চুপকথা

নিহত সময়।
স্মৃতি আলপথ ধরে এইক্ষণে হেঁটে আসা যায়।
.
স্তব্ধ প্রহর।
মুখোমুখি আমি আর আমি বসে। চিলেকোঠা ঘর।
.
মৃত্যু ভ্রমরী
বলে গেল, এইবার এইবার চুপিসারে নামবে শর্বরী।
.
রাত্রি নিঝুম।
কথকতা শেষ। আজ চুপকথাদের মরসুম।

বৃষ্টি পড়ে

নিকষ নিঝুম ঘুম শহরে
চুপকথাদের ওজন বাড়ে
বৃষ্টি পড়ে
সারা সকাল বৃষ্টি পড়ে

ঘুম জড়িয়ে চোখ জুড়িয়ে আকাশ জুড়ে
মেঘ-বালিহাঁস জলকে চলে। শব্দসুলুক।
টুপ টুপ টুপ জল-সোহাগী ঘাস চাদরে
মুখ নামিয়ে ভিজছে কথা। একলা ডাহুক

ডাকছে কাকে গহীন সুরে দিগন্তে।
মাটির ঘ্রাণে মন্মথ মন একান্তে
তোমার কথাই ভাবছে। সকাল বৃষ্টিলীন।
মেঘপিয়নের মন-কেমনে শব্দঋণ…

বাবার বিয়ে

শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে
ইবোলার নাকি বাবার বিয়ে?
করোনাকে পাত্র পেলে?
জানতে চাও সে কেমন ছেলে?
মন্দ নয়, সে পাত্র ভাল
মন যদিও বেজায় কালো
তার উপরে মুখের মুকুর
ঠিক যেন এক সুয্যি ঠাকুর
বিট্‌লে বুদ্ধি? বলছি মশাই
ধন্যি ছেলে অধ্যবসায়
হাজার তিনেক নামিয়ে চীনে
ইটালি ঘোরার টিকিট কিনে
এখন করছে ইউ এস ট্রিপ
শুনেই কেমন বুক ঢিপঢিপ
মান সম্মান? অনেক আছে…
দেখলে সবাই পালিয়ে বাঁচে

মানুষ তো নয় বোনগুলো তার
একটা নিপা, একটা শুয়ার –
ইংরেজিতে সোয়াইন ফ্লু গো
পালা পড়লে পুরো ঘেঁটে ঘ
কনিষ্ঠটির ই-কোলি নাম
পেটের রোগের ভোগান্তি দ্যান
কিন্তু তারা উচ্চ ঘর
সার্স (SARS) বংশের বংশধর
চিকেনগুনিয়া মধ্যমগাঁ-র
কি যেন কে হয় করোনার
যা হোক বাবার পাত্র পেলে,
এমন কি আর মন্দ ছেলে?

গোপন প্রেম

তুমি ছটফটিয়ে সামনে এলে
সহস্রবার। আড্ডা দিলে
এর সাথে আর ওর সাথে
আর সন্ধেবাসর মৌতাতে
চোখ চুরিয়ে দেখলে আমায়।
একফালি চাঁদ হৃদয় থামায়
সেই হাসি
হাসলে চেয়ে এর পানে আর ওর পানে
আর ময়ূর হয়ে উঠল নেচে তোমার কানের
ঝুমকোরা। তোমার চোখের কাজললতায়
দীঘির মত স্তব্ধতা – তাই
তোমায় খোঁজা হয় নি শেষ।
বিষণ্ণতার মিষ্টি রেশ
থাকল লেগে মনবাথানে
সঙ্গীবিহীন দুপুর জানে
একলা হলেই তোমার খোঁজ
আমার শহর রোজ খোঁজে রোজ
বৃষ্টিদিন। তোমার চুলের শ্রাবণধারায়
ঘুরতে ফিরতে চোখ চলে যায়…
“কি দেখছ?” – বলবে ভেবে চোখ নামিয়ে
গোপন প্রেমের দেরাজ নিয়ে
তোমার মনের ঠিক পাশেতে চুপকথাতে সমর্পণ।

কি হয় তাতে কি হয় বলো,
আমার একলা বিকেলগুলো
বলতে না হয় নাই পেরেছে…তুমিই আমার আপনজন।।

তোমার কথা

তোমার কথা বলে বেভুল অমলতাস ফুল
নবীন আকাশ, হিরন্ময় জল
তোমার কথা বলে অনর্গল

তোমায় খোঁজে কৃষ্ণ আঁখি রাতচরা এক পাখি
হেমন্তের হিমেল হাহাকার তোমায় খোঁজে
একলা দুপুর বোঝে তোমায় বোঝে

তোমায় জানে বনমর্মর, নয়ানজুলির চর
বর্ষামুখর ঝিঁঝিঁ ডাকার রাত
জানে তোমার নীরব সংঘাত

তোমায় ছুঁয়ে থাকে কথা, মেদুর বিষণ্ণতা
ভোরের বাতাস পাথরকুচি পাতা
তোমায় ছোঁয়ার ছলেই উদ্গতা

কবিতা প্রত্যেকে

কবিতাটি শুনতে চাইলে

শ্যামল রাত্রি তুমি এসো
আমায় নিয়ে যাও আগুনঝোরার বনে
যেখানে কোনো এক দুরন্ত ফাল্গুনে
ফুটেছিল রাশি রাশি অমলতাস ফুল।
ফুটেছিল? নাকি সে আমার মনের ভুল?
জানি না..জানি না ফুলেদের মৃতদেহ ঝরে
কেন ঘাসেদের চাদরে আদরে,
কেন মর্মব্যথা জেগে থাকে
পৃথিবীর বিজন প্রান্তরে,
কেন রুদ্ধ সঙ্গীত বাজে অন্তরে অন্তরে?
ক্ষুধা জেগে থাকে বুভুক্ষু মনে
মন পোড়ে, পোড়ে মন তুষের আগুনে।
রাতচরা পাখিদের গান
আর বুকভরা নীরব অভিমান
লেগে থাকে শিশিরের গায়,
আমি শুধু বসে থাকি ঠায়।
খোলা পরে থাকে সাদা পাতা
ব্যর্থ কোনো ব্যর্থ প্রেমগাথা
শরীর পেতে চায়। এক প্রাচীন পাখির
কণ্ঠে বিঁধে থাকে তীর,
রক্ত ঝরে বিধুর সঙ্গীতে।
বিষাক্ত কীটের মত দংশাতে
আসে কোনো বিষধর সাপ –
ঠোঁটে লেগে থাকে তার
সহস্র বছরের পুরাতন পাপ,
রক্ত মাংস মজ্জা মেদ
জুড়ে থাকে স্তূপীকৃত ক্লেদ।

ক্লিন্ন পৃথিবী, হে ক্লিন্ন পৃথিবী
রাত্রি সর্বজ্ঞ নয় এ আমার একান্ত বিশ্বাস।
প্রতি নিশ্বাসে তাই অভিসার অনাগত দিনে
যেখানে অরণ্যের গহনে গহীনে
অমল অরূপ এক আলো খেলা করে।
গাছেদের একান্ত জঠরে
জীবনের স্বাদ মাখামাখি জড়াজড়ি।
এইখানে এইখানে নিহত শর্বরী
এইখানে এসে আমি দুদন্ড বসি, খেলা করি।
অনলস ঝরে পরে অজস্র মেহুল।
তান ওঠে, ঐকতান, সুগভীর নাভীমূল থেকে –
“একা নই একা নই আমরা তো সুমধুর কবিতা প্রত্যেকে”

আবার যদি ফিরে আসি

আবার যদি ফিরে আসি,
আমায় নিয়ে যাবে তোমার ভুবনডাঙার মাঠে?
যেখানে রোজ সন্ধেবেলা রিক্ত প্রহর কাটে
মগ্নতারা একলা জাগে নদীর ঘাটে ঘাটে।

আবার যদি ফিরে আসি,
তোমার খোঁপায় জড়িয়ে দেব বনধুতরোর ফুল।
বাতাস তোমার গন্ধে আকুল
প্রিয়া তোমায়, ইতস্তত ছুঁয়ে যাবে সামান্য লজ্জায়।
আমি তখন একলা শুয়ে তোমার জলে..অনন্ত শয্যায়।।

Phoolon ke Rang se…

গীতিদি এবং পার্থদা বলে এক দম্পতি আছেন যাঁরা এখানকার যেকোনো মহতী বাঙালি উদ্যোগে একজন আশ্রয়ী বটবৃক্ষের মত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। ওনাদের ৪৩ তম বিবাহবার্ষিকিতে শুভানুধ্যায়ীরা একটা প্রীতিভোজের আয়োজন করেছিলেন। সাথে একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। আমায় অনুষ্ঠান সঞ্চালকের দায়িত্ব দেওয়ায় বিভিন্ন শিল্পীরা যে গানগুলি গাইবেন শুনে দেখছিলাম। নতুন করে প্রেমে পড়ে গেলাম সেই অমর কালজয়ী গানটির – “Phoolon Ke Rang Se Dil Ki Kalam Se”। এতটাই প্রেমে পড়ে গেলাম মনে হল গানটি অনুবাদ করি। কবি শ্রীজাতর কথায় অনুবাদ অনেকটা একটা শিশি থেকে অন্য শিশিতে আতর ঢালার মত। স্থানান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় কিছু সুগন্ধ উবে যাবেই যাবে। তাই প্রচেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব সুবাস ধরে রাখতে, যতটা সম্ভব ধ্বনিমাধুর্য অক্ষুণ্ণ রাখতে।

তোমায় চিঠি লিখেছি রোজ ফুলের মরমে মনের কলমে প্রিয়া
কেমন করে বলি, তোমার তরেই জ্বলে আমার হৃদয় দিয়া
তোমার স্বপ্ন নিয়েই বাঁচা তোমার স্মৃতিই জাগা
তোমার কথাই ভাবছে বসে এ মন হতভাগা
তোমার আমার প্রেম যেন এক শ্রাবণ রাতের মেঘ মিঁয়া মল্লার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার
তোমার আমার প্রেম যেন এক শিউলি ভোরের কোমল গান্ধার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার
আমার হৃদয় তন্ত্রীতে আমার মনের বীণটিতে তোমার সুরই বাজে
তোমার ছবি আছে রাখা কস্তুরী সুঘ্রাণ মাখা হৃদয় দেরাজে
তোমায় খুঁজেছি জনান্তিকে তোমায় খুঁজেছি নিয়ন আলোর ভিড়ে
তোমার কথা পড়লে মনে এক লহমায় একলা নদীতীরে
তোমার আমার প্রেম যেন এক শ্রাবণ রাতের মেঘ মিঁয়া মল্লার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার
তোমার আমার প্রেম যেন এক শিউলি ভোরের কোমল গান্ধার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার

Original Song

Phoolon Ke Rang Se Dil Ki Kalam Se Tujhko Likhi Roz Paati
Kaise Bataaoon Kis Kis Tarah Se Pal Pal Mujhe Tu Sataati
Tere Hi Sapne Lekar Ke Soya Teri Hi Yaadon Mein Jaaga
Tere Khayaalon Mein Uljha Raha Yoon Jaise Ki Maala Mein Dhaaga
Haan Badal Bijli Chandan Pani Jaisa Apna Pyar
Lena Hoga Janam Humein Kayi Kayi Baar
Haan Itna Madir Itna Madhur Tera Mera Pyar
Lena Hoga Janam Hameh Kayi Kayi Baar

Sanson Ki Sargam Dhadkan Ki Beena Sapnon Ki Geetanjali Tu
Man Ki Gali Mein Mehke Jo Hardum Aisi Juhi Ki Kali Tu
Chhota Safar Ho Lamba Safar Ho Sooni Dagar Ho Ya Mela
Yaad Tu Aaye Man Ho Jaaye Bheed Ke Beech Akela
Haan Badal Bijli Chandan Pani Jaisa Apna Pyar
Lena Hoga Janam Humein Kayi Kayi Baar
Haan Itna Madir Itna Madhur Tera Mera Pyar
Lena Hoga Janam Hameh Kayi Kayi Baar

নির্বাক

আমাদের আর কোনো কথা নেই…
নেই সন্ধ্যা শ্রাবণ, জ্যোৎস্না প্লাবন,
নেই কোনো বনপলাশীর চরে চপল রণন।
আছে শুধু উদাসীন ব্যথাতুর আড়াআড়ি ভেঙে যাওয়া মন।

থাকে শুধু উদাসীন ব্যথাতুর আড়াআড়ি ভেঙে যাওয়া মন…
ভীড় করে থাকে তার আশেপাশে মৃত্যু গহন।

এ প্রহর নিবিড় প্রহর
এ এক অদ্ভুত অচঞ্চল অলীক মৃত্যুলেখা ভোর
ভালবাসা, বলো সখী, কবেই বা জোর করে, জোর?
মানুষেরা সকলেই ছেড়ে যাওয়া গ্রাম-বন্দর।।

নির্বাক

কবিতা, তোমায় বলি শোনো,

হেমন্তের নিভৃত দুপুরে শুনেছ কখনো

ঝরা পাতাদের নিঃশব্দ সংলাপ?

টুপ টাপ টুপ টাপ টুপ টাপ…

মনস্তাপে ভুগেছ নিত্যদিন?

মজে যাওয়া নদীর মত ক্ষীণ, অতি ক্ষীণ

না-বলা-কথাদের মন্দ্র গম্ভীরে

কথা বলা কত অর্থহীন?

কখনো কি মনে হয়

শুধু থাক, শুধু থাক, শুধু থেকে যাক শব্দঋণ?

 

কবিতা, তোমায় বলি শোনো,

মাঝে মাঝে মনে হয় কথা বলা গর্হিত অপরাধ কোনো

কথা বলে অবিরল, অবিরল কথা বলে অনঙ্গ মনও…