প্রাণের ভাষা

যে ভাষায় প্রদোষ মিত্র সমাধান করেন বাক্স রহস্য আর ফুল্লরা কহেন তাঁর বারমাস্যা, টেনিদা বলেন “ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফেলিস” আর মনের মত কেকের নাম মন-জিনিস, যে ভাষায় মেঘ গাভীর মত চরে আবার খোকাবাবু যায় লাল জুতো পায়, যে ভাষায় কুচবরণ কন্যার মেঘবরণ কেশ আর পত্রিকার নাম সন্দেশ, যে ভাষা কখনো সরব হয় পথের দাবীতে আবার নীরব হয় পথের পাঁচালিতে, যে ভাষায় তারিণী খুড়ো গল্প বলেন আর লালমোহন গাঙ্গুলী লেখেন রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাস, যে ভাষায় ফুলে নাম পাথরকুচি আর নাচের নাম ধুনুচি, ঘাসের নাম মধুকুপী আর ছিনাথ সাজেন বহুরূপী, যে ভাষায় পথিক হয় পথভোলা আর কিশোরী হয় চঞ্চলা, সে ভাষার নাম বাংলা।

যে ভাষায় নাচের নাম ছৌ আর মধুপের নাম মৌ, যে ভাষায় ফাঁদ দেখে নি ঘুঘু আর ডাকাতের নাম রঘু, বাড়ির মেয়ে গৌরী আর ত্যাগের রঙ গৈরিক, কাঁথার নাম নকশী আর গোয়েন্দার পদবী বক্সী, যে ভাষায় গাছের পাতা হিজল আর চোখের পাতায় কাজল, ফুলের নাম শিউলি আর ডালের নাম বিউলি, যে ভাষায় ঘনাদা দেয় গাঁট্টা আর খেলার নাম সাট্টা, যে ভাষায় ক্যারাম পিটিয়ে আড্ডা আর পরীক্ষাতে গাড্ডা,  স্কুলের বাইরে চুরমুর আর ফুচকা স্টলে হুড়মুড়, যে ভাষায় রাজ্যের নাম হল্লা আর অংক খাতায় গোল্লা, মাঠের নাম ভুবনডাঙা আর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তে রাঙা, যে ভাষায় সাপের নাম তক্ষক আর যে রক্ষক সেই ভক্ষক, স্টেশানের নাম ঘুম আর চাষের নাম ঝুম, যে ভাষায় পৌষমাসে পার্বণ আর কয়লা কালো কার্বন, যে ভাষায় নায়ক মানেই উত্তম আর চাল দেবে যেই মোক্ষম, যে ভাষায় জীবন মানে যাপন আর মৃত্যু মানে তর্পণ, যে ভাষায় “গল্প হলেও সত্যি” আর ছোটরা একরত্তি, যে ভাষায় সোনায় থাকে সোহাগা আর সোহাগ না পেলে অভাগা, যে ভাষায় প্রমাণের সাথে তথ্য আর ওষুধের সাথে পথ্য, ভাতের সাথে শুক্তো আর মণির সাথে মুক্তো, যে ভাষায় পেছনে দিলেই বাঁশ আর উৎসব বারোমাস, যে ভাষায় পিঠের সাথে পুলি আর চুলোর সাথে চুলি, গোলার সাথে গুলি আর মজুরের সাথে কুলি, চৈত্রসেলে ঝুলোঝুলি আর বিজয়ায় কোলাকুলি, স্মৃতিবোঝাই ভেলা আর মিলনবোঝাই মেলা, যে ভাষায় একলা হলেই দুপুর আর বৃষ্টি টাপুরটুপুর, যে ভাষায় ঘুড়ির নাম পেটকাটি আর বাড়ির নাম ভিটেমাটি, আকাশে থাকে গঙ্গা আর লেবুজল খেয়ে চাঙ্গা, মিলের নাম জুট আর খেলার নাম গোল্লাছুট, যে ভাষায় নদীর নাম কাঁসাই আর ইসকাপনের বিবি পাশাই, পাখির নাম শুক আর জ্যোৎস্না রাতে মূক সে আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা।

যে ভাষায় পিসির নাম পদী আর সুবর্ণরেখা নদী, গোয়েন্দা হন ভানু আর গায়ক কুমার সানু, যে ভাষায় উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে আর লিচুচুরি হয় পুকুর পাড়ে, অলির কথা শুনে বকুল হাসে আর সন্তান সুরক্ষিত মাতৃবাহুপাশে, ব্যাঙের নাম সোনা আর মাছের নাম পোনা, চুলেতে বেলফুল আর রূপেতে মশগুল, সাঁওতাল রাজার নাম দোবরু আর হর্ষবর্ধনের ভাই গোবরা, যে ভাষায় প্রিয়ার নাম রাজলক্ষ্মী আর বারবণিতার নাম মধুমক্ষী, যে ভাষায় ছাদনাতলায় বসিয়ে…”আমি যামিনী তুমি শশী হে”, যে ভাষায় আমের থাকে শিষ আর যা উনিশ তা বিশ, বাঙাল থাকলে ঘটি আর আঁশ থাকলে বঁটি, পানের থাকে বরজ আর প্রেমিকের থাকে গরজ, পাটির সাথে সাপটা আর ঝড়ের সাথে ঝাপটা, বাঁশের নাম মুলি আর স্টেশান শ্যাওড়াফুলি, যে ভাষায় গাছে ওঠে গল্পগরু আর ছক্কা হাঁকালে “চলবে গুরু”, ফুলের নাম মহুল আর গানের নাম বাউল, টেনিদার চ্যালা প্যালা আর টিফিনে কুমীরডাঙা খেলা, যে ভাষায় রবিবারেতে পাঁঠা আর পিরিতি কাঁঠালের আঠা, মাছের দোকানে জটলা আর ফটিক, বাপ্পা, পটলা, যে ভাষায় ফুলপিসি আর বড়কা, আর চাদের বুড়ির চড়কা, যে ভাষায় কাগজে হয় নৌকো আর চালাক চতুর চৌকোস, পানে থাকে জর্দা আর গল্প বলেন বড়দা, পুজোয় থাকে ফর্দ আর মেয়ে থাকলেই মর্দ সে আমার প্রাণের ভাষা গানের ভাষা বাংলা ভাষা।  

শোক ৪

শোক তোমাদের কোথায় বাড়ি কোন নগরে?
শোক তোমাকে আজ খুঁজে পাই কেমন করে?
শোক তুমি আজ কোথায় গাইছ মৃত্যুর ধুন
শোক তুমি আজ বুক ফুঁড়ে দাও…লাল হারপুন

শোক তুমি আজ পাথরকুচি পাতার মতন
পাতায় তোমার রক্ত ধরো। সন্ধ্যা শকুন
খুবলে খাবে আজকে হৃদয় খুবলে খাবে
শোক তুমি আজ রক্তনদে নাইতে যাবে

শোক তোমার আজ হোক বনবাস চোদ্দ বছর
আমার তো এই সাজিয়ে রাখা স্বপ্নশহর
শোক তোমার আজ এই শহরে প্রবেশ মানা
শোক তুমি যাও অন্য কোথাও। মৃত্যুডানা

দাও মেলে দাও। আমার তো কেউ হয়নি সামিল  
ওই দূরে যায়  অনেক দূরে মৃত্যুমিছিল..

 

শোক ৩

শোক এসেছে, শোক এসেছে, উলু দে রে
রশনচৌকি…সানাই বাজুক শোক শহরে
শোক খেতে দাও, শোক বেঁটে দাও গরম গরম
শোক উপহার হোক। না থাকুক লজ্জাশরম

শোক সাজানো আজকে থাকুক ফুলদানিতে
“হেঁইয়ো” চলুক শোকের মিছিল রাজধানীতে
শোক পড়ুক আজ ঝরুক পড়ে জোর কলমে
শোক জ্বলুক আজ মোমবাতিতে মধ্যযামে

শোক তুমি আজ কথার কথা…এমনি এলে?
যে বাড়িতে ফিরল না আজ বাড়ির ছেলে
শোক ধুয়ে খাক – শোকের মত উপাদেয়
কিই বা আছে? ঘৃণা তো নয় শোকই শ্রেয়

শোকের থেকে বড় সুজন আর কে কারো?
রুপোর থালায় শোক বিনিময় শ্রেষ্ঠতর  

শোক ২

শোক ফুটেছে পথের ধারে মৃত্যুভারে
শোক জমেছে ইস্তাহারে শব্দহারে
শোক নটরাজ নয়, নাচে আজ উন্মাদিনী
ওই ছেলেটা আজকে ঘরে আর ফেরে নি

শোক শোকালো শোক শোকালো চোখের কোণে
বোকা হৃদয় ব্যর্থ আশায় প্রহর গোণে
শোক তুমি আজ পাথর হলে পাথর হলে
আজ ছেলেটা ফিরবে না আর মায়ের কোলে

শোক তুমি আজ বৃথাই তোমার সওয়াল করো
শোক তুমি আজ বৃথাই স্মৃতির সৌধ গড়ো
শোক শহরের সিংহদুয়ার আজ খোলা নেই
ঐ ছেলেটা কালকে ছিল আজ বেঁচে নেই

শোক তুমি আজ নির্বাসিত নির্বাসিত
কাল ছিল ফুল, আজ ঝরেছে, আজ প্রয়াত

  শোক ১

দেখো আমার আনন্দধন
উথলে পড়ে সুরার মতন
শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার ফান-ভান্ড
চাখছে পিঁপড়ে একি কান্ড
শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার প্রেম পিরিচি
উপচে পড়ে মিছিমিছি
শোক তোমাকে কোথায় রাখি

পূর্ণ আমি ভালবাসায়
বিক্ষত নই গোলাপ কাঁটায়
শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার সেলফি শহর
অষ্টপ্রহর আনন্দঘোর
শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার প্রেমপ্লাবনে
প্রাণ ভেসে যায় ক্ষণে ক্ষণে
শোক তোমাকে কোথায় রাখি

দেখো আমার মোহনবাঁশি
বাজছে সুরে দিবানিশি
শোক তোমাকে কোথায় রাখি

শোক তুমি আজ সাত সকালে
কেনই বা দরজায় দাঁড়ালে
শোক তুমি যাও অন্তরালে

ঘৃণা

পাত পেড়ে বসো আজ ঘৃণা বেড়ে দিই পাতে পাতে
ঘৃণা জমা করে দিই ব্যাঙ্কে তোমার নামে, খাতে
ঘৃণা উদ্গত হোক অক্ষরে অক্ষরে আজ
এমনই তো শিখিয়েছে আমাকে এ বেশ্যা সমাজ

এসো ঘৃণা চাষ করি…ঘৃণাদের রূপশালী ধান
এসো তছনছ করি অন্যের সাজানো বাগান
এসো ঘৃণা দিয়ে গড়ি শহিদের স্মৃতিসৌধ
ঘৃণার আহুতি হোক, ঘৃণার যজ্ঞসমিধ

তাজা ঘৃণা ফিরি করি বিনামূল্যেতে সস্তায়
ঘৃণাঝুলি নিয়ে আমি দাঁড়িয়েছি বড়রাস্তায়
ঘৃণা চাই? চাই ঘৃণা? আমি বড় ঘৃণাকারবারি
ঝুলি থেকে নিয়ে যাও ঘৃণায় পোড়ানো তরবারি

পূজার থালায় আজ ঘৃণা থাক, ফুল চন্দন
ব্রাত্য হোক, হোক ঘৃণা দিয়ে আজ দেবী বন্দন।

[Its the worldview of those rats, those perpetrators of violence..not mine. Please dont fall for Poe’s law https://en.wikipedia.org/wiki/Poe%27s_law]

নম্বর

প্রথম বই প্রকাশ হওয়ায় কেমন লাগল জিজ্ঞাসা করেছেন এক শুভার্থী। উত্তরে বলি,

না তেমন হাতি-ঘোড়া কিছু লাগে না। না, খুব একটা ল্যাজমোটা হইনি। আমার ল্যাজ ছোটবেলা থেকেই মোটা ছিল। নতুন করে মোটা হওয়ার কিছু নেই। ফেসবুকে স্ত্রী-কন্যা সহ সেলফি দিলে আগেও দুশ লাইক পড়ত আর লেখা দিলে লাইক দুই ডিজিটেও যেত না। এখনো তাই হবে। কথা দিচ্ছি, এরপরেও প্রতিদিন শব্দ রেওয়াজ করব যেমন এখন করি। কথা দিচ্ছি, সস্তায় নাম কামানোর চেষ্টা কখনো করিনি। এখনো করব না। চেষ্টা করব যাতে জীবনে কোনো একটা অন্তত লেখা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ পরীক্ষায় শেষ ঘণ্টি বেজে যাওয়ার মত অনুভূতি অবশ্যই হয়। সেই যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় নিজেকে প্রমাণ করার আকুল প্রয়াস আর তারপর খাতাটা জমা দিয়ে দুরুদুরু বুকে নম্বরের অপেক্ষা করা। অনেকটা সেইরকম। প্রথমদিনেই বইমেলায় যারা “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” বইসংগ্রহ করেছে, বই হাতে ছবি পাঠিয়েছে, তারা সকলেই সেই এক্সামিনার। আমার এক বন্ধু সায়ন্তন দিল্লির এক ব্যস্ত উকিল। দুদিনের ঝটিতি সফরে কলকাতা এসেও বন্ধুর বই সংগ্রহ করতে বইমেলা প্রাঙ্গণে ঢুঁ মেরে চিলের মত দক্ষতায় তুলে নিয়ে গেছে বইখানা। স্কুলের বন্ধু হলেই এমনটা সম্ভব। মোট কথা বইটা বইমেলা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে এমন কি কলকাতার চৌহদ্দি পেরিয়ে পাড়ি দিয়েছে পুরো পনেরশ কিমি। কিন্তু নম্বর পড়তে শুরু করবে তখনই যখন গল্পগুলোর সাথে মানুষগুলোর শুভদৃষ্টি হবে।  

শুধু একটাই মুশকিল। এই পরীক্ষায় দুরকমের নম্বর দেওয়ার প্রথা। একটা সৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে মনে মনে। আর একটা অসৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে সামনাসামনি। অসৎ নম্বরটা হবে লেটার মার্কস। আর সৎ নম্বরে পরীক্ষায় পাশ করলাম কিনা, সেটা বোধ হয় কখনো জানা যাবে না।

বইমেলা অতিক্রান্ত। বইটা এখন ফ্লিপকার্টে পাওয়া যাচ্ছে। Flipkart-এ গিয়ে “Jojatir Jhuli” বলে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে। গল্পের গরু গাছে ঠিকঠাক উঠেছে কিনা দেখতে এক কপি সংগ্রহ করবেন। দেশের যেকোনো প্রান্তেই কিন্তু ডেলিভারি হবে।

https://www.flipkart.com/jojatir-jhuli/p/itmfddfjpdqtqggg?pid=RBKFDCGMBJTKZAZN&lid=LSTRBKFDCGMBJTKZAZNVGGGS4&marketplace=FLIPKART&srno=s_1_1&otracker=AS_Query_HistoryAutoSuggest_0_2&fm=SEARCH&iid=417238ca-99f3-46d0-895a-dc5694f1347f.RBKFDCGMBJTKZAZN.SEARCH&ppt=Homepage&ppn=Homepage&ssid=nzouf4tfq80000001549471830883&qH=463fb7b5b874e6b9

ঝোলায় পুরুন যযাতির ঝুলি

দেখছেন তো? লাইন পড়ে গেছে…

আমাদের মাস্টার গোগোল অর্ধকায়স্থ, মিসেস অ্যাংলোলেডি চৌধুরী, মিস্টার উন্মাদ হিজিবিজিবিজ আর মহামান্য রামগরুড় তর্করত্ন এরা সব লাইন দিয়ে আছে এবারে বইমেলায় নিজের বইয়ের ঝোলায় এক কপি যযাতির ঝুলি ভরবে বলে… আপনি আবার ফাঁকে পড়ে না যান তাই এইবেলা খবরটা চুপি চুপি দিয়ে দিলাম। বইমেলায় পত্রভারতী স্টল নাম্বার 359-এর বাইরে ইঁট পেতে ফেলুন। ঝাঁপি খুলতেই ঝাঁপ দিয়ে পড়ুন। সংগ্রহ করে ফেলুন আপনার কপিটা। “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” পত্রভারতী থেকে আসছে মুদ্রিত মাধ্যমে। এবারে বইমেলায়।

যযাতি কে? ঝুলিতে কি আছে? তাহলে বলি শুনুন। তা হয়েছে কি সেই ছোটবেলায় সুকুমার দাদু বলে দিয়েছেন “আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার। কাতুকুতু বুড়োর কাছে যেও না খবরদার”। তো আমিও তাই যখন সাত সাগরপার পাড়ি দিয়েছি, সাবধান থেকেছি যাতে কাতুকুতু বুড়োর ত্রহস্পর্শ মাড়াতে না হয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে আলাপ হল এক বুড়োর সাথে নাম নাকি তাঁর যযাতি। আর তাঁর কথাতে তিনি হলেন এই কাতুকুতু বুড়োর “মামার পিসিঠাম্মার ভাইয়ের নাতির বোনের ছেলে।” পুরো সাড়ে চৌত্রিশ মিনিট ভেবে ভেবে দেখলাম আদতে তিনি কাতুকুতু বুড়োর ভাই হন। সে যাকগে যাক। এই যযাতি বুড়ো অন্তত কথায় কথায় কাতুকুতু দিয়ে অসভ্যতা করেন না। কিন্তু কাতুকুতু বুড়োর সাথে তাঁর সম্পর্ক বলার ধরণ দেখেই বুঝছেন নিশ্চয়ই এ ভদ্রলোকের বেশি কথা বলার বদরোগ আছে। তো সে যযাতি বুড়ো রোজ এসে আগডুম বাগডুম গপ্পো বলে যায়। সাথে ভয় দেখায় তক্ষুনি তক্ষুনি লিখে না ফেললে সে অবমাননার শোধ নিতে তিনি কাতুকুতু বুড়োকে পাঠিয়ে দেবেন। আমিও তাই টুকে রাখি এই ভেবে যে ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিদের শোনাতে কাজে লাগবে। আর তাছাড়া কাতুকুতু বুড়োর কাছে কাতুকুতু খাওয়ার থেকে যযাতি বুড়োর গপ্পো শোনা ঢের ভালো ব্যাপার।

পত্রভারতী বলে একটা পেল্লাই ছাপাখানা বলে কিনা এইসব হাবিজাবি গপ্পোগুলো ছাপিয়ে দেবে। তো আমি বললাম, “তা দাও খন।” তাই কাতুকুতু বুড়োর কাছে অষ্টপ্রহর কাতুকুতু না খেতে চাইলে এবারের বইমেলায় স্টল 359 থেকে ঝটপট কিনে ফেলুন এক কপি “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”।

ও হ্যাঁ এই অসাধারণ কার্টুনটির জনক আমার বিশেষ বন্ধু বহুমুখী প্রতিভাবান শ্রীল শ্রীযুক্ত অভিষেক রায়। তার সব কটা প্রতিভাকে খুব ছোট করে বললেও লাগে বাহান্ন মিনিট তিপ্পান্ন সেকেন্ড। তাই আপাতত কার্টুনিস্ট অভিষেকের সাথেই পরিচিত হোন।

যযাতির ঝুলি এবার মুদ্রিত মাধ্যমে

যযাতির সুধী যজমানেরা, কেমন আছেন সকলে? কলকাতার শীতের মরশুম কেমন উপভোগ করছেন? বাজারে টাটকা তাজা ওলটা ফুলকপিটা দরদাম করে কিনতে নিশ্চয়ই সকাল সকাল পৌঁছে যাচ্ছেন মাফলার চড়িয়ে। বাড়ির কুঁচোকাঁচাকে স্কুলে পাঠানোর আগে নিশ্চয়ই হনুমান টুপি পড়িয়ে দিচ্ছেন? রাত দশটা বাজলেই লেপের তুলোর নরমে-আদরে-পায়রা-গরমে ঢুকে পড়ার জন্য মন উচাটন নিশ্চয়ই? সকালবেলা সেই রাতভরের প্রেমিকা কম্বলের সাথে ব্রেকআপের মাহেন্দ্রক্ষণে নিশ্চয়ই মনে রাজ্যের বিরক্তি। গিজারে আজকাল গরমজল বেরলেও দু একটা দিন স্নানের সাথে মান করেন নি এমনটা একগলা গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে বললেও কি কেউ আর বিশ্বাস করবে? পৌষপাবনে গৃহিণী গোকুলপিঠে  বানালে বেড়াল-পায়ে রান্নাঘরে হানা দিয়ে দু একটার সদ্গতি করছেন নিশ্চয়ই? সব মিলিয়ে শীতের বাজার সরগরম।

আগে তো বাঙালির ছিল বারো মাসে তের পাবন। তবে এখন হচ্ছে প্রতিমাসেই তেরোটা করে মেলা। হস্তশিল্প মেলা, পদশিল্প মেলা, উদরশিল্প মেলা ইয়ে থুড়ি মানে খাদ্যমেলা, আরও কত কি? তবে সব মেলার সেরা নিশ্চয়ই বাঙালির বইমেলা। যখন এইসব মেলারা মায়ের গর্ভে ছিল (দিদির গর্ভে বলা উচিত ছিল কি?) তখন থেকেই বইমেলা। ধুলো পায়ে পায়ে স্টলে স্টলে ঘোরা, বই চেখে চেখে দেখা, পছন্দের বইখানা খরিদ করে ক্রমশ-ভারি-হতে-থাকা নিজের বইয়ের ঝুলিতে ভরে ফেলা আর মাঝে মাঝে রসনাতৃপ্তির জন্য বইমেলা চত্বরেই চটপটে খাবারের দোকানে মাথা গলানো। সব মিলিয়ে বইমেলায় মেলা আনন্দ, সুপার ফান।

আপনারা যারা যযাতির ঝুলি পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য এবার কিন্তু আর একটা মস্ত খবর আছে। নামী পত্রভারতী প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত মাধ্যমে আসছে “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”। বারোখানা টানটান কাহিনী। বারো খানা রোববারের দুপুরে শুয়ে শুয়ে আলগোছে “যযাতির ঝুলি”-র পাতা ওলটানো।

আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ এক কপি সংগ্রহ করবেন। আপনার বইয়ের তাকে আদর করে তুলে নেবেন। বইটি পড়ে হতাশ হবেন না এটা যযাতির গ্যারান্টি। আপনার গল্পজিভে যাতে চড়া না পড়ে যায় তাই ঝুলি থেকে ভিন্ন জনার ও স্বাদের গল্প চয়ন করেছি বারোখানা। কখনো অম্লমধুর দাম্পত্যকলহ তো কখনো কর্কশ, ঊষর দিনের কড়চা, কখনো দাদু-নাতির সম্পর্কের পায়রাগরম উত্তাপ তো কখনো ব্যর্থ প্রেমিকার ঈর্ষানল। কখনো কঠোর বাস্তব তো কখনো লোমখাড়া করা অদ্ভুতুড়ে গল্প অথবা কল্পবিজ্ঞানলোক। কুশীলবেরা কখনো রবীন্দ্রনাথ তো কখনো প্রফেসর শঙ্কু, কখনো মানুষ তো কখনো না-মানুষ, কখনো চোর তো কখনো পকেটমার। ঝুলিতে প্যানপ্যানানি ঘ্যানঘ্যানানি নেই, নেই শাশুড়ি বৌ। অনর্থক সুড়সুড়ি নেই, নঞর্থক জীবনভাষ্য নেই। আছে এক ডজন খাস্তা তাজা মুচমুচে গপ্পো। আছে নিখাদ আদ্যন্ত বাঙালিয়ানা। যে গল্প শুনতে পান অফিসে, বাসে, ট্রেনে, শনিবারীয় পার্টিতে, রবিবাসরীয় বৈঠকখানায় – যাকে ইংরেজিতে বলে life as it is. শীতের দুপুরে কম্বলের ওমের নিরাপত্তায় নিখাদ কাহিনীক্ষুধা নিবৃত্তি করার জন্য এবারের কলকাতা বইমেলায় পত্রভারতীর স্টল 359 থেকে অবশ্যই সংগ্রহ করুন এক কপি যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো

প্রিয়জনকে উপহার দিন। আর হ্যাঁ, পড়া হয়ে গেলে কেমন লাগল যযাতির ঝুলি ব্লগে বা ফেসবুক পেজে একটা মন্তব্য করে জানাবেন। প্লীজ প্লীজ প্লীজ জানাবেন। কারণ আপনাদের উৎসাহ, কমেন্ট, তারিফ এগুলোই, বিশ্বাস করুন, যযাতির পথ চলার একমাত্র মাধুকরী। আপনাদের ভালবাসাতেই যযাতির কলম সচল থাকে। আজও।  

সিম্বা-কিম্বা-জুম্বা

ছোটবেলায় একটা ভূতের গপ্পো পড়েছিলাম যেখানে ভূতটা কারু বৈঠকখানায় গিয়ে বসলে খুলিটা খুলে পাশে নামিয়ে রাখত। তা রোহিত শেট্টির ফিল্ম দেখতে যাব যখন ঠিক করেছি, তখন এরকম একটা কিছু করব ঠিক করেই রেখেছিলাম। ছোটবেলায় কলকাতার গরমে অনেকেই এসিতে ঠান্ডা হতে কিম্বা বান্ধবীর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে সিনেমা হলে ঢুকত। বান্ধবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার দিন আমার গেছে আর এসি? না তার খোঁজে দরকার নেই। সমগ্র শিকাগো এখন একটা বিশাল রেফ্রিজারেটর হয়ে আছে। ঠান্ডাঘরের খোঁজে নয়, এখানে এখন সবাই উত্তাপের সন্ধানেই মাথার ওপর ছাদ খুঁজছে। তবে রোহিতের ছবি দেখতে যাওয়ার incentive কি? পরিজনের মুখে হাসি ফোটানো বলতে পারেন আর অবশ্যই সুন্দরী সারাহ্‌। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, রবিবাসরীয় আলসেমি আর ফুর্তির-প্রাণ-গড়ের-মাঠ নিয়ে পৌঁছে গেলাম সিম্বা দেখতে। সিম্বা বলতে আমি শেষ জানতাম একটা মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম যা ব্ল্যাকবেরি ডিভাইসকে প্রাণ দিত। সে লঙ্কা নেই, নেই সে রাবণও। কালোজাম ফোন এক্সটিঙ্কট হয়ে গেছে। সাথে সাথে সিম্বা নামক অপারেটিং সিস্টেমও। কিন্তু তার উত্তরসূরী হিসেবে জন্ম নিল পুলিশ অফিসার সিম্বা। হাবভাব চালচলন তার দাবাং-এর সল্লু মিয়ার মত। কলেজ লাইফে একটা তিন অক্ষরের গালাগালি ব্যবহার হত। শুরু আর শেষের অক্ষর মিলে হয় হামি। তিনি হলেন গে তাই। হা-ড্যাশ-মি। আর কেউ তাকে সেই বিশেষণে ভূষিত করলে প্রথমে তিনি মারাঠিতে কি একটা বলেন। পরে দয়া করে সেটাকেই ইংরেজিতে তর্জমা করে দেন – “Tell me something I don’t know”।

না না, সিম্বার মত একটা আপাদমস্তক ননসেন্স মুভি নিয়ে ক্রিটিকাল রিভিউ লিখছি এরকম ভাববেন না, এ নেহাতই পিয়োর আড্ডার ছলে সিম্বার সিম্বায়োসিস। তো যা বলছিলাম আর কি, এই পুলিশ অফিসার, সামথিং ভালেরাও, ওরফে সিম্বার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজিক ডিসঅ্যাডভান্টেজ, ইনি ছোটবেলা থেকেই অনাথ। তবে অনাথদের সাধারণত এরকম ফার্স্টনেম সারনেম সহ গালভরা নাম হয় না। তারা নাম পায় চিন্টু, পিন্টু ছোটে, রাজু ইত্যাদি। কিন্তু ইনি সৌভাগ্যক্রমে একটা দাঁতভাঙা নাম হাতিয়েছেন। এখন এই ভালেরাও মোটেই ভাল রাও নন। অনাথ হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকে ইনি যন্তর ছিলেন, পেটের দায়ে পকেট মারতেন এবং কালক্রমে ধরাও পড়েন পুলিশের হাতে। অল ইন্ডিয়া পকেটমার অ্যাসোসিয়েশানের জেনেরাল সেক্রেটারি তাকে ছাড়াতে এসে পুলিশের হাতে চাঁটা খায় আর তারপর পুলিশকে টাকা খাওয়ায়। সেই থেকেই সিম্বা ঠান মেরে আছে বড় হয়ে সে পুলিশ হবে আর খুব ঘুষ খাবে। তা মারাঠি মানুষ পুলিশ হবে না তো কি মাছ-ভাত-খাওয়া বাঙালি হবে? হাজার হোক ছত্রপতি শিবাজির রক্ত বইছে ওদের শরীরে।

জীবনটা বাজেরাও থুড়ি ভালেরাও-এর বেশ ভালোই প্ল্যানমাফিক এগিয়েছিল। সিম্বা তার পুলিশ অবতারে রীতিমতো জুম্বা করতে করতে এন্ট্রি নিলেন। স্পাইডারম্যান স্টাইলে ধোপার কাপড় ছুঁড়ে দিয়ে একটা সোনাচোরের গলায় পেঁচিয়ে তাকে আছাড়িপিছাড়ি খাওয়ালেন। তারপর চোরের কাছেও টাকা খেলেন। চুরির মাল ফেরত দিয়ে মালিকের কাছেও কাট নিলেন। ঘুষখোর সিম্বার শিবগড়ীয় নিরঙ্কুশ জীবনে মুস্কিল শুরু হল যখন তিনি শিবগড় থেকে গড়গড় করে মিরামার পুলিশ স্টেশানে ট্রান্সফার হয়ে গেলেন। মিরামার থানার বিপরীতেই শাগুনের হোটেল। এই শাগুন, তিনি রূপে আগুন, ভালেরাওয়ের হৃদয়ে এনে দিল প্রেমের ফাগুন। আর সেই ফাগুনে আরও রঙ ধরলো যখন উনিশবর্ষীয়া মিষ্টি মেয়ে, আকৃতি, সিম্বার কাছে দরবার করতে আসল। আকৃতি একটা evening school  চালায়। দূর্বা নামে এক দুর্বৃত্ত আর তার সাঙ্গপাঙ্গ সেই স্কুলে পড়তে আসা গরীব বস্তির ছেলেদের ড্রাগ পেডলিং-এর কাজে ব্যবহার করছে।

না দূর্বা বলে যদি একটি সুন্দরী মিষ্টি মেয়ের কথা মনে আসে তাহলে আগেই বলে দিই ভুল করছেন। বাঙালি দূর্বারা মেয়ে হয়, মারাঠি দূর্বা নিতান্ত গুঁফো এবং পেশিবহুল দুষ্টু লোক (তবে নিজের মা-কে খুব ভালবাসে তাই শতকরা একশভাগ দুষ্টু বলা যায় না)। তবে লোকটার এলেম আছে বলতে হবে, বলিহারি তার মনের জোর। ব্যাবসায় তাকে ঠকিয়েছে বলে নিজের বৌয়ের ভাইকে, মানে আপন শালাকে নিজের হাতে খুন করেছে এবং ফলাও করে বলে বেড়ায়। বাঙালি পুরুষ বৌ-এর ভাইয়ের কেন বৌ-এর চোখে চোখ রাখতেই ভয় পায়! এই না হলে মারাঠা ক্ষাত্রবীর্য!

যাই হোক দূর্বা রেনিডে থুড়ি দূর্বা রানাডের কিসসা ক্লাইম্যাক্স অব্দি মুলতুবি থাক। অভিযোগকারিণী, সমাজসেবী আকৃতির নরমসরম প্রকৃতি দেখে সিম্বা তাকে বোন পাতিয়ে ফেলে। আর তার থেকেই সিম্বার অধঃপতন (কিম্বা উত্থান যাই বলবেন) শুরু। ঘুষের রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় – কবি সুকান্ত বলে গেছেন। আর সম্পর্ক তো কবিতা। জীবনের তার সম্পর্কের সুরে বাঁধলেই যাকে বলে এক্কেরে সাড়ে সব্বোনাশ। ড্রাগপেডলারদের ডেরায় গিয়ে আকৃতি তাদের কুকীর্তির ভিডিও করে নেওয়ায় তার ওপর যৌন অত্যাচার ও হত্যা। সিম্বার ঘুমিয়ে থাকা বিবেক নাড়া দিয়ে জাগিয়ে দেয় এই ঘটনা আর তারপরেই শুরু প্রায়শ্চিত্ত। সিম্বা তার ঘুষখোর অফিসার অবতারে এক বৃদ্ধকে হুড়কো দিয়েছিল (পড়ুন সম্পত্তি হড়পে নিয়ে মনঃকষ্ট দিয়েছিল)। প্রায়শ্চিত্তর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সিম্বা তাঁকে ফটাফট্‌ বাবা পাতিয়ে নেয় আর রীতিমতো ভিক্ষা করে একটা ঠাটিয়ে থাপ্পড় খেয়ে আসে তাঁর হাতে (কোটি কোটি টাকার জমি হড়পানোর শাস্তি যদি একটি থাপ্পড় হয় আমি বারে বারে সেই অপকার্য করে থাপ্পড় খেতে রাজি আছি)। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, অনাথ হওয়ার কারণে মিরামারে পা রাখার পর থেকেই সিম্বা মুম্বাইমেলের গতিতে মা, বোন, বৌ, বাবা ইত্যাদি সম্পর্ক পাতিয়েছে। এমন কি প্রবল প্রতাপশালী দূর্বার মা আর বউকেও নিজের টাপোরি ভাষা আর ভালোবাসায় জয় করে ফেলেছে। আকৃতির অকালপ্রয়াণে বিবেকতাড়িত সিম্বা দূর্বার দুই ভাইকে অসমসাহসে ধরে নিয়ে এসে কোর্টে পেশ করে। আকৃতির ওপর অত্যাচার তারাই করেছে। কিন্তু বিচারের দিন সব সাক্ষ্যপ্রমাণ গায়েব। আকৃতির ওপর অত্যাচারের যে  ভিডিও পুলিশ হেফাজতে ছিল, তা মহামান্য ধর্মাবতারকে দেখানোর জন্য কম্পিউটার-এ পেন-ড্রাইভ ইনসার্ট করতেই একটা নীল পপ-আপ বলছিল “empty empty”। এমন অভূতপূর্ব অপারেটিং সিস্টেম, পেন ড্রাইভ ঢোকালেই যা কিনা empty empty বলে শোরগোল করে, আমি জীবনে দেখিনি। ওটা বোধ হয় কম্পিউটার-নিরক্ষরদের (এবং এই সিনেমা প্রধান গ্রাহক) জন্য হবে। আমি তো আমার খুলি সিনেমা হলের বাইরে খুলেই এসেছি। আমার চাপ নেই।

মোটের ওপর  দূর্বার দুর্বার ভাইদের কোর্টে কাবু করতে না পেরে সিম্বা নিজের সব পাতানো বৌ, বোন, মা, বাবাদের কাছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট নিয়ে ফেলল। সর্বসম্মতিক্রমে দূর্বার দুই ভাইকে পৌরুষে সুড়সুড়ি দিয়ে লকআপ থেকে বের করে “স্টেজড এনকাউন্টার” করে ফেলল। ভাতৃবিরহের ক্রোধে অন্ধ দূর্বা যখন আমাদের সিম্বুকে বাম্বু দিতে তুলে নিয়ে গেছে আর মেরে হাতের সুখ করছে তখনই দরজা টরজা ভেঙে গাড়ি নিয়ে গ্র্যান্ড এন্ট্রি নিলেন আমাদের সিংহম, হ্যাঁ আমাদের সেই আদি অকৃত্রিম অজেয় অজয়। এমন মুহূর্তে টেনিদা থাকলে বলতেন “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক”। সে যাক।  তারপর আবার শুরু হল সিংহম,  সিম্বা আর ভিলেনদের জুম্বা নাচ। দুজনে মিলে ফাটিয়ে মারল দূর্বা ও তার সঙ্গীসাথীদের। নেপথ্যে বাজল “সিংহম সিংহম সিম্বা সিম্বা” ধ্বনি। এই প্রসঙ্গে একটা কথা আমার খুব মনে হয় যে, বলিউডের সব সিনেমার ফাইট মাস্টার বোধ হয় একজনাই। অন্তত একে অপরের অভিন্নহৃদয় বন্ধু তো বটেই। কারণ সব সিনেমার মারপিটেই একই স্ট্যান্স পাবেন। হ্যাঁ, ঐ যে একটাতে দুজন দুষ্টু পেছন থেকে এসে হিরোকে ধরবে আর সামনে একটা লোক লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবে আর হিরো ঐ পেছনের দুজনের কাঁধে ভর করে তেড়ে আসা সামনের লোকটাকে মোক্ষম “বাপি বাড়ি যা” শট মারবে আর তারপর তিনশো ষাট ডিগ্রি ভল্ট খেয়ে নেমে পেছনের দুষ্টু দুটোর চুলের মুঠি ধরে দুম করে একে অপরের মাথায় ঠুকে ছেড়ে দেবে…হ্যাঁ এই সিনেমাতেও সেই স্ট্যান্স পাবেন। পাবেন হিরো কর্তৃক ভিলেনকে একটা টেনিস বলের মত কাচের টেবিল কি কাচের দরজার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া এবং তজ্জনিত কারণে কাচ ভেঙে খানখান হয়ে ছত্রাকারে ছড়িয়ে পড়া (তবে বিনা রক্তপাতে)।

শেষে দূর্বার মা-বৌ গদ্দারি করে দূর্বার সাথে। আগেই বলেছি রিলেশানশিপ মাস্টার, অনাথ সিম্বা ফটাফট অন্যের মা-বোন-বৌ ইত্যাদি নিজের পক্ষে টেনে নিতে সিদ্ধহস্ত অথবা সিদ্ধহৃদয় বলা চলে। দূর্বার মা-বৌ যথাক্রমে নিজের ছেলে ও দেওরের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে দিল। দূর্বার ভাইরাই আকৃতির যৌন হেনস্তা ও খুন করেছে সে কথা ভরা কোর্টে দাঁড়িয়ে বলে দিল (দূর্বার বৌ বোধ হয় এইভাবে নিজের ভাইয়ের খুনের বদলা নিলো)। কিন্তু দূর্বার মা-বৌয়ের কেউই অপরাধের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা স্বত্তেও সে সাক্ষ্য কোর্টে গ্রাহ্য হল কেন সেটা না হয় রোহিতবাবুকেই জিগেস করে নেবেন।

সিম্বা করলেন সাম্বাClick To Tweet

সব মিলিয়ে মাথার খুলি খুলে রাখলে সিম্বা ওরফে রণবীরের জুম্বা খানিকটা সহনীয় হলেও হতে পারে। শুধু দু-একটা প্রশ্ন মাথায় ঘোরে। এক, ধর্ষণ আর অ্যাসিড অ্যাটাক জঘন্যতম অপরাধ। সেটাকে নিয়ে এরকম সস্তা বাণিজ্য করে এইধরণের পৈশাচিক অপরাধের গুরুত্বটাকে প্রতিদিন লঘু থেকে লঘুতর করে দেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? এরকম ছবির স্রষ্টার  মাথা যখন শিশুসুলভ তখন ছোটদের জন্য সিনেমা করলেও তো পারেন। ছোটদের ছবি তো আর বেরোয় না বললেই চলে! দ্বিতীয়, সারাহ্‌ কেরিয়ারের বারা না বাজিয়ে, শুরুতেই নিজেকে সারা না করে একটু ভাল ছবিতে উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করতে পারেন যেখানে নিজের প্রিটি ফেস ছাড়াও ওঁর আরও কিছু অবদান থাকবে। আর তৃতীয়, সিম্বার হাতঘড়িটা বন্ধ ছিল। সেট-ডিজাইনার বোধ করি অনুমান করতে পারেন নি যে দৈবক্রমে কখনো হাতঘড়ির ওপর ক্যামেরা ক্লোজ-আপ হয়ে যেতে পারে।