বাংলার ইতিবৃত্ত

আমি একটু আধটু বাংলা লিখি বলে কদিন ধরে আমায় দু একজন বন্ধু/আত্মীয় একটি পোস্ট ফরোয়ার্ড করছেন এবং ফেসবুকেও পোস্টটি দেখলাম বেশ কয়েকজনের ওয়ালে। বুঝলাম পোস্ট বাবাজীবন ভাইরাল হয়েছেন। ভাইরাস ছাড়া অন্য যেকোনো জিনিস ভাইরাল হোক তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। তা পোস্টটির মূল বক্তব্য হল, বাঙালি বাংলা ভুলে যাচ্ছে। চারটি ধাপের বাঙালি…তিন নম্বর ধাপ থেকে বাঙালি বাংলা বলা ছাড়া শুরু করে আর চার নম্বর ধাপে বাঙালি বিদেশে। বাংলা তখন শুধুই স্টাইল স্টেট্মেন্ট, শুক্রবার বিকেলে বিদেশি মদের আড্ডায় বসে মায়ের আঁচলের হলুদের গন্ধ মনে পড়ে যদিও সন্তানের সাথে চোস্ত ইঞ্জিরিতে কথা বলেন তিন…ইত্যাদি ইত্যাদি। লেখাটি ঝরঝরে এবং বক্তব্য উপস্থাপনের মুন্সিয়ানা আছে। তবে ওই চার নম্বর ধাপের বাঙালির সাথে প্রবাসী বাঙালিদের জুড়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় লেখকের অভিজ্ঞতার দীনতা প্রকাশ পায়। আজ থেকে দশ কুড়ি বছর আগে নিশ্চয়ই পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, কিন্তু ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর থেকে আমরা সত্যিই একটা বিশ্বগ্রাম, একটা গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হচ্ছি। অতি দ্রুত। বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষা আমি কলকাতাতেও যেরকম দেখি শিকাগোতেও সেরকমই। যদি সামান্য কিছু কম বেশি থাকে সে আমার দাঁড়িপাল্লায় ধরা পড়ে না। লেখক হয়তো বিদেশে থাকেন নি। তাই তিনি ক্ষমার্হ।

তবে আমার বক্তব্য অন্য। যারা এ ধরণের লেখা পড়ে ও ফরোয়ার্ড করে আহা উহু করছেন আমি ধরে নিতে পারি তাঁদের বাংলা ভাষার প্রতি দরদ আছে। অনেকে ওপর ওপর পড়েন কিন্তু সুধী পাঠক মন দিয়ে যদি পড়ে থাকেন দেখবেন এই লেখাটির শেষের দিকে একটি লাইন আছে – “বাংলা বই এখনো amazon kindle -এ পাওয়া যায় না। পরের প্রজন্মে ছাপা বাংলা বইও পাওয়া যাবে না।” যত মানুষ ফরোয়ার্ড করে করে এই পোস্টটিকে ভাইরাল করলেন তাঁর অর্ধেক মানুষও যদি বাংলা বই কিনতেন ও পড়তেন তবে শ্রীজাতর মত বিখ্যাত কবিকে “আপনি সিনেমার গান কেন লেখেন” প্রশ্নের উত্তরে বলতে হত না, বই বিক্রি করে আমার পেন কেনারও পয়সা জোটে না। লক্ষ করবেন সেই অর্থে বাংলায় কোনো ফুল টাইম লেখক নেই (যিনি শুধুই কবিতা কি ফিকশান লেখা ছাড়া আর কোনোভাবে অর্থোপার্জন করেন না) কারণ থেকে থাকলে তিনি এতদিনে অনাহারে মারা গেছেন।

amazon kindle প্রসঙ্গে বলি আমি কদিন আগে আমার একটি kindle book প্রকাশ করেছিলাম। দশ কপি বিক্রি হয়েছে। হ্যাঁ ইন্ডিয়া আর ইউ এস এ মিলে দশ কপি। রয়ালটি হিসেবে আমাজন থেকে দশ ডলার মত পেয়েছি। তুলনা করার জন্য বলি, সানাইএর স্কুলের টুইশান ফী হাজার ডলার। তাই লজ্জায় সে বইয়ের লিঙ্ক আর দিলাম না। কেউ যদি চান যোগাযোগ করবেন। যারা আমার লেখার প্রশংসা করেন তারা প্রশ্রয় হিসেবেই করেন ঠিকই, বুঝি। তবে সেই প্রশ্রয় দিয়েই যদি বাংলা বই মাঝে মাঝে সংগ্রহ করেন তবে হয়তো বাংলা ছাপা বই বা বৈদ্যুতিন বই আরো কিছুদিন বেঁচে যেতে পারে।

আর একটু বলি, বইমেলায় আমার বইটি দেখে আমায় একজন মেসেজ করেছিলেন, আপনার বইটি দেখলাম। কিন্তু দাম কিছু বেশি লাগল। আমি তাঁকে বলেছিলাম, হ্যাঁ দাম কিছু বেশি আছে। দয়া করে আপনি সংগ্রহ করবেন না। সে যাই হোক 🙂 , দাম কত ছিল বইটির? ১৫০ টাকা ভারতীয় মুদ্রা। কলকাতার যেকোনো ভাল রেস্টুরেন্টে খেয়ে আপনি যদি তিন থেকে চার হাজার টাকার নিচে বিল করতে পারেন তবে আপনি নেহাত মিতব্যয়ী আর মিতভোজী। অতএব কি দাঁড়ালো? এই দাঁড়ালো যে এক সন্ধের পান আসরে আমরা অনায়াসে চার হাজার টাকা ওড়াতে পারি, কিন্তু বইএর দাম ১৫০ টাকা হলে আমাদের গায়ে লাগে। নো ওয়ান্ডার
প্রকাশকরা বলেন, জানেনই তো বাংলা বই বিক্রি হয় না। তাই বই প্রকাশের খরচ আপনাকেই দিতে হবে। আপনি কি জানেন, বাংলা প্রকাশনা বেঁচে আছে লেখকের টাকায়, কারণ বাংলা বইয়ের ক্রেতা নেই? ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে দয়া করে ভাষার কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখুন। আর বাংলা ভাষার নামে এই লেখাটি শেয়ার করুন না।

কিনডেলে কেলেঙ্কারি

আপনারা যারা “যযাতির ঝুলি” পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য এবার একটা মস্ত খবর আছে। ২০১৯-এ পত্রভারতী প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত “যযাতির ঝুলি” গল্প সঙ্কলন বইটির কপি দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার কারণে আমার বহু বন্ধু ও সুহৃদ বইটি সংগ্রহ করতে পারেন নি। পৃথিবীর যে কোনো কোণায় একটিও মানুষ যদি আমায় পড়তে চান, আমি কৃতজ্ঞ বোধ করি। আর তাই এই বইটিকে, ঠিক এই এক ডজন গপ্পো এবারে নিয়ে এসেছি ডিজিটাল মাধ্যমে। অ্যামাজন কিনডেলে এবং অ্যাপল বুকে পাওয়া যাচ্ছে বইটি।

আপনারা যারা বারংবার যযাতির ঝুলি থেকে প্রকাশিত লেখা পড়ে এক রাশ মুগ্ধতা জানিয়েছেন, আপনাদের যাদের যযাতির হিউমার পড়ে পেটে খিল ধরেছে, আপনারা যারা যযাতির মধ্যেকার গল্পবুড়োকে কুর্নিশ জানিয়েছেন, আর সর্বোপরি যারা আমার প্রিন্টেড বুকের কপি শেষ হয়ে যাওয়ায় সংগ্রহ করতে পারেন নি তাদের সকলকে বলি বইটির এক কপি সংগ্রহ করুন। বারো খানা গল্প, দাম তিন ডলার কিম্বা ৫০ টাকা ভারতীয় মুদ্রা। হ্যাঁ, দুটো ব্রেডের দামে। চলচ্চিত্র মাধ্যমে গল্প পরিবেশনার জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে ছাপার অক্ষরের গল্পের বিপণন ক্ষমতা তত কমেছে। তবু এটাও ঠিক, যে গল্প-লিখিয়েরা অক্ষরেই গল্প লেখেন। পরে তাকে চলচ্চিত্র বানান অন্য কেউ। এই কিনডেল বুকটির গল্পগুলো কেমন জানতে amazon-e “Look Inside” button ক্লিক করে দেখতে পারেন। পড়লে হতাশ হবেন না এটা যযাতির প্রতিশ্রুতি।

আপনার গল্পজিভে যাতে চড়া না পড়ে যায় তাই প্রতিটা গল্প ভিন্ন স্বাদের রাখা হয়েছে। পড়ে দেখুন। আর হ্যাঁ, পড়া হয়ে গেলে প্লীজ কেমন লাগল জানাবেন। কারণ আপনাদের উৎসাহই যযাতির পথ চলার মাধুকরী। ২০১৯-এ মুদ্রিত সংস্করণে যে সহায়তা ও সমর্থন পেয়েছিলাম, আমি নিশ্চিত সেই সাপোর্ট আবারও পাবো।

বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী আমার এক প্রিয় দিদি, সুলেখিকা এবং সম্পাদিকা Mousumi Mondal Debnath.

“Jojatir Jhuli Baro Kahon” Kindle Edition Amazon India Link is here.

“Jojatir Jhuli Baro Kahon” Kindle Edition Amazon USA Link is here.

যাঁরা কখনো kindle book পড়েন নি তাদের জন্যঃ

যদিও ছাপা বই পড়ার মজাই আলাদা, কিন্তু কখনো সখনো বিশেষ করে ট্র্যাভেল করার সময় আমি মুঠো ফোনের কম্ফোর্ট থেকে ডিজিটাল বই পছন্দ করি। ইপাব ফরম্যাটে ডিজিটাল বইও অনেকটা ছাপা বইয়ের মত। পাতা উল্টোনো যায়। বুকমার্ক করা যায়। আমার মনে হয় এটা কিনডেলে আসা প্রথম বাংলা বই। এর আগে কিছু বই তার মুদ্রিত কপির স্ক্রীনশট থেকে কিনডেল এডিশান বানিয়েছে বটে তবে তা পড়ার জন্য চোখের পক্ষে বেদনাদায়ক। আমি প্রপার বাংলা হরফে বই প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি। পড়ে দেখুন। অসুবিধে হবে না। আর বলে রাখি, kindle book পড়তে কোনো স্পেশাল ডিভাইস লাগে না। Amazon will download kindle app for you once you purchase. আমেরিকায় Amazon.com আর ভারতে যারা আছেন Amazon.in ওয়েবসাইট বা Amazon app-এ অথবা Apple Device-এর books অ্যাপে “Jojatir Jhuli” বলে সার্চ করলে বইটি পাবেন। উপরে লিঙ্কও দিয়েছি।

বাড্ডে লাঞ্চ

এক পিস দেড় ফুটিয়া আর এক পিস তিন ফুটিয়া যে বাড়িতে থাকে সে বাড়ির অভিভাবকবৃন্দ নির্বাণ লাভ করার পথে যে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে সে সুধীজন মাত্রেই স্বীকার করবেন। আমরাও “দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেসু বিগতস্পৃহ” হয়ে গেছি অনেকদিন। ছো্টখাটো ট্যাঁ ফোঁ ধর্তব্যের মধ্যে আনি না। বড় জোর সানাই অর্থাৎ আমার বড় কন্যা সানাই বাজানো শুরু করলে ওর ঐ নামকরণ করার জন্য মনে মনে স্ত্রীকে অভিশম্পাত করি। মুখে করি না। কারণ নিশ্চয় বলে দিতে হবে না। আমার একটা বই দুটো মাথা নেই আর সেই মাথাটা রসনাতৃপ্তির কাজে আমার প্রধান সহায়ক। তা রসনা বলতে মনে পড়লো বছরে একদিন করে আমার জন্মদিন থাকে। আজ যেমন ছিল। জন্মদিন থাকার প্রধান সুবিধে হল বৌয়ের ওপর আমি আমার স্বভাব অনুযায়ী হম্বিতম্বি করলে বৌ পাল্টা আক্রমণ শানায় না। আর কাঁসার থালায় খাবার পাই। সে প্রায় কোটি কোটি পদ। একটার পাশে একটা রেখে দিলে পৃথিবী থেকে চাদে পৌঁছনো যাবে। আজও তেমন পেয়েছিলাম। প্রসঙ্গত বলে রাখি চুরাশি রকমের পদ এবং অপর প্রান্তে গৃহিনীর হাসি হাসি এবং প্রশংসার-আশায়-প্রোজ্জ্বল মুখ দেখলে আমি একটু নার্ভাস বোধ করি কারণ আমার পেটের পরিসর নেহাতই এক কামরার ফ্ল্যাট, দালানকোঠা নয়। অথচ সব কটা পদ যাকে বলে ঠিক করে অ্যাপ্রিশিয়েট না করতে পারলে আমার পদস্খলন হতে পারে অর্থাৎ হতাশাজনিত কারণে গৃহিনীর সিংহিনী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আমি যখন এই অজস্র পদের ভুলভুলাইয়াতে দাঁড়িয়ে মাথার মধ্যে একটা ডিটেইল্ড এক্সিকিউশান প্লান ছকে নিচ্ছি, সে সময় উদয় হল আমার সুলক্ষণা বড় কন্যা সানাই। সে সকাল থেকে বাবার হ্যাপি বাড্ডে জনিত কারণে মহোৎসাহে গোটা তিনেক কার্ড মেখে ফেলেছে। তার মধ্যে একটা ছিল বাটারফ্লাইরা বাড্ডেতে এসে ফ্লাওয়ারের জুস খেয়ে হেভি মৌজ মস্তি করছে। এখন দাবি সে বাবাকে খাইয়ে দেবে। জন্মদিনে প্রথম পাতে পায়েস খাওয়া হয়। সে কথা তাকে জানাতেই সে এক চামচ পায়েস তুলে কিছুটা আমাকে আর কিছুটা আমার কাচা টি শার্টকে সরাসরি অফার করে দিল। টি শার্ট থেকে টুপটুপ করে অধোগতি প্রাপ্ত গড়িয়ে নামা পায়েস মুছেটুছে, সানাইকে মৃদু ভর্ৎসনা করে (সানাইয়ের তাতে বিশেষ অনুতাপ হল বলে মনে হল না), সবে খাওয়াতে মনসংযোগ করেছি সানাই তেজের সঙ্গে জানাল সে আরো খাওয়াতে চায়। অতএব শাক ভাজা দিয়ে ভাতের অপার্থিব স্বাদ উপভোগ করার মাঝেই আর এক চামচ পায়েস খেয়ে নিতে হল। ভাবলাম যাক ঝামেলা মিটল। কিন্তু রোগের প্রকোপ যেমন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় সেরকম সানাই আমায় এর পরের পনের মিনিটে মাছের সাথে পায়েস, পটলের দোলমার সাথে পায়েস, আলুভাজার সাথে পায়েস খাইয়ে সুচিন্তিত ভাবে আমার স্বাদকোরক নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে থাকল। ধৈর্যের পরীক্ষাও বলা চলে। ফলতঃ আমি ইলিশ মাছের ঝাল দিয়ে ভাত খেতে খেতে সানাই দত্ত আমের চাটনি খেলাম। পটলের দোর্মার দুরন্ত স্বাদ মাঠে মারা গেল কারণ সাথে এক মুঠো সাদাভাত, হ্যাঁ একদম প্লেইন সাদা ভাত, খেতে হল।

আমার স্ত্রীয়ের রান্নার হাতটি খাসা। কিন্তু সানাইয়ের অশেষ বদান্যতায় যে মোটের ওপর সমস্ত টেস্টের গুষ্টির তুষ্টি হয়ে গেল সেটা বোধ হয় সুধী পাঠক বুঝতেই পারছেন। এইভাবে খাওয়া পর্ব চালিয়ে যখন শেষ পাতে পৌঁছেছি এবং যুত করে আমের পায়েসের বাটিটা ধরে সেই অমৃতসম লেহ্য পদ দিয়ে জিভের সুখবিধান করতে এক চামচ মুখে দিয়েছি, সানাই আমাকে আমার প্রথম পাতের ছেড়ে আসা একটা জাম্বো সাইজ উচ্ছেভাজা অফার করল। পায়েসের সাথে উচ্ছে? আপনারাই বলুন কাঁহাতক সহ্য করা যায়। আমি ফুট ডাউন করলাম। না সানাই, উচ্ছে এখন খায় না। কিন্তু ততক্ষণে ওর মাথায় খুন চেপে গেছে। উচ্ছে আমায় ও খাইয়েই ছাড়বে। আমিও উচ্ছে কিছুতে খাব না। শেষমেশ ধুন্ধুমার কাণ্ড, ওর মায়ের বকুনি এবং ফলস্বরূপ সানাইয়ের সপ্তম সুরে সানাই বাজাতে বাজাতে পা ঠুকে ঠুকে সোফার দিকে প্রস্থান। এর মধ্যে ওর বোনু অর্থাৎ তাথৈয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গেছে। সে কোনোরকম পূর্বলক্ষণ না জানিয়ে তারস্বরে কাঁদতে শুরু করল। বাবার দুঃখে না নিজের দুঃখে না দিদির দুঃখে নাকি দিদিকে সঙ্গত দেওয়ার জন্য সেটা বোঝা গেল না। শুধু এই দ্বিবিধ আক্রমণে আমার খাওয়ার অবশিষ্ট ইচ্ছার পরলোক প্রাপ্তি হল। আমি কোনমতে বাকি পায়েসটুকু মুখে ঠুসে দিয়ে দুই রত্নসম কন্যার কান্না থামানোয় তথা বাড়ির শান্তি বিধানে উদ্যোগী হলাম। জিভ সেবা, সাংসারিক ভোগসুখ থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে আমাদের নির্বাণ লাভের পথ প্রশস্ত করাই যে আমার কন্যারত্ন দ্বয়ের মূল উদ্দেশ্য সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহই রইল না।

কবি কীর্তন

তা হয়েছে কি, কবি লিখে ফেলেছেন, ভালবাসা কারে কয়। তা তৎক্ষনাৎ কবির ফ্যান, এসিরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বলতে আরম্ভ করেছে, অহো কবি, কি লিখলেন, কি লিখলেন! কি অপূর্ব ধ্বনি মাধুর্য। কি অপরূপ রচনাশৈলী! কি গভীর জীবনবোধ! কেউ বললেন, এ যেন জীবনের বাণী। কেউ বললেন, কথা কটা শুনে হালে পেলাম পানি। কেউ বললেন, কবি তোমায় ঈশ্বর আমি জানি।

কবি মুখরা লিখেছেন, ভালবাসা কারে কয়। তো কবির পো-রা কিম্বা পোঁ-ধরারা লিখতে বসে গেলেন, সঞ্চারী, অন্তরা। কোনো পো লিখলেন, ভালবাসা কারে খয়। কেউ লিখলেন, ভালবাসা কারে গয়। ভালবাসা কারে ঘয়। ভালবাসা কারে ঙয়। কবি ক লিখেছেন তো ফ্যানেরা চন্দ্রবিন্দু অব্দি লিখে তবে থামলেন।

এদিকে কবি ফ্যাসাদে পড়ে গেছেন। প্রথম লাইনটা মাথায় আসতেই ফেসবুকে পোস্টিয়ে দিয়েছেন কারণ পাঠকের পাহাড় প্রমাণ চাপ। ফেসবুকের দেওয়ালে রোজ রাখতে হবে গভীর ছাপ। এখন পরের লাইন খুঁজে পাচ্ছেন না। মাথা ঠুকছেন।

ভালবাসা কারে কয়?
কয়ের সাথে মিলিয়ে কি হয়?
কবির মনে সংশয়।
আরে যা হোক কিছু লিখে দিই বিশেষ্য, বিশেষণ, অব্যয়।
ফ্যানেরা লাইক দিয়েই দেবে…শ’য় শ’য়।

সবুজ

মে মাসটা আমেরিকায় বৃষ্টিমাস। সকাল থেকে প্রায় দিনই ঝিরি ঝিরি করে ঝরতে থাকে শ্রাবণ। সূর্যের আলসেমি ছড়িয়ে যায় নিজের শরীরেও। চোখ খুলতে চায় না। কম্বলের তলায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে বর্ষার চপল পায়ের নিক্কণ শুনি। আবার এক এক দিন হয়তো প্রকৃতির সঙ্গলাভের ইচ্ছায় জ্যাকেট চড়িয়ে বাড়ির বারান্দায়। সারারাত বৃষ্টি হয়ে সবে হয়তো আকাশ একটু ফর্সা। সদ্যস্নাতা প্রকৃতির কি যে অদ্ভুত মাদকতা সে কেমনে ভাষায় ধরি? আমার যদি “শক্তি” থাকতো বলতাম, “এখানে মেঘ গাভীর মত চরে”। সত্যি আসন্নপ্রসবা নারীর মত সময় যেন শ্লথ হয়ে আসে। সময়। যা প্রতিদিন ছল করে আমায় আমার থেকে দূরে করে দিতে থাকে, যে প্রতিদিন আমায় মিথ্যে আশ্বাস দেয়, একদিন নীড়ে ফেরা হবে, সে যেন থমকে দাঁড়ায়। সে যে কি অনুভূতি, ঠিক বলা যায় না। ভাষা তুমি এত অসম্পূর্ণ কেন? শব্দ তুমি এত অপারগ কেন? অক্ষর তুমি এত সীমাবদ্ধ কেন? ভাবি। ভাবি আর দেখি একটা ত্রিমাত্রিক কুয়াশার মিহি জাল ঝুলে আছে আলগোছে। তার মধ্যে ঘুমে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে ভেজা বাতাস আর ঠান্ডার অদৃশ্য কোরক। আর থাকে পাখিদের কুহুগিতালী।  যে কল্পনাপ্রবণ কবিমন পাখিদের ডাকে প্রভাত রাগিণী খুঁজে পায় সে আমি নই। আমি দেখি ওদের মধ্যে লেশমাত্র হিউমান সিভিলিটি নেই। কেউ কারু কথা শোনার জন্য দু দন্ড চুপ থাকছে না। অনর্গল শুধু নিজের কথা। সবাই মিলে একসাথে বকর বকর করে এমন একটা শোরগোল তৈরী করেছে যে কারুর কথাই ঠাহর হয় না। আন্দাজে বুঝে নিতে হয় ওই বুঝি কোনো মা তার ছানাটিকে ওড়ার সহজপাঠ দিচ্ছে। ওইখানে কোনো নবীন প্রেমিক তার সদ্যপ্রেমিকাকে একটু মির্জা গালিব শুনিয়ে দিচ্ছে। ওইখানে হয়তো কয়েকটা ছোট ছোট পাখি-ছেলে-মেয়ে জীবনের পাঠ নিতে বসে অনর্গল নিজেদের মধ্যেই বকে চলেছে। সব মিলিয়ে মাছের বাজার। না। পাখির বাজার বলা চলে। এক অপার্থিব, অনাস্বাদিত, অলীক পাখির বাজার। জীবনের এমন কলরোল শুনতে শুনতে বুঁদ হয়ে আসি। 

আমার এক নামকরা কবি বন্ধুকে একবার এদেশের গাছ চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি উৎসাহিত হন নি তেমন। প্রথমে মনে হয়েছিল, এ কেমনে সম্ভব? কবি অথচ প্রকৃতিপ্রেমী নয়? পরে ভেবে দেখেছি, সে তাঁর দোষ নয়। নগর কলকাতায় বড় হয়ে ওঠায় তাঁর কখনো প্রকৃতির সাথে সখ্যতাই স্থাপিত হয় নি। আমার অন্য এক কবিবন্ধু বলেছিলেন, কলকাতায় বড় হয়ে ওঠায় তিনি গাছ বলতে দেখেছেন মানি প্ল্যান্ট আর পাখি বলতে দেখেছেন কাক। মফস্বলের কবিরা দেখি গাছ বাঁচানোর অ্যাক্টিভিজিমের সঙ্গে যুক্ত। সত্যি, এ হিসেবে আমরা যারা মফস্বলে মানুষ তারা কিছুটা গৌরব করতে পারি। আমেরিকার বৃষ্টিভেজা এক ভোরে কিচিরমিচির পাখিদের ডানায় ভর করে ছোটবেলায় উড়ে গিয়ে দেখি, বর্ষাকাল। এক প্রকান্ড কদম গাছ ফুলভারে নত। মাটিতে আলগোছে পড়ে কদম ফুল। তার পুষ্পিত কেশরগুলো নবঘন শ্যাম দর্শনে শ্রীরাধিকার মতই শিহরিত। ওই তো পাশেই একটা কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচুড়া জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। এখন তাদের ফুল নেই। গ্রীষ্মে ছিল তাদের পুষ্পগৌরব। লাল আর হলুদের আশ্চর্য হোলিখেলা শেষ হয়েছে বটে কিন্তু তাদের ভেজা ভেজা সঘন আচ্ছাদন কিছু কম মনোহর নয়। ওই তো, এক বিশাল বকুল গাছ এক প্রাচীন চিলের মত ডানা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বকুলের গন্ধ আরামদায়ক ঈষদোষ্ণ আলোয়ানের মত ছড়িয়ে আছে গাছের নীচে। এখনও দেশে গেলে যাই ছোটবেলার শহর খড়গপুরে। কিন্তু সে স্থানের সে রূপ আর নেই। আর পাঁচটা উঠতি শহরের মতই সে ঝরিয়ে নিয়েছে বৃক্ষমেদ। ইঁট-কাঠ-সুড়কির পেশী আস্ফালন দেখা যায় সর্বত্রই। এখন শহর আর শহরতলির পার্থক্য ঘুচছে। আসলে বোধ হয় সব প্রকার পার্থক্যই ঘুচেছে। লন্ডন প্যারিসের পার্থক্য ঘুচছে। আমেরিকা ভারতের পার্থক্য ঘুচছে। সভ্যতা যেন এক আত্মধ্বংসী সুষমার খোঁজে ছুটে চলেছে। দ্রুত। 

সে যাই হোক, পৃথিবীর একমাত্র দ্বিপেয় প্রাণীর চাপ কিছুটা কম বলেই হয়তো এখনও এ দেশে, আমেরিকায়, কিছুটা সবুজ আছে। এখনো ডালপালার শামিয়ানা টাঙিয়ে কিছু গাছ আছে। সে গাছে গাছে এখনও কিছু বাচাল অবিমৃষ্য পাখি আছে। আর এমন বৃষ্টি ভেজা দিনের ঘুমঘোর আছে। প্রকৃতির স্নেহময় বাহুডোর আছে। আর সবুজ কমে আসছে আমার শৈশবের ঘরে। ক্যাক্টাসের সেই গানটা আজ বোধ হয় প্রাসঙ্গিক। “কথা ছিল সব সবুজ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আমি দেব অমৃতের সন্ধান।” সবুজ ফুরিয়ে আসছে। কবি কবে আর, কবে আর, অমৃতের সন্ধান দেবে? 

জীবন

করোনার ক্যারিস্মায় দুসপ্তাহ হল গৃহবন্দী।

বাড়িতে বেসমেন্ট আর তিনতলা মিলিয়ে কটা সিঁড়ি আছে গুনে ফেলেছি। Cosco আর Whole Foods-এর মধ্যে কাঁচা সব্জির দামের তুলনামূলক বিচার করে নিয়েছি। করোনা নিয়ে আড়াই হাজার Opinion Piece, আর তিনশ আটানব্বইটা “ভাইরাল ভিডিও” দেখে ফেলেছি। সমগ্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চার বছরে যা শিখেছি, গত দু সপ্তাহে করোনা এবং ভাইরোলজি সম্বন্ধে তার থেকে বেশি জেনে ফেলেছি। এই রিসেশানের বাজারে চাকরিটা গেলে নিশ্চয়ই Virologist হিসেবে ডক্টর ফসি’র সহকারী হিসেবে চাকরি বাঁধা। প্রতি আড়াই দিনে একবার করে সানাইকে পড়তে বসানোর একটা বিফল চেষ্টা করে ফেলেছি। দিনে পৌনে তিনখানা করে আমার ছোট মেয়ে তাথৈ আর বড় মেয়ে সানাইয়ের ঝগড়া সমাধান করে ফেলেছি। দেড়খানা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুএজ শিখে ফেলেছি। পৌনে দু খানা উপন্যাস শেষ করে ফেলেছি। যে ভাবে আগে ক্রিকেট সম্রাট শচীনের স্কোর ট্র্যাক করতাম সেরকম করে করোনায় লোকান্তরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ট্র্যাক করছি পাঁচ মিনিট অন্তর। তারপরেও তো সারাদিন সময় কাটে না। তাই সারাদিন খাই খাই করছি। কিচেনের আশেপাশে পোষা বিড়ালের মত ঘুরঘুর করছি নিজের অমতেই। Involuntary Motion-এর মত নিজের অজান্তেই হাত চলে যাচ্ছে ছোলার ডিব্বেতে, কেকের প্যাকেটে, কিম্বা চানাচুরের বোয়ামে। দু মাস এমন চললে “ছোটা হাতি” হয়ে বেরোবো সন্দেহ নেই। কিন্তু মুসকিলটা অন্য জায়গায়। আমার যদি “খাই খাই” রোগ লেগে থাকে তবে আমার ছোট কন্যার (আপাতত এক-বছর-কত-জানি-মাস বয়স তার) “খাও খাও” রোগে ভুগছে। রোগের লক্ষণ বা দুর্লক্ষণ এই যে, যেকোনো ধরণের জিনিস হাতে নিলেই আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলছে “খাও খাও”। শব্দটা নতুন আবিষ্কার করায় ব্যবহার করার ভীষণ তাড়া ওর। এমনটা মনে আছে স্কুল জীবনে নতুন ইংরেজি শব্দ শিখলে হত আমার। যেকোনো সেন্টেন্সেই শব্দটা ফ্যাটাক করে ঢুকিয়ে দিয়ে রিডারের হার্ট অ্যাটাক করিয়ে দেওয়ার মত আনন্দ কিছুতে ছিল না। সে যাই হোক। প্রসঙ্গে ফিরি। তো আমার মেয়ে যেসকল জিনিস আমায় খেতে অনুরোধ করছে সেগুলো হল এরকম – এক পাটি জুতো (কখনো মানুষের, কখনো পুতুলের), সোফার দুর্গম কর্নার থেকে বের করে আনা ক্ষয়রোগাক্রান্ত, ধসে-যাওয়া কর্নফ্লেক্সের টুকরো, কিচেনের ঘনান্ধকার কোনো গলিখুঁজি থেকে বের করে আনা আনুবীক্ষণিক সাইজের (মোস্ট লাইকলি ইঁদুরে কাটা) বিস্কুটের টুকরো, মাঝে মাঝে সোফিয়া কি রপাঞ্জেলের প্রতিমূর্তি বা ডল ইত্যাদি। আমি চাইনীজ নই। এমন অখাদ্য কুখাদ্য খাওয়ার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তাই বিনয়ের সঙ্গে সেই বদান্যতা প্রত্যাখ্যান করলে সেই দেড় ফুটিয়া তিরিশ পাউন্ডের অণু মানবীটি ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়। অনেক কটা খুব খারাপ গালাগালি দিয়ে (মনে হয় গালাগালিই হবে কারণ সেই শব্দগুলোর একটাও আমার বাংলা কি ইংরেজি অভিধানে নেই) সে আবার সেই “খাও খাও” কথাটি রিপিট মারে ভাঙা ক্যাসেটের মত। চোখে আশা আর হাতে অখাদ্য নিয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকে। সানাই খুব উৎসাহের সঙ্গে বুঝিয়ে দেয়, বাবা প্রিটেন্ড খাওয়া খেতে হবে। অর্থাৎ কিনা খাওয়ার অভিনয় করতে হবে। এমন একটা দুর্ঘট ঘটনায় সানাই যে যারপরনাই পুলকিত সে তার চোখ মুখের ঔজ্জ্বল্য দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। পড়তে বসার সময়টুকু ছাড়া ও সবকিছুতেই বেশ ফুর্তি পায়। বিশেষ ফুর্তি পায় বাবা বোনুর হাতে কি মায়ের হাতে নাকাল হলে। পড়তে বসানোর চেষ্টা করা ছাড়া এ জন্মে ওর পেছনে কোনো কাঠি করেছি বলে মনে পড়ে না। পূর্বজন্মের শত্রুতা হবে নিশ্চয়ই। যাই হোক। তাথৈর সেই বাড়ানো ছোট মাপের হাতটা মুখের কাছে টেনে এনে খাবার অভিনয় করতেই কচি মুখে এক মুখ হাসি ফুটে ওঠে এবং সাথে তার কিছু আশীর্বাণী বর্ষায় (আশীর্বাণীই হবে কারণ এ শব্দগুলোও আমার বাংলা বা ইংরেজি অভিধানে নেই)। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চ্যাংদোলা করে হাত ধোয়াতে নিয়ে গেলে সে চেঁচাতে থাকে তারস্বরে “ছেলে দাও। ছেলে দাও।” (না “ছেলে” চায় না, “ছাড়া” পেতে চায়)। আপাতত তার ভাষাশিক্ষা এই অবধি। পেছনে হাততালি দিতে দিতে সানাই অনুগমন করে আমার ও আমার কব্জায় থাকা অসন্তুষ্ট বোনুর।

গ্রহণের করাল ছায়ার মত বাইরে মৃত্যু কেড়ে নিতে থাকে জীবনের জমি। আর চার দেওয়ালের মধ্যে এমন করেই নতুন প্রাণ, নতুন কিছু শাখামৃগ নিজেদের শাখা প্রশাখা বিস্তার করতে থাকে। Death is the only constant. And life is the only derivative.

দর্পিত

আমাদের কৃত্রিম গতিময়তা, আমাদের নিত্যদিনের ব্যস্ত থাকার মানস বিলাস, আমাদের সামাজিক হওয়ার অনর্থক নিয়ত প্রয়াস যখন একটা আনুবীক্ষণিক বীজাণু এসে স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেল তখন চোখ ফুটলো আমার। যেমন করে পাখির ছানা চোখ ফুটেই দেখতে পায় অনন্ত সুনীল আকাশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, রুনুক ঝুনুক প্রসন্নতা ছড়িয়ে আছে আনাচে-কানাচে। যেমন করে বোধোদয় হয় শিশুর যখন সে বুঝতে পারে শব্দ শুধু কয়েকটা ধ্বনির সমষ্টি নয়, তার অন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে একটি অর্থ যা কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে উদ্দিষ্ট করে আর সেই উপলব্ধির গৌরবে সে ক্রমাগত উচ্চারণ করে চলে সেই শব্দ যেমন বাবা, মাম্মা, ক্যাট। এই সাময়িক স্থিতি আমাদের সেইরকম একটা গুরুবোধ দিয়ে গেল যে একটি বিকল্প জীবনপথ আছে, আমাদের বহির্মুখী জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের কাছাকাছি, নিজের কাছের মানুষের কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ আছে।

একটা প্রচণ্ড উন্নাসিক রথ পতপতিয়ে উত্তরাধুনিক সভ্যতার জয়ধ্বজা উড়িয়ে অশ্লীল গতিতে ছুটে চলেছিল আর কোমড়ে দড়ি বাঁধা আমার শরীর হেঁচড়ে হেঁচড়ে এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। প্রায়োন্মৃত রক্তাক্ত শরীর আমার অক্ষম কণ্ঠে বিশ্রাম ভিক্ষা করেছে বারংবার। বধির জয়রথ শুনতে পায় নি। অথবা রথচক্রের ঘর্ঘর ধ্বনির মদোন্মত্ততার সামনে সেইসব অক্ষম রোদন, বিলাপ নেহাতই দুর্বলের প্রলাপ মনে করে ক্রূর হাসি হেসে উপেক্ষা করেছে। হঠাতই সেই রথের গতি শ্লথ হয়ে এল। হঠাতই সময় হল দু দন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রেমিক প্রকৃতিকে গভীর ভাবে দেখা, বীক্ষণ করা। 

সামাজিকতা রক্ষায় আমি দিবারাত্রি সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে নৃত্য করেছি, মনের বাতায়ন খোলার সময় হয় নি দিনের পর দিন। সামাজিক কর্তব্য রক্ষার ডাক, কল অব ডিউটি তে সাড়া দিতে গিয়ে মনজমিন উষর হয়েছে, কালিঝুলি পড়েছে মনের দেওয়ালে, দেউলিয়া হয়েছি অন্তরে অন্তরে। সমাজ বড় দাম্ভিক। সে অসামঞ্জস্যের ধার ধারে না। আত্মগৌরব তার এমনই আকাশচুম্বী সে ব্যক্তির অনন্যতায় বিশ্বাসী নয়। সে যেন এক অনুভূতীহীন মেষপালক যার কাজ ভেড়ার দলকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নির্দিষ্ট পথে নিয়ে চলা। বিপথে চলা পশুটিকে ফিরিয়ে আনা লাঠির ঘায়ে। সেই সমাজ, সেই দোর্দন্ড প্রতাপশালী সমাজ, হঠাতই মাথা নিচু করে চুপ করে বসেছে, বসেছে নিজের সংবিধান পুনর্লিখন করতে। সামাজিক মিলনের নতুন পরিকাঠামো তৈরী করতে বসেছে। আর পৃথিবীর আদিমতম অধিবাসী মাতৃসমা বৃক্ষরা এই শ্লথগতি সভ্যতাকে দু হাত তুলে আশীর্বাদ করছে। আশীর্বাদ করছে নাকি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তার দর্প ঠিক  কতখানি অর্থহীন?

করোনা, এরকম কোরো না।

করোনা, লক্ষ্মী ভাইটি, এরকম কোরো না। এমন করে মাথার উপর চড়ো না। আমি তোমার থেকে বয়সে বড় না?…

এমনটাই বলতে ইচ্ছে করছিল সকাল সকাল। কারণ? শুনুন তবে। সকালবেলা রুজি রোজগারের তাগিদে স্টিয়ারিং ধরেছি। এমন সময় সামনে দেখি করোনা। সঙ্গে সঙ্গে ধাঁই করে ব্রেক টিপে পেছনে বদাম করে পেছনের গাড়ির ধাক্কা খেয়ে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি কান্ড! একটু বাড়িয়ে বললাম। এতকিছু হয় নি। তবে হ্যাঁ সামনের করোলা গাড়িটাকে দূর থেকে করোনা পড়েছিলাম। চোখের সামনে মূর্তিমান করোনা দেখলে মনের অবস্থা যে সদ্যবর্ষণস্নাতা প্রকৃতির মত স্নিগ্ধ শান্ত হয় না সেটা বলা বাহুল্য। করোনা ছড়াচ্ছে বসন্ত মলয় সমীরে, হাওয়ায় হাওয়ায়। তার থেকেও বেশি ছড়াচ্ছে করোনাভীতি। বিশ্ববিদিত আমাদের গুজবপ্রীতি।

তবে সামাজিক মাধ্যমে করোনাকে নিয়ে রসিকতাও কম ছড়াচ্ছে না। একটি জোকস পড়লাম, করোনা ভাইরাস থেকে দূরে থাকতে সকাল সকাল দু কুচি রসুনের কোয়া খান। তাতে করোনার কিছু যায় আসবে না, কিন্তু অন্য লোকেরা আপনার থেকে দূরে থাকবে। আবার একটা পড়লাম, আগে ইঞ্জিনিয়াররা পরীক্ষা করত, কোনো সফটওয়ারে ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। এখন (মেডিকাল) সফটওয়ার পরীক্ষা করছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কিনা। কিছু রামগরুড়ের ছানা আবার করোনা নিয়ে রসিকতা শুনলেই আগ্নেয়গিরি হয়ে যাচ্ছেন। মজার ব্যাপার নাকি? কতলোক মারা গেছে জান হে ছোকরা? তা আর জানব না দাদা। চীন চিরদিনই তাদের পরমাণু বোমার সংখ্যা বাড়িয়ে বলে আর দুর্ভিক্ষ, খরা, ভূমিকম্প এবং মহামারীতে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা কমিয়ে। তাই চীন যখন তিন হাজার বলেছে, আমি মনে মনে তিরিশ হাজার ধরে নিয়েছি। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে একটিও না। তাই নিয়েও রসিকতা কম বেরোয় নি। কেউ কেউ বলছে আমাদের রক্তে এমন সব দেশী ভাইরাস আছে যে সস্তার চায়না মেড করোনা ভাইরাস তার সামনে টিকতে পারছে না। তবে আমি কি বলি জানেন? ভাইরাস যদি করোনা না হয়ে করিনা হত, তবে তার আক্রমণে আমি মরতেও রাজি। করিনা কাপুর শুনলেই বুকের মধ্যে ধাঁই ধপাধপ ধাপুর হয়। তবে করোনা ভাইরাসকে বলা যেতেই পারে, করোনা তুমি কেন মরো না? কিম্বা করোনা, তোর মড়ামুখ দেখতে চাই।

তবে এইসব হাসি মজাগুলো শুধু ভয়টা যাতে চেপে বসতে না পারে, তার জন্য। নয়তো সত্যি বলতে পরিস্থিতি যথেষ্ট গন্ডোগোলিয়াস। সতর্কতা অবলম্বন অবশ্যই করুন। বাইরে বেরোলে আপনার মুখোশের ওপর আর একটি মুখোশ পড়ুন। বাইরে থেকে ফিরেই হাত ধুন। এ তো বেসিক হাইজিন। সবাই জানে। তবে হাত ধোয়ার কথায় মনে পড়ল। যাদের একটু হাতটান আছে মানে এই যারা ধরুন পকেট্মার, তাদের বলি, এই সময় কাজ বন্ধ রাখো ভায়া। কারণ পকেট মেরে হয়তো মানিব্যাগ বের করলে, কিন্তু বিনামূল্যে পেয়ে গেলে কিছু অদৃশ্য করোনা। অন্যের পকেট ফুরুত করতে গিয়ে নিজের প্রাণপাখি সুরুত করে খাঁচার বাইরে বেরিয়ে পড়া কোনো কাজের কথা না। তাই যদ্দিন করোনা তদ্দিন অন্যের পকেটে হাত দেওয়ার কাজটি কোরো না। রুজিরুটির ব্যবস্থা করতে রাজনীতিতে যোগ দিতে পারো। চোরেদের ও লাইনে ভালই সম্মান ও প্রতিপত্তি। শুধু কর্‌নার জায়গায় দিতে হবে ধর্ণা। করোনা না বলে বলতে হবে করছি না, করব না।

চাঁদ উঠেছিল গগনে

একজন খুব কাছের মানুষ দেখলাম মোবাইল ক্লিক পোস্ট করেছেন। একটি ছবি। দোল পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র রাশি রাশি চাঁদের হাসি ছড়াচ্ছে। ক্যাপশান দিয়েছেন “চাঁদ উঠেছিল গগনে”। যাক বাবা! অনেকদিন পরে চাঁদ নিজের বকধার্মিক সঙ্গীটিকে সাথে নিয়ে আকাশে ওঠেন নি দেখে চাঁদি ঠান্ডা হল। সঙ্গ পরিত্যাগ করার জন্য চন্দ্রমাকে এবং ওই দাদাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে চন্দ্রিলের একটি ভিডিওতে মনঃসংযোগ করলাম।
তবে কাকে দোষ দিই বলুন। বঙ্গসংস্কৃতি অঙ্গসংস্কৃতি বা গুহ্য-অঙ্গ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে অনেক দিন হল। সেই ব-সূচক শব্দ বাদ দিয়ে কোনো বাক্যই সম্পূর্ণ করেন না এমন পুরুষ বা নারী কম নেই। হঠাত করে সেই ‘ব’ যখন বন্যার মত সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে ফেলল, মনে হল মুখের সামনে কে যেন আয়না ধরেছে। আর সেই আয়নায় নিজের বিকট মুখব্যাদান দেখে ছিৎকারে ভরে উঠেছে আজকের ব-সন্ত। তাই চলুন না সবাই মিলে আর একবার বলি, “চাঁদ উঠেছিল গগনে” – হ্যাঁ, একা চাঁদ উঠেছিল গগনে। হ্যাঁ, শুধু চাঁদ উঠেছিল গগনে।


আর যে অমলকান্তি “রোদ্দুর” হতে পারে নি, তাঁকে বলি রোদ্দুরের কাছে একটা আলোর প্রতিশ্রুতি আমরা আশা করতেই পারি। রোদ্দুরের কাছে অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের পথের দিশা আমরা দাবী করতেই পারি।
শুভ দোল পূর্ণিমা সব বন্ধুকে।

নবীনগঞ্জ

শীত মানেই ভীড় করে আসে এক গুচ্ছ স্মৃতি। এক ঝাঁক বকম বকম পায়রার মতন অর্থহীন সংলাপে ভরে ওঠে মনের উঠোন। ছোটবেলায় শীত মানেই ছিল মায়ের হাতে উলের কাঁটায় বোনা উলটো ঘর। ব্যাডমিন্টন খেলতে থাকা সারা সন্ধে ভর। ছুটির দুপুরে বাবার হাত ধরে পৌঁছে যেতাম কখনো চিড়িয়াখানা, কখন বইমেলা। বয়সটা ছিল পড়া পড়া খেলার। শীত মানেই মনে পড়ে নতুন গুড়ের স্বাদ। ছুটির দুপুর একলা পেলেই ফেলুদা হাতে চিলেকোঠার ছাদ।

সরস্বতী পূজোর আগে কুল খেলে দেবী পাপ দেবেন সেই ভয়ে কক্ষনো চেখে দেখতাম না পাকড়াশি স্যার-এর বাগানের টোপা টোপা নারকোলি কুল। একটু বড় হবার পর বড়জোর একটা দুটো। মা কালির দিব্যি, পুজোর আগে তার বেশি কক্ষনো খাইনি…তাও মনে মনে দেবী হংসবাহিনীর কাছে মার্জনা ভিক্ষা করে। কুল খাওয়ায় দেবীর নিষেধ থাকলেও কুল চুরি করায় ছিল না। তাই এন্তার কুল চুরি করতাম আমি বাবু আর অনুপম মিলে। আমি ছিলাম বৃক্ষ বিশারদ। অর্থাৎ চোখের পলক ফেলতেই গাছে উঠে ফটাফট্‌ কুল ঝেড়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাকে বলে বামাল হাওয়া হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া থুড়ি মানে পাড়াজোড়া। তাই পাড়ার কুল পিপাসুরা শীত পড়লেই চুড়মুড়টা, চুরনটা দিয়ে আমায় যে হাতে রাখার চেষ্টা করত সে কি আর বুঝতাম না! কুল চুরি করে ধরা কখনো পড়িনি ঠিকই, তবে একবার প্রায় মারা পড়েছিলাম। আমাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পাকড়াশি স্যার এক পিস কেঁদো বাঘের বাচ্চা থুড়ি মানে অ্যালসেশিয়ান কুকুর এনেছিল কিন্তু আমার চুড়মুড় সাপ্লায়াররা সে খবর আমায় এনে দিতে পারে নি। তাই যেই না পাকড়াশি স্যার-এর গাছে ওঠা, সেই চতুষ্পদ মূর্তিমান মৃত্যুর কর্ণকুহরে সেই মধুর আওয়াজ প্রবেশ করল। তারপরে যা হয় আর কি..গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে আমিও দৌড়চ্ছি আর হাত পাঁচেক পেছনে আমায় দিয়ে আজকের লাঞ্চটা সেরে নেবার তাগিদে তিনিও দৌড়চ্ছেন। দৌড়তে দৌড়তে ভুবন ডাঙার মাঠ এল। নিশ্চিন্দিপুর এল..গোঁসাই বাগান এল। তারপর পাকড়াশি স্যার-এর কুকুরটা টিনটিনের সঙ্গী snowy হয়ে গেল..রাজলক্ষ্মী এল..ইন্দ্রনাথ..সাঁওতাল রাজকন্যা ভানুমতি এল.. কতবার প্রেমে পড়লাম.. কতবার কতবার মিঠে রোদ্দুরের ওম নিতে নিতে লেবুর খোসা ছাড়ালাম। কত শীতের দুপুরে স্নান না করার জন্য বায়না করলাম আর বাবার ধাঁতানি খেয়ে স্নান করতে গেলাম। আজ হয়তো কোনো ছুটির দুপুরে স্নান করি না। কিন্তু স্নান করতে বলার লোকগুলো কাছে নেই…

বড়বেলা, হে আমার ক্লান্ত বড়বেলা, আমায় নবীনগঞ্জে ফিরিয়ে দাও।