আত্মজ – ছোটগল্প

বাবা তোমার মুখে এরকম ভয়ঙ্কর নির্লিপ্তি কেন? তুমি কি বুঝতে পারছ না আমার কত কষ্ট হচ্ছে? তুমি কি বুঝতে পারছ না বাবা আমি মরে যাচ্ছি? অনেকটা রক্ত বেরিয়ে গেছে। ঘরের বিছানায় পড়ে আছি আমি। তুমি কিভাবে এলে এখানে? কার কাছে খবর পেলে? এসেছই যদি ওভাবে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে দেখছ কেন? আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছ না কেন বাবা? বিদিশা আমায় সতেরো বার স্ট্যাব করেছে। আমার হার্ট লিভার কিডনি সব ফালা ফালা করে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করো ওর সাথে চীট আমি করি নি। ওকে ঠকাই নি আমি। ও মিথ্যে সন্দেহের বশে…

পুরোটাই কি মিথ্যে অজয়?

অ্যাঁ? তুমি…তুমি কি অনহিতার কথা বলছ? অনহিতা জাস্ট আমার অফিস কলিগ ছিল। দ্যাট’স ইট। আমি কোন দিন ওকে সে ভাবে দেখি নি – বিদিশা যেরম মনে করে।

তাই কি? আমার যেন মনে হচ্ছে তোমার যেন একটা দুর্বলতা ছিল অনহিতার ওপরে। সেই একটা শনি বারে যখন বিদিশা শপিং-এ বেরিয়ে গেল, তুমি বিনা কারণে অনহিতাকে চ্যাটে ধরো নি?

হ্যাঁ ইয়ে। ধরেছিলাম। কিন্তু তুমি…তুমি জানলে কি করে? যাই হোক, যখন জেনেই ফেলেছ তখন সত্যি বলি। সত্যি বলতে আমার একদম কিছু ছিল না তা নয়। আমার ওর সাথে কথা বলতে ভাল লাগে। ও আমায় বোঝে। তবে ওকে শুধু আমি বন্ধুর চোখেই দেখি। কিন্তু তুমি জানলে কি করে?

আমি জানি। কিন্তু সত্যিই কি বন্ধুর চোখে দেখো ওকে?

হ্যাঁ.. বিশ্বাস করো। তার বেশি কিছু নয়। একদম সত্যি এটা।

তবে একদিন বিদিশাকে রাতে আদর করার সময় মনে মনে তুমি অনহিতার কথা ভেবেছিলে কেন?

কি বলছ তুমি? কক্ষনো নয়। ইয়ে মানে। হ্যাঁ। ভেবেছিলাম। সে একটা প্রচন্ড দুর্বল মুহুর্তে। কিন্তু সে তো আমি কাউকে কখনো বলি নি। আমার গোপনতম সিক্রেট। তুমি কি করে জানলে বাবা? হাউ কুড উ?

জানি আর এও জানি, বিদিশাকে তুমি শুরুতে ভালইবাসতে। কিন্তু তোমাদের মধ্যে ইন্টেলেকচুয়াল লেভেলে কোন  বন্ধুত্ব ছিল না। তাই তোমরা একে অপরের থেকে ধীরে ধীরে দুরে সরে গেছো।

ঠিক ঠিক। ভীষণ সত্যি। আমি অনেকবার ভেবেছি এই কথা। কিন্তু তুমি আমার সব মনের কথা জানলে কি করে বাবা? বুঝেছি। তুমি আমার ডাইরি পড়েছ। আমার পারমিশান না নিয়েই আমার ডাইরি পড়লে? দ্যাট ওয়াজ নট ফেয়ার।

না। ডাইরি আমি পড়িনি। বিদিশা সন্দেহ করার পরে, বাড়িতে অশান্তি শুরু হওয়ার পরে, তুই তো ডাইরিটা ছিঁড়েখুড়ে সেই রাস্তার ধারে বড় ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এলি। কি করে পড়ব?

কিন্তু তখনও তো তোমরা কিছু জানতে না। তখনও তো পাঁচকান হয় নি ব্যাপারটা। তবে কি করে জানলে আমার ডাইরি ছিঁড়ে ফেলার কথা?

তোর মনের কথা জানতে আমায় তোর ডাইরি পড়তে হয় না। তোর মন ডাইরেক্ট পড়ে ফেলি। আমারই হাতে গড়া মন কি না।

মানে?

আর ওই ডার্ক ইচ্ছেগুলো আমিই তো দিয়েছি। তুই অনুশোচনা করিস না। তোর তাতে কোন দায় নেই, দোষ নেই। অজয় এই সব বিরোধ, কনফ্লিক্ট তো আমি তোকে এই জন্য দিয়েছিলাম যাতে তুই এই সংসার থেকে ডিটাচড হয়ে ইন্ট্রোস্পেক্ট করতে পারিস। আত্মবিশ্লেষণ। আত্মসমীক্ষা।  বোঝার চেষ্টা করতে পারিস তোর স্বরুপ। একটা করে খেলনা দিয়েছি। কেড়ে নিয়েছি। যাতে সব খেলনাতে ইন্টারেস্ট হারিয়ে নিজেকে চিনতে চেষ্টা করিস।

তুমি দিয়েছিলে? মানে কি? তুমি দেবার কে? হ্যাঁ আমি সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে দু একবার একলা বসে ভাবার চেষ্টা করেছি। যে আমি কি চাই? কি পেলে শান্তি পাব? আমি লোকটা আদতে কে? কিন্তু তারপর আবার দৈনন্দিন জীবনের চাহিদারা আমায় জোর করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তুমি এইসব কনফ্লিক্ট দিয়েছ কথাটার মানে কি? তুমি দেবার কে? আমি সত্যি বুঝতে পারছি না বাবা।

ওয়েল। যদি নিজেকে জানার চেষ্টাটা চালিয়ে যেতিস, তাহলে আজ আমায় তোকে খুন করতে হত না।

কি বলছ? তুমি আমায় খুন করেছ? বিদিশা তো আমায় স্ট্যাব করল। ঘুমের ঘোরে আমার নাকে কি একটা ধরল। আমার হাত পা অবশ হয়ে গেল। প্রতিরোধ শক্তি চলে গেলেও আমি সব বুঝতে পারছিলাম। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছিল।

হ্যাঁ আমিই ওকে দিয়ে করিয়েছি অজয়। আমার কিছু করার ছিল না। আমায় ক্ষমা করে দিস। আমারও কষ্ট হবে তোকে ছেড়ে থাকতে। কিন্তু এই কাজ তুই-ও তো করেছিস অজয়। তুই একটা কম্পুটার সিমুলেটেড ব্রেন  নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছিলি না? মৃত্যুঞ্জয় নাম দিয়েছিলি তার। সে তোকে বাবা বলে জানত। সেটাকেও তো তোকে মডেলটা এক্সপেক্টেড ওয়েতে বিহেভ করছিল না বলে টার্মিনেট করতে হয় । আমি সেই একই দোষে দোষী মাত্র। তার বেশি নয়।

ওটা একটা প্রোগ্রাম ছিল বাবা। তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু আমি? আমি তো একটা রক্ত মাংসের মানুষ….তুমি আমার নিজের বাবা হয়ে পারলে বিদিশাকে দিয়ে এই কাজ করাতে? আমি, আমি কত কষ্ট পাচ্ছি দেখতে পাচ্ছ না? আমার সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রনা…

যদি উত্তরটা পাওয়ার দিকে এগোতিস, তাহলে আমাকে এই ভাবে প্রোগ্রামটা টার্মিনেট করতে হত না। । আমার এই মডেলটাও ফেল হয়ে গেল। অজয়, তুইও মানুষ না। তোর শরীর নেই। ওটা মিথ্যে কল্পনা। তুইও তোর সৃষ্ট মৃত্যুঞ্জয়ের মতই একটা কম্পুটার সিমুলেটেড কনসাসনেস। আমি তোর মধ্যে তোর হাত পা মাথা আছে এই বোধ ভরে দিয়েছি।  এই যে তোর নাম অজয় এই বোধ ভরে দিয়েছি। বিদিশাও আমারই তৈরি একটা কম্পুটার সিমুলেটেড কনসাসনেস। তুই তোর জীবনে যত লোকের সাথে আলাপ করেছিস কেউ সত্যি নয় রে। ওরাও তোর মতই কম্পুটার সিমুলেশান। একটা লাইব্রেরি অব সিমুলেটেড ব্রেন ইম্পোর্ট করেছি তোর ডিজিটাল জীবনে। এই চুয়াল্লিশ শতাব্দিতে স্ট্যান্ডার্ড রেডিমেড ব্রেন লাইব্রেরি পাওয়া যায় কিনতে। কিন্তু তোর মনটা, তোর চেতনাটা আমার নিজের সৃষ্টি। তুই আমার সন্তান।

কি সব বলছ? এটা হতে পারে না। আর এটা তো একত্রিশ শতাব্দি। চুয়াল্লিশ কি করে হল?

আজকে যত তারিখ বলে তোর ধারণা সেটাও যে আমিই ভরেছি তোর প্রোগ্রামে। একটু পুরোন দিনে ফেলে ট্রাই করছিলাম। তোর মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়কে সৃষ্টি করার ইচ্ছেও আমি-ই দিয়েছি। আসলে আমি এই নেস্টেড সিমুলেশানটা চালাচ্ছিই এই জন্য যাতে এই পরস্পর বিরোধী বোধগুলোর মধ্যে থেকে কোন একটা অন্তত সিমুলেটেড কনসাসনেস বুঝতে পারে কিনা যে এগুলো হতে পারে না। দীজ আর আটার নন্‌সেন্স। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হতে পারে না। মানুষ বোকার মত ধর্মের নামে একে অপরকে মারতে পারে না। দীজ আর পসিবল ওনলি ইন আ প্রোগ্রামড ওয়ার্ল্ড। যাতে সে বুঝতে পারে যে সে সত্যিকারের মানুষ নয়, একটা কম্পুটার প্রোগ্রামের একটা থ্রেড মাত্র। যদি সেই ব্যাপারটা বুঝতে পারতিস বা তোর সন্তান মৃত্যুঞ্জয় অন্তত বুঝতে পারত তাহলে আমাকে তোর প্রোগ্রামটা টার্মিনেট করতে হত না। তুই অমর হয়ে যেতিস। তুই পারলি না। আমি আবার একটা নতুন সিমুলেশান ট্রাই করব। এখনও ভেবে দেখ যদি বুঝতে পারিস তোর স্বরুপটা। তাহলে আমি এখুনি হাসপাতালে গিয়ে সুস্থ হয়ে যাওয়ার বোধ তোর কৃত্রিম মনে ভরে দিতে পারি।

বাবা, আমার এই হাত, পা, মাথা কিছু সত্যি নয়? আমি সত্যি নই? আমি অজয় নই? আমি কিছুতেই মানতে পারব না বাবা…

আচ্ছা দাঁড়া। তোর হাত পা নেই কিনা দেখবি? আমি তোর বডি কনসাসনেস মডিউলটাকে শাট ডাউন করে দিই। এবার বুঝছিস? হালকা লাগছে?

না না না। তুমি জাস্ট একটা সিডেটিভ দিয়েছ। তাই আমি হাত পা মাথার বোধ আর পাচ্ছি না। আমি কিছুতেই মানতে পারব না আমার এতদিনের এত কিছু সব মিথ্যে। বাবা আমি অজয় তোমার ছেলে…

কন্ট্রোল সি মেরে দেন বিজয় বাবু। অজয় নামের প্রোগ্রামটা বন্ধ হয়ে যায়। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে দেওয়ালের দিকে শুন্যগর্ভ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। পারল না তার এই সিমুলেশানটাও সেল্ফ কনসাস হতে। নিজেকে জানতে। আবার করে করতে হবে…তবু মনে তার কেন জানি কষ্ট হয়। যতই সিমুলেশান হোক, তারই তো সন্তান। গর্ভপ্রসুত না হলেও তারই তো মস্তিস্ক প্রসুত। আত্মজ। বিজয় বাবু ভাবেন “আফটার অল তিনি তো মানুষ। কষ্ট হওয়া তো স্বাভাবিক।”

*****

চিন্তিত মুখে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে ধনঞ্জয়। নাহ, তিনি মিছেই আশায় দিন গুনছেন। এই বিজয় এখনও ভাবছে ও আদতে মানুষ। আর ওর দ্বারা সৃষ্ট অজয় একটা সিমুলেটেড কনসাসনেস। ও এখনও বুঝছে না যে ও নিজেও একটা কম্পুটার সিমুলেশান মাত্র, ওর ছেলেরই মত। ওর ছেলের ছেলেরই মত। ও এখনও ভাবছে এটা চুয়াল্লিশ শতাব্দি। ওই টাইমফ্রেমটা ওর সিমুলেশানে আমি ভরেছিলাম। ও এখনও বুঝছে না এটা আসলে আদতে সাতাত্তর শতাব্দি। ও সেলফ কনসাস হতে পারল না। বিজয়কেও টার্মিনেট করে দিতে হবে। নতুন করে আর একটা সিমুলেশান শুরু করতে হবে। শুধু মায়ার বশে করতে পারছেন না। তিনি তো মানুষ।

*****

ধনঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে হতাশায় মাথা নাড়ে তার সৃষ্টিকারী সিমুলেটেড ব্রেন দুর্জয়….

[প্রকাশিত পরবাস ৭০ সংখ্যা https://parabaas.com/PB70/LEKHA/gSwarvanu70.shtml  ]

মুক্তি

প্রণবেশ সাধু ঘুম থেকে উঠেই দেখলেন মাথার কাছে একটা লোক হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে। অন্য কেউ হলে হয়তো চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করত কিমবা পুলিশকে টেলিফোন করার জন্য সেন্টার টেবিল হাতড়াত, কিন্তু প্রণবেশ সাধুর নামটা গালভারী হলেও মেজাজটা নেহাতই অমায়িক। কোনো কিছুতেই অধিক উত্তেজিত বা আনন্দিত অথবা যারপরনাই দুঃখিত হন না। যাকে বলে একেবারেই “দুঃখেষুনুদবিগ্নমনা সুখেষুবিগতস্পৃহ”। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে পাশে অচেনা কাউকে বসে থাকতে দেখলে চা-শরবত দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করার রীতি নেই। তাই চোখ পড়া মাত্র ধড়মড় করে উঠে বসতে যাবেন, লোকটা বলল “এ হে হে, সাম্‌লে কত্তা সাম্‌লে। এই বয়সে অতো দৌড় ঝাঁপ করবেন না।”

তা তুমি বাপু কে? বিরক্ত হলেও ভদ্রতার মাত্রা অতিক্রম না করে বললেন সাধু বাবু।

“কে জানে? সে বহুকাল আগের ব্যাপার যখন আমি একটা কিছু ছিলাম। এখন মনে টনে নেই। আর মনে রাখার দরকারও তেমন পড়ে না। আমি কে সেই নিয়ে আমাদের এ তল্লাটে তেমন কারু মাথা ব্যাথা নেই। যে যার নিজের মতো আছে। বুঝলেন কিনা। আমাকে স্রেফ হাওয়া বলতে পারেন।” বলে লোকটা একটা বিচ্ছিরি পান খাওয়া দাঁত নিয়ে হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলো।

সাধুবাবু এর মধ্যে বিশেষ হাসির কিছু পেলেন না। কথাটার মানেও যে বিশেষ বুঝলেন তা নয়। বিশেষত “এই তল্লাটের” ব্যাপারটা।

রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বললেন “আহ বাপু বিনা কারণে হাসছ কেন? তো আমার এখানে কি দরকার? বিশেষত আমার বেডরুম-এ। চোর-টোর নও তো?

লোকটা এক হাত জিভ কেটে বলল “আজ্ঞ্যে না কত্তা। কি যে বলেন। আমি এক্কেরে যাকে বলে কুলীন বামুন। অ্যাই অ্যাই দেখুন পৈতে। পুরো দেড় হাত। কথায় বলে পৈতের দৈর্ঘ দেখে বামুনের ব্রহ্মতেজ বোঝা যায়” বলেই লোকটা আবার হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলো।

মাঝ রাত্তিরে এরকম বাজে রসিকতা সাধু বাবুর একেবারেই পছন্দ হল না। বললেন “দেখ বাপু ঠিকঠাক বলো তুমি কে নয়ত কিন্তু …” কিন্তু যে কি করা উচিৎ নিতান্ত নিরীহ সাধু বাবু সেটা কিছুতেই ভেবে উঠতে পারলেন না।

এই “নয়ত কিন্তু” তে কিন্তু বোধ হয় একটু কাজ হল। লোকটা মুখটা নিতান্ত দুখি দুখি করে বলল “মাইরি বলছি, আমার পিতৃদত্ত নামটা আমার আজকাল একদম মনে পড়ে না। আসলে কেউ কাউকে নাম ধরে ডাকে না যে। আপনিও বছর কয়েক আমার তল্লাটে থেকে দেখুন, দেখবেন আপনার নাম ধাম বংশপরিচয় সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

“আমি খামোকা তোমাদের তল্লাটে গিয়ে থাকতে যাব কেন? আমি আমার পৈত্রিক বাড়িতে গিন্নি সমেত বেশ আছি।”

“ও হো আপনি এখনো বুঝতে পারেন নি। তাই না?” বলেই লোকটা আবার ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লাগলো।

“তুমি আমার বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করেছ আর মাঝরাত্তিরে বিনা কারণে হেসে আমার হাড় ভাজা ভাজা করছো। এতে আর বোঝবার কি আছে?”

“হে, হে এমনটা সক্কলের হয়। আমারই হয়েছিল জানেন। শুধু শরীরটা একটু হাল্কা লাগত। আর বিশেষ কিছুই তফাত ধরতে পারিনি প্রথমটায়। কখন বুঝলাম জানেন? যখন দেখলাম  মানুষগুলো আস্তে আস্তে ঝাপসা থেকে ঝাপসাতর হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। বৌ বাচ্ছা সব। আর নতুন লোক যাদের দেখতে পাচ্ছিলাম তারা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হল। আসলে ভূতেদের নামে মিছেই নিন্দা মন্দ করে মানুষেরা। ভূতেরা তো আদতে মানুষদের দেখতেই পায় না। আর মানুষ যেমন ভুত দেখে চম্‌কে ওঠে, ভূতেরাও হঠাৎ করে কোনভাবে মানুষ দেখতে পেয়ে গেলে রীতিমতো খাবি খায়।”

“থামো থামো, কি-কি-কি আবোলতাবোল বকছ? তু-তুমি বলছ আ-আমি ম-মরে গেছি” এবার যৎসামান্য উত্তেজনায় তোতলাতে থাকেন সাধু বাবু।

“তা বলে নিজেকে চিমটি কেটে দেখবেন না যেন। প্রথম প্রথম চিমটি কাটলে ঠিক-ই লাগবে। যারা বলে মরে গেছি কিনা দেখতে নিজেকে চিমটি কেটে দেখা উচিৎ, তারা নিতান্তই নির্বোধ। আসলে অনেকদিনের অভ্যাস তো ওগুলো। সহজে যাবে না। শরীরবোধটা আস্তে আস্তে যাবে।”

“যত সব ঢ-ঢ-ঢপবাজি। একটা বর্ণ-ও বিশ্বাস করি না।”

“আপনি বরং এক কাজ করেন কত্তা। দুধ কা দুধ পানি কা পানি হয়ে যাবে। ওই জানলার গরাদগুলো আমি খুলে আনছি। ওই পথে এই দোতলা থেকে সোজা একটা ঝাঁপ দিয়ে দেন। মাটিতে পড়লে একটু লাগবে, অনেক দিনের অভ্যাস তো। কিন্তু দেখবেন আদতে একটুও লাগে নি। গট গট করে আবার দেওয়াল বেয়ে উঠে ঐ জানলা পথে ঘরে ফিরে আসুন।”

“না না। ও ও সব আমি পারব না। মরেছি কিনা প্রমাণ পেতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণটা খোয়াই আর কি।” এইবার সাধুবাবু একটু ভয় পেয়েছেন। বিশেষত জানলার লোহার গরাদটা এই বেয়াক্কেলে লোকটা কি করে খুলে আনল সে কথা ভেবে।

“হুম্ম্। আপনার দেখছি সময় লাগবে। এই এই দেখুন আমি করে দেখাচ্ছি।” বলেই লোকটা কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জানলা পথে অদৃশ্য হয়ে গেল। আবার বাইরের দেওয়াল বেয়ে উঠে এসে জানলায় পা ঝুলিয়ে বসে ফ্যাক ফ্যাক  করে সেই বিরক্তিকর হাসিটা হাসতে লাগলো।

“এইবার বলুন কত্তা। বেঁচে থাকাকালীন আমার মত অশরীরীর দেখা কখনো পেয়েছেন? আমায় দেখেছেন কি মরেছেন।”

কথাটা যুক্তি সঙ্গত। সারা জীবন শুনেছেন অনেক, কিন্তু ভুতের দেখা তো কখনো পান নি।

“তবে আপনি ভাগ্যবান। ঘুমের মধ্যেই হৃদয়ে সামান্য দোলাচল আর আপনি সোজা অক্কা। আপনি সাধু টাইপ মানুষ বলে শরীরটা সহজে ছাড়তে পেরেছেন। অনেকের দেখি খুব ভোগান্তি হয়। যাকগে যাক। আপনার এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস হয় নি তো। আসেন। এইখানটায় এসে দাঁড়ান। এবার পা দুটোকে মাটি থেকে ওপরে তুলে শূন্যে ভেসে থাকার চেষ্টা করুন। পারছেন না তো? হুম্ম্। প্রথম প্রথম পারবেন না। আপনার মনে এখনো অভিকর্ষের প্রভাব। এই দেখুন?” বলেই লোকটা হাত দুয়েক শূন্যে উঠে ভাসতে লাগলো আর ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লাগলো।

সাধুবাবু নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরও একবার চেষ্টা করে ফেললেন এবং ব্যর্থ হলেন। কিন্তু এই মানুষটা তো শূন্যে ভেসে থেকেছে মিনিট খানেক। স্বচক্ষে দেখেছেন তিনি। একটু ধন্দে পরে যান। তবে কি এ সত্যি না-মানুষ? সত্যি কি তবে তিনি মরে গেছেন?

“এখনও বিশ্বাস হয় নি তো আপনার? আচ্ছা বলুন এ বাড়িতে এই মুহুর্তে আর কে কে আছে? আসলে আজকাল আমি আর মানুষ দেখতে পাই না। আপনি সদ্য সদ্য দেহ ছেড়েছেন। আপনি পাবেন।”

“কেন আমার স্ত্রী আছেন। ওই তো, ঐ তো ঘুমিয়ে আছেন বিছানায়। তাছাড়াও আমার চারপেয়ে assistant ভুলু। নিচের তলায়।”

“আপনি যদি একটা জবরদস্ত প্রমাণ খুজছেন যে আপনি শরীর ছেড়েছেন, এক কাজ করুন আপনার স্ত্রীকে ঘুম থেকে তুলে একটু খাস গপ্প করার চেষ্টা করে দেখুন কত্তা। দেখবেন আপনি ওনাকে তুলতেই পারবেন না। আসলে আপনার শরীর নেই তো। গলার স্বরও নেই।”

সাধু বাবু তখুনি উচ্চ স্বরে “ওগো শুনছো” বার কয়েক চেঁচিয়ে, হাত ধরে টেনে, নাকে পায়ে সুড়সুড়ি কোনভাবেই স্ত্রীকে জাগাতে পারলেন না।

“এইবার ভুলোকেও একবার চেষ্টা করে দেখবেন নাকি কত্তা?”

“না থাক” হাল ছেড়ে দেন সাধুবাবু। তাঁর এবার বেশ বিশ্বাস হচ্ছে তিনি মরেই গেছেন।

“শরীর গেছে বলে দুঃখ করবেন না। আপনার তো সেই অর্থে পিছুটান বলে তেমন কিছু ছিল না। এবার ঠিক করুন। থাকবেন না যাবেন?”

“মা-মানে? কোথায় যাব?”

“না মানে আপনি এ বাড়িতেও গেঁড়ে বসে থাকতে পারেন, আবার ও পারে চলেও যেতে পারেন। আমি আসলে যাকে বলে ঘোর সংসারী ছিলাম। তাই আর ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হয় নি। এখানেই ঘুরে ঘুরে বেড়াই। দেশ দুনিয়া দেখি। আপনি চাইলে ওপারে চলেও যেতে পারেন। এক যদি কোনো কিছুর প্রতি প্রবল আকর্ষণ না থেকে থাকে।”

সাধু বাবু একটু ভেবে বললেন “হ্যাঁ মানে চলে যেতে পারলে মন্দ হয় না। এই রোজকার ঝঞ্ঝাটের থেকে মুক্তি পেতে কে না চায়? জাগতিক আকর্ষন বলতে আমার ঐ বিয়ের আংটি, সোনার বোতাম আর রোলেক্স ঘড়িটা..আর ঠাকুর্দা আমায় আমার ১৮ বছরের জন্মদিনে দিয়েছিলেন একটা সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো ছিলিম…সেইটে। ওই আলমারিতে আছে।”

“হুম্ম্ মুস্কিল। এ জগৎ মায়া প্রপঞ্চময়। মায়ার বাঁধন তাই খুব বাধা দেবে আপনাকে। আপনি যেই ছেড়েছুড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, অমনি টেনে নামিয়ে আনবে। ঐ আলমারিটার আশেপাশে ঘুর ঘুর করবেন। সে ভারী যন্ত্রণা।”

“তাহলে আমার এখন কি করা উচিৎ?”

“কি যে করবেন? টান মেরে যে কোথাও গিয়ে ফেলে আসবেন তার জো নেই। সেখানেই আপনার অ-শরীরটা ঘুর ঘুর করবে। এক কাজ করেন। ও গুলো আমায় দিয়ে দেন। আমার শরীর তো এই জাগতিক ফাঁদে আটকা পড়েই আছে, আমি বরং দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসি। আপদগুলোর হদিস না জানলে দেখবেন মায়া কাটাতে আপনার সুবিধে হবে।”

সাধুবাবু খানিক ভেবে দেখলেন আইডিয়াটা মন্দ না। আংটি, বোতাম, ঘড়ি আর ঠাকুর্দার ছিলিম তিনি আলমারি খুলে বের করে লোকটার হাতেই তুলে দিলেন। দিতেই মনটা বেশ হাল্কা আর প্রসন্ন হয়ে উঠল। যাক আর কোনো পিছুটান রইলো না। “নিয়ে যাও বাপু। অনেক উপকার করলে। এবার মনে হচ্ছে হাত পা ছড়িয়ে পরপারে যেতে পারব।”

“এই বার শুয়ে পড়ুন। শুয়ে শুয়ে চেষ্টা করুন। অনেক সময় কিন্তু ততক্ষনাত যাওয়া যায় না। দু-এক দিন লাগে। সেই দু-এক দিনে দেখবেন অনেকরকম জাগতিক বাধা এসে আপনার পথ রোধ করবে। দেখবেন আপনার স্ত্রী ঘটি ঘটি চোখের জল ফেলছে, আপনার বোতাম, ঘড়ি চুরি যে হয়েছে তার অকাট্য প্রমাণ দাখিল করছে। ওসবে একদম ঘাবড়াবেন না। আপনি ঠান মেরে রাখুন আপনাকে মুক্তি পেতেই হবে। বোঝলেন কিনা…নয়তো কিন্তু আমার মত অশরীরী হয়ে ঘুরঘুর করতে হবে কত্তা..” বলেই লোকটা সুরুত করে জানালা পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।

*********

সকাল বেলা হৈ হৈ রই রই রব। পাড়া প্রতিবেশী সব হাজির। সাধনবাবুর বাড়িতে রাত্তির বেলা আলমারি খুলে  সোনার আংটি, বোতাম, ছিলিম, ঘড়ি সব নিয়ে গেছে চোরে। সংগে একটা চিঠি রেখে গেছে

সাধু বাবু,

এখনও আপনি না মরলেও, অচিরেই একদিন শরীর ছাড়তে হবে। তখন এই মায়া গুলো বড় আটকাবে আপনাকে মুক্তির পথে। তাই আপনার মুক্তির পথটা সুগম করতেই এ কটা নিয়ে গেলাম। গ্রন্থিগুলো ছিন্ন করে গেলাম। আমরা বংশ পরম্পরায় চোর। তাই দোতলা থেকে লাফ দেওয়া, দেওয়াল বেয়ে ওঠা এগুলো ভালই জানা আছে। আর আমার পিসি ছিল এক ডাকিনী, আজকের দিনে যাদের ডাইনি বলে আর কি। তার কাছ থেকে ঐ শূন্যে ভাসার দৃষ্টি বিভ্রম তৈরী করার কৌশলটা শিখেছিলাম। আর বেড-সাইড টেবিল-এ ঘুমের ওষুধের কৌটো দেখেই বুঝলাম আজ রাত্তিরে আপনার স্ত্রীকে শত ডাকলেও উঠবেন না। আর জানলার লোহার গরাদ তো কেটে ঐ পথেই ঢুকেছিলাম। ভালবাসা নেবেন।

                              আপনার অনুগত,

                                       স্রেফ হাওয়া

সাধুবাবুর স্ত্রী শেফালি বরকে শাপশাপান্ত করে বাড়ি মাথায় করছে। “শেষমেশ বুড়ো বয়সে তোমার এই ভীমরতি ধরলো গো? নিজের হাতে করে একটা ছিঁচকে চোরের হাতে সোনার আংটি, বোতাম তুলে দিলে?” ইত্যাদি ইত্যাদি…

*********

পাড়াপ্রতিবেশীর মতামত, বৌ-এর ধাঁতানি অনেক্ষণ ধরে বসে ভ্যাবলাকান্তের মত খেয়ে বাথরুমে ঢুকলেন সাধুবাবু। দরজাটা লক করে দিয়েই চট করে একবার শূন্যে ভাসার চেষ্টা করলেন। ব্যর্থ হলেন।

“হবে হবে। লোকটা তো বলেই গেছে এরকম অনেক বাধাবিপত্তি আসবে মুক্তির পথে। বাইরে যা চিতকার চেচাঁমেচি হচ্ছে, এ সবই তাঁর মানসিক বিভ্রম। এগুলোতে বিশ্বাস করেছেন কি ঠকেছেন। ওই লোকটার মত আটকে থেকে যাবেন তাহলে। আসলে তাঁর শরীর ছাড়া হয়ে গেছে কাল রাত্তিরেই।” স্থির নিশ্চিত সাধুবাবু।

নিজেকে চিমটি কেটে দেখলেন। হ্যাঁ এখন অনেকটা কম লাগছে। আর একটা ব্যাপার-ও তো সত্যি। পাড়া প্রতিবেশী, স্ত্রী সবাইকে অলরেডি ঝাপসা দেখছেন তিনি। আর সবচেয়ে ভাল ব্যাপার ঐ ঘড়ি-আংটির মায়া ত্যাগ করতে পেরে তাঁর শরীর-মন দুটোই এখন বেশ ফুরফুরে হাল্কা লাগছে। শূন্যে ভাসতে পারার আর বেশি দেরি নেই।

 

theif

রবিবাসরীয়

happy-sunday-quotes-sunday-humorরবিবার সকালবেলা কোথায় সদ্য ভাজা গরম মুচমুচে চিঁড়ে ভাজার মত আবহাওয়া থাকবে, কোথায় শরতের মেঘের মত হালকা খুশি ভাসবে বাতাসে, মার্চ মাসের ভোরের মত না-গরম-না-ঠান্ডা একটা ফুরফুরে মেজাজ বাড়িতে ঘুর ঘুর করবে তা না, সকাল থেকে শ্রাবণের জলদ গম্ভীর আকাশের মত হাল বাড়ির। বৃষ্টি কখন নামে তার ঠিক নেই। ইন্ডিয়া অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ আছে। শমীক টিভিটা খুলে দেখবে কিনা সেই নিয়ে বেশ খানিক চিন্তা করে আপাতত না দেখাই ঠিক হবে ডিসিশান নিয়েছে। মোবাইল খুলে অফিসের মেল চেক করার নাম করে ক্রিকইনফো ডট কম থেকে লেটেস্ট স্কোরটা দেখে নিচ্ছে। আর মুখটা যারপরনাই গম্ভীর রাখার চেষ্টা করছে। রবিবার দুপুরে একটু কচি পাঠার ঝোল খাবে বলে কাল থেকে মনের মধ্যে কাঠবিড়ালি টাইপস হালকা খুশি তিড়িক তিড়িক করে চড়ে বেড়াচ্ছিল। সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠেই বিল্টুর দোকান থেকে নিয়েও এসেছে। কিন্তু সেই মাংসের ব্যাগ রান্নাঘরের এক কোনায় পড়ে আছে। অনাদৃত। এতক্ষনে তাদের কড়াইতে পেয়াজ টোমাটোর কার্পেটে শুয়ে গরম তেলের জাকুজিতে হট বাথ নেওয়ার কথা। ছাল ছাড়ানো নুন মাখানো অবস্থায় পড়ে আছে মাংসের আলুরা। মানে যাদের মাংসের ঝোলে সিক্ত হয়ে মধ্যাহ্ন ভোজনে রসনার মধ্যে অদ্ভুত সঙ্গীত সৃষ্টি করবার কথা ছিল। বাবাই বই-এর পাতা খুলে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। শমীক জানে তার এখন এক বিন্দুও পড়ায় মন নেই। চুপচাপ বসে বাড়ির সিচুয়াশানটা জাজ করার চেষ্টা করছে। কারণ এতক্ষনে তার বারোয়ারি তলার মাঠে বল পিটতে যাওয়ার কথা। এমনকি চারপেয়ে ভুলোও কি বুঝে বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করছে না। আর এ বাড়ির হাইকমান্ড ওরফে হোমে মিনিস্টার ওরফে শমীকের স্ত্রী, অন্তরা, গম্ভীর মুখে বসে টিভিতে কি একটা সিরিয়াল দেখছে। চোখের কোনে একটু জল শুকিয়ে আছে। শমীক আড়চোখে একবার দেখে নিয়েছে। এটা সেই সিরিয়ালটা। একটা ভীষণ ভাল বউমা সংসারের সব কাজকর্ম বিনা বাক্যব্যয়ে করে ফেলছে। শাশুরি-ননদ সকলেই তার সাথে অত্যন্ত ঢ্যামনাগিরি করলেও বউমার সাত চড়ে মুখে রা নেই। দুদিন বাদে বাদেই তাকে গয়না চুরির অপবাদ দিলেও সে শুধু মাত্র সংসারের মঙ্গল চিন্তা করে। এমন সহমর্মিতার প্রতিমুর্তি দেখলে ভগবান বুদ্ধ-ও বোধ করি লজ্জা পেতেন। এমন ক্ষমার ক্ষমতা দেখে মেজাজ চটকে গিয়ে গান্ধিজীও বোধ হয় একটি চড় কষিয়ে দিতেন বউমাটিকে – মনে মনে ভাবে শমীক। নর্মাল দিনে সে সিরিয়াল চললে পাশ থেকে টিপ্পুনি কেটে থাকে। কিন্তু আজ সিচুয়েশান খুব চাপের। কি থেকে ঝামেলা শুরু হয় তার ঠিক নেই। তাই সে ক্রিক-ইনফোতে মনোনিবেশ করে আবার।

সকাল পর্যন্ত সব ঠিক-ই ছিল। ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাবাই এর সাথে অন্তরার “দাঁতটা মাজ না রে বাঁদর। দুধটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে না” টাইপস স্নেহ সম্ভাষণে বোঝা যাচ্ছিল একটা নর্মাল দিন। বাজারে যাওয়ার সময়েও অন্তরা বলল “একদম হাড়-ওলা মাংস আনবে না। আর শোনো মেটে নিয়ো তো।” শমীক বলল “কেউই যদি হাড়-ওলা মাংষ না নেয় তাহলে মাংসের দোকানদারদের এবার থেকে জেনেটিকালি মডিফায়েড বোনলেস পাঁঠা প্রোডিউস করার কথা ভাবতে হবে”। এটা শমীকের প্রি-ডিফেন্স। সে জানে সে যতই চেষ্টা করুক না কেন ঠিক হাড়ওলা মাংসই তার কপালে জুটবে। অন্তত অন্তরার সেরকমই বক্তব্য হবে। অন্তরা নিজে গিয়ে নিয়ে আসলে মাংসের গুণমান, কোয়ালিটি ইত্যাদি ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত ঝকঝকে হয়ে যায় কেমন করে একটা। এই অব্দি সব ঠিক ছিল। বাজার থেকে ফিরে শুনলো কেস গড়বড়। অন্তরার তার কেটে গেছে। কেমন একটা তড়িৎপৃষ্ট মুখ। কি না সকালের ডেইলি এফ বি ডায়েট করতে গিয়ে অন্তরা দেখেছে ওর মা চন্দ্রানির এফবি স্ট্যাটাস

“শঙ্কুর পা মচকে গেছে। হাড় ভেঙ্গেছে কিনা জানা যাবে ডাক্তার দেখালে। ফীলিং স্যাড।”

শঙ্কু অন্তরার বাবার নাম। তখন থেকেই অন্তরার ভীষন দুশ্চিন্তা। দুবার ফোনও করেছে। কিন্তু মা ফোন ধরে নি। নিশ্চয়ই এখন ডাক্তার-হসপিটাল-নার্সিং হোম করছে। শমীক মনে মনে ভাবে, ভদ্রলোক আর দিন পেলেন না। থেকে থেকে এই রোব্বার সকালেই পা মচকালেন। এর জন্য মৃত পাঁঠা ওনাকে কোন দিন ক্ষমা করবে না। সোমবার কি মঙ্গল বার করে পা মচকালে বিশাল মহাভারত অশুদ্ধ হত? আর শাশুড়ি মার বলিহারি। সামান্য পা মচকেছে তাতে ঘটা করে স্ট্যাটাস আপডেট দেওয়ার দরকার কি? ডাক্তার দেখিয়ে পা ভেঙ্গেছে জেনে দিলে তাও একটা কথা ছিল। সব সময় মেয়েদের বাবা-মারাই বেশি স্মার্ট হয় কেন শামীক বোঝেনা। শত শত বার চেষ্টা করেও নিজের বাবা-মাকে স্মার্ট ফোন ধরাতে পারেনি। রোব্বার এই এগারটা নাগাদ দ্বিতীয় বার কফি খায় সে। অনেক চেষ্টা করেও কফিটা অন্তরার মত বানাতে পারে না। বিবাহোত্তর জীবন যে মেয়েরা  “জিনিয়াস” হয় এটা শমীক সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করে। কিন্তু আজ অন্তরার হাতের কফি তো দুরের কথা, নিজেও যে বানাতে যাবে, সেটাতেও ভরসা পাচ্ছে না। হঠাৎ যদি “আমার বাবার পা ভেঙ্গেছে তোমার কোন মাথা ব্যাথাই নেই” শুরু করে দেয় তাহলে নিজেকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে প্রবল মাথা ধরে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই সময় বিরাট কোহলি না খেলে রাহুল দ্রাবিড় খেলাই ভাল। বল আসলেই ডট। ডট। ডট। লম্বা খেলতে হলে দু একটা ওভার মেডেন ছাড়তেই হয়।

এই সময় বিরাট কোহলি না খেলে রাহুল দ্রাবিড় খেলাই ভাল। বল আসলেই ডট। ডট। ডট। লম্বা খেলতে হলে দু একটা ওভার মেডেন ছাড়তেই হয়।

এমন সময় ফোনটা এল। অন্তরার মায়ের ফোন।

কি রে ফোন করেছিলি নাকি? দু-তিনটে কল দেখলাম

বাবা এখন কি করছে? আমি তো চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছি।।

কি আবার করবে? যা করে এই সময়। বিন্দাস শুয়ে আছে। আর আমার হয়ে গেছে বাঁশ।

ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছ কখন?

দেখি দু-এক দিন পরে নিয়ে যাব। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।

এখনো নাও নি? তুমি কি গো? পড়ল কি করে?

সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নামছিল। ওটা তো ওরকমই। সারাক্ষণ ফুটছে।

এই বয়সে বাবা লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। বাবার কি ভীমরতি হল নাকি?

তোর বাবা কেন নামবে? নামছিল আমার নতুন সোনামোনাটা। ও তুই বোধ হয় একে দেখিস নি। মাস খানেক আগে একদিন রাস্তায় দেখলাম ডাস্টবিন ঘাঁটছে। খেতে না পেয়ে রোগা। গায়ে ঘা। আমি তো জানিস-ই পশুপ্রেমী। এই সব দেখলেই চোখে জল চলে আসে। তা কুকুরটাকে বাড়ি আনলাম। সবে খাইয়ে, ভেটেরিনারি ডাক্তার দেখিয়ে একটু সুস্থ করে তুলেছি, আজকে দেখ না পড়ে গিয়ে পা টা মচকে বসে আছে। লেংড়ে হাঁটছে। আমার কপাল। সারা জীবন অন্যদের সেবা শুশ্রুষা করেই গেল।

ঊফফ মা। এইটা ঘটা করে এফবি আপডেট দিয়েছ?

কেন? তুই দিস না। শমীকের জন্মদিনে একই ঘরে থেকেও এফ বি তে “হ্যাপি বার্থ ডে মাই লাভ” দিস না? তুই দিলে সেটা ফেসবুক স্ট্যাটাস আর আমি দিলে আদিখ্যেতা?

আঃ মা ঝগড়া কোরো না তো! কিন্তু তুমি শেষে বাবার নামে কুকুর পুষেছ? বাবার সাথে তোমার ঝগড়া-টগড়া এইভাবে পাবলিক করার কোন দরকার ছিল?

বাবার নামে কেন পুষতে যাব? ওই নামের একটা মানুষকে সামলাতেই সারা জীবন হিমসিম খেয়ে গেলাম। আবার আর একটা? আমি পাগল নাকি? ওর নাম তো রেখেছি বঙ্কু। আমাদের ছেলের মতই তো। তাই তোর বাবার নামের সাথে মিলিয়েই রাখলাম।

ঊফফ মা। তুমি না? মানে কিছু বলার নেই। তাহলে এফবি তে দিয়েছ কেন শঙ্কুর পা ভেঙ্গে গেছে বোধ হয়।

ও শঙ্কু লিখেছি বুঝি। ওটা বঙ্কু হবে। এই ফোনটাও বলিহারি? আগে ব্যাবহার করা ওয়ার্ড ফট করে রিপ্লেস করে দেয়।

অন্তরা মায়ের সাথে আরও কিছু ঝগড়া করে ফোন রাখল। মুখে হাসি ফুটেছে। টিভিতে তখন সেই সুপারলক্ষী বৌটি পরাধীন ফ্রান্সের সেই কিংবদন্তী কৃষককন্যা জোন অব আর্ক-এর মত তার শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী কোন এক দুষ্টু লোককে শাস্তি দিতে যুদ্ধ যাত্রা করেছে। রিমোটের একটা বাটনের আঘাতে সে ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে যায়। অন্তরা এবার রান্নাঘর মুখো। শমীক স্পষ্ট দেখতে পায় ব্যাগ-এর মধ্যে থাকা মাংসের টুকরোর মুখ উজ্জল হয়। মনে হচ্ছে দুটো-আড়াইটের মধ্যে মাংসের ঝোলটা দাঁড়িয়ে যাবে। বাবাইও সুযোগ বুঝে বলে ওঠে “মা আমি খেলতে যাই?” ভুলো লাফিয়ে সোফায় উঠে রাজার বেটা ঘুগনিওলার মত বসে পড়ে। শমীকও রিমোটটা নিয়ে টিভিটা চালিয়ে ফেলে। ম্যাচের বাকিটা এবার আরাম করে সোফায় বসে টিভিতেই দেখা যাবে। কোহলি ততক্ষণে পিটিয়ে ম্যাচটাকে প্রায় মেরে এনেছে।

নীড়ে ফেরা

অরিত্র মোবাইলে দেশের খবর পড়তে পড়তে চায়ের কাপটায় লম্বা চুমুক লাগায়। আজ মনটা তার বেজায় খুশি খুশি। শিরায় উপশিরায় ধমনিতে যেন একটা গঙ্গাফড়িঙ তির তির করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোটবেলায় অ্যানুয়াল পরীক্ষার শেষ দিনে পরীক্ষা দিয়ে আসার পর যেমনটা হত।  এই সবে লং ডিস্ট্যান্স ফোনটা শেষ করেছে সে। ডীলটা পাকা হয়ে গেল। অনেক পুরুষ ধরে বিশুদ্ধ কলকাতাবাসী সে। তার কোন ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা ঢাকা শহর থেকে গুটিয়ে বাটিয়ে কলকাতা চলে এসেছিল। বাসা বিনিময় করেছিল কোন এক তাহের আলির সঙ্গে। অরিত্রকেও যে সেইরকমই একটা কান্ড করতে হবে কে জানত। কিন্তু ঠাকুরের কৃপায় পাওয়া গেছে একজনকে। ভদ্রলোকের নাম বিনিত আগরওয়াল। মাড়োয়ারি। কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না প্রথমে। ব্যাটা বানিয়া বলছিল

“আপনার বাড়ি আমার পসন্দ আছে কিন্তু ওখানে গিয়ে হামি বেবসা জমাতে না পারলে আমার কি হোবে” এই সব। অরিত্র ওকে অনেক স্তোকবাক্য দিয়েছে।

“আপনার কাপড়ের দোকান এখানে রমরম করে চলবে। অনেক ঘর বাঙ্গালি আছে। অর্থাৎ কিনা শাড়ির ব্যাবসা চলতে বাধ্য। সেরম কোন শাড়ির দোকানও এখানে নেই। আপনি কলকাতা থেকে শাড়ি কিনে আনবেন আর এখানে তিন গুন দামে বিক্কিরি করবেন। এক বছরের মধ্যে আপনার বৌয়ের গলায় শেকলের মত মত মোটা সীতাহার বাঁধা। একদম অচলা লক্ষী আপনার বাড়িতে” ইত্যাদি।

ব্যাটা তাও গাঁইগুই করে। শেষমেষ ব্রহ্মাস্ত্রটা ছাড়ে অরিত্র। সঙ্গে সঙ্গে রাজি বিনিত। চায়ে আর এক চুমুক লাগিয়ে ঈপ্সিতাকে ডাকে সে। “ও গো শুনছো, পাকা কথা হয়ে গেল। আসছে বছরের মাঝামাঝি করে বিনিত-এর চৌরঙ্গির বাড়িটার পজেশান পাচ্ছি। আর এ বাড়িটা ওর। কদ্দিন পরে কলকাতা ফিরব..উফফ ভাবতেই পারছি না। প্যাকিং-ট্যাকিং চালু করো।”

এখন থেকে কি? দেরি আছে তো।

কই আর দেরি। যেতে সময় লাগবে না?

হুমম। তুমি যখন এ শহরে বাড়ি কিনছিলে তখনই বারণ করেছিলাম। বলে ছিলাম “কিনছ তো। কিন্তু এরম একটা ধরধরা গোবিন্দপুরে গিয়ে থাকতে পারবে তো কলকাতা ছেড়ে?” তখন তো কত জ্ঞান দিলে। “ইপ্সু, আমরা হবো গিয়ে আর্লি অ্যাডপ্টার। সব থেকে বেশি সুবিধে আমরা পাবো। সব থেকে বেশি লাভ আমাদের হবে।” হ্যানা তানা।

কি করবো? তখন তো এই নতুন শহরে কেউই আসতে চাইছিল না বলে জলের দরে জমি বাড়ি বিক্কিরি করছিল। লোভে পড়ে…

তো বছর তিনেকও তো হয়নি আমরা এখানে এসেছি। এর মধ্যে তোমায় কি ভুতে কামড়ালো যে ফিরে যেতে হচ্ছে? কি খারাপটা আছে এ শহরে শুনি?

কিছুই খারাপ নেই। সেইটাই সবচেয়ে বড় কারণ ইপ্সু।

সত্যিই তো নেই। চব্বিশ ঘন্টা ইলেক্ট্রিসিটী, জলের সমস্যা নেই, গ্রসারি টসারি অর্ডার করলেই হোম ডেলিভারি

২৪ ঘন্টা অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, আউট অফ দি ওয়ার্ল্ড চিকিৎসা ব্যাবস্থা – যোগ করে অরিত্র।

তারপর মে মাসের প্যাচপেচে গরম নেই। আগাস্ট সেপ্টেম্বর-এর রাস্তা উপচানো জল কাদা নেই।

ঠিক ঠিক। সবই ভাল। কিন্তু এ শহরে কোন খবর নেই ইপ্সু। ঘটনা নেই। দিন নেই রাত নেই। শহরের নাম শুনলেই মনে হয় জেলখানা। কোনদিন শুনেছ কোনো শহরের নাম হয় হান্ড্রেড অ্যান্ড টু?

তা বলতে পারো। হ্যাঁ, এখানে ফুচকা নেই। গড়িয়াহাটে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা শাড়ির দোকান নেই। চেৎলার মোড়ের মাছের বাজারের চিতল মাছ নেই।

তারপর এখানে সাউথ সিটি মল নেই, রাস্তার ধারের এগ রোল নেই, হাত বাড়ালেই দীঘা মন্দারমুনি নেই, পাটায়া-ফুকেট এর হলিডে প্যাকেজ নেই। নাহ, এখানে থাকা চলে না। এখানে মেড়োই ঠিক আছে।

কিন্তু মানালে কি করে ভদ্রলোককে? উনি তো বেঁকে বসেছিলেন।

আরে ব্যাবসায়ি মানুষ। ছাড়তেও পারছিল না। ওর দু কামরার বাড়ির বদলে আমি আমাদের এখানের বিশাল বাগান বাড়ি দিচ্ছি।

তবুও তো আসতে চাইছিলেন না।

একটা মোক্ষম অস্ত্র ছাড়লাম। বিনিত কাত।

কি বললে?

বলে দিলাম এখানে সরকার ইনকাম ট্যাক্স নেয় না।

এ বাবা, তুমি না যাতা এক্কেরে।

মিত্থে তো বলিনি। এখানে সব ট্রান্সাকশানই ডিজিটাল। তাই প্রতিটা টাকা হস্তান্তরেই ট্যাক্স কেটে নেয়। কিন্তু সেটা বলিনি ওকে। ট্যাক্স দিতে হয় না জেনে খুশি খুশি রাজি হয়ে গেল।

মনটা এখন আমারও বেশ খুশি খুশি লাগছে বুঝলে। আজ রাতে শেফ ইপ্সিতার হাতে তোমার জন্য বেনুদির চিকেন কষা।

বাহ। কিন্তু আমাদের বেরোতে হবে এই মাসেই। সাত মাসের পরে আর এয়ার ট্রাভেল করতে দেয় না। তোমার তো এখন তিন মাস চলছে।

ঠিক বলেছ। সেটা ভেবে দেখিনি। যেতে এখন কিরম সময় লাগছে?

ক্রেয়োজেনিক ইঞ্জিনে তিন মাস। মেসোজেনিক-এ দুই। কিন্তু ভাড়া ডাবল প্রায়।

যাক ভালই হল। আমার পেটে থাকা মিস্টুকে আর এম-বি-সি-ই হতে হল না।

সেটা কি?

Mars Born Confused Earthian!!

হ্যাঁ। সিরিয়াসলি। এই মঙ্গল গ্রহে মানুষ থাকে না। চলো এই আনন্দে আজ আমরা লুডো খেলি। জড়িয়ে ধরে অরিত্র ইপ্সিতাকে।

এই কি হচ্ছে। মিস্টু আছে না?  ছাড়ো। আর সিটি ১০১ এ  যে বাড়িটা কিনলে?

ওটা তো পচিশ-শো-পচিশের রিসেশানে কিনেছিলাম। কলকাতা থেকে ওখানে এখন তিন দিনেই যাওয়া যায় আজকাল। সামার হোম করে রেখে দেব। “এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব সেই চাঁদের পাহাড়” গাইতে গাইতে বেরিয়ে পড়লেই হল। পরে যদি দেখি তেমন যাওয়া-টাওয়া হচ্ছে না ভাড়া দিয়ে দেব। চলো এখন আমরা বেনুদিকে পাকড়াই।

ঈপ্সিতা রান্না ঘরের দিকে যায়। অরিত্র চায়ে চুমুক দিতে দিতে গুনগুনিয়ে গায়

“মঙ্গল গ্রহে মানুষ থাকে না।…সিন্ধু ঘোটক থাকে না…”

“মঙ্গল গ্রহে মানুষ থাকে না।…সিন্ধু ঘোটক থাকে না…”

index

শিরোধার্য দাড়ি

rabiএই যে বড়দা, হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই বলছি, এই একটু উজ্জয়িনীর রাস্তাটা বাতলে দিতে পারেন?

আমিও সেই দিকেই যাচ্ছি। জুড়ে পড় ইচ্ছে হলে। গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। তা তুমি বাপু কিসের খোঁজে? ভোজ খেতে চলেছ নিশ্চয়ই? পাত পেড়ে খুব করে মন্ডা মিঠাই খেতে চাও? ওই ধান্দাতেই আজ সবাই ও মুখো।

আজ্ঞে না না। আমার বাপের জমিদারি আছে। খাওয়া পরার চিন্তা নেই। আমি যাচ্ছি গান শুনতে। শুনলাম মহাকবি কালিদাস নতুন বই লিখেছেন, কুমারসম্ভব নামে। তো সেই বই তিনদিন তিন রাত ধরে কবি নিজে গান গেয়ে শোনাবেন আর ঠিকঠাক রাজ কর্মচারির হাত ভেজাতে পারলে কবির ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারও পাওয়া যাবে। তা ভাবলাম যাই একটা অটোগ্রাফ নিয়ে আসি আর যদি কোনভাবে কবির সাথে যদি একটা সেল্ফি ম্যানেজ করতে পারি। আপনিও কি উজ্জয়িনী যাচ্ছেন?

হ্যাঁ আমিও সে উদ্দেশেই। কিন্তু উদ্দেশ্য এক নয়। ছোঁড়াটা নতুন লেখাটা কেমন লিখলে সেটা একটু নিজের কানেই শুনে বিচার করব বলে যাচ্ছি। তা তোমার কি করা হয়?

দাদা, ঐ যে বললাম বাপের জমিদারি। তাই করতে কিছুই হয় না। তাই লিখি। আমি কিঞ্চিত লেখক।

বটে? তুমিও লেখ। আজকাল দেখছি এঁদিপেঁদি গেঁড়ি গুগলি সবাই লিখছে। যাকগে যাক। তা এ ছোঁড়ার লেখা পড়েছ?

পড়েছি। মেঘদুতম আমার ভীষণ প্রিয়। রসোত্তীর্ণ লেখা। যেমন ভাষার বাঁধুনি, তেমনি মন্দাক্রান্তা ছন্দ, তেমনি ভাব। “কাঙ্খিতকান্তা বিরহগুরুণা স্বাধিকারপ্রমত্ত…”

ওই লেখাটার জন্য আমি ওকে অবিশ্যি দশে সাত দিতে পারি। এরোটিক রোমান্টিসম বিষয়টাকে ভালই এক্সপ্লোর করেছে। কিন্তু ছোঁড়াটা বড্ড বেশি লিখেছে। একজন লেখক জীবনে একটা কি বড় জোর দুটো লিখবে। ভাল লিখবে যাতে হাজার বছর টেঁকে সে লেখা। এত গাদা গাদা লেখার দরকার কি? বিশেষত অনুপ্রেরণাহীন অর্ডারি লেখা লিখেছ তো ব্যাস। মাথা থেকে বেরুবে খড় বিচুলি। যতই চিবাও কোন রস নেই। যেমন তোমার এই “মহাকবি কালিদাসের” লেখা রঘুবংশম। রদ্দি মাল। আসলে দরকার হল অনুপ্রেরণা, ইনস্পিরেশান।

বাহ দারুন বলেছেন তো বড়দা। আপনিও লেখক নাকি? এত সুন্দর কথা বলেন?

আমায় চেনো নি বুঝি? অবিশ্যি তখনকার দিনে ঘটা করে বই-এর সাথে বই-এর লেখক এর ছবি ছাপত না। আর ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, রীডিং সেশান এসবও ছিল না। তাই, না চেনাই স্বাভাবিক। আমি একটা বিশাল মহাকাব্য লিখেছি। বহু বছর ধরে সেটা বেস্ট সেলার।

উরিব্বাস। অমন একটা লেখার ইনস্পিরেশানটা কি ছিল দাদা?

আমার ব্যাপারটা খুব নাটকীয়, ড্রামাটিক। আমি টীন-এজ বয়সে বিশাল বড় “পাড়ার দাদা” ছিলাম। গ্যাং লিডার। এলাকায় তোলা তুলতাম, চুরি ছিনতাই করতাম। তখন আমার নাম রত্নাকর। সে নামে সবাই থরহরি কম্পমান। তারপর কি করে একটা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মনটা নরম হয়ে গেলো। ওসব বাজে কাজ ছেড়ে দিলাম। নামটাও এফিডেভিট করে বদলে বাল্মিকী হলাম। গানটান করতাম। একদিন স্নান করতে গেছি। দেখি কি? একটা ক্রৌঞ্চ মানে সারস আর কি। জলে নেমে একটা সারসীর সাথে একটু ইয়ে ইয়ে করছিল। মানে ফোরপ্লে আর কি, বুঝলে না? হঠাৎ এক ব্যাটা আকাট মুখ্যু ব্যাধ তীর মেরে মদ্দা পাখিটাকে মেরে দিল। বললে বিশ্বাস করবে না, তার মেয়ে বন্ধুটিও বয় ফ্রেন্ড-এর শোকে খুব কান্নাকাটি করতে করতে আত্মহত্যা করল। আমি স্নান করতে নেমে নিজের চোখে সে দৃশ্য দেখলাম। সেই করুণ দৃশ্য দেখে চোখে জল এসে গেল। কিভাবে নিজের অজান্তেই রচনা করে ফেললাম একটা শ্লোক…”মা নিষাদ প্রতিষ্ঠা…” ঐটাই আমার লেখা রামায়নের প্রথম শ্লোক। আমি আদি কবি বাল্মিকী। দাঁড়াও তোমার জন্য আমার প্রথম শ্লোকটা বাঙলায় তর্জমা করে দিই। তোমার বুঝতে সুবিধে হবে।

“অসতর্ক মিথুনরত প্রেমিকবরের প্রাণটি চুরি করে
অয়ি আর্য, তুমি শান্তি পাবে না অনন্তকাল ধরে”

অসতর্ক মিথুনরত প্রেমিকবরের প্রাণটি চুরি করে
অয়ি আর্য, তুমি শান্তি পাবে না অনন্তকাল ধরে

আহা, সুন্দর, অদ্ভুত। দাদা আপনার দেখা পাব ভাবি নি। এ যে আমার পরম সৌভাগ্য। বেড়ে লিখেছেন কাব্যখানা। আমি পড়েছি। একদম খাস্তা মুচমুচে। কিন্তু আপনি তো দাদা এ জামানার নন? দাদা, ও দাদা, নখ খুঁটছেন কেন? বলছি আপনি তো অনেক আগেকার মানুষ?

অ্যাঁ, কি বলছ? ও আমি? হ্যাঁ, সে অনেক কাল আগে। নয় নয় করেও হাজার তিনেক বছর হবে। তবে কিনা আমি যোগবলে ত্রিকাল, ত্রিলোকের যেকোন জায়াগায় যেতে পারি। তুমিও তো দেখছি বাপু এ জামানার নও। হাজার দুয়েক বছর পরের মানুষ। তুমি এলে কি করে এখানে?

হ্যাঁ, আমি ভানু সিংহ। বিংশ শতাব্দি। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?

এই যে নখে আমার একটা আয়না আছে – নখ দর্পণ। আসলে আমি নখ খুঁটছিলাম না। তোমার পরিচয়টা একটু দেখে নিচ্ছিলাম। তুমি এলে কি করে এখানে? তুমিও যোগ টোগ করো নাকি।

আমি টাইম ট্র্যাভেল করে এসেছি। এখন থেকে হাজার তিনেক বছর পর মানুষ সেই কৌশলটি আয়ত্ত করে ফেলেছে।

কিন্তু তোমায় যেন দেখলাম হাজার দুয়েক বছর পরে এসেছ। নাকি ভুল দেখলাম। অনেকদিন নখটা পরিষ্কার করা হয় না। কি দেখতে কি দেখলাম?

না না দাদা, আপনি ঠিকই দেখেছেন। আপনার নখ একদম নির্ভুল। আসলে একটু ঘুর পথ নিতে হয়েছে। মহাকবির সাথে দেখা করতে হাজার খানেক বছর ভবিষ্যতে গিয়ে ওই টাইম ট্র্যাভেল টেকনোলজি ব্যাবহার করে তবে আসতে পারা।

বেশ বেশ। তুমি তো দেখছি বেশ বিখ্যাত। অনেক পুরস্কার টুরস্কার-ও পেয়েছ। এই পুরস্কারটা নিয়ে খুব হইচই দেখছি। নোবেল না কি?

না দাদা, আপনার কাছে আমি কিসসু না। হাতির কাছে পিঁপড়ে। নোবেল হল আমাদের জামানার সেরা পুরস্কার। প্রথমে তো আমার লেখা কেউ পড়ত না। পরে যবন ভাষায় অনুবাদ করে ওই পুরস্কারটা পেয়ে গেলাম। তখন দেশের লোকেরা আমায় মাথায় তুলে নাচানাচি করতে লাগল। বাঙালি বিশ্ববিধাতার এক আশ্চর্যতম সৃষ্টি। বুঝলেন না। ভাল করেছেন আপনি বাংলায় লেখেন নি। নোবেল না পেলে আপনাকেও কেউ পুঁছত না বাঙলায়।

বটে। কিন্তু তুমি বাপু তোমার ওই নোবেলটি একটু সামলে রেখো, মানে তোমার সাগরেদদের সামলে রাখতে বোলো। আমার নখদর্পণ বলছে ওটা কোন উর্বর মস্তিষ্ক বাঙালি পরবর্তী কালে ঝেঁপে দেবে। তবে সে ঘটনাটি বোধ হয় তোমার জীবন সীমার বাইরে। যাকগে যাক। তা তোমার লেখা দু একটা পাঠিও। পড়ব। কটা লেখা বেরিয়েছে এখনও অব্দি?

আজ্ঞে সে বললে আপনি খুব রাগ করবেন। অনেক লিখে ফেলেছি। আসলে কি করব? কিছুই করার থাকে না যে। জমিদারি টমিদারি আমার দ্বারা হয় না। ও সব দাদারাই সামলায়। সকলের ছোট ভাই। তাই সাত খুন মাপ। তা লিখেছি বলতে, এই ধরুন এক ডজন উপন্যাস, বেশ কিছু ছোট গল্প, হাজার তিনেক গান, ডজন দুয়েক কাব্য গ্রন্থ, কিছু প্রহসন, গীতিনাট্য, নাট্যকবিতা…

থামো, থামো, থামো। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে ভাই। যাকগে যাক। অন্য কথা বলি। একটা কথা কি জানো, লেখক যদি তারিফ পাওয়ার জন্য লেখে সে লেখার ষোল আনাই ফাঁকি। নিজের খুশিতে নিজের মনের কথাটি লেখার জন্য পেন ধরলে তবেই ওই কি যেন বললে “রসোত্তীর্ণ লেখা” বেরোয়। তোমার কি মত এ ব্যাপারে?

হ্যাঁ দাদা। একদম একমত। আমি তো সম্পুর্ণ নিজের খুশিতে লিখি। সব যে ছাপাই তাও নয়।

বেশ, বেশ। যাক কথা বলতে বলতে আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। ওই যে সূর্যতোরণ দেখা যায় ওইটে উজ্জয়িনী। তা নখ দর্পণে তোমার যে ছবি দেখলাম তাতে যেন তোমার আমার মতই বড় বড় দাড়ি দেখলাম। তুমি তো দেখছি রীতিমত ক্লীন শেভড। এমনটা কেন দেখলাম, তাই ভাবছি?

দাড়ি, দাড়ি তো আমি রাখি না বড়দা। আপনি কি অন্য কারু ছবি…?

—–

রবি, রবি, ওঠ। আর কতখন ঘুমুবি? কটা বাজে জানিস? আমাদের বজরার ডেকে গিয়ে দেখ, কেমন বৃষ্টি পড়ছে। আজ মেঘনা পেখম তোলা ময়ুরের মতই সুন্দর।

“এ হে, এতো দেরি হয়ে গেলো? আসলে কাল একটু রাত করে লিখছিলাম।” রবি উঠে কয়েক দিনের না-কাটা দাড়িতে হাত বোলায়। পাশে খোলা তার খেরো খাতা। তার পরের কাব্যগ্রন্থ মানসীর গুটি কতক কবিতা তাতে লেখা। কাল আষাঢ় মাসের পয়লা তারিখে মেঘনা বক্ষে ঝুম বৃষ্টি দেখতে দেখতে খুব মনে পড়ছিল তার প্রিয় লেখক মহাকবি কালিদাসের অমর কাব্য মেঘদুতের সেই বিখ্যাত লাইন “আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানু…”

তাই কবি কালিদাসের সম্মানেই চার লাইন লিখে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।

কবিবর, কবে কোন্‌ বিস্মৃত বরষে
কোন্‌ পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক

কবিবর, কবে কোন্‌ বিস্মৃত বরষে
কোন্‌ পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক

পেনটা তুলে নিয়ে পরের চারটে লাইন লিখতে গিয়ে হঠাৎ গত রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে থমকে গেলো রবি।

“স্বপ্নে মহাকবি বাল্মিকী বললেন যেন আমার বড় বড় দাড়ি দেখেছেন। দাড়িটা রেখেই দেখব নাকি? অত বড় একজন কবি বলেছেন যখন সে কথা আদেশ বই তো নয়। তায় আবার ভদ্রলোক ত্রিকালদ্রষ্টা। ঠিকই দেখেছেন নিশ্চয়ই। এ আদেশ শিরোধার্য। এখন থেকে দাড়িটা শিরে ধারণ করেই দেখি কেমন লাগে আমাকে।”

শ্বাসকষ্ট

পৃথিবীর তাবড় তাবড় পরিবেশবিদদের ডেকে আনা হয়েছে। সাত দিনের চিন্তন শিবির খোলা হয়েছে। বিষয় পরিবেশ দুষণ নিয়ন্ত্রণ করা। পরিসংখ্যান বলছে গত এক সপ্তাহে কোটি কোটি ভারতবাসী শ্বাসকষ্টে ভুগছে। দু চারটে শ্বাসকষ্টে মৃত্যুর খবর-ও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায় নি। কিন্তু হঠাৎ কি করে বাতাসে এতটা দুষণ এল তার কারণটা খুঁজে বের করতে বড় বড় বিজ্ঞানীরা শক্ত শক্ত অঙ্ক কষছে আর দাঁড়ি চুলকোচ্ছে। ওজোন স্তরেই কি ছিদ্র হল না কি ফসিল ফুয়েল পোড়ানোর জন্য বাতাসে কার্বন কণার পরিমাণ বৃদ্ধি সেই নিয়ে জোরদার তর্ক লেগেছে। কেউ কেউ ম্যাটল্যাব সিমুলেশান বানিয়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাব প্রেডিক্ট করার চেষ্টা করছে। কেউ বা হ্যাডুপ ব্যাবহার করে একটা বিগডাটা ডাটাবেসে-এ বিশ্বের শেষ এক হাজার বছরের আবহাওয়া আর জলবায়ুর ডাটা ফীড করে হিউমিডিটি লেভেল-এর ওপর প্রেডিক্টিভ অ্যানালিসিস জব চালাচ্ছে। রাজনীতিকরা সব বলছে “এই নাকি আচ্ছে দিন?” এই দুষিত বাতাসের জন্য RAW পাকিস্তান অ্যাংগলটাও খতিয়ে দেখছে। কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না বাতাস হঠাৎ এত ভারী আর আর্দ্র হয়ে যাওয়ার কারণটা ঠিক কি? কেন শ্বাস নিতে গেলেই মনে হচ্ছে বাতাসে অক্সিজেন-এর সঙ্গে কি যেন মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। শেষমেষ একটা চ্যাঙড়া ছোঁড়া, সে কয়েকদিন যাবৎ এক ক্ষীণকটি সুন্দরীর বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছে কিন্তু ঠিক লাইন করতে পারেনি, সে বললে “আপনারা দেখছি বড়ই বেবুক। আমি জানি কি হয়েছে। সক্কলে সমস্বরে বলল “কি, কি, কি হয়েছে ভাই?” ছেলেটা বলল “ভয়ের কিছু নেই। সাময়িক সমস্যা। কেটে যাবে। 14th February-r পর। February মাসে রোজ রোজ এই রোজ ডে, টেডি ডে, চকলেট ডে, ভ্যালেন্টাইনস ডে এই সব সাপ-ব্যাঙ দিনের প্রভাবে বাতাসে ভালবাসার পরিমাণ একটু বেড়ে গেছে। তাই বাতাস একটু ভারি আর ভেজা। ভালবাসাটা কর্তব্য হয়ে গেলে সেটা পাপের থেকেও ভারি বোঝা। 14th February টা কেটে গেলেই দেখবেন দখিনা বাতাসের মত ফুরফুরে আর অ্যানুয়াল-পরীক্ষা-শেষ-হওয়া-মনের মত হালকা হাওয়া আবার বইবে।

ষড়যন্ত্র

নতুন দিল্লী থেকে পঞ্চাশ মাইল দুরে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন কক্ষে বসেছে আজ এই মীটিংটা। সর্বোচ্চ স্তরের গোপনীয়তা রাখা হয়েছে পুরো ব্যাপারটায়। গোপনীয়তা রক্ষার সব ব্যাবস্থা সুষমা স্বয়ং তদারকি করে নিয়ে মাথা নাড়লেন হালকা করে। দরজা খুলে দেওয়া হল। এক এক করে ঢুকছেন সকল মন্ত্রীরা আর সর্বোচ্চ পদাধিকারী আই-এ-এস অফিসাররা। তিন তিনটে চেকপয়েন্ট পেরিয়ে আসতে হচ্ছে সকলকে। একটায় বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ, পরেরটায় রেটিনা স্ক্যান আর তার পরেরটায় ডি-এন-এ পরীক্ষা করা হচ্ছে। একে একে এসে সবাই নিজের নিজের নির্দিস্ট আসন গ্রহণ করল। রাজু সকলকে সংক্ষেপে বলে দিল আজকের এই টপ সিক্রেট মীটিং-এর আলোচ্য বিষয়খানা। তারপরেই হাতে নমস্কার মুদ্রা নিয়ে তিনি ঢুকলেন। পাজামা, কুর্তা পরিহিত, ট্রিম করা ফ্রেঞ্চ-কাট দাঁড়ি। সঙ্গে সঙ্গে সব গুজগুজ ফিসফিস বন্ধ। গম্ভীর স্বরে বললেন


মিত্রঁ, আজকে আপনাদের এখানে আসার মহত্মপুর্ণ কারণ নিশ্চয়ই রাজু আপনাদের জানিয়েছে। মাথা নাড়ে সবাই। পরিকল্পনাটা সার্থক করতে আপনাদের কাউকে কাউকে হয়তো প্ল্যানটা না জেনেও কিছু কিছু কাজ অলরেডি করতে হয়েছে। রাজু সব রেডি তো?


হ্যাঁ, দাদা। সব ব্যাবস্থা হয়ে গেছে।


যাচ্ছেন যে সে খবর পাক্কা?


হ্যাঁ, দাদা। শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত। আমরা এয়ার ইন্ডিয়ার সাথে কনফার্ম করেছি।


হুমম, কটার ফ্লাইট?


দাদা, পরশু..দিল্লী থেকে উড়বেন রাত নটায়। সিধে ডি সি।


গুড। সুষমা? পাসপোর্ট -এর ব্যাপারটা?


ইয়েস স্যার। সব ব্যবস্থা হয়ে আছে। আমরা “ছেলে পাঠিয়ে” আসল পাসপোর্টটা বদলি করে সে জায়গায় জাল পাসপোর্ট রেখে দিয়েছি। দিল্লী থেকে উনি খেচর হলেই পাসপোর্ট বিভাগে আমাদের চর পাসপোর্টটাকে ইনভ্যালিড বলে ঘোষণা করবে।


আমাদের হাতে কত সময় আছে?


স্যার, মাস তিনেকের বেশি ইনভ্যালিড রাখতে পারা খুব মুস্কিল?


“তিন মাস। হুমম। ওটাকে ছয় করার চেস্টা করুন। আর ওদিকে?” রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংস -এর প্রধান-এর দিকে তাকান তিনি।


আমরা সব রকম চেস্টা করছি স্যার। ওনার একটা ছবি আর ওনার আঁকা একটা ছবি দেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্টকে। আমাদের গুপ্তচর কনফার্ম করেছে যে প্রেসিডেন্ট অনেকক্ষন ধরে ছবি দুটো দেখেছেন। মহিলাদের ওপর ওনার আবার চিরকাল-ই একটু ব্যথা। So we think we are on target, sir.


গুড। ওনার তো তৃতীয় পক্ষ আছে। চতুর্থ নেবেন? কি মনে হয়? আমাদের শুধু তিন মাস সময় আছে এই সম্পর্কটা দাঁড় করানোর জন্য।


স্যার, সাধ্য মত চেস্টা চালাচ্ছি। মেলানিয়া যাতে ওনাকে সতীন বলে মেনে নিতে পারে তার জন্য আমাদের বেস্ট ম্যান মনবীরকে লাগিয়েছি।


গুড। গুড। পুরো ব্যাপারটার গোপনীয়তা যেন সর্বোচ্চ স্তরে থাকে।


অরুণ বলল “দাদা, বিমুদ্রিকরণ-এর থেকেও বেশী গোপন রাখা হচ্ছে।”


এতক্ষণে হাসি ফোটে তাঁর মুখে। বলেন “রাজু, তাহলে কি মনে হয়, প্রেসিডেন্টের সাথে ওনার বিয়েটা হয়ে উনি ওখানেই সেটল করে গেলে, মমতাহীন অখিল ভারতে আমাদের জয়ধ্বজা ওড়াতে পারবো?”


“দাদা, অখিল ভারত দখলের পথে একটাই বাধা – অখিলেশ।” বললেন রাজনাথ।

“ও নিয়ে ভেবো না। মোলায়েম করে ওর পেছনে হাতা দেওয়ার জন্য ওর বাবা মুলায়মকে নিয়েছি টীমে।”

অমিয়র আত্মহত্যা

কাল সন্ধে থেকেই অমিয়-র মেজাজটা খিঁচড়ে আছে। সন্ধেবেলা পাশের বাড়ির পরাশর কাকু এসেছিল। সাথে মিনিও। পরাশর কাকু বলল ওরা কাল-ই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ওনার নাকি দিল্লি ট্রান্সফার হয়ে গেছে। একমাত্র মিনির সঙ্গই এ পাড়ায় ভাল লাগত অমিয়র। বেশ সুশ্রী আর ছিপছিপে। আর একটু শান্তশিষ্ট লাজুক মতন। ওদের দুজনের মধ্যে কত কথা হয়। লোকাল পলিটিক্স থেকে বলিউড পর্যন্ত। মিনির ওপর কেমন একটা অধিকার বোধ জন্মে গেছিল অমিয়র। এই তো সেদিন সে একটা পার্টিতে গেছিল। মিনিরাও ছিল সেখানে। অরিত্র বলে একটা হুমদো ছেলে খুব ঢলে ঢলে কথা বলছিল মিনির সাথে। একদম সহ্য হয় নি অমিয়র। পরে মিনিকে সে ঐ সব আটভাট ছেলেদের সাথে মিশতে বারণ-ও করে দিয়েছিল।  সেই মিনিরাই কিনা চলে যাবে আজ। আর কোন যোগাযোগ থাকবে না। ভেবে কাল রাতেও লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে সে।


সকালবেলা উঠে একটু গুটিসুটি মেরে বসে টিভিতে মিকি মাউস-এর একটা পর্ব দেখছিল অমিয়। কি বোকা বোকা গল্প…কোন মানে হয়? ভীষণ বিরক্তিকর। ছোটখাট বলে আমাদেরকে এরা কি ভাবে কে জানে? আনমনা হয়ে ভাবছিল অমিয়। রবিবারের সকালে ছুটির মেজাজটা ঘরের আনাচে কানাচে ফাল্গুনি হাওয়ার মত তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে।  অমিত কাকু বেরোচ্ছে বাজারে। কাকিমা চেঁচিয়ে বলছে “পাঁঠার মাংসটা দেখে নিও, গেল রোববার হাড়-ই সার ছিল। আর বুড়ো লাউ একদম আনবে না, আনলে ওটা তোমার মাথাতে ভাঙব।” প্রতি রবিবার এই এক-ই চিরাচরিত ছবি। কি বিরক্তিকর? উফফ…অমিয় আবার কার্টুনে মনোনিবেশ করে। সবে টিভিতে মিকি মিনিকে কি একটা পাকে ফেলেছে, এমন সময় অন্তুদা এসে, কথা নেই বার্তা নেই, বললো “কি মিস্টার হুলুস্থুলু, সকাল সকাল বসে বসে কার্টুন দেখা হচ্ছে। বলেই ওকে এক ঝটকায় তুলে নিয়ে সোফায় ওর জায়গাটাই দখল করে বসল। আর তারপর অমিয়কে কোলে বসিয়ে ওর গালে গাল ঘষতে লাগল। এই কোলে বসা আর গালে-গাল-ঘষা আদর একদম পছন্দ নয় অমিয়র। সেটা তাও মানা যায় কিন্তু এই হুলুস্থুলু নামটা? মোটেই পছন্দ নয় তার। সে খেলার সময় এমন কিছু হুলুস্থুলু কান্ড করে না যে তাকে হুলুস্থুলু বলে ডাকতে হবে। অন্তুদার বয়স কত আর? সাত হবে। অমিয়রও বয়স নয় নয় করে পাঁচ হয়ে গেছে। এই মাত্র দু-এক বছরের বড় দাদার এই জ্যাঠামো মোটেই সহ্য হয় না। অন্তুদা না হয় ছোটো। সে তো আর ছোটো নয়, রীতিমতো প্রাপ্ত বয়স্ক। কোল থেকে নেমে অমিয় এক ছুটে নিচের রান্না ঘরে। অনু কাকিমা মাছ ভাজছে। এই মাছ ভাজার গন্ধটা শুঁকলেই অমিয়র ভেতরটা কেমন একটা করে..খুব ভালবাসে ও মাছ ভাজা খেতে। খুব সাবধানে পা টিপে টিপে গিয়ে একটা মাছ ভাজা নেওয়ার চেস্টা করেছিল। কিন্তু অনু কাকিমা দেখতে পেয়েই এমন তাড়া দিল যে ওকে তর তর করে পালাতে হল। যাক গে যাক। পরে নিশ্চয়ই একটা পাওয়া যাবে। ও তো আর আদেখলে নয়। এখন গিয়ে কোথাও খেলা-টেলা যাক। রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে অমিয় ঠাকুরঘরে এল। এটা ওর ভারি প্রিয় জায়গা। অনেক ইন্টারেস্টিং জিনিস আছে এখানে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখার জন্য। ঠাকুরের থালা গ্লাস গুলো বেশ ছোট ছোট।

ঠাকুররা যদি এত বড়, তবে তাদের খাবারের থালাগুলো এত ছোট ছোট হয় কেন কে জানে? thinking

শুনেছে ঠাকুররা নাকি অনেক বড় হয়। সারা আকাশ জুড়ে থাকে। কিন্তু ওদের খাবার থালা বাসন এত ছোট হয় কেন বোঝে না অমিয়। যাকগে যাক। সে ছোটখাট মানুষ। তাই এই ছোট ছোট থালা গ্লাস গুলো তার পছন্দের। সে প্রথমেই পেড়ে ফেলল প্রসাদ রাখার ছোট্ট থালাটা। দুটো নকুলদানা গলে আটকে ছিল। নখ দিয়ে খুঁটে খেয়ে ফেলল। নকুলদানা বেশ ভাল খেতে। কিছুক্ষণ ওটা নিয়ে খেলার পর ঠাকুরের একটা সিংহাসন ছিল সেইটা পেড়ে ফেলল। সেটাকে নিয়ে উলটে পালটে কিছুক্ষণ খেলা হল। ঠাকুরের আসনটা গলায় জড়িয়ে আর খুলে আরও খানিকক্ষণ কাটলো। এরপর বোর হয়ে গেলো। বিরক্তিটা আবার ফিরে আসছে। মিনি চলে যাবে। ছাদে যাওয়া যাক। ছাদে গিয়ে মিনিকে ডাকলে নিশ্চয়ই ও ও বাড়ির ছাদে উঠে আসবে। কিন্তু বিধি বাম! ঠাকুর ঘর থেকে বেরনোর সময় কান্ডটা ঘটল। বসার ঘরের মধ্যে দিয়ে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি। হঠাৎ করে পায়ে লেগে বসার ঘরের দরজার সামনে থাকা দামি ফুলদানিটা পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে চুরচুর। আর যায় কোথায়? অনু কাকিমা ছুটে এল। সে কি বকুনি! একটা দুটো চড়-থাপ্পড়ও পড়ল পেছনে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। সবাই খারাপ। কেউ ভালবাসে না। অমিত কাকু ফিরে এসে ভাঙ্গা ফুলদানিটা দেখে তো রেগে আগুন। প্রচণ্ড বকাবকি করল। এমন কি শাস্তি স্বরুপ শোবার ঘরে এক ঘন্টা বন্ধ করে রাখলো। আর অন্তুদা ওর বকুনি দেখে কিনা পুরো সময়টা ফ্যাক ফ্যাক করে হাসল? অমিয় বুঝে গেছে। সে তো এ বাড়ির ছেলে নয়। তাই। অন্তুদার পায়ে লেগে ফুলদানি ভাঙলে এই ভাবে বকতে, শাস্তি দিতে পারতো ওরা? কক্ষনো না। বলত “কতই বা বয়স। পায়ে লেগে পড়ে গেছে। ছেড়ে দাও।” অমিয় জানে অনেক ছোটবেলায় তাকে এ বাড়িতে একটা অনাথ আশ্রম থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেই থেকে সে এই বাড়িতেই আছে ছেলের মত। মুখে যতই দেখাক না কেন, এরা কখনই অমিয়কে বাড়ির ছেলে ভাবে না। সৎ ছেলে সে। তাই এত বকুনি। অন্তুদারও সৎ ভাই। তাই অমন করে হাসতে পারল সে ওর দুর্দশা দেখে। ধুৎ, এই অনাথ, আশ্রিত মার্কা জীবন বাঁচার কোন মানেই হয় না। তাও মিনি চলে যাবে আজ। জীবনের কোন মুল্যই নেই আর। কার জন্য বাঁচবে সে? কিসের জন্য বাঁচবে?  আত্মহত্যা..হ্যাঁ আত্মহত্যা-ই করতে হবে। কোন একটা সিনেমায় দেখেছিল অমিয়। আত্মহত্যা। এই তো অমিয়দের এই বাড়িটাই তেতলা। চারতলার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলে নিশ্চয়ই মরতে পারবে সে। রাগটা থাকতে থাকতেই করতে হবে। নয়তো মনের জোরটা পাওয়া যায় না। এখনই অন্তুদা কিম্বা অনুকাকিমা এসে আদর করে দিলে রাগটা পড়ে যাবে। দেরি করা যাবে না। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে চার তলার ছাদে উঠে যায় অমিয়। ছাদের রেলিংটার ওপরে ওঠে একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে। ওপর থেকে নিচের রাস্তাটা একবার দেখে অমিয়। কি ছোট ছোট খুদে লাগছে সব কিছু। দূর থেকে দেখলে সবই ছোট। না, এসব ভাবলে চলবে না। অনু কাকিমার মারটা মনে পড়ে। অমিত কাকুর বকুনিটা। অন্তুদার হাসি। মিনির ঢলো ঢলো মুখটা। নাহ বেঁচে থাকা অনর্থক। মরতে তাকে হবেই। চোখ বুজে নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে দেয় অমিয়। তীব্র গতিতে তার তুলতুলে শরীরটা এসে মাটি ছোঁয়। ধুপ করে একটা শব্দ। তারপর সব চুপ।


মাটিতে পড়ার পর বিশ সেকেণ্ড মতো পড়ে থাকে অমিয়। হুমম, এতক্ষণে নিশ্চয়ই মরে গেছে সে। একবার উঠে দাঁড়াতে চেস্টা করলেই বোঝা যাবে। এক লাফে উঠে দাঁড়ায় অমিয়। ঠিক বুঝতে পারে না মরেছে কিনা। পরীক্ষা করতে নিজের গায়ে একটা আঁচড় কাটে। লাগছে। তবে কি সে বেঁচে আছে? নাকি মরা লোকেদেরও ব্যাথা বেদনা থাকে? বেঁচে থাকলে যন্ত্রণা হওয়া উচিত এত উঁচু থেকে পড়লে। হাতে পায়ে মাথায় সব জায়গায় ব্যাথা অনুভব করার চেস্টা করে। নাহ কোথাও কোন ব্যাথা নেই। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে সে বেঁচেই আছে।
“মরণ!!! আমার মরণ-ও নেই। বেড়ালরা বোধ হয় যমেরও অরুচি।” মনে মনে বলে অমিয়। আর ভেবে কি হবে? রাগটাও এবার বেশ পড়ে এসেছে। তাই আজ আর চেস্টা করা যাবে না। “যাইগে, মিনির সাথে একবার দেখা করে আসি। মানুষদের ফেসবুক-এর মত বেড়ালদের একটা social networking site আছে। কিটিবুক বলে। ওখানে মিনিকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিই। তাহলে ওর সাথে পরেও যোগাযোগ রাখা যাবে।” ল্যাজ দিয়ে গায়ের ধুলো ঝেড়ে অমিয় মিনির বাড়ির দিকে যায়। “ও হ্যাঁ, ওকে বলে দিতে হবে যেন কিটিবুকে ঐ হুমদো হুলো অরিত্রটার friend request একদম  accept না করে।” মনে মনে ভাবে সে।

সমাপ্ত

cat

ডাবল খাওয়া দাওয়া

foodওগো শুনছ, হ্যাঁ, আমি তোমাকেই বলছি। বলি, আজকে বাটি চচ্চড়ি বানিয়েছ তো?  বাটি চচ্চড়িটার জন্যই আর একবার তোমায় বিয়ে করতে পারি।


হ্যাঁ বানিয়েছি গো বানিয়েছি..জানি না আবার। বাটি চচ্চড়ি না হলে তোমার তো জন্মদিনের খাবার মুখে রুচবে না। হাড়মাস তো সারা জীবন জ্বালিয়ে খেলে..

কি ঐ ভেজিটেবিল তেলে নাকি?

না গো, বাবা না। একদম কাচ্চি ঘানি সর্ষের তেলে কাঁচালঙ্কা ছিঁড়ে ফোড়ন দিয়ে বেশ কষিয়ে রেঁধেছি। তোমার যে রকম পছন্দ।। খুশি?

বাহ বেশ বেশ। আর আলু পোস্ত?

তাও হয়েছে। তোমার আর আজকের দিনে সাধ অপূর্ণ থাকে কেন? আলু খাওয়া তোমার মানা। তাও বানালাম। লোভের মাথায় এক বাটি খেয়ে বোসো না।

উফফ, জমে যাবে আজকের খাওয়াটা। ভাবতেই পারছি না। আর ছানার পায়েস?

সে আর বলতে। ছানার পায়েস তো তোমার বরাবরই হট ফেভারিট। সেই একুশ বছর বয়স থেকে নেই নেই করে আজ আমার হয়ে গেল চুরাশি। কোনো জন্মদিনে ছানার পায়েস পাওনি, এমনটা হয়েছে? আর আজ তো তোমার শুধু জন্মদিন নয় দু-দুটো স্পেশাল অকেশান। তাই ছানার পায়েস না করে উপায় কি বলো?

আহা ঐ একটি পদ তুমি মায়ের থেকেও ভাল রাঁধো..সেই আমার ২৮ বছর বয়স থেকে খেয়ে আসছি। তবে আজকাল তেমন স্বাদ হয় না। না, না তোমার দোষ নয়। সুগার-ফ্রী দিয়ে ছানার পায়েস যেন রায়তা দেওয়া ফুচকা..

তুমি বাপু বুড়ো ভাম হয়ে গেলে। তাও নোলাটা একটুও কমল না। বাচ্ছা ছেলের মত আবদার করছ। যাকগে যাক। আজ বেশ করে চিনি দিয়েই তোমার পসন্দমাফিক পায়েস বানিয়েছি, বুঝলেন মিস্টার হ্যাংলা??

উফফ, জিভে জল এসে যাচ্ছে। চনচনে খিদেটাও পাচ্ছে। কিন্তু তুমি বুড়ো ভাম কাকে বলছ হ্যাঁ? গেল সোমবার পর্যন্ত আমি দু ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে আসিনি।

সেটা কোন কৃতিত্বের কম্ম নয়। পরিতোষ ডাক্তার হাজার বার বারণ করেছে অত ভারি ব্যাগ বইতে..

প্রতি রবিবার পিকলু বাবুকে সাইকেলে করে ঘুরিয়ে নিয়ে আসিনা? তারপর আমাদের বাগানে ওর সাথে ঝাড়া ১০ ওভার-এর ক্রিকেট খেলি..ও ছোট বলে ওর দুটো আউট-এ আউট হয় আর আমি ওকে জেতাতে ইচ্ছে করে আউট হয়ে যাই। শুধু ওর খুশি মুখে “দাদু তুমি হেরে গেছো, হেরে গেছো” শোনার জন্য।

“দাদু তুমি হেরে গেছো, হেরে গেছো”

হুম, বিশাল বাহাদুরির কাজ করো। এই বয়সে অত দৌড়ঝাঁপ ভাল? আচ্ছা তুমি কোন আক্কেলে পিকলুকে কাঁধে তুলে গাছ থেকে বাতাবি লেবুটা পাড়তে গেলে বলো তো? যদি পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙতে, তাহলে কি হত হ্যাঁ? সেই তো এই শর্মাকেই সেবা শুশ্রুষা করতে হত নাকি?

আরে কি করব? জানো তো ওর আব্দারের কাছে আমি চিরকালই অসহায়..ওর মুখের খুশির ঝলকানিটা দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না। বায়না করল  “দাদু, বাতাবি লেবু পাড়ব চল না”। তাই গেলাম..অনেক চেষ্টা করেও আঁকশি দিয়ে ডালটার নাগাল পেলাম না..দাদুভাই এর মুখটা ছোট হয়ে গেল। তাই বললাম “দাদু ভাই, তুমি আমার কাঁধে চড়বে আর আমি বীর হনুমানের মত এক লাফাব। তুমি চট করে ডালটা ধরে টেনে আনবে নিচে। তারপর আমরা বাতাবি লেবুটা ছিঁড়ে নিয়ে তোমার দিম্মাকে দেব..দিম্মা ভাল করে নুন, লঙ্কার গুঁড়ো দিয়ে মেখে ফ্রীজে রেখে দেবে। আমরা সন্ধেবেলা খাব। কেমন আইডিয়া, দাদুভাই?

খুব মজা হবে দাদু..

তাহলে বলে দাও বাতাবি লেবুর ইংরেজি আর সংস্কৃত নাম কি..কি শিখিয়েছিলাম?

দাদু, ইংরেজি হল গ্রেপফ্রুট আর সংস্কৃত হল…উমম…মধুকর্কটিকা।

“That’s my boy” বলে ওকে কাঁধে তুলে লাফালাম উঁচু ডালটা লক্ষ করে। নামার সময় একটু বেসামাল হয়ে গেলাম। তাও দাদুভাইকে সাবধানে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম। ঠিক ডালটা ধরতে পারেনি দাদুভাই। তাই বাতাবি লেবুটা…বুকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল। তোমার মুখটা মনে পড়ছিল। দশ দিনের জন্য বিরানব্বইটা কমপ্লিট করতে পারলাম না। সে যাক। ”জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কথা কবে”। বিধান বাবুর শুনেছি জন্মদিন আর মৃত্যু দিন একই দিনে। আমার জন্মদিন আর কাজের দিনটা একদিনে হল। সে এক যা হোক ভালই হল। ডাবল খাওয়া দাওয়া।smoke