রয়েছ নয়নে নয়নে

মানুষের বেঁচে থাকার কি অদম্য আগ্রহ , কি অপ্রমিত ইচ্ছা ! এই যে আমার চেতন সত্তা, এই যে আমার আপন কক্ষপথে আমার সাথে হাত মিলিয়ে চলতে থাকা মানুষগুলো , আমার দাদা , বোন , স্ত্রী , সন্তান , বাবা , মা , মিত্রস্বজন এদের প্রতি কি অনির্বচনীয় মমত্ববোধ , এদের পাশাপাশি এদের কাছাকাছি থাকার কি হৃদয়মর্মী কাতরতা । “আমি আছি” এই বোধ – এ যেন এক ভরসাপ্রদায়ক স্বস্তিবাচন , এক অনুপম বিশ্বাস । এই যে আমি জীবনের সুমিষ্ট পয়োনিধি থেকে প্রতিনিয়ত এক পেয়ালা জল পান করছি তার কি আনন্দঘন অনুভূতি । এই যে আমি দেখছি , স্পর্শ করছি , ভালবাসছি , প্রিয়জনের সঙ্গকামনা করছি , এই যে “আমি এবং আমার” এর নামই জীবন !

তবু এক অনিবার্য বিশ্রামের সম্ভাবনা আমাদের স্বততঃ অনুসরণ করে । মৃত্যুলোকের তমিস্রাময় ছায়া আমাদের পিছু পিছু ঘোরে সর্বদা। হঠাৎই অতর্কিতে ছুঁয়ে ফেলে প্রিয় কোনো মানুষকে । সহসা অলঙ্ঘ্য অন্ধকারে হারিয়ে যায় কোনো প্রিয় মুখ । নিত্যদিনের হাসি খেলায় তখন সে অনুপস্থিত । হৃদয়ে হৃদয়ের যোগসূত্র ছিন্ন করে তার তখন এক অনুদ্বিগ্ন অনঘ উপস্থিতি । সূর্য তবু আপন বলয়ে প্রদক্ষিণ করতে থাকে । পৃথিবী তবু নিজের কক্ষপথে ছুটতে থাকে। তবু শীত গ্রীষ্ম বর্ষা আসে । তবু পাখিদের কলকাকলিতে মুখর ভোর আসে । তবু সন্ধ্যা নামে আসন্নপ্রসবা গাভীর মত ধীরে । নবজাতক তবু ভূমিষ্ঠ হয় । আহার নিদ্রা মৈথুন হয় । তবু নির্বাচন হয় । উষ্ণ বক্তৃতা হয় । জীবন চলতে থাকে আপন ছন্দে । তার যে মৃত্যুর জন্য থামার সময় নেই !

শুধু কিছু হৃদয়ে ব্যাথা জেগে থাকে । কিছু আঁখি থেকে অশ্রুবিসর্জন হয় গোপনে একান্তে । ছোট ছোট কথা , ছোট ছোট ব্যাথা , ছোট ছোট সঙ্গসুধাকণিকা কোনো একলা দুপুরে টুকরো স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে । মহাকাল তার যাদুদণ্ড বোলাতে থাকে ক্ষতস্থানে । কালের প্রলেপ লেগে শুকোয় ঘা । সম্পর্কের যে মায়াশিকড় মাটির গভীরে বিস্তৃত হয়েছিল , যা  পুষ্ট হত রোজকার সংলাপে , রোজকার হাসি-কান্নায়-আদরে-অভিমানে সে ধীরে ধীরে শুকোতে থাকে । তবু যেন নিঃশেষ হয় না মানুষটার অস্তিত্ব । ভূমায় উড়তে থাকা ঘুড়ি যেমন ভূমির সাথে এক প্রায়-অদৃশ্য সুতো দিয়ে জোড়া থাকে , মুক্ত বিহঙ্গের মত কোনো অনাবিল আনন্দলোকে বিচরণ করতে থাকা মানুষটিও তেমন ভালবাসার এক অচ্ছেদ্য , প্রায়-অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকে মর্ত্যলোকে। সুতোয় যেমন টান পড়লেই বোঝা যায় আকাশে ওই দূরে ছোট্ট কুট্টি হয়ে যাওয়া ঘুড়িটা এখনো আছে , ভোকাট্টা হয় নি , সেরকমই স্মৃতির দড়িতে টান পড়লেই বোঝা যায় মানুষটা আছে । মানুষটা আছে তার সমগ্র অস্তিত্ব নিয়ে , তার আপনজনেদের প্রতি স্নেহ-মমতা-ভালবাসা নিয়ে , তার সন্তানের প্রতি মঙ্গলকামনা নিয়ে , স্ত্রীয়ের স্বাস্থ্যের প্রতি উদ্বেগ নিয়ে , কোনো স্বজন কি বান্ধবের সাফল্যের গৌরব নিয়ে , কোনো অনাগত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুশ্চিন্তা নিয়ে , কোনো এক সুস্থ হিংসাহীন পৃথিবীর স্বপ্ন চোখে নিয়ে ,  মানুষটা আছে – শুধু নয়নসমুখে আর নেই, নয়নের মাঝখানে সে গড়ে নিয়েছে তার চৌখুপী ঘর ।

প্রাণের ভাষা

যে ভাষায় প্রদোষ মিত্র সমাধান করেন বাক্স রহস্য আর ফুল্লরা কহেন তাঁর বারমাস্যা, টেনিদা বলেন “ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফেলিস” আর মনের মত কেকের নাম মন-জিনিস, যে ভাষায় মেঘ গাভীর মত চরে আবার খোকাবাবু যায় লাল জুতো পায়, যে ভাষায় কুচবরণ কন্যার মেঘবরণ কেশ আর পত্রিকার নাম সন্দেশ, যে ভাষা কখনো সরব হয় পথের দাবীতে আবার নীরব হয় পথের পাঁচালিতে, যে ভাষায় তারিণী খুড়ো গল্প বলেন আর লালমোহন গাঙ্গুলী লেখেন রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাস, যে ভাষায় ফুলে নাম পাথরকুচি আর নাচের নাম ধুনুচি, ঘাসের নাম মধুকুপী আর ছিনাথ সাজেন বহুরূপী, যে ভাষায় পথিক হয় পথভোলা আর কিশোরী হয় চঞ্চলা, সে ভাষার নাম বাংলা।

যে ভাষায় নাচের নাম ছৌ আর মধুপের নাম মৌ, যে ভাষায় ফাঁদ দেখে নি ঘুঘু আর ডাকাতের নাম রঘু, বাড়ির মেয়ে গৌরী আর ত্যাগের রঙ গৈরিক, কাঁথার নাম নকশী আর গোয়েন্দার পদবী বক্সী, যে ভাষায় গাছের পাতা হিজল আর চোখের পাতায় কাজল, ফুলের নাম শিউলি আর ডালের নাম বিউলি, যে ভাষায় ঘনাদা দেয় গাঁট্টা আর খেলার নাম সাট্টা, যে ভাষায় ক্যারাম পিটিয়ে আড্ডা আর পরীক্ষাতে গাড্ডা,  স্কুলের বাইরে চুরমুর আর ফুচকা স্টলে হুড়মুড়, যে ভাষায় রাজ্যের নাম হল্লা আর অংক খাতায় গোল্লা, মাঠের নাম ভুবনডাঙা আর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তে রাঙা, যে ভাষায় সাপের নাম তক্ষক আর যে রক্ষক সেই ভক্ষক, স্টেশানের নাম ঘুম আর চাষের নাম ঝুম, যে ভাষায় পৌষমাসে পার্বণ আর কয়লা কালো কার্বন, যে ভাষায় নায়ক মানেই উত্তম আর চাল দেবে যেই মোক্ষম, যে ভাষায় জীবন মানে যাপন আর মৃত্যু মানে তর্পণ, যে ভাষায় “গল্প হলেও সত্যি” আর ছোটরা একরত্তি, যে ভাষায় সোনায় থাকে সোহাগা আর সোহাগ না পেলে অভাগা, যে ভাষায় প্রমাণের সাথে তথ্য আর ওষুধের সাথে পথ্য, ভাতের সাথে শুক্তো আর মণির সাথে মুক্তো, যে ভাষায় পেছনে দিলেই বাঁশ আর উৎসব বারোমাস, যে ভাষায় পিঠের সাথে পুলি আর চুলোর সাথে চুলি, গোলার সাথে গুলি আর মজুরের সাথে কুলি, চৈত্রসেলে ঝুলোঝুলি আর বিজয়ায় কোলাকুলি, স্মৃতিবোঝাই ভেলা আর মিলনবোঝাই মেলা, যে ভাষায় একলা হলেই দুপুর আর বৃষ্টি টাপুরটুপুর, যে ভাষায় ঘুড়ির নাম পেটকাটি আর বাড়ির নাম ভিটেমাটি, আকাশে থাকে গঙ্গা আর লেবুজল খেয়ে চাঙ্গা, মিলের নাম জুট আর খেলার নাম গোল্লাছুট, যে ভাষায় নদীর নাম কাঁসাই আর ইসকাপনের বিবি পাশাই, পাখির নাম শুক আর জ্যোৎস্না রাতে মূক সে আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা।

যে ভাষায় পিসির নাম পদী আর সুবর্ণরেখা নদী, গোয়েন্দা হন ভানু আর গায়ক কুমার সানু, যে ভাষায় উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে আর লিচুচুরি হয় পুকুর পাড়ে, অলির কথা শুনে বকুল হাসে আর সন্তান সুরক্ষিত মাতৃবাহুপাশে, ব্যাঙের নাম সোনা আর মাছের নাম পোনা, চুলেতে বেলফুল আর রূপেতে মশগুল, সাঁওতাল রাজার নাম দোবরু আর হর্ষবর্ধনের ভাই গোবরা, যে ভাষায় প্রিয়ার নাম রাজলক্ষ্মী আর বারবণিতার নাম মধুমক্ষী, যে ভাষায় ছাদনাতলায় বসিয়ে…”আমি যামিনী তুমি শশী হে”, যে ভাষায় আমের থাকে শিষ আর যা উনিশ তা বিশ, বাঙাল থাকলে ঘটি আর আঁশ থাকলে বঁটি, পানের থাকে বরজ আর প্রেমিকের থাকে গরজ, পাটির সাথে সাপটা আর ঝড়ের সাথে ঝাপটা, বাঁশের নাম মুলি আর স্টেশান শ্যাওড়াফুলি, যে ভাষায় গাছে ওঠে গল্পগরু আর ছক্কা হাঁকালে “চলবে গুরু”, ফুলের নাম মহুল আর গানের নাম বাউল, টেনিদার চ্যালা প্যালা আর টিফিনে কুমীরডাঙা খেলা, যে ভাষায় রবিবারেতে পাঁঠা আর পিরিতি কাঁঠালের আঠা, মাছের দোকানে জটলা আর ফটিক, বাপ্পা, পটলা, যে ভাষায় ফুলপিসি আর বড়কা, আর চাদের বুড়ির চড়কা, যে ভাষায় কাগজে হয় নৌকো আর চালাক চতুর চৌকোস, পানে থাকে জর্দা আর গল্প বলেন বড়দা, পুজোয় থাকে ফর্দ আর মেয়ে থাকলেই মর্দ সে আমার প্রাণের ভাষা গানের ভাষা বাংলা ভাষা।  

নম্বর

প্রথম বই প্রকাশ হওয়ায় কেমন লাগল জিজ্ঞাসা করেছেন এক শুভার্থী। উত্তরে বলি,

না তেমন হাতি-ঘোড়া কিছু লাগে না। না, খুব একটা ল্যাজমোটা হইনি। আমার ল্যাজ ছোটবেলা থেকেই মোটা ছিল। নতুন করে মোটা হওয়ার কিছু নেই। ফেসবুকে স্ত্রী-কন্যা সহ সেলফি দিলে আগেও দুশ লাইক পড়ত আর লেখা দিলে লাইক দুই ডিজিটেও যেত না। এখনো তাই হবে। কথা দিচ্ছি, এরপরেও প্রতিদিন শব্দ রেওয়াজ করব যেমন এখন করি। কথা দিচ্ছি, সস্তায় নাম কামানোর চেষ্টা কখনো করিনি। এখনো করব না। চেষ্টা করব যাতে জীবনে কোনো একটা অন্তত লেখা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ পরীক্ষায় শেষ ঘণ্টি বেজে যাওয়ার মত অনুভূতি অবশ্যই হয়। সেই যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় নিজেকে প্রমাণ করার আকুল প্রয়াস আর তারপর খাতাটা জমা দিয়ে দুরুদুরু বুকে নম্বরের অপেক্ষা করা। অনেকটা সেইরকম। প্রথমদিনেই বইমেলায় যারা “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” বইসংগ্রহ করেছে, বই হাতে ছবি পাঠিয়েছে, তারা সকলেই সেই এক্সামিনার। আমার এক বন্ধু সায়ন্তন দিল্লির এক ব্যস্ত উকিল। দুদিনের ঝটিতি সফরে কলকাতা এসেও বন্ধুর বই সংগ্রহ করতে বইমেলা প্রাঙ্গণে ঢুঁ মেরে চিলের মত দক্ষতায় তুলে নিয়ে গেছে বইখানা। স্কুলের বন্ধু হলেই এমনটা সম্ভব। মোট কথা বইটা বইমেলা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে এমন কি কলকাতার চৌহদ্দি পেরিয়ে পাড়ি দিয়েছে পুরো পনেরশ কিমি। কিন্তু নম্বর পড়তে শুরু করবে তখনই যখন গল্পগুলোর সাথে মানুষগুলোর শুভদৃষ্টি হবে।  

শুধু একটাই মুশকিল। এই পরীক্ষায় দুরকমের নম্বর দেওয়ার প্রথা। একটা সৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে মনে মনে। আর একটা অসৎ নম্বর যেটা দেওয়া হবে সামনাসামনি। অসৎ নম্বরটা হবে লেটার মার্কস। আর সৎ নম্বরে পরীক্ষায় পাশ করলাম কিনা, সেটা বোধ হয় কখনো জানা যাবে না।

বইমেলা অতিক্রান্ত। বইটা এখন ফ্লিপকার্টে পাওয়া যাচ্ছে। Flipkart-এ গিয়ে “Jojatir Jhuli” বলে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে। গল্পের গরু গাছে ঠিকঠাক উঠেছে কিনা দেখতে এক কপি সংগ্রহ করবেন। দেশের যেকোনো প্রান্তেই কিন্তু ডেলিভারি হবে।

https://www.flipkart.com/jojatir-jhuli/p/itmfddfjpdqtqggg?pid=RBKFDCGMBJTKZAZN&lid=LSTRBKFDCGMBJTKZAZNVGGGS4&marketplace=FLIPKART&srno=s_1_1&otracker=AS_Query_HistoryAutoSuggest_0_2&fm=SEARCH&iid=417238ca-99f3-46d0-895a-dc5694f1347f.RBKFDCGMBJTKZAZN.SEARCH&ppt=Homepage&ppn=Homepage&ssid=nzouf4tfq80000001549471830883&qH=463fb7b5b874e6b9

ঝোলায় পুরুন যযাতির ঝুলি

দেখছেন তো? লাইন পড়ে গেছে…

আমাদের মাস্টার গোগোল অর্ধকায়স্থ, মিসেস অ্যাংলোলেডি চৌধুরী, মিস্টার উন্মাদ হিজিবিজিবিজ আর মহামান্য রামগরুড় তর্করত্ন এরা সব লাইন দিয়ে আছে এবারে বইমেলায় নিজের বইয়ের ঝোলায় এক কপি যযাতির ঝুলি ভরবে বলে… আপনি আবার ফাঁকে পড়ে না যান তাই এইবেলা খবরটা চুপি চুপি দিয়ে দিলাম। বইমেলায় পত্রভারতী স্টল নাম্বার 359-এর বাইরে ইঁট পেতে ফেলুন। ঝাঁপি খুলতেই ঝাঁপ দিয়ে পড়ুন। সংগ্রহ করে ফেলুন আপনার কপিটা। “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” পত্রভারতী থেকে আসছে মুদ্রিত মাধ্যমে। এবারে বইমেলায়।

যযাতি কে? ঝুলিতে কি আছে? তাহলে বলি শুনুন। তা হয়েছে কি সেই ছোটবেলায় সুকুমার দাদু বলে দিয়েছেন “আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার। কাতুকুতু বুড়োর কাছে যেও না খবরদার”। তো আমিও তাই যখন সাত সাগরপার পাড়ি দিয়েছি, সাবধান থেকেছি যাতে কাতুকুতু বুড়োর ত্রহস্পর্শ মাড়াতে না হয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে আলাপ হল এক বুড়োর সাথে নাম নাকি তাঁর যযাতি। আর তাঁর কথাতে তিনি হলেন এই কাতুকুতু বুড়োর “মামার পিসিঠাম্মার ভাইয়ের নাতির বোনের ছেলে।” পুরো সাড়ে চৌত্রিশ মিনিট ভেবে ভেবে দেখলাম আদতে তিনি কাতুকুতু বুড়োর ভাই হন। সে যাকগে যাক। এই যযাতি বুড়ো অন্তত কথায় কথায় কাতুকুতু দিয়ে অসভ্যতা করেন না। কিন্তু কাতুকুতু বুড়োর সাথে তাঁর সম্পর্ক বলার ধরণ দেখেই বুঝছেন নিশ্চয়ই এ ভদ্রলোকের বেশি কথা বলার বদরোগ আছে। তো সে যযাতি বুড়ো রোজ এসে আগডুম বাগডুম গপ্পো বলে যায়। সাথে ভয় দেখায় তক্ষুনি তক্ষুনি লিখে না ফেললে সে অবমাননার শোধ নিতে তিনি কাতুকুতু বুড়োকে পাঠিয়ে দেবেন। আমিও তাই টুকে রাখি এই ভেবে যে ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিদের শোনাতে কাজে লাগবে। আর তাছাড়া কাতুকুতু বুড়োর কাছে কাতুকুতু খাওয়ার থেকে যযাতি বুড়োর গপ্পো শোনা ঢের ভালো ব্যাপার।

পত্রভারতী বলে একটা পেল্লাই ছাপাখানা বলে কিনা এইসব হাবিজাবি গপ্পোগুলো ছাপিয়ে দেবে। তো আমি বললাম, “তা দাও খন।” তাই কাতুকুতু বুড়োর কাছে অষ্টপ্রহর কাতুকুতু না খেতে চাইলে এবারের বইমেলায় স্টল 359 থেকে ঝটপট কিনে ফেলুন এক কপি “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”।

ও হ্যাঁ এই অসাধারণ কার্টুনটির জনক আমার বিশেষ বন্ধু বহুমুখী প্রতিভাবান শ্রীল শ্রীযুক্ত অভিষেক রায়। তার সব কটা প্রতিভাকে খুব ছোট করে বললেও লাগে বাহান্ন মিনিট তিপ্পান্ন সেকেন্ড। তাই আপাতত কার্টুনিস্ট অভিষেকের সাথেই পরিচিত হোন।

যযাতির ঝুলি এবার মুদ্রিত মাধ্যমে

যযাতির সুধী যজমানেরা, কেমন আছেন সকলে? কলকাতার শীতের মরশুম কেমন উপভোগ করছেন? বাজারে টাটকা তাজা ওলটা ফুলকপিটা দরদাম করে কিনতে নিশ্চয়ই সকাল সকাল পৌঁছে যাচ্ছেন মাফলার চড়িয়ে। বাড়ির কুঁচোকাঁচাকে স্কুলে পাঠানোর আগে নিশ্চয়ই হনুমান টুপি পড়িয়ে দিচ্ছেন? রাত দশটা বাজলেই লেপের তুলোর নরমে-আদরে-পায়রা-গরমে ঢুকে পড়ার জন্য মন উচাটন নিশ্চয়ই? সকালবেলা সেই রাতভরের প্রেমিকা কম্বলের সাথে ব্রেকআপের মাহেন্দ্রক্ষণে নিশ্চয়ই মনে রাজ্যের বিরক্তি। গিজারে আজকাল গরমজল বেরলেও দু একটা দিন স্নানের সাথে মান করেন নি এমনটা একগলা গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে বললেও কি কেউ আর বিশ্বাস করবে? পৌষপাবনে গৃহিণী গোকুলপিঠে  বানালে বেড়াল-পায়ে রান্নাঘরে হানা দিয়ে দু একটার সদ্গতি করছেন নিশ্চয়ই? সব মিলিয়ে শীতের বাজার সরগরম।

আগে তো বাঙালির ছিল বারো মাসে তের পাবন। তবে এখন হচ্ছে প্রতিমাসেই তেরোটা করে মেলা। হস্তশিল্প মেলা, পদশিল্প মেলা, উদরশিল্প মেলা ইয়ে থুড়ি মানে খাদ্যমেলা, আরও কত কি? তবে সব মেলার সেরা নিশ্চয়ই বাঙালির বইমেলা। যখন এইসব মেলারা মায়ের গর্ভে ছিল (দিদির গর্ভে বলা উচিত ছিল কি?) তখন থেকেই বইমেলা। ধুলো পায়ে পায়ে স্টলে স্টলে ঘোরা, বই চেখে চেখে দেখা, পছন্দের বইখানা খরিদ করে ক্রমশ-ভারি-হতে-থাকা নিজের বইয়ের ঝুলিতে ভরে ফেলা আর মাঝে মাঝে রসনাতৃপ্তির জন্য বইমেলা চত্বরেই চটপটে খাবারের দোকানে মাথা গলানো। সব মিলিয়ে বইমেলায় মেলা আনন্দ, সুপার ফান।

আপনারা যারা যযাতির ঝুলি পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য এবার কিন্তু আর একটা মস্ত খবর আছে। নামী পত্রভারতী প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত মাধ্যমে আসছে “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো”। বারোখানা টানটান কাহিনী। বারো খানা রোববারের দুপুরে শুয়ে শুয়ে আলগোছে “যযাতির ঝুলি”-র পাতা ওলটানো।

আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ এক কপি সংগ্রহ করবেন। আপনার বইয়ের তাকে আদর করে তুলে নেবেন। বইটি পড়ে হতাশ হবেন না এটা যযাতির গ্যারান্টি। আপনার গল্পজিভে যাতে চড়া না পড়ে যায় তাই ঝুলি থেকে ভিন্ন জনার ও স্বাদের গল্প চয়ন করেছি বারোখানা। কখনো অম্লমধুর দাম্পত্যকলহ তো কখনো কর্কশ, ঊষর দিনের কড়চা, কখনো দাদু-নাতির সম্পর্কের পায়রাগরম উত্তাপ তো কখনো ব্যর্থ প্রেমিকার ঈর্ষানল। কখনো কঠোর বাস্তব তো কখনো লোমখাড়া করা অদ্ভুতুড়ে গল্প অথবা কল্পবিজ্ঞানলোক। কুশীলবেরা কখনো রবীন্দ্রনাথ তো কখনো প্রফেসর শঙ্কু, কখনো মানুষ তো কখনো না-মানুষ, কখনো চোর তো কখনো পকেটমার। ঝুলিতে প্যানপ্যানানি ঘ্যানঘ্যানানি নেই, নেই শাশুড়ি বৌ। অনর্থক সুড়সুড়ি নেই, নঞর্থক জীবনভাষ্য নেই। আছে এক ডজন খাস্তা তাজা মুচমুচে গপ্পো। আছে নিখাদ আদ্যন্ত বাঙালিয়ানা। যে গল্প শুনতে পান অফিসে, বাসে, ট্রেনে, শনিবারীয় পার্টিতে, রবিবাসরীয় বৈঠকখানায় – যাকে ইংরেজিতে বলে life as it is. শীতের দুপুরে কম্বলের ওমের নিরাপত্তায় নিখাদ কাহিনীক্ষুধা নিবৃত্তি করার জন্য এবারের কলকাতা বইমেলায় পত্রভারতীর স্টল 359 থেকে অবশ্যই সংগ্রহ করুন এক কপি যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো

প্রিয়জনকে উপহার দিন। আর হ্যাঁ, পড়া হয়ে গেলে কেমন লাগল যযাতির ঝুলি ব্লগে বা ফেসবুক পেজে একটা মন্তব্য করে জানাবেন। প্লীজ প্লীজ প্লীজ জানাবেন। কারণ আপনাদের উৎসাহ, কমেন্ট, তারিফ এগুলোই, বিশ্বাস করুন, যযাতির পথ চলার একমাত্র মাধুকরী। আপনাদের ভালবাসাতেই যযাতির কলম সচল থাকে। আজও।  

আই-টি ভাইটি

[সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত সকল বন্ধুদের কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এ লেখার উদ্দেশ্য নিছক হিউমার সৃষ্টি, কাউকে আঘাত দেওয়া নয়। আর আমি নিজেও যেহেতু একই পেশায় নিযুক্ত, লেখাটিকে খানিকটা আত্মসমালোচনা হিসাবেও ধরতে পারেন। লেখাটির স্টাইল অবশ্যই বঙ্কিমবাবুর “বাবু” রম্যরচনার থেকে অনুপ্রাণিত।]

স্ব বাবু যযাতিকে কহিলেন হে নৃপশ্রেষ্ঠ শুনেছি কলিকালে আই-টি পিপল নামক এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হবে। এঁদের আকৃতি প্রকৃতি ও বিকৃতি আপনি অনুগ্রহপূর্বক বর্ণনা করুন।

যযাতি বলিলেন, হে নরবর, আমি এই কপি-পেস্ট-কর্মকুশলী, আত্মাভিমানী, বিদেশবিলাসী আই-টি পিপল গণকে বর্ণনা করব। আপনি শ্রবন করুন।

যাঁরা পড়াশুনায় লবডঙ্কা, সাফল্য বলতে শুধু বোঝে টঙ্কা আর সদাই যাঁদের প্রাণে ফায়ার হওয়ার আশঙ্কা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের দেশের থেকে বিদেশে বেশি মতি, অনসাইট পেলে মনে করে পূর্বজন্মের সুকৃতি, একবার বিদেশে পৌঁছতে পারলেই মুছে ফেলে ডার্টি দেশের সব স্মৃতি তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের বল প্রোগ্রামিং-এ এক গুণ, প্রেজেন্টেশানে দশ গুণ, জব ইন্টারভিউ দিতে গেলে শত গুণ আর অ্যাপ্রাইজাল ইন্টারভিউতে সহস্র গুণ তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা দেশোদ্ধার করেন ফেসবুকে আর একই সাথে সিনেমা দেখেন ম্যাকবুকে তারাই আই-টি পিপল। যাঁরা অফিসে করেন কপি-পেস্ট, বাড়িতে থাকলে কাউচে বসে নেন হালকা রেস্ট আর প্রবল কর্তব্যপরায়ণতাজনিত কারণে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে যারা নিজের বাড়িতে নিজেই গেস্ট তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের নিজের স্ত্রীতে অনাগ্রহ, পরস্ত্রীতে কিঞ্চিত অধিক আগ্রহ, সহকর্মী পরস্ত্রীতে সর্বাধিক আগ্রহ তাঁরাই আই-টি পিপল। যারা বঙ্গভাষায় “নট সো গুড”, ব্রায়ান অ্যাডামস শোনেন “টু আপলিফট মুড”, আর অফিসের “বাচ্চা ছানাপোনা”-দের সাথে অতিমাত্রায় রুড তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা করেন সামান্যই, বন্ধু ও বাবা-মা-স্ত্রীকে কিছু বাড়িয়ে বলেন, বায়োডাটাতে আরো কিছু বাড়িয়ে লেখেন আর ইন্টারভিউতে নিজের কৃতিত্ব ঘোষণায় টেনিদা-ঘনাদাকেও হার মানান তাঁরাই আই-টি পিপল।

এনারা কপি-পেস্টে পারদর্শী হবেন। অন্যের কোড ঝাঁপার ব্যাপারে এনাদের দক্ষতা সর্বজনবিদিত হবে। যাঁরা সকাল নটা থেকে চারটে অব্দি ক্যাফেটেরিয়াতে, পিংপং টেবিলে ও সুন্দরী সহকর্মীদের ডেস্কে দৃশ্য হন আর বিকেল চারটে থেকে রাত্রি নটা অব্দি আপন ডেস্কে বসে আইপিএল ফলো করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। রাত্রিকাল যাঁরা রতি কার্যে নয় প্রোডাকশান সাপোর্টে ব্যয় করবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। বিমুগ্ধ বাবা মা-রা যাঁদের পাঁচে পাঁচ রেটিং দেবেন, নট-সো-ইম্প্রেসড বস পাঁচে তিন রেটিং দেবেন ( সাথে জ্ঞান দেবেন You need to exceed expectation) আর বীতশ্রদ্ধ স্ত্রী-রা পাঁচে শুন্য রেটিং দেবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের ডেডলাইন ডেড হয়ে যায় বছরে সহস্র বার এবং তজ্জনিত কারণে ডেডলাইন এক্সটেন্ড হয় সহস্র এক বার তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা অনসাইট যাওয়ার জন্য বসের ঘরে গিয়ে প্যানপ্যান করেন, পদোন্নতি প্রাপ্ত হতে বসের বসের ঘরে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেন এবং এই সকল প্রাপ্ত হলে ফটাস করে লেঙ্গি মেরে কোম্পানিটি ছেড়ে দেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা প্রাতঃকালে বসের গালি সেবন করেন, সন্ধ্যাকালে স্ত্রীয়ের গালি সেবন করেন এবং সপ্তাহান্তে সেই সকল দুঃখ ভুলতে সুরা সেবন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। দেবী সরস্বতী কৃপা করে এদের মাথার বাঁপাশে একটি উইকিপিডিয়া ফিট করে দেবেন। তাই পৃথিবীর সকল সমস্যার সমাধান এঁদের করতলগত হবে। প্রধানমন্ত্রী নৈঋত না ঈশান কোনদিকে বসে পটি করলে দেশের উন্নতি হবে, প্রাণায়াম করার সময় হংসের মত প্যাঁক প্যাঁক না সারমেয়র মত ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক করলে বেশি উপকার হয়, বিমুদ্রীকরণ না করে ব্যাঙ্কগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ করলে দেশের কতটা উন্নতি হত এঁদের নখদর্পণে হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সম্বন্ধে যাঁদের অগাধ এবং সমান জ্ঞান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সংস্কৃতিপ্রীতি প্রমাণ করতে (বছরে একবার) বইমেলা যান এবং বই কিনে এনে সেলফে সাজিয়ে রাখেন, দেশপ্রীতি প্রমাণ করতে ঘন ঘন ফেসবুকে জ্ঞানগর্ভ আপডেট দেন আর বন্ধুপ্রীতি প্রমাণ করতে শুক্কুরবারের সন্ধ্যায় সুরাপান পূর্বক ধেই ধেই নাচেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা পরার্থে অচেতন, স্বার্থে সচেতন আর স্বাস্থ্যে অতিচেতন তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের এক অত্যাশ্চর্য দক্ষতা হবে যে এনারা খাবার দেখলেই তার ক্যালরি কাউন্ট বলে দিতে পারবেন।

যাঁরা বাবা-মার সাথে বাংলায় বাক্যালাপ করেন, স্ত্রী, বন্ধু এবং বন্ধুস্ত্রীদের সাথে বাংরেজিতে বাক্যালাপ করেন এবং নিজেদের সন্তানদের সাথে ইংরেজিতে বাক্যালাপ করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা স্বভাবে ভোগী, বসের কাছে ছুটির দরখাস্ত করার সময় রোগী এবং ক্লায়েন্ট-সাইড ম্যানেজার-এর কাছে যোগী রূপে প্রতিপন্ন হতে চান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা কোডিং করার সময় চ্যাঙ-মুড়ি-কানা আর কোড-রিভিউ করার সময় পুরো ষোল আনা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সারাজীবন পরবাসে থেকে ফাদারস ডে আর মাদারস ডে তে বাবা-মার সাথে একটি করে ছবি ফেসবুক দেওয়ালে চিপকে বাবা-মার প্রতি কর্তব্য সাধন করেন, ভ্যালেন্টাইন ডে-তে গোলাপ সহযোগে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য সাধন করেন এবং আইপ্যাড কিনে দিয়ে সন্তানের প্রতি কর্তব্য সাধন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা নিজের ফাঁকিবাজির জন্য বসের কাছে গিয়ে টীমকে দায়ী করেন, টীমের ফাঁকিবাজির জন্য বসের বসের কাছে গিয়ে বসকে দায়ী করেন অথচ টীমের সামনে টীমের আর বসের সামনে বসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা প্রোগ্রামিং-এর মত ইডিওটিক কাজ করা থেকে বাঁচতে চাকরিতে ঢোকার দু বছরের মধ্যে নিজেকে পিপল পার্সন দাবি করে ম্যানেজার হতে চান, চার বছরের মাথায় কার লোন নিয়ে গাড়ি কেনেন, পাঁচ বছরের মাথায় হাউস লোন নিয়ে বাড়ি কেনেন এবং চাকরির বাকি বছরগুলো কাটিয়ে দেন সেই সব লোন শোধ্‌ করতে তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের চোখে এদের বাবা মায়েরা এক্সপায়ারি ট্যাগ লাগানো এবং আউট-অফ-ডেট, স্ত্রী কাংস্যবিনিন্দিতকন্ঠী ও স্বামীমাংসভোজী এবং সন্তান আইনস্টাইনের থেকেও খরতর বুদ্ধির অধিকারী। এঁদের স্ফীত মস্তিষ্ক গোময় দ্বারা আর স্ফীত উদর স্নেহ জাতীয় পদার্থ দ্বারা নির্মিত হবে।

স্ববাবু বলিলেন “রোসেন রোসেন স্যার। এতদূর শুনে আমার প্রতিটি রোমকূপে রোমাঞ্চ হচ্ছে, হৃদয়ে অদ্ভুত আনন্দবারি সিঞ্চিত হচ্ছে। স্থির বিশ্বাস হচ্ছে এই আই-টি পিপল দ্বারা দেশ ও দশের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হবে। আশীর্বাদ করুন প্রভু যেন পরজন্মে আমি হই বনমালী ইয়ে থুড়ি মানে আই-টি পিপল।”

যযাতি বলিলেন “তথাস্তু”।

[প্রকাশিত – বাতায়ন ধারাবাহিক ১ সংখ্যা]

পাগলি

অফিস ফেরতা ট্রেনসফরটুকু শেষ করে বাসে উঠে পড়েছিলাম। এই বাসেই শুধুমাত্র সাত মিনিটের সফরে পৌঁছে যাব বাড়ির দোরগোড়ায়। অক্টোবর মাসে শিকাগোতে সুযযিজেঠুর ডিউটি আওয়ারস নেহাতই কম। পাঁচটা বাজল কি বাজল না, আলো-টালো গুটিয়ে নিয়ে সে দিনের মত বিদায় নেওয়ার যোগাড়যন্ত্র করে। গুঁড়ি গুঁড়ি সন্ধ্যারা চুপিসাড়ে নেমে এসে ঘাসের ডগায় অপেক্ষা করছে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। আলোর বিন্দুগুলো আর একটু তেজ হারালেই, আর একটু ম্রিয়মাণ হলেই তাদের জায়গাজমি দখল করে নেবে অন্ধকার কণারা। আমার তিন বছরের কন্যার আধো আধো গলা শোনার ইচ্ছায় তখন মনের মধ্যে কাঠবিড়ালির পিড়িক পিড়িক। বাস ছাড়ার একটু আগে বাসে আমার উল্টোদিকে এসে যে আসন গ্রহণ করল সে একটি মধ্যবয়স্কা মহিলা। দু এক সেকেন্ড দেখলেই বোঝা যায় মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। হতশ্রী শতছিন্ন কাপড়জামা। কিন্তু পরিপাটি করে পরেছে। চুপ করে বসে থাকার চেষ্টা করছে কিন্তু যেন পারছে না। মাঝে মাঝে কথা বলে উঠছে, মাঝে মাঝে উঠছে হেসে। পরমুহুর্তেই চুপ। যেন কোন এক অস্থির সবল শিশুস্বত্তা ক্রমাগতই বডি ফ্রেমের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর ছোটবেলা থেকে শেখা সামাজিক সংস্কারের দুর্বল স্বত্তা বারে বারে তাকে ঠেলে ভিতরে পাঠাচ্ছে। নিজের মধ্যেই যেন এক মাস্টারনি বলছে “না না এ শোভন নয়। সমাজোচিত নয়। অকারণে হাসলে, কথা বললে লোকে তোমায় পাগল বলবে।” কিন্তু পরমুহুর্তেই আবার যেন ভুলে যাচ্ছে। এই বিরুদ্ধ দুই স্বত্তার মধ্যে যেন লেগেছে শুম্ভ নিশুম্ভ যুদ্ধ।

এমন মানুষ দেখলে তাকে উপেক্ষা করাই দস্তুর। আমিও তাই করছিলাম। অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে রেখে না দেখার অভিনয়। কিন্তু আমাদের সকলের মধ্যেই একটা পাগল থাকে যে কিনা পাগল দেখার লোভ সামলাতে পারে না। তাই চোখ পড়ে যাচ্ছে থেকে থেকে। হঠাৎ দেখি মহিলা আমার দিকে কিছু একটা বাড়িয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। মনে মনে শঙ্কিত হলাম। ভাবলাম “মনে হচ্ছে জ্বালাবে মহিলা।” একটু কান দিয়ে শুনে দেখলাম মহিলা আমাকে একটা ফ্রুটজুসের কাচের বোতল খুলে দিতে অনুরোধ করছে। বোতল ধরে থাকা হাতটা আমার দিকে বাড়ানো। যতদূর মনে হয় বাড়িতে তাকে এই জুসের বোতল খুলে দেওয়া হয়। আর ওই শিশুসুলভ মাথাতে আপন পরের বোধ তৈরী হয়নি আজও। তাই আমাকেই করে ফেলেছে বোতল খুলে দেওয়ার অনুরোধ। অনিচ্ছা স্বত্তেও বোতলটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কসরত করলাম। কাচের ওপর লোহার ঢাকনা শক্ত হয়ে লেগে আছে। অনেক চেষ্টাতেও একটুও ঘোরাতে না পেরে নিজের অক্ষমতা জানিয়ে ফেরত দিলাম কাচের কন্টেনারটা।  কোন দ্বিতীয় বাক্য খরচ না করে মহিলা বোতলটা নিয়ে নিলো। আর তারপর আমি সবিস্ময়ে দেখলাম বোতলের গলার দিকটা এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে বোতলের পেছনে সজোরে তিন চার বার মারল যাতে ভিতরের রঙিন তরলটা সবেগে এসে ভেতর থেকে চাপ দেয় ঢাকনায়। আর তারপরেই বোতলটা আবার বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। হাতে নিয়ে ঢাকনাটা একটু ঘোরাতেই যখন খুলে এলো তখন লাজুক মুখে “আই ডিড নট নো দিস টেকনিক” বলে বোতলটা ফেরত দিতেই ধন্যবাদ জানিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে জুস খেতে শুরু করল মহিলা।

সান্দ্র তরলের সজোরে ধাক্কায় বোতলের আর ঢাকনার সংযোগ আলগা করে দেওয়ার এই বুদ্ধি তো আমার মাথায় আসে নি। জীবনের এই যে পাঠ আমার জানা ছিল না, এই মানসিক প্রতিবন্ধী মহিলা জানল কি করে? আর যদি জানল, বোতলের ঢাকনা খোলার কৌশলটা ব্যাবহার করার পরেও ঢাকনাটা নিজে না খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল কোন অভিপ্রায়ে? বাস ভর্তি লোকের সামনে আমার অক্ষমতাটাকে একটু কম করে দেওয়ার জন্য কি? হয়তো বা। মহিলার অপরিণত মনে এত সূক্ষ্ম অনুভূতিরও কি তবে জায়গা আছে? অথচ এই যে আমি যে কিনা একটু আগেই নাক সিঁটকাচ্ছিল, কতক্ষণে এই পাগলিটার সামনাসামনি বসা থেকে মুক্তি পাবে সে কথা ভেবে, আমি তো সুস্থ সমাজের প্রতিনিধি। এমনকি আমাকে অনেকে প্রতিভাবানও বলে। তবে কি কোথাও সুস্থ মন আর অসুস্থ মনের যে লেবেল আমরা সাঁটিয়েছি সেটা উল্টো লাগানো হয়ে গেছে? অসহিষ্ণু, সমালোচনাপ্রিয় মনই বহুলদৃষ্ট বলে তাকেই সুস্থ স্বাভাবিক নাম দিয়েছি আর অনুভূতির উথালপাথাল বন্যায় ক্রমাগত ডুবতে থাকা, ভাসতে থাকা মনগুলোকে পাগল আখ্যা দিয়েছি?

মোহময়ী ফেসবুক

এখানকার একটি বাঙালি সমিতির দুর্গোৎসবে একটি স্থানীয় অনুষ্ঠান ছিল রবীন্দ্রনাথের নারীচরিত্রদের নিয়ে। তিনখানি নৃত্যনাট্যের সেই কোলাজে স্ক্রিপ্ট লিখেছেন যিনি, কিছু লেখালেখির সূত্রে আমি তাকে চিনি। এগিয়ে গিয়ে বললাম “স্ক্রিপ্টটা খুব ভালো ছিল। স্ক্রিপ্ট লেখা তো থ্যাঙ্কলেস জব। তাই বললাম আর কি! ভালো লেগেছে।”

উনি বললেন “সবচেয়ে যাকে ভালবাসি তার কাছেই তো তারিফ পেয়েছি। আর তারিফের দরকার কি?” আমি বললাম “কার কাছে?” উনি হাসিমুখে বললেন “নিজের কাছে”। তাঁর শরীরী ভাষা বলে দিচ্ছিল তাঁর হাসিমুখ নিছক অভিনয় নয়। স্তম্ভিত হয়ে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ কি মনে হল জিগেস করলাম “আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই না?” উনি বললেন “না না। ওসব তোমাদের প্রজন্মের জিনিস ভাই”। নীরবে স্বীকার করলাম এই মানুষটা আমার থেকে উন্নত। কিছুটা ভাগ্যবানও কি?

এই ফেসবুক, এই সামাজিক মাধ্যম, এরা আমার আত্মবিপণনের চেষ্টায় জ্বালানি দেয় না আমি আত্মবিপণনের ইচ্ছা নিয়ে এই সামাজিক মাধ্যমে এসেছি ঠিক জানি না, শুধু জানি এ দুটোর মধ্যে গভীর হার্দিক সম্পর্ক আছে। আমাদের আগের প্রজন্মের সেই মানুষগুলো ভাগ্যবান যাদের এই অশুভ জোয়ারে গা ভাসাতে হয় নি। আমার বাবা দিস্তে দিস্তে লেখালেখির কাজ করেছে বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃতে। কিন্তু কৃতকার্যের প্রাপ্য সম্মান আদায়ে ভিক্ষাঝুলি হাতে বেরিয়ে পরেন নি ফেসবুকে। আমায় বেরোতে হয়। না বেরিয়ে থাকতে পারি না। হায় ফেসবুক, ধন্য তোমার মোহিনী শক্তি, সম্মোহনী সুধা।

যযাতির ঝুলি টাটকা তাজা
ইমেলে পেলে ভারি মজা

আঁতেলনগর

নচিকেতা যেমন মহারাজ যমকে প্রশ্ন করেছিল মরণের ওপারে কি সেইরুপ স্ববাবু মহারাজ যযাতিকে প্রশ্ন করলে

“এই যে দেখি উঁচু প্রাচীর তোলা আঁতেল নগর। ওর ওপারে কি মহারাজ? কেমনে প্রবেশ করব সে রাজ্যে..দু চারটে কবিতা লিখেছি, জীবনানন্দ এমনকি সমর সেনও পড়েছি কিছু কিছু..কিন্তু কোনভাবেই ও রাজ্যে এন্ট্রি ভিসা পাচ্ছি না”

মহারাজ যযাতি বললেন “শোনো বৎস..আঁতেল রাজ্যে অধিকার অত সহজ নয়..”সকলেই আঁতেল নয়, কেউ কেউ আঁতেল” কে একটা লিখেছিলেন। ঠিক মনে করতে পারছি না…যাকগে..আঁতেল রাজ্যে প্রবেশের সবচেয়ে প্রাথমিক শর্ত হল সার্কাজম। একটা সতেজ, সফেন, জ্বালাময়ী সার্কাস্টিক লাইন ভেবে যদি রোজ ক গাছি চুল না পাকিয়েছ তবে বনলতা সেন কিম্বা নীরার মত নারীরা পাখির নীড়ের মত চোখ নিয়ে তোমায় চেয়েও দেখবে না..এফবি তে সেই লাইনটা ঝেড়ে উইমেন রিডারশিপ বাড়াতে হবে। পুরুষ প্রাণিটা ব্রুট, পাতে দেওয়ার মত নয়..উইমেন ফলোয়ার চাই। বুঝলে?

প্রভু কিরূপ এই সার্কাজম?

সার্কাজম অর্থাত শাঁশালো খুলির অর্গাজম। এইটি তোমায় শিখতে হবে..হরিণের মত লঘুপদ আর অ্যাজাইল হতে হবে এই সার্কাজম। এবং পানিং থাকা ইজ অ্যাবসলিউটলি মাস্ট…

শুধু সার্কাজম হলেই হবে প্রভু?

ইয়ে না, আর কিছু শর্তাবলী আছে..যেমন ধরো যে দেওয়ালকে সক্কলে সাদা বলেছে তোমায় সেখানাকে ঝপ করে কালো বলে দিতে হবে..শুধু বললেই হবে না..ধারাল বিশ্লেষণ আর “reason” এর সিমেন্ট দিয়ে আর উইকিপিডিয়া লিঙ্ক এর ইঁট দিয়ে তোমার যুক্তি প্রাচীর খাড়া করতে হবে যেটা “beyond doubt” প্রমাণ করবে দেওয়ালটা আদতে কালো..সবাই যা বলছে সেটা বলার এই আঁতেল সমাজে একটা গাল ভারি নাম আছে.. চর্বিত চর্বণ..গরু জাতীয় প্রাণীরা এই কাজ করে থাকে। যদিও তারা মানুষের মত জানা-অজানা-অর্ধজানা সকল বিষয়ে নিজেদের মতামত দিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয় না, তবুও তাদের বুদ্ধি তেমন জোরদার নয় বলে শোনা যায়। তো এই চর্বিত চর্বণ করা নৈব নৈব চ..

প্রভু আর?

আর for God’s sake, হাজার পাতা লেফটিস্ট লিটারেচার পড়ে নিও..কিছু যদি না বোঝ, নিদেনপক্ষে ইম্পর্টান্ট টার্ম গুলো রোজ একটু ঝালিয়ে নিও..আর কিউবার ইতিহাসটা..যদি তোমার প্রলেতারিয়াত শুনে প্রহেলিকার মত লাগে, তবে আঁতেল নগর থেকে পত্রপাঠ বিদায়..আঁতেল ক্লাসরুমের বাইরে তখন তোমাকে কান ধরে নিলডাউন করে রেখে দেবে..আর হাসিটা..হাসিটার ওপর একটু কাজ করতে হবে..কিছু বোঝ বা না বোঝ একটা মোনালিসা টাইপ “knowing smile” মুখে সারাক্ষন ঝুলিয়ে রাখতে হবে..

 

এতেই হবে?

অনেকটাই হবে..”hungry generation” গাঁতিয়েছ?

আজ্ঞে ষাটের দশকের লিটারারি মুভমেন্ট যাতে..

ব্যাস ব্যাস ওতেই হবে..কোন কিছু ভাল করে না জানলেও চলবে..কিন্তু সবকিছু কিছু কিছু জানা আবশ্যক..ঐটা একটা বড় ক্রাইটিরিয়ন..আর সিগারেটটা..হ্যাঁ ঐটা হল আঁতেলদের সর্বোত্তম prop..যুক্তি সাজানোর সময় it gives you “time to breathe”..কিন্তু আজকাল এই props এর সাহায্য ছাড়াও অনেকে আঁতেল নগরে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে..যেমন চিনচুড়ার স্বর্ণবাবু..কিন্তু সে ভারি শক্ত..ঈশ্বরে বিশ্বাস কর?

হ্যাঁ প্রভু..

কেলো করেছে..ঐটি ছাড়তে হবে যে..ঝটাপট year end resolution নিয়ে নাও..quit belief in God..অত কিছু করেও কিছুতেই তুমি আঁতেল নগরের চৌকাঠ পেরোতে পারবে না ঐ একটা গর্হিত অপরাধের জন্য। তা দ্বৈত না অদ্বৈত, সাকার না নিরাকার?

আজ্ঞে প্রভু অদ্বৈত..

তাহলে হাভানা তামাকের মত কড়া, ইজিপ্সিয়ান সুন্দরীর চোখের মত চোখা যুক্তি সাজাতে পারলে exemption পেয়ে যেতেও পার..কিন্তু সাকার একেবারেই…বুঝলে কিনা।  ভালো কথা, তুমি বাপু রবি ঠাকুর পড়োটড়ো নাকি আবার?

আজ্ঞে খুব..

উঁহুহুহু। একদম নয়..আজ থেকে পুরোপুরি বন্ধ। তোমার দেখছি মস্তিস্ক প্রক্ষালন করতে হবে।

আজ্ঞে?

মানে ভুলে যেতে হবে..সব রবিঠাকুরের one-liner ভুলে যেতে হবে..ওনার মানবদেবতা মরেছে বহুদিন হল..সেক্স, ভায়োলেন্স আর উইমেন অ্যানাটমি এই তিন বিষয় ছাড়া স্ট্রিক্টলি আর কোন পোয়েট্রি পড়বে না..আর বড়জোড় আর্থিক বৈষম্য আর শাষক-শোষক টাইপ্স লেখা. রবির প্রকৃতি প্রেমে পড়েছ কি মরেছ। আতেঁল সমাজে এরও একটা গালভরা নাম আছে। পরিবর্তনবিমুখতা। আধুনিক গান, কবিতা, সিনেমা তা পর্নো হলেও তাকে স্বর্ণ অর্থাৎ সোনা মনে করে স্বাগতম করতে হবে।

এ তো ভারি গ্যাঁড়াকল…

আর কবিতা লেখো টেখো বললে না। একটা ব্যাপার মনে রাখবে, যদি লেখার পরে দ্বিতীয় বার পড়ে কোন মানে উদ্ধার করতে পারো, ব্যাস তৎক্ষণাৎ সেটাকে ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে। যদি সত্তর বার পড়েও কবিতাটির কোন মানে বোঝা না যায়, তবেই সে কবিতা প্রকৃত কাব্যনির্যাস আর কবি তবেই আতেঁল স্তরে উন্নীত হবে।

আজ্ঞে বুঝেছি। এ তো দেখছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়াও এর থেকে সোজা মহারাজ..

অনেক..আমি বলি কি ঐ চেষ্টাই করো। এই গোলমেলে প্রতিযোগিতায় যোগ দিও না..

নিজস্ব

আমাদের সকলের কিছুটা নিজস্ব সময় লাগে, একান্ত নিজস্ব অবসর – যখন আমার আমিটাকে দাঁড় করাই একটা অদৃশ্য আয়নার সামনে। প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার আঘাতে তৈরী ক্ষতগুলোর ওপর প্রলেপ দেওয়ার জন্য। পুরনো আমিকে বিনির্মাণ করে একটা নতুন আমি তৈরী করার জন্য। একটা ছায়াঘেরা স্মৃতিবিজড়িত স্মৃতিপথ ধরে মনে মনে একা হেঁটে অনেক দূর চলে যাওয়ার জন্য। আমার এই সেলফিসর্বস্ব অস্তিত্ব থেকে ক্ষণিকের মুক্তি পাওয়ার জন্য। আবার একবার পথ চলা শুরু করার আগে পাথেয় সংগ্রহ করে নেওয়ার জন্য। জ্বালাপোড়া মনের ওপর শিউলি ঝরা ভোরের শিশির প্রলেপ লাগিয়ে নেওয়ার জন্য। আমার মধ্যে দাঁত খিচিয়ে থাকা বানর স্বত্বাটাকে কিছুটা অন্ততঃ প্রচ্ছন্ন করে দিয়ে মানবিক আমাকে পুনরাবিষ্কার করার জন্য। আমাকে ছাপিয়ে ওঠা আমার অহংটাকে ঠুকে ঠুকে আমার বডি ফ্রেমের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলার জন্য। আমার এইটুকুই আত্মবিনোদন। আমার এইটুকুই আত্মরূপ দর্শন।

যখনই পথের বাঁকে এরকম একলা সময় এসে ধীরে দাঁড়ায় আমার দ্বারে, একটাই সুর শুনতে পাই। একটাই রণন।

আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া তোমার বীণা হতে আসিল নামিয়া
ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে
জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায় বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে…