নম্বর

প্রথম বই প্রকাশ হওয়ায় কেমন লাগল জিজ্ঞাসা করেছেন এক শুভার্থী। উত্তরে বলি,

না তেমন হাতি-ঘোড়া কিছু লাগে না। না, খুব একটা ল্যাজমোটা হইনি। আমার ল্যাজ ছোটবেলা থেকেই মোটা ছিল। নতুন করে মোটা হওয়ার কিছু নেই। ফেসবুকে স্ত্রী-কন্যা সহ সেলফি দিলে আগেও দুশ লাইক পড়ত আর লেখা দিলে লাইক দুই ডিজিটেও যেত না। এখনো তাই হবে। কথা দিচ্ছি, এরপরেও প্রতিদিন শব্দ রেওয়াজ করব যেমন এখন করি। কথা দিচ্ছি, সস্তায় নাম কামানোর চেষ্টা কখনো করিনি। এখনো করব না। চেষ্টা করব যাতে জীবনে কোনো একটা অন্তত লেখা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ পরীক্ষায় শেষ ঘণ্টি বেজে যাওয়ার মত অনুভূতি অবশ্যই হয়। সেই যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় নিজেকে প্রমাণ করার আকুল প্রয়াস আর তারপর খাতাটা জমা দিয়ে দুরুদুরু বুকে নম্বরের অপেক্ষা করা। অনেকটা সেইরকম। প্রথমদিনেই বইমেলায় যারা “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” বইসংগ্রহ করেছে, বই হাতে ছবি পাঠিয়েছে, তারা সকলেই সেই এক্সামিনার। আমার এক বন্ধু সায়ন্তন দিল্লির এক ব্যস্ত উকিল। দুদিনের ঝটিতি সফরে কলকাতা এসেও বন্ধুর বই সংগ্রহ করতে বইমেলা প্রাঙ্গণে ঢুঁ মেরে চিলের মত দক্ষতায় তুলে নিয়ে গেছে বইখানা। স্কুলের বন্ধু হলেই এমনটা সম্ভব। মোট কথা বইটা বইমেলা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে এমন কি কলকাতার চৌহদ্দি পেরিয়ে পাড়ি দিয়েছে পুরো পনেরশ কিমি। কিন্তু নম্বর পড়তে শুরু করবে তখনই যখন গল্পগুলোর সাথে মানুষগুলোর শুভদৃষ্টি হবে।  

শুধু একটাই মুশকিল। এই পরীক্ষায় দুরকমের নম্বর দেওয়ার প্রথা। একটা সৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে মনে মনে। আর একটা অসৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে সামনাসামনি। অসৎ নম্বরটা হবে লেটার মার্কস। আর সৎ নম্বরে পরীক্ষায় পাশ করলাম কিনা, সেটা বোধ হয় কখনো জানা যাবে না।

বইমেলা অতিক্রান্ত। বইটা এখন ফ্লিপকার্টে পাওয়া যাচ্ছে। Flipkart-এ গিয়ে “Jojatir Jhuli” বলে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে। গল্পের গরু গাছে ঠিকঠাক উঠেছে কিনা দেখতে এক কপি সংগ্রহ করবেন। দেশের যেকোনো প্রান্তেই কিন্তু ডেলিভারি হবে।

https://www.flipkart.com/jojatir-jhuli/p/itmfddfjpdqtqggg?pid=RBKFDCGMBJTKZAZN&lid=LSTRBKFDCGMBJTKZAZNVGGGS4&marketplace=FLIPKART&srno=s_1_1&otracker=AS_Query_HistoryAutoSuggest_0_2&fm=SEARCH&iid=417238ca-99f3-46d0-895a-dc5694f1347f.RBKFDCGMBJTKZAZN.SEARCH&ppt=Homepage&ppn=Homepage&ssid=nzouf4tfq80000001549471830883&qH=463fb7b5b874e6b9

ঝোলায় পুরুন যযাতির ঝুলি

দেখছেন তো? লাইন পড়ে গেছে…

আমাদের মাস্টার গোগোল অর্ধকায়স্থ, মিসেস অ্যাংলোলেডি চৌধুরী, মিস্টার উন্মাদ হিজিবিজিবিজ আর মহামান্য রামগরুড় তর্করত্ন এরা সব লাইন দিয়ে আছে এবারে বইমেলায় নিজের বইয়ের ঝোলায় এক কপি যযাতির ঝুলি ভরবে বলে… আপনি আবার ফাঁকে পড়ে না যান তাই এইবেলা খবরটা চুপি চুপি দিয়ে দিলাম। বইমেলায় পত্রভারতী স্টল নাম্বার 359-এর বাইরে ইঁট পেতে ফেলুন। ঝাঁপি খুলতেই ঝাঁপ দিয়ে পড়ুন। সংগ্রহ করে ফেলুন আপনার কপিটা। “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” পত্রভারতী থেকে আসছে মুদ্রিত মাধ্যমে। এবারে বইমেলায়।

যযাতি কে? ঝুলিতে কি আছে? তাহলে বলি শুনুন। তা হয়েছে কি সেই ছোটবেলায় সুকুমার দাদু বলে দিয়েছেন “আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার। কাতুকুতু বুড়োর কাছে যেও না খবরদার”। তো আমিও তাই যখন সাত সাগরপার পাড়ি দিয়েছি, সাবধান থেকেছি যাতে কাতুকুতু বুড়োর ত্রহস্পর্শ মাড়াতে না হয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে আলাপ হল এক বুড়োর সাথে নাম নাকি তাঁর যযাতি। আর তাঁর কথাতে তিনি হলেন এই কাতুকুতু বুড়োর “মামার পিসিঠাম্মার ভাইয়ের নাতির বোনের ছেলে।” পুরো সাড়ে চৌত্রিশ মিনিট ভেবে ভেবে দেখলাম আদতে তিনি কাতুকুতু বুড়োর ভাই হন। সে যাকগে যাক। এই যযাতি বুড়ো অন্তত কথায় কথায় কাতুকুতু দিয়ে অসভ্যতা করেন না। কিন্তু কাতুকুতু বুড়োর সাথে তাঁর সম্পর্ক বলার ধরণ দেখেই বুঝছেন নিশ্চয়ই এ ভদ্রলোকের বেশি কথা বলার বদরোগ আছে। তো সে যযাতি বুড়ো রোজ এসে আগডুম বাগডুম গপ্পো বলে যায়। সাথে ভয় দেখায় তক্ষুনি তক্ষুনি লিখে না ফেললে সে অবমাননার শোধ নিতে তিনি কাতুকুতু বুড়োকে পাঠিয়ে দেবেন। আমিও তাই টুকে রাখি এই ভেবে যে ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিদের শোনাতে কাজে লাগবে। আর তাছাড়া কাতুকুতু বুড়োর কাছে কাতুকুতু খাওয়ার থেকে যযাতি বুড়োর গপ্পো শোনা ঢের ভালো ব্যাপার।

পত্রভারতী বলে একটা পেল্লাই ছাপাখানা বলে কিনা এইসব হাবিজাবি গপ্পোগুলো ছাপিয়ে দেবে। তো আমি বললাম, “তা দাও খন।” তাই কাতুকুতু বুড়োর কাছে অষ্টপ্রহর কাতুকুতু না খেতে চাইলে এবারের বইমেলায় স্টল 359 থেকে ঝটপট কিনে ফেলুন এক কপি “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”।

ও হ্যাঁ এই অসাধারণ কার্টুনটির জনক আমার বিশেষ বন্ধু বহুমুখী প্রতিভাবান শ্রীল শ্রীযুক্ত অভিষেক রায়। তার সব কটা প্রতিভাকে খুব ছোট করে বললেও লাগে বাহান্ন মিনিট তিপ্পান্ন সেকেন্ড। তাই আপাতত কার্টুনিস্ট অভিষেকের সাথেই পরিচিত হোন।

যযাতির ঝুলি এবার মুদ্রিত মাধ্যমে

যযাতির সুধী যজমানেরা, কেমন আছেন সকলে? কলকাতার শীতের মরশুম কেমন উপভোগ করছেন? বাজারে টাটকা তাজা ওলটা ফুলকপিটা দরদাম করে কিনতে নিশ্চয়ই সকাল সকাল পৌঁছে যাচ্ছেন মাফলার চড়িয়ে। বাড়ির কুঁচোকাঁচাকে স্কুলে পাঠানোর আগে নিশ্চয়ই হনুমান টুপি পড়িয়ে দিচ্ছেন? রাত দশটা বাজলেই লেপের তুলোর নরমে-আদরে-পায়রা-গরমে ঢুকে পড়ার জন্য মন উচাটন নিশ্চয়ই? সকালবেলা সেই রাতভরের প্রেমিকা কম্বলের সাথে ব্রেকআপের মাহেন্দ্রক্ষণে নিশ্চয়ই মনে রাজ্যের বিরক্তি। গিজারে আজকাল গরমজল বেরলেও দু একটা দিন স্নানের সাথে মান করেন নি এমনটা একগলা গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে বললেও কি কেউ আর বিশ্বাস করবে? পৌষপাবনে গৃহিণী গোকুলপিঠে  বানালে বেড়াল-পায়ে রান্নাঘরে হানা দিয়ে দু একটার সদ্গতি করছেন নিশ্চয়ই? সব মিলিয়ে শীতের বাজার সরগরম।

আগে তো বাঙালির ছিল বারো মাসে তের পাবন। তবে এখন হচ্ছে প্রতিমাসেই তেরোটা করে মেলা। হস্তশিল্প মেলা, পদশিল্প মেলা, উদরশিল্প মেলা ইয়ে থুড়ি মানে খাদ্যমেলা, আরও কত কি? তবে সব মেলার সেরা নিশ্চয়ই বাঙালির বইমেলা। যখন এইসব মেলারা মায়ের গর্ভে ছিল (দিদির গর্ভে বলা উচিত ছিল কি?) তখন থেকেই বইমেলা। ধুলো পায়ে পায়ে স্টলে স্টলে ঘোরা, বই চেখে চেখে দেখা, পছন্দের বইখানা খরিদ করে ক্রমশ-ভারি-হতে-থাকা নিজের বইয়ের ঝুলিতে ভরে ফেলা আর মাঝে মাঝে রসনাতৃপ্তির জন্য বইমেলা চত্বরেই চটপটে খাবারের দোকানে মাথা গলানো। সব মিলিয়ে বইমেলায় মেলা আনন্দ, সুপার ফান।

আপনারা যারা যযাতির ঝুলি পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য এবার কিন্তু আর একটা মস্ত খবর আছে। নামী পত্রভারতী প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত মাধ্যমে আসছে “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”। বারোখানা টানটান কাহিনী। বারো খানা রোববারের দুপুরে শুয়ে শুয়ে আলগোছে “যযাতির ঝুলি”-র পাতা ওলটানো।

আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ এক কপি সংগ্রহ করবেন। আপনার বইয়ের তাকে আদর করে তুলে নেবেন। বইটি পড়ে হতাশ হবেন না এটা যযাতির গ্যারান্টি। আপনার গল্পজিভে যাতে চড়া না পড়ে যায় তাই ঝুলি থেকে ভিন্ন জনার ও স্বাদের গল্প চয়ন করেছি বারোখানা। কখনো অম্লমধুর দাম্পত্যকলহ তো কখনো কর্কশ, ঊষর দিনের কড়চা, কখনো দাদু-নাতির সম্পর্কের পায়রাগরম উত্তাপ তো কখনো ব্যর্থ প্রেমিকার ঈর্ষানল। কখনো কঠোর বাস্তব তো কখনো লোমখাড়া করা অদ্ভুতুড়ে গল্প অথবা কল্পবিজ্ঞানলোক। কুশীলবেরা কখনো রবীন্দ্রনাথ তো কখনো প্রফেসর শঙ্কু, কখনো মানুষ তো কখনো না-মানুষ, কখনো চোর তো কখনো পকেটমার। ঝুলিতে প্যানপ্যানানি ঘ্যানঘ্যানানি নেই, নেই শাশুড়ি বৌ। অনর্থক সুড়সুড়ি নেই, নঞর্থক জীবনভাষ্য নেই। আছে এক ডজন খাস্তা তাজা মুচমুচে গপ্পো। আছে নিখাদ আদ্যন্ত বাঙালিয়ানা। যে গল্প শুনতে পান অফিসে, বাসে, ট্রেনে, শনিবারীয় পার্টিতে, রবিবাসরীয় বৈঠকখানায় – যাকে ইংরেজিতে বলে life as it is. শীতের দুপুরে কম্বলের ওমের নিরাপত্তায় নিখাদ কাহিনীক্ষুধা নিবৃত্তি করার জন্য এবারের কলকাতা বইমেলায় পত্রভারতীর স্টল 359 থেকে অবশ্যই সংগ্রহ করুন এক কপি যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো

প্রিয়জনকে উপহার দিন। আর হ্যাঁ, পড়া হয়ে গেলে কেমন লাগল যযাতির ঝুলি ব্লগে বা ফেসবুক পেজে একটা মন্তব্য করে জানাবেন। প্লীজ প্লীজ প্লীজ জানাবেন। কারণ আপনাদের উৎসাহ, কমেন্ট, তারিফ এগুলোই, বিশ্বাস করুন, যযাতির পথ চলার একমাত্র মাধুকরী। আপনাদের ভালবাসাতেই যযাতির কলম সচল থাকে। আজও।  

সিম্বা-কিম্বা-জুম্বা

ছোটবেলায় একটা ভূতের গপ্পো পড়েছিলাম যেখানে ভূতটা কারু বৈঠকখানায় গিয়ে বসলে খুলিটা খুলে পাশে নামিয়ে রাখত। তা রোহিত শেট্টির ফিল্ম দেখতে যাব যখন ঠিক করেছি, তখন এরকম একটা কিছু করব ঠিক করেই রেখেছিলাম। ছোটবেলায় কলকাতার গরমে অনেকেই এসিতে ঠান্ডা হতে কিম্বা বান্ধবীর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে সিনেমা হলে ঢুকত। বান্ধবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার দিন আমার গেছে আর এসি? না তার খোঁজে দরকার নেই। সমগ্র শিকাগো এখন একটা বিশাল রেফ্রিজারেটর হয়ে আছে। ঠান্ডাঘরের খোঁজে নয়, এখানে এখন সবাই উত্তাপের সন্ধানেই মাথার ওপর ছাদ খুঁজছে। তবে রোহিতের ছবি দেখতে যাওয়ার incentive কি? পরিজনের মুখে হাসি ফোটানো বলতে পারেন আর অবশ্যই সুন্দরী সারাহ্‌। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, রবিবাসরীয় আলসেমি আর ফুর্তির-প্রাণ-গড়ের-মাঠ নিয়ে পৌঁছে গেলাম সিম্বা দেখতে। সিম্বা বলতে আমি শেষ জানতাম একটা মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম যা ব্ল্যাকবেরি ডিভাইসকে প্রাণ দিত। সে লঙ্কা নেই, নেই সে রাবণও। কালোজাম ফোন এক্সটিঙ্কট হয়ে গেছে। সাথে সাথে সিম্বা নামক অপারেটিং সিস্টেমও। কিন্তু তার উত্তরসূরী হিসেবে জন্ম নিল পুলিশ অফিসার সিম্বা। হাবভাব চালচলন তার দাবাং-এর সল্লু মিয়ার মত। কলেজ লাইফে একটা তিন অক্ষরের গালাগালি ব্যবহার হত। শুরু আর শেষের অক্ষর মিলে হয় হামি। তিনি হলেন গে তাই। হা-ড্যাশ-মি। আর কেউ তাকে সেই বিশেষণে ভূষিত করলে প্রথমে তিনি মারাঠিতে কি একটা বলেন। পরে দয়া করে সেটাকেই ইংরেজিতে তর্জমা করে দেন – “Tell me something I don’t know”।

না না, সিম্বার মত একটা আপাদমস্তক ননসেন্স মুভি নিয়ে ক্রিটিকাল রিভিউ লিখছি এরকম ভাববেন না, এ নেহাতই পিয়োর আড্ডার ছলে সিম্বার সিম্বায়োসিস। তো যা বলছিলাম আর কি, এই পুলিশ অফিসার, সামথিং ভালেরাও, ওরফে সিম্বার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজিক ডিসঅ্যাডভান্টেজ, ইনি ছোটবেলা থেকেই অনাথ। তবে অনাথদের সাধারণত এরকম ফার্স্টনেম সারনেম সহ গালভরা নাম হয় না। তারা নাম পায় চিন্টু, পিন্টু ছোটে, রাজু ইত্যাদি। কিন্তু ইনি সৌভাগ্যক্রমে একটা দাঁতভাঙা নাম হাতিয়েছেন। এখন এই ভালেরাও মোটেই ভাল রাও নন। অনাথ হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকে ইনি যন্তর ছিলেন, পেটের দায়ে পকেট মারতেন এবং কালক্রমে ধরাও পড়েন পুলিশের হাতে। অল ইন্ডিয়া পকেটমার অ্যাসোসিয়েশানের জেনেরাল সেক্রেটারি তাকে ছাড়াতে এসে পুলিশের হাতে চাঁটা খায় আর তারপর পুলিশকে টাকা খাওয়ায়। সেই থেকেই সিম্বা ঠান মেরে আছে বড় হয়ে সে পুলিশ হবে আর খুব ঘুষ খাবে। তা মারাঠি মানুষ পুলিশ হবে না তো কি মাছ-ভাত-খাওয়া বাঙালি হবে? হাজার হোক ছত্রপতি শিবাজির রক্ত বইছে ওদের শরীরে।

জীবনটা বাজেরাও থুড়ি ভালেরাও-এর বেশ ভালোই প্ল্যানমাফিক এগিয়েছিল। সিম্বা তার পুলিশ অবতারে রীতিমতো জুম্বা করতে করতে এন্ট্রি নিলেন। স্পাইডারম্যান স্টাইলে ধোপার কাপড় ছুঁড়ে দিয়ে একটা সোনাচোরের গলায় পেঁচিয়ে তাকে আছাড়িপিছাড়ি খাওয়ালেন। তারপর চোরের কাছেও টাকা খেলেন। চুরির মাল ফেরত দিয়ে মালিকের কাছেও কাট নিলেন। ঘুষখোর সিম্বার শিবগড়ীয় নিরঙ্কুশ জীবনে মুস্কিল শুরু হল যখন তিনি শিবগড় থেকে গড়গড় করে মিরামার পুলিশ স্টেশানে ট্রান্সফার হয়ে গেলেন। মিরামার থানার বিপরীতেই শাগুনের হোটেল। এই শাগুন, তিনি রূপে আগুন, ভালেরাওয়ের হৃদয়ে এনে দিল প্রেমের ফাগুন। আর সেই ফাগুনে আরও রঙ ধরলো যখন উনিশবর্ষীয়া মিষ্টি মেয়ে, আকৃতি, সিম্বার কাছে দরবার করতে আসল। আকৃতি একটা evening school  চালায়। দূর্বা নামে এক দুর্বৃত্ত আর তার সাঙ্গপাঙ্গ সেই স্কুলে পড়তে আসা গরীব বস্তির ছেলেদের ড্রাগ পেডলিং-এর কাজে ব্যবহার করছে।

না দূর্বা বলে যদি একটি সুন্দরী মিষ্টি মেয়ের কথা মনে আসে তাহলে আগেই বলে দিই ভুল করছেন। বাঙালি দূর্বারা মেয়ে হয়, মারাঠি দূর্বা নিতান্ত গুঁফো এবং পেশিবহুল দুষ্টু লোক (তবে নিজের মা-কে খুব ভালবাসে তাই শতকরা একশভাগ দুষ্টু বলা যায় না)। তবে লোকটার এলেম আছে বলতে হবে, বলিহারি তার মনের জোর। ব্যাবসায় তাকে ঠকিয়েছে বলে নিজের বৌয়ের ভাইকে, মানে আপন শালাকে নিজের হাতে খুন করেছে এবং ফলাও করে বলে বেড়ায়। বাঙালি পুরুষ বৌ-এর ভাইয়ের কেন বৌ-এর চোখে চোখ রাখতেই ভয় পায়! এই না হলে মারাঠা ক্ষাত্রবীর্য!

যাই হোক দূর্বা রেনিডে থুড়ি দূর্বা রানাডের কিসসা ক্লাইম্যাক্স অব্দি মুলতুবি থাক। অভিযোগকারিণী, সমাজসেবী আকৃতির নরমসরম প্রকৃতি দেখে সিম্বা তাকে বোন পাতিয়ে ফেলে। আর তার থেকেই সিম্বার অধঃপতন (কিম্বা উত্থান যাই বলবেন) শুরু। ঘুষের রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় – কবি সুকান্ত বলে গেছেন। আর সম্পর্ক তো কবিতা। জীবনের তার সম্পর্কের সুরে বাঁধলেই যাকে বলে এক্কেরে সাড়ে সব্বোনাশ। ড্রাগপেডলারদের ডেরায় গিয়ে আকৃতি তাদের কুকীর্তির ভিডিও করে নেওয়ায় তার ওপর যৌন অত্যাচার ও হত্যা। সিম্বার ঘুমিয়ে থাকা বিবেক নাড়া দিয়ে জাগিয়ে দেয় এই ঘটনা আর তারপরেই শুরু প্রায়শ্চিত্ত। সিম্বা তার ঘুষখোর অফিসার অবতারে এক বৃদ্ধকে হুড়কো দিয়েছিল (পড়ুন সম্পত্তি হড়পে নিয়ে মনঃকষ্ট দিয়েছিল)। প্রায়শ্চিত্তর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সিম্বা তাঁকে ফটাফট্‌ বাবা পাতিয়ে নেয় আর রীতিমতো ভিক্ষা করে একটা ঠাটিয়ে থাপ্পড় খেয়ে আসে তাঁর হাতে (কোটি কোটি টাকার জমি হড়পানোর শাস্তি যদি একটি থাপ্পড় হয় আমি বারে বারে সেই অপকার্য করে থাপ্পড় খেতে রাজি আছি)। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, অনাথ হওয়ার কারণে মিরামারে পা রাখার পর থেকেই সিম্বা মুম্বাইমেলের গতিতে মা, বোন, বৌ, বাবা ইত্যাদি সম্পর্ক পাতিয়েছে। এমন কি প্রবল প্রতাপশালী দূর্বার মা আর বউকেও নিজের টাপোরি ভাষা আর ভালোবাসায় জয় করে ফেলেছে। আকৃতির অকালপ্রয়াণে বিবেকতাড়িত সিম্বা দূর্বার দুই ভাইকে অসমসাহসে ধরে নিয়ে এসে কোর্টে পেশ করে। আকৃতির ওপর অত্যাচার তারাই করেছে। কিন্তু বিচারের দিন সব সাক্ষ্যপ্রমাণ গায়েব। আকৃতির ওপর অত্যাচারের যে  ভিডিও পুলিশ হেফাজতে ছিল, তা মহামান্য ধর্মাবতারকে দেখানোর জন্য কম্পিউটার-এ পেন-ড্রাইভ ইনসার্ট করতেই একটা নীল পপ-আপ বলছিল “empty empty”। এমন অভূতপূর্ব অপারেটিং সিস্টেম, পেন ড্রাইভ ঢোকালেই যা কিনা empty empty বলে শোরগোল করে, আমি জীবনে দেখিনি। ওটা বোধ হয় কম্পিউটার-নিরক্ষরদের (এবং এই সিনেমা প্রধান গ্রাহক) জন্য হবে। আমি তো আমার খুলি সিনেমা হলের বাইরে খুলেই এসেছি। আমার চাপ নেই।

মোটের ওপর  দূর্বার দুর্বার ভাইদের কোর্টে কাবু করতে না পেরে সিম্বা নিজের সব পাতানো বৌ, বোন, মা, বাবাদের কাছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট নিয়ে ফেলল। সর্বসম্মতিক্রমে দূর্বার দুই ভাইকে পৌরুষে সুড়সুড়ি দিয়ে লকআপ থেকে বের করে “স্টেজড এনকাউন্টার” করে ফেলল। ভাতৃবিরহের ক্রোধে অন্ধ দূর্বা যখন আমাদের সিম্বুকে বাম্বু দিতে তুলে নিয়ে গেছে আর মেরে হাতের সুখ করছে তখনই দরজা টরজা ভেঙে গাড়ি নিয়ে গ্র্যান্ড এন্ট্রি নিলেন আমাদের সিংহম, হ্যাঁ আমাদের সেই আদি অকৃত্রিম অজেয় অজয়। এমন মুহূর্তে টেনিদা থাকলে বলতেন “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক”। সে যাক।  তারপর আবার শুরু হল সিংহম,  সিম্বা আর ভিলেনদের জুম্বা নাচ। দুজনে মিলে ফাটিয়ে মারল দূর্বা ও তার সঙ্গীসাথীদের। নেপথ্যে বাজল “সিংহম সিংহম সিম্বা সিম্বা” ধ্বনি। এই প্রসঙ্গে একটা কথা আমার খুব মনে হয় যে, বলিউডের সব সিনেমার ফাইট মাস্টার বোধ হয় একজনাই। অন্তত একে অপরের অভিন্নহৃদয় বন্ধু তো বটেই। কারণ সব সিনেমার মারপিটেই একই স্ট্যান্স পাবেন। হ্যাঁ, ঐ যে একটাতে দুজন দুষ্টু পেছন থেকে এসে হিরোকে ধরবে আর সামনে একটা লোক লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবে আর হিরো ঐ পেছনের দুজনের কাঁধে ভর করে তেড়ে আসা সামনের লোকটাকে মোক্ষম “বাপি বাড়ি যা” শট মারবে আর তারপর তিনশো ষাট ডিগ্রি ভল্ট খেয়ে নেমে পেছনের দুষ্টু দুটোর চুলের মুঠি ধরে দুম করে একে অপরের মাথায় ঠুকে ছেড়ে দেবে…হ্যাঁ এই সিনেমাতেও সেই স্ট্যান্স পাবেন। পাবেন হিরো কর্তৃক ভিলেনকে একটা টেনিস বলের মত কাচের টেবিল কি কাচের দরজার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া এবং তজ্জনিত কারণে কাচ ভেঙে খানখান হয়ে ছত্রাকারে ছড়িয়ে পড়া (তবে বিনা রক্তপাতে)।

শেষে দূর্বার মা-বৌ গদ্দারি করে দূর্বার সাথে। আগেই বলেছি রিলেশানশিপ মাস্টার, অনাথ সিম্বা ফটাফট অন্যের মা-বোন-বৌ ইত্যাদি নিজের পক্ষে টেনে নিতে সিদ্ধহস্ত অথবা সিদ্ধহৃদয় বলা চলে। দূর্বার মা-বৌ যথাক্রমে নিজের ছেলে ও দেওরের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে দিল। দূর্বার ভাইরাই আকৃতির যৌন হেনস্তা ও খুন করেছে সে কথা ভরা কোর্টে দাঁড়িয়ে বলে দিল (দূর্বার বৌ বোধ হয় এইভাবে নিজের ভাইয়ের খুনের বদলা নিলো)। কিন্তু দূর্বার মা-বৌয়ের কেউই অপরাধের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা স্বত্তেও সে সাক্ষ্য কোর্টে গ্রাহ্য হল কেন সেটা না হয় রোহিতবাবুকেই জিগেস করে নেবেন।

সিম্বা করলেন সাম্বাClick To Tweet

সব মিলিয়ে মাথার খুলি খুলে রাখলে সিম্বা ওরফে রণবীরের জুম্বা খানিকটা সহনীয় হলেও হতে পারে। শুধু দু-একটা প্রশ্ন মাথায় ঘোরে। এক, ধর্ষণ আর অ্যাসিড অ্যাটাক জঘন্যতম অপরাধ। সেটাকে নিয়ে এরকম সস্তা বাণিজ্য করে এইধরণের পৈশাচিক অপরাধের গুরুত্বটাকে প্রতিদিন লঘু থেকে লঘুতর করে দেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? এরকম ছবির স্রষ্টার  মাথা যখন শিশুসুলভ তখন ছোটদের জন্য সিনেমা করলেও তো পারেন। ছোটদের ছবি তো আর বেরোয় না বললেই চলে! দ্বিতীয়, সারাহ্‌ কেরিয়ারের বারা না বাজিয়ে, শুরুতেই নিজেকে সারা না করে একটু ভাল ছবিতে উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করতে পারেন যেখানে নিজের প্রিটি ফেস ছাড়াও ওঁর আরও কিছু অবদান থাকবে। আর তৃতীয়, সিম্বার হাতঘড়িটা বন্ধ ছিল। সেট-ডিজাইনার বোধ করি অনুমান করতে পারেন নি যে দৈবক্রমে কখনো হাতঘড়ির ওপর ক্যামেরা ক্লোজ-আপ হয়ে যেতে পারে।

 

আই-টি ভাইটি

[সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত সকল বন্ধুদের কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এ লেখার উদ্দেশ্য নিছক হিউমার সৃষ্টি, কাউকে আঘাত দেওয়া নয়। আর আমি নিজেও যেহেতু একই পেশায় নিযুক্ত, লেখাটিকে খানিকটা আত্মসমালোচনা হিসাবেও ধরতে পারেন। লেখাটির স্টাইল অবশ্যই বঙ্কিমবাবুর “বাবু” রম্যরচনার থেকে অনুপ্রাণিত।]

স্ব বাবু যযাতিকে কহিলেন হে নৃপশ্রেষ্ঠ শুনেছি কলিকালে আই-টি পিপল নামক এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হবে। এঁদের আকৃতি প্রকৃতি ও বিকৃতি আপনি অনুগ্রহপূর্বক বর্ণনা করুন।

যযাতি বলিলেন, হে নরবর, আমি এই কপি-পেস্ট-কর্মকুশলী, আত্মাভিমানী, বিদেশবিলাসী আই-টি পিপল গণকে বর্ণনা করব। আপনি শ্রবন করুন।

যাঁরা পড়াশুনায় লবডঙ্কা, সাফল্য বলতে শুধু বোঝে টঙ্কা আর সদাই যাঁদের প্রাণে ফায়ার হওয়ার আশঙ্কা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের দেশের থেকে বিদেশে বেশি মতি, অনসাইট পেলে মনে করে পূর্বজন্মের সুকৃতি, একবার বিদেশে পৌঁছতে পারলেই মুছে ফেলে ডার্টি দেশের সব স্মৃতি তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের বল প্রোগ্রামিং-এ এক গুণ, প্রেজেন্টেশানে দশ গুণ, জব ইন্টারভিউ দিতে গেলে শত গুণ আর অ্যাপ্রাইজাল ইন্টারভিউতে সহস্র গুণ তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা দেশোদ্ধার করেন ফেসবুকে আর একই সাথে সিনেমা দেখেন ম্যাকবুকে তারাই আই-টি পিপল। যাঁরা অফিসে করেন কপি-পেস্ট, বাড়িতে থাকলে কাউচে বসে নেন হালকা রেস্ট আর প্রবল কর্তব্যপরায়ণতাজনিত কারণে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে যারা নিজের বাড়িতে নিজেই গেস্ট তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের নিজের স্ত্রীতে অনাগ্রহ, পরস্ত্রীতে কিঞ্চিত অধিক আগ্রহ, সহকর্মী পরস্ত্রীতে সর্বাধিক আগ্রহ তাঁরাই আই-টি পিপল। যারা বঙ্গভাষায় “নট সো গুড”, ব্রায়ান অ্যাডামস শোনেন “টু আপলিফট মুড”, আর অফিসের “বাচ্চা ছানাপোনা”-দের সাথে অতিমাত্রায় রুড তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা করেন সামান্যই, বন্ধু ও বাবা-মা-স্ত্রীকে কিছু বাড়িয়ে বলেন, বায়োডাটাতে আরো কিছু বাড়িয়ে লেখেন আর ইন্টারভিউতে নিজের কৃতিত্ব ঘোষণায় টেনিদা-ঘনাদাকেও হার মানান তাঁরাই আই-টি পিপল।

এনারা কপি-পেস্টে পারদর্শী হবেন। অন্যের কোড ঝাঁপার ব্যাপারে এনাদের দক্ষতা সর্বজনবিদিত হবে। যাঁরা সকাল নটা থেকে চারটে অব্দি ক্যাফেটেরিয়াতে, পিংপং টেবিলে ও সুন্দরী সহকর্মীদের ডেস্কে দৃশ্য হন আর বিকেল চারটে থেকে রাত্রি নটা অব্দি আপন ডেস্কে বসে আইপিএল ফলো করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। রাত্রিকাল যাঁরা রতি কার্যে নয় প্রোডাকশান সাপোর্টে ব্যয় করবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। বিমুগ্ধ বাবা মা-রা যাঁদের পাঁচে পাঁচ রেটিং দেবেন, নট-সো-ইম্প্রেসড বস পাঁচে তিন রেটিং দেবেন ( সাথে জ্ঞান দেবেন You need to exceed expectation) আর বীতশ্রদ্ধ স্ত্রী-রা পাঁচে শুন্য রেটিং দেবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের ডেডলাইন ডেড হয়ে যায় বছরে সহস্র বার এবং তজ্জনিত কারণে ডেডলাইন এক্সটেন্ড হয় সহস্র এক বার তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা অনসাইট যাওয়ার জন্য বসের ঘরে গিয়ে প্যানপ্যান করেন, পদোন্নতি প্রাপ্ত হতে বসের বসের ঘরে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেন এবং এই সকল প্রাপ্ত হলে ফটাস করে লেঙ্গি মেরে কোম্পানিটি ছেড়ে দেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা প্রাতঃকালে বসের গালি সেবন করেন, সন্ধ্যাকালে স্ত্রীয়ের গালি সেবন করেন এবং সপ্তাহান্তে সেই সকল দুঃখ ভুলতে সুরা সেবন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। দেবী সরস্বতী কৃপা করে এদের মাথার বাঁপাশে একটি উইকিপিডিয়া ফিট করে দেবেন। তাই পৃথিবীর সকল সমস্যার সমাধান এঁদের করতলগত হবে। প্রধানমন্ত্রী নৈঋত না ঈশান কোনদিকে বসে পটি করলে দেশের উন্নতি হবে, প্রাণায়াম করার সময় হংসের মত প্যাঁক প্যাঁক না সারমেয়র মত ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক করলে বেশি উপকার হয়, বিমুদ্রীকরণ না করে ব্যাঙ্কগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ করলে দেশের কতটা উন্নতি হত এঁদের নখদর্পণে হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সম্বন্ধে যাঁদের অগাধ এবং সমান জ্ঞান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সংস্কৃতিপ্রীতি প্রমাণ করতে (বছরে একবার) বইমেলা যান এবং বই কিনে এনে সেলফে সাজিয়ে রাখেন, দেশপ্রীতি প্রমাণ করতে ঘন ঘন ফেসবুকে জ্ঞানগর্ভ আপডেট দেন আর বন্ধুপ্রীতি প্রমাণ করতে শুক্কুরবারের সন্ধ্যায় সুরাপান পূর্বক ধেই ধেই নাচেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা পরার্থে অচেতন, স্বার্থে সচেতন আর স্বাস্থ্যে অতিচেতন তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের এক অত্যাশ্চর্য দক্ষতা হবে যে এনারা খাবার দেখলেই তার ক্যালরি কাউন্ট বলে দিতে পারবেন।

যাঁরা বাবা-মার সাথে বাংলায় বাক্যালাপ করেন, স্ত্রী, বন্ধু এবং বন্ধুস্ত্রীদের সাথে বাংরেজিতে বাক্যালাপ করেন এবং নিজেদের সন্তানদের সাথে ইংরেজিতে বাক্যালাপ করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা স্বভাবে ভোগী, বসের কাছে ছুটির দরখাস্ত করার সময় রোগী এবং ক্লায়েন্ট-সাইড ম্যানেজার-এর কাছে যোগী রূপে প্রতিপন্ন হতে চান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা কোডিং করার সময় চ্যাঙ-মুড়ি-কানা আর কোড-রিভিউ করার সময় পুরো ষোল আনা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সারাজীবন পরবাসে থেকে ফাদারস ডে আর মাদারস ডে তে বাবা-মার সাথে একটি করে ছবি ফেসবুক দেওয়ালে চিপকে বাবা-মার প্রতি কর্তব্য সাধন করেন, ভ্যালেন্টাইন ডে-তে গোলাপ সহযোগে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য সাধন করেন এবং আইপ্যাড কিনে দিয়ে সন্তানের প্রতি কর্তব্য সাধন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা নিজের ফাঁকিবাজির জন্য বসের কাছে গিয়ে টীমকে দায়ী করেন, টীমের ফাঁকিবাজির জন্য বসের বসের কাছে গিয়ে বসকে দায়ী করেন অথচ টীমের সামনে টীমের আর বসের সামনে বসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা প্রোগ্রামিং-এর মত ইডিওটিক কাজ করা থেকে বাঁচতে চাকরিতে ঢোকার দু বছরের মধ্যে নিজেকে পিপল পার্সন দাবি করে ম্যানেজার হতে চান, চার বছরের মাথায় কার লোন নিয়ে গাড়ি কেনেন, পাঁচ বছরের মাথায় হাউস লোন নিয়ে বাড়ি কেনেন এবং চাকরির বাকি বছরগুলো কাটিয়ে দেন সেই সব লোন শোধ্‌ করতে তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের চোখে এদের বাবা মায়েরা এক্সপায়ারি ট্যাগ লাগানো এবং আউট-অফ-ডেট, স্ত্রী কাংস্যবিনিন্দিতকন্ঠী ও স্বামীমাংসভোজী এবং সন্তান আইনস্টাইনের থেকেও খরতর বুদ্ধির অধিকারী। এঁদের স্ফীত মস্তিষ্ক গোময় দ্বারা আর স্ফীত উদর স্নেহ জাতীয় পদার্থ দ্বারা নির্মিত হবে।

স্ববাবু বলিলেন “রোসেন রোসেন স্যার। এতদূর শুনে আমার প্রতিটি রোমকূপে রোমাঞ্চ হচ্ছে, হৃদয়ে অদ্ভুত আনন্দবারি সিঞ্চিত হচ্ছে। স্থির বিশ্বাস হচ্ছে এই আই-টি পিপল দ্বারা দেশ ও দশের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হবে। আশীর্বাদ করুন প্রভু যেন পরজন্মে আমি হই বনমালী ইয়ে থুড়ি মানে আই-টি পিপল।”

যযাতি বলিলেন “তথাস্তু”।

[প্রকাশিত – বাতায়ন ধারাবাহিক ১ সংখ্যা]

প্রেম অভাগা

তোমারও চোখের কোলে রাত্রিলেখা

আমারও চোখ ভেসে যায় মন্দাকিনী

তবুও প্রেম অভাগা মেলছে ডানা

এ শহর পুড়ছে প্রহর নিত্যদিনই

 

তোমারও মেঘলা আকাশ গহীন ছায়া

আমারও বৃষ্টি পড়ে সারা দুপুর

মিথ্যার বসতবাটি আকাশছোঁয়া

বালিশে মুখ গুঁজে কে একলা উপুড়?

 

আমি তো কালের থেকেও ছুটছি জোরে

তুমি তো পথ ভুলেছ মেঘশহরে

তোমাকে নিঃশ্বাসে আজ পাই কি করে?

কেমনে বাসর সাজাই তাসের ঘরে?

 

তোমারও অঘ্রাণ মাস অস্থির মন

আমারও জীর্ণ শরীর ঝরছে পাতা

ভালবাসা নয় কি তবে অক্ষয়ধন?

তবে কি প্রেমপিরিতি মিথ্যে কথা?

রক্তচক্ষু

[প্রকাশিতঃ প্রবাহ শারদীয়া সংখ্যা 2018]

Featured post on IndiBlogger, the biggest community of Indian Bloggers

রোজ সন্ধ্যে বেলা এক বাটি মুড়ি চানাচুর অল্প সরষের তেল দিয়ে মেখে একটা কাঁচা পেয়াজ দিয়ে খাওয়া মিত্তিরবাবুর অনেকদিনের অভ্যাস। কিন্তু দোকানে পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে দেখলেন আজও পেঁয়াজের দাম দু টাকা বেড়েছে। মধ্যবিত্ত বাঙালিকে পেঁয়াজ খাওয়া এবার বন্ধ করতে হবে – এই কথা ভাবতে ভাবতে আর মূল্যবৃদ্ধির জন্য মনে মনে সরকারের বাপ-বাপান্ত করতে করতে হনহনিয়ে বাড়ির দিকে হাটছিলেন অফিসফেরতা মিত্তিরবাবু। জুন মাসের শেষ। মৌসুমী বায়ু অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে পশ্চিম বাংলায় ঢোকার পথে গড়িমসি করছে – আবহাওয়া দপ্তরের এমনই মতামত। ভ্যাপসা গরমে বিন্দু বিন্দু ঘাম তাঁর কপালে। চশমাটাও বেশ অস্বচ্ছ হয়ে গেছে কপালের ঘামে। হাঁটতে হাঁটতেই চশমার কাঁচটা রুমাল দিয়ে পরিষ্কার করবেন বলে খুললেন তিনি। মোটা পাওয়ারের চশমা। খুললে প্র্যাকটিকালি অন্ধ তিনি। খুলতেই অঘটনটা ঘটলো। উলটো দিক থেকে আসা এক অফিসফেরতা বাবুর সাথে সরাসরি ধাক্কা।

“চোখ খুলে স্বপ্ন দেখেন নাকি” – ভদ্রলোকটির তির্যক কমেন্ট। স্পষ্টতই বিরক্ত তিনি।

কথাটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না মিত্তিরবাবু। কলকাতার পথেঘাটে কারণে এবং অকারণে বিরক্ত থাকে মানুষজন। ওটাকে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। উপরন্তু ধাক্কার ফলে হাতের পেঁয়াজের থলিটা ছিটকে পড়ে গেছে। দুর্মূল্য পেঁয়াজ কুড়োতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। চশমাটা চোখে বসিয়ে নিয়ে চারচোখ হয়েই পেঁয়াজ শিকারে নেমে পড়েন। পেঁয়াজগুলো থলিবন্দী করে উঠতেই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ চোখে পড়ল একটু দূরে কাদার মধ্যে একটা পেঁয়াজ পড়ে আছে। একটু ইতস্তত করলেন তিনি। কুড়িয়ে নেবেন? নাহ, পেয়াজের দাম যা আগুনছোঁয়া তাতে একটাও নষ্ট করা চলে না। বাড়িতে গিয়ে একটু ধুয়ে নিলেই হবে। কাদার মধ্যে থেকে পেঁয়াজটা তুলে নিতে গিয়েই চোখে পড়ল জিনিসটা। একটা গোলাকৃতি নীল রঙের পাথর। পুরো গোলকাকার বললে ভুল বলা হবে। একটা দিক একটু চ্যাপ্টা। আর ওই চ্যাপ্টা দিকের কেন্দ্রে একটা কালো মতন বিন্দু যেখান থেকে খুব সূক্ষ্ম কয়েকটা রেখা পরিধির দিকে গেছে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় একটা অক্ষিগোলক যাকে ইংরেজিতে বলে আইবল। একটু ইতস্তত করে হাতে তুলে নেন তিনি। রুমালের কোণায় একটু মুছে নিয়ে নাকের সামনে ধরলেন পাথরটাকে। পড়ন্ত বিকেলের ম্লান হলুদ আলোয় নীল পাথরটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকতেই তলপেটের কাছটায় কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করলেন। পাথরটা ফেলে দিতেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু কি ভেবে নিজের অজান্তেই বস্তুটিকে পকেটস্থ করে বাড়ির পথে চললেন। মিনিট খানেকের মধ্যেই বাড়ি পৌছে গেলেন। এই গরম কালটায় দিনে দুবার স্নান করেন তিনি। সান্ধ্যস্নান সেরে কাচা পায়জামাতে পা গলিয়ে সোফায় বসে টিভিটা চালিয়ে দেন। টিভিতে তখন শাহরুখ খান একটা উজ্জ্বল গোলক হাতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বাংলার প্রগতির ওপর আদিখ্যেতা করছেন। অন্যমনস্ক ভাবে সেই দেখতে দেখতে হাঁক পাড়লেন

“কই দাও গো”।

একবাটি মুড়ি-চানাচুর আর আধখানা পেঁয়াজ হাতে ঘরে ঢোকে শিখা, মিত্তিরবাবুর সহধর্মিণী। “সারাদিন পরে ঢুকে বউ-এর সাথে দু দণ্ড কথা বলা নেই, টিভি চালিয়ে হুকুম  করা হচ্ছে” – গজগজ করতে থাকে শিখা। বহুদিনের অভিজ্ঞতা বলছে এই অভিযোগের উত্তর না করাই ভালো। নয়তো বজ্রবিদ্যুৎ সহযোগে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা। এক গাল মুড়ি নিয়ে আর পেঁয়াজে একটা বড় কামড় লাগিয়ে মিত্তিরবাবু টিভিতে মনঃসংযোগ করলেন। আর এইসবের চক্করে পাথরটার কথা বেমালুম ভুলে গেলেন।

ঘটনাটা ঘটলো পরের দিন রাত্রি বেলা। ব্যাঙ্কে একটা কাজ সেরে অফিসে যেতে হবে বলে একটু আগে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে। তাই এগারটার মধ্যেই বিছানা নিয়েছিলেন। মধ্যরাত্রে হঠাৎ করে তাঁর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ঘুম ভাঙতেই একটা ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল তাঁর। অন্ধকারে চোখ সওয়াতে একটু সময় লাগে। ছোটোবেলায় বিজ্ঞানের বইতে পড়েছিলেন কারণটা। কি যেন কারণটা – অনেক ভেবেও মনে করতে পারলেন না। দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত আড়াইটে। গলাটা একটু ভেজানোর জন্য হাত বাড়ালেন বেডসাইড টেবিলটার দিকে। রাতে শোয়ার সময় ওখানে এক গ্লাস জল রাখে শিখা। কিন্তু মাঝপথেই থেমে গেল হাতটা তাঁর। আগেরদিন প্রাকসন্ধ্যাকালে যে পাথরটা সংগ্রহ করেছিলেন, বেডসাইড টেবিল থেকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে সেটা যেন তাঁরই দিকে চেয়ে আছে। একটা ঠাণ্ডা স্রোত মাথা থেকে পা পর্যন্ত নেমে গেল তার। মিনিটখানেক বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেন তিনি পাথরটার দিকে। কেমন একটা সম্মোহনী শক্তি আছে ওটার মধ্যে। একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না চট করে। সম্বিৎ ফিরতেই তাড়াতাড়ি স্ত্রীকে ডাকেন তিনি।

– শিখা, শিখা, এই, এ-এ-এই পাথরটা এ-এ-এখানে এলো কি করে – তোতলান মিত্তিরবাবু।
– তোমার প্যান্ট কাচতে নেওয়ার সময় টুম্পা দিলো ওটা। কোথায় পেলে জিজ্ঞেস করব বলে রেখে দিয়েছিলাম ওখানে। তারপর ভুলে গেছি। কিন্তু তুমি? এত রাতে? ওটার কথা?”
– না কিছু না। ইয়ে অখিলেশ দিয়েছে ওটা। আগের মাসে পুরী গেছিল না। সেখান থেকে এনেছে ওটা।

রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছেন – এমন বাৎসল্যসুলভ আচরণ শিখার কাছে প্রকাশ করবেন না বলে কেমন করে একটা মিথ্যে বলে ফেলেন তিনি। মিথ্যেটা বলেই একটু সঙ্কুচিত হইয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত শিখা আর কোনও প্রশ্ন না করে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। মিত্তিরবাবুর চট করে ঘুম আসে না। তাইতো, এই সামান্য পাথরটাকে দেখে এত ভয় পেয়ে গেলেন কেন তিনি। অফিসের কাজের চাপটা বেড়েছে। কয়েকদিনের জন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসতে হবে। অন্ধকার থেকে আলোতে বা আলো থেকে অন্ধকারে হঠাৎ করে আসলে চোখ সওয়াতে সময় লাগে কেন – আরেকবার মনে করার চেষ্টা করলেন তিনি। মনে পড়ল না। এই সব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি।

সকালবেলা উঠে চশমাটা পরার সময় আরেকবার চোখ পড়ল পাথরটার দিকে। নিতান্তই সাদামাটা। আকারে এবং আয়তনে আইবলের সাথে সাদৃশ্য ছাড়া আর কোন বিশেষত্ব নেই। বেডরুমের উত্তরপূর্ব কোণে একটা সুদৃশ্য কাচের আলমারি আছে। পাথরটাকে সেইখানে রাখলেন তিনি। স্লাইডিং ডোরটা টেনে দিতেই ঘষা কাচের আড়ালে আবছা হয়ে গেল পাথরটা। এরপর দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরতে সাতটা বেজে যায়। শোবার ঘরে ঢুকে আলোটা নিভিয়ে পোশাক পরিবর্তন করার সময় তাঁর স্পষ্ট মনে হল কেউ যেন তাঁকে দেখছে। কেন এমনটা মনে হল কিছুতেই ধরতে পারলেন না। অনাবাশ্যক কোন ভয়কে প্রশ্রয় দেওয়া স্বভাব নয় তাঁর। আবেগতাড়িত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ নন তিনি। তবুও এমন কেন মনে হচ্ছে ভাবতে ভাবতে কাচের আলমারিটার দিকে চোখ গেল।

ঘষাকাচের আলমারিটার যেইখানে পাথরটা রেখেছিলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়ে গেছে জায়গাটা। কাচের মধ্যে দিয়ে নীল পাথরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মনে হল তাঁর চোখের মণির সাথে ওই পাথরচোখের মণি সরলরেখায় আসার জন্য পাথরটা যেন সামান্য বেঁকে গেছে। ভয়ে হাড় হিম হয়ে যায় তাঁর। পাথরচোখের থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে পায়ে পায়ে পেছতে থাকেন মিত্তিরবাবু। ঘরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকতেই কাঁপা কাঁপা হাতে লাইটের সুইচটা অন করে দেন তিনি। একশ পাওয়ারের বাল্বটা একবার জ্বলেই নিভে যায়। ফিউস হয়ে গেল বোধ হয়। অন্ধকারে দপদপ করে জ্বলতে থাকে পাথরটা। দরদর করে ঘামতে থাকেন মিত্তিরবাবু। পাথরচোখ স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকে। এমন রক্ত জল করা হিম দৃষ্টি ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শরীরের সব রক্ত যেন ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছে। কতক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন কে জানে, হঠাৎ দরজা ঠেলে শিখা ঢোকে ঘরে মুড়ির বাটি হাতে।

“এই বুড়ো বয়সে ভিমরতি হল নাকি তোমার। এতক্ষণ ধরে ঘরে আলো নিভিয়ে কি করছ?” শিখার চোখে বিস্ময় আর দুশ্চিন্তার সংমিশ্রন। ঘরে এসে শিখা লাইটটা জ্বালতেই উজ্জ্বল আলোয় ঘরটা ভরে যায়। মিত্তিরবাবু তখন বাক্যরুদ্ধ। ফ্যাকাসে মুখে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকেন আলমারিটার দিকে। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে শিখার চোখ পড়ে পাথরটার দিকে। নিতান্ত সাধারণ ঘর সাজানোর জিনিস বই কিছু নয়। সামান্য নাড়িয়ে দেন তিনি স্বামীকে। সম্বিৎ ফিরে পেয়েই মিত্তিরবাবু নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করেন। শিখার কাছে নিজের এই খনিকের দুর্বলতা কিছুতেই প্রকাশ করা যাবে না। নিশ্চয়ই ঠাট্টা করবে ও। গলা খাঁকারি দিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে ওঠেন

– “নাহ, এই লাইটটা জ্বলছিল না।”

– “ওহ, ওটা? অনেক দিন ধরেই তো লুজ কানেকশান ওই সুইচটা। কখনো জ্বলে, কখনো জ্বলে না। কখনো একবার জ্বলেই নিভে যায়। হরেনকে কত বার বলেছি ঠিক করে দিয়ে যেতে। তা এখন ও বড় ইলেক্ট্রিশিয়ান। এখন ছোটো একটা কাজে আমাদের বাড়ি আসার সময় ওর হবে কেন।”

মুড়ি খেতে খেতে নিজেকে যতটা সম্ভব সুস্থির রেখে যেন একটা খুব সাধারণ প্রশ্ন করছেন এমন ভাব করে শুধোন মিত্তিরবাবু – “কাচের আলমারির ঘষা কাচটা অমন পরিষ্কার হয়ে গেল কি করে?”

“ও মা। তোমার কি স্মৃতিভ্রম হল নাকি। ওই তো আগের মাসে ওটাকে বসবার ঘর থেকে শোবার ঘরে আনার সময় ওপর থেকে প্রথম কাচটা ভেঙ্গে গেল। বাবলু এসে, ওর কাছে ঘষা কাঁচ ছিল না বলে সাদা কাঁচ লাগিয়ে দিয়ে গেল – ভুলে গেলে নাকি।” তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে যায় মিত্তিরবাবুর। নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেই লজ্জিত হয়ে ওঠেন তিনি। নাহ, কটা দিন ছুটি নিতেই হবে। মাথাটাকে একটু ঠাণ্ডা করা দরকার।

“আর ওই নীল পাথরটা ভাল দেখতে বলে ঘষা কাচের দ্বিতীয় তাক থেকে সাদা কাঁচের প্রথম তাকে টুম্পা নিয়ে এসেছে শেলফটা পরিষ্কার করার সময়।” সংযোজন করে শিখা। কানটা লাল হয়ে ওঠে মিত্তিরবাবুর। তবে কি শিখা বুঝতে পারল তাঁর এই অকারণ ভীতিটা।

“ইয়ে, মানে, ওই পাথরটা বেশ সুন্দর বলো?” স্ত্রীয়ের মনোগতি অনুধাবন করার জন্য প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন তিনি।
“হ্যাঁ, বেশ। কে দিলো? অখিলেশ?” দীর্ঘ চুলে বিনুনি করতে করতে জিজ্ঞেস করে শিখা।

যাক, তবে শিখা কিছু বুঝতে পারেনি তাহলে। যাক বাবা। বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই ঠাট্টা করত। “হ্যাঁ, পুরী থেকে এনে দিয়েছে। বলল, বৌদিকে দেবেন।” – নিশ্চিন্ত মনে অবলীলাক্রমে মিথ্যে বলেন তিনি।

“কাল বাদে পরশু তোমার অফিসের বন্ধুরা আসছে, মনে আছে তো। কাল ফেরার পথে পাঠার মাংস কিনে এনো। ম্যারিনেট করতে হবে।” মিত্তিরবাবুর মনে পড়ে যায়। অনেকদিন ধরে অফিসের সহকর্মীরা ধরেছে খাওয়ানোর জন্য। তাঁর প্রমোশান উপলক্ষে। “হ্যা, আনবো” অন্যমনস্ক ভাবে বলেন তিনি।

শুক্রবার অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পরেন মিত্তিরবাবু। একটু পরেই ওরা সব এসে পড়বে। তার আগে ঘর গোছানোয় শিখাকে একটু সাহায্য না করলে রাতের বেলা অনেক গালাগালি শুনতে হবে। চ্যাটারজিবাবু, মিত্রবাবু আসবে সস্ত্রীক। কৌশিকবাবু বিপত্নীক। তিনি আসবেন আর আসবে অখিলেশ। এই কজনেরই নেমন্তন্ন। বাড়িতে এসেই দেখেন শিখা আজ সেজেছে। প্রসাধন করলে এই বয়সেও শিখাকে বেশ লাগে। শরীরে মধ্যবয়সোচিত মেদ সামান্য লাগলেও বেশ বোঝা যায় অল্প বয়সে সে বেশ তন্বী ছিল। শাড়ি পরেছে নীলরঙা। দীর্ঘ চুল বেনী হয়ে ঝুলছে। কাজল দিয়ে সুন্দর করে চোখ এঁকেছে। মিত্তিরবাবু তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আড়চোখে দেখে শিখা একটু লজ্জা পায়।

“প্রথমবার দেখছ নাকি। যাও স্নান সেরে এসো। অনেক কাজ আছে।” মিত্তিরবাবু তাড়াতাড়ি স্নানের তোয়ালে নিতে শোবার ঘরে প্রবেশ করেন। আলো না জ্বালিয়েও হয়তো খুজে পেতেন, শিখা জায়গার জিনিস জায়গাতেই রাখে, কিন্তু সেইদিনের পর থেকে কেন যেন আলো না জালিয়ে শোবার ঘরে ঢুকতে ভরসা পান না। অনেকবার এটার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন, কিন্তু পরের বার শোবার ঘরে ঢোকার সময় কোন মন্ত্রবলে পাটা থেমে যায়। লাইটটা জ্বালিয়ে তবেই ঢুকতে পারেন। আর নিজের অজান্তেই চোখটা চলে যায় কাচের আলমারিটার দিকে যার এক নম্বর তাকে নীল পাথরটা পাথর চোখ নিয়ে চেয়ে আছে। আজও দেখলেন সেটা যথাস্থানেই আছে। স্নানে চলে যান তিনি।

সন্ধ্যে সাতটার একটু পরে প্রথম আসে অখিলেশ। হাসি খুশি, আমুদে বেশ ছেলেটা। বিয়ে থা এখন হয়নি। বেশ মিত্তিরদা মিত্তিরদা করে। খারাপ লাগে না অখিলেশকে মিত্তিরবাবুর। প্লাস শিখা অখিলেশকে বেশ স্নেহের চোখে দেখে।

– “সকাল থেকে তোমার হাতের রান্না কবজি ডুবিয়ে খাবো বলে দুপুরে লাঞ্চ স্কিপ করেছি। তোমার হাতের রান্নায় জাদু আছে বৌদি।” হাসি হাসি মুখে বলে অখিলেশ শিখাকে।
– “বিয়ে করে বৌ নিয়ে এসো। তাকে শিখিয়ে দেবো, তাহলে আর লাঞ্চ স্কিপ করতে হবে না।”
– “এতো সুন্দর লাগছে তোমায়, এসো কটা ছবি তুলে দিই অন্যরা আসার আগে।”

অখিলেশের ছবি তোলার শখ। কিন্তু বাংলাদেশে মডেলের অভাব। তাই এ বাড়িতে আসলে সে শিখার কয়েকটা ছবি তুলেই থাকে। বেশ কয়েকটা বাঁধিয়ে শিখাকে উপহারও দিয়েছে সে। আর শিখা অন্য মেয়েদেরই মতো ছবি তুলতে বেশ ভালইবাসে। পর পর শিখার বেশ কয়েকটা ছবি তোলে অখিলেশ। দাঁড় করিয়ে, বসে, ক্লোজ আপ, ফুল বডি, বিনুনি সামনে করে।

– “এবার তুমি ওই কাঠের শেলফটার ওপর কনুই রেখে গালে হাত দিয়ে অফ-দ্য-ক্যামেরা তাকাও। আগের মাসে এখানে একটা কাচের আলমারি ছিল না? ”
– “এই কাঠের আলমারিটা কেনার পর ওটাকে শোবার ঘরে সরানো হয়েছে” – অখিলেশের সুপারিশ মতো পোজ দিতে দিতে উত্তর দেয় শিখা। অখিলেশ ছবি তুলে একটু পর্যবেক্ষণ করে শিশুর মতো উৎসাহিত হয়ে বলে
– “দারুন এসেছে এই ছবিটা। লাইটিং কন্ডিশানটা ভালো ছিল না। ফ্ল্যাশ মারার ফলে একটু রেড আই এফেক্ট আছে। ওটা এডিট করে ঠিক করে দেবো। তোমার সব ছবিগুলো এতো সুন্দর আসে, মডেলিং-এ নামলে এখনো অনেকের পেটের ভাত মারতে পারবে। দেখো বৌদির কেমন ছবি তুলেছি” বলে ক্যামেরার স্ক্রীন টা মিত্তিরবাবুর দিকে মেলে ধরে অখিলেশ।

অখিলেশই একদিন বুঝিয়ে ছিল রেড-আই এফেক্টটা আদতে কি। আধো-অন্ধকারে ছবি তোলার আগে একটা লাল আলো ফেলে আধুনিক ক্যামেরাগুলো ফোকাস দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে, আর সেই অনুযায়ী ক্যামেরার ভেতরের লেন্স অ্যাডজাস্ট করে যাতে ছবিটা আউট-অফ-ফোকাস না হয়ে যায়। আর ওই মেজারিং লাইটের সাথে অ্যাডজাস্ট করতে চোখের মণি স্ফীত হয়, আর তারপর ফ্ল্যাশ মারলে ওই বিস্ফারিত মণি লাল রঙের দেখায় ছবিতে।

“হ্যাঁ এই বুড়ো বয়সে মডেলিং করি আর কি। আমি মডেলিং করছি শুনলে তোমার মিত্তিরদা তো আনন্দে লাফাবে” – মিত্তিরবাবুকে শুনিয়েই হালকা খোঁচা শিখার। মিত্তিরবাবু খোঁচাটা চুপচাপ হজম করেন। শিখার ছবিটা ভাল তুলেছে অখিলেশ। কিন্তু ছবিটাতে কি একটা যেন দেখে খটকা লেগেছে মিত্তিরবাবুর। অথচ কি সেটা ঠিক বুঝতে পারেন নি। ভাবতে থাকেন মিত্তিরবাবু।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাকিরা এসে পরে। আমপানা নিয়ে আসে শিখা। গল্পগাছা  চলতে থাকে। মিত্তিরবাবুর খটকাটা যায় না। ছবিটাতে কি যেন একটা…

নটা নাগাদ ডিনার পরিবেশন করে শিখা। সবাই যখন খেতে ব্যস্ত, মিত্তিরবাবু অখিলেশের ক্যামেরাটা নিয়ে আজকের সন্ধ্যায় তোলা ছবিগুলো দেখতে থাকেন। খটকাটা না কাটলে আজ রাতে ঘুম আসবে না। কাঠের শেলফে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো শিখার ছবিটা ভাল করে দেখেন মিত্তিরবাবু। হঠাৎ-ই ছবিটার অস্বাভাবিকতাটা চোখে পড়ে যায়। চোখে পড়তেই মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায় তাঁর। ভাল করে আর একবার দেখেন। নাহ কোন সন্দেহ নেই। শিখার শেfলফে রাখা হাতের কনুইের দুই ইঞ্চি বাঁ দিকে সেই নীল পাথরটা। আজ সন্ধ্যেতেই শোবার ঘরে দেখেছিলেন তিনি পাথরটাকে। কোনোভাবেই সেটা বসবার ঘরে আসা সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, পাথর চোখেও সেই একই রেড-আই এফেক্ট…

আলো থেকে অন্ধকারে বা অন্ধকার থেকে আলোতে হঠাৎ করে আসলে চোখ সওয়াতে সময় কেন লাগে মিত্তিরাবুর মনে পড়ে যায় এক লহমায়। পাথরচোখটা ঘরে আনার পরদিন রাতে ঘুম ভেঙ্গে পাথরটাকে বেডসাইড টেবল-এ দেখে ভয় পেয়েছিলেন আর সেই সঙ্গে এই প্রশ্নটা মাথায় অনেকক্ষণ ঘুরপাক খেয়েছিল তাঁর। আলোর উজ্জ্বলতার উপর নির্ভর চোখের মণি সঙ্কুচিত, প্রসারিত হয় যাতে চোখের মধ্যে একই পরিমাণ আলো প্রবেশ করে। আসলে চোখের মণিটা একধরণের অর্গানিক ক্যামেরাই। চোখের মণি বড়, ছোটো হতে যে সময় লাগে, সেটাই চোখ সওয়ানোর সময় বলে।

আরেকবার ভাল করে ছবিটা দেখেন মিত্তিরবাবু। নাহ, জীবন্ত চোখ না হলে এমন স্পষ্ট রেড-আই এফেক্ট হওয়া অসম্ভব। তীব্র ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যান তিনি। খাবার টেবলের হাসি ঠাট্টাগুলো অনেক দূর থেকে ভেসে আসে যেন। ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসা হাত থেকে ক্যামেরাটা পড়ে যায় সোফার ওপর। টলতে টলতে শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে যান মিত্তিরবাবু। আলো জ্বালার কথা আজ মনে পড়ে না তাঁর। অন্ধকারেই কাচের আলমারিটার দিকে এগিয়ে যান। চোখ সওয়াতে একটু সময় লাগে তাঁর। পাথরচোখটা যথাস্থানেই আছে। নিষ্ঠুর শ্বাপদের দৃষ্টির মতো অন্ধকারে ধক ধক করে জ্বলছে সেটা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মণিটা অন্ধকারে বেশি আলো পাওয়ার জন্য সামান্য স্ফীত। এমন ক্রুর দৃষ্টি কারো কখনো দেখেন নি মিত্তিরবাবু।

আর দেরি করেননি মিত্তিরবাবু। পকেট থেকে রুমাল বের করে পাথরটাকে রুমালবন্দি করে পকেটস্থ করেন। বাইরের ঘরে তখন নৈশাহার শেষ করে শিখার রান্নার প্রশংসা চলছে। খুব সাবধানে বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে হনহন করে হাঁটতে থাকেন তিনি। যেখান থেকে সংগ্রহ করেছিলেন আপদটাকে, সেখানেই ফেলে আসবেন। মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে যান। অন্ধকার ফুটপাথটায় তখন একটাও লোক নেই। রুমালের ভাঁজ থেকে পাথরটা বের করে সাবধানে রেখে দেন ফুটপাতের ধারে। জুন মাসের ভ্যাপসা গরমেও পাথরটা হিমশীতল। ভীতশঙ্কিত মিত্তিরবাবু পিছন ঘুরে প্রায় ছুটতে থাকেন।

হাত দশেক দূরে গিয়ে কেমন এক প্রকার বাধ্য হয়েই একবার থেমে পেছন ঘুরে তাকান তিনি। মোহাবিষ্টের মত অবস্থা তখন তাঁর। যেন ঘুরে তাকানোই তাঁর ভবিতব্য ছিল। না তাকিয়ে উপায় ছিল না। আর তাকালে কি দেখতে পাবেন সেটাও তাঁর যেন আগে থেকেই জানাই ছিল –

একটা নয়, দুটো, হ্যাঁ ঠিকই দেখেছেন তিনি, দু দুটো জ্বলন্ত নিষ্ঠুর চোখ, একে অপরের থেকে আঙুলখানেক দূরত্বে, চেয়ে আছে তাঁর দিকে…ঠিক যতটা দূরত্বে থাকে মানুষের বা পিশাচের বা দেবতার দুটো চোখ। হিমশীতল দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকে চোখ দুটো তাঁর দিকে। আর সে চোখে আছে নীরব আহ্বান। এমন আহ্বান যেটাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই এখন মিত্তিরবাবুর আর। ধীরে ধীরে মন্ত্রমুগ্ধের মত তিনি এগিয়ে যান চোখ দুটোর দিকে। একদম সামনে পৌঁছে পকেট থেকে রুমাল বের করে দুখানা পাথরচোখকেই রুমালে মুড়ে নেন। প্রেত, পিশাচ, অশরীরী এই চোখ দুখানা যারই হোক, সে যেন অদৃশ্যে থেকে নির্দেশ দিচ্ছে এই চোখ দুখানা আলাদা করা যাবে না। যে একখানা সংগ্রহ করেছে, তাকে দুখানাই রাখতে হবে নিজের সংগ্রহে। রুমালবন্দি পাথর দুটোকে হাতে নিয়েই পেছনে ঘোরেন মিত্তিরবাবু। একটা জোরালো আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ছিটকে পড়ে যান বড় রাস্তার ওপরে। গাঢ় লাল রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরোতে থাকে মাথার থেকে। যে গাড়িটা তাকে ধাক্কা মেরেছে সেটা স্পীড বাড়িয়ে রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়। হাত থেকে ছিটকে পাথর দুটো পড়ে যায়। গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে ঠিক সেই জায়গায় স্থির হয় যেখান থেকে মিত্তিরবাবু প্রথম পাথরখানা কুড়িয়েছিলেন সপ্তাহখানেক আগে। নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে স্থির শুয়ে থাকেন তিনি। পাথর দুটো যেখানে পড়ে আছে সেখানটা ঢালু। মাথার থেকে ক্রমাগত বেরোতে থাকা মোটা রক্তের ধারা সেই ঢালু জায়াগাটাতেই গিয়ে জমতে থাকে। জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার আগে মিত্তিরবাবু স্পষ্ট টের পান তাঁরই রক্তে ভেজা পাথরচোখ দুটো এখনো তাঁর দিকেই চেয়ে আছে। অপলক।

বিনায়ক সঙ্গে, বিনায়ক প্রসঙ্গে

শিকাগোতেই দেখা হয়ে গেল সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে। সাউথ এশিয়ান লিটারেচার ফেস্টিভালের উদ্যোগে সানফ্রান্সিকো এসেছিলেন কবি। একটু আড্ডা গল্প করতে, একটু সাহিত্য আড্ডা দিতে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম শিকাগোতে। সাহিত্যিকের মনের আঙিনায় উঁকিঝুঁকি দেওয়ার জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনার দরকার হয় না, কারণ সাদা কাগজের পরিসরে তাঁর শব্দ দিয়ে করা আঁকিবুঁকি তার ভাবনা, চিন্তা জীবনদর্শনের সবচেয়ে সৎ ও প্রকট দলিল। কিন্তু সে চেনাটা সাহিত্যিক বিনায়ককে চেনা, কবি-ঔপন্যাসিক বিনায়ককে চেনা। কিন্তু সামনাসামনি আলাপচারিতা হওয়ায় ব্যক্তি বিনায়ককে চেনার সৌভাগ্য হল। লেখার পরিসরে যেমন তিনি একটু বিশিষ্ট, একটু স্বতন্ত্র, ব্যক্তিগত বিনায়কও তাই। ভাল লাগল এই দেখে যে সাহিত্যচর্চার মই বেয়ে শিখরে পৌঁছনোর তাগিদে তিনি তাঁর স্বকীয়তাটা ফেলে আসেন নি মইয়ের নিচের কোন ধাপে।

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল তারকা বিনায়কদার সাথে গোটা দুই নিজস্বী তুলে এবং ফেসবুকে পোস্ট করে মুহূর্তগুলোকে ধরে রেখে দিতে পারতাম। তবে তাতে একসাথে কাটানো সেই সময়টুকুর ঠিক কতটা ধরে রাখতে পারতাম। ছবি মানুষের ঠিক কতটা ধরতে পারে? সেলফি তো শুধু সুখ ধরে অথবা সুখের অভিনয়। সত্যি কথাটা হল, একজন মানুষের যে ছবি ধরা যায় ক্যামেরাতে সে তার বহিরঙ্গের ছবি। যা কিছু দৃষ্টিগ্রাহ্য তাই শুধু ধরা পড়ে সে ছবিতে। কিন্তু যা কিছু অনুভুতিগ্রাহ্য তা ধরার জন্য একটাই ক্যামেরা, সে ক্যামেরা ভাষার, সে ক্যামেরা শব্দের। তাই শব্দের ক্যামেরায় চিত্রিত করতে চাই মানুষটাকে। আনুষ্ঠানিক যে সাহিত্যবাসর আর সাক্ষাৎকার তার কথা অন্য একদিন হবে কারণ ওনার মাপের সাহিত্যিকের ইন্টারভিউ দেশ পত্রিকায় এবং অন্যান্য নানা পত্রিকায় ইতিপূর্বেই বেরিয়েছে এবং পরেও অনেক বেরোবে। কিন্তু যে ক্যাজুয়াল মোমেন্টসগুলো একসাথে কাটালাম সেই কথাগুলো লিখতে চাই। নিচের অনুচ্ছেদগুলোতে বিনায়কদার বলা কিছু কথা কোটেশানে লিখলেও অবশ্যই প্যারাফ্রেজ করেছি, কারণ সর্বক্ষণ কোন ভয়েস রেকর্ডার চালিয়ে রাখিনি আর স্মৃতি বড় প্রবঞ্চক। তাই ওনার বলা কোন কথার ভুল ব্যাখ্যা করলে বিনায়কদার কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

প্রথমেই যে ব্যাপারটা মন কাড়ে তা হল অনুজ সাহিত্যিক তৈরী করার ব্যাপারে ওনার নিখাদ আন্তরিকতা। বারে বারেই রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তির কথা উল্লেখ করছিলেন যার সারমর্ম হল – যেদিন আমি মহাপৃথিবীর অংশ হয়ে যাব সেদিন যদি জানি যে লোকে আমার লেখা ছাড়া আর কারো লেখা পড়ছে না, বা নতুন কিছু কেউ লিখছে না তবে সেটাই হবে আমার মহামৃত্যু। সেই হবে আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সাহিত্য একটা ধারা, একটা বহতা নদীর মত। তাতে নতুন শাখানদীর জলসিঞ্চন না হলে সে নদীর জল একদিন শুকিয়ে যাবে। নিজের অমর হওয়ার তাগিদেই তাই আমায় এই ধারা পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের হাতে দিয়ে যেতে হবে। তবেই একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যানুরাগীতে উত্তরণ। আর সাহিত্যিক হওয়ার প্রথম ধাপ নয়, বোধ হয় শেষ ধাপ হল সাহিত্যানুরাগী হওয়া। “শব্দশিল্পকে ভালবাসি বলেই অনুপ্রেরণা দেব সব নতুন লেখকদের।” – এই কথা বলছিলেন। কবি বিনায়ক একান্ত আলাপচারিতায় হাতে ধরে দেখিয়ে দিলেন ছন্দের রীতিনীতি নিয়মগুলোকে। কখনো জীবনানন্দ, কখনো রবীন্দ্রনাথ থেকে কোট করে দেখিয়ে দিলেন অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, মাত্রাবৃত্ত ছন্দ, স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার। সবটুকুকেই যে মনে রাখতে পেরেছি তা নয়, কিন্তু যেটা হয় সেটার নাম দীক্ষা। ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনে বলা হয় দীক্ষা ছাড়া ঈশ্বরলাভ হয় না, আবার দীক্ষা নিলেই ঈশ্বরলাভ হয় না। দীক্ষামন্ত্রতে অধ্যাত্মজীবনের শুরু। আর তারপর থাকে সাধনা। সেরকমই ছন্দের জগতে দীক্ষা নিলেই একজন সার্থক ছন্দকার হবেন তা নয়, তার জন্য দরকার নিষ্ঠা। কিন্তু ছন্দটাকে প্রাথমিক ভাবে না জানলে তো শুরুটা করা যায় না। তাই না? বলছিলেন “অনেকে ছন্দ জিনিসটা আদৌ না শিখে বলছে পোয়েটিক লিবার্টি নিচ্ছি। আরে বাবা বাঁধনটা কি না জানলে সেটার থেকে মুক্তি নেওয়া যাবে কিভাবে?” কথাটা ঠিকই – কাব্যিক স্বাধীনতা যেন কাব্যিক অক্ষমতা গোপনের অজুহাত না হয়।

আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ বললেন “শিল্পীরা সাধারণত খুব নিষ্ঠুর হয় জানো। কেন জানো? কারণ ধরো একজন শব্দশিল্পী বা সাহিত্যিক। মানুষের মধ্যে যে সহজাত আবেগ আছে সেটা কোন পাত্র বা পাত্রীতে সমর্পণ না করে সাহিত্যিকরা সেই আবেগের সম্পূর্ণটুকুই কাগজে সমর্পণ করে। একজন চিত্রশিল্পী তাঁর আবেগ সমর্পণ করে ক্যানভাসে। কাগজের পরিসরে নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়ে শিল্পী কপর্দকশূন্য হয় হৃদয়ের আঙিনায়। তাঁর সৃষ্টিই পৃথিবীকে তাঁর একমাত্র দেয়। ঘনীভূত আবেগ থেকেই তো শিল্পের সৃষ্টি। আর সে আবেগ শব্দের আকরে, শিল্পের আকরে জমা পড়লে তবেই সে শিল্প কালোত্তীর্ণ হয়। লেখকের সবটুকু নিংড়ে নিয়ে জারিত শব্দমালা যখন আত্মপ্রকাশ করে তখন লেখকের ঘনিষ্ঠজনদের ওই লেখাটুকু ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার থাকে না।” কথাটা খুবই ইন্টারেস্টিং। তাই না? মধুসূদন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ অনেকের মধ্যেই আমরা আপনজনের প্রতি কিছুটা অবিবেচনা দেখতে পাই। এই অবিবেচনা দেখতে পাই ভিনসেন্ট ভ্যান গগের মত কালজয়ী চিত্রশিল্পীর মধ্যেও। স্পষ্টত বুঝতে পারি মানুষগুলো নিজের সাথেই শুধু ঘর করে। সম্পূর্ণ একা, নির্বান্ধব। তার কারণটা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিলেন বিনায়কদা।

বলছিলেন “সৃষ্টিশীল মানুষেরা সৃষ্টি করে কেন জানো? যে লেখে, যে ছবি আঁকে, যে সুর দেয়, কেন দেয়? মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য। মৃত্যু মানে তো বিলুপ্তি, বিস্মরণ। আমার শরীরটা যতটা আমি তার থেকে অনেকটা বেশি আমি হল আমার এই নামটা। উত্তর প্রজন্মের কাছে নিজের বিশিষ্টতা, নিজের ডি এন এ, নিজের পদবী পৌঁছে দেওয়ার জন্যই যেমন মানুষের যৌন ইচ্ছা জাগে, সেরকমই শরীরের মৃত্যুর পর নামটুকুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই সমস্ত সৃজনশীলতা। পাঠকের বইয়ের তাকে কতদিন বাঁচল সেটার নিরিখেই একজন লেখকের চরম নির্দয় বিচার হয়। সেটা বাদ দিলে ফেসবুকে কটা লাইক হল, আনন্দ পুরস্কার হল না অ্যাকাডেমি সেটা তো একটা সন্ধ্যার ব্যাপার। আনন্দ পুরস্কারের মঞ্চটা এক সন্ধ্যার ব্যাপার, পাঠকের হৃদয়ের সিংহাসন চিরকালীন। বলছিলেন উনি নিযুত পাঠক নয়, নিবিড় পাঠক চান – “অযুত লক্ষ নিযুত পাঠক যেদিন আমার লেখা ভালবাসবে সেদিন বুঝব ফেলনা লেখা শুরু করেছি। সস্তা গিমিক শুরু করেছি।” আজকে তো ফেসবুকে লেখা পোস্ট করে আর একশ-দুশ লাইক পেয়ে যে কোনো পুরুষ বা নারীই মনে করছে আমি লেখক। কিন্তু লেখার প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন করতে যে সাধনা দরকার সেটা নেই। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়রা লাইকের নামে যেটা দেয় সেটা তো তাঁদের মুগ্ধতা নয়, সেটা পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয়টির প্রতি তাঁদের স্নেহ, প্রশ্রয়। সেটা লেখার মান বিচার কখনো নয়। অচেনা পাঠকের ভারবহনের ক্ষমতাতে হয় লেখার প্রকৃত মান বিচার। লেখার মধ্যে সত্যিকারের সততা থাকলে সে লেখা আপনিই কিছু কিছু মনে অনুরণন তুলবে সে পাঠক তোমায় চিনুক বা না চিনুক। যদি সাহিত্যিক হতে চাও পাঠকের কোয়ান্টিটি নয়, কোয়ালিটি সবসময় মাথায় রাখবে।” আনন্দবাজার শারদীয়া পত্রিকায় ওনার উপন্যাস “মন্ত্র” খুব জনপ্রিয় হয়েছে বলাতে বললেন – “মানুষ এখন আর বানিয়ে বানিয়ে লেখা গল্প আর চাইছে না। তারা লেখার মধ্যে জীবন চাইছে, জীবনের কথা চাইছে। তাই উপন্যাস লেখার সময় সেই উপন্যাসের সঙ্গে নিজের যাপন দরকার। লেখক মানসে উপন্যাসের ঘটনাক্রমের সত্যি সত্যি ঘটে যাওয়ার দরকার আছে। তবে সে উপন্যাস লোকে পড়বে।” লেখালেখির ক্ষেত্রে দিয়ে গেলেন কিছু দামী টিপস যার একটা মনে পড়ছে “একসাথে গল্প, উপন্যাস, কবিতা সব লেখার চেষ্টা করবে না। অন্তত প্রথম প্রথম। মাথাটাকে প্রতিটা ক্ষেত্রে আলাদা ভাবে কাজ করাতে হয়। তাই গল্প, কবিতা বা উপন্যাস কোন একটা ফিল্ড ধরে তাকে দুটো বছর পুরো দাও।” শুনে মনে হল ঠিকই তো বলেছেন। ওরা প্রেমিকার মত। সবটুকু চায়। ফাঁকি দিয়েছ কি নিজেই ফাঁকে পড়বে। একসময়ে একটা প্রেমিকা রাখলেই যেমন সর্বতোভাবে মঙ্গল, তেমনি একইসঙ্গে কবিতা, গল্প, উপন্যাসের যেকোনো একটির প্রতি হতে হবে নিষ্ঠাবান। তবেই রসোত্তীর্ন লেখার জন্ম হবে।

বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার জিহাদে সামিল হয়েছেন কবি। আইওয়া আন্তর্জাতিক সাহিত্য সমাবেশে এসে বার্ষিক পাঁচ হাজার ডলারের বাংলা বই কেনার সুপারিশ করে গেছেন। যেখানে পঞ্চাশ হাজার ডলারের কন্নড় বই কেনা হত সেখানে নাকি এক ডলারেরও বাংলা বই কেনা হত না। অন্যান্য ভাষার সৈনিকরা নিজের ভাষার প্রতি অনেক বেশি একনিষ্ঠ। বলছিলেন ভাষা সংস্কৃতির ব্যাপারটা অনেকটা ফুটবল খেলার মাঠের মত। তুমি যত জমি ছেড়ে দেবে অপর পক্ষ এসে তত জমি দখল করে নেবে। শক্তিগড়ে পিৎজার দোকান খুলে গেছে কিন্তু শক্তিগড় নিজের ল্যাংচা নিয়ে ইটালিতে পৌঁছতে পারে নি। ভাষার ক্ষেত্রেও আমরা যত বাংলা বলা, বাংলা লেখা, বাংলায় ভাবা কমিয়ে দিচ্ছি ইংরেজি এসে দখল করে নিচ্ছে সেই ছেড়ে দেওয়া পরিসরটুকু। এইভাবে ছাড়তে থাকলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে একদিন। বাংলা গান, নাটক, সিনেমা সবই কিন্তু ভাষাকেন্দ্রিক। ভাষার ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে গেলে একদিন হুড়ুমুড়িয়ে ভেঙে পড়বে আমাদের সংস্কৃতির অট্টালিকা যেটা নিয়ে আমাদের এত গর্ব। আমি কথায় কথায় ইংরেজি বলাতে দাদাতুল্য অগ্রজ সাহিত্যিকের মৃদু ভর্ৎসনা – “তুমি কথায় কথায় ইংরেজি বলো কেন? কই পিনাকী তো বলে না?” পিনাকী আমার বন্ধু যে এই প্রচেষ্টাটাতে সর্বতোভাবে আমার সাথে ছিল। আমি মাথা চুলকে জিভ বার করে বললাম “সরি।” সত্যিই তো একজন আমেরিকান কি ইংরেজ তো কথা বলতে বলতে, নিজের ভাব প্রকাশ করার জন্য হঠাত করে স্প্যানিশ কি বাংলা কি গুজরাটি বলে ফেলে না। নাকি সাত আট দশক আগে বিজিত জাতি ছিলাম বলে আজও মনে মনে দাসত্ব করছি? কথায় কথায় ইংরেজি বাক্য বলা, বাংলাতে লেখা একটা অনুচ্ছেদের জায়গায় ইংরেজিতে লেখা একটা প্যারাগ্রাফ পড়তে স্বচ্ছন্দ বোধ করা আত্মম্ভরিতা নয় লজ্জার বিষয় হওয়া উচিত।

সবচেয়ে ভালো লাগল সমসাময়িক বাংলা ভাষার একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক হয়েও নিজেকে তিনি তারকা মনে করেন না। আমার মনে আছে প্রথম যেদিন চ্যাটে কথা হয়েছিল আমি কথায় কথায় বলেছিলাম – আপনার কক্ষপথ, আপনার বৃত্ত আর আমার কক্ষপথ, আমার বৃত্ত ভীষণই পৃথক। উত্তর বলেছিলেন “আমার কক্ষপথও ভীষণ পরিচিত, বৃত্তও খুব চেনা”। হ্যাঁ ঠিকই বিনয় করার জন্য বিনয় করার একটা রেওয়াজ আজকালকার তারকাদের মধ্যে এসেছে। অনেকে বিনয়কে খুব কৌশলে ব্যাবহারও করছেন নিজের বিদগ্ধতা প্রমাণ করার জন্য। কথাই আছে “Out of proportion humility is actually arrogance”. তাই মুখের মুখোশটাকে চেনা যায় সহজেই। বিনায়কদাকে কাছ থেকে দেখে মনে হল ওনার ঐ কথাগুলো বিনয় দেখানোর জন্য বিনয় নয়। এসে থেকেই বলছেন আমার লেখা তো তোমরা শুনবেই, কিন্তু তোমাদের লেখা আমি শুনতে চাই। আজকালকার ছেলেরা কি লিখছে জানতে চাই। যেটুকু জেনেছি সেটুকু তোমাদের জানিয়ে যেতে চাই। আমার লেখা একটা কবিতা শুনে ছন্দের ভুলগুলো ধরিয়েও দিলেন। আমি নিজে খুব সামান্য কলম প্রয়াস করি তবু নিজেকে দিয়েই বুঝি লেখকরা একটু নার্সিসিজমে ভোগে অর্থাৎ নিজের প্রেমে নিজেই হাবুডুবু খায়। নিজের লেখা নিজেই পড়ে এবং অন্যকে শুনিয়ে মুগ্ধ হয়। আসলে লেখা তার সন্তান তো আর সন্তানের প্রতি অহেতুক মুগ্ধতা সব বাবামায়ের পক্ষেই স্বাভাবিক। তবু সেই মুগ্ধতা কাটিয়ে অন্যের লেখা শোনার আগ্রহটা ধরে রাখা, অন্য অনুজ সাহিত্যিককে গ্রুম করার চেষ্টা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে।

মুস্কিল হচ্ছে আরও অনেক কথাই মনে ভিড় করে আসছে। কিন্তু খুব বড় পোষ্ট পড়তে চায় না কেউ। তাই লেখার দৈর্ঘের প্রতি লক্ষ রেখে এবারে শেষ করব। প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকদের সাহিত্যমহলের টুকরোটাকরা মজাদার ঘটনা বলে হাসিখুশি মানুষটা জমিয়ে রাখলেন দুটো দিন। লৌকিকতার যে অদৃশ্য দেওয়াল দুটো মানুষকে আলাদা করে রাখে, নিজেই সেটি ভেঙে দিলেন নিজের ডাউন-টু-আর্থ পার্সোনালিটি দিয়ে। হাসিমস্করাতেও শ্লীলতা অশ্লীলতার সীমারেখাগুলো একটু একটু মুছে যাচ্ছিল। তারকার দূরত্ব নিয়ে কখনোই দূরে সরে থাকতে চান নি। মানুষটার মধ্যে ভণ্ডামি নেই, কোন দেখানো সফিস্টিকেশান নেই। নির্দ্বিধায় বলতে পারেন “কলকাতায় বড় হয়েছি। কাক ছাড়া কোন পাখি দেখিনি। কৃষ্ণচূড়ার গাছ দেখিনি। তাই নেচার বা প্রকৃতি আমার লেখায় আসে না। শহুরে সুখ, দুখ, যন্ত্রণা, বিষাদ বুঝতে পারি। গাছ, পাখি, ফুল, নদীর সাথে রিলেট করতে পারি না সেভাবে। কল্পনা কবি সাহিত্যিকদের একটা প্রধান হাতিয়ার কিন্তু কল্পনার সাহায্যে নিজের অভিজ্ঞতাটুকুর ওপর একটু আদর প্রলেপ দেওয়া যায় মাত্র, সম্পূর্ণ অপরিচিতের সাথে পরিচিত হওয়া যায় না।” নিজের এই সীমাবদ্ধতার কথা এত স্পষ্ট করে আর কেউ বলতে পারত কিনা জানি না। শুধু দু দিনের আলাপেই এক অলীক বন্ধনে জড়িয়ে দিয়ে নিজের বৃত্তে ফিরে গেলেন কবি-ঔপন্যাসিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।

[Binayak Bandyopadhyay who is one of the most promising faces of current Indian Vernacular poetry is also considered as the changing face of Bengali fiction. His writing is a subtle blend of Cosmic and mundane, world and locality. He has till date published 15 novels and as many poetry collections. Binayak has received quite a few awards for his work and has represented India in the Iowa International Writers program 2014. He lives in Kolkata and combines a career in writing and teaching]

IMG_5572

পাগলি

অফিস ফেরতা ট্রেনসফরটুকু শেষ করে বাসে উঠে পড়েছিলাম। এই বাসেই শুধুমাত্র সাত মিনিটের সফরে পৌঁছে যাব বাড়ির দোরগোড়ায়। অক্টোবর মাসে শিকাগোতে সুযযিজেঠুর ডিউটি আওয়ারস নেহাতই কম। পাঁচটা বাজল কি বাজল না, আলো-টালো গুটিয়ে নিয়ে সে দিনের মত বিদায় নেওয়ার যোগাড়যন্ত্র করে। গুঁড়ি গুঁড়ি সন্ধ্যারা চুপিসাড়ে নেমে এসে ঘাসের ডগায় অপেক্ষা করছে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। আলোর বিন্দুগুলো আর একটু তেজ হারালেই, আর একটু ম্রিয়মাণ হলেই তাদের জায়গাজমি দখল করে নেবে অন্ধকার কণারা। আমার তিন বছরের কন্যার আধো আধো গলা শোনার ইচ্ছায় তখন মনের মধ্যে কাঠবিড়ালির পিড়িক পিড়িক। বাস ছাড়ার একটু আগে বাসে আমার উল্টোদিকে এসে যে আসন গ্রহণ করল সে একটি মধ্যবয়স্কা মহিলা। দু এক সেকেন্ড দেখলেই বোঝা যায় মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। হতশ্রী শতছিন্ন কাপড়জামা। কিন্তু পরিপাটি করে পরেছে। চুপ করে বসে থাকার চেষ্টা করছে কিন্তু যেন পারছে না। মাঝে মাঝে কথা বলে উঠছে, মাঝে মাঝে উঠছে হেসে। পরমুহুর্তেই চুপ। যেন কোন এক অস্থির সবল শিশুস্বত্তা ক্রমাগতই বডি ফ্রেমের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর ছোটবেলা থেকে শেখা সামাজিক সংস্কারের দুর্বল স্বত্তা বারে বারে তাকে ঠেলে ভিতরে পাঠাচ্ছে। নিজের মধ্যেই যেন এক মাস্টারনি বলছে “না না এ শোভন নয়। সমাজোচিত নয়। অকারণে হাসলে, কথা বললে লোকে তোমায় পাগল বলবে।” কিন্তু পরমুহুর্তেই আবার যেন ভুলে যাচ্ছে। এই বিরুদ্ধ দুই স্বত্তার মধ্যে যেন লেগেছে শুম্ভ নিশুম্ভ যুদ্ধ।

এমন মানুষ দেখলে তাকে উপেক্ষা করাই দস্তুর। আমিও তাই করছিলাম। অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে রেখে না দেখার অভিনয়। কিন্তু আমাদের সকলের মধ্যেই একটা পাগল থাকে যে কিনা পাগল দেখার লোভ সামলাতে পারে না। তাই চোখ পড়ে যাচ্ছে থেকে থেকে। হঠাৎ দেখি মহিলা আমার দিকে কিছু একটা বাড়িয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। মনে মনে শঙ্কিত হলাম। ভাবলাম “মনে হচ্ছে জ্বালাবে মহিলা।” একটু কান দিয়ে শুনে দেখলাম মহিলা আমাকে একটা ফ্রুটজুসের কাচের বোতল খুলে দিতে অনুরোধ করছে। বোতল ধরে থাকা হাতটা আমার দিকে বাড়ানো। যতদূর মনে হয় বাড়িতে তাকে এই জুসের বোতল খুলে দেওয়া হয়। আর ওই শিশুসুলভ মাথাতে আপন পরের বোধ তৈরী হয়নি আজও। তাই আমাকেই করে ফেলেছে বোতল খুলে দেওয়ার অনুরোধ। অনিচ্ছা স্বত্তেও বোতলটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কসরত করলাম। কাচের ওপর লোহার ঢাকনা শক্ত হয়ে লেগে আছে। অনেক চেষ্টাতেও একটুও ঘোরাতে না পেরে নিজের অক্ষমতা জানিয়ে ফেরত দিলাম কাচের কন্টেনারটা।  কোন দ্বিতীয় বাক্য খরচ না করে মহিলা বোতলটা নিয়ে নিলো। আর তারপর আমি সবিস্ময়ে দেখলাম বোতলের গলার দিকটা এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে বোতলের পেছনে সজোরে তিন চার বার মারল যাতে ভিতরের রঙিন তরলটা সবেগে এসে ভেতর থেকে চাপ দেয় ঢাকনায়। আর তারপরেই বোতলটা আবার বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। হাতে নিয়ে ঢাকনাটা একটু ঘোরাতেই যখন খুলে এলো তখন লাজুক মুখে “আই ডিড নট নো দিস টেকনিক” বলে বোতলটা ফেরত দিতেই ধন্যবাদ জানিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে জুস খেতে শুরু করল মহিলা।

সান্দ্র তরলের সজোরে ধাক্কায় বোতলের আর ঢাকনার সংযোগ আলগা করে দেওয়ার এই বুদ্ধি তো আমার মাথায় আসে নি। জীবনের এই যে পাঠ আমার জানা ছিল না, এই মানসিক প্রতিবন্ধী মহিলা জানল কি করে? আর যদি জানল, বোতলের ঢাকনা খোলার কৌশলটা ব্যাবহার করার পরেও ঢাকনাটা নিজে না খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল কোন অভিপ্রায়ে? বাস ভর্তি লোকের সামনে আমার অক্ষমতাটাকে একটু কম করে দেওয়ার জন্য কি? হয়তো বা। মহিলার অপরিণত মনে এত সূক্ষ্ম অনুভূতিরও কি তবে জায়গা আছে? অথচ এই যে আমি যে কিনা একটু আগেই নাক সিঁটকাচ্ছিল, কতক্ষণে এই পাগলিটার সামনাসামনি বসা থেকে মুক্তি পাবে সে কথা ভেবে, আমি তো সুস্থ সমাজের প্রতিনিধি। এমনকি আমাকে অনেকে প্রতিভাবানও বলে। তবে কি কোথাও সুস্থ মন আর অসুস্থ মনের যে লেবেল আমরা সাঁটিয়েছি সেটা উল্টো লাগানো হয়ে গেছে? অসহিষ্ণু, সমালোচনাপ্রিয় মনই বহুলদৃষ্ট বলে তাকেই সুস্থ স্বাভাবিক নাম দিয়েছি আর অনুভূতির উথালপাথাল বন্যায় ক্রমাগত ডুবতে থাকা, ভাসতে থাকা মনগুলোকে পাগল আখ্যা দিয়েছি?

মোহময়ী ফেসবুক

এখানকার একটি বাঙালি সমিতির দুর্গোৎসবে একটি স্থানীয় অনুষ্ঠান ছিল রবীন্দ্রনাথের নারীচরিত্রদের নিয়ে। তিনখানি নৃত্যনাট্যের সেই কোলাজে স্ক্রিপ্ট লিখেছেন যিনি, কিছু লেখালেখির সূত্রে আমি তাকে চিনি। এগিয়ে গিয়ে বললাম “স্ক্রিপ্টটা খুব ভালো ছিল। স্ক্রিপ্ট লেখা তো থ্যাঙ্কলেস জব। তাই বললাম আর কি! ভালো লেগেছে।”

উনি বললেন “সবচেয়ে যাকে ভালবাসি তার কাছেই তো তারিফ পেয়েছি। আর তারিফের দরকার কি?” আমি বললাম “কার কাছে?” উনি হাসিমুখে বললেন “নিজের কাছে”। তাঁর শরীরী ভাষা বলে দিচ্ছিল তাঁর হাসিমুখ নিছক অভিনয় নয়। স্তম্ভিত হয়ে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কি মনে হল জিগেস করলাম “আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই না?” উনি বললেন “না না। ওসব তোমাদের প্রজন্মের জিনিস ভাই”। নীরবে স্বীকার করলাম এই মানুষটা আমার থেকে উন্নত। কিছুটা ভাগ্যবানও কি?

এই ফেসবুক, এই সামাজিক মাধ্যম, এরা আমার আত্মবিপণনের চেষ্টায় জ্বালানি দেয় না আমি আত্মবিপণনের ইচ্ছা নিয়ে এই সামাজিক মাধ্যমে এসেছি ঠিক জানি না, শুধু জানি এ দুটোর মধ্যে গভীর হার্দিক সম্পর্ক আছে। আমাদের আগের প্রজন্মের সেই মানুষগুলো ভাগ্যবান যাদের এই অশুভ জোয়ারে গা ভাসাতে হয় নি। আমার বাবা দিস্তে দিস্তে লেখালেখির কাজ করেছে বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃতে। কিন্তু কৃতকার্যের প্রাপ্য সম্মান আদায়ে ভিক্ষাঝুলি হাতে বেরিয়ে পরেন নি ফেসবুকে। আমায় বেরোতে হয়। না বেরিয়ে থাকতে পারি না। হায় ফেসবুক, ধন্য তোমার মোহিনী শক্তি, সম্মোহনী সুধা।

যযাতির ঝুলি টাটকা তাজা
ইমেলে পেলে ভারি মজা