NABC 2024

#NABC2024

সকল শুরু মধ্যেই শেষের বীজ নিহিত থাকে। সকল শুরুকেই মহাকাল স্মৃতির তকমা লাগিয়ে একদিন অতীত করে দেয়। তেমনই দিয়েছে NABC অর্থাৎ উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সম্মেলনকে। অতিথি অভ্যাগত এবং আমন্ত্রিত শিল্পীরা আজ একযোগে বলছেন, যে গত কয়েক দশকে NABC কেনো, অন্য কোনো সাংস্কৃতিক উদ্যোগেই এরকম নজিরবিহীন সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা নাকি দেখা যায় নি। বলছেন, best NABC ever. ডক্টর কুণাল সরকার তো বলেই ফেললেন, আপনারা বাঙালি তো? আমার মনে হচ্ছে আপনারা জেনেটিকালি মডিফায়েড কোনো স্পিসিস। বাঙালি ঝগড়াঝাঁটি না করে একযোগে কাজ করতে পারে, এমনটা তো কখনো দেখি নি!

আমরা বাঙালিরা নিজেদের বলি, কাঁকড়ার জাত। অর্থাৎ কিনা একজন উঠতে চাইলে অন্যজন টেনে নামায়। কিন্তু NABC24 প্রমাণ করল, আমরা পারি… আমরা কাঁকড়ার জাত না হয়ে মৌমাছি কিম্বা পিঁপড়ের জাত হতে পারি যেখানে প্রত্যেকে ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সমষ্টির জন্য শ্রম দেয়। এমনটা কিভাবে হল? অনুষ্ঠানের যে স্কেল, তা যেকোনো বড় মাপের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকেও দুঃস্বপ্ন দিতে পারত। চার হাজারের কাছাকাছি অতিথি, একশ সত্তর জনের মত দেশ থেকে আগত শিল্পী। এত মানুষের খাওয়া দাওয়া, আপ্যায়ন, আবদার। এতগুলো complex production, এতগুলো অতিথির দেখভাল, এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার, এমন অনবদ্য ডেকরেশান, টিনএজার এবং ছোটদের জন্য এমন সুন্দর প্রোগ্রাম লাইন আপ। চারশোর মত স্বেচ্ছাসেবক হাসিমুখে এমন একটা হারকিউলিয়ান টাস্ক করে ফেলল একটি মানুষকেও একটিও অভিযোগ করার সুযোগ না দিয়ে। না, অনায়াসে নয়, অল্প আয়াসেও নয়। রীতিমত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। কেমন করে হল? কোনো জীন কি পরী কিম্বা গোঁসাইবাগানের ভুত নেমে এসেছিল কি?

না আসেনি। অথবা বলা যেতে পারে, এসেছিল। সেই জীন কি পরীর কি গোঁসাইবাগানের ভুতের নাম স্বার্থশুন্যতা। পরিবর্তে কি পেতে পারি, সে চিন্তা মুছে দিয়ে যে দান করা যায় সে দান প্রকৃত অর্থেই ঐশ্বরিক। সে দেওয়াই আসল দেওয়া যে দেওয়া হয়ে যায় না দেওয়া-নেওয়ার খেলা, হয়ে যায় না transaction। এই অনুষ্ঠান এরকম সর্বাঙ্গসুন্দর হয়েছে কারণ প্রতিটা স্বেচ্ছাসেবক নিজের সময় ও শ্রম দান তো করেছেন, কিন্তু আশ্চর্য, বদলে কিচ্ছুটি চান নি। ব্যষ্টি সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে সমষ্টি সত্তায় মিশে গেছেন, ব্যক্তি চেতনাকে উহ্য রেখে সামগ্রিক চেতনায় নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন। তাই এই সাফল্য। তাই এত সব অভ্যাগতদের মুখে এমন অনাবিল হাসি। নিষ্কাম কর্ম এক ধরণের win-win situation. যে সেবা দেয় আর যে সেবা লাভ করে, দু পক্ষই আনন্দ পায়।

ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া ছাড়াও আমার মতে আর একটা ফ্যাক্টর ছিল এই সামগ্রিক সাফল্যের পেছনে। আর তা হল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, decentralization of authority. কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, central leadership কাজ গুলোকে বিভিন্ন বিভাগে (tower) ভেঙে দেওয়ার পর সেই টাওয়ারের ওপর রেখেছিলেন অবিচলিত আস্থা। তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করা বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন নি। একনায়কতন্ত্র (autocracy) ছিল না কোনোখানে। ফলে ফলেই প্রতিটা বিভাগ এবং তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা নিজের কাজের মালিকানা (ownership) নিয়েছে এবং সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করেছে। কেমন করে হয় এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ? উত্তর হল, অহমনাশ। অহমকারাবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতিমন্যতে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অহংকারের বশবর্তী হয়ে মানুষ নিজেকে কর্তা বলে মনে করেন। আমাদের central leadership অহংকারের মোহ জয় করে নিজেদের অকর্তা বলে মনে করেছেন। প্রেসিডেন্ট ইমেইলে বলেছে, I urge the community to get to know these volunteers (not the ‘leaders’ like me for instance)…These are the faceless individuals who should be celebrated, applauded, recognized and most importantly respected.

শিকাগো। এই শহর থেকেই এক গৈরিকধারী বীর সন্ন্যাসী এক শতাব্দী আগে বাঙালির হৃতপ্রায় জাত্যাভিমানকে উদ্ধার করার কাজে অগ্রণী হয়েছিলেন। বিশ্বের দরবারে বাঙালির নাম উজ্জ্বল করেছিলেন। আজ সেই শহর থেকেই বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারের কাজটা যদি শুরু হয়, তবে তা আনন্দের কথা বই কি!

ভবিষ্যতে যাঁরা NABC-র দায়িত্বভার প্রাপ্ত হবেন, সেই সব শহরকে বলি, আপনাদের সঙ্গে শিকাগোর কোনো প্রতিযোগিতা নেই। আপনার বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান, বঙ্গ সম্মেলনের মান আরও বৃদ্ধি করুন, NABC Brandকে আরও উজ্জ্বল করুন, এ আমরা সর্বতোভাবে কামনা করি।

শুধু টিপস হিসেবে এটাই বলব, ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে উঠে নিষ্কাম সেবা আর অহমশুন্যতা এই দুটো উপাদান আপনাদের সাফল্যের রেসিপিতে অবশ্য করে দিতে ভুলবেন না।

পাঠান

স্ব বাবু যযাতিকে বললেন, মহারাজ, আপনি প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ।
মহারাজ যযাতি বললেন, সে ব্যাপারে আমি সম্যক রূপে অবগত। আগে বলো।
স্ব বাবু বললেন, শুনেছি মহান আর্যাবর্তে একটি নতুন ছায়াছবি প্রকাশ পেয়েছে। সেই নিয়ে খুব হৈ হৈ রৈ রৈ। নাম পাঠান।
মহারাজ যযাতি বললেন, অতি আশ্চর্য। ছবি হৈ হৈ করে চলছে অথচ তার নাম নির্ধারণ করা হয় নি? আমাকে নাম পাঠাতে বলছে?
আজ্ঞে না না। ছবির নামই পাঠান।
সে বুঝেচি। কিন্তু তারা নিজেরাই তো ছবির নাম ঠিক করতে পারে। তারা তো আর পাঁঠা নয় যে তাদের ছবির নাম আমায় পাঠাতে হবে!
মহারাজ, ছাড়ুন। শুনেছি সে ছবি নাকি নয় শো কোটি টাকার ব্যাবসা করেছে।
নয় শো কোটি মানে কত? এক পদ্ম না এক মহা পদ্ম?
আজ্ঞে, নয় পদ্ম। এক পদ্ম মানে হলে গে একশ কোটি।
সে আর এমন কি। বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে যে দাক্ষিণাত্য আছে, সেই স্থলে ছবি শুনতে পাই প্রায়শই এক মহাপদ্ম কি এক জলধি পর্যন্ত ব্যাবসা করে।
মহারাজ সর্বজ্ঞ। তবে অদ্দুর করে না মনে হয়। হাজার পদ্মে এক মহাপদ্ম। বাহুবলী বলে একটি ছবি পনের পদ্ম ব্যাবসা করেছিল। অর্থাৎ কিনা পনের শো কোটি।
বটে? তবে কোনো ছবি এর থেকে বেশি ব্যাবসা করে নি?
আজ্ঞে করেছে। সে ছবি এখন ছবি হয়ে গেছে। নাম আদানি।
ও। আদানি? সে কি আদার ব্যাপারী?
না না আদা না। আদানির আদান প্রদান বহুবিধ। একে বলে বিজনেস কংগ্লোমারেট। সে যাগগে। মহারাজা, যাবেন নাকি পাঠান দেখতে? চমৎকার ছবি। তবে মাথাটি শুনেছি হলের বাইরে খুলে রেখে যেতে হয় দেখতে।
তুমিই দেখো এসো বৎস। আমার এই বুড়ো হাড়ে আর জোর নেই তেমন। তার ওপর আমার মাথা আমার পরম প্রিয়। তা খুলে রাখতে রাজি নই। গল্পটি শুনিও দেখে এসে। যদি কিছু থাকে…

খেলাখেলা

মাঝে মাঝে সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে থাকে খেলার মরসুম। বাইরে তখন শীতঘুম। সাদা কাপড়ে মোড়া শীতবুড়ি। চালিয়ে দিয়েছে ছোরা, ঋণাত্মক কুড়ি।

শুনেছি প্রাণী মধ্যে mammals বা স্তন্যপায়ীরা সবচেয়ে কৌতুকপূর্ণ বা playful । এ কথা একদমই নয় ভুল। কিন্তু থাক সেসব ইকড়িমিকড়ি। জীববিদ্যা ফেলে চলুন আমরা গল্পে ফিরি।

বাড়ির কনিষ্ঠতম সদস্যা চোখে আলো জ্বেলে বলে ওঠে, বাবা কি খেলবে? হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু প্লে। বাট আই রিয়েলি ডোন্ট হ্যাভ এ সে। আমায় ভাবার সুযোগ না দিয়েই বলে, হাইড অ্যান্ড সীক। আমি চোখের তারায় জোনাকি জ্বেলে বলি, ঠিক ঠিক। তাথৈ বলে, ওকে বাবা, ইউ কাউন্ট। আমি দেওয়ালের দিকে ফিরে হাত চোখে করি মাউন্ট। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে গুনতে থাকি, এক দুই তিন চার… তর সয় না তার। “বাবা আমি হাইড করেছি”। ব্যাস আমিও চোখ খুলে ফেলেছি। আর কাউন্ট করে কি কাজ, থাক। তাথৈ সোনাকে খোঁজা যাক। তা লুকিয়েছে সে, যেখানে কাউন্ট করছি সেখান থেকেই ফুট চারেক দূরে, সোফার আড়ালে। সেখান থেকে তার আওয়াজ আসছে যেমন করে আওয়াজ আসে কলে ইঁদুর পড়লে। উত্তেজনায় তার ছোটো শরীর থরো থরো। কিন্তু অমনি খুঁজে বের করলে কি ভাল দেখায় বড়ো? তাই বাবা এদিক যায়, ওদিক যায়। “তাথৈ তুমি কোথায়? আই অ্যাম কাআআমিং। তোমায় খুঁজে বের করা খুব শক্ত হচ্ছে ইদানীং”। এই সব বলি। সময় কিছু নষ্ট করে পৌঁছই সোফার কানাগলি। তাথৈ বলে ধাপ্পাআআ, আওয়াজ শোনা যায় রামতলা থেকে রাজারাপ্পা। অমনি আমিও করি, চমকে ওঠার ভানটি। সে সরলা তাই দেখে হেসেই কুটিপাটি।

এবার তার কাউন্ট করার পালা। কিন্তু একটাই ঝামেলা। আমার লুকোনোর স্পটটা সেই ঠিক করে দেয়…খুঁজে পেতে যাতে তার না হয় কষ্ট। তাথৈ এই সব ব্যাপারে খুব স্পষ্ট। “বাবা এইখানে বোসো, পা মোড়ো।” “আ মোলো। তুই যেখানে ঢুকতে পারিস সেখানে কি আমি ঢুকতে পারি, ছাই।” কিন্তু তর্ক করা বৃথাই। তার খেলার ভুবনে বাকবিতণ্ডার স্থান নাই। যাক বাবা, ঝামেলায় কাজ নাই। বেশি গোলমাল করলে তাথৈ বাজাবে সানাই। জুড়ে দেবে কান্না। বাবা তা চান না। কোনোভাবে বডিফ্রেম সেইখানে গুঁজে রাখি। নট-সো-টোনড মধ্যপ্রদেশ অর্থাৎ ভুঁড়িটিকে বলি, জাঁহাপন, মাফ করো গুস্তাখী। এই তো শুধু কাউন্ট টু টেন। তারপরই স্বাধীন হবেন। তাথৈ কাউন্ট শুরু করে। ওয়ান…টু…থ্রী…ফোর…ফাইভ…সিক্স…এইট। আমি বলি, “সেভেন সেভেন, তাথৈ সিক্সের পর সেভেন”। মাফ করবেন। ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙেন, তেমনি বাবা কিম্বা মা হাইড অ্যান্ড সীকের মাঝেও শেখান, ওয়ান টু টেন। তাথৈ আবার গোনে, প্রথম থেকে, ওয়ান টু টেন। পুরো এক থেকে দশ। আমার পেট বলে, এবার ছেড়ে দে বস। তারপর তিনি আমায় খুঁজে পেতে আসেন যেখানে আগেই আমায় লুক্কায়িত রেখেছেন!! কিন্তু তাতে খেলা হয় না মাটি। ধাপ্পা দিলেই তাথৈ আবার হেসেই কুটিপাটি।

এই খেলাই রিপিট হতে থাকে দশবার বিশবার। প্রতিবারই তার কাছে একইরকম মজাদার। পুনরাবৃত্তি বোর করে আপনাকে আমাকে। কিন্তু হারায় নি সে চিন্তাস্রোতে জীবন পথের বাঁকে। সে যাই হোক, বাবা অর্থাৎ আমিও প্রতিবার মজা পাওয়ার অ্যাক্টো করি। ছোটো মানুষটাকে খিলখিলিয়ে হাসতে দেখে বুকের মধ্যে কুলু কুলু ধানসিঁড়ি।

জীববিদ্যা বলেছে কিনা, স্তন্যপায়ীরা হল গিয়ে ক্রীড়ামোদী! এইভাবেই রুনু ঝুনু বয়ে চলে জীবননদী। এইভাবেই দৈনন্দিন একঘেঁয়েমি হয়ে ওঠে যাদুবাস্তব, নিরবধি।

কবি কি দেখছেন?

এক দিদি বললেন, তোমরা যারা লেখো, তোমাদের মাথার তন্ত্রীগুলো অন্য সুরে বাঁধা। আমি দড় কোনও লেখক নই। তবে লেখকের মাথা সম্বন্ধে দু এক কথা জানি। লেখকের মাথা অন্য তন্ত্রীতে বাঁধা? সত্যি কি তাই? লেখক/কবি কি ভাবে দেখে? কোন্‌ ঘটনা বা অঘটনকে সে করে নেয় কথকতার উপাদান? কেমনে সে ক্রমাগত গল্প খুঁজে পায় দৈনন্দিন একঘেঁয়েমি আর ক্লিন্নতায়? 

কারণ অন্যে যেখানে জীবন দেখে, লেখক সেখানে যাপন দেখে। অন্যে যেখানে গন্তব্য দেখে, লেখক কেবল দেখে একটা পথ মাত্র যা আদতে কোথাও যায় না। এক শাশ্বত বর্তমানে সে পথ অনন্তকাল ধরে শুধুই থেমে আছে। শুধুই থেমে আছে। অন্যে যখন দেখে বস্তুনিচয়, লেখক দেখে একটি প্রবাহ মাত্র। পরম শূন্য থেকে নিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, পরম শূন্যেই স্থিত হচ্ছে আর সেই পরম শূন্যেই নিশ্চিতভাবে বিলীন হচ্ছে সেই সব বস্তু ছায়াপ্রতিমারা। অন্যে যখন দেখে কঠোর বাস্তব, কবি দেখেন প্রপঞ্চ। কবি বোঝেন, এ সকলই সতত পরিবর্তনশীল, অন্তঃসারশূন্য এবং স্বাধীন সত্তাবিহীন। ছায়ার মত চিদাকাশে ফুটে উঠছে নিয়ত আর নিয়ত অপসৃত হচ্ছে।। অন্যে যেখানে ক্রমাগত একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির খোঁজে সঙ্গ খুঁজে ফেরে অন্তর্জালে, সমাজমাধ্যমে, কবি সেখানে অনেকের সঙ্গে মিশেও সর্বতোভাবে অসঙ্গ। অন্যে যেখানে নিজের ব্যক্তিগত গল্পনদীর মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে, কবি দেখতে পাচ্ছে জীবন নদীবক্ষ আর নিরন্তর উৎসারিত ঊর্মিমালা। ঢেউ উঠছে, ঢেউ ভাঙছে। ঢেউ উঠছে, ঢেউ ভাঙছে। থুপ থুপ থুপ। আদি ও অনন্ত জল থেকে ঢেউ হয়ে জন্ম নিচ্ছে নাম-রূপ আর ক্ষণিক বাদে জল হয়ে মিশে যাচ্ছে তার সৃষ্টি উৎসে। তখন সে নামহীন, রূপাতীত। এক মুহূর্তে পৃথক অস্তিত্ব, অপৃথক পরমুহূর্তে। অন্যে যেখানে সারবত্তা খুঁজে পেতে মাথা খুঁড়ছে, কবি দেখছেন সংসার। সংসার কি? যা ক্রমাগত সরে সরে যায়, সেই তো সংসার। অন্য অর্থে যা চক্রাকারে আবর্তিত হয়, তাই সংসার। সেই সংসারে সং সাজা যায়, কিন্তু সার খুঁজে পাবে কেমন করে? 

সার খোঁজা শেষ হলে তবে সার খুঁজে পাওয়া যায়। এই অস্তি এমনই স্ববিরোধী। তাই কবি/শিল্পী/লেখক শব্দে, তুলিতে, আলোছায়ায়, সুরে ধরে রাখে এই নিয়ত পরিবর্তনশীল শাশ্বত বর্তমানের ঠিক যতটুকু ধরে রাখা যায়। সেই শব্দরতিও ক্ষণিকের। সে শব্দমালাও ডুবে যাবে এক কৃষ্ণগহ্বরে যার নাম মহাকাল। মহাকালের গর্ভে বিলীন হবে সব যা দৃশ্য ও অদৃশ্য, সব যা শ্রুত ও অশ্রুত, সব প্রেম, সব আবিষ্ট থিরি থিরি কাঁপা অধর, সব যুথীমালা, সব অবাধ্য কবরীগুচ্ছ, সব বংশলতিকা, সব রাজপাট, সব চক্রান্ত, সব অসূয়া, সব নীহারিকা, সব নক্ষত্র, সব পাখি, সব নদী, এমনকি সব কবিতা। যা থেকে যাবে সে এক আদিম কবিতা। সে কবিতার রচয়িতৃ এক সন্ন্যাসিনী যে সঞ্চয় করতে শেখে নি।

রাজনীতিবিদ

স্ত্রী কহিলেন, জানো সানাই খুব মিথ্যে কথা বলতে শিখেছে।

আমি নিরুত্তর রহিলাম।

স্ত্রী কহিলেন, ওকে জিগ্যেস করলাম ভাত খাওয়ার পর কুলকুচি করেছিস কিনা। কনফিডেন্টলি বলল, হ্যাঁ। একটু চেপে ধরতেই ছুটল কুলকুচি করতে।

আমি বলিলাম, বেশ বেশ।

বেশ? মিথ্যে বলছে সেটা ভাল?

আমি বলিলাম, তুমি তো বলো, ও কোনো কম্মের না। সব কাজেই লবডঙ্কা। এই একটা কাজ তো ঠিক করে করছে। এই যে মিথ্যে বলাটা আয়ত্ত করেছে – এর ফলে দুটো কেরিয়ার পাকা।

কি কেরিয়ার?

রাজনীতিবিদ ওরফে দুর্নীতিবিদ আর উকিল।

বাগেদের বাগাড়ম্বর

তা হয়েছে কি শীত গিয়ে বসন্ত এসে পড়েছে। ফাগুন হাওয়ায় দুলে দুলে নতুন ফোটা ফুলের গরবে গরবিনী, সদ্য যুবতী গাছগুলো নিজেদে মধ্যে চুপকথা শুরু করে দিয়েছে। রতিদেবী ঘুরে ঘুরে পুষ্পশর ছুঁড়ছেন আপন খেয়ালে। আর তার ফলে পোকা মাকড়েরা ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি করে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে চলেছে। তা আপনি জিজ্ঞেস করবেন তা তোমার বাপু তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। পোকামাকড়েরা যা করছে করুক, তোমার তাতে কি?

কথা ঠিক, কিন্তু এ কথা আমার ছোটকন্যাকে বোঝায় কে? তাকে কিছুদিন হল বাগে পেয়েছে। অর্থাৎ কিনা সে বাড়ির বিভিন্ন প্রত্যন্ত অংশে মানে ধরুন খাটের নিচে, সোফা ও কফিটেবিলের মাঝের অতি সংকীর্ণ পরিসরে, সিলিঙে, টবে বসানো গাছের গোড়ায় ছোট বড় মাঝারি, সবুজ লাল গেরুয়া, একলা কিম্বা সমবেত, স্থির কিম্বা চলমান পোকা এবং মাকড়দের খুঁজে বের করছে আর বাড়িতে ডাকাত পড়লে লোকে যেভাবে তারস্বরে চিৎকার করে, সেইভাবে চিৎকার করছে, “বাবা বাগ।” বিবাগী হয়ে যেতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।

তাকে যতই বলি বাগেদের কেউ কোনোদিনই বাগে আনতে পারে নি, তারা পরব্রহ্মের মত সর্বভূতে ও সর্বস্থানে বিরাজমান কে শোনে কার কথা? তারা নিজগুণেই এত জলদি নিজেদের জ্ঞাতিগুষ্টিকে ডেকে আনে, যে তাদের গুনে শেষ করে, সাধ্য কার। কিন্তু কন্যা শুনলে তো? সৃষ্টি পূর্বে শ্রীবিষ্ণু অনন্ত শয্যায় ছিলেন। আমি সেই আদিপুরুষের দ্বারাই সম্ভবত অনুপ্রাণিত হয়ে এবং আমার দ্বারা কোনোকিছু সৃষ্টি সম্ভবপর নয় জেনে যোগনিদ্রায় শরীর এলিয়ে রাখা পছন্দ করি। কিন্তু তাথৈইয়ের বাগ সন্দর্শন হলেই  প্রথমে চিৎকার করে বাবা বাগ। সেই চিৎকারে আমার যোগনিদ্রা টলাতে না পেরে ছুটে এসে তার খুদে আঙুল আঙুলে জড়িয়ে টানতে থাকে। মানে আমাকেও গিয়ে দেখতে হবে। আরে দেখে হবেটা কি ছাতা? তারা মোটেই আমায় ডরায় না। আমার নাকের ডগা দিয়ে তারা সকলে “আমরা সবাই ড্যাং ড্যাং” করে চলে যাবে।

বাগেদের কে কবে বাগড়া দিতে পেরেছে? পোকাদের কে কবে বোকা বানাতে পেরেছে? মাকড়দের কান পাকড় করে বাড়ি থেকে বের করে দিতে কে কবে পেরেছে? বাগান থেকে বেগুণ, বাগে কাটা নান থেকে বাগনান, গোলাপবাগ থেকে আরামবাগ সর্বত্র বাগেদের অবাধ বিস্তার। প্রবল প্রতাপশালী  ডাইনোসররাই যাদের ঠিকানা লাগাতে পারে নি, তাদের আমি ঠেকাই কি করে? বাগেদের ওপর রাগ করে করবই বা কি, তারা আমার রক্তচক্ষুর পরোয়া করে না। সমস্ত রকম বাগ স্প্রে ট্রাই করে ফেলেছি। তাদের নিকেশ করা তো দূরের কথা, তাদের কেশকর্ষণ (এর খারাপ বাংলাটা আর বললাম না। সমঝদারের জন্য ইশারাই যথেষ্ট) পর্যন্ত করতে পারি নি। বাগেদের ওপর রাগ করার থেকে বাগেশ্রী রাগ শিখে ফেলা সোজা। বাগদেবীর দেখা পাওয়া যদি বা সম্ভব হয় বাগেদের বাগে আনা নেহাত অসম্ভব। বাগদের ওপর রাগ করে আপনার রক্ত টগবগ ফুটতেই পারে, কিন্তু তাতে বাগবাহিনীর কিছু যায় আসে না। তারা জাঁক ভরে ঘুরে বেড়াবে বাড়িময়। বাগেদের ডিবাগ করার থেকে ব্যাগাডুলি খেলা ঢের সোজা। তর্কবাগীশকেও তর্কে হারাতে পারবেন, কিন্তু বাগেদের টর্কে (torque) আপনি নাজেহাল হবেন নি।

কথায় আছে না, নরকের কীট। নরকেই যারা মহা আনন্দে উৎসব করে, এই মর্ত্যে তাদের প্রভাব ও আধিপত্য যে অপ্রতিম হবে তাতে আর আশ্চর্য কি? কীটেদের ঢিঁট করতে পারে এমন কিরীটী মর্ত্যলোকে নেই। কীটেদের হারায় এমন হিরো কেই বা আছে? যাক গে আর বাগবিতণ্ডায় গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু আমাদের তাথৈশ্রী বাগুলার বাগপ্রীতি কমায় সাধ্য কার?

শুভ মহালয়া

কথা নিয়ে খেলা এ নয় হেলাফেলা!!!

দুর্গাপুজো এবার কাটাবো নিজের শহরে। সে কথা যখন জানালাম এক বন্ধুকে, তিনি বললেন, আমার শহরে কবিকে স্বাগত।

আমি বললাম, প্রিয় ব্যর্থ কবি বলো। কবি দুই প্রকারের, জানো না? অর্থ কবি আর ব্যর্থ কবি। 

উত্তর তিনি বললেন, ও বুঝলাম, এবার আপনার বিনয় আসছে।

আমি বললাম, হ্যাঁ সে আসছে বইকি। বাদল আর দীনেশ আসা বাকি শুধু। তিনে মিললেই বিবাদী বাগ হবে।

তিনি বললেন, বাদল এসেছেন তো। শুধু আসেনই নি, তিনি তো যেতেই চান না। ঘরঘাট সব ভেসে গেল।

আমি বল্লুম, হ্যাঁ সে খবর পেয়েছি। তাহলে চলুন আমরা দীনেশের নয়, দিনেশের আরাধনা করি যাতে পুজোর দিনগুলি রৌদ্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। 

শুভ মহালয়া সকলকে!!!

তা তা থৈ থৈ

আহা কি অনবদ্য নৃত্যশৈলী! যেন রাম তেরি গঙ্গা মইলি! যেন কালবৈশাখী উঠেছে পাগলপারা, যেন শ্রাবণঘন বাদল দিনে ঝরোঝরো বৃষ্টি ধারা! ফেঁপে উঠেছে বাঙালিয়ানা, নেচে উঠেছে মন মাতাল, কেঁপে উঠেছে ত্রাসে টেরাস (terrace) এবং স্বর্গ-মর্ত-পাতাল! যেন স্বয়ং নটরাজ ভর করেছেন প্রতি অঙ্গে, প্রত্যঙ্গে, আহা অঙ্গে! আহা কি প্রেম সাজিল আজি বঙ্গে! মুরারী দাঁড়াইল ত্রিভঙ্গে। ঘেরিয়া ঘেরিয়া নাচে গোপীজনশ্রেষ্ঠা রণরঙ্গে!

প্রভু কন, ওরে প্রভু কন। তিনি নিজেই ফ্যাশন আইকন! তাই বাজিল নুপুর, কঙ্কণ! মাথা ঝনঝন ঝন ঝনঝন! রাঙা ধুতি চড়িল শ্রী অঙ্গে! ষষ্ঠীর সাজে শ্রীমতী সে সঙ্গে! ওহে বাঙালি, তুমি কাঙালি। তাই তোমায় দেখাল দ্য ওয়াল, কাহারে বলে দ্য বাওয়াল। তা তা থই থই রনোথম্বোর। মন টই টই টই টম্বুর। আহা মিস্টি, আহা কৃষ্টি, এ তো হিস্ট্রি, অনাসৃষ্টি। আজ এ সকলই হল শুদ্ধ। বাক্রুদ্ধ। বাক্রুদ্ধ। আহা লাবণ্যে প্রাণ পূর্ণ। শুধু মন ভেঙেচুরে চূর্ণ। রবিসন্ধ্যা রবিসন্ধ্যা। বাংলা কি তবে বন্ধ্যা? আজ দেবী দুর্গার আগমনী গানে নেমে পড়ে মদ-অনদা। তা তা থৈ থৈ। এ কি হৈ হৈ। আমি মনকেই বলি পই পই – মন রে, ওরে মন রে, ওরে বিকচকুসুম মন রে, আজ মেনে নাও তুমি, মেনে নাও আজ, এসকলই শোভন রে।

Any resemblance to actual events or locales or persons, living or dead, is entirely coincidental – মানে আমার তাই মনে হচ্ছে আর কি। আপনার কি মনে হচ্ছে বলতে পারব না।

ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা

“ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা” পড়লাম। শিবরামের আত্মচরিত। শিবরামের হাসির রচনাগুলির কথা সকলেই জানে। পড়েছেন আপনিও। আমিও। কিন্তু এ একেবারে অন্যরকম। এই আত্মজীবনীটিতে হাসির উপদান থাকলেও এমন গভীর তত্ত্বকথা আছে যে পড়লে যারপরনাই বিস্মিত হতে হয় যে এ কি সেই একই লোকের কলম থেকে নিঃসৃত হয়েছে? আমার সেই বালক বয়সে আমার দাদু বলেছিল এই বইটির কথা। কি আশ্চর্য দেখুন চল্লিশটা বসন্ত পার করে সেই বইয়ের ধার আমায় ধারতে হল। পড়লাম এসে এতদিনে এক দাদার রেকমেন্ডেশানে। দেবাশিসদা। এ বইতে শিবরামের জ্ঞান ও বুদ্ধিচ্ছটাতে প্রতিটা বাক ও বাক্যাংশ যেন হীরক খণ্ডের মত ঝলমল করছে। এমনই তার লেখনীর মধু যে মধুমক্ষীর মত তাতে মজে রইলাম। এমন বর্ণনা যে এক বর্ণ না পড়ে থাকতে পারলাম না। সাড়ে চারশো পাতার পথ সাড়ে চারদিনে ধুলো উড়িয়ে গেলাম। ধূলিবিজড়িত অবস্থায় শেষ পাতা অব্দি পড়ে তবে পরিত্রাণ। নিজেরই গল্প এত সরস করে বলা যায়, নিজেকেই একটি মহাকাব্যের প্রোটাগনিস্ট করে এমন ধারা দাঁড় করানো যায়, এ বই পড়ার আগে তা শুধু একবারই দেখেছি। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতকে। সেটিও তাঁর আত্মচরিত।

মহাস্থবির জাতক বইটির সঙ্গে আমার পরিচয় কিছু নাটকীয়। আসল কথায় আসার আগে সেইটি বলে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। বইটার নাম আমি কোনোদিন শুনি নি আগে। কেমন করে যে এমন একটা বহুলচর্চিত বই আমাকে রীডার করে নি, আমার রাডার এড়িয়ে ছিল বহুদিন, তা জানি না। কয়েক বছর আগের কথা। একদিন কলেজ স্ট্রীটে একটি বইয়ের দোকানে ঢুকেছি দু একটি বই সংগ্রহ করতে। বইয়ের তাক থেকে একটু চোখ সরাতে দেখি কোন ফাঁকে পাশে ঝলমল করছে এক ছিমছাম সুন্দরী। সেই রমণীয় রমণী কোন বই সংগ্রহ করেন বইয়ের আড়তে দাঁড়িয়ে আড়চোখে তাই দেখতে থাকি। রূপই তো তছরুপ করি আমরা বইয়ের পাতায়। সে রূপ যদি অমনি এসে পাশে দাঁড়ায় তবে বই খোঁজা কিছুক্ষণ বন্ধ রাখা যায় বই কি! তো তিনি কিনলেন একটি এক মণ ওজনের বই। প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতক। আমি তখন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। যেমন ধীরে তিনি এসেছিলেন তেমনই ভিড়ে মিলিয়ে গেলেন। আমায় কিছু অধীর করে হয়তো। তো দোকানদার জিগ্যেস করল, আপনার কোন বইটা চাই যেন। কোনটা চাই তখন কি ছাই মনে পড়ে! বললাম ওই। ওই মানে কোনটা? মানে ওই। মানে উনি। মানে উনি যেটা কিনলেন। বইটা হাতে পেলাম এভাবেই। হাজার পাতার বই। সে বই পড়ে আতর্থীবাবুর  জীবনের সিনেমার অলীক কল্পলোকে যখন বিচরণ করেছি, তখন মনে মনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছি সেই ক্ষণিকাকে। 

কিন্তু কথা হচ্ছিল “ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা” নিয়ে। মহাস্থবির জাতকের জাত আর “ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালোবাসা”-র জাত এক হলেও মানুষ দুটো জাতে এক নয়। প্রেমাঙ্কুর অঙ্কুর বেলা থেকেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন শহর থেকে শহরে। আর শিবরাম জাত ঘরকুনো। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস না করে পাশ কাটিয়ে সেই যে কলকাতার একটি মেসবাড়িতে এসে ঢুকেছিলেন ওখান থেকেই গেছেন অনন্তের পথে। তবু সেই ঘরকুনো জীবনও যে এমন একঘর হতে পারে তা শুধু পড়লে বোঝা যাবে। আনন্দবাজার পত্রিকা বিক্রি করে এবং অর্জিত সামান্য টাকায় আনন্দ করে ম্যাটিনি শোয়ে আর নাইট শোয়ে শয়ে শয়ে ছবি দেখে আর রাবড়ি খেয়ে যে জীবনের শুরু সেই জীবনেরই উত্তরণ সেই আনন্দবাজারেরই কলাম রাইটার হিসেবে যার হকারই তিনি করতেন। মাঝখানে ইংরেজ সরকারের হাতে দেশদ্রোহের নামে জেলে যাওয়া, দেশবন্ধুর ইচ্ছায় আত্মশক্তি কাগজের সম্পাদনা আর সুভাষচন্দ্রের হাতে চাকরি নট, বিধানাবাবুর কাছে রোগের অজুহাত নিয়ে চাকরির একটা রেফারেন্স পেতে যাওয়া কত যে মজার ঘটনা সে বলার মত না। এক চোর তাঁর ঘরে এসে এক ফোঁটা কিছু চুরি করার জিনিস না পেয়ে দশটা টাকা রেখে গেল। সঙ্গে চিঠি। “তুমি ভাই লেখো টেখো দেখছি। কিন্তু খেতে পাও না মনে হয়। তাই এই টাকা কটা দিয়ে ধুপ কিনে এনে বেচো। অন্নসংস্থান হবে।” সব ঘটনা মজার হয়তো না যেমন জীবনের প্রারম্ভে দিনের পর দিন ফুটপাথে শোয়া আর দিনের পর দিন উপবাসের জঠর জ্বালায় ভোগা খুব মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা নয়, কিন্তু বলার গুনে বা বৈগুণ্যে তা এত রসসিঞ্চিত হয়েছে যে জামবাটি ধরে ধরে খাওয়া যায় সে রস। তবে এ লেখার অবতারণা পাঠ প্রতিক্রিয়া নয়, বলা যেতে পারে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। 

প্রথমটি হল, দুটো আত্মচরিত দেখেই একটা জিনিস মনে হচ্ছিল সেই কথাখানাই লিখি। প্রেমাঙ্কুর শিবরাম দুজনেই বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে তবে দুজনেই বাউন্ডুলে। আর সেই বাউন্ডুলেপনাই তাদের বাউন্ডারি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক। যে কথাটি দুজনেই লেখেন নি, কিন্তু লেখার মধ্য দিয়ে ফল্গুর মত প্রবাহিত সেটা হল, স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় পরধর্মো ভয়াবহঃ। সত্যিই তাই। মানে অন্যের ধর্মের প্রতিপালন করার থেকে নিজের ধর্মে মরা ভাল। এ ধর্ম হিন্দু কি ইসলাম নয়। এ ধর্ম স্বধর্ম। ধৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন ধর্ম মানে যা আমাদের ধারণ করে। শিবরামের অনুকরণে বলতে গেলে বলতে হয় ধর্ম মানে যা ধারণ করে মানে ধার অন করে আমাদের ধারালো করে দেয়। শিবরামের আত্মচরিতে দেখি একটা অংশে ভদ্রলোকের বহুদিন অন্নসংস্থান নেই। মল্লিকবাড়ির লঙ্গর খানায় ভিখিরিদের সঙ্গে খেয়ে জীবনধারণ। এমন সময়ে কেউ একজন তাকে একটি বিজ্ঞাপন লিখিয়ের চাকরি দিচ্ছে। মাস মাইনে খারাপ না। শিবরাম বাড়ি বয়ে সে চাকরি প্রেমেন মিত্তিরকে দিয়ে এলো। প্রেমেন জিগেস করছে, তুমি তো খেতে পাচ্ছ না। করো না কিছুদিন চাকরিটা। শিবরাম বলছেন, না ভাই, আমি দশটা পাঁচটা চাকরি করতে পারব না। এক পেটের অধীন হয়ে নিজের বাকি সব স্বাধীনতা খোয়াতে পারব না। চিন্তার এই স্বচ্ছতা, clarity of thought ছিল বলেই শিবরাম খেতে না পেয়েও বেঁচে গেলেন। মানে শুধু জীবনকালে বাঁচলেন না। মরার পরে বেঁচে রইলেন আপামর বাঙালির জনমানসে। যে কাজে তাঁর মন লাগে না, শত মন্দার দিনেও তেমন কাজে তাঁকে কলুর বলদের মত জুড়ে দিতে পারে নি সমাজের জাঁতাকল।

অনেক লেখকেরই জীবনে এরকম সংগ্রাম দেখা যায়। প্রকাশকরা তাঁর সাহিত্যশ্রমের দাম দেবে না, অন্য লেখকেরা গুঁতো দেবেন, লেখক খেতে পাবেন না ইত্যাদি। আজকে যখন ফেসবুকে অনেক সখের লেখককে দুঃখ করতে দেখি আমার লেখা কেউ পড়ে না, আমায় কেউ লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিল না ইত্যাদি তখন মনে হয় বলি, আপনি আপনার জীবনের পান থেকে চুন খসালেন না, সংগ্রাম দূর অস্ত এক গ্রামও ত্যাগ স্বীকার করলেন না, অথচ অমরত্বের খাতায় নাম লেখানোর প্রত্যাশী তা কি হয়? আপনি স্ট্রাগল করবেন না, স্মাগল করে যশ খ্যাতি নিয়ে যাবেন পাঠককুল তেমন ছাগল নয়।     

আর দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি লক্ষ্য করলাম সেটা আতর্থীর ব্যাপারেও লক্ষ্য করেছিলাম। কথাটা কিছুদিন আগে চন্দ্রিলও বলেছিল মনে হয়। বাঙালি এক সময় একটু আলগোছে বাঁচতে জানত। মানে প্রথাগতভাবে পড়াশুনো, চাকরি, বিবাহ সন্তানাদি করা ছাড়াও আরও একটি অল্টারনেটিভ পথ খোলা ছিল আগেকার দিনে বাংলায় (অন্যান্য প্রদেশ বা দেশের খবর জানি না)। ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী হয়েও তখনকার দিনে কেউ কেউ সেই পথে হাঁটত। মানে পরীক্ষায় কিছুতেই পাশ হবে না জেনে যারা স্কুল পালায় সেই ধারার নয়, বরং কলেজের প্রথম দ্বিতীয় পদাধীকারীদের কলিজায় ব্যাথা হলে পারে এরকম ধরণের প্রতিভাশালী কিছু লোকও প্রথাগত শিক্ষার ধার না ধেরে, মানে বাংলায় বলে নিজেকে ধেড়িয়ে দিয়ে বসেছিলেন। তাদেরই কেউ কেউ হয়তো অমরাবতীর পথে যাত্রা করার পরেও জনমানসে অমর হয়ে রয়ে গেছেন । আজকের দিনে সেই সম্ভাবনা কোথায়? রবীন্দ্রনাথকেই দেখুন। প্রপার স্কুলিং হলে তাঁর প্রতিভার এমন স্ফুরণ হত কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অলীক অসম্ভবের সব সম্ভাবনা নিকেশ করে দেওয়ার নাম এডুকেশান। পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন সব নিউক্লিয়াসকে বৃত্তাকারে ঘুরছে ঠিকই। ওরা আমার আপনার মত কলুর বলদ। কিন্তু থাকে কিছু ফ্রী আয়ন। তারাই বিদ্যুৎ পরিবহন করে। এই শিবরাম চক্কোত্তির মত মানুষগুলো তখন ছিল এইরকম ফ্রী আয়ন। কেউ ধরে বেঁধে ধরাবাঁধার গণ্ডীতে আনতে পারে নি। তাই ইনি নিজের সম্পূর্ণ আত্মশক্তিটা দিতে পেরেছেন ভাষার একটু সম্পূর্ণ নতুন ধারার প্রণয়ন করতে। কিন্তু আজকের দিনে সম্ভাবনাময় কোন ছাত্র স্কুল কি কলেজ পালিয়ে ভ্যাগাবন্ড হয়ে যাচ্ছে তার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। প্রায় শূন্যই হয়তো। তাই সাহিত্য কি শিল্পেও সম্পূর্ণ একটা গোলামাল কিছু হওয়ার চান্সও ওই গোল্লা।

যাই হোক মহাস্থবির জাতক আর ঈশ্বর পৃথিবী ও ভালবাসা পড়ে ফেলুন। এমন কাহিনি, জীবন নিয়ে এমন ছিনিমনি, এমনটা আর পাবেন না। পড়তে ল্যাদ লাগে জানি, কিন্তু পড়তে আরম্ভ করলে গল্পের মধ্যে এমন লেদিয়ে যাবেন যে কখন শেষ পাতায় পৌঁছবেন বুঝতেই পারবেন না।  

ইরাবতীতে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধ

গল্প কিভাবে লেখা হয়, ভাল গল্পের বৈশিষ্ট্যই বা কি এই বিষয়ে আমার একটি প্রবন্ধ। প্রকাশিত হল ইরাবতী ওয়েবজিনে।

https://irabotee.com/kahinir-kathgora-by-swarvanu-sanyal/