই। আমার কলমকে কালি দিল পত্রভারতী। বইমেলায় বইটি বেরিয়েছে এবং অনেকেই সংগ্রহ করেছে। তাই বাকি দু-দশ কপি যা পড়ে আছে সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়লাম কলেজ স্ট্রীটের দিকে। গন্তব্য পত্রভারতীর অফিস। এই কপি কখানা আমার ইউ এস এর কিছু সুহৃদ্‌ বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাব। আমার একা কোথাও যাওয়ার থাকলে সাধারণত ট্রামে বাসে যাই, জীবন দেখতে দেখতে। পত্রভারতীর যে আধিকারিক আসতে বলেছেন তার নির্দেশ অনুযায়ী রামরাজাতলার থেকে হুগলি সেতু দিয়ে যাওয়াটাই তাড়াতাড়ি হবে। বাকসাড়া মোড় অব্দি টোটোয় গিয়ে একটা গরম বাসের জঠরে সেঁধিয়ে গেলাম। মাতৃ জঠরে থাকার অভিজ্ঞতাটা মনে নেই। তবে আন্দাজ করতে পারি এই বাসের পেটের মতই হবে। ঠাসা, গরম আর ভেজা ভেজা। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচনী আসর জমে উঠেছে। বাসের গরমে ইলেকশানের বাজার আরও সরগরম হয়ে উঠেছে। হাত জোড় করে ভিক্ষাপাত্র থুড়ি ভোটপাত্র হাতে দাঁড়িয়ে জননেতারা, পোস্টারে, পোস্টারে। নির্বাচনী আসরে, বাসের গরমে, গরম আলোচনা হচ্ছে অফিসযাত্রীদের মধ্যে। এই একটাই সময়ে মানুষ এই জননেতাদের মাটিতে টেনে নামায়। 

জানলা পথে একটা বিজ্ঞাপন দেখে মনে মনে একটু তারিফ না করে পারলাম না। ওরিপ্লাস্ট বলে একটা ব্রান্ড অ্যাড দিয়েছে, “দরের থেকে কদর বেশি”। আমরা যারা পানাসক্ত অর্থাৎ পানিং-এ আসক্ত এমন সুন্দর pun দেখলে মুখে এক চিলতে হাসি চলে আসে বৈকি। রবীন্দ্রসদনে বাস থেকে নেমে আমার পাতাল প্রবেশ। অর্থাৎ পাতাল রেল ধরব। “তুমি কি শুনেছ মোর বাণী, হৃদয়ে নিয়েছ তারে টানি / জানি না তোমার নাম, তোমারেই সঁপিলাম আমার ধ্যানের ধনখানি।” – লেখা আছে মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে। আহা কি কথা। ঠিক যেন tailor made আজকের এই ক্ষণখানির জন্য। আমাকেই সঁপেছেন, একটা গোটা শতাব্দীর ওপার থেকে শুধু আমাকেই সঁপেছেন কবিবর তাঁর ধ্যানের ধনখানি, তাঁর সুললিত শব্দভান্ডার। সার্থক কবি আপনি, হে রবীন্দ্রনাথ। এতদিন পরেও বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরোনোর পর থেকেই নতুন প্রজন্ম এক অনিবার্য আকর্ষণ বোধ করে আপনার বাণীর প্রতি। কিছু নির্বোধ আঁতেল নিশ্চয় আপনাকে খাদারে ফেলে দিতে চায় তবে তাদের লেখা বছর পার করতে পারে না। আপনি তো শতবর্ষের পরেও অমলিন। রবি ঠাকুরের দেশ থেকে আমি যাব গান্ধীজীর দেশে। অর্থাৎ কিনা রবীন্দ্রসদনে উঠে আমার মেট্রোমুক্তি মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে। তাঁকে মহাত্মা নামটা ঘটনাচক্রে এই রবীন্দ্রনাথই দিয়েছিলেন। মেট্রো রেলের দরজা বন্ধ হতেই নিশ্চিন্তি। কলকাতার যানজটের তোয়াক্কা না করে সাঁই সাঁই করে এগিয়ে চললাম আমার গন্তব্যের দিকে। 

“স্টেশান রবীন্দ্র সেডান, পরবর্তী স্টেশান ময়ডান।” কৃত্রিম অ্যাক্সেন্ট মেরে ঘোষণা করে এক নারীকণ্ঠ। সত্যি সেডান-ই বটে। সদন কথাটা মোটেই যুগোপোযোগী নয়, ম্যাদামারা মিয়নো বিস্কুটের মত। তার থেকে সেডান “একেবারে কড়ক আছে”। বাংলা ভাষার ‘ত’ থেকে ‘ধ’ অব্দি অক্ষরগুলো ব্যান করে দেওয়া উচিত। ‘ট’ থেকে ‘ঢ’ অব্দি তো আছেই। আমাদের দু-শ বছরের পলিটিকাল মাস্টাররা ‘ত, থ’ বলতে পারে না যখন তখন ওই বর্ণ কখানার নিশ্চয়ই অস্তিত্বসঙ্কট।  

বার বার পকেটের মধ্যে মেট্রো রেলের প্লাস্টিক টিকিট হাৎড়াই। ওইটা ছাড়া বেরোতে পারব না। আর জিনিসপত্র হারানোর ব্যাপারে আমার মেলা বদনাম আছে। বছরে গোটা তিনেক ছাতা আর একখানা অন্তত মানিব্যাগ আমি পরার্থে পথে দান করে আসি। কিন্তু টিকিট হারালে পাতালজীবন থেকে মুক্তি পেতে টিকি মাথায় উঠবে। 

মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে নেমে অটো ধরার নির্দেশ দেওয়া ছিল। আমার কোনদিকে যেতে হবে একে তাকে জিগেস করতেই সুলুক সন্ধান পাওয়া গেল। কলকাতার এই এক সুবিধে। অন্ধের জষ্টির মত পথচারীরা আছেন যাঁরা পথের সুলুক সন্ধান দেবে। দেবেই দেবে। চড়ে পড়লাম অটোতে। অটোটা যখন আরো যাত্রী তোলার জন্য গড়িমসি করছে আমি দেখছিলাম ঝুড়ি ঝুড়ি ঝুড়ি-মানুষ। সেটা কি? সেটা হল কিছু প্রকাণ্ড ঝুড়ি। সার সার রাখা আছে। আর তার ভেতরে গুটলি পাকিয়ে শুয়ে রোদ-গরমে বিশ্রাম নিচ্ছে ঝুড়ির মালিক বোধ করি। ঝুড়ি পিছু একজন। যে ঝুড়ি তার জীবিকা সেই ঝুড়িই তার বিশ্রামাগার। এমন চমৎকার দৃশ্য, ঝুড়ির এমন অভিনব ব্যবহার কলকাতা ছাড়া কোথায় দেখতে পাবো? খুব লোভ হচ্ছিল ঝুড়ি মানুষের কাছে একটা বিড়ি টিড়ি চাওয়ার অছিলায় একটু আড্ডা মেরে নিতে। বহুবার করেছি। নস্টালজিয়া খুব পাওয়ারফুল ড্রাইভার। দেশ-গাঁয়ের কথা বললেই এনারা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। এদের মধ্যে যা গল্প আছে তা দিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায় সহজেই। কিন্তু আজ সময় নেই। সময়ে পৌঁছনর একটা বদনাম আছে আমার। ঝুড়ি মানুষদের পেছনে ফেলে আমাদের অটো এগিয়ে চলল। 

যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে সেটা ঝাঁ চকচকে কলকাতা নয়। “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণা” যত্রতত্র অর্থাৎ কিনা পলিটিকাল পোস্টার। সারা কলকাতা যেন একটা ফলাও দিদি এ্যালবাম। পাশেই অবিশ্যি কাস্তে-হাতুড়ির ত্রিকোণ পতাকা। সোনালি স্বপ্নের দিন নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতাদের হাত জোড় করে ভোট ভিক্ষা। নেতাগণ, নেতৃগণ আর কত বছর, আর কত যুগ অপেক্ষা করবে বাঙালি সেই সোনাঝরা দিনের জন্য? রাস্তার কল দিয়ে মোটা ধারায় জল পড়ছে আর সেই জলে পথশিশুরা স্নান সারছে। এই গরমে জলকেলি করতে পেরে তাদের মুখে পরম পরিতৃপ্তি। একটা কাক, সেও গরমে কাহিল, একটু গা ধুতে চায়। একবার করে উড়ে এসে সে-ও একটু জলে ঝটপট করে নিচ্ছে ডানা। আবার তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে। এ শহরের পাখি বলতে ওই এক কাক। দেখে নিন। প্রাণ ভরে দেখে নিন তার চিকণ শ্যামল গা। কান ভরে শুনে নিন তার কর্কশ সঙ্গীত। কারণ, পঞ্চাশ বছর পরে এরাও থাকবে না। মানুষ ছাড়া আর কারু বাঁচার অধিকার নেই, এ আমাদের মানবজাতির দৃপ্ত ঘোষণা। জরাজীর্ণ বাড়ি, তাতে বট গাছ মাথা তুলেছে কার্নিশে। দ্বিপ্রাহরিক আজান ভেসে আসছে কাছেই কোনো দেবস্থল থেকে। দুপুরের গনগনে আগুনে পান বিড়ির দোকানে বসে খদ্দেরের অভাবে ঢুলছে দোকানদার। আমার ছোকরা অটো ড্রাইভার বেশ চড়া ভলিউমে কাওয়ালি লাগিয়েছে তার বাহনের স্টিরিও সিস্টেমে। “আল্লাহ জানে ক্যা হ্যায় মহম্মদকা মারতাবা”। সত্যি-ই যেভাবে মানব সভ্যতার অকল্পনীয় বিস্তার হয়েছে শেষ বিশ বছরে, তাতে আল্লাহ্ই জানে কোথায় গিয়ে ইতিচিহ্ন টানা হবে, ঈশ্বরের সন্তানের স্থান এখন ঠিক কোথায় বলা মুস্কিল। গানের তালে তালে ছোকরা মাথা নাড়ছে। পথশ্রম তুচ্ছ করে, রোজকার দৈনন্দিনতার ক্লেশ তুচ্ছ করে সঙ্গীতের সঞ্জীবনী তাকে উজ্জীবিত করছে। আর একটু যেতেই অটোচালক ছোকরাটি নামিয়ে দিল যেখানে সেখান থেকে কলেজ স্ট্রীট পায়ে হাঁটা দূরত্বে। 

অদ্ভুত এই বইপাড়া এই কলেজে স্ট্রীট। সারা পৃথিবীতে এরকম একটা সারস্বত সাধনার জায়গা আর একটিও নেই। বইয়ের ভারে ন্যুব্জ আর জ্ঞানভারে মন্থর। কাশির গলির মত অপ্রশস্ত পথ। একদিকে প্রতিষ্ঠিত দোকান আর একদিকে স্টল করে বই বিক্রি করছে খুচরো ব্যাবসায়ী। পুরীতে যেমন পান্ডারা ছেঁকে ধরে সেরকমই এই পথ দিয়ে গেলেই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কানে আসবে “দাদা, আপনার কি বই চাই বলুন না”। আর এদের অদ্ভুত বইয়ের জ্ঞান। যেকোনো বইয়ের নাম বললেই হয় আনিয়ে দেবে নয় বলে দেবে কোন দোকানে পাওয়া যাবে। আমি মূলত এসেছি আমার প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছেছি। কলেজ স্ট্রীট এসেছি আর লোভী মৌমাছির মত বইয়ের খোঁজে গলিতে গলিতে ঘুরব না তা কি হয়? দু একটা বইয়ের খোঁজে ছিলাম। লেখালেখি সামান্য করি কিন্তু আমি মূলত পাঠক। দেজ-এর কাউন্টারে গিয়ে আমার লিস্টি থেকে বইগুলো বলছি আর প্রদীপের দৈত্যর মত বইগুলো সামনে এনে ফেলছে একটা অল্পবয়সী ছেলে। যেন কতদিন ধরেই জানতো এই বইগুলো আমি চাইব। সে যা হোক কলেজ স্ট্রীটের একটা ব্যাপার হল, হরেক ধরণের পাঠক দেখা যায় এ চত্বরে। এক বৃদ্ধা মহিলা নজরুলের একটি বিশেষ গানের খোঁজে এসেছেন। নজরুলের গানের যত সঙ্কলনই দেখাক তিনি বলছেন না এতে ঐ গান নেই। তবু ক্লান্তি নেই দোকানের কর্মচারীদের। এক এক করে দেখাচ্ছে অন্য অন্য সঙ্কলন। আমি আমার বই কটার দাম দিয়ে ঝোলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার আমার প্রকাশকের সঙ্গে বসব আমার প্রকাশিত বইটার ভবিষ্যৎ নিয়ে।

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

পর্ব ৩ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

নির্বাক

কবিতা, তোমায় বলি শোনো,

হেমন্তের নিভৃত দুপুরে শুনেছ কখনো

ঝরা পাতাদের নিঃশব্দ সংলাপ?

টুপ টাপ টুপ টাপ টুপ টাপ…

মনস্তাপে ভুগেছ নিত্যদিন?

মজে যাওয়া নদীর মত ক্ষীণ, অতি ক্ষীণ

না-বলা-কথাদের মন্দ্র গম্ভীরে

কথা বলা কত অর্থহীন?

কখনো কি মনে হয়

শুধু থাক, শুধু থাক, শুধু থেকে যাক শব্দঋণ?

 

কবিতা, তোমায় বলি শোনো,

মাঝে মাঝে মনে হয় কথা বলা গর্হিত অপরাধ কোনো

কথা বলে অবিরল, অবিরল কথা বলে অনঙ্গ মনও…

লিপ্সা

[প্রকাশিতঃ পরবাস ৭৬ সংখ্যা https://www.parabaas.com/PB76/LEKHA/kSwarvanu76.shtml ]

কোনো কোনো শীতের রাতে শঙ্খচূড় সাপ হয়ে যাই
খোলসের আড়ালে পিচ্ছিল
বিষের আচ্ছাদনে নীল

শরীরময় ঘুরে বেড়ায় জলজ কাঁকড়ারা
যেন গাজনের মেলা
চোখে লেগে থাকে ইন্দ্রজাল
চেরা জিভে স্বাদ থাকে না, শুধু অন্ধ স্পর্শসুখ
আর থাকে গভীর অসুখ
সুখের ভারেতে আনত, বিড়ম্বিত, মূক

তারপর সারারাত বৃষ্টি হয় অঝোরে
ভিজি বসে অন্ধকারে ঝাপসা একেলা…

জীবন তো কতগুলো মেঘেদের খেলা।

দেখা

তোমার আমার দেখা হয়ে যাবে শিপ্রা নদীর পারে

                                                 গহন অন্ধকারে

একটা দুটো ফুটবে তারা সুনীল আকাশ পরে

                                    বনবীথিকার বিষণ্ণ মর্মরে

                                            গোপন ব্যাথার অলক্ষ্য সঞ্চারে

তোমার আমার সমান্তরাল একলা পথের ধারে

                       না বলা কথারা জমা হবে শুধু নীরব অহংকারে


কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৩

May 22, 2019, Morning

মার্কিন মুলুক থেকে কলকাতা ফিরলে থাকে একটা বাৎসরিক অনু্ষ্ঠান। তার নাম ভিসা স্ট্যাম্পিং। আমেরিকায় ঢোকার অনুমোদনপত্র নবীকরণ করতে হবে। তাই দেশে পৌঁছে সপ্তাহান্তটা বাড়িতে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভিসা অভিযানে। আমাজন অভিযানের থেকে সেটা কিছু কম উত্তেজক ঘটনা নয়। পার্থক্য হচ্ছে আমাজন হল রেইন ফরেস্ট, আর মে মাসের  কলকাতা হল বৃষ্টিহীন কংক্রিটের অরণ্য। প্রথম দিনেই বাসে ট্রামে যাওয়ার রোমহর্ষক কিম্বা স্বেদসিঞ্চক ঘটনা ঘটাতে রাজি হল না স্ত্রী। তাই বাড়ির গাড়ি এবং ড্রাইভার বাবুদা। বাবুদা গাড়ি চালানোটা শিখেছে ঠিকই কিন্তু কলকাতার মানচিত্রটা শেখেনি। আর মাপ করবেন পৃথিবীর কোন শহরেরই ম্যাপ আমি কোনদিনও আত্মস্থ করতে পারি নি। অতএব গুগল দেবতাকে স্মরণ করা হল। গন্তব্য হো-চি-মিন সরণী। ইউ এস কনসুলেট। বাবুদার অসাধারণ কলকাতাপ্রীতি হোক বা গুগলের নির্দেশ অমান্য করার ধৃষ্টতাই হোক, কোনো একটা কারণে মোটামুটি পার্কস্ট্রীট চত্বরের প্রায় প্রতিটা গলি থেকে বড় রাস্তায় চাকার ধুলো দিয়ে যখন কনসুলেটে পৌঁছলাম তখন অনেক বেলা। গিয়েই বুঝলাম ছড়িয়েছি। শুধুমাত্র ভিসা ইন্টারভিউ দেওয়ার থাকলেই এখানে আসতে হয়, আমি করতে এসেছি ভিসা রিনিউয়াল। সে কাজ হয় শেক্সপিয়ার সরণী থেকে। কনসুলেটের নিরাপত্তারক্ষী বুঝিয়ে দিল হো-চি-মিনের পদপ্রান্ত থেকে শেক্সপীয়ারের সান্নিধ্যে পৌঁছনোর রাস্তা। মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। বাবুদার ম্যাপজ্ঞানের অনুগ্রহে আর কলকাতার ওয়ান-ওয়ে রাস্তার নিগ্রহে এই দশ মিনিটের হাঁটাপথ তিরিশ মিনিটের গাড়িপথ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে মনে করে হাঁটাই মনস্থ করলাম। যমলোকে শুনেছি পাপীদের ফুটন্ত তেলের কড়াইতে নিক্ষেপ করা হয়। পাপকর্ম জীবনে কম করি নি ! তাই যমলোকে জীবন্ত মানুষের মত বোশেখি দাবদাহে দগ্ধ হতে হতে অতঃপর শেক্সপিয়ার সরণীর ভিসা অফিস। 

এই কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে একটা ফলভারে বিনম্র আম গাছ এক টুকরো মরূদ্যানের মত আগলে রেখেছে জেসমিন টাওয়ার। ঢুকে পড়ে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সাবমিট করতেই চমক। ছবিটা নাকি স্পেসিফিকেশান মত হয় নি আর তাছাড়া একটি ডকুমেন্ট লাগবে যা আমি নিয়ে আসিনি। মাথায় বজ্রাঘাত হলেও এর থেকে কম পাথর হতাম। এই গরমে অন্য একদিন জেসমিন টাওয়ারের চক্কর কাটতে হলেই চিত্তির। বাইরে অপেক্ষারত স্ত্রীরও গরম বাণী নসীব হবে। “ঠিকঠাক দেখে ডকুমেন্ট আনো নি” এইবিধ আক্রমণের আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে প্রতিরক্ষাস্বরূপ নিজের যুক্তি পেশ করি, “ওয়েবসাইটে ঠিক করে কিছু লেখা নেই”। কিন্তু চুপি চুপি বলে রাখি, ওয়েবসাইটে ঠিকই লেখা ছিল। আমি সব কিছু একটু ক্যাজুয়াল নিই বলেই আজ এই হাল। হালে পানি কিভাবে পাই, পা ছড়িয়ে বসে ভাবছি, এমন সময় নিরাপত্তারক্ষীর অম্লমধুর আবেদন, “এখানে ওইভাবে পা ছড়িয়ে বসবেন না”। তাই শুনে এক অচেনা প্রিয়দর্শিনীর মুখে এমন একটা অপ্রিয়দর্শন বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তাতে স্বকীয় অভব্যতার প্রতি যথেষ্ট লজ্জিত বোধ করলেও গরমে মতিভ্রম হয়েছে মনে করে মনে মনে নিজেকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ইন্টারনেটের খোঁজ। যদি মিসিং ডকুমেন্টটা পাওয়া যায় কোনভাবে। আমার মত মুর্গিদের জাঁতাকলে পেষবার ব্যাবস্থা সামনেই। অনেকেই ভিসা ফর্মের প্রিন্ট আউট নিয়ে আসে না বলে ঝোপ বুঝে কোপ মারার ব্যাবস্থা। ইন্টারনেট ক্যাফেতে ঢুকতেই এক মাড়োয়ারী ভদ্রলোক জানিয়ে দিল ভিসা ফর্মের প্রিন্ট নিতে পাঁচশ টাকা লাগবে। সবিনয়ে জানাই আমি সেই অপরাধে অপরাধী নই। অন্য ডকুমেন্ট প্রিন্টপ্রার্থী। দেড় মিনিটের ইন্টারনেট সার্ফিং আর প্রিন্ট করার মূল্য ধার্য করল দুশ টাকা। অন্যায্য। তবু তৃষ্ণার্তকে এক ফোঁটা জল দিলে যেমন সে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে আমিও করলাম। এইবার ভিসা স্পেসিফিকেশান অনুযায়ী ছবি তুললেই এ যাত্রা কাজ উদ্ধার হবে। সন্ধান পাওয়া গেল যে বি কে মার্কেট বলে এক জায়গায় একদম মার্কিনদের মনোমত ছবি তুলে দেবে কিন্তু হাঁটতে হবে বারো থেকে পনের মিনিট। “আরাম হারাম হ্যায়” – এই মন্ত্র জপ করতে করতে হাঁটতে লাগালাম। পথ হাঁটতে আমার খুব ভাল লাগে। জীবন থাকে। যাপন থাকে। সাহিত্যিকদের শুনেছি এক জোড়া অতিরিক্ত চোখ থাকে। আমি তেমন লেখিয়ে নই। তবু চোখ খুলে রাখতে চেষ্টা করি। চলুন আমার সাথে হাঁটুন। দেখি কেমন কলকাতা?

ওই তো একটা উভলিঙ্গ (unisex) সেলুন। বাইরের দেওয়ালে এক শ্বেতাঙ্গী, বিদেশিনী, সুন্দরীর মোহময়ী আমন্ত্রণ। ভারতীয় চোখ সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে শ্বেতাঙ্গী ও বিদেশিনীদের এখনো দু দশ নম্বর বেশি দিয়ে থাকে। আর দু পা হাঁটতেই প্রতিস্পর্ধী নগর সভ্যতার পাশাপাশি উপস্থিত কিছু হেরে যাওয়া মানুষ। ইটালিয়ান সেলুন – অর্থাৎ ইঁটের ওপর বসিয়ে নরসুন্দর ওরফে নাপিত চুল দাঁড়ি কাটছে। লেখা না থাকলেও এ সেলুন উভলিঙ্গ নয়, শুধু পুরুষ প্রাণীদের জন্য। আছে ফুটপাথে বসা লিট্টি বিক্রেতা। জীবনদায়ী ছাতুর সরবত কেবল মাত্র দশ টাকায়। না…খাওয়ার স্পর্ধা আমার নেই। আমি সুখী পান্থজন মাত্র। বিহারী ভোজনের পাশেই বিশুদ্ধ বাঙালি ভোজনেরও ব্যবস্থা। ভাত ডাল দু কুচি আলুভাজা আর মাছের ঝোল প্লেটে প্লেটে পরিবেশন হচ্ছে। একটা আনুবীক্ষণিক সাইজের পাতিলেবুও আছে। এই গরমে ওটাই অমৃতের চাঙ্গড়। মাছ কিন্তু ভাগাড়ের হয় না। শুধু জলেই তাদের প্রতিপত্তি। খাবার স্পর্ধা নেই তবু অনুসন্ধিৎসু মন দাম জিজ্ঞেস করে। মাত্র পনেরো টাকা।পাশেই পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। ক্লাসিক ব্র্যান্ডের সাদা কাঠির দাম পনেরো এখন। দু মিনিটের ফুসফুস ফুটো করার বিলাস আর এক পেট ভাত একই দামে পাওয়া যাচ্ছে পাশাপাশি দোকানে। আজও কলকাতা তার হেরে যাওয়া সন্তানদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেয় নি। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে ঠিকই কিন্তু কিছু বিজ্ঞাপন মুখে মিচকি হাসিও আনে কখনো সখনো। চোখে পড়ে গেল একটা বিজ্ঞাপন। “হার পানি কা বোতল বিসলারি নেহি” – জলসঙ্কটে পড়া এক উট অন্য সব জল দেখে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, শুধু বিসলারির বোতল পেলে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। এই আর্বান ঊস্ট্রকে দেখে একটু হাসতেই হল। নিখাদ হিউমার। দু পয়েন্ট দিতেই হল বিসলারিকে।  জল ভাবতেই দেখলাম রাস্তার ধারে এক গামলা জল রাখা। আর কাকেরা তেষ্টা মেটাচ্ছে। আমাদের মত লব্ধপ্রতিষ্ঠরা নয়, পাখিদের জন্য জল রেখে দেওয়ার এই সহৃদয়তা হয়তো ঐ মুচিটার যে ওখানে বসে ঘামতে ঘামতে জুতো সেলাই করছে কিম্বা ঐ জাঁতা হাতে ইঁটের ওপরে বসা লোকটার যার পেশা সুপুরি পেষা। আবার একটু এগোতেই সুতানুটি কাফের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আমন্ত্রণ। তিন সহোদর ভাই কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর। সময়ের সাথে ভাই গোবিন্দ আর সুতানুটির থেকে সব জমি হড়পে নিয়েছে ছোটভাই কলকাতা। গোবিন্দপুর তো ধ্যারধেরে হয়ে অখ্যাত হয়েছে। সুতানুটির নামে কাফে তাই তার হারানো জমির জন্য বিচার প্রার্থনা করছে। হাঁটতে থাকি। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে ইলেকশান সিজন। পাশাপাশি ছবিতে সহাবস্থান দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ভোটপিপাসু নমস্কার মুদ্রায়। হাসির বিষয় নাকি লজ্জার বিষয় জানিনা, কোনো মা-মাটি-মানুষ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মুদিতা প্রদর্শন করতে প্রতিটা ছবিতে তাঁর চোখ দুটো গেলে দিয়ে গেছে। ঈশ্বর(চন্দ্র) যেখানে মুণ্ডুহীন, সেখানে দেশের কর্ণধার চক্ষুহীন হবেন, আশ্চর্য নয়। সুপুরি কাটার দোকানের থেকে একটু এগোলেই চুনের একটা বড় গামলা। বিনামূল্যে। সুপুরির সাথে চুনের জন্মান্তরের আত্মীয়তা। হঠাৎ মনে পড়ল, কলকাতার সাথে চুনের সম্বন্ধও অঙ্গাঙ্গি। কলকাতার নাম নিয়ে অনেক মত প্রচলিত। একটি মতে কলকাতা এসেছে কলি-কাতা বা চুনের ভাটি শব্দ থেকে। 

দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম বি কে মার্কেটে ছবি তোলার স্টুডিওতে। দাম আবার গলাকাটা। তিনশো টাকা এক এক জনের। বোঝা গেল অনেকেই ভিসা অফিস থেকে নাকচ হয়ে ভরাডুবি থেকে উদ্ধারে এই স্থানে আগমন করে থাকেন। কিন্তু বাচ্চা ছেলেটির হাতটি ভাল। মুহুর্তের মধ্যে ফটোশপ করে ব্যাকগ্রাউন্ড করে ফেলল ধপধপে সাদা ঠিক যেমনটা মার্কিন কনসুলেট চেয়েছে, মুখের ওপর পড়া অবাধ্য চুলেদের কাঁচি করে দিল ম্যাজিকের মত। আমার স্ত্রী ছবি তুলতে ভীষণ ভালবাসেন। তিনি এমন এক রিফ্লেস্ক তৈরী করেছেন যে ক্যামেরা তাক করলেই বারোটা বাজতে পাঁচ কিম্বা বারোটা বেজে পাঁচের ভঙ্গিতে মাথাটা সাইডে হেলে যায়। মাথার বারোটা বাজানোর জন্য অর্থাৎ মাথাটিকে সিধে রাখতে ফটোগ্রাফের ছেলেটিকে বেশ বেগ পেতে হল। সেই নিয়ে একটু ঠাট্টা করছিলাম। কিন্তু যে হারে গরম বাড়ছে আর বাড়ছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে কমছে রসবোধ। তাই রসিকতাগুলো অপাত্রে গেল। ছেলেটির মুখে হাসির রেখাও দৃষ্ট হল না। সে যাই হোক, তার তোলা ছবি আর ইন্টারনেট কাফে থেকে পাওয়া ডকুমেন্ট বলে বলীয়ান হয়ে আবার ফিরে গিয়ে কাজটা উদ্ধার হয়ে গেল। 

ভিসা স্ট্যাম্পিং-এর জন্য পাসপোর্ট জমা করে যেই বেরোলাম, ব্যাস বেজে গেল ছুটির ঘন্টা। ভিক্টোরিয়ার পরীর ডানা দুটো ধার করে কপোত কপোতী উড়ে চলল দক্ষিণ দিশায়। দক্ষিণাপন। শপিং টাইম। সেখানে বিশ্বের সমস্ত অদরকারি জিনিসের সম্ভার। কিন্তু বানিয়েছে বাংলার শিল্পীরা। প্রতিশ্রুতি সমস্ত লাভের গুড় নাকি তাদের ভাগেই যায়। সত্যতা জানা নেই। পথে পড়লো গড়িয়াহাট ব্রিজের নিছে চেস ক্লাব। কদিন আগেই তার উপরে প্রতিভাষণ শুনছিলাম একটা। সূর্যের প্রবল দাপটকে প্রতিহত করছে ব্রিজ আর তারই ছায়ায় গুটি সাজাচ্ছে মহারথী দাবাড়ুরা যাতে অন্যের রাজাকে প্যাঁচে ফেলতে পারে। আর দেখলাম ট্রাফিক পুলিশের বিজ্ঞাপন। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছেন প্রসেনজিত, জীৎ, দেব। বিজ্ঞাপন বলছে, “এনারা জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোতে পারলে আপনারাও পারবেন।” বেশ সৃজনশীল। তবে একটাই খটকা লাগল। শুধু বাংলা সিনে জগতের লোকেরাই তবে কি এখন আইকন? সিনেমার কুশীলবদেরই শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী আখ্যা দিয়ে যবে থেকে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তবে থেকেই কি বাংলা বৌদ্ধিক দারিদ্রে ভুগছে? কোনো লেখক কি বিজ্ঞানী কি স্পোর্টস ফিগার কি অর্থনীতিবিদ নেই এ লিস্টিতে! যাকগে। সিগনাল মেনে রাস্তা পেরোবার আর একটা বিজ্ঞাপন বলছে, “এক মিনিটের একটু থামা। আর একটু বেশি হলে ক্ষতি কি?” বেশ মজাদার। 

আর দেখলাম কৃষ্ণচুড়া গাছ। ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। তার রক্তিম গুমোরে সূর্যও খানিকটা ভীত, সঙ্কুচিত।  ও কৃষ্ণচুড়া তুমি অজুত নিযুত অর্বুদ কোটি পুষ্প বৃষ্টি করো এ ক্লান্ত, অবসন্ন শহরের বুকে। ঘৃণাকে ঘৃণা করে ফুলেল প্যারেড হোক রাজপথে। পুষ্পহন্তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোল বলিষ্ঠ জনমত। ছায়াহীন এই পৃথিবীকে ছায়াচ্ছন্ন করতে তুমিই পারো। কৃষ্ণচুড়া, শুধু তুমিই পারো এ শহরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে এক অসূয়াহীন পৃথিবী গড়তে। 

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

শিকাগো সামার

স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায় – লিখেছিলেন রঙ্গলাল। কিন্তু শিকাগোর বঙ্গসন্তানদের জন্য গানটা হবে, উত্তাপহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে কে বাঁচিতে চায়! নয় কিনা বলুন?

বাইরে যখন ঋণাত্মক কুড়ি তখন বাইরে বেরোনো নিতান্ত বাহাদুরি। কিন্তু অফিস কাছারি? তার সাথে তো চলবে না জারিজুরি। অতএব সক্কাল সক্কাল মারকাটারি। অ্যাস্ট্রোনটের মত পোশাক পরে মুখ মাথা ঢেকে ছাড়তে হয় বাড়ি। তাই শীতবুড়ির সাথে বাঙালির চিরকালের আড়ি। কিন্তু ঋতু রকমারি। মহাকাল চালিয়ে দেয় তার গাড়ি। শীতের মুখে ছাই দিয়ে শিকাগো সামার আসে। কাঠবিড়ালি ঘুরে ফেরে বাড়ির আশেপাশে। একটা র‍্যাবিট খিল্লি করে চৌধুরীদের ঘাসে। জুলাই আগাস্ট মাসে, হাওয়ায় হাওয়ায় অনেক আদর ভাসে। সবুজ পাতার ঝালর ঝুলিয়ে বাকথর্ন গাছ হাসে। প্রচুর মজা প্রচুর ফান, প্রচুর হাসি প্রচুর গান – শিকাগো সামার সবাই ভালবাসে। গামবুট চিলেকোঠায় ওঠে, চপ্পলেরা নামে। যদিও শরীর একটু একটু ঘামে, তবুও যেন ছুটির চিঠি পৌঁছে যায়, ভোরেরবেলা, শিশির মাখা খামে। আনন্দধুন বাজতে থাকে সকাল, সন্ধ্যে কিম্বা মধ্যযামে। ইচ্ছে করে, এই গ্রীষ্মাবকাশ কক্ষনো না থামে।

হরজাই পাখি ডাকে। কোনো পথের বাঁকে, একটা দুটো ড্যান্ডিলিওন আপনি ফুটে থাকে। ফুলের টবে মাথা দোলায় পেটুনিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে। শাসন করি, শাসন করি চঞ্চল মনটাকে। তবুও সেখান খুঁজে ফেরে আনন্দ ভোমরাকে। কখনো আবার আদুরে মেঘ আকাশটাকে ঢাকে। টুপুর টাপুর শাম্মি কাপুর বৃষ্টি হতে থাকে। আড্ডা বসে বন্ধুবাড়ির বৈঠকখানাতে। হরেকরকম খানাতে পিনাতে, জমতে থাকে সন্ধেবাসর পরতে পরতে। মধ্যরাতেও চলতে থাকে মিঠি মিঠি বাঁতে। টুকরোটাকরা স্মৃতিরা সব জমা পড়ে ফেসবুকিয় খাতে। পি এন পি সি চলতে থাকে আড্ডাতে আড্ডাতে। প্রেম বিরহ মিলন চলে তোমাতে আমাতে।

মোটের ওপর সামার ডে-তে, ছেলে-বুড়ো সব জনাতে আনন্দেতে মাতে।   

তোমার সাথে

তোমার সঙ্গে হয় না রমণ অনেক প্রহর হল, খাতার পাতা…
আজকে না হয় তোমার কথাই বলো –
তোমার যত অন্ধ ব্যাকুলতা
তোমার যত মৃত্যু নিথরতা…

আমি না হয় আজকে থাকি শ্রোতা
তোমার আমার মধ্যে থাকুক সংলাপময় মুখর নীরবতা

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ২

May 20, 2019, Morning

বচ্ছরভরকার মত দেশে ফিরলে তড়িঘড়ি স্টুডিওতে ছুটতে হয় প্রায় প্রতিবারই। না না টলিউড পাড়ার নয়, আমাদের পাড়ার শিপ্রা স্টুডিও। উদ্দেশ্য নিজের ছবি তোলা। নিজের মুখের প্রতি কোন বিশুদ্ধ প্রেমজনিত কারণে নয়, তার জন্য তো সেলফি ক্যামেরাই আছে (হৈ হৈ করে সেলফি কনটেস্ট হচ্ছে এন্তার), বিভিন্ন জায়গায় প্রমাণপত্র দাখিলে, ভিসা স্ট্যাম্পিং নামক বাৎসরিক উৎসব ইত্যাদি সবেতেই প্রয়োজন পড়ে আমার মুখচ্ছবি। বেরোতেই পলিটিকাল পোস্টার – “মিলে মিশে লুটে খায় বুঝে গেছে জনতা / ও পাড়ার মোদী আর এ পাড়ার মমতা”। বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না কোন পার্টি। অজস্র “এই চিহ্নে ভোট দিন”-এর ভিড়ে এমন চমৎকার পোয়েট্রিকে দু নম্বর দিতেই হয়। কাস্তের ধার না থাকলেও কথার ধার আছে বইকি।        

শিপ্রা স্টুডিওর দাদা বহু পুরনো যাকে সেই স্কুল জীবন থেকে দেখে আসছি। কখনো নামটা জানা হয় নি। তবু কুশল বিনিময় হয় দেখা হলেই। প্রথাগত “কবে এলে?” প্রশ্নের উত্তর করে ভেতরে যখন ঢুকলাম সেই চেনা ছবি। একটা সাদা কাপড়ের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা বেঞ্চি। ওইখানে সাবজেক্ট বসবে। আর তার দিকে তাক করা আছে দৈত্যাকৃতি তিনটে লাইট। কখনো কখনো কোন একটা দৃশ্য কি কোন এক গন্ধ টাইমমেশিনে করে ফিরিয়ে নিয়ে যায় গত জন্মে। প্রাচীন সুগন্ধী অতীতে। 

তখন আমার বয়স পাঁচ। আর সেদিন আমার জন্মদিন। যেন কোন অনন্ত অতীত। সময়ের রেখাগুলো সমান্তরাল হয়ে গেছে তাই। ছোঁয়া যায় না শুধু দেখা যায়। আমি তখন খড়গপুর। আমি তখন কিশলয়। জন্মদিন তখন এক অদ্ভুত আনন্দ-মৌতাত বয়ে আনত। আজ যখন জন্মদিন আসে সে সাথে করে নিয়ে আসে কি একটা হারিয়ে ফেলার একটা যন্ত্রণা – নিজের ছেলেবেলাই হবে বোধ হয়। আমার কিশলয়-আমিকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা প্রতি মুহূর্তে আমাদের জীর্ণ করতে থাকে। কিন্তু বয়স যখন পাঁচ, জন্মদিন মানেই এক অবিমিশ্র আনন্দ। বিশেষ দিনটিতে নো বকাবকি। নো পড়াশুনো। মায়ের হাতের পায়েস আর “আমি ভীষণ মহার্ঘ্য” এইধরনের একটা অনুভূতি দিনভর। আমার জন্য মা মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছে। আমার জন্য পায়েস রাঁধছে। মহাকালের গর্ভ থেকে একখানা দিন শুধু আমার জন্যই কাস্টম-মেড করে বানানো হয়েছে। শুধু আমারই জন্য আজ সূর্য উঠেছে, দোয়েল পাখি ডেকেছে, জানালার পাশের শিউলি গাছ ফুল ঝরিয়েছে। রাতভর। আমার জন্য কৃষ্ণচূড়া গাছ রঙ-মাতাল। ভাবতে ভালো লাগত। 

এখনকার মত কেক কেটে লোক খাইয়ে ঘটা করে পাঁচ বছরের জন্মদিন পালন করার রীতি তখন ছিল না। সভ্যতা তখনও কিছু শম্বুক-শ্লথ, সম্মোহিত। সেই বয়সে আমি কিছু ঠিক করতাম না। বাড়ি থেকে বোধ হয় ঠিক করা হয়েছিল আমার আমার পঞ্চম বর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমার ছবি তোলা হবে। সময়, হা সময়। প্রতি মুহূর্তে যে পিছলে গলে বেরিয়ে যায় এক মুঠো জলের মত,  সেই সময়কে স্থাণু করে রাখার কি অদম্য মানবিক আগ্রহ! বাড়িতে ক্যামেরা ছিল না। তখন ক্যামেরা খুব একটা বিলাসদ্রব্য যা ধনীদের বাড়িতেই থাকত। আর সরস্বতী লক্ষ্মীর রেষারেষি খুব। যে বাড়িতে সরস্বতী সে বাড়িতে লক্ষ্মী পা রাখেন না। আমার মা স্কুলে পড়ায়। বাবা কলেজে। তাই ক্যামেরা কেনার সঙ্গতি ছিল না। স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলা হবে ঠিক হল। আমাকে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হল। স্পেশ্যাল ট্রিটমেন্ট পেয়ে আমি সুপার এক্সাইটেড। দাদা আর আমি বাবার হাত ধরে গেলাম চিত্রালি স্টুডিও। ইন্দা মোড়ে। দুটো গোড়ের মালা। একটা দাদা, একটা আমি পরে বসলাম। স্টুডিওর কাকু ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাথা দুটোকে ডানদিকে, বাঁ দিকে, ওপরে, নিচে, ঈশান, নৈঋত কোণে ঘোরালেন যতক্ষণ না মুখের সব হাসি অন্তর্হিত হয়ে মুখটা বেশ গোমড়া গোমড়া হয়। ইনস্ট্যান্ট নুডলের দিন নয় সেটা। ফিল্মে তোলা ছবিও ইনস্ট্যান্ট দেখা যায় না। ডার্করুমে ডেভেলপ হয়ে তবে তার দর্শন মিলবে। ফটোগ্রাফার নিজেও দেখতে পাবে না। আজকের চোখ দিয়ে দেখলে প্রায় অসম্ভব মনে হয়। খড়গপুরের চিত্রালি স্টুডিওর কাকু সময়ের হাত ধরে আজ রামরাজাতলার শিপ্রা স্টুডিওর দাদা হয়ে গেছে। তবে মুখ ক্রমাগত ওপর নীচ করতে বলে হাসি মারার টেকনিক এখনো আছে। 

ছবি তুলে বেরোলাম যখন, দেখলাম আকাশ কালো করে এসেছে। জ্যোৎস্নাস্নাত টাঁড়ভূমির সঙ্গমরতা, কামোন্মত্তা যুবতী সম্বর হরিণীর চোখের কাজল কে যেন চুরি করে এনে মুঠো মুঠো ছড়িয়ে দিয়েছে। আকাশময়। জ্বোরো রুগীর ঘন ঘন নিঃশ্বাসের মত হাওয়া চলছে। কালবৈশাখী।  অত্যাচারী জমিদারের মত তেজীয়ান নিষ্ঠুর সূর্যটা কোন অপরূপ জাদুবলে ছাপোষা গৃহস্থ স্বামীর মত মুখ লুকিয়েছে মেঘের আঁচলে। উড়নচণ্ডী প্রেমিকার মত হাওয়া কোনপথে যাবে নিজেই ঠিক করতে পারে নি। একবার দু পা সামনে যাচ্ছে তো তারপর তিন পা পেছনে। চিতায় পুড়তে থাকা শব যেমন শেষকালে এক বালতি জল পেয়ে শীতল হয়, তেমন করেই শীতল হবে এ শহর। আজ। হাওয়ায় হাওয়ায় তারই কানাকানি। আমি হাঁটতে হাঁটতে দেখি রাশি রাশি হলুদ কল্কে ফুল ঝরে পড়েছে রাস্তায়। অনাদরে। কেউ দলিত, বিগলিত। কেউ অনাহত, ফুটফুটে। একখানা অক্ষত ফুল তুলে নিলাম। সানাই হল গে “ফুলোফিলিক”। না, এমন কোনো শব্দ অভিধানে নেই। শব্দটা আমার বানানো। মানে হল সানাই ফুল খুব ভালবাসে। ফুলটা পেলে যত্ন করে রাখবে ওর ইউনিকর্ন পার্সে।

কৌলীন্যহীন কল্কে ফুল। পাপড়ির বাহার নেই, তবু গাঢ় হলুদ রঙা। আমাদের সারা জীবনটাই তো রঙের খোঁজ। আহার-নিদ্রা-মৈথুন-ফেসবুক অন্তে ক্রমাগত আমরা জীবনে রঙের পোঁচ দেওয়ারই চেষ্টা করছি। কিন্তু ভ্যানিশিং কালারের মতই এই রঙ দিলাম আর এই ভ্যানিশ। সবে রঙের প্যালেট থেকে এ রঙ ও রঙ মিশিয়ে মনোমত উজ্জ্বল রঙ বানিয়ে কালার ব্রাশ দিয়ে এই মাখালাম জীবনের গায়ে তো প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার চাপে এই আবার বর্ণহীন। আবার খোঁজ, খোঁজ, রঙের খোঁজ। অথচ কত অজস্র রঙের উপাচার আমাদের আশেপাশে। আমরা দেখতে পাই না। সভ্যতা আমাদের বর্ণান্ধ করেছে। এই আপাত বেরঙ দুনিয়ার রঙ-মিলন্তি খেলায় আমি তুমি সবাই সামিল। এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে যখন বাড়ি ঢুকলাম তখন জলপরীরা ডানা মেলেছে। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে।   

পর্ব ১ লিংকঃ https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ৩ লিংকঃ https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ১

কেমন আছেন যযাতির বন্ধুরা? অনেকদিন দেখা নেই বলে ভাবছেন যযাতি বুড়ো পটল তুলেছে নাকি? পটল তুলিনি ঠিকই কিন্তু ভাবনার বীজ রুয়ে-বুনে-চাষ-করে ফসল ঘরে তুলতে সময় লাগে বই কি! দেড় বছর পরে প্রায় মাস দেড়েকের জন্য গেছিলাম আমার নিজের শহরে। প্রতি মুহূর্তেই তো আমাদের মনোমধ্যে অন্তর্বিপ্লব ঘটে যায় নিঃশব্দে। তাই সেই পুরনো শহর নতুন চোখে ধরা পড়ল। তাই কতক লিপিবদ্ধ করেছি।

আপনাদের জন্য তাই রইল এই কলকাতা ডায়েরী। পড়ুন। হয়তো দেখবেন এর অনেক মুহূর্ত আপনিও যাপন করেছেন। উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও উদ্দেশ তো আমাদের কম বেশি একই। 

****      

May 18, 2019, Evening

গতকাল ভোর রাত্রেই এসে পৌঁছেছি আমার শহরে। কুসুম কোমল লাজুক সূর্যটার ঠোঁটে লেখা ছিল, “স্বাগতম”। কেউ দেখতে পায়নি। আমি পেয়েছি। বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কাঠবিড়ালি আনন্দরা। স্নেহের সুসিক্ত আবেশে ভারি হয়েছিল বাতাস। অনেককটা প্রত্যাশী মুখে ফুটে উঠেছিল হাসি। প্রিয়জন মিলনের এক অমোঘ আগ্রহ তাড়া করে ফেরে আমাদের। প্রত্যহ।

আমার তিন বছরের ডানা লোকানো ছোট্ট পরীর হাসিতে-কান্নায়-অভিমানে-দুঃখে-আনন্দে-উৎসাহে-বিড়ম্বনায় মর্মর, বিহ্বল তার দুই দিদি, মানে আমার দুই প্রিয় ভাইঝি। কাকা-কাম্মা-সানাইয়ের আসার অপেক্ষা করছিল তারা ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে। চিটেগুড়ে লেগে থাকা লোভাতুর পিঁপড়ের মত পান করি স্বজন সুখ। সারাদিন। দিনভর। বুদ্ধপূর্ণিমা কাল। চতুর্দশী চাঁদ তাই সন্ধেবেলা যৌবন বিলোচ্ছে অকৃপণ। ভোলানাথ আশ্রমে একবার যেতে হবে। বাবা বলে গেছে। আমিও বেরিয়ে পড়ি। মা বলেছিল টোটো করে নিতে। আমি ভাবলাম, হাঁটিনা খানিক। এ শহর তো রোজ রোজ আসে না আমার কাছে। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহে হাহুতাশ করতে থাকা আমার শহর। বাস-বাইক-কার-টোটো উদ্গত ধূলিধূসরিত আমার শহর। ক্যান্সারকোষের মত দ্রুত বাড়তে থাকা উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ির চাপে নিঃসঙ্গ হতে থাকা আমার শহর। তবু আজ কোকিল শুনেছি ভোররাতে। কে বলে – “কোকিল শুধু বসন্তের, উহারা শীত গ্রীষ্মের কেহ নহে”। আজকে বৈশাখী ভোরেও কোকিলের কণ্ঠ চালিয়েছে সঙ্গিনীর খোঁজ। এখন সন্ধেবেলা শব্দহীন ধোঁয়াহীন টোটোরা সর্বত্রগামী। আমি লুব্ধ দৃষ্টি হানি। কিন্তু না এগারো নম্বর বাস অর্থাৎ হাঁটাই শ্রেয়। শহরের গল্পরা তো অনাদরে পড়ে থাকে হাঁটা রাস্তায়। সঙ্গিনীকে চিনতে যেমন মধুচন্দ্রিমার রাত্রিনিবাস, শহরকে চিনতে তেমন তার হাঁটা রাস্তা। আমি হাঁটতে থাকি। আমি দেখতে থাকি। শুষে নিতে থাকি আমার অতীতকে। চেখে দেখি পরিবর্তন। বর্তমানকে। বুড়ো শিবমন্দিরের পাশ দিয়ে যাই। মন্দিরের চাতালে তিনটে বৃদ্ধ খালি গায়ে বসে। আগের বছরেও যেন ওরা ওখানেই ওরকম করে বসেছিল। ঠায়। নিশ্চুপ। অনন্তকাল ধরে ওরা ওখানে ওরকম করেই বসে আছে। আজ থেকে অর্বুদ কল্প পরেও ওরা ওরকম করেই ওখানে বসে থাকবে বাক্যহীন। আমি পাশ কাটিয়ে ডানদিকে চলি। গল্পেরা চলে সাথে সাথে। এইসব গল্পগাছা কুড়িয়ে বাড়িয়েই তো জীবন। দু চারটে চারপেয়ে জীব ঘুরে বেড়ায় উদ্দেশহীন। শীর্ণ, মন্থর। দু একটি বসে। এই তাপপ্রবাহের সাথে যোঝবার শক্তি সংগ্রহ করছে ক্ষণিকের জন্য। চোখে ক্লান্ত বিষণ্ণতা। মাসখানেকের মধ্যে  এ শহরে এসে পড়বে বর্ষার সজল সঘন উচ্ছ্বাস। ওদের চোখে সেই মৌসুমী সজীবতারই নিরবধি প্রতীক্ষা। 

শর্টকাট নিতে বাঁদিকে বাঁকি। কিছুদূর যেতেই পথ রূদ্ধ। কিন্তু এখান দিয়ে তো রাস্তা ছিল! শ্যাওলাধরা মৈনাকদের বাড়ির পাশ দিয়ে সোজা বেরোনো যেত ক্যাঁচাল সঙ্ঘ ক্লাবের কাছে। ক্যাঁচাল সঙ্ঘের একটা ভালো নাম ছিল কিন্তু বড় বেশি ক্যাঁচাল করে এই উপাধি পেয়েছে তারা। সেই চেনা পথ এমন করে পথহারা হল কেমন করে? এক শূন্যদৃষ্টি লোক বসে বৈশাখী তাপে ভাজা ভাজা হচ্ছে। জিগেস করলাম – দাদা এখান দিয়ে হাওড়া হোমসের দিকে বেরোনো যেতো না? “কোথা থেকে এসেছ হে পথিকবর” টাইপ একটা দৃষ্টি হেনে বলল, “সে অনেকদিন বন্ধ। পার্ক হয়েছে। যান না। পার্কের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যান।” জন্মাবধি দেখে আসছি নামগোত্রহীন যে পুকুরটাকে, সেটাকেই বংশমর্যাদা দান করে তৈরী হয়েছে বাচ্চাদের পার্ক আর রামকৃষ্ণ উপাসনা মন্দির। ভারি মনোহর। তবে সেই কৌলীন্যবৃদ্ধির দায়ে পায়ে-হাঁটা পথ পড়েছে কাটা। আমার অতীত কি তবে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে? মন্দাক্রান্তা চালে বয়ে চলে সময়। তার রথারূঢ় বিজয়গৌরবে কাটা পড়েছে কত কত রাজ্যপাট –  নীলনদ, সিন্ধুনদের পার্শ্ববর্তী সভ্যতা। এ তো সামান্য হতভাগা পায়ে-হাঁটা পথ। 

পরিবর্তিত ভূগোলের মধ্যে দিয়ে পথ করে নিয়ে বড় রাস্তায় পড়ি। ডান দিকে আশ্রমের গলি। নির্বাচনের গরম নিঃশ্বাস বাতাসে। পাঁচিলে ছোটো ছোটো পতাকায় শোভা পাচ্ছে জোড়াফুল, পদ্ম, কাস্তে-হাতুড়ি। চিহ্নধারীরা যেখানে একে অপরকে বাক্যবাণে কুচিকুচি করছে, চিহ্নগুলো একে অপরের গায়ে ঢলে পড়েছে পরম বিশ্বাসে। ওদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ওরা ঘাতকের ভয়ে ভীত নয়। আশ্রমের মধ্যে একটা প্রাচীন আমগাছ অজস্র ডালপালা বিস্তার করে মাতৃস্নেহে ধারণ করছে পুরোনো বাড়িটাকে। ফলভারে ন্যুব্জ। দূরে একটা তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মাথা দোলাচ্ছে হা-হা-উষ্ণ বাতাসে।

দেখি আর ভাবি এখনো তো সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায় নি। এই তো আমার দেশ, আমার শহরতলি। এখনো তো প্রাণ জেগে আছে লালসাক্লিন্ন শরীরে। আজ সকালেই এক টোটোওলাকে খুচরো কুড়ি টাকা দিতে না পেরে দশ টাকার একটা নোট দেওয়াতে বলেছিল, “কোনো ব্যাপার না। পরে দেখা হলে বাকি দশ টাকা দিয়ে দেবেন।” তবু জোর করে দাঁড় করিয়ে খুচরো করে এনে দিলাম। কারণ জানি দেখা হবে না। যেমন করে দেখা হয় নি শিশুবয়সের প্রাণের বন্ধু বুবুনের সাথে আর কোনোদিন। দেখা হয় নি শিপ্রা এক্সপ্রেসে ইন্দোর যাওয়ার পথের বালিকা সহচরীর সাথে। এই ব্যস্তসমস্ত গতিবান সভ্যতায় কারু সাথে কারু আর দেখা হয় না। একই ছাদের তলায় থাকা দুজনের মধ্যেও অনেক সময় অনন্ত ছায়াপথ। তবু কোকিল ডাকে, তবু অকারণে হৃদয় খুলে ধরে কেউ আচম্বিতে। রাজনৈতিক রক্তপাত, ঘৃণা, হানাহানি থেকে দূরে এ আমার স্নেহসিঞ্চনে সুসিক্ত স্নেহার্দ্র স্বভূমি।

পর্ব ২ লিঙ্ক – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

পর্ব ৩ লিংক – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

ভাষা – ছোটগল্প

[প্রকাশিত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত দখিনা পত্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, একটি আনন্দধারা উদ্যোগ

https://anandodhara.com/wp-content/uploads/2019/03/Dakhina.pdf  ]

ঠাম্মার একটা আঙুল নিজের আঙুলে জড়িয়ে নদীর বাঁধানো ঘাটটায় বসেছিল কাহিনী। তখন সবে সন্ধে নামছে। নদীর ওপারে ঐ দূরে লাল তামার চাকতির মত সূর্যটা গাছগাছালির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে আহ্লাদে আলো আর রঙের খেলায় মেতেছে। আকাশে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা মেঘখন্ডগুলোকে কখনো লাল, কখনো কমলা রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যেন কোন খেয়ালী চিত্রকর সমগ্র পরিবেশটাকে আরক্তিম করে তুলেছে। এইরকম সময়গুলোতে যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তি মানুষকে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়ে যায়। ষোলো বছরের ফুটফুটে মেয়ে কাহিনী, সারাক্ষণ যার মুখে ফুলঝুরি ছোটে, সে অব্দি চুপ করে দেখছিল নদীর জলে আকাশের থেকে ঝরে পড়া সোনা আলো আর তার আবীর রঙের ঝিকিমিকি। কলকাতা থেকে কদিনের জন্য দেশের বাড়িতে দিদার কাছে এসেছে সে। তার কোমর লম্বা চুল মোটা ডাঁটো বিনুনি হয়ে তার সদ্যোদ্ভিন্ন বুকের ওপর আলগোছে পড়ে আছে। সন্ধের মৃদুমন্দ হাওয়ায় বিনুনির শেকল থেকে মুক্তি নিয়ে দু এক গুচ্ছ অবাধ্য চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে। চোখের ওপর থেকে চুল সরাতে সরাতে কাহিনী জিগ্যেস করে উঠল

“আচ্ছা গ্র্যানি, শুনেছি, হোয়েন উ ওয়্যার এ কিড, তুমি আর তোমার গ্র্যানিও এই নদীর পাশে এসে বসতে।”

“হ্যাঁ রে। আমিও ঠিক তোর মত আমার ঠাম্মার হাত ধরে এই নদীর ধারে বসে কত বিকেল থেকে সন্ধে হতে দেখেছি। কিন্তু আজকাল আর এই নদীটাকে ঠিক চিনতে পারি না। অনেক বদলে গেছে।”

“কেন? সেই ছোটবেলা থেকে দেখছ। তাও চিনতে পারো না কেন?”

“আসলে নদীরা তো বহতা। সময়ের সাথে সাথে ওরা গতি পরবর্তন করে। ক্রমাগত রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যায়। আগে এর জল কেমন হাল্কা নীল ছিল। এখন কেমন ছাইরঙা হয়ে গেছে। ওপর থেকে জলের মধ্যে যে মাছগুলো দেখতে পাওয়া যেত তারও রঙ, আকৃতি, প্রকৃতি বদলে গেছে।”

“বহতা? ইউ মীন ফ্লোয়িং রাইট? কাম অন্ গ্র্যানি, তুমি না? মাঝে মাঝে কোন ভাষায় যে কথা বলো বুঝতেই পারি না। এনিওয়েজ, আচ্ছা একটা কথা বলো। তোমার গ্র্যানির সাথে তোমার গ্র্যানপার পারহ্যাপ্স লাভ ম্যারেজ তাই না?”

“ধুর বোকা। তখনকার দিনে এই আজকালকার মত প্রেম টেম হত না। আমরা, আমাদের মা ঠাকুমারা তোদের মত, ওই তোদের ভাষায়, আল্ট্রামডার্ন ছিল না। বুঝলি? কেন বল তো? তোর কেন মনে হল আমার দাদু ঠাকুমার প্রেম করে বিয়ে?”

“না মানে তোমার গ্র্যানি তো আই গেস বাঙালি না। তাই ভাবছিলাম।”

“ও মা। দিদিমা বাঙালি নয় কেন রে? দিব্যি নৈহাটির মেয়ে। অবাঙালি হতে যাবে কোন দুঃখে?”

“বারে তুমিই তো বলেছিলে তোমার গ্র্যানির নাম, লেট মী রিমেম্বার, কুমুদিনী। রাইট? তো সেটা তো আর বাংলা নাম নয়। ইন ফ্যাক্ট বাংলাতে এরকম কোন শব্দই নেই।”

“ধুর বোকা। কুমুদিনী একদম বাংলা শব্দ। এক ধরণের ফুল। যেমন আমার নাম কথা। তোমার মায়ের নাম যেমন করবী সেরকম।”

“রিয়েলি? উ মীন কুমুদিনী ইজ এ বেঙ্গলি ওয়ার্ড? তোমার নাম, মায়ের নাম – কথা, করবী একসেটরা বাংলা শব্দ জানি। কিন্তু কুমুদিনী?” অবিশ্বাসী চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে কাহিনী।

বিরক্তিতে মাথা নাড়েন বৃদ্ধা কথা সান্যাল। “হ্যাঁ রে। সত্যি কি দিনকাল এলো। তোরা, মানে তোদের প্রজন্ম বা তার পরের পরের প্রজন্ম, তোরা কি বাংলা ভাষাটাকে পুরোপুরি ভুলে যাবি? আজ থেকে আর একশ বছর পর ভাষাটা কি সত্যিই থাকবে? তুই তো ইংরেজি শব্দ ছাড়া এক মিনিটও কথা বলতে পারিস না। আর বাংলার অর্ধেক শব্দ অব্যবহারে অপ্রচলিত হয়ে পড়ছে দেখছি। তোর দাদুর নাম ভাস্কর। সূর্যের প্রতিশব্দ। ভাস্কর তো দূরে থাক তোরা সূর্য কথাটাই ভুলতে বসেছিস।  রৌদ্রোজ্জ্বল দিন হলে সেটাকে বলিস সানি ডে। কে জানে বাবা এই বাংলা ভাষাটা থাকবে তো?”

কাহিনী মুখে মিচকে ফাজিল হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে কথার গলা জড়িয়ে ধরল। গাঢ়স্বরে ডাকল “ঠাম্মা”। সে জানে গ্র্যানিকে ঠাম্মা বলে ডাকলে তার সব রাগে জল ঢালা হয়ে যায়। কথা কপট রাগ দেখিয়ে বললেন “বল”।

“তোমায় কে বলেছে এগুলো ইংরেজি শব্দ। এই যে সানি ডে, লাভ ম্যারেজ, গেস যে শব্দগুলো আমি ইউজ করেছি এতক্ষণ, এগুলো তো বাংলা শব্দই ঠাম্মা।”

“আবার ফাজলামি করছিস? এগুলো কবে থেকে বাংলা শব্দ হল শুনি?”

“ধরো যদি বলি, আজ থেকে ঠাম্মি? একটা কথা বলো। আক্কেল, আসল, এলাকা, ওজন এই শব্দগুলো বাংলা তো ঠাম্মা?

“হুম”

“আর, আর আওয়াজ, আন্দাজ, আয়না, খারাপ?”

“ও মা, ওগুলো বাংলা হবে না কেন? তুই কি বলছিস আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“এই ওয়ার্ডসগুলো ঠাম্মা বাংলার পার্ট ছিল না ফর ইটার্নিটি। প্রথম চারটে শব্দ আরবি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে এসেছে। পরের চারটে ফার্সী ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে এসেছে। এলাকা শব্দের আসল আরবি শব্দ ইলাকাহ, খারাপ শব্দের ফার্সী শব্দ খারাব।”

“তুই কি বলতে চাইছিস?”

“বেঙ্গলি যদি এতদিন ধরে অন্য অন্য ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে ওয়ার্ড রিসিভ করে এসেছে তবে আজ কেন তার এক্সসেপশান হবে বলো তো? দাদু তো বলে স্যাংস্কৃট এক সময়ে এত রিজিড হয়ে গেছিল যে ইট রিফিউজড টু অ্যাডপ্ট। তাই সাধারণ মানুষ স্যাংস্কৃটে নয়, প্রাকৃতে কথা বলত। স্যাংস্কৃট থেকে যায় লেখার ভাষা হিসেবে। আর স্পোকেন ল্যাঙ্গুয়েজটা, তোমরা যেটাকে কথ্য ভাষা বলো, সেটা গ্র্যাজুয়ালি বদলাতে থাকে। আর তার ফলেই স্যাংস্কৃটের ইভেনচুয়াল ডেথ।”

“তার মানে…”

“তার মানে, ” কাহিনী ঠাম্মার গালে একটা চুমু খেয়ে বলে উঠল “ইংলিশ ওয়ার্ডগুলোকে রিজেক্ট করে নয়, অ্যাক্সেপ্ট করেই তোমার আদরের বাংলা ভাষা বাঁচবে, মাই ডিয়ার ঠাম্মি।”

“কি বলছিস? এই এত এত ইংরেজি শব্দ আমাদের শব্দ বলে মেনে নিতে হবে?”

“ওরাও নিচ্ছে ঠাম্মা। প্রতি বছর ইংরেজিতে ঢোকে ক্লোজ টু ফাইভ টু টেন ওয়ার্ডস। ইয়োগা, বাজার, জাংগল এগুলো অক্সফোর্ড ডিকশানারিতে জায়গা পেয়েছে। ট্রু দ্যাট, ইংলিশ যত ওয়ার্ড বরো করে তার থেকে বেশি ওয়ার্ড লেন্ড করে। কিন্তু তবু নিচ্ছে তো। বাংলাও কেন নেবে না? তাছাড়া কান বন্ধ করে বসে থাকলে ভাষার ইনফিল্ট্রেশান তো তুমি স্টপ করতে পারবে না ঠাম্মা? একটা ল্যাঙ্গুয়েজের পাওয়ারের কাছে আমরা ওয়ে টু উইক। সে এক নদীর মত। নিয়ম মেনে চলা তার স্বভাব নয়। কখনো তার এক জায়গায় চড়া পড়ে, শুকিয়ে যায় আবার অন্য জায়গায় সে পাড় ভেঙ্গে নতুন পথ করে নেয়। কখনো অন্যান্য শাখানদীর জলধারা এসে মেশে। সেটাকে কনটামিনেশান না ভেবে এক্সপ্যানশান ভাবলে প্রবলেম সলভ হয়ে যায়। আমাদের বাংলার বলার ভাষা আর লেখার ভাষা যদি প্রচণ্ড ডিফারেন্ট হয়ে যায়, ঠাম্মা, তবেই বাংলা ভাষার মৃত্যু হবে। তাই স্নবের মত মুখ ঘুরিয়ে বসে না থেকে চলো এই ওয়ার্ডগুলো আমরা নিজেদের শব্দ বলে গ্রহণ করে নিই। এই আমদানি করা শব্দগুলোকে লেখার জন্য প্রপার স্পেলিং ডিভাইস করি। চলো“শব্দ” আর “ওয়ার্ড”-কে আমরা সিনোনিম, তোমরা কি যেন বলো, হ্যাঁ, সমার্থক শব্দ বলে অ্যাক্সেপ্ট করে নিই। করা যায় না ঠাম্মা?”

“কথাটাতে তোর যুক্তি আছে।”

“যুক্তি আছে। আমি লজিকাল কথাই বলছি। এই যে আমি লজিকাল ওয়ার্ডটা ইউজ করলাম, লিখতে গেলে কেন এর বাংলা ট্রান্সলেশান মনে করতে মাথার চুল ছিঁড়ব? লজিকাল ওয়ার্ডটা বহু ব্যাবহারে এখন আমাদেরই শব্দ হয়ে গেছে। লেখার ভাষা আর বলার ভাষার মধ্যে প্যারিটি থাকতে হবে, সামঞ্জস্য থাকতে হবে। আমি অলরেডি বেঙ্গলি নভেলের অনেক শব্দ বুঝতে পারি না। কারণ প্রচলিত ইংলিশ শব্দ ব্যাবহার না করে তার অভিধান স্বীকৃত বাংলা শব্দ ইউজ করা হয়। এটা তো একধরনের ইউজলেস শভিনিজম বা তোমার ডিকশানে যাকে বলে অপ্রয়োজনীয় বিদগ্ধতা। তুমি এই নদীটাকে চিনতে পারো না বললে না? যদি চিনতে পারার জন্য এই নদীটার পাড় ধরে ধরে শক্ত বাঁধ দিয়ে নদীটাকে বদলাতে না দিতে তবে কে বলতে পারে হয়তো নদীটা শুকিয়ে যেত, আমরা নদীটা দেখতেই পেতাম না। তোমার সাথে নদীটার পাড়ে বসে এই সানসেটটা দেখতেই পেতাম না। তাই বলি কি…বাংলা ভাষার সো কলড ফ্ল্যাগ বিয়ারার বা ধ্বজাধারীদের বলো যে ভাষাটাকে এক্সপ্যান্ড করতে দিতে। এই নতুন শব্দগুলোকে বাঙলারই শব্দ বলে স্বীকৃতি দিতে। কথা দিচ্ছি আমার ঠাম্মির ভাষাকে আমি, আমরা মরতে দেব না। অনেক বকে ফেলেছি। এবারে আমার সুইট ঠাম্মি আমার এই গালে, হ্যাঁ ঠিক এইখানে, একটা কিসি দিয়ে দাও তো।”

কাহিনীর দৃষ্টিকোণটা দেখে অশীতিপর বৃদ্ধা কথার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বাংলা ভাষা বাঁচবে। তার আদরের নাতনি কাহিনীর, কাহিনীদের হাত ধরেই বাঁচবে। বিদেশী শব্দ গ্রহণ করে ওরা বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। ওরা ওদের মাতৃভাষা, মাদার টাঙকে মরতে দেবে না। পরম আদরে চুমু খান তিনি তার চোখের মণি নাতনিটিকে।

ঠাকুমা-নাতনি, কথা ও কাহিনী, অনেকক্ষণ গললগ্ন হয়ে থাকে। ততক্ষণে গোধূলির আলোর খেলা মিলিয়ে গিয়ে সন্ধে নেমেছে। নদী সংলগ্ন গাছগুলো স্থির হয়ে কোন সুগম্ভীরের ধ্যানে নিমগ্ন হয়েছে। ঠাম্মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে কাহিনী বলে ওঠে “ঠাম্মা এই রিভারটার নাম কি বলেছিলে?”

“এটা তো একটা ছোট নদী। সেরকম কোনো নাম নেই। আমাদের এই লক্ষীকান্তপুরে এটাকে সবাই ভাসা নদী বলে। অন্য গ্রামে অন্য নাম।”

ইয়ার্কির লেশমাত্র নেই এমন একটা গাঢ়, প্রায়-অচেনা স্বরে কাহিনী বলে ওঠে “গ্র্যানি আমার মনে হয় লোকমুখে নদীটার নাম ভাসা হয়ে গেছে। নদীটার আসল নাম বোধ হয় ছিল “ভাষা”।”

কথা চোখ তুলে নদীটার দিকে তাকান। যেন এক নতুন আঙ্গিকে দেখতে পান নদীটিকে। তারপর অপলক দৃষ্টিতে নাতনির দিকে চেয়ে থাকেন আর তার ঘন ঝালর চুলের মধ্যে বিলি কাটতে থাকেন।