কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৩

May 22, 2019, Morning

মার্কিন মুলুক থেকে কলকাতা ফিরলে থাকে একটা বাৎসরিক অনু্ষ্ঠান। তার নাম ভিসা স্ট্যাম্পিং। আমেরিকায় ঢোকার অনুমোদনপত্র নবীকরণ করতে হবে। তাই দেশে পৌঁছে সপ্তাহান্তটা বাড়িতে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভিসা অভিযানে। আমাজন অভিযানের থেকে সেটা কিছু কম উত্তেজক ঘটনা নয়। পার্থক্য হচ্ছে আমাজন হল রেইন ফরেস্ট, আর মে মাসের  কলকাতা হল বৃষ্টিহীন কংক্রিটের অরণ্য। প্রথম দিনেই বাসে ট্রামে যাওয়ার রোমহর্ষক কিম্বা স্বেদসিঞ্চক ঘটনা ঘটাতে রাজি হল না স্ত্রী। তাই বাড়ির গাড়ি এবং ড্রাইভার বাবুদা। বাবুদা গাড়ি চালানোটা শিখেছে ঠিকই কিন্তু কলকাতার মানচিত্রটা শেখেনি। আর মাপ করবেন পৃথিবীর কোন শহরেরই ম্যাপ আমি কোনদিনও আত্মস্থ করতে পারি নি। অতএব গুগল দেবতাকে স্মরণ করা হল। গন্তব্য হো-চি-মিন সরণী। ইউ এস কনসুলেট। বাবুদার অসাধারণ কলকাতাপ্রীতি হোক বা গুগলের নির্দেশ অমান্য করার ধৃষ্টতাই হোক, কোনো একটা কারণে মোটামুটি পার্কস্ট্রীট চত্বরের প্রায় প্রতিটা গলি থেকে বড় রাস্তায় চাকার ধুলো দিয়ে যখন কনসুলেটে পৌঁছলাম তখন অনেক বেলা। গিয়েই বুঝলাম ছড়িয়েছি। শুধুমাত্র ভিসা ইন্টারভিউ দেওয়ার থাকলেই এখানে আসতে হয়, আমি করতে এসেছি ভিসা রিনিউয়াল। সে কাজ হয় শেক্সপিয়ার সরণী থেকে। কনসুলেটের নিরাপত্তারক্ষী বুঝিয়ে দিল হো-চি-মিনের পদপ্রান্ত থেকে শেক্সপীয়ারের সান্নিধ্যে পৌঁছনোর রাস্তা। মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। বাবুদার ম্যাপজ্ঞানের অনুগ্রহে আর কলকাতার ওয়ান-ওয়ে রাস্তার নিগ্রহে এই দশ মিনিটের হাঁটাপথ তিরিশ মিনিটের গাড়িপথ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে মনে করে হাঁটাই মনস্থ করলাম। যমলোকে শুনেছি পাপীদের ফুটন্ত তেলের কড়াইতে নিক্ষেপ করা হয়। পাপকর্ম জীবনে কম করি নি ! তাই যমলোকে জীবন্ত মানুষের মত বোশেখি দাবদাহে দগ্ধ হতে হতে অতঃপর শেক্সপিয়ার সরণীর ভিসা অফিস। 

এই কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে একটা ফলভারে বিনম্র আম গাছ এক টুকরো মরূদ্যানের মত আগলে রেখেছে জেসমিন টাওয়ার। ঢুকে পড়ে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সাবমিট করতেই চমক। ছবিটা নাকি স্পেসিফিকেশান মত হয় নি আর তাছাড়া একটি ডকুমেন্ট লাগবে যা আমি নিয়ে আসিনি। মাথায় বজ্রাঘাত হলেও এর থেকে কম পাথর হতাম। এই গরমে অন্য একদিন জেসমিন টাওয়ারের চক্কর কাটতে হলেই চিত্তির। বাইরে অপেক্ষারত স্ত্রীরও গরম বাণী নসীব হবে। “ঠিকঠাক দেখে ডকুমেন্ট আনো নি” এইবিধ আক্রমণের আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে প্রতিরক্ষাস্বরূপ নিজের যুক্তি পেশ করি, “ওয়েবসাইটে ঠিক করে কিছু লেখা নেই”। কিন্তু চুপি চুপি বলে রাখি, ওয়েবসাইটে ঠিকই লেখা ছিল। আমি সব কিছু একটু ক্যাজুয়াল নিই বলেই আজ এই হাল। হালে পানি কিভাবে পাই, পা ছড়িয়ে বসে ভাবছি, এমন সময় নিরাপত্তারক্ষীর অম্লমধুর আবেদন, “এখানে ওইভাবে পা ছড়িয়ে বসবেন না”। তাই শুনে এক অচেনা প্রিয়দর্শিনীর মুখে এমন একটা অপ্রিয়দর্শন বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তাতে স্বকীয় অভব্যতার প্রতি যথেষ্ট লজ্জিত বোধ করলেও গরমে মতিভ্রম হয়েছে মনে করে মনে মনে নিজেকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ইন্টারনেটের খোঁজ। যদি মিসিং ডকুমেন্টটা পাওয়া যায় কোনভাবে। আমার মত মুর্গিদের জাঁতাকলে পেষবার ব্যাবস্থা সামনেই। অনেকেই ভিসা ফর্মের প্রিন্ট আউট নিয়ে আসে না বলে ঝোপ বুঝে কোপ মারার ব্যাবস্থা। ইন্টারনেট ক্যাফেতে ঢুকতেই এক মাড়োয়ারী ভদ্রলোক জানিয়ে দিল ভিসা ফর্মের প্রিন্ট নিতে পাঁচশ টাকা লাগবে। সবিনয়ে জানাই আমি সেই অপরাধে অপরাধী নই। অন্য ডকুমেন্ট প্রিন্টপ্রার্থী। দেড় মিনিটের ইন্টারনেট সার্ফিং আর প্রিন্ট করার মূল্য ধার্য করল দুশ টাকা। অন্যায্য। তবু তৃষ্ণার্তকে এক ফোঁটা জল দিলে যেমন সে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে আমিও করলাম। এইবার ভিসা স্পেসিফিকেশান অনুযায়ী ছবি তুললেই এ যাত্রা কাজ উদ্ধার হবে। সন্ধান পাওয়া গেল যে বি কে মার্কেট বলে এক জায়গায় একদম মার্কিনদের মনোমত ছবি তুলে দেবে কিন্তু হাঁটতে হবে বারো থেকে পনের মিনিট। “আরাম হারাম হ্যায়” – এই মন্ত্র জপ করতে করতে হাঁটতে লাগালাম। পথ হাঁটতে আমার খুব ভাল লাগে। জীবন থাকে। যাপন থাকে। সাহিত্যিকদের শুনেছি এক জোড়া অতিরিক্ত চোখ থাকে। আমি তেমন লেখিয়ে নই। তবু চোখ খুলে রাখতে চেষ্টা করি। চলুন আমার সাথে হাঁটুন। দেখি কেমন কলকাতা?

ওই তো একটা উভলিঙ্গ (unisex) সেলুন। বাইরের দেওয়ালে এক শ্বেতাঙ্গী, বিদেশিনী, সুন্দরীর মোহময়ী আমন্ত্রণ। ভারতীয় চোখ সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে শ্বেতাঙ্গী ও বিদেশিনীদের এখনো দু দশ নম্বর বেশি দিয়ে থাকে। আর দু পা হাঁটতেই প্রতিস্পর্ধী নগর সভ্যতার পাশাপাশি উপস্থিত কিছু হেরে যাওয়া মানুষ। ইটালিয়ান সেলুন – অর্থাৎ ইঁটের ওপর বসিয়ে নরসুন্দর ওরফে নাপিত চুল দাঁড়ি কাটছে। লেখা না থাকলেও এ সেলুন উভলিঙ্গ নয়, শুধু পুরুষ প্রাণীদের জন্য। আছে ফুটপাথে বসা লিট্টি বিক্রেতা। জীবনদায়ী ছাতুর সরবত কেবল মাত্র দশ টাকায়। না…খাওয়ার স্পর্ধা আমার নেই। আমি সুখী পান্থজন মাত্র। বিহারী ভোজনের পাশেই বিশুদ্ধ বাঙালি ভোজনেরও ব্যবস্থা। ভাত ডাল দু কুচি আলুভাজা আর মাছের ঝোল প্লেটে প্লেটে পরিবেশন হচ্ছে। একটা আনুবীক্ষণিক সাইজের পাতিলেবুও আছে। এই গরমে ওটাই অমৃতের চাঙ্গড়। মাছ কিন্তু ভাগাড়ের হয় না। শুধু জলেই তাদের প্রতিপত্তি। খাবার স্পর্ধা নেই তবু অনুসন্ধিৎসু মন দাম জিজ্ঞেস করে। মাত্র পনেরো টাকা।পাশেই পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। ক্লাসিক ব্র্যান্ডের সাদা কাঠির দাম পনেরো এখন। দু মিনিটের ফুসফুস ফুটো করার বিলাস আর এক পেট ভাত একই দামে পাওয়া যাচ্ছে পাশাপাশি দোকানে। আজও কলকাতা তার হেরে যাওয়া সন্তানদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেয় নি। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে ঠিকই কিন্তু কিছু বিজ্ঞাপন মুখে মিচকি হাসিও আনে কখনো সখনো। চোখে পড়ে গেল একটা বিজ্ঞাপন। “হার পানি কা বোতল বিসলারি নেহি” – জলসঙ্কটে পড়া এক উট অন্য সব জল দেখে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, শুধু বিসলারির বোতল পেলে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। এই আর্বান ঊস্ট্রকে দেখে একটু হাসতেই হল। নিখাদ হিউমার। দু পয়েন্ট দিতেই হল বিসলারিকে।  জল ভাবতেই দেখলাম রাস্তার ধারে এক গামলা জল রাখা। আর কাকেরা তেষ্টা মেটাচ্ছে। আমাদের মত লব্ধপ্রতিষ্ঠরা নয়, পাখিদের জন্য জল রেখে দেওয়ার এই সহৃদয়তা হয়তো ঐ মুচিটার যে ওখানে বসে ঘামতে ঘামতে জুতো সেলাই করছে কিম্বা ঐ জাঁতা হাতে ইঁটের ওপরে বসা লোকটার যার পেশা সুপুরি পেষা। আবার একটু এগোতেই সুতানুটি কাফের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আমন্ত্রণ। তিন সহোদর ভাই কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর। সময়ের সাথে ভাই গোবিন্দ আর সুতানুটির থেকে সব জমি হড়পে নিয়েছে ছোটভাই কলকাতা। গোবিন্দপুর তো ধ্যারধেরে হয়ে অখ্যাত হয়েছে। সুতানুটির নামে কাফে তাই তার হারানো জমির জন্য বিচার প্রার্থনা করছে। হাঁটতে থাকি। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে ইলেকশান সিজন। পাশাপাশি ছবিতে সহাবস্থান দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ভোটপিপাসু নমস্কার মুদ্রায়। হাসির বিষয় নাকি লজ্জার বিষয় জানিনা, কোনো মা-মাটি-মানুষ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মুদিতা প্রদর্শন করতে প্রতিটা ছবিতে তাঁর চোখ দুটো গেলে দিয়ে গেছে। ঈশ্বর(চন্দ্র) যেখানে মুণ্ডুহীন, সেখানে দেশের কর্ণধার চক্ষুহীন হবেন, আশ্চর্য নয়। সুপুরি কাটার দোকানের থেকে একটু এগোলেই চুনের একটা বড় গামলা। বিনামূল্যে। সুপুরির সাথে চুনের জন্মান্তরের আত্মীয়তা। হঠাৎ মনে পড়ল, কলকাতার সাথে চুনের সম্বন্ধও অঙ্গাঙ্গি। কলকাতার নাম নিয়ে অনেক মত প্রচলিত। একটি মতে কলকাতা এসেছে কলি-কাতা বা চুনের ভাটি শব্দ থেকে। 

দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম বি কে মার্কেটে ছবি তোলার স্টুডিওতে। দাম আবার গলাকাটা। তিনশো টাকা এক এক জনের। বোঝা গেল অনেকেই ভিসা অফিস থেকে নাকচ হয়ে ভরাডুবি থেকে উদ্ধারে এই স্থানে আগমন করে থাকেন। কিন্তু বাচ্চা ছেলেটির হাতটি ভাল। মুহুর্তের মধ্যে ফটোশপ করে ব্যাকগ্রাউন্ড করে ফেলল ধপধপে সাদা ঠিক যেমনটা মার্কিন কনসুলেট চেয়েছে, মুখের ওপর পড়া অবাধ্য চুলেদের কাঁচি করে দিল ম্যাজিকের মত। আমার স্ত্রী ছবি তুলতে ভীষণ ভালবাসেন। তিনি এমন এক রিফ্লেস্ক তৈরী করেছেন যে ক্যামেরা তাক করলেই বারোটা বাজতে পাঁচ কিম্বা বারোটা বেজে পাঁচের ভঙ্গিতে মাথাটা সাইডে হেলে যায়। মাথার বারোটা বাজানোর জন্য অর্থাৎ মাথাটিকে সিধে রাখতে ফটোগ্রাফের ছেলেটিকে বেশ বেগ পেতে হল। সেই নিয়ে একটু ঠাট্টা করছিলাম। কিন্তু যে হারে গরম বাড়ছে আর বাড়ছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে কমছে রসবোধ। তাই রসিকতাগুলো অপাত্রে গেল। ছেলেটির মুখে হাসির রেখাও দৃষ্ট হল না। সে যাই হোক, তার তোলা ছবি আর ইন্টারনেট কাফে থেকে পাওয়া ডকুমেন্ট বলে বলীয়ান হয়ে আবার ফিরে গিয়ে কাজটা উদ্ধার হয়ে গেল। 

ভিসা স্ট্যাম্পিং-এর জন্য পাসপোর্ট জমা করে যেই বেরোলাম, ব্যাস বেজে গেল ছুটির ঘন্টা। ভিক্টোরিয়ার পরীর ডানা দুটো ধার করে কপোত কপোতী উড়ে চলল দক্ষিণ দিশায়। দক্ষিণাপন। শপিং টাইম। সেখানে বিশ্বের সমস্ত অদরকারি জিনিসের সম্ভার। কিন্তু বানিয়েছে বাংলার শিল্পীরা। প্রতিশ্রুতি সমস্ত লাভের গুড় নাকি তাদের ভাগেই যায়। সত্যতা জানা নেই। পথে পড়লো গড়িয়াহাট ব্রিজের নিছে চেস ক্লাব। কদিন আগেই তার উপরে প্রতিভাষণ শুনছিলাম একটা। সূর্যের প্রবল দাপটকে প্রতিহত করছে ব্রিজ আর তারই ছায়ায় গুটি সাজাচ্ছে মহারথী দাবাড়ুরা যাতে অন্যের রাজাকে প্যাঁচে ফেলতে পারে। আর দেখলাম ট্রাফিক পুলিশের বিজ্ঞাপন। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছেন প্রসেনজিত, জীৎ, দেব। বিজ্ঞাপন বলছে, “এনারা জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোতে পারলে আপনারাও পারবেন।” বেশ সৃজনশীল। তবে একটাই খটকা লাগল। শুধু বাংলা সিনে জগতের লোকেরাই তবে কি এখন আইকন? সিনেমার কুশীলবদেরই শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী আখ্যা দিয়ে যবে থেকে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তবে থেকেই কি বাংলা বৌদ্ধিক দারিদ্রে ভুগছে? কোনো লেখক কি বিজ্ঞানী কি স্পোর্টস ফিগার কি অর্থনীতিবিদ নেই এ লিস্টিতে! যাকগে। সিগনাল মেনে রাস্তা পেরোবার আর একটা বিজ্ঞাপন বলছে, “এক মিনিটের একটু থামা। আর একটু বেশি হলে ক্ষতি কি?” বেশ মজাদার। 

আর দেখলাম কৃষ্ণচুড়া গাছ। ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। তার রক্তিম গুমোরে সূর্যও খানিকটা ভীত, সঙ্কুচিত।  ও কৃষ্ণচুড়া তুমি অজুত নিযুত অর্বুদ কোটি পুষ্প বৃষ্টি করো এ ক্লান্ত, অবসন্ন শহরের বুকে। ঘৃণাকে ঘৃণা করে ফুলেল প্যারেড হোক রাজপথে। পুষ্পহন্তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোল বলিষ্ঠ জনমত। ছায়াহীন এই পৃথিবীকে ছায়াচ্ছন্ন করতে তুমিই পারো। কৃষ্ণচুড়া, শুধু তুমিই পারো এ শহরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে এক অসূয়াহীন পৃথিবী গড়তে। 

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

শিকাগো সামার

স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায় – লিখেছিলেন রঙ্গলাল। কিন্তু শিকাগোর বঙ্গসন্তানদের জন্য গানটা হবে, উত্তাপহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে কে বাঁচিতে চায়! নয় কিনা বলুন?

বাইরে যখন ঋণাত্মক কুড়ি তখন বাইরে বেরোনো নিতান্ত বাহাদুরি। কিন্তু অফিস কাছারি? তার সাথে তো চলবে না জারিজুরি। অতএব সক্কাল সক্কাল মারকাটারি। অ্যাস্ট্রোনটের মত পোশাক পরে মুখ মাথা ঢেকে ছাড়তে হয় বাড়ি। তাই শীতবুড়ির সাথে বাঙালির চিরকালের আড়ি। কিন্তু ঋতু রকমারি। মহাকাল চালিয়ে দেয় তার গাড়ি। শীতের মুখে ছাই দিয়ে শিকাগো সামার আসে। কাঠবিড়ালি ঘুরে ফেরে বাড়ির আশেপাশে। একটা র‍্যাবিট খিল্লি করে চৌধুরীদের ঘাসে। জুলাই আগাস্ট মাসে, হাওয়ায় হাওয়ায় অনেক আদর ভাসে। সবুজ পাতার ঝালর ঝুলিয়ে বাকথর্ন গাছ হাসে। প্রচুর মজা প্রচুর ফান, প্রচুর হাসি প্রচুর গান – শিকাগো সামার সবাই ভালবাসে। গামবুট চিলেকোঠায় ওঠে, চপ্পলেরা নামে। যদিও শরীর একটু একটু ঘামে, তবুও যেন ছুটির চিঠি পৌঁছে যায়, ভোরেরবেলা, শিশির মাখা খামে। আনন্দধুন বাজতে থাকে সকাল, সন্ধ্যে কিম্বা মধ্যযামে। ইচ্ছে করে, এই গ্রীষ্মাবকাশ কক্ষনো না থামে।

হরজাই পাখি ডাকে। কোনো পথের বাঁকে, একটা দুটো ড্যান্ডিলিওন আপনি ফুটে থাকে। ফুলের টবে মাথা দোলায় পেটুনিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে। শাসন করি, শাসন করি চঞ্চল মনটাকে। তবুও সেখান খুঁজে ফেরে আনন্দ ভোমরাকে। কখনো আবার আদুরে মেঘ আকাশটাকে ঢাকে। টুপুর টাপুর শাম্মি কাপুর বৃষ্টি হতে থাকে। আড্ডা বসে বন্ধুবাড়ির বৈঠকখানাতে। হরেকরকম খানাতে পিনাতে, জমতে থাকে সন্ধেবাসর পরতে পরতে। মধ্যরাতেও চলতে থাকে মিঠি মিঠি বাঁতে। টুকরোটাকরা স্মৃতিরা সব জমা পড়ে ফেসবুকিয় খাতে। পি এন পি সি চলতে থাকে আড্ডাতে আড্ডাতে। প্রেম বিরহ মিলন চলে তোমাতে আমাতে।

মোটের ওপর সামার ডে-তে, ছেলে-বুড়ো সব জনাতে আনন্দেতে মাতে।   

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ২

May 20, 2019, Morning

বচ্ছরভরকার মত দেশে ফিরলে তড়িঘড়ি স্টুডিওতে ছুটতে হয় প্রায় প্রতিবারই। না না টলিউড পাড়ার নয়, আমাদের পাড়ার শিপ্রা স্টুডিও। উদ্দেশ্য নিজের ছবি তোলা। নিজের মুখের প্রতি কোন বিশুদ্ধ প্রেমজনিত কারণে নয়, তার জন্য তো সেলফি ক্যামেরাই আছে (হৈ হৈ করে সেলফি কনটেস্ট হচ্ছে এন্তার), বিভিন্ন জায়গায় প্রমাণপত্র দাখিলে, ভিসা স্ট্যাম্পিং নামক বাৎসরিক উৎসব ইত্যাদি সবেতেই প্রয়োজন পড়ে আমার মুখচ্ছবি। বেরোতেই পলিটিকাল পোস্টার – “মিলে মিশে লুটে খায় বুঝে গেছে জনতা / ও পাড়ার মোদী আর এ পাড়ার মমতা”। বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না কোন পার্টি। অজস্র “এই চিহ্নে ভোট দিন”-এর ভিড়ে এমন চমৎকার পোয়েট্রিকে দু নম্বর দিতেই হয়। কাস্তের ধার না থাকলেও কথার ধার আছে বইকি।        

শিপ্রা স্টুডিওর দাদা বহু পুরনো যাকে সেই স্কুল জীবন থেকে দেখে আসছি। কখনো নামটা জানা হয় নি। তবু কুশল বিনিময় হয় দেখা হলেই। প্রথাগত “কবে এলে?” প্রশ্নের উত্তর করে ভেতরে যখন ঢুকলাম সেই চেনা ছবি। একটা সাদা কাপড়ের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা বেঞ্চি। ওইখানে সাবজেক্ট বসবে। আর তার দিকে তাক করা আছে দৈত্যাকৃতি তিনটে লাইট। কখনো কখনো কোন একটা দৃশ্য কি কোন এক গন্ধ টাইমমেশিনে করে ফিরিয়ে নিয়ে যায় গত জন্মে। প্রাচীন সুগন্ধী অতীতে। 

তখন আমার বয়স পাঁচ। আর সেদিন আমার জন্মদিন। যেন কোন অনন্ত অতীত। সময়ের রেখাগুলো সমান্তরাল হয়ে গেছে তাই। ছোঁয়া যায় না শুধু দেখা যায়। আমি তখন খড়গপুর। আমি তখন কিশলয়। জন্মদিন তখন এক অদ্ভুত আনন্দ-মৌতাত বয়ে আনত। আজ যখন জন্মদিন আসে সে সাথে করে নিয়ে আসে কি একটা হারিয়ে ফেলার একটা যন্ত্রণা – নিজের ছেলেবেলাই হবে বোধ হয়। আমার কিশলয়-আমিকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা প্রতি মুহূর্তে আমাদের জীর্ণ করতে থাকে। কিন্তু বয়স যখন পাঁচ, জন্মদিন মানেই এক অবিমিশ্র আনন্দ। বিশেষ দিনটিতে নো বকাবকি। নো পড়াশুনো। মায়ের হাতের পায়েস আর “আমি ভীষণ মহার্ঘ্য” এইধরনের একটা অনুভূতি দিনভর। আমার জন্য মা মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছে। আমার জন্য পায়েস রাঁধছে। মহাকালের গর্ভ থেকে একখানা দিন শুধু আমার জন্যই কাস্টম-মেড করে বানানো হয়েছে। শুধু আমারই জন্য আজ সূর্য উঠেছে, দোয়েল পাখি ডেকেছে, জানালার পাশের শিউলি গাছ ফুল ঝরিয়েছে। রাতভর। আমার জন্য কৃষ্ণচূড়া গাছ রঙ-মাতাল। ভাবতে ভালো লাগত। 

এখনকার মত কেক কেটে লোক খাইয়ে ঘটা করে পাঁচ বছরের জন্মদিন পালন করার রীতি তখন ছিল না। সভ্যতা তখনও কিছু শম্বুক-শ্লথ, সম্মোহিত। সেই বয়সে আমি কিছু ঠিক করতাম না। বাড়ি থেকে বোধ হয় ঠিক করা হয়েছিল আমার আমার পঞ্চম বর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমার ছবি তোলা হবে। সময়, হা সময়। প্রতি মুহূর্তে যে পিছলে গলে বেরিয়ে যায় এক মুঠো জলের মত,  সেই সময়কে স্থাণু করে রাখার কি অদম্য মানবিক আগ্রহ! বাড়িতে ক্যামেরা ছিল না। তখন ক্যামেরা খুব একটা বিলাসদ্রব্য যা ধনীদের বাড়িতেই থাকত। আর সরস্বতী লক্ষ্মীর রেষারেষি খুব। যে বাড়িতে সরস্বতী সে বাড়িতে লক্ষ্মী পা রাখেন না। আমার মা স্কুলে পড়ায়। বাবা কলেজে। তাই ক্যামেরা কেনার সঙ্গতি ছিল না। স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলা হবে ঠিক হল। আমাকে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হল। স্পেশ্যাল ট্রিটমেন্ট পেয়ে আমি সুপার এক্সাইটেড। দাদা আর আমি বাবার হাত ধরে গেলাম চিত্রালি স্টুডিও। ইন্দা মোড়ে। দুটো গোড়ের মালা। একটা দাদা, একটা আমি পরে বসলাম। স্টুডিওর কাকু ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাথা দুটোকে ডানদিকে, বাঁ দিকে, ওপরে, নিচে, ঈশান, নৈঋত কোণে ঘোরালেন যতক্ষণ না মুখের সব হাসি অন্তর্হিত হয়ে মুখটা বেশ গোমড়া গোমড়া হয়। ইনস্ট্যান্ট নুডলের দিন নয় সেটা। ফিল্মে তোলা ছবিও ইনস্ট্যান্ট দেখা যায় না। ডার্করুমে ডেভেলপ হয়ে তবে তার দর্শন মিলবে। ফটোগ্রাফার নিজেও দেখতে পাবে না। আজকের চোখ দিয়ে দেখলে প্রায় অসম্ভব মনে হয়। খড়গপুরের চিত্রালি স্টুডিওর কাকু সময়ের হাত ধরে আজ রামরাজাতলার শিপ্রা স্টুডিওর দাদা হয়ে গেছে। তবে মুখ ক্রমাগত ওপর নীচ করতে বলে হাসি মারার টেকনিক এখনো আছে। 

ছবি তুলে বেরোলাম যখন, দেখলাম আকাশ কালো করে এসেছে। জ্যোৎস্নাস্নাত টাঁড়ভূমির সঙ্গমরতা, কামোন্মত্তা যুবতী সম্বর হরিণীর চোখের কাজল কে যেন চুরি করে এনে মুঠো মুঠো ছড়িয়ে দিয়েছে। আকাশময়। জ্বোরো রুগীর ঘন ঘন নিঃশ্বাসের মত হাওয়া চলছে। কালবৈশাখী।  অত্যাচারী জমিদারের মত তেজীয়ান নিষ্ঠুর সূর্যটা কোন অপরূপ জাদুবলে ছাপোষা গৃহস্থ স্বামীর মত মুখ লুকিয়েছে মেঘের আঁচলে। উড়নচণ্ডী প্রেমিকার মত হাওয়া কোনপথে যাবে নিজেই ঠিক করতে পারে নি। একবার দু পা সামনে যাচ্ছে তো তারপর তিন পা পেছনে। চিতায় পুড়তে থাকা শব যেমন শেষকালে এক বালতি জল পেয়ে শীতল হয়, তেমন করেই শীতল হবে এ শহর। আজ। হাওয়ায় হাওয়ায় তারই কানাকানি। আমি হাঁটতে হাঁটতে দেখি রাশি রাশি হলুদ কল্কে ফুল ঝরে পড়েছে রাস্তায়। অনাদরে। কেউ দলিত, বিগলিত। কেউ অনাহত, ফুটফুটে। একখানা অক্ষত ফুল তুলে নিলাম। সানাই হল গে “ফুলোফিলিক”। না, এমন কোনো শব্দ অভিধানে নেই। শব্দটা আমার বানানো। মানে হল সানাই ফুল খুব ভালবাসে। ফুলটা পেলে যত্ন করে রাখবে ওর ইউনিকর্ন পার্সে।

কৌলীন্যহীন কল্কে ফুল। পাপড়ির বাহার নেই, তবু গাঢ় হলুদ রঙা। আমাদের সারা জীবনটাই তো রঙের খোঁজ। আহার-নিদ্রা-মৈথুন-ফেসবুক অন্তে ক্রমাগত আমরা জীবনে রঙের পোঁচ দেওয়ারই চেষ্টা করছি। কিন্তু ভ্যানিশিং কালারের মতই এই রঙ দিলাম আর এই ভ্যানিশ। সবে রঙের প্যালেট থেকে এ রঙ ও রঙ মিশিয়ে মনোমত উজ্জ্বল রঙ বানিয়ে কালার ব্রাশ দিয়ে এই মাখালাম জীবনের গায়ে তো প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার চাপে এই আবার বর্ণহীন। আবার খোঁজ, খোঁজ, রঙের খোঁজ। অথচ কত অজস্র রঙের উপাচার আমাদের আশেপাশে। আমরা দেখতে পাই না। সভ্যতা আমাদের বর্ণান্ধ করেছে। এই আপাত বেরঙ দুনিয়ার রঙ-মিলন্তি খেলায় আমি তুমি সবাই সামিল। এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে যখন বাড়ি ঢুকলাম তখন জলপরীরা ডানা মেলেছে। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে।   

পর্ব ১ লিংকঃ https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ৩ লিংকঃ https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

রয়েছ নয়নে নয়নে

মানুষের বেঁচে থাকার কি অদম্য আগ্রহ , কি অপ্রমিত ইচ্ছা ! এই যে আমার চেতন সত্তা, এই যে আমার আপন কক্ষপথে আমার সাথে হাত মিলিয়ে চলতে থাকা মানুষগুলো , আমার দাদা , বোন , স্ত্রী , সন্তান , বাবা , মা , মিত্রস্বজন এদের প্রতি কি অনির্বচনীয় মমত্ববোধ , এদের পাশাপাশি এদের কাছাকাছি থাকার কি হৃদয়মর্মী কাতরতা । “আমি আছি” এই বোধ – এ যেন এক ভরসাপ্রদায়ক স্বস্তিবাচন , এক অনুপম বিশ্বাস । এই যে আমি জীবনের সুমিষ্ট পয়োনিধি থেকে প্রতিনিয়ত এক পেয়ালা জল পান করছি তার কি আনন্দঘন অনুভূতি । এই যে আমি দেখছি , স্পর্শ করছি , ভালবাসছি , প্রিয়জনের সঙ্গকামনা করছি , এই যে “আমি এবং আমার” এর নামই জীবন !

তবু এক অনিবার্য বিশ্রামের সম্ভাবনা আমাদের স্বততঃ অনুসরণ করে । মৃত্যুলোকের তমিস্রাময় ছায়া আমাদের পিছু পিছু ঘোরে সর্বদা। হঠাৎই অতর্কিতে ছুঁয়ে ফেলে প্রিয় কোনো মানুষকে । সহসা অলঙ্ঘ্য অন্ধকারে হারিয়ে যায় কোনো প্রিয় মুখ । নিত্যদিনের হাসি খেলায় তখন সে অনুপস্থিত । হৃদয়ে হৃদয়ের যোগসূত্র ছিন্ন করে তার তখন এক অনুদ্বিগ্ন অনঘ উপস্থিতি । সূর্য তবু আপন বলয়ে প্রদক্ষিণ করতে থাকে । পৃথিবী তবু নিজের কক্ষপথে ছুটতে থাকে। তবু শীত গ্রীষ্ম বর্ষা আসে । তবু পাখিদের কলকাকলিতে মুখর ভোর আসে । তবু সন্ধ্যা নামে আসন্নপ্রসবা গাভীর মত ধীরে । নবজাতক তবু ভূমিষ্ঠ হয় । আহার নিদ্রা মৈথুন হয় । তবু নির্বাচন হয় । উষ্ণ বক্তৃতা হয় । জীবন চলতে থাকে আপন ছন্দে । তার যে মৃত্যুর জন্য থামার সময় নেই !

শুধু কিছু হৃদয়ে ব্যাথা জেগে থাকে । কিছু আঁখি থেকে অশ্রুবিসর্জন হয় গোপনে একান্তে । ছোট ছোট কথা , ছোট ছোট ব্যাথা , ছোট ছোট সঙ্গসুধাকণিকা কোনো একলা দুপুরে টুকরো স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে । মহাকাল তার যাদুদণ্ড বোলাতে থাকে ক্ষতস্থানে । কালের প্রলেপ লেগে শুকোয় ঘা । সম্পর্কের যে মায়াশিকড় মাটির গভীরে বিস্তৃত হয়েছিল , যা  পুষ্ট হত রোজকার সংলাপে , রোজকার হাসি-কান্নায়-আদরে-অভিমানে সে ধীরে ধীরে শুকোতে থাকে । তবু যেন নিঃশেষ হয় না মানুষটার অস্তিত্ব । ভূমায় উড়তে থাকা ঘুড়ি যেমন ভূমির সাথে এক প্রায়-অদৃশ্য সুতো দিয়ে জোড়া থাকে , মুক্ত বিহঙ্গের মত কোনো অনাবিল আনন্দলোকে বিচরণ করতে থাকা মানুষটিও তেমন ভালবাসার এক অচ্ছেদ্য , প্রায়-অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকে মর্ত্যলোকে। সুতোয় যেমন টান পড়লেই বোঝা যায় আকাশে ওই দূরে ছোট্ট কুট্টি হয়ে যাওয়া ঘুড়িটা এখনো আছে , ভোকাট্টা হয় নি , সেরকমই স্মৃতির দড়িতে টান পড়লেই বোঝা যায় মানুষটা আছে । মানুষটা আছে তার সমগ্র অস্তিত্ব নিয়ে , তার আপনজনেদের প্রতি স্নেহ-মমতা-ভালবাসা নিয়ে , তার সন্তানের প্রতি মঙ্গলকামনা নিয়ে , স্ত্রীয়ের স্বাস্থ্যের প্রতি উদ্বেগ নিয়ে , কোনো স্বজন কি বান্ধবের সাফল্যের গৌরব নিয়ে , কোনো অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুশ্চিন্তা নিয়ে , কোনো এক সুস্থ হিংসাহীন পৃথিবীর স্বপ্ন চোখে নিয়ে ,  মানুষটা আছে – শুধু নয়নসমুখে আর নেই, নয়নের মাঝখানে সে গড়ে নিয়েছে তার চৌখুপী ঘর ।

প্রাণের ভাষা

যে ভাষায় প্রদোষ মিত্র সমাধান করেন বাক্স রহস্য আর ফুল্লরা কহেন তাঁর বারমাস্যা, টেনিদা বলেন “ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফেলিস” আর মনের মত কেকের নাম মন-জিনিস, যে ভাষায় মেঘ গাভীর মত চরে আবার খোকাবাবু যায় লাল জুতো পায়, যে ভাষায় কুচবরণ কন্যার মেঘবরণ কেশ আর পত্রিকার নাম সন্দেশ, যে ভাষা কখনো সরব হয় পথের দাবীতে আবার নীরব হয় পথের পাঁচালিতে, যে ভাষায় তারিণী খুড়ো গল্প বলেন আর লালমোহন গাঙ্গুলী লেখেন রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাস, যে ভাষায় ফুলে নাম পাথরকুচি আর নাচের নাম ধুনুচি, ঘাসের নাম মধুকুপী আর ছিনাথ সাজেন বহুরূপী, যে ভাষায় পথিক হয় পথভোলা আর কিশোরী হয় চঞ্চলা, সে ভাষার নাম বাংলা।

যে ভাষায় নাচের নাম ছৌ আর মধুপের নাম মৌ, যে ভাষায় ফাঁদ দেখে নি ঘুঘু আর ডাকাতের নাম রঘু, বাড়ির মেয়ে গৌরী আর ত্যাগের রঙ গৈরিক, কাঁথার নাম নকশী আর গোয়েন্দার পদবী বক্সী, যে ভাষায় গাছের পাতা হিজল আর চোখের পাতায় কাজল, ফুলের নাম শিউলি আর ডালের নাম বিউলি, যে ভাষায় ঘনাদা দেয় গাঁট্টা আর খেলার নাম সাট্টা, যে ভাষায় ক্যারাম পিটিয়ে আড্ডা আর পরীক্ষাতে গাড্ডা,  স্কুলের বাইরে চুরমুর আর ফুচকা স্টলে হুড়মুড়, যে ভাষায় রাজ্যের নাম হল্লা আর অংক খাতায় গোল্লা, মাঠের নাম ভুবনডাঙা আর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তে রাঙা, যে ভাষায় সাপের নাম তক্ষক আর যে রক্ষক সেই ভক্ষক, স্টেশানের নাম ঘুম আর চাষের নাম ঝুম, যে ভাষায় পৌষমাসে পার্বণ আর কয়লা কালো কার্বন, যে ভাষায় নায়ক মানেই উত্তম আর চাল দেবে যেই মোক্ষম, যে ভাষায় জীবন মানে যাপন আর মৃত্যু মানে তর্পণ, যে ভাষায় “গল্প হলেও সত্যি” আর ছোটরা একরত্তি, যে ভাষায় সোনায় থাকে সোহাগা আর সোহাগ না পেলে অভাগা, যে ভাষায় প্রমাণের সাথে তথ্য আর ওষুধের সাথে পথ্য, ভাতের সাথে শুক্তো আর মণির সাথে মুক্তো, যে ভাষায় পেছনে দিলেই বাঁশ আর উৎসব বারোমাস, যে ভাষায় পিঠের সাথে পুলি আর চুলোর সাথে চুলি, গোলার সাথে গুলি আর মজুরের সাথে কুলি, চৈত্রসেলে ঝুলোঝুলি আর বিজয়ায় কোলাকুলি, স্মৃতিবোঝাই ভেলা আর মিলনবোঝাই মেলা, যে ভাষায় একলা হলেই দুপুর আর বৃষ্টি টাপুরটুপুর, যে ভাষায় ঘুড়ির নাম পেটকাটি আর বাড়ির নাম ভিটেমাটি, আকাশে থাকে গঙ্গা আর লেবুজল খেয়ে চাঙ্গা, মিলের নাম জুট আর খেলার নাম গোল্লাছুট, যে ভাষায় নদীর নাম কাঁসাই আর ইসকাপনের বিবি পাশাই, পাখির নাম শুক আর জ্যোৎস্না রাতে মূক সে আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা।

যে ভাষায় পিসির নাম পদী আর সুবর্ণরেখা নদী, গোয়েন্দা হন ভানু আর গায়ক কুমার সানু, যে ভাষায় উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে আর লিচুচুরি হয় পুকুর পাড়ে, অলির কথা শুনে বকুল হাসে আর সন্তান সুরক্ষিত মাতৃবাহুপাশে, ব্যাঙের নাম সোনা আর মাছের নাম পোনা, চুলেতে বেলফুল আর রূপেতে মশগুল, সাঁওতাল রাজার নাম দোবরু আর হর্ষবর্ধনের ভাই গোবরা, যে ভাষায় প্রিয়ার নাম রাজলক্ষ্মী আর বারবণিতার নাম মধুমক্ষী, যে ভাষায় ছাদনাতলায় বসিয়ে…”আমি যামিনী তুমি শশী হে”, যে ভাষায় আমের থাকে শিষ আর যা উনিশ তা বিশ, বাঙাল থাকলে ঘটি আর আঁশ থাকলে বঁটি, পানের থাকে বরজ আর প্রেমিকের থাকে গরজ, পাটির সাথে সাপটা আর ঝড়ের সাথে ঝাপটা, বাঁশের নাম মুলি আর স্টেশান শ্যাওড়াফুলি, যে ভাষায় গাছে ওঠে গল্পগরু আর ছক্কা হাঁকালে “চলবে গুরু”, ফুলের নাম মহুল আর গানের নাম বাউল, টেনিদার চ্যালা প্যালা আর টিফিনে কুমীরডাঙা খেলা, যে ভাষায় রবিবারেতে পাঁঠা আর পিরিতি কাঁঠালের আঠা, মাছের দোকানে জটলা আর ফটিক, বাপ্পা, পটলা, যে ভাষায় ফুলপিসি আর বড়কা, আর চাদের বুড়ির চড়কা, যে ভাষায় কাগজে হয় নৌকো আর চালাক চতুর চৌকোস, পানে থাকে জর্দা আর গল্প বলেন বড়দা, পুজোয় থাকে ফর্দ আর মেয়ে থাকলেই মর্দ সে আমার প্রাণের ভাষা গানের ভাষা বাংলা ভাষা।  

নম্বর

প্রথম বই প্রকাশ হওয়ায় কেমন লাগল জিজ্ঞাসা করেছেন এক শুভার্থী। উত্তরে বলি,

না তেমন হাতি-ঘোড়া কিছু লাগে না। না, খুব একটা ল্যাজমোটা হইনি। আমার ল্যাজ ছোটবেলা থেকেই মোটা ছিল। নতুন করে মোটা হওয়ার কিছু নেই। ফেসবুকে স্ত্রী-কন্যা সহ সেলফি দিলে আগেও দুশ লাইক পড়ত আর লেখা দিলে লাইক দুই ডিজিটেও যেত না। এখনো তাই হবে। কথা দিচ্ছি, এরপরেও প্রতিদিন শব্দ রেওয়াজ করব যেমন এখন করি। কথা দিচ্ছি, সস্তায় নাম কামানোর চেষ্টা কখনো করিনি। এখনো করব না। চেষ্টা করব যাতে জীবনে কোনো একটা অন্তত লেখা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ পরীক্ষায় শেষ ঘণ্টি বেজে যাওয়ার মত অনুভূতি অবশ্যই হয়। সেই যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় নিজেকে প্রমাণ করার আকুল প্রয়াস আর তারপর খাতাটা জমা দিয়ে দুরুদুরু বুকে নম্বরের অপেক্ষা করা। অনেকটা সেইরকম। প্রথমদিনেই বইমেলায় যারা “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” বইসংগ্রহ করেছে, বই হাতে ছবি পাঠিয়েছে, তারা সকলেই সেই এক্সামিনার। আমার এক বন্ধু সায়ন্তন দিল্লির এক ব্যস্ত উকিল। দুদিনের ঝটিতি সফরে কলকাতা এসেও বন্ধুর বই সংগ্রহ করতে বইমেলা প্রাঙ্গণে ঢুঁ মেরে চিলের মত দক্ষতায় তুলে নিয়ে গেছে বইখানা। স্কুলের বন্ধু হলেই এমনটা সম্ভব। মোট কথা বইটা বইমেলা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে এমন কি কলকাতার চৌহদ্দি পেরিয়ে পাড়ি দিয়েছে পুরো পনেরশ কিমি। কিন্তু নম্বর পড়তে শুরু করবে তখনই যখন গল্পগুলোর সাথে মানুষগুলোর শুভদৃষ্টি হবে।  

শুধু একটাই মুশকিল। এই পরীক্ষায় দুরকমের নম্বর দেওয়ার প্রথা। একটা সৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে মনে মনে। আর একটা অসৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে সামনাসামনি। অসৎ নম্বরটা হবে লেটার মার্কস। আর সৎ নম্বরে পরীক্ষায় পাশ করলাম কিনা, সেটা বোধ হয় কখনো জানা যাবে না।

বইমেলা অতিক্রান্ত। বইটা এখন ফ্লিপকার্টে পাওয়া যাচ্ছে। Flipkart-এ গিয়ে “Jojatir Jhuli” বলে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে। গল্পের গরু গাছে ঠিকঠাক উঠেছে কিনা দেখতে এক কপি সংগ্রহ করবেন। দেশের যেকোনো প্রান্তেই কিন্তু ডেলিভারি হবে।

https://www.flipkart.com/jojatir-jhuli/p/itmfddfjpdqtqggg?pid=RBKFDCGMBJTKZAZN&lid=LSTRBKFDCGMBJTKZAZNVGGGS4&marketplace=FLIPKART&srno=s_1_1&otracker=AS_Query_HistoryAutoSuggest_0_2&fm=SEARCH&iid=417238ca-99f3-46d0-895a-dc5694f1347f.RBKFDCGMBJTKZAZN.SEARCH&ppt=Homepage&ppn=Homepage&ssid=nzouf4tfq80000001549471830883&qH=463fb7b5b874e6b9

ঝোলায় পুরুন যযাতির ঝুলি

দেখছেন তো? লাইন পড়ে গেছে…

আমাদের মাস্টার গোগোল অর্ধকায়স্থ, মিসেস অ্যাংলোলেডি চৌধুরী, মিস্টার উন্মাদ হিজিবিজিবিজ আর মহামান্য রামগরুড় তর্করত্ন এরা সব লাইন দিয়ে আছে এবারে বইমেলায় নিজের বইয়ের ঝোলায় এক কপি যযাতির ঝুলি ভরবে বলে… আপনি আবার ফাঁকে পড়ে না যান তাই এইবেলা খবরটা চুপি চুপি দিয়ে দিলাম। বইমেলায় পত্রভারতী স্টল নাম্বার 359-এর বাইরে ইঁট পেতে ফেলুন। ঝাঁপি খুলতেই ঝাঁপ দিয়ে পড়ুন। সংগ্রহ করে ফেলুন আপনার কপিটা। “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” পত্রভারতী থেকে আসছে মুদ্রিত মাধ্যমে। এবারে বইমেলায়।

যযাতি কে? ঝুলিতে কি আছে? তাহলে বলি শুনুন। তা হয়েছে কি সেই ছোটবেলায় সুকুমার দাদু বলে দিয়েছেন “আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার। কাতুকুতু বুড়োর কাছে যেও না খবরদার”। তো আমিও তাই যখন সাত সাগরপার পাড়ি দিয়েছি, সাবধান থেকেছি যাতে কাতুকুতু বুড়োর ত্রহস্পর্শ মাড়াতে না হয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে আলাপ হল এক বুড়োর সাথে নাম নাকি তাঁর যযাতি। আর তাঁর কথাতে তিনি হলেন এই কাতুকুতু বুড়োর “মামার পিসিঠাম্মার ভাইয়ের নাতির বোনের ছেলে।” পুরো সাড়ে চৌত্রিশ মিনিট ভেবে ভেবে দেখলাম আদতে তিনি কাতুকুতু বুড়োর ভাই হন। সে যাকগে যাক। এই যযাতি বুড়ো অন্তত কথায় কথায় কাতুকুতু দিয়ে অসভ্যতা করেন না। কিন্তু কাতুকুতু বুড়োর সাথে তাঁর সম্পর্ক বলার ধরণ দেখেই বুঝছেন নিশ্চয়ই এ ভদ্রলোকের বেশি কথা বলার বদরোগ আছে। তো সে যযাতি বুড়ো রোজ এসে আগডুম বাগডুম গপ্পো বলে যায়। সাথে ভয় দেখায় তক্ষুনি তক্ষুনি লিখে না ফেললে সে অবমাননার শোধ নিতে তিনি কাতুকুতু বুড়োকে পাঠিয়ে দেবেন। আমিও তাই টুকে রাখি এই ভেবে যে ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিদের শোনাতে কাজে লাগবে। আর তাছাড়া কাতুকুতু বুড়োর কাছে কাতুকুতু খাওয়ার থেকে যযাতি বুড়োর গপ্পো শোনা ঢের ভালো ব্যাপার।

পত্রভারতী বলে একটা পেল্লাই ছাপাখানা বলে কিনা এইসব হাবিজাবি গপ্পোগুলো ছাপিয়ে দেবে। তো আমি বললাম, “তা দাও খন।” তাই কাতুকুতু বুড়োর কাছে অষ্টপ্রহর কাতুকুতু না খেতে চাইলে এবারের বইমেলায় স্টল 359 থেকে ঝটপট কিনে ফেলুন এক কপি “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”।

ও হ্যাঁ এই অসাধারণ কার্টুনটির জনক আমার বিশেষ বন্ধু বহুমুখী প্রতিভাবান শ্রীল শ্রীযুক্ত অভিষেক রায়। তার সব কটা প্রতিভাকে খুব ছোট করে বললেও লাগে বাহান্ন মিনিট তিপ্পান্ন সেকেন্ড। তাই আপাতত কার্টুনিস্ট অভিষেকের সাথেই পরিচিত হোন।

যযাতির ঝুলি এবার মুদ্রিত মাধ্যমে

যযাতির সুধী যজমানেরা, কেমন আছেন সকলে? কলকাতার শীতের মরশুম কেমন উপভোগ করছেন? বাজারে টাটকা তাজা ওলটা ফুলকপিটা দরদাম করে কিনতে নিশ্চয়ই সকাল সকাল পৌঁছে যাচ্ছেন মাফলার চড়িয়ে। বাড়ির কুঁচোকাঁচাকে স্কুলে পাঠানোর আগে নিশ্চয়ই হনুমান টুপি পড়িয়ে দিচ্ছেন? রাত দশটা বাজলেই লেপের তুলোর নরমে-আদরে-পায়রা-গরমে ঢুকে পড়ার জন্য মন উচাটন নিশ্চয়ই? সকালবেলা সেই রাতভরের প্রেমিকা কম্বলের সাথে ব্রেকআপের মাহেন্দ্রক্ষণে নিশ্চয়ই মনে রাজ্যের বিরক্তি। গিজারে আজকাল গরমজল বেরলেও দু একটা দিন স্নানের সাথে মান করেন নি এমনটা একগলা গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে বললেও কি কেউ আর বিশ্বাস করবে? পৌষপাবনে গৃহিণী গোকুলপিঠে  বানালে বেড়াল-পায়ে রান্নাঘরে হানা দিয়ে দু একটার সদ্গতি করছেন নিশ্চয়ই? সব মিলিয়ে শীতের বাজার সরগরম।

আগে তো বাঙালির ছিল বারো মাসে তের পাবন। তবে এখন হচ্ছে প্রতিমাসেই তেরোটা করে মেলা। হস্তশিল্প মেলা, পদশিল্প মেলা, উদরশিল্প মেলা ইয়ে থুড়ি মানে খাদ্যমেলা, আরও কত কি? তবে সব মেলার সেরা নিশ্চয়ই বাঙালির বইমেলা। যখন এইসব মেলারা মায়ের গর্ভে ছিল (দিদির গর্ভে বলা উচিত ছিল কি?) তখন থেকেই বইমেলা। ধুলো পায়ে পায়ে স্টলে স্টলে ঘোরা, বই চেখে চেখে দেখা, পছন্দের বইখানা খরিদ করে ক্রমশ-ভারি-হতে-থাকা নিজের বইয়ের ঝুলিতে ভরে ফেলা আর মাঝে মাঝে রসনাতৃপ্তির জন্য বইমেলা চত্বরেই চটপটে খাবারের দোকানে মাথা গলানো। সব মিলিয়ে বইমেলায় মেলা আনন্দ, সুপার ফান।

আপনারা যারা যযাতির ঝুলি পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য এবার কিন্তু আর একটা মস্ত খবর আছে। নামী পত্রভারতী প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত মাধ্যমে আসছে “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”। বারোখানা টানটান কাহিনী। বারো খানা রোববারের দুপুরে শুয়ে শুয়ে আলগোছে “যযাতির ঝুলি”-র পাতা ওলটানো।

আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ এক কপি সংগ্রহ করবেন। আপনার বইয়ের তাকে আদর করে তুলে নেবেন। বইটি পড়ে হতাশ হবেন না এটা যযাতির গ্যারান্টি। আপনার গল্পজিভে যাতে চড়া না পড়ে যায় তাই ঝুলি থেকে ভিন্ন জনার ও স্বাদের গল্প চয়ন করেছি বারোখানা। কখনো অম্লমধুর দাম্পত্যকলহ তো কখনো কর্কশ, ঊষর দিনের কড়চা, কখনো দাদু-নাতির সম্পর্কের পায়রাগরম উত্তাপ তো কখনো ব্যর্থ প্রেমিকার ঈর্ষানল। কখনো কঠোর বাস্তব তো কখনো লোমখাড়া করা অদ্ভুতুড়ে গল্প অথবা কল্পবিজ্ঞানলোক। কুশীলবেরা কখনো রবীন্দ্রনাথ তো কখনো প্রফেসর শঙ্কু, কখনো মানুষ তো কখনো না-মানুষ, কখনো চোর তো কখনো পকেটমার। ঝুলিতে প্যানপ্যানানি ঘ্যানঘ্যানানি নেই, নেই শাশুড়ি বৌ। অনর্থক সুড়সুড়ি নেই, নঞর্থক জীবনভাষ্য নেই। আছে এক ডজন খাস্তা তাজা মুচমুচে গপ্পো। আছে নিখাদ আদ্যন্ত বাঙালিয়ানা। যে গল্প শুনতে পান অফিসে, বাসে, ট্রেনে, শনিবারীয় পার্টিতে, রবিবাসরীয় বৈঠকখানায় – যাকে ইংরেজিতে বলে life as it is. শীতের দুপুরে কম্বলের ওমের নিরাপত্তায় নিখাদ কাহিনীক্ষুধা নিবৃত্তি করার জন্য এবারের কলকাতা বইমেলায় পত্রভারতীর স্টল 359 থেকে অবশ্যই সংগ্রহ করুন এক কপি যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো

প্রিয়জনকে উপহার দিন। আর হ্যাঁ, পড়া হয়ে গেলে কেমন লাগল যযাতির ঝুলি ব্লগে বা ফেসবুক পেজে একটা মন্তব্য করে জানাবেন। প্লীজ প্লীজ প্লীজ জানাবেন। কারণ আপনাদের উৎসাহ, কমেন্ট, তারিফ এগুলোই, বিশ্বাস করুন, যযাতির পথ চলার একমাত্র মাধুকরী। আপনাদের ভালবাসাতেই যযাতির কলম সচল থাকে। আজও।  

আই-টি ভাইটি

[সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত সকল বন্ধুদের কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এ লেখার উদ্দেশ্য নিছক হিউমার সৃষ্টি, কাউকে আঘাত দেওয়া নয়। আর আমি নিজেও যেহেতু একই পেশায় নিযুক্ত, লেখাটিকে খানিকটা আত্মসমালোচনা হিসাবেও ধরতে পারেন। লেখাটির স্টাইল অবশ্যই বঙ্কিমবাবুর “বাবু” রম্যরচনার থেকে অনুপ্রাণিত।]

স্ব বাবু যযাতিকে কহিলেন হে নৃপশ্রেষ্ঠ শুনেছি কলিকালে আই-টি পিপল নামক এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হবে। এঁদের আকৃতি প্রকৃতি ও বিকৃতি আপনি অনুগ্রহপূর্বক বর্ণনা করুন।

যযাতি বলিলেন, হে নরবর, আমি এই কপি-পেস্ট-কর্মকুশলী, আত্মাভিমানী, বিদেশবিলাসী আই-টি পিপল গণকে বর্ণনা করব। আপনি শ্রবন করুন।

যাঁরা পড়াশুনায় লবডঙ্কা, সাফল্য বলতে শুধু বোঝে টঙ্কা আর সদাই যাঁদের প্রাণে ফায়ার হওয়ার আশঙ্কা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের দেশের থেকে বিদেশে বেশি মতি, অনসাইট পেলে মনে করে পূর্বজন্মের সুকৃতি, একবার বিদেশে পৌঁছতে পারলেই মুছে ফেলে ডার্টি দেশের সব স্মৃতি তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের বল প্রোগ্রামিং-এ এক গুণ, প্রেজেন্টেশানে দশ গুণ, জব ইন্টারভিউ দিতে গেলে শত গুণ আর অ্যাপ্রাইজাল ইন্টারভিউতে সহস্র গুণ তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা দেশোদ্ধার করেন ফেসবুকে আর একই সাথে সিনেমা দেখেন ম্যাকবুকে তারাই আই-টি পিপল। যাঁরা অফিসে করেন কপি-পেস্ট, বাড়িতে থাকলে কাউচে বসে নেন হালকা রেস্ট আর প্রবল কর্তব্যপরায়ণতাজনিত কারণে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে যারা নিজের বাড়িতে নিজেই গেস্ট তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের নিজের স্ত্রীতে অনাগ্রহ, পরস্ত্রীতে কিঞ্চিত অধিক আগ্রহ, সহকর্মী পরস্ত্রীতে সর্বাধিক আগ্রহ তাঁরাই আই-টি পিপল। যারা বঙ্গভাষায় “নট সো গুড”, ব্রায়ান অ্যাডামস শোনেন “টু আপলিফট মুড”, আর অফিসের “বাচ্চা ছানাপোনা”-দের সাথে অতিমাত্রায় রুড তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা করেন সামান্যই, বন্ধু ও বাবা-মা-স্ত্রীকে কিছু বাড়িয়ে বলেন, বায়োডাটাতে আরো কিছু বাড়িয়ে লেখেন আর ইন্টারভিউতে নিজের কৃতিত্ব ঘোষণায় টেনিদা-ঘনাদাকেও হার মানান তাঁরাই আই-টি পিপল।

এনারা কপি-পেস্টে পারদর্শী হবেন। অন্যের কোড ঝাঁপার ব্যাপারে এনাদের দক্ষতা সর্বজনবিদিত হবে। যাঁরা সকাল নটা থেকে চারটে অব্দি ক্যাফেটেরিয়াতে, পিংপং টেবিলে ও সুন্দরী সহকর্মীদের ডেস্কে দৃশ্য হন আর বিকেল চারটে থেকে রাত্রি নটা অব্দি আপন ডেস্কে বসে আইপিএল ফলো করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। রাত্রিকাল যাঁরা রতি কার্যে নয় প্রোডাকশান সাপোর্টে ব্যয় করবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। বিমুগ্ধ বাবা মা-রা যাঁদের পাঁচে পাঁচ রেটিং দেবেন, নট-সো-ইম্প্রেসড বস পাঁচে তিন রেটিং দেবেন ( সাথে জ্ঞান দেবেন You need to exceed expectation) আর বীতশ্রদ্ধ স্ত্রী-রা পাঁচে শুন্য রেটিং দেবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের ডেডলাইন ডেড হয়ে যায় বছরে সহস্র বার এবং তজ্জনিত কারণে ডেডলাইন এক্সটেন্ড হয় সহস্র এক বার তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা অনসাইট যাওয়ার জন্য বসের ঘরে গিয়ে প্যানপ্যান করেন, পদোন্নতি প্রাপ্ত হতে বসের বসের ঘরে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেন এবং এই সকল প্রাপ্ত হলে ফটাস করে লেঙ্গি মেরে কোম্পানিটি ছেড়ে দেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা প্রাতঃকালে বসের গালি সেবন করেন, সন্ধ্যাকালে স্ত্রীয়ের গালি সেবন করেন এবং সপ্তাহান্তে সেই সকল দুঃখ ভুলতে সুরা সেবন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। দেবী সরস্বতী কৃপা করে এদের মাথার বাঁপাশে একটি উইকিপিডিয়া ফিট করে দেবেন। তাই পৃথিবীর সকল সমস্যার সমাধান এঁদের করতলগত হবে। প্রধানমন্ত্রী নৈঋত না ঈশান কোনদিকে বসে পটি করলে দেশের উন্নতি হবে, প্রাণায়াম করার সময় হংসের মত প্যাঁক প্যাঁক না সারমেয়র মত ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক করলে বেশি উপকার হয়, বিমুদ্রীকরণ না করে ব্যাঙ্কগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ করলে দেশের কতটা উন্নতি হত এঁদের নখদর্পণে হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সম্বন্ধে যাঁদের অগাধ এবং সমান জ্ঞান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সংস্কৃতিপ্রীতি প্রমাণ করতে (বছরে একবার) বইমেলা যান এবং বই কিনে এনে সেলফে সাজিয়ে রাখেন, দেশপ্রীতি প্রমাণ করতে ঘন ঘন ফেসবুকে জ্ঞানগর্ভ আপডেট দেন আর বন্ধুপ্রীতি প্রমাণ করতে শুক্কুরবারের সন্ধ্যায় সুরাপান পূর্বক ধেই ধেই নাচেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা পরার্থে অচেতন, স্বার্থে সচেতন আর স্বাস্থ্যে অতিচেতন তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের এক অত্যাশ্চর্য দক্ষতা হবে যে এনারা খাবার দেখলেই তার ক্যালরি কাউন্ট বলে দিতে পারবেন।

যাঁরা বাবা-মার সাথে বাংলায় বাক্যালাপ করেন, স্ত্রী, বন্ধু এবং বন্ধুস্ত্রীদের সাথে বাংরেজিতে বাক্যালাপ করেন এবং নিজেদের সন্তানদের সাথে ইংরেজিতে বাক্যালাপ করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা স্বভাবে ভোগী, বসের কাছে ছুটির দরখাস্ত করার সময় রোগী এবং ক্লায়েন্ট-সাইড ম্যানেজার-এর কাছে যোগী রূপে প্রতিপন্ন হতে চান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা কোডিং করার সময় চ্যাঙ-মুড়ি-কানা আর কোড-রিভিউ করার সময় পুরো ষোল আনা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সারাজীবন পরবাসে থেকে ফাদারস ডে আর মাদারস ডে তে বাবা-মার সাথে একটি করে ছবি ফেসবুক দেওয়ালে চিপকে বাবা-মার প্রতি কর্তব্য সাধন করেন, ভ্যালেন্টাইন ডে-তে গোলাপ সহযোগে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য সাধন করেন এবং আইপ্যাড কিনে দিয়ে সন্তানের প্রতি কর্তব্য সাধন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা নিজের ফাঁকিবাজির জন্য বসের কাছে গিয়ে টীমকে দায়ী করেন, টীমের ফাঁকিবাজির জন্য বসের বসের কাছে গিয়ে বসকে দায়ী করেন অথচ টীমের সামনে টীমের আর বসের সামনে বসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা প্রোগ্রামিং-এর মত ইডিওটিক কাজ করা থেকে বাঁচতে চাকরিতে ঢোকার দু বছরের মধ্যে নিজেকে পিপল পার্সন দাবি করে ম্যানেজার হতে চান, চার বছরের মাথায় কার লোন নিয়ে গাড়ি কেনেন, পাঁচ বছরের মাথায় হাউস লোন নিয়ে বাড়ি কেনেন এবং চাকরির বাকি বছরগুলো কাটিয়ে দেন সেই সব লোন শোধ্‌ করতে তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের চোখে এদের বাবা মায়েরা এক্সপায়ারি ট্যাগ লাগানো এবং আউট-অফ-ডেট, স্ত্রী কাংস্যবিনিন্দিতকন্ঠী ও স্বামীমাংসভোজী এবং সন্তান আইনস্টাইনের থেকেও খরতর বুদ্ধির অধিকারী। এঁদের স্ফীত মস্তিষ্ক গোময় দ্বারা আর স্ফীত উদর স্নেহ জাতীয় পদার্থ দ্বারা নির্মিত হবে।

স্ববাবু বলিলেন “রোসেন রোসেন স্যার। এতদূর শুনে আমার প্রতিটি রোমকূপে রোমাঞ্চ হচ্ছে, হৃদয়ে অদ্ভুত আনন্দবারি সিঞ্চিত হচ্ছে। স্থির বিশ্বাস হচ্ছে এই আই-টি পিপল দ্বারা দেশ ও দশের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হবে। আশীর্বাদ করুন প্রভু যেন পরজন্মে আমি হই বনমালী ইয়ে থুড়ি মানে আই-টি পিপল।”

যযাতি বলিলেন “তথাস্তু”।

[প্রকাশিত – বাতায়ন ধারাবাহিক ১ সংখ্যা]

পাগলি

অফিস ফেরতা ট্রেনসফরটুকু শেষ করে বাসে উঠে পড়েছিলাম। এই বাসেই শুধুমাত্র সাত মিনিটের সফরে পৌঁছে যাব বাড়ির দোরগোড়ায়। অক্টোবর মাসে শিকাগোতে সুযযিজেঠুর ডিউটি আওয়ারস নেহাতই কম। পাঁচটা বাজল কি বাজল না, আলো-টালো গুটিয়ে নিয়ে সে দিনের মত বিদায় নেওয়ার যোগাড়যন্ত্র করে। গুঁড়ি গুঁড়ি সন্ধ্যারা চুপিসাড়ে নেমে এসে ঘাসের ডগায় অপেক্ষা করছে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। আলোর বিন্দুগুলো আর একটু তেজ হারালেই, আর একটু ম্রিয়মাণ হলেই তাদের জায়গাজমি দখল করে নেবে অন্ধকার কণারা। আমার তিন বছরের কন্যার আধো আধো গলা শোনার ইচ্ছায় তখন মনের মধ্যে কাঠবিড়ালির পিড়িক পিড়িক। বাস ছাড়ার একটু আগে বাসে আমার উল্টোদিকে এসে যে আসন গ্রহণ করল সে একটি মধ্যবয়স্কা মহিলা। দু এক সেকেন্ড দেখলেই বোঝা যায় মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। হতশ্রী শতছিন্ন কাপড়জামা। কিন্তু পরিপাটি করে পরেছে। চুপ করে বসে থাকার চেষ্টা করছে কিন্তু যেন পারছে না। মাঝে মাঝে কথা বলে উঠছে, মাঝে মাঝে উঠছে হেসে। পরমুহুর্তেই চুপ। যেন কোন এক অস্থির সবল শিশুস্বত্তা ক্রমাগতই বডি ফ্রেমের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর ছোটবেলা থেকে শেখা সামাজিক সংস্কারের দুর্বল স্বত্তা বারে বারে তাকে ঠেলে ভিতরে পাঠাচ্ছে। নিজের মধ্যেই যেন এক মাস্টারনি বলছে “না না এ শোভন নয়। সমাজোচিত নয়। অকারণে হাসলে, কথা বললে লোকে তোমায় পাগল বলবে।” কিন্তু পরমুহুর্তেই আবার যেন ভুলে যাচ্ছে। এই বিরুদ্ধ দুই স্বত্তার মধ্যে যেন লেগেছে শুম্ভ নিশুম্ভ যুদ্ধ।

এমন মানুষ দেখলে তাকে উপেক্ষা করাই দস্তুর। আমিও তাই করছিলাম। অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে রেখে না দেখার অভিনয়। কিন্তু আমাদের সকলের মধ্যেই একটা পাগল থাকে যে কিনা পাগল দেখার লোভ সামলাতে পারে না। তাই চোখ পড়ে যাচ্ছে থেকে থেকে। হঠাৎ দেখি মহিলা আমার দিকে কিছু একটা বাড়িয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। মনে মনে শঙ্কিত হলাম। ভাবলাম “মনে হচ্ছে জ্বালাবে মহিলা।” একটু কান দিয়ে শুনে দেখলাম মহিলা আমাকে একটা ফ্রুটজুসের কাচের বোতল খুলে দিতে অনুরোধ করছে। বোতল ধরে থাকা হাতটা আমার দিকে বাড়ানো। যতদূর মনে হয় বাড়িতে তাকে এই জুসের বোতল খুলে দেওয়া হয়। আর ওই শিশুসুলভ মাথাতে আপন পরের বোধ তৈরী হয়নি আজও। তাই আমাকেই করে ফেলেছে বোতল খুলে দেওয়ার অনুরোধ। অনিচ্ছা স্বত্তেও বোতলটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কসরত করলাম। কাচের ওপর লোহার ঢাকনা শক্ত হয়ে লেগে আছে। অনেক চেষ্টাতেও একটুও ঘোরাতে না পেরে নিজের অক্ষমতা জানিয়ে ফেরত দিলাম কাচের কন্টেনারটা।  কোন দ্বিতীয় বাক্য খরচ না করে মহিলা বোতলটা নিয়ে নিলো। আর তারপর আমি সবিস্ময়ে দেখলাম বোতলের গলার দিকটা এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে বোতলের পেছনে সজোরে তিন চার বার মারল যাতে ভিতরের রঙিন তরলটা সবেগে এসে ভেতর থেকে চাপ দেয় ঢাকনায়। আর তারপরেই বোতলটা আবার বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। হাতে নিয়ে ঢাকনাটা একটু ঘোরাতেই যখন খুলে এলো তখন লাজুক মুখে “আই ডিড নট নো দিস টেকনিক” বলে বোতলটা ফেরত দিতেই ধন্যবাদ জানিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে জুস খেতে শুরু করল মহিলা।

সান্দ্র তরলের সজোরে ধাক্কায় বোতলের আর ঢাকনার সংযোগ আলগা করে দেওয়ার এই বুদ্ধি তো আমার মাথায় আসে নি। জীবনের এই যে পাঠ আমার জানা ছিল না, এই মানসিক প্রতিবন্ধী মহিলা জানল কি করে? আর যদি জানল, বোতলের ঢাকনা খোলার কৌশলটা ব্যাবহার করার পরেও ঢাকনাটা নিজে না খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল কোন অভিপ্রায়ে? বাস ভর্তি লোকের সামনে আমার অক্ষমতাটাকে একটু কম করে দেওয়ার জন্য কি? হয়তো বা। মহিলার অপরিণত মনে এত সূক্ষ্ম অনুভূতিরও কি তবে জায়গা আছে? অথচ এই যে আমি যে কিনা একটু আগেই নাক সিঁটকাচ্ছিল, কতক্ষণে এই পাগলিটার সামনাসামনি বসা থেকে মুক্তি পাবে সে কথা ভেবে, আমি তো সুস্থ সমাজের প্রতিনিধি। এমনকি আমাকে অনেকে প্রতিভাবানও বলে। তবে কি কোথাও সুস্থ মন আর অসুস্থ মনের যে লেবেল আমরা সাঁটিয়েছি সেটা উল্টো লাগানো হয়ে গেছে? অসহিষ্ণু, সমালোচনাপ্রিয় মনই বহুলদৃষ্ট বলে তাকেই সুস্থ স্বাভাবিক নাম দিয়েছি আর অনুভূতির উথালপাথাল বন্যায় ক্রমাগত ডুবতে থাকা, ভাসতে থাকা মনগুলোকে পাগল আখ্যা দিয়েছি?