ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা

“ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা” পড়লাম। শিবরামের আত্মচরিত। শিবরামের হাসির রচনাগুলির কথা সকলেই জানে। পড়েছেন আপনিও। আমিও। কিন্তু এ একেবারে অন্যরকম। এই আত্মজীবনীটিতে হাসির উপদান থাকলেও এমন গভীর তত্ত্বকথা আছে যে পড়লে যারপরনাই বিস্মিত হতে হয় যে এ কি সেই একই লোকের কলম থেকে নিঃসৃত হয়েছে? আমার সেই বালক বয়সে আমার দাদু বলেছিল এই বইটির কথা। কি আশ্চর্য দেখুন চল্লিশটা বসন্ত পার করে সেই বইয়ের ধার আমায় ধারতে হল। পড়লাম এসে এতদিনে এক দাদার রেকমেন্ডেশানে। দেবাশিসদা। এ বইতে শিবরামের জ্ঞান ও বুদ্ধিচ্ছটাতে প্রতিটা বাক ও বাক্যাংশ যেন হীরক খণ্ডের মত ঝলমল করছে। এমনই তার লেখনীর মধু যে মধুমক্ষীর মত তাতে মজে রইলাম। এমন বর্ণনা যে এক বর্ণ না পড়ে থাকতে পারলাম না। সাড়ে চারশো পাতার পথ সাড়ে চারদিনে ধুলো উড়িয়ে গেলাম। ধূলিবিজড়িত অবস্থায় শেষ পাতা অব্দি পড়ে তবে পরিত্রাণ। নিজেরই গল্প এত সরস করে বলা যায়, নিজেকেই একটি মহাকাব্যের প্রোটাগনিস্ট করে এমন ধারা দাঁড় করানো যায়, এ বই পড়ার আগে তা শুধু একবারই দেখেছি। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতকে। সেটিও তাঁর আত্মচরিত।

মহাস্থবির জাতক বইটির সঙ্গে আমার পরিচয় কিছু নাটকীয়। আসল কথায় আসার আগে সেইটি বলে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। বইটার নাম আমি কোনোদিন শুনি নি আগে। কেমন করে যে এমন একটা বহুলচর্চিত বই আমাকে রীডার করে নি, আমার রাডার এড়িয়ে ছিল বহুদিন, তা জানি না। কয়েক বছর আগের কথা। একদিন কলেজ স্ট্রীটে একটি বইয়ের দোকানে ঢুকেছি দু একটি বই সংগ্রহ করতে। বইয়ের তাক থেকে একটু চোখ সরাতে দেখি কোন ফাঁকে পাশে ঝলমল করছে এক ছিমছাম সুন্দরী। সেই রমণীয় রমণী কোন বই সংগ্রহ করেন বইয়ের আড়তে দাঁড়িয়ে আড়চোখে তাই দেখতে থাকি। রূপই তো তছরুপ করি আমরা বইয়ের পাতায়। সে রূপ যদি অমনি এসে পাশে দাঁড়ায় তবে বই খোঁজা কিছুক্ষণ বন্ধ রাখা যায় বই কি! তো তিনি কিনলেন একটি এক মণ ওজনের বই। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতক। আমি তখন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। যেমন ধীরে তিনি এসেছিলেন তেমনই ভিড়ে মিলিয়ে গেলেন। আমায় কিছু অধীর করে হয়তো। তো দোকানদার জিগ্যেস করল, আপনার কোন বইটা চাই যেন। কোনটা চাই তখন কি ছাই মনে পড়ে! বললাম ওই। ওই মানে কোনটা? মানে ওই। মানে উনি। মানে উনি যেটা কিনলেন। বইটা হাতে পেলাম এভাবেই। হাজার পাতার বই। সে বই পড়ে আতর্থীবাবুর  জীবনের সিনেমার অলীক কল্পলোকে যখন বিচরণ করেছি, তখন মনে মনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছি সেই ক্ষণিকাকে। 

কিন্তু কথা হচ্ছিল “ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা” নিয়ে। মহাস্থবির জাতকের জাত আর “ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা”-র জাত এক হলেও মানুষ দুটো জাতে এক নয়। প্রেমাঙ্কুর অঙ্কুর বেলা থেকেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন শহর থেকে শহরে। আর শিবরাম জাত ঘরকুনো। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস না করে পাশ কাটিয়ে সেই যে কলকাতার একটি মেসবাড়িতে এসে ঢুকেছিলেন ওখান থেকেই গেছেন অনন্তের পথে। তবু সেই ঘরকুনো জীবনও যে এমন একঘর হতে পারে তা শুধু পড়লে বোঝা যাবে। আনন্দবাজার পত্রিকা বিক্রি করে এবং অর্জিত সামান্য টাকায় আনন্দ করে ম্যাটিনি শোয়ে আর নাইট শোয়ে শয়ে শয়ে ছবি দেখে আর রাবড়ি খেয়ে যে জীবনের শুরু সেই জীবনেরই উত্তরণ সেই আনন্দবাজারেরই কলাম রাইটার হিসেবে যার হকারই তিনি করতেন। মাঝখানে ইংরেজ সরকারের হাতে দেশদ্রোহের নামে জেলে যাওয়া, দেশবন্ধুর ইচ্ছায় আত্মশক্তি কাগজের সম্পাদনা আর সুভাষচন্দ্রের হাতে চাকরি নট, বিধানাবাবুর কাছে রোগের অজুহাত নিয়ে চাকরির একটা রেফারেন্স পেতে যাওয়া কত যে মজার ঘটনা সে বলার মত না। এক চোর তাঁর ঘরে এসে এক ফোঁটা কিছু চুরি করার জিনিস না পেয়ে দশটা টাকা রেখে গেল। সঙ্গে চিঠি। “তুমি ভাই লেখো টেখো দেখছি। কিন্তু খেতে পাও না মনে হয়। তাই এই টাকা কটা দিয়ে ধুপ কিনে এনে বেচো। অন্নসংস্থান হবে।” সব ঘটনা মজার হয়তো না যেমন জীবনের প্রারম্ভে দিনের পর দিন ফুটপাথে শোয়া আর দিনের পর দিন উপবাসের জঠর জ্বালায় ভোগা খুব মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা নয়, কিন্তু বলার গুনে বা বৈগুণ্যে তা এত রসসিঞ্চিত হয়েছে যে জামবাটি ধরে ধরে খাওয়া যায় সে রস। তবে এ লেখার অবতারণা পাঠ প্রতিক্রিয়া নয়, বলা যেতে পারে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। 

প্রথমটি হল, দুটো আত্মচরিত দেখেই একটা জিনিস মনে হচ্ছিল সেই কথাখানাই লিখি। প্রেমাঙ্কুর শিবরাম দুজনেই বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে তবে দুজনেই বাউন্ডুলে। আর সেই বাউন্ডুলেপনাই তাদের বাউন্ডারি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক। যে কথাটি দুজনেই লেখেন নি, কিন্তু লেখার মধ্য দিয়ে ফল্গুর মত প্রবাহিত সেটা হল, স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় পরধর্মো ভয়াবহঃ। সত্যিই তাই। মানে অন্যের ধর্মের প্রতিপালন করার থেকে নিজের ধর্মে মরা ভাল। এ ধর্ম হিন্দু কি ইসলাম নয়। এ ধর্ম স্বধর্ম। ধৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন ধর্ম মানে যা আমাদের ধারণ করে। শিবরামের অনুকরণে বলতে গেলে বলতে হয় ধর্ম মানে যা ধারণ করে মানে ধার অন করে আমাদের ধারালো করে দেয়। শিবরামের আত্মচরিতে দেখি একটা অংশে ভদ্রলোকের বহুদিন অন্নসংস্থান নেই। মল্লিকবাড়ির লঙ্গর খানায় ভিখিরিদের সঙ্গে খেয়ে জীবনধারণ। এমন সময়ে কেউ একজন তাকে একটি বিজ্ঞাপন লিখিয়ের চাকরি দিচ্ছে। মাস মাইনে খারাপ না। শিবরাম বাড়ি বয়ে সে চাকরি প্রেমেন মিত্তিরকে দিয়ে এলো। প্রেমেন জিগেস করছে, তুমি তো খেতে পাচ্ছ না। করো না কিছুদিন চাকরিটা। শিবরাম বলছেন, না ভাই, আমি দশটা পাঁচটা চাকরি করতে পারব না। এক পেটের অধীন হয়ে নিজের বাকি সব স্বাধীনতা খোয়াতে পারব না। চিন্তার এই স্বচ্ছতা, clarity of thought ছিল বলেই শিবরাম খেতে না পেয়েও বেঁচে গেলেন। মানে শুধু জীবনকালে বাঁচলেন না। মরার পরে বেঁচে রইলেন আপামর বাঙালির জনমানসে। যে কাজে তাঁর মন লাগে না, শত মন্দার দিনেও তেমন কাজে তাঁকে কলুর বলদের মত জুড়ে দিতে পারে নি সমাজের জাঁতাকল।

অনেক লেখকেরই জীবনে এরকম সংগ্রাম দেখা যায়। প্রকাশকরা তাঁর সাহিত্যশ্রমের দাম দেবে না, অন্য লেখকেরা গুঁতো দেবেন, লেখক খেতে পাবেন না ইত্যাদি। আজকে যখন ফেসবুকে অনেক সখের লেখককে দুঃখ করতে দেখি আমার লেখা কেউ পড়ে না, আমায় কেউ লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিল না ইত্যাদি তখন মনে হয় বলি, আপনি আপনার জীবনের পান থেকে চুন খসালেন না, সংগ্রাম দূর অস্ত এক গ্রামও ত্যাগ স্বীকার করলেন না, অথচ অমরত্বের খাতায় নাম লেখানোর প্রত্যাশী তা কি হয়? আপনি স্ট্রাগল করবেন না, স্মাগল করে যশ খ্যাতি নিয়ে যাবেন পাঠককুল তেমন ছাগল নয়।     

আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি লক্ষ্য করলাম সেটা আতর্থীর ব্যাপারেও লক্ষ্য করেছিলাম। কথাটা কিছুদিন আগে চন্দ্রিলও বলেছিল মনে হয়। বাঙালি এক সময় একটু আলগোছে বাঁচতে জানত। মানে প্রথাগতভাবে পড়াশুনো, চাকরি, বিবাহ সন্তানাদি করা ছাড়াও আরও একটি অল্টারনেটিভ পথ খোলা ছিল আগেকার দিনে বাংলায় (অন্যান্য প্রদেশ বা দেশের খবর জানি না)। ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী হয়েও তখনকার দিনে কেউ কেউ সেই পথে হাঁটত। মানে পরীক্ষায় কিছুতেই পাশ হবে না জেনে যারা স্কুল পালায় সেই ধারার নয়, বরং কলেজের প্রথম দ্বিতীয় পদাধীকারীদের কলিজায় ব্যাথা হলে পারে এরকম ধরণের প্রতিভাশালী কিছু লোকও প্রথাগত শিক্ষার ধার না ধেরে, মানে বাংলায় বলে নিজেকে ধেড়িয়ে দিয়ে বসেছিলেন। তাদেরই কেউ কেউ হয়তো অমরাবতীর পথে যাত্রা করার পরেও জনমানসে অমর হয়ে রয়ে গেছেন । আজকের দিনে সেই সম্ভাবনা কোথায়? রবীন্দ্রনাথকেই দেখুন। প্রপার স্কুলিং হলে তাঁর প্রতিভার এমন স্ফুরণ হত কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অলীক অসম্ভবের সব সম্ভাবনা নিকেশ করে দেওয়ার নাম এডুকেশান। পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন সব নিউক্লিয়াসকে বৃত্তাকারে ঘুরছে ঠিকই। ওরা আমার আপনার মত কলুর বলদ। কিন্তু থাকে কিছু ফ্রী আয়ন। তারাই বিদ্যুৎ পরিবহন করে। এই শিবরাম চক্কোত্তির মত মানুষগুলো তখন ছিল এইরকম ফ্রী আয়ন। কেউ ধরে বেঁধে ধরাবাঁধার গণ্ডীতে আনতে পারে নি। তাই ইনি নিজের সম্পূর্ণ আত্মশক্তিটা দিতে পেরেছেন ভাষার একটু সম্পূর্ণ নতুন ধারার প্রণয়ন করতে। কিন্তু আজকের দিনে সম্ভাবনাময় কোন ছাত্র স্কুল কি কলেজ পালিয়ে ভ্যাগাবন্ড হয়ে যাচ্ছে তার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। প্রায় শূন্যই হয়তো। তাই সাহিত্য কি শিল্পেও সম্পূর্ণ একটা গোলামাল কিছু হওয়ার চান্সও ওই গোল্লা।

যাই হোক মহাস্থবির জাতক আর ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালবাসা পড়ে ফেলুন। এমন কাহিনি, জীবন নিয়ে এমন ছিনিমনি, এমনটা আর পাবেন না। পড়তে ল্যাদ লাগে জানি, কিন্তু পড়তে আরম্ভ করলে গল্পের মধ্যে এমন লেদিয়ে যাবেন যে কখন শেষ পাতায় পৌঁছবেন বুঝতেই পারবেন না।  

ইরাবতীতে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধ

গল্প কিভাবে লেখা হয়, ভাল গল্পের বৈশিষ্ট্যই বা কি এই বিষয়ে আমার একটি প্রবন্ধ। প্রকাশিত হল ইরাবতী ওয়েবজিনে।

লঙ্কাকাণ্ড

শিকাগো সামার মানেই আউটডোর ফান। ওদের মা কোথায় বেরিয়েছে। সানাই আর তাথৈ নামক দুটি বিচিত্র জীবের দায়ভার আমার ওপর অর্পণ করে। আমি এক কাপ কফি সহযোগে আমার বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডে বসে  ল্যাপটপে একটি গল্প সাজানোর চেষ্টা করছি। আমাদের জীবনের কত গল্পই তো আখের রসের মত জীবনের ইক্ষুগাছে জমে জমে ওঠে। সেইসব দোহন করে শব্দের প্রাকারে সাজানো, গল্প মানে তো তাই।

সানাই এসে বলল, তুমি সারাক্ষণ অফিস করো। আমার সাথে খেলো না। সানাইয়ের অভিমানী স্বরে শ্রাবণ। আমি তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ বন্ধ করে বলি, চলো খেলি। সানাইয়ের খেলার স্বভূমিতে বিভিন্ন নাটক, যাত্রাপালা, চলচ্চিত্র অভিনীত হয়। তবে কিনা সে নিজেই ডিরেক্টর, স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং প্রধান চরিত্রে নিজেই অবতীর্ণ হয়। আমরা নেহাত এলেবেলে সাইড রোলে। মানে মৃত সৈনিক টাইপ আর কি! আজকের পালা রামায়ণ। তবে আগাস্টের ফুরফুরে হাওয়ায় সানাইয়ের মন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতই দক্ষিণাপন আজ। তাই আমি একটা প্রধান চরিত্র পেয়ে গেছি। শ্রীরামের ভূমিকায় আমায় কাস্ট করা হয়েছে। হনুমানের রোলটা নিজে নিয়েছে। ও সাধারণভাবে যে পরিমাণ লম্ফঝম্প করে থাকে, তাতে পবনপুত্রের রোলে ওকে খুব একটা প্রয়াস করতে হবে বলে মনে হয় না। নিজ চরিত্রগুণেই ও হনুমানের চরিত্রে মানিয়ে যাবে। মহাকাব্য রামায়ণ অভিনীত হতে হলে সীতা দরকার। আমি সানাইয়ের বোনু অর্থাৎ আমার দ্বিতীয় কন্যা তাথৈকে সীতার রোল দেওয়ার জন্য আর্জি করি। সানাই শোনামাত্র আর্জি খারিজ করে দেয়। তাথৈয়ের বয়স এখনও দুই হয় নি। সীতার মত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাথৈয়ের মত বালখিল্য স্বভাবের একজন মানুষকে কাস্ট করতে ওর ডিরেক্টর সুলভ মন কেমন যেন কু গায়। শেষমেশ সীতা হলেন সিন্ড্রারেলা। মানে সিন্ড্রারেলার পুতুল। পুতুলেরা নিজেদের স্বভাববশত হাত পা নাড়ে না বা কথা বলে না স্বেচ্ছায়। কিন্তু তার প্রক্সি তো আমাদের সানাই দিতেই পারে। বোনু নেহাত কোনো রোল না পেয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছিল, আমি ফট করে তাকে লক্ষ্মণের রোলে কাস্ট করে দিলাম। সানাই দেখলাম তাতে বিশেষ আপত্তি করলো না।

পালা এদিকে জমে উঠেছে। আদি কাণ্ড আর অযোধ্যা কাণ্ড শেষ হয়ে অরণ্য কান্ড শুরু হয়ে গেছে।  মহারাজা দশরথ পুত্রশোকে প্রাণত্যাগ করেছেন। মানে সানাইএর ভাষায় ডাই হয়ে গেছেন। রাম লক্ষ্মণ সীতা অনেক ঘুরেটুরে পঞ্চবটির আশ্রমে আস্তানা গেড়েছেন। পাঁচ পাঁচখানা বট গাছ পাওয়া দুষ্কর। তাই আমাদের ব্যাকইয়ার্ডের তিনখানা বড় ব্ল্যাক চেরী ট্রীকেই মনে মনে বটবৃক্ষ হিসেবে কল্পনা করে নিয়েছি। শূর্পণখার নাসাচ্ছেদ হয়ে গেছে। এবার তবে রাবণকে আসতে হয় মারীচকে সাথে করে। কিন্তু বাড়িতে তো মোটে তিনখানি প্রাণী। তারা মুখ্য চরিত্র রাম লক্ষ্মণ হনুমান হয়ে বসে আছে। চতুর্থ প্রাণী নেই যে রাবণের ভূমিকার নামবে। সমস্যার সমাধান করতে সানাই নিজেই ডাবল রোলে। হনুমান রাবণ হয়ে গেল চোখের নিমেষে। এই ধরণের চরিত্র বদলে মৃদু আপত্তি জানানোয় সানাই যুক্তি দিল, রাবণ হলে আমি পুষ্পক রথে করে আসতে পারব, বাবা। ব্যক্তিগত বিমান পাওয়ার লোভেই এই পার্টি বদল। সেতো আমাদের মুকুলও…না থাক।  

হরিণরূপী মারীচকে কোথায় পাওয়া যায় জিগেস করতেই সানাই বিদ্যুৎগতিতে দোতলায় চলে গিয়ে ওর খেলার ঘর থেকে একটা ইউনিকর্ন নিয়ে চলে এল। ইউনিকর্নকে হরিণ হিসেবে ভাবতে একটু বেগ পেতে হলো ঠিকই। কিন্তু নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। হরিণেরও চারটে পা। ইউনিকর্নেরও। হরিণের দুটো শিং। ইউনিকর্নের একটা। চলে যাবে। সীতারূপী পুতুল সিন্ড্রারেলার প্রক্সি সানাই রামরূপী আমাকে আদেশ দিল ইউনিকর্ন থুড়ি সোনার হরিণ ধরে আনতে। আমি তো পরম বিক্রমে অদৃশ্য ধনুক টনুক বাগিয়ে ক্রমাগত অদৃশ্য তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে সিংহগর্জন করে ছুটলাম হরিণ ধরতে (আসলে অধিকাংশ দিন আমি বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট পালায় বীস্টের চরিত্র পেয়ে থাকি। তাই হাঁউ মাউ করাটা আমার, কি যেন বলে, হ্যাঁ, ওই ম্যানারিজমে পরিণত হয়েছে)। বাগানের এক কোনায় গিয়ে মারীচের গলায় রামের স্বর নকল করে আমি এস ও এস পাঠাই – বাঁচাও বাঁচাও। সীতার আড়াল থেকে সানাই তখন লক্ষ্মণকে হাঁক দিয়েছে রামকে সাহায্য করতে যেতে। হিসেব মত লক্ষ্মণের তখন লক্ষ্মণরেখা কেটে দিয়ে রামের সন্ধানে বনে যাওয়ার কথা। কিন্তু লক্ষ্মণ অর্থাৎ তাথৈ জন্ম ইস্তক এই ধরণের যাত্রাপালায় চরিত্রের ধার মোটেই ধারে না। মার্জিত ভাষায় বললে অবাধ্য আর অপরিশীলিত ভাষায় বললে ঢ্যাঁটা, তাথৈ হল তাই। বাংলায় যাকে বলে, আপনি মর্জিকা মালিক। সে মাটিতে পড়ে থাকা গাছের ডালপালা পাতামাতা তুলে পরমানন্দে নিজের ওপরেই পুষ্পবৃষ্টি করছে। 

লক্ষ্মণের আমাকে উদ্ধার করতে আসার কোনো লক্ষণ নেই দেখে আমি স্বপ্রবৃত্ত হয়ে নিজেই ফিরে এসে দেখি রাবণরূপী সানাই সিন্ড্রারেলা সীতাকে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ঠিক উড়ছে না, একটা গাছের ডাল ধরে বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে আছে। আশু বিপদের সম্ভাবনায় আমি রাম, রাবণকে চ্যাংদোলা করে নামিয়ে দিই। রাবণ ওরফে সানাই তাতে খুব খুশি না হলেও এই টেন্সড মুহূর্তে সেই নিয়ে মাথা গরম করে না। তার আদেশে আমাকেই রাম থেকে জটায়ু হয়ে যেতে হয়। ঘেঁটে পুরো ঘ হয়ে গেছি। কে রাম, কে হনুমান, কে জটায়ু, কে রাবণ , কে সীতা, কে লক্ষ্মণ কিচ্ছু ঠিক নেই। রাবণের সঙ্গে জটায়ুর এদিকে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রথমে হাতাহাতি। সানাই-এর হাতের চটাস চটাস মার খেয়ে চটকে যাই বেশ। তারপর গদাযুদ্ধ। জটায়ুকে গদাযুদ্ধ করতে হবে কেন সে প্রশ্ন করতে গিয়ে পশ্চাদ্দেশে গদাম করে গদাবাড়ি খেলাম। সানাই-এর রামায়ণ। এখানে রাম রাবণে এক ঘাটে জল খায়। যুদ্ধ করতে করতে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে রাবণ মারীচ ওরফে খেলনা ইউনিকর্নকে জটায়ুর দিকে অর্থাৎ আমার দিকে ছুঁড়ে মারে। পুরো স্পাইডার ম্যান ওয়ানের স্টাইলে ইউনিকর্নের শক্তিশেলের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বলি, সানাই, এটা হচ্ছেটা কি? লেগে যাবে না? সানাই পরম বিক্রমে জানান দেয়, সে সানাই নয় রাবণ। সে তুমি রাবণই হও আর পতিত পাবনই হও, একটা হৃষ্টপুষ্ট ইউনিকর্ন ছুঁড়ে মারবে এ কেমন অভদ্রতা।    

কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড হাল্কা করে স্কিপ মেরে সুন্দর কাণ্ডে পৌঁছে যাই। সানাই এইবার তার আসল রোলে কাস্ট হয়েছে। এক লাফে সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কায় যাবে বলে তার ভীষণ উত্তেজনা। যাকগে যাক, সে সব তো হল। ফাইনালি লঙ্কাকাণ্ড টা তো হতে হবে। যাকে বলে সিনেমার ক্লাইম্যাক্স। লক্ষ্মণকে না পেলে রাম রাবণের যুদ্ধটা নেহাত ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে ভেবে লক্ষ্মণের খোঁজে গিয়ে দেখি কেলেঙ্কারী টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। লক্ষ্মণ সারা মুখে মাটি মেখে শিব সেজে দাঁড়িয়ে আছে। মাটি ছাড়াও শুকনো পাতা, গাছের ডাল, শিকড় বাকড়, জড়িবুটি কি নেই শেই ক্ষুদ্র শরীরে?  তার ওপরে পাখিদের খাওয়ার জন্য যে জল রাখা হয়, পরিপাটি করে নিজের মাথায় ঢেলেছে। ভিজে সপসপে জামা প্যান্ট। দুটো চোখ আর খুদে দাঁতের সারি ছাড়া তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভদ্র ঘরের ভদ্র সন্তান বলে কেউ দূর কল্পনাতেও ভাববে না। লক্ষ্মণ নয় একে জাম্বুবানের রোলে কাস্ট করা উচিত ছিল। ওর মা এই অবস্থায় তাথৈকে অর্থাৎ লক্ষ্মণকে দেখতে পেলে রাম, হনুমান আর লক্ষ্মণের বনবাস তো নিশ্চিতই, স্বর্গবাস হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।   

কিছু মানুষ জন্মে ধীরে বাঁদরে পরিণত হয়। আর কিছু জন্মসূত্রেই বান্দর হয়। তাথৈ দ্বিতীয় গোত্রের। নিজের ভাগ্যকে ছাড়া কাকেই বা দুষি। এই মুহূর্তে সমস্ত অপরাধের চিহ্ন গায়েব করার তাগিদে আমি রাম, লক্ষ্মণরূপী তাথৈকে চ্যাংদোলা করে তুলি। লক্ষ্মণ এমন একটা কিছু আশা আগেই করেছিল। তাই পিতৃপ্রতিম দাদার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্ভ্রম প্রদর্শন না করে একটা ঝেড়ে লাথি কষায়। ব্যাক কিক। সে লাথি কোথায় গিয়ে লাগে বললে সম্পাদক মহাশয়/মহাশয়া নিশ্চয়ই কাঁচি করে দেবেন, তাই আর লিখলাম না। চোখে দু দন্ডের জন্য সর্ষে ফুল দেখি। লক্ষ্মণের লাথির হাত থেকে বাঁচতে ওকে পাঁজাকোলা করে ধরি। হনুমানরূপী সানাই এদিকে নেহাত অধৈর্য হয়ে জামা ধরে টানাটানি শুরু করেছে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার জন্য। দাঁড়াও সানাই, দেখছ না বোনু মাটি মেখেছে, বলাতে হনুমানরূপী সানাই তার পরমারাধ্য শ্রীরামচন্দ্রকে চড়াম করে মেরে বলে, আমি সানাই নই, হনুমান। তোমাকে যুদ্ধ করতেই হবে। এদিকে লক্ষ্মণ কোলে উঠে ইস্তক মাথা দিয়ে দুম দুম করে হেড মারছে কুশলী কুস্তিগীরের মত। মাথা তো নয় একটা ঝুনো নারকেল! ধনুকের ছিলার মত উল্টোদিকে বেঁকে গেছে আর তারস্বরে চেঁচিয়ে জানান দিচ্ছে ওর মাটি মাখায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে আমি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি। লঙ্কাকান্ড প্রায় পণ্ড হয় দেখে হনুমানও চটাচট মারছে রামকে। আক্ষরিক অর্থে লঙ্কাকান্ড বেঁধে উঠেছে, মানে মঞ্চে নয়, বাস্তবে। আমি রাম না রাবণ, জটায়ু নাকি শূর্পনখা কিচ্ছু মনে পড়ছে না। এর থেকে বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট পালা অভিনীত হলে ভাল ছিল। শেষমেষ হনুমান ওরফে সানাইকেও আর এক হাতে কোলে তুলে নিই। হনুমান ওরফে রাবণ ওরফে সানাই এবং লক্ষ্মণ ওরফে তাথৈ, দুজনকে দু কোলে নিয়ে আমি ঘরে ঢুকে সোজা বাথরুমে চলে যাই। গৃহিণী ফেরার আগে দুটোকে স্নান করিয়ে নিতে হবে। 

মাথায় খানিক জল ঢালায় সানাইয়ের মাথা ঠান্ডা হল। তবে দেখলাম রাবণবধ না হওয়ার শোকটা পুরো ভুলতে পারে নি। দুখী দুখী মুখে বলে, বলেছিলাম বোনুকে খেলায় না নিতে।

স্ট্যাটাস আপডেট

ফেসবুকে কি ধরনের স্ট্যাটাস আপডেট পাওয়া যায় তা একটু সঙ্কলিত করতে ইচ্ছা হল। স্ট্যাটাস আপডেটের বিস্তৃতি ও ব্যাপ্তি দেখলে মনে হয়, আমরা ভারতীয়রা আছি বলে বিশেষত বাঙালিরা আছি বলে জুকেন ভায়রা বেঁচে গেলেন নয়তো বেঞ্চে বসতেন টিসিএস কি ইনফোসিসের। আমরা ফেসবুককে যাকে বলে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেছি..সুখ দুখ হতাশা বিষাদ আনন্দ বিরহ ইত্যাদি সমস্ত আবেগ (এবং সকালবেলার বেগ) স্ট্যাটাস আপডেট-এর মাধ্যমে জানান দিচ্ছি নিজের দেওয়ালে। কিছু কিছু স্ট্যাটাস আপডেট নিম্নরূপ। এবং বিশ্বাস করুন আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখি বটে তবে এই সঙ্কলনের একটিও আমার কল্পনাপ্রসূত নয় যদিও সব চরিত্র কাল্পনিক। এইসব  স্ট্যাটাস দেখে আমার মত বেরসিক খটাসের কি কমেন্ট করতে ইচ্ছে হয় (কিন্তু করি না) তাও দিলাম সাথে ব্র্যাকেটে। 

জ্বরে আমার গা পুড়ে যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে আছি। 

 – (জ্বরে শরীরের নব্বই ভাগ পুড়ে যাওয়ার আগে স্ট্যাটাস আপডেটের পরিবর্তে ক্যালপল খান। কাজে দেবে )

আমাকে ফেসবুকে একটা ফেক প্রোফাইল থেকে খুব জ্বালাচ্ছে। কি করা উচিৎ? 

– (ভাও খেতে চাইলে সগর্বে সে কথা ফেসবুকে ঘোষনা করুন। কিন্তু সমাধান করতে চাইলে জেনে রাখুন ফেসবুকে যে কোন কাউকে ব্লক করা যায় )

হঠাৎ করে প্রেসার খুব বেড়ে যাওয়ায় কাল আবার একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। আপনারা প্রার্থনা করুন। 

– (সে না হয় করব কিন্তু আগেরবার যখন হাসপাতালে গেছিলেন, অসুস্থ আপনার ইঞ্জেকশান, স্যালাইন সহ একটা ছবি সাথে পোস্টিয়ে ছিলেন। এবারে ছবি তুলে দেওয়া জন্য কাউকে পান নি নাকি? এবারে সাথে ঐরকম নট-সো-প্লিজিং ছবি না পোস্টানোর জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। বিশ্বাস করুন আপনার রক্তের চাপ ফেসবুকে না চাপিয়ে দিয়ে ওষুধ খেলে বেশি কাজ হবে)

আমার ভাড়াটে ভাড়া দিচ্ছে না। উঠছেও না। কি করব? 

– (ভাড়াটেকে ঠ্যাঙান। না পারেন ফেসবুকে ব্লক করে দিন। এমনি মনস্তাপে উঠে যাবে। )

গীতার ভাল বাংলা অনুবাদ কোথায় পাওয়া যাবে? 

– (সে না হয় খুঁজব। কিন্তু সংসার, ফেসবুক, হোয়াটসাআপ ইত্যাদি সামলে সময় পাবেন পড়বার? )

আসছি খুব তাড়াতাড়ি…

– (কোথায় আসছেন? যদি আমার বাড়ি হয়, আজ বিকেলে আসবেন না..বাড়ি থাকছি না )

বন্ধুগণ আজ বিকেলে তোমাদের সাথে গান, গল্প আর অনেক আড্ডা দিতে লাইভে আসব 

– (বাহ, খুব ভাল। সাথে এক প্যাকেট তাস আনবেন। দু দান টুয়েন্টি নাইন খেলে নেব আপনার সাথে )

বিপদের সময় কোন বন্ধুকে পাশে পাওয়া যায় না। 

– (আপনার বিপদটা ঠিক কি জানিনা কিনা তবে আপনার বিপদের কারণ অপসৃত হলে জানাবেন। আপনার পোস্টের নিচে একটা “ঠিক বলেছিস” লিখে দেব)

আপনারা অনেকে যারা আমায় ক্রমাগত ম্যাসেজ করে বিরক্ত করেন, তাদের বলি আমি কারুর সাথে চ্যাট করি না। 

– (বুঝেছি, আপনি বলতে চাইছেন, দশ দিশায় আপনার রূপের খবর ছড়িয়ে পড়েছে, অনেক বাঘ সিংহ আপনার প্রেমে টুয়েন্টি থাউসান্ড মিটার আন্ডার দ্য সী হয়ে গেছে, ঈশ্বর আপনার রূপ ও অ্যাডমায়ারারের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করুন, শুধু একটা কথা ম্যাসাজ না লিখে মেসেজ লিখবেন। অন্যথায় অন্য মানে হয় )

বইগুলো ইঁদুরে কাটছে। বিষ দিয়েও কাজ হছে না। কি করা উচিৎ? 

– (বেড়াল পুষুন বা ইঁদুরগুলো ধরে ভেজে খেয়ে ফেলুন)

প্রেম একবারই এসেছিল জীবনে 

– (ভাগ্যিস)

ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল, নাহলে জানতেই পারতাম না আমায় সকলে এত ভালবাসে 

– (অঅঁ, আপনি খুব কিউট)

সুপ্রভাত 

– (আমায় বললেন?)

রাত ৩ te বাজে। ঘুম আসছে না কি করি 

– (আর যাই করুন বিছানায় হিসি করবেন না)

আমার লেখা প্রথম কবিতা বন্ধুরা। জানিও কেমন লাগলো। 

– ( আর কয়েকটা লিখে হাত পাকিয়ে পোস্টালে ভাল করতেন। প্রথম প্রেমের মতই প্রথম কবিতা যদি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকত, যদি বাজারি না হত খুব ক্ষতি হত কি?)

My phon is hacked….How to secure my phon…give me suggesion…… 

– (এক কাজ করুন। ফোনটা এক মগ জলে মিনিট দশেক ডুবিয়ে রাখুন..হ্যাকার ঘোল খেয়ে যাবে…কোনোভাবে মিস

ইউজ করতে পারবে না। আর ফোন আর সাজেসানের বানানটা একটু গুগল করে নেবেন )

আগুন ঝরা শ্রাবণ বেলায় …. 

– (এটা কি আপনার স্বরচিত কবিতার প্রথম লাইন? বাকি কবিতাটা কি কিস্তিতে লিখবেন? )

এবারের বইমেলায় আমি এই বইগুলো কিনলাম। 

– (খুব ভাল করলেন। এবার আগের বছর বইমেলায় যে বইগুলো কিনেছিলেন সেগুলো পড়ে ফেলুন )

এবং সবশেষে…

বন্ধুরা আমি কিছুদিনের জন্য ফেসবুক থেকে দূরে থাকব। সকলে সুস্থ থাকবেন।

– (করোনার কর্নার গোল থেকে বেঁচে নিশ্চয়ই সুস্থ থাকার চেষ্টা করব। তবে আগের বার আপনি যখন ফেসবুক থেক “দূরে” গেছিলেন, তিনদিন মতন ছিলেন। এবারে সাত দিন ট্রাই করুন। )

গুগল

স্ব বাবু মহারাজ যযাতিকে জিগেস করলেন “মহারাজ, এই যে শুনতে পাই গুগল বলে এক নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়েছে। এ দেবতার স্বরূপ সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন?”

মহারাজ যযাতি বললেন – গুগল অতি কার্যকারী দেবতা। এনার দ্বারা নিতান্ত মূর্খও মুহূর্তের মধ্যে জ্ঞানী-গুণী-বিদগ্ধ মানুষে পরিণত হতে পারে, নিদেন পক্ষে নিজেকে জ্ঞানী প্রতিপন্ন করার অভিনয় সফল ভাবে চালিয়ে যেতে পারে। মানে নিজেকে একজন বিজ্ঞ, কেউকেটা দেখানোর ইচ্ছে মাধ্যমিক ফেলেরও থাকে, নোবেলজয়ীরও থাকে। নিজেকে স্কলার দেখিয়ে কলার তোলার ইচ্ছে কার না থাকে বলুন? এই দেবতা আসার আগে এই জ্ঞান সংগ্রহের ব্যাপারটায় ছিল গোড়ায় গলদ। ঠিকমত জানতে হলে লাইব্রেরীতে যাও রে, মোটা মোটা বোরিং বোরিং বই ঘাঁটো রে, এক বইতে না পেলে আবার অন্য বই – যত্তসব গা পিত্তির জালানো ফালতু ঝামেলা। গুগল দেবতার কৃপায় সে বালাই নেই আর। গুগল দেবতাকে পেন্নাম করে একটা প্রশ্ন ঠুকে দিলেই হল। হাতেনাতে উত্তর। ঠিক কতো বছর আগে পৃথিবীর বুকে নিয়ান্ডারথ্যালরা চরে বেড়াত, ডাইনোসরেরা ঘরে ঘরে ডেঙ্গু জ্বরে মারা পড়েছিল না পেটের রোগে, পৃথিবী থেকে প্রতিবেশী নক্ষত্র আলফা সেন্টাউরির দূরত্ব ঠিক কতো কিমি এরকম নানান বিষয়ে ইনস্ট্যান্ট নুডল-এর মত ইনস্ট্যান্ট জ্ঞান সঞ্চয় করতে এবং সেই সংগৃহীত জ্ঞানাদি টুকুস করে কথায় কথায় কায়দা করে ঝেড়ে দিয়ে মোনালিসা হাসি হাসার জন্য গুগল দেবতার সাহায্য অপরিহার্য।

রবীন্দ্রনাথের পদবীটা কি ঠিক মনে পড়ছে না, কোই বাত নেহি, গুগল করে নাও। “মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন” না মন্দাক্রান্তা সেন নাকি তান সেন সেটা নিয়ে একটু ধন্দে পড়েছ, গুগল দেবতা আছে তোমার পরিত্রাণে। প্রোগ্রামিং করার চাকরিতে কলুর বলদের মত জুড়ে পড়েছ অথচ পড়েছিলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং যাতে প্রোগ্রামিং বাদে আর সব কিছু শিখিয়েছে, কিম্বা হয়তো কম্পিউটার নিয়ে পড়েছ কিন্তু কলেজে থাকাকালীন বাপের পয়সায় কেনা কম্পিউটারে বাজে কাজ ছাড়া আর তেমন সদব্যবহার করো নি, প্রোগ্রামিং-এ যাকে বলে ক-অক্ষর-গোমাংস, লিঙ্কড লিস্ট সর্ট করতে হলে প্যান্টে পেচ্ছাপ করে ফেলার মত দুরবস্থা, কোন চিন্তা না করে গুগল দেবতাকে স্মরণ করে ফেলো। মুহূর্তের মধ্যে উত্তর। জাভায় চাও জাভায়, পাইথন, অজগর, লুয়া যে ভাষায় চাও লিখে দেবে কোডটা। তারপর ধরো বাঙালি মাত্রেরই একটু কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে না মাঝে মাঝে? কিন্তু কথা খুঁজে পাচ্ছ না। অর্থাৎ কিনা কবি কবি ভাব ভাবের অভাব। সামান্য একটু গুগল করলেই কবিতার যাকে বলে একেবারে কুম্ভ মেলা। পঙ্গপালের মত ঝাঁকে ঝাঁকে কবিতা তোমাকে ছেঁকে ধরবে। সেখান থেকে চেনা কবিদের কিছু অচেনা শব্দ আর অচেনা কবিদের চেনা-যায়-না-এমন শব্দ অর্থাৎ অতি দুর্বোধ্য কিছু শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে নিলেই কেল্লা ফতে। দাঁড়িয়ে গেল তোমার স্বরচিত কিম্বা স্বচয়িত কবিতা (চয়ন থেকে চয়িত কথাটা হয় কিনা গুগল করে একটু দেখে নিও)। এবারে কবিতা খানা ফেসবুকে ঝেড়ে দিয়ে ইচ্ছেমত হাততালি কুড়োও। কবিতাটার কিছু মানে থাকলে সামান্য হাততালি পড়বে, আর না থাকলে সেটা একেবারে “avant-garde” – complete class apart. একেবারে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে।

মহারাজ, এই দেবতার অনুগ্রহ লাভের উপায় কি?

খুবই সহজ। শিব কালি দুর্গা ইত্যাদি মেইনস্ট্রীম দেবতাদের কলিযুগে অনেক ডেকেও তেমন সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। পুরাণ মতে জানা যায় নারায়ণ কারণ সলিলে যোগ নিদ্রায় নিদ্রিত থাকেন অর্থাৎ কিনা ঘুমোন। গুগল দেবতা একেবারে জাগ্রত। পূজার উপাচার শুধু তোমার মোবাইলে একটা আন্তর্জাল কানেকশান। কোনো পার্টিতে কোন্‌ টপিকে কথা হচ্ছে সেটা আড়ি পেতে শুনে নিয়ে আন্তর্জালের সহায়তায় গুগল দেবতাকে ডেকে ফেলো। এক ডাকেই তিনি প্রদীপের দৈত্যের মত হাজির। টপিকটা চুপিসারে টাইপ করে দিয়ে দু এক পৃষ্ঠা পড়ে নিলেই একেবারে সরস্বতীর বরপুত্রের মত খেলার মাঠে নেমে পড়তে পারবে। পিঁপড়ে নিজের ওজনের ঠিক কত গুণ ওজনের খাবারের টুকরো বইতে পারে, অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়ার জীবাণু শুঁড়ে বহন করে না ঠ্যাঙে ইত্যাদি তাক লাগানো তথ্য দিয়ে আলোচনারত সমস্ত সুধীবৃন্দকে স্তম্ভিত করে দাও। তথ্যের সত্যতা নিয়ে মাথা ঘামানোর অবশ্য কোন দরকার নেই কারণ আন্তর্জালের তথ্যের মহার্ণব থেকে তথ্যের সত্য মিথ্যা যাচাই করা বোধ করি দেবগণেরও অসাধ্য।

মহারাজ এই দেবতার পূজা-আচ্চার পদ্ধতি কি? কোন উপাচারে এই দেবতা তুষ্ট?

ইনি অতি অল্পে তুষ্ট। এনাকে পুজো করার দুটি উপায় শাস্ত্রে বিধৃত আছে। এক উপায়ের কথা আগেই বলেছি। মাঝে মাঝে ওনাকে স্মরণ করে কিছু প্রশ্ন করলেই উনি খুশি হন। উত্তর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার প্রশ্নটি বিভিন্ন ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ অ্যাড এজেন্সীর কাছে পাঠিয়ে দেন যারা তোমাদের সেবায় সদাই নিমগ্ন। ধরো তুমি কৌতূহল বশত সিঙ্গাপুরের হোটেলের খোঁজ করতে গুগল দেবতার অনুগ্রহ প্রার্থনা করেছ। তুমি যে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার মতলব ভাঁজছ, এই খবরটা দেবতা সকল ট্রাভেল এজেন্টের কাছে অনুগ্রহ করে পাঠিয়ে দেবেন। তারা ক্রমাগত “সস্তা ডীল” ইমেল মারফত পাঠিয়ে তোমাকে “সাহায্য” করার চেষ্টা করবে, তোমার জীবন “সুখে শান্তিতে” ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করবে। কিম্বা ধরো তুমি লাক্ষা দ্বীপ থেকে লাক্ষা কিনে এনে বাংলায় চড়া দড়ে বিক্কিরি করে লাখ লাখ টাকা লাভ করতে চেয়ে যদি গুগল দেবতার কৃপা প্রার্থনা করে থাকো, তাহলে তোমার ব্যাবসায়িক সাফল্যকে সুনিশ্চিত করতে গুগলদেব সেই তথ্যটা বিভিন্ন ব্যাঙ্কের কাছে পৌঁছে দেবেন। তারা তোমাকে ঋণী করার জন্য তোমার ঘরের দরজার সামনে ধর্ণা দেবে। এই উপায়ে দেব-অর্চনাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রতি নিয়ত অর্বুদ কোটি লোক এই উপায়েই দেবতাকে প্রসন্ন করছে। এই প্রশ্ন গুলোর দ্বারাই দেবতা জানেন তোমার সমস্ত পছন্দ অপছন্দ, তুমি দিনে কবার পটি করো, চাইনিজ খেতে ভালবাস না ইথিয়োপিয়ান, নেক্সট পুজোর ছুটিতে সমুদ্রে যেতে চাও না পাহাড়ে? Buy one, get one free -এর মত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার সাথে সাথে তোমার এই চাওয়াপাওয়া গুলোর সামঞ্জস্য বিধানে উপযুক্ত এজেন্টও ধরে দিচ্ছেন অযাচিত ভাবে। একেই বৈষ্ণব ধর্ম মতে বলে “অহৈতুকি কৃপা”।

আর এক ভাবে দেবতার পুজো করা যায়, তা হল তোমার কন্টেন্ট দিয়ে। তুমি অর্থনীতির সমস্ত বই গুটিপোকার মত কেটে ফেলেছ, ডিমানিটাইজেশানে দেশের উন্নতি না অবনতি সে ব্যাপারে তুমি অথরিটি, জনশিক্ষার্থে একটা আর্টিকল লিখে ফেলো এবং সেটি গুগল দেবতার হাতে সঁপে দাও। গুগল তোমার লেখা গুলে খেয়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে এবং অন্য কেউ সেই নিয়ে প্রশ্ন করলে তোমার আর্টিকলটা তাকে উত্তর স্বরূপ ঝেড়ে দেবে। তারপর ধরো তুমি এমন মাথায় মাখার তেল বানিয়েছে যা মাখলে দশাননের দশ মাথা জোড়া সুপ্রশস্ত টাক ঠিক আড়াই দিনেই চুলের মহারণ্যে পরিণত হবে, কিম্বা এমন একটা ফেয়ারনেস ক্রিম বানিয়েছে, যেটা মাখলে “অন্ধকার মানুষ” রাও “খাঁটি আর্য” দের মত ফরসা হয়ে উঠবে ঠিক সাড়ে সাত ঘণ্টায়, গুগলের কাছে তোমার প্রোডাক্ট পোর্টফোলিওটা ভরসা করে দাও। দেখবে বর্ষার জলের মত তোমার প্রোডাক্ট হই হই করে বিকোচ্ছে। এইভাবে যারা গুগল দেবকে নিজের কন্টেন্ট দিয়ে পূজা করে থাকেন তারা প্রায়শই দেবতার কৃপায় লক্ষ্মী লাভ করে কন্টেন্ট হন অর্থাৎ কিনা পরিতৃপ্ত হন। দেবতার এইসব অনুচরেরা নিজেদের কন্টেন্ট ফীড করে দেবতার জ্ঞানের পরিধি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। তবে শিবের যেমন সহস্র সহস্র ভুত প্রেত অনুচর থাকা স্বত্বেও নন্দী আর ভৃঙ্গি সবচেয়ে বেশি কৃপাধন্য, তেমনি এই অনুচরদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে কৃপাধন্য যাদের কন্টেন্টের অনেক “ব্যাকলিঙ্ক” (backlink) আছে। অর্থাৎ তোমার পাতা থেকে হুবহু ঝেড়ে দিয়ে তোমার পাতাটির লিঙ্ক রেফারেন্স স্বরূপ নিজের পাতায় পেশ করে থাকে যদি কেউ, তাহলে তুমি লাভ করলে একটি ব্যাকলিঙ্ক। যত ব্যাকলিঙ্ক উপার্জন ততই দেবতার কৃপাদৃষ্টিতে আসার সম্ভাবনা। প্রভূত পরিমাণ ব্যাকলিঙ্কের দ্বারা দেবতার মনোরঞ্জন করতে পারলে চাই কি অন্যদেরকে প্রশ্নের প্রথম উত্তর হিসেবে গুগল দেবতা তোমার পাতাটা ধরে দিতে পারেন। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি জিজ্ঞাসু মানুষ তখন তোমার পাতায়, তোমার কন্টেন্টে চোখ বোলাচ্ছে। তোমার এই জনপ্রিয়তা নজর এড়াবে না বিভিন্ন সংগঠনের যারা এই জনতা জনার্দনের সাহায্যে সদা তৎপর। তারা তোমাকে কিছু নজরানা দিয়ে তোমার পাতায় নিজেদের প্রোডাক্টের উৎকর্ষতা সগর্বে ঘোষণা করবে। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর অর্চনাও হল জিজ্ঞাসু জনের, সাথে তোমার হল ধনলক্ষ্মীলাভ।

এখন তুমি যদি যথেষ্ট পরিমাণ ব্যাকলিঙ্ক সংগ্রহ করতে না পারো তারও বন্দোবস্ত আছে। শান্তি স্বস্ত্যয়ন করতে হবে। পদ্মলোচন রাম যেমন একটি পদ্মের অভাবে নিজের পদ্ম আঁখিটি ধরে দিতে চেয়ে দেবীর প্রসন্নতা লাভ করেন, তেমনি ব্যাকলিঙ্কের অভাব তুমি মেটাতে পারো প্রাচিত্তির স্বরূপ গুগলে দেবতাকে কিছু টাকা কি ডলার ধরে দিয়ে। পুজোর সময় ফল-মিষ্টি দিয়ে দেবতার আশীর্বাদ প্রার্থনা করার সময় যেমন নাম, গোত্র, নক্ষত্র বলতে হয়, ঠিক সেরকমই ঠিক কোন্‌ প্রশ্নের উত্তরে তোমার পাতাটি দেখাতে হবে সেটা দেবতাকে বলে কিছু মূল্য ধরে দিলেই হাতে হাতে ফল। একে বলে গুগলে অ্যাড। একদম গুগল সার্চ রেজাল্টের প্রথম পাতায় প্রথম লিঙ্ক হিসেবে তোমার স্থিতি। ফলাফল একই। তোমার প্রোডাক্ট বা কন্টেন্ট হু হু করে বিকোবে।

আহা। দেবতার কি মহিমা! মহারাজ এই দেবতার প্রণাম মন্ত্রটা যদি একটু বলেন।

লিখে নাও –
দেহী দেহী, জ্ঞানং দেহী, স্থানং দেহী প্রথম পাতায়
ধনং দেহী, ব্যালেন্স দেহী, আমার ব্যাঙ্কের খাতায়।।
নমঃ শ্রী গুগলায় নমঃ

সানাইয়ের সানাই

সানাই রাত্রি সারে এগারটার সময় ডাক ছেড়ে সানাই ধরলো। মটকা এতে কার না সটকে যায় বলুন? কি না তার মাম্মা তার সাথে কথা বলবে না বলেছে! মাম্মার কথাটা যে গুরুতর অনৃত বাচন, মানে বাংলায় বললে নেহাত বাজে হুমকি, সে কথা বোঝানোর ব্যাপারে যত্নশীল হয়ে ব্যর্থ হলাম। মানে কোন মা আর মেয়ের সাথে কথা না বলে…তাও বিশেষতঃ কন্যা যখন জামাই সহকারে বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে বলে নি যে, “কালীঘাটে আড়াইশ টাকা প্যাকেজে বিয়েটা সেরে এসেছি, এই তোমার জামাই, একে আশীর্বাদ করো।” আমার কন্যাটি নেহাত অর্বাচীন, মাত্র পাঁচখানি বসন্ত পার করেছে। ঘটার মধ্যে ঘটেছে, ওয়েল যারা সানাই নামক বিচিত্র প্রাণীকে জানেন তারা অনুমান করে নিয়েই থাকবেন, যে তিনি নৈশাহার বা বাংলায় যাকে বলে ডিনার সেটি যথেষ্ট পরিমাণে আত্মস্থ করতে অরাজী হয়েছেন। খাদ্যরসিকের বিপরীত শব্দ যদি খাদ্য-বেরসিক হয়, তবে সানাইকে খাদ্য বেরসিক বললে শব্দটির ওপর যথেষ্ট দায়ভার অর্পণ করতে হয়। কারণ যে কোনো খাবারের প্রতি সানাইয়ের যেটা আছে সেটা হল অবিমিশ্র ঘৃণা (শুধু ক্যান্ডি, চকলেট এবং বেরী বাদ দিয়ে)। পলান্ন অর্থাৎ কিনা পোলাও-এর মত উপাদেয় খাদ্য যা আমি “লাও লাও” করে কেজি দুয়েক সাবড়ে দিলাম এবং সর্বোপরি যা কিনা আমার এগার বছরের সাত পাকে বাঁধা বৌ নিজ হস্তে পাকিয়েছেন সেটা যখন সর্বসাকুল্যে তিন গ্রাস খেয়ে সানাই স্বমূর্তি ধারণ করল, অর্থাৎ কিনা পরের গ্রাস মুখে নিয়ে দাঁতের চারপাশে মাজনের মত জড়ো করে রেখে দিল এবং শত অনুরোধ, উপরোধ, অনুনয়, বিনয়, উপদেশ, আদেশেও দাঁত নামক হামান-দিস্তাটাকে চালানো থেকে বিরত থাকল, তখন যে মেজাজের চড়াই উতরাই হয় সেটা বাবা মা মাত্রই জানেন। তবে তার দুই বৎসর বয়সী সহোদরার দেখলাম বেশ সহৃদয় পরান। গালে টোবলা করে খাবার নিয়ে ঘুরছে আর মাঝে মাঝে এসে তার ক্রন্দনরতা দিদিকে তার খুদে খুদে হাত দিয়ে আদর জাতীয় কিছু একটা করে যাচ্ছে। নিষ্ঠুর প্রাণ বাবা ও মায়ের কাছে খাওয়ানোর নামে বিজাতীয় যন্ত্রণা পেয়ে সানাই মনোযোগ সহকারে বোনের আদর গ্রহণ করছে এবং সেই সুযোগে বোনুর সাথে একটু খেলেও নিচ্ছে। কিন্তু বোনু ব্যস্ত মানুষ। তাকে বিবিধ কার্য সমাধা করতে হয় যেমন দেওয়ালে রঙ পেন্সিল দিয়ে শিল্প কর্ম করা, সোফার ওপর থেকে টারজান স্টাইলে ঝাঁপানো, বাবার চটি জুতো মহারাজ ভরতের স্টাইলে মাথায় করে ঘুরে বেরানো ইত্যাদি। কর্ম না বলে সেগুলোকে অপকর্ম বলাই ভাল কিন্তু বাসুদেব বলে গেছেন শুধু কর্মতেই আমাদের অধিকার, ফলে নয়। ফলে ফলেই বোনু কর্ম করে যায় ফলের চিন্তা না করে। তাই তার দিদিকে সান্ত্বনা দান সাময়িক। সে নিজকার্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই সানাই আবার ডুকরে কেঁদে উঠছে। আমি নেহাত হৃদয়হীনের মতই বলে ফেলি সানাই আইদার কাঁদো, নয় খেলো, দুটো একসাথে কোরো না। শুনে সানাইয়ের কান্নার লয় এবং তান দুই দ্বিগুণ হল।

সানাই খেতে কেন চায় না, ক্যাটরিনা কি করিনার মত ছিপকলি থাকার অভিপ্রায়ে না বাবা মাকে পেরেন্টিং-এ ব্যর্থতার দোষিমন্যতার নরককুণ্ডে নিক্ষেপ করতে তা জানি না কিন্তু সানাইয়ের সানাইয়ের বিস্তারে কানে তালা লাগার জোগার। এমন কি অমন সহৃদয় সহোদরাটিও সান্ত্বনা জানাতে কাছে ঘেঁষছে না আর। দুই সন্তানের পিতৃপদ লাভ করার পর থেকেই আমি ব্রহ্মপদ লাভ করে গেছি অর্থাৎ কিনা নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত হয়ে গেছি। তবে কিনা বুদ্ধদেবকে তো সংসার করতে হয় নি, তাই এমন কাকচিল তাড়ানো চিৎকারে তার ধৈর্যচ্যুতি যে ঘটতই না, এমনটা হলফ করে বলা যায় না। আমি সানাইকে বলি সানাই কাঁদতে হলে গ্যারেজে গিয়ে কাঁদো। এও নেহাত হুমকি। আমি পাষণ্ড ঠিকই তবে এতটাও নই যে আমার ধনাত্মক পাঁচের বাচ্চাকে ঋণাত্মক বারোতে গ্যারেজে ছেড়ে আসব। কিন্তু এই নেহাত হুমকিতেও হিটে বিপরীত হল। আজ্ঞে না, ওটা টাইপো নয়, আমি হিতে বিপরীত নয়, হিটে বিপরীতই লিখেছি। সানাই এসে আমায় গুমগাম দু ঘা হিট করে তারপর এমন শোকাকুলা হল যে মেঘনাদবধ হওয়ার পর পঞ্চসতীর-এক-সতী দেবী মন্দোদরী অত শোকাকুলা হয়েছিলেন কিনা সন্দেহ হয়। বোনু দুটো গাল টোপাকুল করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনিও দিদির পদাঙ্ক অনুসরণ করে আহার্যসামগ্রী গলাধঃকরণ করার বদলে গালের দুদিকে সঞ্চয় করে রাখতেই বেশী পছন্দ করেন। এবং সব থেকে ছোট হওয়ার ট্রাম্প কার্ড থাকায় এমন গর্হিত অপরাধ করেও খুব বেশি বকুনি খান না। তো তিনিও ত্রস্তভঙ্গিতে মাঝে মাঝে দিদির দিকে তাকাচ্ছেন কিন্তু কাছে ঘেঁষছেন না। আমি সংসার প্রতিপালন করতে কেন নেমেছি ভেবে নিজের কপালকে দুষছি, এমন সময় ওপর থেকে দেবীকণ্ঠ শ্রুত হল মানে আমার স্ত্রীয়ের গলা আর কি।

সানাই তোমায় আর খেতে হবে না, না কেঁদে মুখ ধুয়ে শুয়ে পরো, কাল সরস্বতী পুজোতে তোষানির বাড়ি যেতে হবে।

দেবী হংসবাহিনী বেদজ্ঞা এবং পরমার্থলাভে সহায়িকা জানা ছিল কিন্তু তিনি যে এমন সংসারে শান্তিবিধানকারী তা জানা ছিল না। সরস্বতী পুজোয় যাওয়া হবে (এবং খেতে হবে না) শুনেই শোকাকুলা সানাই চোখ টোক মুছে বলয়ে ফেললে, ইয়েয়ে সরস্বতী পুজো। যে অকল্পনীয় দ্রুততায় চোখের তরল বাষ্পীভূত হয়ে গেল, কান্নার ভুত যেভাবে ভুতপূর্ব হয়ে গেল, যেভাবে শ্রাবণের মেঘ সরে গিয়ে চোখে রোদ্দুর ফুটল, তাতে সেই রোদনাশ্রুর অথেনটিসিটি নিয়ে যদি আমার চল্লিশ বছরের বৃদ্ধ মনে সংশয় জেগে থাকে, তবে তার জন্য নেহাৎ আমার বার্ধক্যকেই দুষতে হবে। যাই হোক,

আমি মনে মনে বললাম,

জয় জয় দেবি চরাচর সারে
কুচজুগ শোভিত মুক্তা হরে
বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে
ভগবতী ভারতী দেবি নমস্তে।

সান্টা

বাবা, তুমি জানো, সান্টা রেড ড্রেস পরে? ভীষণ ভীষণ ভীষণ রেড..আর ব্ল্যাক শু পরে। আর ওর হোয়াইট বার্ড আছে। সানাই বলছিল।

আজ রাতে চিমনি পথে সান্টা নেমে আসবে। তার শুভ্র শ্বশ্রূ, শুভ্র কেশ। কাঁধে উপহারের প্রকাণ্ড ঝোলা আর মুখে প্রাণখোলা হো হো হাসি। আজ রাতে সান্টা ক্রিস্টমাস ট্রী-এর নীচে রেখে যাবে ক্রিস্টমাস প্রেজেন্ট। সানাই ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ে চলে যাবে ক্রিস্টমাস ট্রী-এর কাছে। লাল সাদা গিফট্ র‍্যাপারে মোড়া উপহারগুলো দেখে নিয়ে পরের এক ঘন্টা থাকবে এক্সট্রা নাইস যতক্ষণ না গিফট্ খোলা হচ্ছে। যে জিনিসটা ও মাম্মার সামনে সান্টাকে উইশ করেছিল সেটা হয়তো বা পেয়ে যাবে। হয়তো বা পাবে না। সান্টাকে তো সমস্ত কিডদের গিফট দিতে হয়। তাই সব সময় উইশ মতন গিফট দিয়ে উঠতে পারে না। উইশ অনুযায়ী গিফট পাওয়া বা না পাওয়ার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে চোখ। গিফট্ খোলা হয়ে গেলে উৎসাহে দু চারবার লাফিয়ে নেবে সানাই। চিনি ঢালা গলায় বার বার বলবে, থ্যাঙ্ক উ সান্টা। আই লাভ ইউ। 

কয়েকটা বছর। ব্যাস আর কয়েকটা বছর শুধু থাকবে এই মধুর বিশ্বাস। বাইরের জলহাওয়া লাগলেই একদিন সন্দেহের বীজ প্রোথিত হবে। অবিশ্বাসের বীজ ধীরে ধীরে চারাগাছ হবে। তার পর বৃক্ষ মহীরুহ। বড় হয়ে ওঠা আসলে বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ারই নামান্তর। বড় হতে হতে হতে মাথা যখন আকাশ ছোঁয় তখন আর কিছু থাকে না যা পরম নির্ভরতা দেয়। কোনো দেওয়াল থাকে না যাতে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো যায় বিকেলবেলায়, কোনো চৌকাঠ থাকে না যেখানে এসে দু দন্ড মুগ্ধচোখে বসে থাকা যায়, কোনো আকাশ থাকে না যার পানে চেয়ে যুক্তকরে চাওয়া যায় এক মুঠো নীল, কোনো কবিতা থাকে না যা গুঁড়ো গুঁড়ো চাঁদ হয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায় ঝুপুস, কোনো দ্রোহকালের স্বপ্ন থাকে না যা দৃপ্ত অঙ্গারের মত রোমে রোমে আগুন জ্বালায়। আমাদের সমগ্র জীবন, আমাদের সমগ্র যাপন আসলে একটা আলগোছে পড়ে থাকা পথ যা আমাদের নিয়ে যায় বিশ্বাসহীনতার অনন্ত রৌরবের প্রবেশদ্বারে।

পঞ্চবর্ষীয়া

২৫ আগাস্ট, ২০২০

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। কোভিডের অদৃশ্য প্রহরা না থাকলে হয়তো বড় করেই জন্মদিনের পার্টি হত। কিন্তু এ বছরটা আর পাঁচটা বছরের থেকে আলাদা। তাই সকালে পায়েস, পাঁচভাজা, মাছ, পায়েস আর রাত্রে অল্প কেক কাটা, কিছু পুরনো বন্ধু ও ভাতৃস্থানীয় স্বজন।

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। আজ থেকে ঠিক পাঁচটা বছর আগে এক মাথাচুল আর দু চোখে বিস্ময় নিয়ে আমি এই নিজেরই হাতে মায়ের নাড়ি কেটে ওকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলাম। নাড়ি কাটার পর শুনেছি বাচ্চারা চিল চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। একদম ভুল। একটুও কাঁদে নি। বরং হাবভাবটা এরকম ছিল, এ আবার কোথায় এলাম? এত আলো? সেই থেকে শুরু। তারপর থেকে জুঁই ফুলের মত সেই ছোট্ট প্রাণটার একটা করে পাপড়ি খুলে যাওয়া…জীবনের এক একটা অধ্যায়…প্রথম উবুড় হওয়া, প্রথম হামাগুড়ি, প্রথম হাঁটতে শেখা টলোমলো পায়ে, প্রথম বাবা, মাম্মা বলা…যেন এক স্মৃতির চোরাকুঠুরি। কত হাসি, কত কান্না, কত মান অভিমানের পালা বাবা-মেয়ের – সে লিখতে বসলে বুঝি শেষ হবে না। এই হয়তো মুখে খাবার নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে বকুনি খেয়ে কিম্বা মাঝে মাঝে ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে দু এক ঘা খেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে “বাজে বাবা” বলে চলে গেল তো পরমুহূর্তেই ও বিউটি হলে আমি বীস্ট। কিম্বা আমি ঘোড়া আর ও ঘোড়সওয়ার।

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। হ্যাঁ আনন্দের দিন। কিন্তু সকাল থেকে আমার মনটা খারাপ। খালি মনে হচ্ছে পাঁচ হয়ে গেল। আর বড়জোড় পাঁচ কি দশ। কত অল্প, কত খসে-পড়া-তারার মত স্বল্পায়ু এই সময়। পৃথিবীর কোনো মহার্ঘ জিনিসই বোধ হয় অপরিমিত নয়। “গুপি বাঘা ফিরে এলো” ছবিতে আচার্য ব্রহ্মানন্দ শেষ দৃশ্যে যেমন দু হাত দিয়ে রত্নগুলোকে মুঠি করে ধরছিল আর হাত খুলতেই দেখছিল সে রত্ন গায়েব, ঠিক সেরকমই দু হাত দিয়ে মুঠো করে ধরতে চেয়েছি দিনগুলো। আর কখন মুঠোর ফাঁক দিয়ে গলে বেরিয়ে গেছে। অসহায়ের মত অভিশম্পাত করেছি মহাকালকে।

মহাকাল। সে টর্পেডোর মত চুপি চুপি এসে সমস্ত সঘন মুহূর্তকে বিস্মৃতির অতলান্তিকে ডুবিয়ে দেয়।

আসলে সকল কন্যা সন্তানের বাবার জীবনেই আসলে একদিন “রহমত আলি” মুহূর্ত আসে। সেই মিনির কাবুলিওয়ালা? যে অনেক কটা বছর জেল খেটে এসে একদিন দেখল তার কন্যাসম মিনি অনেক বড় হয়ে গেছে। সেই পুরনো সুর আর বাজছে না। কোথায় যেন সম্পর্কের এসরাজ বাজছে অচেনা সুরে। সেরকম সব বাবাই সময়ের স্রোতে ভেসে চলতে চলতে একদিন হঠাত অনুভব করে তার মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। হয়তো যোগাযোগের নতুন সূত্র খুঁজে পায়, কিন্তু তার শিশু কন্যাটিকে আবার নতুন করে চিনতে হয়। নতুন করে আলাপ করতে হয় নিজেরই মেয়ের সাথে।

আচার্য ব্রহ্মানন্দের মত প্রাণপণে ধরে রাখতে চেষ্টা করি আমার ছোট শিশুকন্যার আধো আধো কথা, তার অভিমানী চোখের জল, তার দুদিকের বিনুনি, তার অবাধ্যতা, আমার বকুনি, আমার আদর, ওর ছোট ছোট হাত হাতে নিয়ে পথ হাঁটার অপার্থিব স্পর্শসুখ কিন্তু পারি না। আলোছায়ায় ধরি, চলচ্চিত্রে ধরি, ছন্দে ধরি, শব্দে ধরি। তবু ধরা যায় না। তবু মনে হয় ওই আসল মুহূর্তগুলোর কাছে ওই ক্যামেরায় ধরা ছবি, ছায়া কি নিষ্ঠুর রকমের অকিঞ্চিৎকর। আমাদের প্রতি মুহূর্তের যে এক্সপিরিয়েন্স, যে অনুভব কোনো রেকর্ড বাটন টিপে তাকে যদি ধরে রাখা যেত আর আমাদের আগত সেই হলুদ বিকেলবেলায়, আমাদের সন্ধে নাম্বার আগের বিষণ্ণ ক্ষণে যদি রিপ্লে করে দেখা যেত, না না দেখা নয়, আবার করে যদি যাপন করা যেত, কি ভালই না হত? তাই না?

আমাদের সমস্ত মহার্ঘ ক্ষণ চুরি করে নিয়ে চলে যায় মহাকাল। আমরা অসহায় চোখে দেখি। কত অভিসম্পাত করি। কিন্তু সে চলে যায় রাজার চালে। তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

বাংলার ইতিবৃত্ত

আমি একটু আধটু বাংলা লিখি বলে কদিন ধরে আমায় দু একজন বন্ধু/আত্মীয় একটি পোস্ট ফরোয়ার্ড করছেন এবং ফেসবুকেও পোস্টটি দেখলাম বেশ কয়েকজনের ওয়ালে। বুঝলাম পোস্ট বাবাজীবন ভাইরাল হয়েছেন। ভাইরাস ছাড়া অন্য যেকোনো জিনিস ভাইরাল হোক তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। তা পোস্টটির মূল বক্তব্য হল, বাঙালি বাংলা ভুলে যাচ্ছে। চারটি ধাপের বাঙালি…তিন নম্বর ধাপ থেকে বাঙালি বাংলা বলা ছাড়া শুরু করে আর চার নম্বর ধাপে বাঙালি বিদেশে। বাংলা তখন শুধুই স্টাইল স্টেট্মেন্ট, শুক্রবার বিকেলে বিদেশি মদের আড্ডায় বসে মায়ের আঁচলের হলুদের গন্ধ মনে পড়ে যদিও সন্তানের সাথে চোস্ত ইঞ্জিরিতে কথা বলেন তিন…ইত্যাদি ইত্যাদি। লেখাটি ঝরঝরে এবং বক্তব্য উপস্থাপনের মুন্সিয়ানা আছে। তবে ওই চার নম্বর ধাপের বাঙালির সাথে প্রবাসী বাঙালিদের জুড়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় লেখকের অভিজ্ঞতার দীনতা প্রকাশ পায়। আজ থেকে দশ কুড়ি বছর আগে নিশ্চয়ই পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, কিন্তু ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর থেকে আমরা সত্যিই একটা বিশ্বগ্রাম, একটা গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হচ্ছি। অতি দ্রুত। বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষা আমি কলকাতাতেও যেরকম দেখি শিকাগোতেও সেরকমই। যদি সামান্য কিছু কম বেশি থাকে সে আমার দাঁড়িপাল্লায় ধরা পড়ে না। লেখক হয়তো বিদেশে থাকেন নি। তাই তিনি ক্ষমার্হ।

তবে আমার বক্তব্য অন্য। যারা এ ধরণের লেখা পড়ে ও ফরোয়ার্ড করে আহা উহু করছেন আমি ধরে নিতে পারি তাঁদের বাংলা ভাষার প্রতি দরদ আছে। অনেকে ওপর ওপর পড়েন কিন্তু সুধী পাঠক মন দিয়ে যদি পড়ে থাকেন দেখবেন এই লেখাটির শেষের দিকে একটি লাইন আছে – “বাংলা বই এখনো amazon kindle -এ পাওয়া যায় না। পরের প্রজন্মে ছাপা বাংলা বইও পাওয়া যাবে না।” যত মানুষ ফরোয়ার্ড করে করে এই পোস্টটিকে ভাইরাল করলেন তাঁর অর্ধেক মানুষও যদি বাংলা বই কিনতেন ও পড়তেন তবে শ্রীজাতর মত বিখ্যাত কবিকে “আপনি সিনেমার গান কেন লেখেন” প্রশ্নের উত্তরে বলতে হত না, বই বিক্রি করে আমার পেন কেনারও পয়সা জোটে না। লক্ষ করবেন সেই অর্থে বাংলায় কোনো ফুল টাইম লেখক নেই (যিনি শুধুই কবিতা কি ফিকশান লেখা ছাড়া আর কোনোভাবে অর্থোপার্জন করেন না) কারণ থেকে থাকলে তিনি এতদিনে অনাহারে মারা গেছেন।

amazon kindle প্রসঙ্গে বলি আমি কদিন আগে আমার একটি kindle book প্রকাশ করেছিলাম। দশ কপি বিক্রি হয়েছে। হ্যাঁ ইন্ডিয়া আর ইউ এস এ মিলে দশ কপি। রয়ালটি হিসেবে আমাজন থেকে দশ ডলার মত পেয়েছি। তুলনা করার জন্য বলি, সানাইএর স্কুলের টুইশান ফী হাজার ডলার। তাই লজ্জায় সে বইয়ের লিঙ্ক আর দিলাম না। কেউ যদি চান যোগাযোগ করবেন। যারা আমার লেখার প্রশংসা করেন তারা প্রশ্রয় হিসেবেই করেন ঠিকই, বুঝি। তবে সেই প্রশ্রয় দিয়েই যদি বাংলা বই মাঝে মাঝে সংগ্রহ করেন তবে হয়তো বাংলা ছাপা বই বা বৈদ্যুতিন বই আরো কিছুদিন বেঁচে যেতে পারে।

আর একটু বলি, বইমেলায় আমার বইটি দেখে আমায় একজন মেসেজ করেছিলেন, আপনার বইটি দেখলাম। কিন্তু দাম কিছু বেশি লাগল। আমি তাঁকে বলেছিলাম, হ্যাঁ দাম কিছু বেশি আছে। দয়া করে আপনি সংগ্রহ করবেন না। সে যাই হোক 🙂 , দাম কত ছিল বইটির? ১৫০ টাকা ভারতীয় মুদ্রা। কলকাতার যেকোনো ভাল রেস্টুরেন্টে খেয়ে আপনি যদি তিন থেকে চার হাজার টাকার নিচে বিল করতে পারেন তবে আপনি নেহাত মিতব্যয়ী আর মিতভোজী। অতএব কি দাঁড়ালো? এই দাঁড়ালো যে এক সন্ধের পান আসরে আমরা অনায়াসে চার হাজার টাকা ওড়াতে পারি, কিন্তু বইএর দাম ১৫০ টাকা হলে আমাদের গায়ে লাগে। নো ওয়ান্ডার
প্রকাশকরা বলেন, জানেনই তো বাংলা বই বিক্রি হয় না। তাই বই প্রকাশের খরচ আপনাকেই দিতে হবে। আপনি কি জানেন, বাংলা প্রকাশনা বেঁচে আছে লেখকের টাকায়, কারণ বাংলা বইয়ের ক্রেতা নেই? ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে দয়া করে ভাষার কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখুন। আর বাংলা ভাষার নামে এই লেখাটি শেয়ার করুন না।

কিনডেলে কেলেঙ্কারি

আপনারা যারা “যযাতির ঝুলি” পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য এবার একটা মস্ত খবর আছে। ২০১৯-এ পত্রভারতী প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত “যযাতির ঝুলি” গল্প সঙ্কলন বইটির কপি দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার কারণে আমার বহু বন্ধু ও সুহৃদ বইটি সংগ্রহ করতে পারেন নি। পৃথিবীর যে কোনো কোণায় একটিও মানুষ যদি আমায় পড়তে চান, আমি কৃতজ্ঞ বোধ করি। আর তাই এই বইটিকে, ঠিক এই এক ডজন গপ্পো এবারে নিয়ে এসেছি ডিজিটাল মাধ্যমে। অ্যামাজন কিনডেলে এবং অ্যাপল বুকে পাওয়া যাচ্ছে বইটি।

আপনারা যারা বারংবার যযাতির ঝুলি থেকে প্রকাশিত লেখা পড়ে এক রাশ মুগ্ধতা জানিয়েছেন, আপনাদের যাদের যযাতির হিউমার পড়ে পেটে খিল ধরেছে, আপনারা যারা যযাতির মধ্যেকার গল্পবুড়োকে কুর্নিশ জানিয়েছেন, আর সর্বোপরি যারা আমার প্রিন্টেড বুকের কপি শেষ হয়ে যাওয়ায় সংগ্রহ করতে পারেন নি তাদের সকলকে বলি বইটির এক কপি সংগ্রহ করুন। বারো খানা গল্প, দাম তিন ডলার কিম্বা ৫০ টাকা ভারতীয় মুদ্রা। হ্যাঁ, দুটো ব্রেডের দামে। চলচ্চিত্র মাধ্যমে গল্প পরিবেশনার জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে ছাপার অক্ষরের গল্পের বিপণন ক্ষমতা তত কমেছে। তবু এটাও ঠিক, যে গল্প-লিখিয়েরা অক্ষরেই গল্প লেখেন। পরে তাকে চলচ্চিত্র বানান অন্য কেউ। এই কিনডেল বুকটির গল্পগুলো কেমন জানতে amazon-e “Look Inside” button ক্লিক করে দেখতে পারেন। পড়লে হতাশ হবেন না এটা যযাতির প্রতিশ্রুতি।

আপনার গল্পজিভে যাতে চড়া না পড়ে যায় তাই প্রতিটা গল্প ভিন্ন স্বাদের রাখা হয়েছে। পড়ে দেখুন। আর হ্যাঁ, পড়া হয়ে গেলে প্লীজ কেমন লাগল জানাবেন। কারণ আপনাদের উৎসাহই যযাতির পথ চলার মাধুকরী। ২০১৯-এ মুদ্রিত সংস্করণে যে সহায়তা ও সমর্থন পেয়েছিলাম, আমি নিশ্চিত সেই সাপোর্ট আবারও পাবো।

বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী আমার এক প্রিয় দিদি, সুলেখিকা এবং সম্পাদিকা Mousumi Mondal Debnath.

“Jojatir Jhuli Baro Kahon” Kindle Edition Amazon India Link is here.

“Jojatir Jhuli Baro Kahon” Kindle Edition Amazon USA Link is here.

যাঁরা কখনো kindle book পড়েন নি তাদের জন্যঃ

যদিও ছাপা বই পড়ার মজাই আলাদা, কিন্তু কখনো সখনো বিশেষ করে ট্র্যাভেল করার সময় আমি মুঠো ফোনের কম্ফোর্ট থেকে ডিজিটাল বই পছন্দ করি। ইপাব ফরম্যাটে ডিজিটাল বইও অনেকটা ছাপা বইয়ের মত। পাতা উল্টোনো যায়। বুকমার্ক করা যায়। আমার মনে হয় এটা কিনডেলে আসা প্রথম বাংলা বই। এর আগে কিছু বই তার মুদ্রিত কপির স্ক্রীনশট থেকে কিনডেল এডিশান বানিয়েছে বটে তবে তা পড়ার জন্য চোখের পক্ষে বেদনাদায়ক। আমি প্রপার বাংলা হরফে বই প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি। পড়ে দেখুন। অসুবিধে হবে না। আর বলে রাখি, kindle book পড়তে কোনো স্পেশাল ডিভাইস লাগে না। Amazon will download kindle app for you once you purchase. আমেরিকায় Amazon.com আর ভারতে যারা আছেন Amazon.in ওয়েবসাইট বা Amazon app-এ অথবা Apple Device-এর books অ্যাপে “Jojatir Jhuli” বলে সার্চ করলে বইটি পাবেন। উপরে লিঙ্কও দিয়েছি।