দর্পিত

আমাদের কৃত্রিম গতিময়তা, আমাদের নিত্যদিনের ব্যস্ত থাকার মানস বিলাস, আমাদের সামাজিক হওয়ার অনর্থক নিয়ত প্রয়াস যখন একটা আনুবীক্ষণিক বীজাণু এসে স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেল তখন চোখ ফুটলো আমার। যেমন করে পাখির ছানা চোখ ফুটেই দেখতে পায় অনন্ত সুনীল আকাশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, রুনুক ঝুনুক প্রসন্নতা ছড়িয়ে আছে আনাচে-কানাচে। যেমন করে বোধোদয় হয় শিশুর যখন সে বুঝতে পারে শব্দ শুধু কয়েকটা ধ্বনির সমষ্টি নয়, তার অন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে একটি অর্থ যা কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে উদ্দিষ্ট করে আর সেই উপলব্ধির গৌরবে সে ক্রমাগত উচ্চারণ করে চলে সেই শব্দ যেমন বাবা, মাম্মা, ক্যাট। এই সাময়িক স্থিতি আমাদের সেইরকম একটা গুরুবোধ দিয়ে গেল যে একটি বিকল্প জীবনপথ আছে, আমাদের বহির্মুখী জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের কাছাকাছি, নিজের কাছের মানুষের কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ আছে।

একটা প্রচণ্ড উন্নাসিক রথ পতপতিয়ে উত্তরাধুনিক সভ্যতার জয়ধ্বজা উড়িয়ে অশ্লীল গতিতে ছুটে চলেছিল আর কোমড়ে দড়ি বাঁধা আমার শরীর হেঁচড়ে হেঁচড়ে এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। প্রায়োন্মৃত রক্তাক্ত শরীর আমার অক্ষম কণ্ঠে বিশ্রাম ভিক্ষা করেছে বারংবার। বধির জয়রথ শুনতে পায় নি। অথবা রথচক্রের ঘর্ঘর ধ্বনির মদোন্মত্ততার সামনে সেইসব অক্ষম রোদন, বিলাপ নেহাতই দুর্বলের প্রলাপ মনে করে ক্রূর হাসি হেসে উপেক্ষা করেছে। হঠাতই সেই রথের গতি শ্লথ হয়ে এল। হঠাতই সময় হল দু দন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রেমিক প্রকৃতিকে গভীর ভাবে দেখা, বীক্ষণ করা। 

সামাজিকতা রক্ষায় আমি দিবারাত্রি সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে নৃত্য করেছি, মনের বাতায়ন খোলার সময় হয় নি দিনের পর দিন। সামাজিক কর্তব্য রক্ষার ডাক, কল অব ডিউটি তে সাড়া দিতে গিয়ে মনজমিন উষর হয়েছে, কালিঝুলি পড়েছে মনের দেওয়ালে, দেউলিয়া হয়েছি অন্তরে অন্তরে। সমাজ বড় দাম্ভিক। সে অসামঞ্জস্যের ধার ধারে না। আত্মগৌরব তার এমনই আকাশচুম্বী সে ব্যক্তির অনন্যতায় বিশ্বাসী নয়। সে যেন এক অনুভূতীহীন মেষপালক যার কাজ ভেড়ার দলকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নির্দিষ্ট পথে নিয়ে চলা। বিপথে চলা পশুটিকে ফিরিয়ে আনা লাঠির ঘায়ে। সেই সমাজ, সেই দোর্দন্ড প্রতাপশালী সমাজ, হঠাতই মাথা নিচু করে চুপ করে বসেছে, বসেছে নিজের সংবিধান পুনর্লিখন করতে। সামাজিক মিলনের নতুন পরিকাঠামো তৈরী করতে বসেছে। আর পৃথিবীর আদিমতম অধিবাসী মাতৃসমা বৃক্ষরা এই শ্লথগতি সভ্যতাকে দু হাত তুলে আশীর্বাদ করছে। আশীর্বাদ করছে নাকি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তার দর্প ঠিক  কতখানি অর্থহীন?

করোনা, এরকম কোরো না।

করোনা, লক্ষ্মী ভাইটি, এরকম কোরো না। এমন করে মাথার উপর চড়ো না। আমি তোমার থেকে বয়সে বড় না?…

এমনটাই বলতে ইচ্ছে করছিল সকাল সকাল। কারণ? শুনুন তবে। সকালবেলা রুজি রোজগারের তাগিদে স্টিয়ারিং ধরেছি। এমন সময় সামনে দেখি করোনা। সঙ্গে সঙ্গে ধাঁই করে ব্রেক টিপে পেছনে বদাম করে পেছনের গাড়ির ধাক্কা খেয়ে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি কান্ড! একটু বাড়িয়ে বললাম। এতকিছু হয় নি। তবে হ্যাঁ সামনের করোলা গাড়িটাকে দূর থেকে করোনা পড়েছিলাম। চোখের সামনে মূর্তিমান করোনা দেখলে মনের অবস্থা যে সদ্যবর্ষণস্নাতা প্রকৃতির মত স্নিগ্ধ শান্ত হয় না সেটা বলা বাহুল্য। করোনা ছড়াচ্ছে বসন্ত মলয় সমীরে, হাওয়ায় হাওয়ায়। তার থেকেও বেশি ছড়াচ্ছে করোনাভীতি। বিশ্ববিদিত আমাদের গুজবপ্রীতি।

তবে সামাজিক মাধ্যমে করোনাকে নিয়ে রসিকতাও কম ছড়াচ্ছে না। একটি জোকস পড়লাম, করোনা ভাইরাস থেকে দূরে থাকতে সকাল সকাল দু কুচি রসুনের কোয়া খান। তাতে করোনার কিছু যায় আসবে না, কিন্তু অন্য লোকেরা আপনার থেকে দূরে থাকবে। আবার একটা পড়লাম, আগে ইঞ্জিনিয়াররা পরীক্ষা করত, কোনো সফটওয়ারে ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। এখন (মেডিকাল) সফটওয়ার পরীক্ষা করছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। কিছু রামগরুড়ের ছানা আবার করোনা নিয়ে রসিকতা শুনলেই আগ্নেয়গিরি হয়ে যাচ্ছেন। মজার ব্যাপার নাকি? কতলোক মারা গেছে জান হে ছোকরা? তা আর জানব না দাদা। চীন চিরদিনই তাদের পরমাণু বোমার সংখ্যা বাড়িয়ে বলে আর দুর্ভিক্ষ, খরা, ভূমিকম্প এবং মহামারীতে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা কমিয়ে। তাই চীন যখন তিন হাজার বলেছে, আমি মনে মনে তিরিশ হাজার ধরে নিয়েছি। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে একটিও না। তাই নিয়েও রসিকতা কম বেরোয় নি। কেউ কেউ বলছে আমাদের রক্তে এমন সব দেশী ভাইরাস আছে যে সস্তার চায়না মেড করোনা ভাইরাস তার সামনে টিকতে পারছে না। তবে আমি কি বলি জানেন? ভাইরাস যদি করোনা না হয়ে করিনা হত, তবে তার আক্রমণে আমি মরতেও রাজি। করিনা কাপুর শুনলেই বুকের মধ্যে ধাঁই ধপাধপ ধাপুর হয়। তবে করোনা ভাইরাসকে বলা যেতেই পারে, করোনা তুমি কেন মরো না? কিম্বা করোনা, তোর মড়ামুখ দেখতে চাই।

তবে এইসব হাসি মজাগুলো শুধু ভয়টা যাতে চেপে বসতে না পারে, তার জন্য। নয়তো সত্যি বলতে পরিস্থিতি যথেষ্ট গন্ডোগোলিয়াস। সতর্কতা অবলম্বন অবশ্যই করুন। বাইরে বেরোলে আপনার মুখোশের ওপর আর একটি মুখোশ পড়ুন। বাইরে থেকে ফিরেই হাত ধুন। এ তো বেসিক হাইজিন। সবাই জানে। তবে হাত ধোয়ার কথায় মনে পড়ল। যাদের একটু হাতটান আছে মানে এই যারা ধরুন পকেট্মার, তাদের বলি, এই সময় কাজ বন্ধ রাখো ভায়া। কারণ পকেট মেরে হয়তো মানিব্যাগ বের করলে, কিন্তু বিনামূল্যে পেয়ে গেলে কিছু অদৃশ্য করোনা। অন্যের পকেট ফুরুত করতে গিয়ে নিজের প্রাণপাখি সুরুত করে খাঁচার বাইরে বেরিয়ে পড়া কোনো কাজের কথা না। তাই যদ্দিন করোনা তদ্দিন অন্যের পকেটে হাত দেওয়ার কাজটি কোরো না। রুজিরুটির ব্যবস্থা করতে রাজনীতিতে যোগ দিতে পারো। চোরেদের ও লাইনে ভালই সম্মান ও প্রতিপত্তি। শুধু কর্‌নার জায়গায় দিতে হবে ধর্ণা। করোনা না বলে বলতে হবে করছি না, করব না।

চাঁদ উঠেছিল গগনে

একজন খুব কাছের মানুষ দেখলাম মোবাইল ক্লিক পোস্ট করেছেন। একটি ছবি। দোল পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র রাশি রাশি চাঁদের হাসি ছড়াচ্ছে। ক্যাপশান দিয়েছেন “চাঁদ উঠেছিল গগনে”। যাক বাবা! অনেকদিন পরে চাঁদ নিজের বকধার্মিক সঙ্গীটিকে সাথে নিয়ে আকাশে ওঠেন নি দেখে চাঁদি ঠান্ডা হল। সঙ্গ পরিত্যাগ করার জন্য চন্দ্রমাকে এবং ওই দাদাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে চন্দ্রিলের একটি ভিডিওতে মনঃসংযোগ করলাম।
তবে কাকে দোষ দিই বলুন। বঙ্গসংস্কৃতি অঙ্গসংস্কৃতি বা গুহ্য-অঙ্গ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে অনেক দিন হল। সেই ব-সূচক শব্দ বাদ দিয়ে কোনো বাক্যই সম্পূর্ণ করেন না এমন পুরুষ বা নারী কম নেই। হঠাত করে সেই ‘ব’ যখন বন্যার মত সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে ফেলল, মনে হল মুখের সামনে কে যেন আয়না ধরেছে। আর সেই আয়নায় নিজের বিকট মুখব্যাদান দেখে ছিৎকারে ভরে উঠেছে আজকের ব-সন্ত। তাই চলুন না সবাই মিলে আর একবার বলি, “চাঁদ উঠেছিল গগনে” – হ্যাঁ, একা চাঁদ উঠেছিল গগনে। হ্যাঁ, শুধু চাঁদ উঠেছিল গগনে।


আর যে অমলকান্তি “রোদ্দুর” হতে পারে নি, তাঁকে বলি রোদ্দুরের কাছে একটা আলোর প্রতিশ্রুতি আমরা আশা করতেই পারি। রোদ্দুরের কাছে অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের পথের দিশা আমরা দাবী করতেই পারি।
শুভ দোল পূর্ণিমা সব বন্ধুকে।

নবীনগঞ্জ

শীত মানেই ভীড় করে আসে এক গুচ্ছ স্মৃতি। এক ঝাঁক বকম বকম পায়রার মতন অর্থহীন সংলাপে ভরে ওঠে মনের উঠোন। ছোটবেলায় শীত মানেই ছিল মায়ের হাতে উলের কাঁটায় বোনা উলটো ঘর। ব্যাডমিন্টন খেলতে থাকা সারা সন্ধে ভর। ছুটির দুপুরে বাবার হাত ধরে পৌঁছে যেতাম কখনো চিড়িয়াখানা, কখন বইমেলা। বয়সটা ছিল পড়া পড়া খেলার। শীত মানেই মনে পড়ে নতুন গুড়ের স্বাদ। ছুটির দুপুর একলা পেলেই ফেলুদা হাতে চিলেকোঠার ছাদ।

সরস্বতী পূজোর আগে কুল খেলে দেবী পাপ দেবেন সেই ভয়ে কক্ষনো চেখে দেখতাম না পাকড়াশি স্যার-এর বাগানের টোপা টোপা নারকোলি কুল। একটু বড় হবার পর বড়জোর একটা দুটো। মা কালির দিব্যি, পুজোর আগে তার বেশি কক্ষনো খাইনি…তাও মনে মনে দেবী হংসবাহিনীর কাছে মার্জনা ভিক্ষা করে। কুল খাওয়ায় দেবীর নিষেধ থাকলেও কুল চুরি করায় ছিল না। তাই এন্তার কুল চুরি করতাম আমি বাবু আর অনুপম মিলে। আমি ছিলাম বৃক্ষ বিশারদ। অর্থাৎ চোখের পলক ফেলতেই গাছে উঠে ফটাফট্‌ কুল ঝেড়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাকে বলে বামাল হাওয়া হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া থুড়ি মানে পাড়াজোড়া। তাই পাড়ার কুল পিপাসুরা শীত পড়লেই চুড়মুড়টা, চুরনটা দিয়ে আমায় যে হাতে রাখার চেষ্টা করত সে কি আর বুঝতাম না! কুল চুরি করে ধরা কখনো পড়িনি ঠিকই, তবে একবার প্রায় মারা পড়েছিলাম। আমাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পাকড়াশি স্যার এক পিস কেঁদো বাঘের বাচ্চা থুড়ি মানে অ্যালসেশিয়ান কুকুর এনেছিল কিন্তু আমার চুড়মুড় সাপ্লায়াররা সে খবর আমায় এনে দিতে পারে নি। তাই যেই না পাকড়াশি স্যার-এর গাছে ওঠা, সেই চতুষ্পদ মূর্তিমান মৃত্যুর কর্ণকুহরে সেই মধুর আওয়াজ প্রবেশ করল। তারপরে যা হয় আর কি..গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে আমিও দৌড়চ্ছি আর হাত পাঁচেক পেছনে আমায় দিয়ে আজকের লাঞ্চটা সেরে নেবার তাগিদে তিনিও দৌড়চ্ছেন। দৌড়তে দৌড়তে ভুবন ডাঙার মাঠ এল। নিশ্চিন্দিপুর এল..গোঁসাই বাগান এল। তারপর পাকড়াশি স্যার-এর কুকুরটা টিনটিনের সঙ্গী snowy হয়ে গেল..রাজলক্ষ্মী এল..ইন্দ্রনাথ..সাঁওতাল রাজকন্যা ভানুমতি এল.. কতবার প্রেমে পড়লাম.. কতবার কতবার মিঠে রোদ্দুরের ওম নিতে নিতে লেবুর খোসা ছাড়ালাম। কত শীতের দুপুরে স্নান না করার জন্য বায়না করলাম আর বাবার ধাঁতানি খেয়ে স্নান করতে গেলাম। আজ হয়তো কোনো ছুটির দুপুরে স্নান করি না। কিন্তু স্নান করতে বলার লোকগুলো কাছে নেই…

বড়বেলা, হে আমার ক্লান্ত বড়বেলা, আমায় নবীনগঞ্জে ফিরিয়ে দাও।

হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে

পৃথিবীর আদিমতম সত্য নারী পুরুষের ভালবাসা। পুরুষ কি চায় সে কন্দর্পদেবও জানেন কিনা জানি না, নারী চায় ভালবাসার সরব উদযাপন। ব্যতীক্রমী নারী থাকবেই কিন্তু ব্যতিক্রমই নিয়মকে প্রমাণ করে। আর সেই প্রেমের উদযাপন করতেই আসে ভ্যালেন্টাইন্স ডে। তাই একটা কার্ড, একটা নরম টেডি, আর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ইলু ইলু। ইলু কা মতলব আই লাভ ইউ। প্রাণের ঠাকুরের পুজোর উপকরণ যেমন গাঁদা,জবা প্রেমের ঠাকুরের পুজোর উপকরণ গোলাপ। তাই ফেব্রুয়ারী চতুর্দশী তিথিতে বাড়ি আসার সময় দেখি রাশি রাশি গোলাপ ফুটেছে ট্রেন জুড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে, “এই যা। ভুলেছি।” অতএব সেই মানুষটাকে টেক্সট করে বলে দাও হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে। যা থাকে কপালে। প্রাচিত্তির এই প্রকার।

কিন্তু প্রেম পুজোর গোলাপের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে আমাজন ওয়েব সার্ভিস। কেন? একটু খোলসা করি। আমাজনের অরণ্যে বিক্রিবাটা হয়। কিন্তু বিক্রিবাটার প্রধান সময় থ্যাঙ্কস গিভিং সপ্তাহান্ত। সেই সময় তার অনেক সার্ভার লাগে। বাকি সময় সেই সার্ভারগুলো করে কি? অতএব সেগুলোকে তারা ভাড়ায় দেয় অন্যকে। এই থেকেই তৈরী আমাজন ওয়েব সার্ভিস। পাড়ার ডেকরেটর যেমন প্যান্ডেল করতে ভাড়া দেয় বাঁশ, কাপড়, আমাজন ভাড়া দেয় হার্ডওয়ার। সে যাকগে। গোলাপের কথা হচ্ছিল। প্রেমপুজোর দিনে গোলাপের খুব চাহিদা আমাজনের থ্যাঙ্কস গিভিং উইকএন্ডের মত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গোলাপ গাছের ভ্যালেন্টাইন নেই। তাই নির্দিষ্ট দিনে তার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে না। তাই ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের ভজকট রুল মেনে বাড়ে গোলাপের দাম। দাম বাড়তে বাড়তে আকাশ ছোঁয়। আকাশে তখন “সুরজ হুয়া মধ্যম”। প্রেমিকার হাতে চুড়ি গলিয়ে দিয়ে গলির শাহরুখ খান বলে ওঠে “কুছ রিস্তে জিসকা কোই নাম নেহি হোতা, সিরফ অ্যাহেসাস হোতা। চুক তো নেহি রাহা”। বাতাস আদর পেয়ে বাঁদর। গলির কাজলের দু এক গোছা অবাধ্য চুল এসে পড়ে কপালে। বাতাসের বাঁদরামিতে।

গলির কাজলের কাজলচোখের গহনে বিকেল হারায়। সন্ধে নামে। চাঁদ তখন বাড়াবাড়ি রকমের নির্লজ্জ হয়ে ওঠে। গলে গলে নামে পৃথিবীর শহরঅরণ্যে জ্যোৎস্না হয়ে। তারপর গলির শাহ্রুখ আর কাজল কি কাণ্ড করে তা আমি দেখি না। চোখ মুদে থাকি। সে গোপন কম্ম ব্রহ্মা জানেন। আমি শুধু জানি, ভালবাসায় ঊষর মঙ্গল গ্রহও সবুজ হয়ে উঠবে একদিন। আমি শুধু বিশ্বাস করতে চাই, এ শহরে ভালবাসায় হেরে যে ছেলেটা আজ অ্যাসিড নিক্ষেপকারী, তার হৃদয়েও গোলাপ ফুটবে একদিন। জানি এ আমার অক্ষম কবিমনের কষ্টকল্পনা। তবু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। আর যে মেয়েটা পোড়া চামড়া নিয়েও করছে জীবন উদযাপন, বিশ্বাস করেছে তার জন্যও আছে এ পৃথিবীর জল, নদী, ফুল, পাখি, আকাশ, তাকে বলি,

হে অগ্নিবর্ণা, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে।

Beauty and the Beast

আমার তিন বছরের কন্যার ভারি টিভি দেখার নেশা বেড়ে যাচ্ছে। তাই আদর্শ বাবার মত ঠিক করলাম ওকে একটু বই পড়ে শোনাতে হবে। আমেরিকানরা তো সন্তানের জন্ম থেকেই বাচ্চার ঘুমোনোর আগে তাকে বই পড়ে শোনায়, তাতে নাকি সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুদের vocabulary বাড়ে। আমি সেই দুঃসাহস করি নি। কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে সানাইকে একটু স্টোরি রীড করে শোনাতে সচেষ্ট হই। তো আজকের গল্প Beauty and the Beast।


বেশ অনেকটা পড়ে ফেলেছি গল্পটা। এক ডাইনি রাজপুত্রকে অভিশাপ দিয়ে কদাকার পশুমানবে, অর্থাৎ একটা Beast-এ পরিণত করেছে। এদিকে Beauty-র বাবার খুব দুঃসময়। ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে ভাঁড়ে-মা-ভবানী হয়ে গেছে। তাও আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া। জাহাজ উদ্ধার করতে গিয়ে ফেরার পথে Beast-এর প্রাসাদে আশ্রয় নেয়। ভুড়িভোজ খেয়েটেয়ে, রাত্রে নরম বিছানায় ঘুমিয়ে টুমিয়ে সকালে যখন Beauty-র জন্য Beast-এর গোলাপ বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়ে নিয়েছে তখন Beast-এর মাথা যাকে বলে একেবারে ভিসুভিয়াস। Beauty-কে পাঠিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি দিয়েছে ওর বাবাকে। রুদ্ধশ্বাস ব্যাপার। বাড়িতে এসে সব ঘটনা বলায় Beauty স্বেচ্ছায় Beast-এর প্রাসাদের উদ্দেশে যাত্রা করছে। Beauty কাঁদছে। Beauty-র বাবা কাঁদছে। আকাশ বাতাস পাখি নদী সবাই কাঁদছে। সমস্ত ক্রন্দসী কাঁদছে বলা চলে। এরকম একটা ভয়ানক বিষণ্ণ মুহূর্তে সানাই জিজ্ঞেস করে বসল, Beauty কাঁদছে কেন বাবা? ও কি ভাতু খায় নি? মাম্মা বকেছে?
লে… সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি? ভাতু-না-খাওয়া-জনিত-মাম্মার-বকা ছাড়াও যে মানুষের দুঃখের আরো কারণ হয় বোঝাতে চেষ্টা করি। সিকুয়েন্স অফ ইভেন্টটা আবার একবার রিপিট মারি। কিন্তু সানাই অলরেডি Beauty-র কান্নার কারণ জানার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। শেয়ার মার্কেটের থেকেও তড়িৎ গতিতে মনের মতি বদলায় ওর। অতএব চরৈবেতি। পরে কি হল জানতে চায়। বাকি গল্পটুকুও পড়ে ফেললাম। Beast-এর Beauty-র প্রতি সহৃদয় ব্যবহার (সুন্দরী মেয়ে পেলে কে আর extra nice ব্যবহার করে না – মনে মনে ভাবছি)। কয়েকদিন Beast-এর প্রাসাদে থাকার পরে Beauty-র বাবার জন্য মন খারাপ। Beast Beauty-কে বাড়ি আসতে অনুমতি দেয়। Beauty বিরহে Beast-এর এই যায় সেই যায় অবস্থা। Beauty-র প্রত্যাবর্তন আর তার চোখের জলে Beast-এর শনির দশা কেটে আবার রাজকুমারে রূপান্তর। অতঃপর Beauty আর রাজপুত্রের বিয়ে-সাদি-সানাই (ইয়ে মানে এটা বাদ্যযন্ত্র সানাই। কথাযন্ত্র সানাই না) । গল্পটা সবাই জানে। কিন্তু মুস্কিল হল গল্পশষে সানাইয়ের প্রশ্নগুলোতে।

সব শুনেটুনে সানাই বলল বাবা, প্রিন্সের মাম্মা কই? খুব-ই চাপের প্রশ্ন। গল্পের লেখক ও পাঠককুল কেউ কোনদিন Beast-cum-রাজপুত্রের বাবা মা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। আগডুম বাগডুম একটা বললাম। পরের প্রশ্নগুলো এইরকম –


বিউটির বাবা কই?
বাড়িতে আছে।
কেন?
কারণ Beauty Beast-এর রাজপ্রাসাদে গেছে তাই।
রাজপ্রাসাদে গেছে। ও। কেন?
কারণ Beast-এর শরীর খারাপ হয়ে গেছে ( গল্পপাঠকালীন কিছুই বোঝাতে পারিনি ভেবে আমার রক্তচাপ বাড়ছে) ।
ও শরীর খারাপ? Beast ডক্করের কাছে যাবে? ইনজেকশান দেবে ডক্কর?
“সেটা দিতেও পারে। কিন্তু এখানে সেরকম লেখা নেই।” গল্পে ডাক্তার বদ্যি আমদানী হবার আগেই আমি তাড়াতাড়ি আর একবার ঘটনাপ্রবাহ বলে দিই। “Beauty-র বাবা Beast-এর বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়েছিল তো। তাই Beast রেগে গিয়ে Beauty কে আসতে বলেছিল।”
বাবা গোলাপ ছিঁড়েছিল? কেন?
আরে Beauty একটা red rose চেয়েছিল না? এই যেমন তুমি কিছু চাইলে বাবা এনে দেয় না?
Beauty red rose কেন চেয়েছে বাবা?
আরে বললাম না, বিউটির বাবা ওকে জিগেস করল, তুমি কি গিফট্ নেবে। তখন ও একটা রক্তগোলাপ চাইল।
ক্রিস্টমাস গিফট্?
হ্যাঁ, ক্রিস্টমাস গিফট্।
Oh. I see.
যাক বুঝেছে। গল্পটা বোঝাতে পেরেছি ভেবে আমি মনে মনে গর্বিত বোধ করি যাকে বলে basking in glory. পরে সানাই-এর থেকে শুনে দেখলাম, গল্পটা আসলে এরকম।


Beauty ভাতু খায় নি। তাই Beauty-কে তার মাম্মা বকেছে। তাই বিউটি কাঁদু করেছে। তখন বিউটির বাবা christmas gift দেবে বলেছে। Beauty-র বাবা Beast-এর বাড়ি গিয়ে ফুল ছিঁড়েছে। তাই Beast বিউটিকে timeout দিয়েছে (যাঃ বাবা, টাইম আউটের কথা বললাম কোথায়? Beauty and the beast-এর গল্পের সঙ্গে এ যে দেখছি নিজের original creation punch করে দিচ্ছে)। বিউটি timeout পেয়ে কাঁদু করেছে। Tears লেগে Beast প্রিন্স হয়ে গেছে। তখন প্রিন্স-এর মাম্মা এসেছে। এসে বিউটিকে ঠিক করে ভাতু খেয়ে নিতে বলেছে (যাক বাবা এটা বলে নি প্রিন্স-এর মাম্মা এসে প্রিন্সকে বলেছে Beauty-র সারা জীবনের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে)।

……এতক্ষণের পণ্ডশ্রমের কথা ভেবে ততক্ষণে আমার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।

লাথি ঝাঁটা

শুনেছি বয়সকালে ছেলেমেয়ের কাছে লাথি ঝাঁটা খেতে হয়। আমার “বয়সকাল” হয়েছে কিনা জানি না কিন্তু কালে কালে বয়স তো কম হল না। বয়সকাল হয়েছে না বয়সটাই কাল হয়েছে বলতে পারব না, আর ঝাঁটাটা ভবিষ্যতে বরাদ্দ হবে কিনা জানি না কিন্তু লাথি বরাদ্দ হচ্ছে এখন থেকেই।

আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য, বয়সে নেহাতই নবীন। তিনি পৃথিবীকে অনুগ্রহ করার পর থেকে একটাই বছর ঘুরেছে, মানে তাঁর বয়স এই মাত্র এক বছর। কিন্তু হলে কি হবে, নিশ্চয়ই আগের জন্মে লিটল বম্ব  তাথৈ দেবী চুনি গোস্বামী থেকে থাকবেন কারণ পা দুটি পুরো ফুটবল-বলিষ্ঠ। ক্ষুদ্র বলিয়া তুচ্ছ নই এই নীতিকথা অনুসরণ করে তিনি সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে, মানে যাকে বলে পাখি ডাকা ভোর থেকে (আমার জন্য অবশ্যই অর্ধেক রাত্রি) পদাঘাত করতে শুরু করেন মানে কাঁচা বাংলায় লাথি মারতে শুরু করেন। বক্তব্যটা হল আমার যখন ঘুম ভেঙেই গেছে তখন তোমরা ঘুমোও কোন অধিকারে? উনি তো সুযোগ সুবিধে মতই একটু গড়িয়ে নেন, আমি হয়তো সপ্তাহান্তের পার্টি প্রেসার সামলে, ধেই ধেই করে নেচে, ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির বাপ বাপান্ত করে, সোনালি তরলের ঘুমঘোর মোহে দেশের দুঃখদুর্দশার কথা বন্ধু সহযোগে তর্কাতর্কি করে, ফেসবুকীয় বিপ্লব সেরে রাত্রি দ্বিপ্রহরে বডি বিছানাতে ফেলেছি। তাই শরীরের বিশ্রামের প্রয়োজনেই এবং মনের বিশ্রামের অধিকারেই ঘুমোই। কিন্তু এ যুক্তি তার কাছে প্লেস করার সুযোগ নেই কারণ যে দু তিনটে ভাষায় আমার সামান্য দখল আছে, আমাদের বাড়ির নবীনতম সদস্য এখনো সেই ভাষায় বাক্যালাপ করতে বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করে নি। তাঁর স্টাইল পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিক। নিজের সুবিধা-অসুবিধা প্রয়োজন-অপ্রয়োজন উঁচুস্বরে নির্দ্বিধায় অন্যের সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি জানান দেন। হিটলার মুসোলিনিও লজ্জা পাবে সেই অথরিটেটিভ স্টাইল দেখে। ধরুন আপনি সকালবেলার প্রথম পটি – না না সকাল সকাল বাজে কথা নাই বা বললাম – ধরুন সকালবেলার প্রথম চা-টা হাতে নিয়ে সোফায় “রাতভর ঘুমোনো ক্লান্ত শরীরটা” একটু এলিয়ে দিয়েছেন এমন সময় বাজ পড়ার মত বাজখাঁই গলায় চিৎকার। আপনি ভাবছেন এই তো সবে ডাইপার চেঞ্জ করে দুধ খাইয়ে সব প্রয়োজন মিটিয়ে দিলাম। কথা হচ্ছে সে প্রয়োজন ছিল শরীরের। এখন তার আত্মার প্রয়োজন আর সেটা হল বাবার কোলে উঠে একটু মর্নিং ওয়াক করা। পিতাপুত্রীর সুসম্পর্ক সাধনের সদিচ্ছা নিয়েই সে সাশ্রু নয়নে জানাবে এই দাবী। কোলে তুলে নিলেই যে দু পাটি দাঁত বের করে এমন নিখাদ স্মাইলটি দেবে দেখেই মনে হবে আগের কান্নাটা ছিল কুমীরকান্না। দু পাটি দাঁত বের কথাটা একটু অত্যুক্তি হয়ে গেল কারণ দু চার খানা দাঁতেরই শুভাগমন হয়েছে সে মুখে। 

যাকগে যাক, কথা হচ্ছিল লাথি ঝাঁটা খাওয়ার। তা হ্যাঁ, লাথিটা নিয়ম করেই খাচ্ছি। তিন বছর আগে খেতাম বড় মেয়ের কাছে। কিন্তু সে এখন রেগে গেলে রাম চিমটি, লক্ষ্মণ কিল ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে (ওর মায়ের কাছে হেভি ঝাড় খাওয়ার সম্ভাবনাটা কনসিডার করে নিজের পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে)। কিন্তু ছোট মেয়ের সে আপদ নেই। এই এক বছর ধরে হোম স্কুলিং-এ বাংলা ভাষা শিক্ষা করে নিশ্চয়ই  ভাষাটাকে তার খুব ফানি ল্যাঙ্গুয়েজ লেগে থাকবে নয়তো তার মা তার ওপরে গলা চড়ালেই দু পাটি না-হওয়া দাঁত বের করে ফ্যাকফ্যাক করে হাসবে কেন? বকাঝকা ভীতির উদ্রেক না করলে বকার উৎসাহ, উদ্যম দুটোই চলে যায়। তো যা বলছিলাম, তিনি বকাঝকার তোয়াক্কা না করেই লাগাতার লাথি মেরে ছটার মধ্যে আমার ঘুমের দফারফা করে দিয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকেন। খিদের মুখে যেমন পৃথিবী গদ্যময়, ঘুমের মুখে তেমনি পৃথিবী রাত্রিময়। থুড়ি ঘুমের চোখে পৃথিবী শত্র‌ুময়। আর সেই শত্র‌ুই যখন ফোকলা দাঁতের হাসি দিয়ে মনজয় করার চেষ্টা করে তখন মনে গৌতমবুদ্ধসুলভ সদ্ভাবনার উদ্ভব হয় না এ কথা অকপটে স্বীকার করাই যায়। তবুও ভদ্রতার খাতিরে মুখে দেঁতো হাসি লাগিয়ে পুতুল সাইজের প্রাণীটাকে জড়িয়ে ধরে সেকেন্ড রাউন্ড ঘুমোনোর চেষ্টা করি। প্রাণপণ। 

সময় চলিয়া যায়

আজ ছিল আমার দ্বিতীয় কন্যার প্রথম জন্মদিন। দিনটা ওদের কাছাকাছি কাটাব বলে দিনভর বাড়ি থেকে কাজ করেছি। কাজের মাঝে মাঝে শিশু কন্যার স্পর্শসুখ। ওর হাতের মুঠির মধ্যে আমার আঙুল যখন আশ্রয় পায়, মনে হয়, শুধু এই সুখটুকুর জন্য আরো হাজার জন্ম নেওয়া যায়। আজ ওর জন্মদিন। আজ ওর জন্য একটু বেশি আদর। আজ ওর সাথে একটু বেশি খেলা। মনে মনে হয়তো বা বলা – “আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা, প্রিয় আমার, ওগো প্রিয়।” 

সঙ্কর প্রজাতি আমরা। সকাল বেলা বাঙালি মতে পায়েস আর ওর মায়ের পরম যত্নে রান্না করা পঞ্চব্যাঞ্জন আর সন্ধেবেলা বিলিতি মতে একটু কেক। ছিমছাম একটা আনন্দের দিন। কিন্তু দিন…সে তো শেষ হয়। সন্ধ্যা আসে। রাত্রি নামে। জেগে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে প্রতি রাতেই আমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটা। আজকেও ব্যতিক্রম হল না। ওর ঘুমিয়ে পড়া ছোট্ট, ভীষণ ছোট্ট শরীরটা দেখলে মনে হয় কোথা থেকে যেন একটুকরো প্রাণের কণা বসন্তের মলয় সমীরে উড়ে আমাদের মাঝে এসে পড়েছে। অনেকটা মানুষ মানুষ কিন্তু ঠিক মানুষ না। যেন একটা খেলনা মানুষ। জীবনের পরীক্ষাগারে আরও একটা ছোট্ট মডেল, আরো নতুন কিছু সম্ভাবনা। 

ওকে বিছানায় শুইয়ে দিতে এসে হঠাৎ বুকের মধ্যে ছাঁত করে উঠল। তাহলে একটা বছর ঘুরে গেল ওর জীবনের। সূর্যের বাহুলগ্না হয়ে যে ব্যালে ড্যান্স শেষ হাজার কোটি বছর ধরে করে চলেছে পৃথিবী, তার আর একটা অধ্যায় সমাপ্ত হল। সূর্যকে ঘিরে মহাশুন্যপথে পুরো এক পাক ঘুরে নিল নীলগ্রহ। ওর অজান্তেই ওর বয়স এখন এক। অসীম নিষ্ঠা ভরে এই বারো মাসে শিখে নিয়েছে অনেক কিছু। মাতৃস্তন্য পান থেকে শুরু করে উবুড় হওয়া, তারপর হামাগুড়ি দেওয়া আর সর্বশেষে টলোমলো পায়ে হাঁটতে চলার এক বছরের নিবিড় জীবনপাঠ। জীবনের রসদ প্রাণপণে ঠুসে নিচ্ছে নিজের ক্ষুদ্র শরীরে। এখন শুধুই নেওয়ার পালা। স্নেহ সঞ্চয়, জীবনের রসদ সঞ্চয়। কিন্তু দেওয়ার বেলাও আসবে। কুঁড়ি মানুষটা যে সম্ভাবনাগুলোর সমষ্টি, তার কতটা রূপায়িত হল সেটা জানার জন্য গুঁড়ি মেরে অপেক্ষা করছে মহাকাল। 

আমি ভাবি, ওর জীবনের আরো একটা বছরের সূচনা হয়ে গেল অথচ কোনো ওয়ার্নিং বেল বাজল না, কোনো ঘন্টি বাজল না, কোন মহাপ্রাণ এসে কানে কানে বলে গেল না “সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়, যে জন না বোঝে তারে ধিক, শত ধিক।” টিক টিক টিক। ঘড়ির কাঁটার অনিবার্য ঘূর্ণন যা প্রতিনিয়ত আমাদের জীর্ণ করে, আমাদের ছায়াকে দীর্ঘতর করে তার চলন এতই ধীরে যে তা বুঝতে বুঝতেই অনেক কটা গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত পার করে এখন আমি জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। মহাকাল। পাহাড়ি দস্যুর মত বজ্র মুষ্টি তার অথচ ভোরের শিউলির মত নিঃশব্দ পদসঞ্চালন। আবার খুব হীনবৃত্তি নিন্দুকের মতই judgemental, ছিদ্রান্বেষী। সে চলে যাবে আপন তালে। বলবে না, “একটু তাড়াতাড়ি পা চালাও ভাই। তোমার তো সন্ধ্যা নেমে এল।” অথচ প্রতিটা মানুষকে তার শেষ স্টেশানে নামিয়ে দেবার দিনে করবে চুলচেরা বিচার। বিচার করবে যে,  সে মানুষটার লোটা কম্বল, জীবনের সঞ্চয় বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, নাকি তার সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই শ্রেয়। কালের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গহ্বরে তাকে নিক্ষেপ করে চলে যাবে, নাকি ক্ষীণ একটা বাতি ধরে দিয়ে যাবে যাতে ভবিষ্যত তার খবর পায় – সেই বিচার। মহাকাল। জীবৎকালে নীরব সাক্ষী, মরণকালে চুলচেরা বিচারক। আমার ফেলে আসা বছরগুলোর দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে তাই বলতে ইচ্ছে করে, “সে চলে গেল, বলে গেল না। সে কোথায় গেল ফিরে এল না। সে যেতে যেতে চেয়ে গেল। কি যেন গেয়ে গেল। তাই আপন মনে বসে আছি…”। আপন মনে বসে আছি…আপন মনে বসে আছি…

আমার এই যে হাসি, এই যে কান্না, এই যে প্রেম, এই যে বিরহ, এই যে স্নেহ, এই যে ঘৃণা, এই যে রমণ ইচ্ছা, এই যে মহোত্তমের খোঁজ – জানি জানি তুমি কিছু নেবে না এ সবের। জানি তুমি আমাকে নেবে না। শুধু যে কটি ফুল ফুটিয়েছিলাম মনের উঠোনে, হে নির্দয় মহাকাল, সে ফুলের সাজি রাখবে কি তোমার অক্ষয় মালঞ্চে?

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৪

May 25, 2019, Morning

ব্লগটা লেখা যখন শুরু করেছিলাম বছর তিনেক আগে, ভাবি নি সেটা এতো পাঠকের চোখ পাবে। তবু পেল যখন তখন যযাতির ঝুলিকে মুদ্রিত মাধ্যমে নিয়ে আসার কথা মাথায় এলো স্বভাবতই। আমার কলমকে কালি দিল পত্রভারতী। বইমেলায় বইটি বেরিয়েছে এবং অনেকেই সংগ্রহ করেছে। তাই বাকি দু-দশ কপি যা পড়ে আছে সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়লাম কলেজ স্ট্রীটের দিকে। গন্তব্য পত্রভারতীর অফিস। এই কপি কখানা আমার ইউ এস এর কিছু সুহৃদ্‌ বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাব। আমার একা কোথাও যাওয়ার থাকলে সাধারণত ট্রামে বাসে যাই, জীবন দেখতে দেখতে। পত্রভারতীর যে আধিকারিক আসতে বলেছেন তার নির্দেশ অনুযায়ী রামরাজাতলার থেকে হুগলি সেতু দিয়ে যাওয়াটাই তাড়াতাড়ি হবে। বাকসাড়া মোড় অব্দি টোটোয় গিয়ে একটা গরম বাসের জঠরে সেঁধিয়ে গেলাম। মাতৃ জঠরে থাকার অভিজ্ঞতাটা মনে নেই। তবে আন্দাজ করতে পারি এই বাসের পেটের মতই হবে। ঠাসা, গরম আর ভেজা ভেজা। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচনী আসর জমে উঠেছে। বাসের গরমে ইলেকশানের বাজার আরও সরগরম হয়ে উঠেছে। হাত জোড় করে ভিক্ষাপাত্র থুড়ি ভোটপাত্র হাতে দাঁড়িয়ে জননেতারা, পোস্টারে, পোস্টারে। নির্বাচনী আসরে, বাসের গরমে, গরম আলোচনা হচ্ছে অফিসযাত্রীদের মধ্যে। এই একটাই সময়ে মানুষ এই জননেতাদের মাটিতে টেনে নামায়। 

জানলা পথে একটা বিজ্ঞাপন দেখে মনে মনে একটু তারিফ না করে পারলাম না। ওরিপ্লাস্ট বলে একটা ব্রান্ড অ্যাড দিয়েছে, “দরের থেকে কদর বেশি”। আমরা যারা পানাসক্ত অর্থাৎ পানিং-এ আসক্ত এমন সুন্দর pun দেখলে মুখে এক চিলতে হাসি চলে আসে বৈকি। রবীন্দ্রসদনে বাস থেকে নেমে আমার পাতাল প্রবেশ। অর্থাৎ পাতাল রেল ধরব। “তুমি কি শুনেছ মোর বাণী, হৃদয়ে নিয়েছ তারে টানি / জানি না তোমার নাম, তোমারেই সঁপিলাম আমার ধ্যানের ধনখানি।” – লেখা আছে মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে। আহা কি কথা। ঠিক যেন tailor made আজকের এই ক্ষণখানির জন্য। আমাকেই সঁপেছেন, একটা গোটা শতাব্দীর ওপার থেকে শুধু আমাকেই সঁপেছেন কবিবর তাঁর ধ্যানের ধনখানি, তাঁর সুললিত শব্দভান্ডার। সার্থক কবি আপনি, হে রবীন্দ্রনাথ। এতদিন পরেও বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরোনোর পর থেকেই নতুন প্রজন্ম এক অনিবার্য আকর্ষণ বোধ করে আপনার বাণীর প্রতি। কিছু নির্বোধ আঁতেল নিশ্চয় আপনাকে খাদারে ফেলে দিতে চায় তবে তাদের লেখা বছর পার করতে পারে না। আপনি তো শতবর্ষের পরেও অমলিন। রবি ঠাকুরের দেশ থেকে আমি যাব গান্ধীজীর দেশে। অর্থাৎ কিনা রবীন্দ্রসদনে উঠে আমার মেট্রোমুক্তি মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে। তাঁকে মহাত্মা নামটা ঘটনাচক্রে এই রবীন্দ্রনাথই দিয়েছিলেন। মেট্রো রেলের দরজা বন্ধ হতেই নিশ্চিন্তি। কলকাতার যানজটের তোয়াক্কা না করে সাঁই সাঁই করে এগিয়ে চললাম আমার গন্তব্যের দিকে। 

“স্টেশান রবীন্দ্র সেডান, পরবর্তী স্টেশান ময়ডান।” কৃত্রিম অ্যাক্সেন্ট মেরে ঘোষণা করে এক নারীকণ্ঠ। সত্যি সেডান-ই বটে। সদন কথাটা মোটেই যুগোপোযোগী নয়, ম্যাদামারা মিয়নো বিস্কুটের মত। তার থেকে সেডান “একেবারে কড়ক আছে”। বাংলা ভাষার ‘ত’ থেকে ‘ধ’ অব্দি অক্ষরগুলো ব্যান করে দেওয়া উচিত। ‘ট’ থেকে ‘ঢ’ অব্দি তো আছেই। আমাদের দু-শ বছরের পলিটিকাল মাস্টাররা ‘ত, থ’ বলতে পারে না যখন তখন ওই বর্ণ কখানার নিশ্চয়ই অস্তিত্বসঙ্কট।  

বার বার পকেটের মধ্যে মেট্রো রেলের প্লাস্টিক টিকিট হাৎড়াই। ওইটা ছাড়া বেরোতে পারব না। আর জিনিসপত্র হারানোর ব্যাপারে আমার মেলা বদনাম আছে। বছরে গোটা তিনেক ছাতা আর একখানা অন্তত মানিব্যাগ আমি পরার্থে পথে দান করে আসি। কিন্তু টিকিট হারালে পাতালজীবন থেকে মুক্তি পেতে টিকি মাথায় উঠবে। 

মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে নেমে অটো ধরার নির্দেশ দেওয়া ছিল। আমার কোনদিকে যেতে হবে একে তাকে জিগেস করতেই সুলুক সন্ধান পাওয়া গেল। কলকাতার এই এক সুবিধে। অন্ধের জষ্টির মত পথচারীরা আছেন যাঁরা পথের সুলুক সন্ধান দেবে। দেবেই দেবে। চড়ে পড়লাম অটোতে। অটোটা যখন আরো যাত্রী তোলার জন্য গড়িমসি করছে আমি দেখছিলাম ঝুড়ি ঝুড়ি ঝুড়ি-মানুষ। সেটা কি? সেটা হল কিছু প্রকাণ্ড ঝুড়ি। সার সার রাখা আছে। আর তার ভেতরে গুটলি পাকিয়ে শুয়ে রোদ-গরমে বিশ্রাম নিচ্ছে ঝুড়ির মালিক বোধ করি। ঝুড়ি পিছু একজন। যে ঝুড়ি তার জীবিকা সেই ঝুড়িই তার বিশ্রামাগার। এমন চমৎকার দৃশ্য, ঝুড়ির এমন অভিনব ব্যবহার কলকাতা ছাড়া কোথায় দেখতে পাবো? খুব লোভ হচ্ছিল ঝুড়ি মানুষের কাছে একটা বিড়ি টিড়ি চাওয়ার অছিলায় একটু আড্ডা মেরে নিতে। বহুবার করেছি। নস্টালজিয়া খুব পাওয়ারফুল ড্রাইভার। দেশ-গাঁয়ের কথা বললেই এনারা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। এদের মধ্যে যা গল্প আছে তা দিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায় সহজেই। কিন্তু আজ সময় নেই। সময়ে পৌঁছনর একটা বদনাম আছে আমার। ঝুড়ি মানুষদের পেছনে ফেলে আমাদের অটো এগিয়ে চলল। 

যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে সেটা ঝাঁ চকচকে কলকাতা নয়। “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণা” যত্রতত্র অর্থাৎ কিনা পলিটিকাল পোস্টার। সারা কলকাতা যেন একটা ফলাও দিদি এ্যালবাম। পাশেই অবিশ্যি কাস্তে-হাতুড়ির ত্রিকোণ পতাকা। সোনালি স্বপ্নের দিন নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতাদের হাত জোড় করে ভোট ভিক্ষা। নেতাগণ, নেতৃগণ আর কত বছর, আর কত যুগ অপেক্ষা করবে বাঙালি সেই সোনাঝরা দিনের জন্য? রাস্তার কল দিয়ে মোটা ধারায় জল পড়ছে আর সেই জলে পথশিশুরা স্নান সারছে। এই গরমে জলকেলি করতে পেরে তাদের মুখে পরম পরিতৃপ্তি। একটা কাক, সেও গরমে কাহিল, একটু গা ধুতে চায়। একবার করে উড়ে এসে সে-ও একটু জলে ঝটপট করে নিচ্ছে ডানা। আবার তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে। এ শহরের পাখি বলতে ওই এক কাক। দেখে নিন। প্রাণ ভরে দেখে নিন তার চিকণ শ্যামল গা। কান ভরে শুনে নিন তার কর্কশ সঙ্গীত। কারণ, পঞ্চাশ বছর পরে এরাও থাকবে না। মানুষ ছাড়া আর কারু বাঁচার অধিকার নেই, এ আমাদের মানবজাতির দৃপ্ত ঘোষণা। জরাজীর্ণ বাড়ি, তাতে বট গাছ মাথা তুলেছে কার্নিশে। দ্বিপ্রাহরিক আজান ভেসে আসছে কাছেই কোনো দেবস্থল থেকে। দুপুরের গনগনে আগুনে পান বিড়ির দোকানে বসে খদ্দেরের অভাবে ঢুলছে দোকানদার। আমার ছোকরা অটো ড্রাইভার বেশ চড়া ভলিউমে কাওয়ালি লাগিয়েছে তার বাহনের স্টিরিও সিস্টেমে। “আল্লাহ জানে ক্যা হ্যায় মহম্মদকা মারতাবা”। সত্যি-ই যেভাবে মানব সভ্যতার অকল্পনীয় বিস্তার হয়েছে শেষ বিশ বছরে, তাতে আল্লাহ্ই জানে কোথায় গিয়ে ইতিচিহ্ন টানা হবে, ঈশ্বরের সন্তানের স্থান এখন ঠিক কোথায় বলা মুস্কিল। গানের তালে তালে ছোকরা মাথা নাড়ছে। পথশ্রম তুচ্ছ করে, রোজকার দৈনন্দিনতার ক্লেশ তুচ্ছ করে সঙ্গীতের সঞ্জীবনী তাকে উজ্জীবিত করছে। আর একটু যেতেই অটোচালক ছোকরাটি নামিয়ে দিল যেখানে সেখান থেকে কলেজ স্ট্রীট পায়ে হাঁটা দূরত্বে। 

অদ্ভুত এই বইপাড়া এই কলেজে স্ট্রীট। সারা পৃথিবীতে এরকম একটা সারস্বত সাধনার জায়গা আর একটিও নেই। বইয়ের ভারে ন্যুব্জ আর জ্ঞানভারে মন্থর। কাশির গলির মত অপ্রশস্ত পথ। একদিকে প্রতিষ্ঠিত দোকান আর একদিকে স্টল করে বই বিক্রি করছে খুচরো ব্যাবসায়ী। পুরীতে যেমন পান্ডারা ছেঁকে ধরে সেরকমই এই পথ দিয়ে গেলেই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কানে আসবে “দাদা, আপনার কি বই চাই বলুন না”। আর এদের অদ্ভুত বইয়ের জ্ঞান। যেকোনো বইয়ের নাম বললেই হয় আনিয়ে দেবে নয় বলে দেবে কোন দোকানে পাওয়া যাবে। আমি মূলত এসেছি আমার প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছেছি। কলেজ স্ট্রীট এসেছি আর লোভী মৌমাছির মত বইয়ের খোঁজে গলিতে গলিতে ঘুরব না তা কি হয়? দু একটা বইয়ের খোঁজে ছিলাম। লেখালেখি সামান্য করি কিন্তু আমি মূলত পাঠক। দেজ-এর কাউন্টারে গিয়ে আমার লিস্টি থেকে বইগুলো বলছি আর প্রদীপের দৈত্যর মত বইগুলো সামনে এনে ফেলছে একটা অল্পবয়সী ছেলে। যেন কতদিন ধরেই জানতো এই বইগুলো আমি চাইব। সে যা হোক কলেজ স্ট্রীটের একটা ব্যাপার হল, হরেক ধরণের পাঠক দেখা যায় এ চত্বরে। এক বৃদ্ধা মহিলা নজরুলের একটি বিশেষ গানের খোঁজে এসেছেন। নজরুলের গানের যত সঙ্কলনই দেখাক তিনি বলছেন না এতে ঐ গান নেই। তবু ক্লান্তি নেই দোকানের কর্মচারীদের। এক এক করে দেখাচ্ছে অন্য অন্য সঙ্কলন। আমি আমার বই কটার দাম দিয়ে ঝোলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার আমার প্রকাশকের সঙ্গে বসব আমার প্রকাশিত বইটার ভবিষ্যৎ নিয়ে।

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

পর্ব ৩ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৩

May 22, 2019, Morning

মার্কিন মুলুক থেকে কলকাতা ফিরলে থাকে একটা বাৎসরিক অনু্ষ্ঠান। তার নাম ভিসা স্ট্যাম্পিং। আমেরিকায় ঢোকার অনুমোদনপত্র নবীকরণ করতে হবে। তাই দেশে পৌঁছে সপ্তাহান্তটা বাড়িতে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভিসা অভিযানে। আমাজন অভিযানের থেকে সেটা কিছু কম উত্তেজক ঘটনা নয়। পার্থক্য হচ্ছে আমাজন হল রেইন ফরেস্ট, আর মে মাসের  কলকাতা হল বৃষ্টিহীন কংক্রিটের অরণ্য। প্রথম দিনেই বাসে ট্রামে যাওয়ার রোমহর্ষক কিম্বা স্বেদসিঞ্চক ঘটনা ঘটাতে রাজি হল না স্ত্রী। তাই বাড়ির গাড়ি এবং ড্রাইভার বাবুদা। বাবুদা গাড়ি চালানোটা শিখেছে ঠিকই কিন্তু কলকাতার মানচিত্রটা শেখেনি। আর মাপ করবেন পৃথিবীর কোন শহরেরই ম্যাপ আমি কোনদিনও আত্মস্থ করতে পারি নি। অতএব গুগল দেবতাকে স্মরণ করা হল। গন্তব্য হো-চি-মিন সরণী। ইউ এস কনসুলেট। বাবুদার অসাধারণ কলকাতাপ্রীতি হোক বা গুগলের নির্দেশ অমান্য করার ধৃষ্টতাই হোক, কোনো একটা কারণে মোটামুটি পার্কস্ট্রীট চত্বরের প্রায় প্রতিটা গলি থেকে বড় রাস্তায় চাকার ধুলো দিয়ে যখন কনসুলেটে পৌঁছলাম তখন অনেক বেলা। গিয়েই বুঝলাম ছড়িয়েছি। শুধুমাত্র ভিসা ইন্টারভিউ দেওয়ার থাকলেই এখানে আসতে হয়, আমি করতে এসেছি ভিসা রিনিউয়াল। সে কাজ হয় শেক্সপিয়ার সরণী থেকে। কনসুলেটের নিরাপত্তারক্ষী বুঝিয়ে দিল হো-চি-মিনের পদপ্রান্ত থেকে শেক্সপীয়ারের সান্নিধ্যে পৌঁছনোর রাস্তা। মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। বাবুদার ম্যাপজ্ঞানের অনুগ্রহে আর কলকাতার ওয়ান-ওয়ে রাস্তার নিগ্রহে এই দশ মিনিটের হাঁটাপথ তিরিশ মিনিটের গাড়িপথ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে মনে করে হাঁটাই মনস্থ করলাম। যমলোকে শুনেছি পাপীদের ফুটন্ত তেলের কড়াইতে নিক্ষেপ করা হয়। পাপকর্ম জীবনে কম করি নি ! তাই যমলোকে জীবন্ত মানুষের মত বোশেখি দাবদাহে দগ্ধ হতে হতে অতঃপর শেক্সপিয়ার সরণীর ভিসা অফিস। 

এই কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে একটা ফলভারে বিনম্র আম গাছ এক টুকরো মরূদ্যানের মত আগলে রেখেছে জেসমিন টাওয়ার। ঢুকে পড়ে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সাবমিট করতেই চমক। ছবিটা নাকি স্পেসিফিকেশান মত হয় নি আর তাছাড়া একটি ডকুমেন্ট লাগবে যা আমি নিয়ে আসিনি। মাথায় বজ্রাঘাত হলেও এর থেকে কম পাথর হতাম। এই গরমে অন্য একদিন জেসমিন টাওয়ারের চক্কর কাটতে হলেই চিত্তির। বাইরে অপেক্ষারত স্ত্রীরও গরম বাণী নসীব হবে। “ঠিকঠাক দেখে ডকুমেন্ট আনো নি” এইবিধ আক্রমণের আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে প্রতিরক্ষাস্বরূপ নিজের যুক্তি পেশ করি, “ওয়েবসাইটে ঠিক করে কিছু লেখা নেই”। কিন্তু চুপি চুপি বলে রাখি, ওয়েবসাইটে ঠিকই লেখা ছিল। আমি সব কিছু একটু ক্যাজুয়াল নিই বলেই আজ এই হাল। হালে পানি কিভাবে পাই, পা ছড়িয়ে বসে ভাবছি, এমন সময় নিরাপত্তারক্ষীর অম্লমধুর আবেদন, “এখানে ওইভাবে পা ছড়িয়ে বসবেন না”। তাই শুনে এক অচেনা প্রিয়দর্শিনীর মুখে এমন একটা অপ্রিয়দর্শন বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তাতে স্বকীয় অভব্যতার প্রতি যথেষ্ট লজ্জিত বোধ করলেও গরমে মতিভ্রম হয়েছে মনে করে মনে মনে নিজেকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ইন্টারনেটের খোঁজ। যদি মিসিং ডকুমেন্টটা পাওয়া যায় কোনভাবে। আমার মত মুর্গিদের জাঁতাকলে পেষবার ব্যাবস্থা সামনেই। অনেকেই ভিসা ফর্মের প্রিন্ট আউট নিয়ে আসে না বলে ঝোপ বুঝে কোপ মারার ব্যাবস্থা। ইন্টারনেট ক্যাফেতে ঢুকতেই এক মাড়োয়ারী ভদ্রলোক জানিয়ে দিল ভিসা ফর্মের প্রিন্ট নিতে পাঁচশ টাকা লাগবে। সবিনয়ে জানাই আমি সেই অপরাধে অপরাধী নই। অন্য ডকুমেন্ট প্রিন্টপ্রার্থী। দেড় মিনিটের ইন্টারনেট সার্ফিং আর প্রিন্ট করার মূল্য ধার্য করল দুশ টাকা। অন্যায্য। তবু তৃষ্ণার্তকে এক ফোঁটা জল দিলে যেমন সে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে আমিও করলাম। এইবার ভিসা স্পেসিফিকেশান অনুযায়ী ছবি তুললেই এ যাত্রা কাজ উদ্ধার হবে। সন্ধান পাওয়া গেল যে বি কে মার্কেট বলে এক জায়গায় একদম মার্কিনদের মনোমত ছবি তুলে দেবে কিন্তু হাঁটতে হবে বারো থেকে পনের মিনিট। “আরাম হারাম হ্যায়” – এই মন্ত্র জপ করতে করতে হাঁটতে লাগালাম। পথ হাঁটতে আমার খুব ভাল লাগে। জীবন থাকে। যাপন থাকে। সাহিত্যিকদের শুনেছি এক জোড়া অতিরিক্ত চোখ থাকে। আমি তেমন লেখিয়ে নই। তবু চোখ খুলে রাখতে চেষ্টা করি। চলুন আমার সাথে হাঁটুন। দেখি কেমন কলকাতা?

ওই তো একটা উভলিঙ্গ (unisex) সেলুন। বাইরের দেওয়ালে এক শ্বেতাঙ্গী, বিদেশিনী, সুন্দরীর মোহময়ী আমন্ত্রণ। ভারতীয় চোখ সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে শ্বেতাঙ্গী ও বিদেশিনীদের এখনো দু দশ নম্বর বেশি দিয়ে থাকে। আর দু পা হাঁটতেই প্রতিস্পর্ধী নগর সভ্যতার পাশাপাশি উপস্থিত কিছু হেরে যাওয়া মানুষ। ইটালিয়ান সেলুন – অর্থাৎ ইঁটের ওপর বসিয়ে নরসুন্দর ওরফে নাপিত চুল দাঁড়ি কাটছে। লেখা না থাকলেও এ সেলুন উভলিঙ্গ নয়, শুধু পুরুষ প্রাণীদের জন্য। আছে ফুটপাথে বসা লিট্টি বিক্রেতা। জীবনদায়ী ছাতুর সরবত কেবল মাত্র দশ টাকায়। না…খাওয়ার স্পর্ধা আমার নেই। আমি সুখী পান্থজন মাত্র। বিহারী ভোজনের পাশেই বিশুদ্ধ বাঙালি ভোজনেরও ব্যবস্থা। ভাত ডাল দু কুচি আলুভাজা আর মাছের ঝোল প্লেটে প্লেটে পরিবেশন হচ্ছে। একটা আনুবীক্ষণিক সাইজের পাতিলেবুও আছে। এই গরমে ওটাই অমৃতের চাঙ্গড়। মাছ কিন্তু ভাগাড়ের হয় না। শুধু জলেই তাদের প্রতিপত্তি। খাবার স্পর্ধা নেই তবু অনুসন্ধিৎসু মন দাম জিজ্ঞেস করে। মাত্র পনেরো টাকা।পাশেই পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। ক্লাসিক ব্র্যান্ডের সাদা কাঠির দাম পনেরো এখন। দু মিনিটের ফুসফুস ফুটো করার বিলাস আর এক পেট ভাত একই দামে পাওয়া যাচ্ছে পাশাপাশি দোকানে। আজও কলকাতা তার হেরে যাওয়া সন্তানদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেয় নি। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে ঠিকই কিন্তু কিছু বিজ্ঞাপন মুখে মিচকি হাসিও আনে কখনো সখনো। চোখে পড়ে গেল একটা বিজ্ঞাপন। “হার পানি কা বোতল বিসলারি নেহি” – জলসঙ্কটে পড়া এক উট অন্য সব জল দেখে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, শুধু বিসলারির বোতল পেলে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। এই আর্বান ঊস্ট্রকে দেখে একটু হাসতেই হল। নিখাদ হিউমার। দু পয়েন্ট দিতেই হল বিসলারিকে।  জল ভাবতেই দেখলাম রাস্তার ধারে এক গামলা জল রাখা। আর কাকেরা তেষ্টা মেটাচ্ছে। আমাদের মত লব্ধপ্রতিষ্ঠরা নয়, পাখিদের জন্য জল রেখে দেওয়ার এই সহৃদয়তা হয়তো ঐ মুচিটার যে ওখানে বসে ঘামতে ঘামতে জুতো সেলাই করছে কিম্বা ঐ জাঁতা হাতে ইঁটের ওপরে বসা লোকটার যার পেশা সুপুরি পেষা। আবার একটু এগোতেই সুতানুটি কাফের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আমন্ত্রণ। তিন সহোদর ভাই কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর। সময়ের সাথে ভাই গোবিন্দ আর সুতানুটির থেকে সব জমি হড়পে নিয়েছে ছোটভাই কলকাতা। গোবিন্দপুর তো ধ্যারধেরে হয়ে অখ্যাত হয়েছে। সুতানুটির নামে কাফে তাই তার হারানো জমির জন্য বিচার প্রার্থনা করছে। হাঁটতে থাকি। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে ইলেকশান সিজন। পাশাপাশি ছবিতে সহাবস্থান দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ভোটপিপাসু নমস্কার মুদ্রায়। হাসির বিষয় নাকি লজ্জার বিষয় জানিনা, কোনো মা-মাটি-মানুষ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মুদিতা প্রদর্শন করতে প্রতিটা ছবিতে তাঁর চোখ দুটো গেলে দিয়ে গেছে। ঈশ্বর(চন্দ্র) যেখানে মুণ্ডুহীন, সেখানে দেশের কর্ণধার চক্ষুহীন হবেন, আশ্চর্য নয়। সুপুরি কাটার দোকানের থেকে একটু এগোলেই চুনের একটা বড় গামলা। বিনামূল্যে। সুপুরির সাথে চুনের জন্মান্তরের আত্মীয়তা। হঠাৎ মনে পড়ল, কলকাতার সাথে চুনের সম্বন্ধও অঙ্গাঙ্গি। কলকাতার নাম নিয়ে অনেক মত প্রচলিত। একটি মতে কলকাতা এসেছে কলি-কাতা বা চুনের ভাটি শব্দ থেকে। 

দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম বি কে মার্কেটে ছবি তোলার স্টুডিওতে। দাম আবার গলাকাটা। তিনশো টাকা এক এক জনের। বোঝা গেল অনেকেই ভিসা অফিস থেকে নাকচ হয়ে ভরাডুবি থেকে উদ্ধারে এই স্থানে আগমন করে থাকেন। কিন্তু বাচ্চা ছেলেটির হাতটি ভাল। মুহুর্তের মধ্যে ফটোশপ করে ব্যাকগ্রাউন্ড করে ফেলল ধপধপে সাদা ঠিক যেমনটা মার্কিন কনসুলেট চেয়েছে, মুখের ওপর পড়া অবাধ্য চুলেদের কাঁচি করে দিল ম্যাজিকের মত। আমার স্ত্রী ছবি তুলতে ভীষণ ভালবাসেন। তিনি এমন এক রিফ্লেস্ক তৈরী করেছেন যে ক্যামেরা তাক করলেই বারোটা বাজতে পাঁচ কিম্বা বারোটা বেজে পাঁচের ভঙ্গিতে মাথাটা সাইডে হেলে যায়। মাথার বারোটা বাজানোর জন্য অর্থাৎ মাথাটিকে সিধে রাখতে ফটোগ্রাফের ছেলেটিকে বেশ বেগ পেতে হল। সেই নিয়ে একটু ঠাট্টা করছিলাম। কিন্তু যে হারে গরম বাড়ছে আর বাড়ছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে কমছে রসবোধ। তাই রসিকতাগুলো অপাত্রে গেল। ছেলেটির মুখে হাসির রেখাও দৃষ্ট হল না। সে যাই হোক, তার তোলা ছবি আর ইন্টারনেট কাফে থেকে পাওয়া ডকুমেন্ট বলে বলীয়ান হয়ে আবার ফিরে গিয়ে কাজটা উদ্ধার হয়ে গেল। 

ভিসা স্ট্যাম্পিং-এর জন্য পাসপোর্ট জমা করে যেই বেরোলাম, ব্যাস বেজে গেল ছুটির ঘন্টা। ভিক্টোরিয়ার পরীর ডানা দুটো ধার করে কপোত কপোতী উড়ে চলল দক্ষিণ দিশায়। দক্ষিণাপন। শপিং টাইম। সেখানে বিশ্বের সমস্ত অদরকারি জিনিসের সম্ভার। কিন্তু বানিয়েছে বাংলার শিল্পীরা। প্রতিশ্রুতি সমস্ত লাভের গুড় নাকি তাদের ভাগেই যায়। সত্যতা জানা নেই। পথে পড়লো গড়িয়াহাট ব্রিজের নিছে চেস ক্লাব। কদিন আগেই তার উপরে প্রতিভাষণ শুনছিলাম একটা। সূর্যের প্রবল দাপটকে প্রতিহত করছে ব্রিজ আর তারই ছায়ায় গুটি সাজাচ্ছে মহারথী দাবাড়ুরা যাতে অন্যের রাজাকে প্যাঁচে ফেলতে পারে। আর দেখলাম ট্রাফিক পুলিশের বিজ্ঞাপন। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছেন প্রসেনজিত, জীৎ, দেব। বিজ্ঞাপন বলছে, “এনারা জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোতে পারলে আপনারাও পারবেন।” বেশ সৃজনশীল। তবে একটাই খটকা লাগল। শুধু বাংলা সিনে জগতের লোকেরাই তবে কি এখন আইকন? সিনেমার কুশীলবদেরই শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী আখ্যা দিয়ে যবে থেকে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তবে থেকেই কি বাংলা বৌদ্ধিক দারিদ্রে ভুগছে? কোনো লেখক কি বিজ্ঞানী কি স্পোর্টস ফিগার কি অর্থনীতিবিদ নেই এ লিস্টিতে! যাকগে। সিগনাল মেনে রাস্তা পেরোবার আর একটা বিজ্ঞাপন বলছে, “এক মিনিটের একটু থামা। আর একটু বেশি হলে ক্ষতি কি?” বেশ মজাদার। 

আর দেখলাম কৃষ্ণচুড়া গাছ। ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। তার রক্তিম গুমোরে সূর্যও খানিকটা ভীত, সঙ্কুচিত।  ও কৃষ্ণচুড়া তুমি অজুত নিযুত অর্বুদ কোটি পুষ্প বৃষ্টি করো এ ক্লান্ত, অবসন্ন শহরের বুকে। ঘৃণাকে ঘৃণা করে ফুলেল প্যারেড হোক রাজপথে। পুষ্পহন্তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোল বলিষ্ঠ জনমত। ছায়াহীন এই পৃথিবীকে ছায়াচ্ছন্ন করতে তুমিই পারো। কৃষ্ণচুড়া, শুধু তুমিই পারো এ শহরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে এক অসূয়াহীন পৃথিবী গড়তে। 

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/