দাও

তাথৈ বলল “দাও”। শুনেই আমার থরহরি কম্পমান হল। আসলে পোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় কথা আছে। আমার তাই অবস্থা। এর আগে যতবার দাও শুনেছি ততবারই ভারি গোল বেঁধেছে। এবারেও বাঁধবে সন্দেহ নেই। কারণ মনুষ্যেতর প্রাণীরা দাও বলে না আর মানুষেরা দাও বললে কি দিতে হবে সেটাও সাথে বলে দেয়। তাথৈ নাম্নী প্রাণী তার ধার ধারে না। দাও বলেই সে যথেষ্ট পরিমাণে আত্মবিশ্বাসী থাকে যে সে মনের ভাব পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রকাশ করতে পেরেছে। এবং সে যেটা চাইছে সেটা তাকে কেন দেওয়া হচ্ছে না এ ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ (এবং এটা আমার অনুমান) ও যেটা চায় সেটার ছবিটা ওর মনে স্পষ্ট কিন্তু তার শব্দরূপ জানে না।

শুধু দুটি জিনিস চাওয়ার ক্ষেত্রে ও বিশেষ্য (নাকি বিধেয়) টা ঠিকঠাক বসাতে পারে। সেটা হল, হ্যাঁ আপনার অনুমান সত্যি। প্রথমটা চকলেট। আর একটা আছে অবিশ্যি সেটা হল জল। দ্বিতীয়টি প্রাণদায়ী হলেও শুনি প্রথমটা প্রাণঘাতী। সে যাই হোক, এই দুটি ছাড়া অন্য কিছু চাওয়ার থাকলে শুধু দাও বলেই ক্ষান্ত হয়। এবার বোঝ ঠেলা। কি দিতে হবে সে ব্যাপারে তোমার অনুমান শক্তিই তোমার একমাত্র গাইড। নিউটনের সূত্র থেকে গোমূত্র সব কিছু ট্রাই করে দেখি এক এক করে। ট্রায়াল অ্যান্ড এরর। একটা লাগবেই। তবে ভুলের মাসুল আছে। একটি করে দিই আর তাথৈ বলে “না”। পরে এই না-এর টোনাল কোয়ালিটি বদলাতে থাকে। মুদারা থেকে তারায় যায়। এবং প্রথম পাঁচ ছটা চেষ্টায় ঠিক ওর যা চাই সেইটি দিতে না পারলে হাত টাত চালাতেও সংকোচ বোধ করে না। গান্ধিগিরির শেখানোর কোন ভাল কোচিং সেন্টার থাকলে জানাবেন। ওকে ভর্তি করে দেব।

দিনের বেলা দাও বললে তাও ভাল। যদি মনে রাখতে পারো, কিছুক্ষণ আগে অব্দি ওর হাতে ঠিক কি ছিল (সম্ভবত একটা পাজলের পিস কি দের ইঞ্চি সাইজের একটা প্লাস্টিকের হাস কি ছোট কোন পাথর ইত্যাদি) সেইটি খুঁজে পেতে হাতে ধরিয়ে দিলে নিশ্চিন্তি। কিন্তু মাঝে মাঝে এই দাও এর জ্বালা হয় রাতে ঘুমের মধ্যে। রাত আড়াইটের সময় ঘুম থেকে উঠে কেউ যদি দাও বলে ভয়ঙ্কর কান্না জোড়ে, তবে প্রশান্ত বুদ্ধ মূর্তি হয়ে যে থাকা যায় না সেটা বলা বাহুল্য। বিশেষ করে এখন হাতে কিছু দিয়েই লাভ হবে না কারণ তিনি স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছেন। সেম স্বপ্নটা না দেখতে পারলে কি করে জানব স্বপ্নে ওর হাতে কি ছিল? অগত্যা অন্ধকারে কিছু বাকবিতণ্ডার পর ওর পাছুতে চটাস শব্দ শুনতে পাই। বোধ হয় ওর মায়ের স্নেহ আশিস। তখন উচ্চৈঃস্বরে কান্না এবং পুনরায় ঘুমিয়ে পড়া। মোটের ওপর তাথৈ-এর দাও এর জ্বালায় ইদানীং অস্থির। হে দেবী সরস্বতী, হে কুচযুগশোভিতা ওকে ভাষাশিক্ষা দাও যাতে ও দাও বলার সাথে সাথে কি দিতে হবে সেটা পরিষ্কার করে জানানর ক্ষমতা অর্জন করে।

লঙ্কাকাণ্ড

শিকাগো সামার মানেই আউটডোর ফান। ওদের মা কোথায় বেরিয়েছে। সানাই আর তাথৈ নামক দুটি বিচিত্র জীবের দায়ভার আমার ওপর অর্পণ করে। আমি এক কাপ কফি সহযোগে আমার বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডে বসে  ল্যাপটপে একটি গল্প সাজানোর চেষ্টা করছি। আমাদের জীবনের কত গল্পই তো আখের রসের মত জীবনের ইক্ষুগাছে জমে জমে ওঠে। সেইসব দোহন করে শব্দের প্রাকারে সাজানো, গল্প মানে তো তাই।

সানাই এসে বলল, তুমি সারাক্ষণ অফিস করো। আমার সাথে খেলো না। সানাইয়ের অভিমানী স্বরে শ্রাবণ। আমি তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ বন্ধ করে বলি, চলো খেলি। সানাইয়ের খেলার স্বভূমিতে বিভিন্ন নাটক, যাত্রাপালা, চলচ্চিত্র অভিনীত হয়। তবে কিনা সে নিজেই ডিরেক্টর, স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং প্রধান চরিত্রে নিজেই অবতীর্ণ হয়। আমরা নেহাত এলেবেলে সাইড রোলে। মানে মৃত সৈনিক টাইপ আর কি! আজকের পালা রামায়ণ। তবে আগাস্টের ফুরফুরে হাওয়ায় সানাইয়ের মন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতই দক্ষিণাপন আজ। তাই আমি একটা প্রধান চরিত্র পেয়ে গেছি। শ্রীরামের ভূমিকায় আমায় কাস্ট করা হয়েছে। হনুমানের রোলটা নিজে নিয়েছে। ও সাধারণভাবে যে পরিমাণ লম্ফঝম্প করে থাকে, তাতে পবনপুত্রের রোলে ওকে খুব একটা প্রয়াস করতে হবে বলে মনে হয় না। নিজ চরিত্রগুণেই ও হনুমানের চরিত্রে মানিয়ে যাবে। মহাকাব্য রামায়ণ অভিনীত হতে হলে সীতা দরকার। আমি সানাইয়ের বোনু অর্থাৎ আমার দ্বিতীয় কন্যা তাথৈকে সীতার রোল দেওয়ার জন্য আর্জি করি। সানাই শোনামাত্র আর্জি খারিজ করে দেয়। তাথৈয়ের বয়স এখনও দুই হয় নি। সীতার মত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাথৈয়ের মত বালখিল্য স্বভাবের একজন মানুষকে কাস্ট করতে ওর ডিরেক্টর সুলভ মন কেমন যেন কু গায়। শেষমেশ সীতা হলেন সিন্ড্রারেলা। মানে সিন্ড্রারেলার পুতুল। পুতুলেরা নিজেদের স্বভাববশত হাত পা নাড়ে না বা কথা বলে না স্বেচ্ছায়। কিন্তু তার প্রক্সি তো আমাদের সানাই দিতেই পারে। বোনু নেহাত কোনো রোল না পেয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছিল, আমি ফট করে তাকে লক্ষ্মণের রোলে কাস্ট করে দিলাম। সানাই দেখলাম তাতে বিশেষ আপত্তি করলো না।

পালা এদিকে জমে উঠেছে। আদি কাণ্ড আর অযোধ্যা কাণ্ড শেষ হয়ে অরণ্য কান্ড শুরু হয়ে গেছে।  মহারাজা দশরথ পুত্রশোকে প্রাণত্যাগ করেছেন। মানে সানাইএর ভাষায় ডাই হয়ে গেছেন। রাম লক্ষ্মণ সীতা অনেক ঘুরেটুরে পঞ্চবটির আশ্রমে আস্তানা গেড়েছেন। পাঁচ পাঁচখানা বট গাছ পাওয়া দুষ্কর। তাই আমাদের ব্যাকইয়ার্ডের তিনখানা বড় ব্ল্যাক চেরী ট্রীকেই মনে মনে বটবৃক্ষ হিসেবে কল্পনা করে নিয়েছি। শূর্পণখার নাসাচ্ছেদ হয়ে গেছে। এবার তবে রাবণকে আসতে হয় মারীচকে সাথে করে। কিন্তু বাড়িতে তো মোটে তিনখানি প্রাণী। তারা মুখ্য চরিত্র রাম লক্ষ্মণ হনুমান হয়ে বসে আছে। চতুর্থ প্রাণী নেই যে রাবণের ভূমিকার নামবে। সমস্যার সমাধান করতে সানাই নিজেই ডাবল রোলে। হনুমান রাবণ হয়ে গেল চোখের নিমেষে। এই ধরণের চরিত্র বদলে মৃদু আপত্তি জানানোয় সানাই যুক্তি দিল, রাবণ হলে আমি পুষ্পক রথে করে আসতে পারব, বাবা। ব্যক্তিগত বিমান পাওয়ার লোভেই এই পার্টি বদল। সেতো আমাদের মুকুলও…না থাক।  

হরিণরূপী মারীচকে কোথায় পাওয়া যায় জিগেস করতেই সানাই বিদ্যুৎগতিতে দোতলায় চলে গিয়ে ওর খেলার ঘর থেকে একটা ইউনিকর্ন নিয়ে চলে এল। ইউনিকর্নকে হরিণ হিসেবে ভাবতে একটু বেগ পেতে হলো ঠিকই। কিন্তু নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। হরিণেরও চারটে পা। ইউনিকর্নেরও। হরিণের দুটো শিং। ইউনিকর্নের একটা। চলে যাবে। সীতারূপী পুতুল সিন্ড্রারেলার প্রক্সি সানাই রামরূপী আমাকে আদেশ দিল ইউনিকর্ন থুড়ি সোনার হরিণ ধরে আনতে। আমি তো পরম বিক্রমে অদৃশ্য ধনুক টনুক বাগিয়ে ক্রমাগত অদৃশ্য তীর ছুঁড়তে ছুঁড়তে সিংহগর্জন করে ছুটলাম হরিণ ধরতে (আসলে অধিকাংশ দিন আমি বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট পালায় বীস্টের চরিত্র পেয়ে থাকি। তাই হাঁউ মাউ করাটা আমার, কি যেন বলে, হ্যাঁ, ওই ম্যানারিজমে পরিণত হয়েছে)। বাগানের এক কোনায় গিয়ে মারীচের গলায় রামের স্বর নকল করে আমি এস ও এস পাঠাই – বাঁচাও বাঁচাও। সীতার আড়াল থেকে সানাই তখন লক্ষ্মণকে হাঁক দিয়েছে রামকে সাহায্য করতে যেতে। হিসেব মত লক্ষ্মণের তখন লক্ষ্মণরেখা কেটে দিয়ে রামের সন্ধানে বনে যাওয়ার কথা। কিন্তু লক্ষ্মণ অর্থাৎ তাথৈ জন্ম ইস্তক এই ধরণের যাত্রাপালায় চরিত্রের ধার মোটেই ধারে না। মার্জিত ভাষায় বললে অবাধ্য আর অপরিশীলিত ভাষায় বললে ঢ্যাঁটা, তাথৈ হল তাই। বাংলায় যাকে বলে, আপনি মর্জিকা মালিক। সে মাটিতে পড়ে থাকা গাছের ডালপালা পাতামাতা তুলে পরমানন্দে নিজের ওপরেই পুষ্পবৃষ্টি করছে। 

লক্ষ্মণের আমাকে উদ্ধার করতে আসার কোনো লক্ষণ নেই দেখে আমি স্বপ্রবৃত্ত হয়ে নিজেই ফিরে এসে দেখি রাবণরূপী সানাই সিন্ড্রারেলা সীতাকে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ঠিক উড়ছে না, একটা গাছের ডাল ধরে বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে আছে। আশু বিপদের সম্ভাবনায় আমি রাম, রাবণকে চ্যাংদোলা করে নামিয়ে দিই। রাবণ ওরফে সানাই তাতে খুব খুশি না হলেও এই টেন্সড মুহূর্তে সেই নিয়ে মাথা গরম করে না। তার আদেশে আমাকেই রাম থেকে জটায়ু হয়ে যেতে হয়। ঘেঁটে পুরো ঘ হয়ে গেছি। কে রাম, কে হনুমান, কে জটায়ু, কে রাবণ , কে সীতা, কে লক্ষ্মণ কিচ্ছু ঠিক নেই। রাবণের সঙ্গে জটায়ুর এদিকে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রথমে হাতাহাতি। সানাই-এর হাতের চটাস চটাস মার খেয়ে চটকে যাই বেশ। তারপর গদাযুদ্ধ। জটায়ুকে গদাযুদ্ধ করতে হবে কেন সে প্রশ্ন করতে গিয়ে পশ্চাদ্দেশে গদাম করে গদাবাড়ি খেলাম। সানাই-এর রামায়ণ। এখানে রাম রাবণে এক ঘাটে জল খায়। যুদ্ধ করতে করতে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে রাবণ মারীচ ওরফে খেলনা ইউনিকর্নকে জটায়ুর দিকে অর্থাৎ আমার দিকে ছুঁড়ে মারে। পুরো স্পাইডার ম্যান ওয়ানের স্টাইলে ইউনিকর্নের শক্তিশেলের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বলি, সানাই, এটা হচ্ছেটা কি? লেগে যাবে না? সানাই পরম বিক্রমে জানান দেয়, সে সানাই নয় রাবণ। সে তুমি রাবণই হও আর পতিত পাবনই হও, একটা হৃষ্টপুষ্ট ইউনিকর্ন ছুঁড়ে মারবে এ কেমন অভদ্রতা।    

কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড হাল্কা করে স্কিপ মেরে সুন্দর কাণ্ডে পৌঁছে যাই। সানাই এইবার তার আসল রোলে কাস্ট হয়েছে। এক লাফে সমুদ্র পেরিয়ে লঙ্কায় যাবে বলে তার ভীষণ উত্তেজনা। যাকগে যাক, সে সব তো হল। ফাইনালি লঙ্কাকাণ্ড টা তো হতে হবে। যাকে বলে সিনেমার ক্লাইম্যাক্স। লক্ষ্মণকে না পেলে রাম রাবণের যুদ্ধটা নেহাত ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে ভেবে লক্ষ্মণের খোঁজে গিয়ে দেখি কেলেঙ্কারী টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। লক্ষ্মণ সারা মুখে মাটি মেখে শিব সেজে দাঁড়িয়ে আছে। মাটি ছাড়াও শুকনো পাতা, গাছের ডাল, শিকড় বাকড়, জড়িবুটি কি নেই শেই ক্ষুদ্র শরীরে?  তার ওপরে পাখিদের খাওয়ার জন্য যে জল রাখা হয়, পরিপাটি করে নিজের মাথায় ঢেলেছে। ভিজে সপসপে জামা প্যান্ট। দুটো চোখ আর খুদে দাঁতের সারি ছাড়া তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভদ্র ঘরের ভদ্র সন্তান বলে কেউ দূর কল্পনাতেও ভাববে না। লক্ষ্মণ নয় একে জাম্বুবানের রোলে কাস্ট করা উচিত ছিল। ওর মা এই অবস্থায় তাথৈকে অর্থাৎ লক্ষ্মণকে দেখতে পেলে রাম, হনুমান আর লক্ষ্মণের বনবাস তো নিশ্চিতই, স্বর্গবাস হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।   

কিছু মানুষ জন্মে ধীরে বাঁদরে পরিণত হয়। আর কিছু জন্মসূত্রেই বান্দর হয়। তাথৈ দ্বিতীয় গোত্রের। নিজের ভাগ্যকে ছাড়া কাকেই বা দুষি। এই মুহূর্তে সমস্ত অপরাধের চিহ্ন গায়েব করার তাগিদে আমি রাম, লক্ষ্মণরূপী তাথৈকে চ্যাংদোলা করে তুলি। লক্ষ্মণ এমন একটা কিছু আশা আগেই করেছিল। তাই পিতৃপ্রতিম দাদার প্রতি বিন্দুমাত্র সম্ভ্রম প্রদর্শন না করে একটা ঝেড়ে লাথি কষায়। ব্যাক কিক। সে লাথি কোথায় গিয়ে লাগে বললে সম্পাদক মহাশয়/মহাশয়া নিশ্চয়ই কাঁচি করে দেবেন, তাই আর লিখলাম না। চোখে দু দন্ডের জন্য সর্ষে ফুল দেখি। লক্ষ্মণের লাথির হাত থেকে বাঁচতে ওকে পাঁজাকোলা করে ধরি। হনুমানরূপী সানাই এদিকে নেহাত অধৈর্য হয়ে জামা ধরে টানাটানি শুরু করেছে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার জন্য। দাঁড়াও সানাই, দেখছ না বোনু মাটি মেখেছে, বলাতে হনুমানরূপী সানাই তার পরমারাধ্য শ্রীরামচন্দ্রকে চড়াম করে মেরে বলে, আমি সানাই নই, হনুমান। তোমাকে যুদ্ধ করতেই হবে। এদিকে লক্ষ্মণ কোলে উঠে ইস্তক মাথা দিয়ে দুম দুম করে হেড মারছে কুশলী কুস্তিগীরের মত। মাথা তো নয় একটা ঝুনো নারকেল! ধনুকের ছিলার মত উল্টোদিকে বেঁকে গেছে আর তারস্বরে চেঁচিয়ে জানান দিচ্ছে ওর মাটি মাখায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে আমি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি। লঙ্কাকান্ড প্রায় পণ্ড হয় দেখে হনুমানও চটাচট মারছে রামকে। আক্ষরিক অর্থে লঙ্কাকান্ড বেঁধে উঠেছে, মানে মঞ্চে নয়, বাস্তবে। আমি রাম না রাবণ, জটায়ু নাকি শূর্পনখা কিচ্ছু মনে পড়ছে না। এর থেকে বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট পালা অভিনীত হলে ভাল ছিল। শেষমেষ হনুমান ওরফে সানাইকেও আর এক হাতে কোলে তুলে নিই। হনুমান ওরফে রাবণ ওরফে সানাই এবং লক্ষ্মণ ওরফে তাথৈ, দুজনকে দু কোলে নিয়ে আমি ঘরে ঢুকে সোজা বাথরুমে চলে যাই। গৃহিণী ফেরার আগে দুটোকে স্নান করিয়ে নিতে হবে। 

মাথায় খানিক জল ঢালায় সানাইয়ের মাথা ঠান্ডা হল। তবে দেখলাম রাবণবধ না হওয়ার শোকটা পুরো ভুলতে পারে নি। দুখী দুখী মুখে বলে, বলেছিলাম বোনুকে খেলায় না নিতে।

খেলা

২০১৭ ডিসেম্বর

আজকের এই যে দিনটা, এই দিনটা আগামী কাল কোথায় থাকবে? আজ যে দিনটাকে এত সত্যি মনে হচ্ছে, বাস্তব মনে হচ্ছে কাল কি সেটা শুধুই একটা স্মৃতিকথা, একটা অলীক কল্পনা? আমরা প্রতি মুহূর্তে এই দিনটাকে, এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চাই। আর মুঠো করে জল ধরতে চাওয়ার মতই আমাদের সবরকম চেষ্টাকে কাঁচকলা দেখিয়ে, আমাদের বজ্রমুষ্টি ছাড়িয়ে সুখমুহূর্তগুলো পালিয়ে যায়। তাই আমরা অনবরতই তাকে still picture কিম্বা video photography করে ধরে রাখতে চাই। আমাদের স্মৃতি বড় প্রতারক। আজকে বেড়াতে এসে যে জায়গাটা, যে দ্রষ্টব্যটা ভীষণ ভাল লাগছে, কদিন পরে হয়তো সেটার নাম মনে করতে পারি না। তাই আমরা ডিজিটাল ফ্রেমে ধরে রাখার চেষ্টা করি সেই ছবি, সেই নাম। কিন্তু সেই ক্ষণটার যে সমগ্র অনুভবটা, total experience-টা সেটা কতটা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী রাখা যায় সে আমার সুধী পাঠক পাঠিকারাই বলতে পারবেন, আপাতত আমি ভাবছিলাম আমার দুই বছরের কন্যা সন্তানের কথা। তার হাসিমুখ প্রায়শই তো ডিজিটাল পিকচারে, শূন্য-একের ভাষায়, ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু তাতে তার এই শিউলি ফুলের মত স্নিগ্ধ শৈশব যতটা চাই, ঠিক ততটা ধরে রাখতে পারি না বোধ হয় । তাই ভাবলাম ঐ আলো আর ছায়ার, ঐ শূন্য আর একের লিমিটেড অভিধানের বাইরে এসে ভাষার সাহায্য নিই। অক্ষর আর শব্দদের সাহায্য নিয়ে এঁকে রাখি আমার দু বছরের ডানা লুকোনো পরীর ছবি।            

স্ত্রী দুপুরবেলা থেকে গেছিল শপিং-এ। অতএব সানাইকে সামলানোর দায়িত্ব পড়েছিল আমার ভাগে। ওর বয়স দুই। ওর সব খেলারই সঙ্গী আমি। প্রথমে কিছুক্ষণ চলল রান্নাবাটি খেলা। ওর খেলাঘরে রান্না হওয়া সব খাবারই আমায় টেস্ট করতে হয়।  শুধু “খাও” আর “ভাল?” ছাড়া রান্না বিষয়ক আর কোন শব্দ এখনও আয়ত্তে আসে নি তার। তাই প্রতিবার একটাই রাবারের টুকরো টেস্ট করে ভাল বলার আগে আমিই কষ্টকল্পনা করে বলতে থাকি “এটা ইলিশের পাতুরি”, “এটা চিংড়ির মালাইকারি” ইত্যাদি। 

রান্নাবাটু খেলা শেষে কিছুক্ষণ “লিটল কৃষ্ণ” দেখা হল computer-এ। সেটা দেখারও সঙ্গী আমি। বালকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ একা দেখতে আমার কন্যাসন্তান মোটেই পছন্দ করেন না। কালীয়দমন থেকে বকাসুর বধ পর্যন্ত সব লীলাখেলা দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয়ে, মুখে হাত রেখে বিস্ময়সূচক শব্দ করে, অনবরত বলবে “বাবা দেখো”। অগত্যা আমাকেও কিছু বিস্ময়সূচক শব্দ বের করতে হয় মুখে। অন্তত শ দুয়েকবার দেখে ফেলেও বালক কৃষ্ণের দস্যিপনায় ওর সমান উৎসাহ। 

কৃষ্ণের দাপাদাপি কিছুটা প্রশমিত হলে শুরু হবে  “কালাল কলা” অর্থাৎ কালার করা অর্থাৎ coloring. তাতে আমায় এই পাখিটা, মাছটা, ডগিটা এঁকে দিতে হয়। উনি তাতে রঙের পোঁচ মারেন। আমি ছোটবেলায় কিছুদিন আঁকা শিখেছিলাম। তবু ঐ বিষয়ে আমার প্রতিভা একদমই সহজাত নয়। আর এখন তো সে বিদ্যা একেবারেই ভুলেছি। তো পাখি বা মাছ আঁকলে যেটা দাঁড়ায় সেটা আমার দু বছরের পুত্রী ক্ষমা ঘেন্না করে নেয় বলেই নিশ্চিন্তি। প্রাপ্তবয়স্ক তো ছেড়েই দিলাম পাখি বা মাছেদেরও সে ছবির জাজ হিসেবে দাঁড় করালে দশে শুন্য পেতাম সে ব্যাপারে আমি শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত। কিন্তু সানাই সেই মাছ, পাখি দেখেই অত্যুৎসাহিত হয়ে তাতে রঙ করতে শুরু করে। কিন্তু দু এক পোঁচ রঙ চাপিয়েই উৎসাহ হারিয়ে অন্য কিছু এঁকে দিতে বলে। দশমিকের পরে পৌনপনিকের মত আমি একই জিনিস ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আঁকতে থাকি। কারণ আঁকার ব্যাপারে আমার ভোকাবুলারি যথেষ্ট লিমিটেড। ছোটবেলায় সেই একটাই সীনারী আঁকতাম আমরা সবাই। একটা কুঁড়ে ঘর, একটা রাস্তা চলে গেছে সামনে দিয়ে। পাশে একটা গাছ। পেছনে পাহাড়, পাহাড়ের কোলে সূর্য আর কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে দিকভ্রান্ত। ওরকম দু একটা জিনিসেরই নক্সা বানাতে পারি। 

কিছুক্ষণ রঙ করে তারপর অন্য খেলা। আমায় বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। আর ও প্রায় WWF-এর স্টাইলে বিভিন্ন কোণ থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর। সে ভারি গোলমেলে খেলা। কোনোভাবে চোখ-নাক-মুখ ইত্যাদি ভাইটাল অর্গানগুলো বাঁচিয়ে সে অত্যাচার সহ্য করতে হবে। প্রতিবার ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর অকারণ খিল খিল করে হাসি। আসলে ওদের হাসার জন্য কোনো কারণের দরকার হয় না। ছোট থেকে বড় হওয়ার কোনো এক পথের বাঁকে আমাদের এই অকারণে হাসির ক্ষমতাটা ফেলে আসতে হয়। 

ঠিক সাড়ে তিন মিনিট পরে সেই খেলাটায় বোর হয়ে গিয়ে আবার অন্য খেলা। কিছু কিছু খেলা আমার এই বুড়ো হাড়ে যথেষ্ট স্ট্রেসফুল। একটা যেমন কোন একটা কাল্পনিক ভুতের ভয়ে ক্রমাগত দৌড়ন। সানাই “ভুত আচছে, ভুত আচছে” বলে ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে আর আমার কাজ হল সেই ভুতের ভয়ে ওর সাথে ছুটতে থাকা। মাঝে মাঝে ঢিলে দিলেই ভাগ্যে জুটছে বকুনি। “বাবা ভুত” বলে চিল চিৎকারে কানের পর্দার দফারফা করে দেবে। 

আর একটা আছে ঘুম ঘুম খেলা। ওর ছোট্ট একটা খেলনা বিছানায় এসে দুজনে মিলে শুতে হবে আর নাক ডাকতে হবে। যদি মনে করেন এই খেলাটায় অ্যাক্টিভিটি কিছু কম, আমাদের মত কুঁড়ে মানুষদের জন্য বাঞ্ছনীয় তাহলে খুব ভুল ভাবছেন কারণ খেলাটাকে ইন্টারেস্টিং করার জন্য প্রত্যেক তিরিশ সেকেন্ড পরে পরে উঠে একটা কাল্পনিক লাইটের সুইচ বন্ধ করতে হয় আর হ্যাঁ আপনি ঠিকই ধরেছেন – ওই সুইচ বন্ধ করার গুরুদায়িত্ব আমার ওপরেই পড়ে। মাঝে মাঝেই বলে উঠবে “বাবা, লাইট বন্ন”। “এই মাত্র তো লাইট অফ করলাম সানাই। বন্ধ লাইট তো আর আপনা আপনি জ্বলে উঠবে না” ইত্যাদি টাইপের যুক্তি খুব একটা কাজে দেয় না। সেই কাল্পনিক লাইট আবারও অফ করানোর জন্য চেঁচিয়ে মাথা ধরিয়ে দেবে। অগত্যা একবার করে শোয়া আর উঠে উঠে গিয়ে মিছিমিছি লাইট অফ করে আসা। সব মিলিয়ে বাবাকে স্লিম আর ফিট রাখার দায়িত্ব চওড়া কাঁধে নিয়েছে আমার কন্যা। 

এর থেকেও গোলমেলে খেলা আছে। যেমন ডাইনিং টেবিলের তলাটা ওর হট ফেভারিট। এবং ওর আদেশে ওর পেছন পেছন আমাকেও ঢুকতে হয় সেই অপরিসর জায়গাটাতে। ওর দু ফুটের শরীর তো দিব্যি ফিট হয়ে যায় কিন্তু আমার ওখানে ঢুকতে আর বেরোতে রীতিমত কসরত করতে হয়। ভেতরে বসে থাকার সময়টাও খুব একটা আনন্দদায়ক নয়। কিন্তু কি আর করা? ওর মুখে হাসি দেখার জন্য কেন যেন মনে হয় সব কিছু করা যায়। 

মাঝে মাঝে ভাবি বোধ হয় ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুযায়ী “যোগ্যতমের উদবর্তন”-ই এর জন্য দায়ী? আমাদের মানুষদের এই অপরিসীম অপত্যস্নেহ এটাই কি আমাদের বাঁদর থেকে মানুষ করেছে? সন্তানস্নেহই কি আমাদের অন্য পশুদের থেকে যোগ্যতর করেছে? ওর সাথে খেলতে খেলতে মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায় ঠাকুরের দু কলি গান – “তুমি মোর আনন্দ হয়ে ছিলে আমার খেলায়/আনন্দে তাই ভুলেছিলেম কেটেছে দিনবেলা”। কখনো কখনো ওর মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে চোখে জল নিয়ে যখন আমার কোলে এসে ওঠে তখন একটা অদ্ভুত গর্বে বুক ফুলে ওঠে। নিজেকে ঈশ্বর মনে হয়। অফিস থেকে বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই চা খাওয়ার অবসর না দিয়েই সে টেনে নিয়ে যায় তার খেলার ঘরে। বিরক্ত লাগে। কিন্তু তবু পরের দিন বাড়ি ফেরতা ট্রেনে মনে পড়ে যায় সেই প্রতীক্ষারত প্রিয় মুখটা। আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে ওকে রক্ষা করতে হবে, ওকে একজন মানুষের মত মানুষ, একজন দরদী মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে – নীরবে এই প্রতিশ্রুতি করি মনে মনে।

সানাইয়ের সানাই

সানাই রাত্রি সারে এগারটার সময় ডাক ছেড়ে সানাই ধরলো। মটকা এতে কার না সটকে যায় বলুন? কি না তার মাম্মা তার সাথে কথা বলবে না বলেছে! মাম্মার কথাটা যে গুরুতর অনৃত বাচন, মানে বাংলায় বললে নেহাত বাজে হুমকি, সে কথা বোঝানোর ব্যাপারে যত্নশীল হয়ে ব্যর্থ হলাম। মানে কোন মা আর মেয়ের সাথে কথা না বলে…তাও বিশেষতঃ কন্যা যখন জামাই সহকারে বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে বলে নি যে, “কালীঘাটে আড়াইশ টাকা প্যাকেজে বিয়েটা সেরে এসেছি, এই তোমার জামাই, একে আশীর্বাদ করো।” আমার কন্যাটি নেহাত অর্বাচীন, মাত্র পাঁচখানি বসন্ত পার করেছে। ঘটার মধ্যে ঘটেছে, ওয়েল যারা সানাই নামক বিচিত্র প্রাণীকে জানেন তারা অনুমান করে নিয়েই থাকবেন, যে তিনি নৈশাহার বা বাংলায় যাকে বলে ডিনার সেটি যথেষ্ট পরিমাণে আত্মস্থ করতে অরাজী হয়েছেন। খাদ্যরসিকের বিপরীত শব্দ যদি খাদ্য-বেরসিক হয়, তবে সানাইকে খাদ্য বেরসিক বললে শব্দটির ওপর যথেষ্ট দায়ভার অর্পণ করতে হয়। কারণ যে কোনো খাবারের প্রতি সানাইয়ের যেটা আছে সেটা হল অবিমিশ্র ঘৃণা (শুধু ক্যান্ডি, চকলেট এবং বেরী বাদ দিয়ে)। পলান্ন অর্থাৎ কিনা পোলাও-এর মত উপাদেয় খাদ্য যা আমি “লাও লাও” করে কেজি দুয়েক সাবড়ে দিলাম এবং সর্বোপরি যা কিনা আমার এগার বছরের সাত পাকে বাঁধা বৌ নিজ হস্তে পাকিয়েছেন সেটা যখন সর্বসাকুল্যে তিন গ্রাস খেয়ে সানাই স্বমূর্তি ধারণ করল, অর্থাৎ কিনা পরের গ্রাস মুখে নিয়ে দাঁতের চারপাশে মাজনের মত জড়ো করে রেখে দিল এবং শত অনুরোধ, উপরোধ, অনুনয়, বিনয়, উপদেশ, আদেশেও দাঁত নামক হামান-দিস্তাটাকে চালানো থেকে বিরত থাকল, তখন যে মেজাজের চড়াই উতরাই হয় সেটা বাবা মা মাত্রই জানেন। তবে তার দুই বৎসর বয়সী সহোদরার দেখলাম বেশ সহৃদয় পরান। গালে টোবলা করে খাবার নিয়ে ঘুরছে আর মাঝে মাঝে এসে তার ক্রন্দনরতা দিদিকে তার খুদে খুদে হাত দিয়ে আদর জাতীয় কিছু একটা করে যাচ্ছে। নিষ্ঠুর প্রাণ বাবা ও মায়ের কাছে খাওয়ানোর নামে বিজাতীয় যন্ত্রণা পেয়ে সানাই মনোযোগ সহকারে বোনের আদর গ্রহণ করছে এবং সেই সুযোগে বোনুর সাথে একটু খেলেও নিচ্ছে। কিন্তু বোনু ব্যস্ত মানুষ। তাকে বিবিধ কার্য সমাধা করতে হয় যেমন দেওয়ালে রঙ পেন্সিল দিয়ে শিল্প কর্ম করা, সোফার ওপর থেকে টারজান স্টাইলে ঝাঁপানো, বাবার চটি জুতো মহারাজ ভরতের স্টাইলে মাথায় করে ঘুরে বেরানো ইত্যাদি। কর্ম না বলে সেগুলোকে অপকর্ম বলাই ভাল কিন্তু বাসুদেব বলে গেছেন শুধু কর্মতেই আমাদের অধিকার, ফলে নয়। ফলে ফলেই বোনু কর্ম করে যায় ফলের চিন্তা না করে। তাই তার দিদিকে সান্ত্বনা দান সাময়িক। সে নিজকার্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই সানাই আবার ডুকরে কেঁদে উঠছে। আমি নেহাত হৃদয়হীনের মতই বলে ফেলি সানাই আইদার কাঁদো, নয় খেলো, দুটো একসাথে কোরো না। শুনে সানাইয়ের কান্নার লয় এবং তান দুই দ্বিগুণ হল।

সানাই খেতে কেন চায় না, ক্যাটরিনা কি করিনার মত ছিপকলি থাকার অভিপ্রায়ে না বাবা মাকে পেরেন্টিং-এ ব্যর্থতার দোষিমন্যতার নরককুণ্ডে নিক্ষেপ করতে তা জানি না কিন্তু সানাইয়ের সানাইয়ের বিস্তারে কানে তালা লাগার জোগার। এমন কি অমন সহৃদয় সহোদরাটিও সান্ত্বনা জানাতে কাছে ঘেঁষছে না আর। দুই সন্তানের পিতৃপদ লাভ করার পর থেকেই আমি ব্রহ্মপদ লাভ করে গেছি অর্থাৎ কিনা নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত হয়ে গেছি। তবে কিনা বুদ্ধদেবকে তো সংসার করতে হয় নি, তাই এমন কাকচিল তাড়ানো চিৎকারে তার ধৈর্যচ্যুতি যে ঘটতই না, এমনটা হলফ করে বলা যায় না। আমি সানাইকে বলি সানাই কাঁদতে হলে গ্যারেজে গিয়ে কাঁদো। এও নেহাত হুমকি। আমি পাষণ্ড ঠিকই তবে এতটাও নই যে আমার ধনাত্মক পাঁচের বাচ্চাকে ঋণাত্মক বারোতে গ্যারেজে ছেড়ে আসব। কিন্তু এই নেহাত হুমকিতেও হিটে বিপরীত হল। আজ্ঞে না, ওটা টাইপো নয়, আমি হিতে বিপরীত নয়, হিটে বিপরীতই লিখেছি। সানাই এসে আমায় গুমগাম দু ঘা হিট করে তারপর এমন শোকাকুলা হল যে মেঘনাদবধ হওয়ার পর পঞ্চসতীর-এক-সতী দেবী মন্দোদরী অত শোকাকুলা হয়েছিলেন কিনা সন্দেহ হয়। বোনু দুটো গাল টোপাকুল করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনিও দিদির পদাঙ্ক অনুসরণ করে আহার্যসামগ্রী গলাধঃকরণ করার বদলে গালের দুদিকে সঞ্চয় করে রাখতেই বেশী পছন্দ করেন। এবং সব থেকে ছোট হওয়ার ট্রাম্প কার্ড থাকায় এমন গর্হিত অপরাধ করেও খুব বেশি বকুনি খান না। তো তিনিও ত্রস্তভঙ্গিতে মাঝে মাঝে দিদির দিকে তাকাচ্ছেন কিন্তু কাছে ঘেঁষছেন না। আমি সংসার প্রতিপালন করতে কেন নেমেছি ভেবে নিজের কপালকে দুষছি, এমন সময় ওপর থেকে দেবীকণ্ঠ শ্রুত হল মানে আমার স্ত্রীয়ের গলা আর কি।

সানাই তোমায় আর খেতে হবে না, না কেঁদে মুখ ধুয়ে শুয়ে পরো, কাল সরস্বতী পুজোতে তোষানির বাড়ি যেতে হবে।

দেবী হংসবাহিনী বেদজ্ঞা এবং পরমার্থলাভে সহায়িকা জানা ছিল কিন্তু তিনি যে এমন সংসারে শান্তিবিধানকারী তা জানা ছিল না। সরস্বতী পুজোয় যাওয়া হবে (এবং খেতে হবে না) শুনেই শোকাকুলা সানাই চোখ টোক মুছে বলয়ে ফেললে, ইয়েয়ে সরস্বতী পুজো। যে অকল্পনীয় দ্রুততায় চোখের তরল বাষ্পীভূত হয়ে গেল, কান্নার ভুত যেভাবে ভুতপূর্ব হয়ে গেল, যেভাবে শ্রাবণের মেঘ সরে গিয়ে চোখে রোদ্দুর ফুটল, তাতে সেই রোদনাশ্রুর অথেনটিসিটি নিয়ে যদি আমার চল্লিশ বছরের বৃদ্ধ মনে সংশয় জেগে থাকে, তবে তার জন্য নেহাৎ আমার বার্ধক্যকেই দুষতে হবে। যাই হোক,

আমি মনে মনে বললাম,

জয় জয় দেবি চরাচর সারে
কুচজুগ শোভিত মুক্তা হরে
বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে
ভগবতী ভারতী দেবি নমস্তে।

পঞ্চবর্ষীয়া

২৫ আগাস্ট, ২০২০

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। কোভিডের অদৃশ্য প্রহরা না থাকলে হয়তো বড় করেই জন্মদিনের পার্টি হত। কিন্তু এ বছরটা আর পাঁচটা বছরের থেকে আলাদা। তাই সকালে পায়েস, পাঁচভাজা, মাছ, পায়েস আর রাত্রে অল্প কেক কাটা, কিছু পুরনো বন্ধু ও ভাতৃস্থানীয় স্বজন।

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। আজ থেকে ঠিক পাঁচটা বছর আগে এক মাথাচুল আর দু চোখে বিস্ময় নিয়ে আমি এই নিজেরই হাতে মায়ের নাড়ি কেটে ওকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলাম। নাড়ি কাটার পর শুনেছি বাচ্চারা চিল চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। একদম ভুল। একটুও কাঁদে নি। বরং হাবভাবটা এরকম ছিল, এ আবার কোথায় এলাম? এত আলো? সেই থেকে শুরু। তারপর থেকে জুঁই ফুলের মত সেই ছোট্ট প্রাণটার একটা করে পাপড়ি খুলে যাওয়া…জীবনের এক একটা অধ্যায়…প্রথম উবুড় হওয়া, প্রথম হামাগুড়ি, প্রথম হাঁটতে শেখা টলোমলো পায়ে, প্রথম বাবা, মাম্মা বলা…যেন এক স্মৃতির চোরাকুঠুরি। কত হাসি, কত কান্না, কত মান অভিমানের পালা বাবা-মেয়ের – সে লিখতে বসলে বুঝি শেষ হবে না। এই হয়তো মুখে খাবার নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে বকুনি খেয়ে কিম্বা মাঝে মাঝে ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে দু এক ঘা খেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে “বাজে বাবা” বলে চলে গেল তো পরমুহূর্তেই ও বিউটি হলে আমি বীস্ট। কিম্বা আমি ঘোড়া আর ও ঘোড়সওয়ার।

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। হ্যাঁ আনন্দের দিন। কিন্তু সকাল থেকে আমার মনটা খারাপ। খালি মনে হচ্ছে পাঁচ হয়ে গেল। আর বড়জোড় পাঁচ কি দশ। কত অল্প, কত খসে-পড়া-তারার মত স্বল্পায়ু এই সময়। পৃথিবীর কোনো মহার্ঘ জিনিসই বোধ হয় অপরিমিত নয়। “গুপি বাঘা ফিরে এলো” ছবিতে আচার্য ব্রহ্মানন্দ শেষ দৃশ্যে যেমন দু হাত দিয়ে রত্নগুলোকে মুঠি করে ধরছিল আর হাত খুলতেই দেখছিল সে রত্ন গায়েব, ঠিক সেরকমই দু হাত দিয়ে মুঠো করে ধরতে চেয়েছি দিনগুলো। আর কখন মুঠোর ফাঁক দিয়ে গলে বেরিয়ে গেছে। অসহায়ের মত অভিশম্পাত করেছি মহাকালকে।

মহাকাল। সে টর্পেডোর মত চুপি চুপি এসে সমস্ত সঘন মুহূর্তকে বিস্মৃতির অতলান্তিকে ডুবিয়ে দেয়।

আসলে সকল কন্যা সন্তানের বাবার জীবনেই আসলে একদিন “রহমত আলি” মুহূর্ত আসে। সেই মিনির কাবুলিওয়ালা? যে অনেক কটা বছর জেল খেটে এসে একদিন দেখল তার কন্যাসম মিনি অনেক বড় হয়ে গেছে। সেই পুরনো সুর আর বাজছে না। কোথায় যেন সম্পর্কের এসরাজ বাজছে অচেনা সুরে। সেরকম সব বাবাই সময়ের স্রোতে ভেসে চলতে চলতে একদিন হঠাত অনুভব করে তার মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। হয়তো যোগাযোগের নতুন সূত্র খুঁজে পায়, কিন্তু তার শিশু কন্যাটিকে আবার নতুন করে চিনতে হয়। নতুন করে আলাপ করতে হয় নিজেরই মেয়ের সাথে।

আচার্য ব্রহ্মানন্দের মত প্রাণপণে ধরে রাখতে চেষ্টা করি আমার ছোট শিশুকন্যার আধো আধো কথা, তার অভিমানী চোখের জল, তার দুদিকের বিনুনি, তার অবাধ্যতা, আমার বকুনি, আমার আদর, ওর ছোট ছোট হাত হাতে নিয়ে পথ হাঁটার অপার্থিব স্পর্শসুখ কিন্তু পারি না। আলোছায়ায় ধরি, চলচ্চিত্রে ধরি, ছন্দে ধরি, শব্দে ধরি। তবু ধরা যায় না। তবু মনে হয় ওই আসল মুহূর্তগুলোর কাছে ওই ক্যামেরায় ধরা ছবি, ছায়া কি নিষ্ঠুর রকমের অকিঞ্চিৎকর। আমাদের প্রতি মুহূর্তের যে এক্সপিরিয়েন্স, যে অনুভব কোনো রেকর্ড বাটন টিপে তাকে যদি ধরে রাখা যেত আর আমাদের আগত সেই হলুদ বিকেলবেলায়, আমাদের সন্ধে নাম্বার আগের বিষণ্ণ ক্ষণে যদি রিপ্লে করে দেখা যেত, না না দেখা নয়, আবার করে যদি যাপন করা যেত, কি ভালই না হত? তাই না?

আমাদের সমস্ত মহার্ঘ ক্ষণ চুরি করে নিয়ে চলে যায় মহাকাল। আমরা অসহায় চোখে দেখি। কত অভিসম্পাত করি। কিন্তু সে চলে যায় রাজার চালে। তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

বাড্ডে লাঞ্চ

এক পিস দেড় ফুটিয়া আর এক পিস তিন ফুটিয়া যে বাড়িতে থাকে সে বাড়ির অভিভাবকবৃন্দ নির্বাণ লাভ করার পথে যে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে সে সুধীজন মাত্রেই স্বীকার করবেন। আমরাও “দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেসু বিগতস্পৃহ” হয়ে গেছি অনেকদিন। ছো্টখাটো ট্যাঁ ফোঁ ধর্তব্যের মধ্যে আনি না। বড় জোর সানাই অর্থাৎ আমার বড় কন্যা সানাই বাজানো শুরু করলে ওর ঐ নামকরণ করার জন্য মনে মনে স্ত্রীকে অভিশম্পাত করি। মুখে করি না। কারণ নিশ্চয় বলে দিতে হবে না। আমার একটা বই দুটো মাথা নেই আর সেই মাথাটা রসনাতৃপ্তির কাজে আমার প্রধান সহায়ক। তা রসনা বলতে মনে পড়লো বছরে একদিন করে আমার জন্মদিন থাকে। আজ যেমন ছিল। জন্মদিন থাকার প্রধান সুবিধে হল বৌয়ের ওপর আমি আমার স্বভাব অনুযায়ী হম্বিতম্বি করলে বৌ পাল্টা আক্রমণ শানায় না। আর কাঁসার থালায় খাবার পাই। সে প্রায় কোটি কোটি পদ। একটার পাশে একটা রেখে দিলে পৃথিবী থেকে চাদে পৌঁছনো যাবে। আজও তেমন পেয়েছিলাম। প্রসঙ্গত বলে রাখি চুরাশি রকমের পদ এবং অপর প্রান্তে গৃহিনীর হাসি হাসি এবং প্রশংসার-আশায়-প্রোজ্জ্বল মুখ দেখলে আমি একটু নার্ভাস বোধ করি কারণ আমার পেটের পরিসর নেহাতই এক কামরার ফ্ল্যাট, দালানকোঠা নয়। অথচ সব কটা পদ যাকে বলে ঠিক করে অ্যাপ্রিশিয়েট না করতে পারলে আমার পদস্খলন হতে পারে অর্থাৎ হতাশাজনিত কারণে গৃহিনীর সিংহিনী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আমি যখন এই অজস্র পদের ভুলভুলাইয়াতে দাঁড়িয়ে মাথার মধ্যে একটা ডিটেইল্ড এক্সিকিউশান প্লান ছকে নিচ্ছি, সে সময় উদয় হল আমার সুলক্ষণা বড় কন্যা সানাই। সে সকাল থেকে বাবার হ্যাপি বাড্ডে জনিত কারণে মহোৎসাহে গোটা তিনেক কার্ড মেখে ফেলেছে। তার মধ্যে একটা ছিল বাটারফ্লাইরা বাড্ডেতে এসে ফ্লাওয়ারের জুস খেয়ে হেভি মৌজ মস্তি করছে। এখন দাবি সে বাবাকে খাইয়ে দেবে। জন্মদিনে প্রথম পাতে পায়েস খাওয়া হয়। সে কথা তাকে জানাতেই সে এক চামচ পায়েস তুলে কিছুটা আমাকে আর কিছুটা আমার কাচা টি শার্টকে সরাসরি অফার করে দিল। টি শার্ট থেকে টুপটুপ করে অধোগতি প্রাপ্ত গড়িয়ে নামা পায়েস মুছেটুছে, সানাইকে মৃদু ভর্ৎসনা করে (সানাইয়ের তাতে বিশেষ অনুতাপ হল বলে মনে হল না), সবে খাওয়াতে মনসংযোগ করেছি সানাই তেজের সঙ্গে জানাল সে আরো খাওয়াতে চায়। অতএব শাক ভাজা দিয়ে ভাতের অপার্থিব স্বাদ উপভোগ করার মাঝেই আর এক চামচ পায়েস খেয়ে নিতে হল। ভাবলাম যাক ঝামেলা মিটল। কিন্তু রোগের প্রকোপ যেমন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় সেরকম সানাই আমায় এর পরের পনের মিনিটে মাছের সাথে পায়েস, পটলের দোলমার সাথে পায়েস, আলুভাজার সাথে পায়েস খাইয়ে সুচিন্তিত ভাবে আমার স্বাদকোরক নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে থাকল। ধৈর্যের পরীক্ষাও বলা চলে। ফলতঃ আমি ইলিশ মাছের ঝাল দিয়ে ভাত খেতে খেতে সানাই দত্ত আমের চাটনি খেলাম। পটলের দোর্মার দুরন্ত স্বাদ মাঠে মারা গেল কারণ সাথে এক মুঠো সাদাভাত, হ্যাঁ একদম প্লেইন সাদা ভাত, খেতে হল।

আমার স্ত্রীয়ের রান্নার হাতটি খাসা। কিন্তু সানাইয়ের অশেষ বদান্যতায় যে মোটের ওপর সমস্ত টেস্টের গুষ্টির তুষ্টি হয়ে গেল সেটা বোধ হয় সুধী পাঠক বুঝতেই পারছেন। এইভাবে খাওয়া পর্ব চালিয়ে যখন শেষ পাতে পৌঁছেছি এবং যুত করে আমের পায়েসের বাটিটা ধরে সেই অমৃতসম লেহ্য পদ দিয়ে জিভের সুখবিধান করতে এক চামচ মুখে দিয়েছি, সানাই আমাকে আমার প্রথম পাতের ছেড়ে আসা একটা জাম্বো সাইজ উচ্ছেভাজা অফার করল। পায়েসের সাথে উচ্ছে? আপনারাই বলুন কাঁহাতক সহ্য করা যায়। আমি ফুট ডাউন করলাম। না সানাই, উচ্ছে এখন খায় না। কিন্তু ততক্ষণে ওর মাথায় খুন চেপে গেছে। উচ্ছে আমায় ও খাইয়েই ছাড়বে। আমিও উচ্ছে কিছুতে খাব না। শেষমেশ ধুন্ধুমার কাণ্ড, ওর মায়ের বকুনি এবং ফলস্বরূপ সানাইয়ের সপ্তম সুরে সানাই বাজাতে বাজাতে পা ঠুকে ঠুকে সোফার দিকে প্রস্থান। এর মধ্যে ওর বোনু অর্থাৎ তাথৈয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গেছে। সে কোনোরকম পূর্বলক্ষণ না জানিয়ে তারস্বরে কাঁদতে শুরু করল। বাবার দুঃখে না নিজের দুঃখে না দিদির দুঃখে নাকি দিদিকে সঙ্গত দেওয়ার জন্য সেটা বোঝা গেল না। শুধু এই দ্বিবিধ আক্রমণে আমার খাওয়ার অবশিষ্ট ইচ্ছার পরলোক প্রাপ্তি হল। আমি কোনমতে বাকি পায়েসটুকু মুখে ঠুসে দিয়ে দুই রত্নসম কন্যার কান্না থামানোয় তথা বাড়ির শান্তি বিধানে উদ্যোগী হলাম। জিভ সেবা, সাংসারিক ভোগসুখ থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে আমাদের নির্বাণ লাভের পথ প্রশস্ত করাই যে আমার কন্যারত্ন দ্বয়ের মূল উদ্দেশ্য সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহই রইল না।

বেবি সিটিং

[2018 Summer]

ঘরে একা বসে আমার প্রায় ছবি বিশ্বাস হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। কেন বলি। আমার কন্যারত্নটি তো আছেই, সঙ্গে এক বন্ধুপুত্র। এই দুই বিস্ময়কর প্রাণীর বেবি সিটিং-এর দায়িত্ব আমার ওপর। একেবারে যাকে বলে ডবল ধামাকা। এমনিতে বাচ্চাদের সঙ্গ আমার মন্দ লাগে না। ওদের মনস্তত্ত্ব স্টাডি করে আমি বেজায় আনন্দ পাই। 

এ যাত্রায় প্রথমেই ওদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করে দিই। কারণ আমার স্থির বিশ্বাস বন্ধুপুত্র হৃদুকে আমার কন্যা সানাই কয়েক মুহুর্ত আগে যেরকম উৎসাহের সঙ্গে বিগলিত হয়ে আপ্যায়ন করেছিল সেইরকম গদগদ সম্পর্ক আধ ঘণ্টা পরে থাকবে না। কারণটা একটাই। রিসোর্স কনস্ট্রেইন্ট। যে জিনিসটা এর চাই সেইটাই সেই মুহূর্তে অন্য জনেরও দরকার হবে। বড়দের মধ্যেও একই বিবাদ হচ্ছে বড় বড় জিনিস নিয়ে। ওদের মধ্যেও হয় ছোট ছোট জিনিস নিয়ে। যেমন ধরুন একটা ম্যাজিক স্টিক্ বা জাদুকাঠি। এ যদি নিলো ওরও চাই। দু কপি থাকলে যে খুব একটা স্বস্তি পাবেন তা না। কারণ এ যে কপিটা নেবে, অন্যটা ফেলে দিয়ে ওরও সেই কপিটা চাই। এ জন্যই এক জ্ঞানীগুণী দাড়িওলা ভদ্রলোক লিখে গেছে “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই যাহা পাই তাহা চাই না।” 

তাই প্রথমেই প্রিয়েম্প্টিভ মেজ়ার হিসেবে ওদের বলি “তাহলে আমরা ফ্রেন্ডস্ রাইট? নো ঝগড়া, কেমন?” দুজনেই খুব বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। আমিও ওদের নিজেদের মত খেলতে দিয়ে একটা উপন্যাসে ডুব দিই। কিন্তু বিধি বাম। কিছুক্ষণ পর থেকেই একবার এর থেকে আর একবার ওর থেকে নালিশ আসতে থাকে “সানাই মারছে”, “রিদু মারছে” ইত্যাদি। অন্যমনস্ক ভাবে একটাই বাক্য ফাটা রেকর্ডের মত বাজাতে থাকি। “দুজনকেই বকব, দুজনকে দু ঘরে দিয়ে দেব,” ইত্যাদি হুমকি দিতে থাকি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবার ওদের সখ্যতা স্থাপিত হয়। তারপর আবার যে কে সেই। 

যখন নালিশ করছে না তখনো যে শান্তি তেমন নয়। কারণ নালিশ করছে না যদি তাহলে নির্লিপ্ত চিত্তে কিছু না কিছু একটা অকাজ, কুকাজ করছে ধরে নেওয়া যেতেই পারে। যেমন সোফায় উঠে উদম নৃত্য বা সোফার হাতল ধরে বিপজ্জনকভাবে ওঠানামা। সেগুলো থেকে মাঝে মাঝে বকাঝকা দিয়ে বিরত করছি। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম রীতিমত গোল বেধে গেছে। অজস্র আনাইডেন্টিফাইড্ ফ্লাইং অবজেক্ট বা ইউ-এফ-ও ঘুরছে আমাদের বসার ঘরের আকাশে। কিম জং উন-এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কিনা কে জানে সানাইয়ের খেলার ব্লক্সগুলো মিশাইলের মত সাঁই সাঁই করে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে চলেছে। টিভির আশেপাশে সেগুলো বিপজ্জনকভাবে ল্যান্ড করছে। একটা আমার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। কাচের জানলায় ঠকাস করে লেগে তারপর অধঃপতন।  “নো থ্রোয়িং” বলে চেঁচাই। কিছুক্ষণের বিরতি।  

তারপর আবার সেই একই খেলা। সাথে যোগ হল নালিশ। সানাই ছুঁড়লে হৃদু নালিশ করে “সানাই ছুলছে’ আর ভাইস ভার্সা। আবার হুমকি ছাড়ি। “দুজনকে দু ঘরে রেখে দেব কিন্তু”। এর উত্তরে সানাই বলে “রিদুকে বকো। রিদু ছুঁলেছে”। রিদু বলে “সানাইয়ের কান মলে দাও। ও ছুঁড়েছে।” আমি কিন্তু ফিজিক্যাল ভায়োলেন্সের পথ মাড়াই না। কান মুলে দিলে সানাই এখন যে সানাই ধরবে সেটা হয়ে যাবে গোদের ওপর বিষফোঁড়া। বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমি রাহুল দ্রাবিড়ের মত সেফ খেলার চেষ্টা করি। কোন সাইডই নিই না। দুজনকেই চোখ রাঙাই। 

কিন্তু মুস্কিলটা হল আমি আমার ছোটবেলাটাকে পুরোটা ভুলে উঠতে পারিনি। তাই ওদের এইসব বালখিল্যপনার মধ্যে নিজেরই ফেলে আসা দিনগুলোকে খুঁজে পাই। তাই সেই অর্থে কাউকেই বেশি বকে উঠতে পারি না। আর বড়দের মুড আর টোন জাজ করার ক্ষমতা ওদের অসীম। তাই দুজনের কেউই সে অর্থে ক্ষান্ত দেয় না। 

একটার পর একটা নতুন দুষ্টুমি বুদ্ধি উদ্ভাবন করে দক্ষযজ্ঞ টাইপ একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড চালাতে থাকে। মাঝে মাঝেই সানাই “মাইন মাইন” বলে চেঁচাতে থাকে। এ মাইন কিন্তু ল্যান্ড মাইন নয়। এর অর্থ mine অর্থাৎ আমার। আমার আড়াই বছরের শিশুকন্যাকে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ পড়াতে পারি নি এখনো। তাই “আমি ও আমার এইটেই অজ্ঞান” – এই জীবনদর্শনে ওর বিশেষ আস্থা নেই। তাও বলি “সানাই শেয়ার করতে হয়। রিদু তোমার বন্ধু না?” বলি বটে কিন্তু খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি না। সত্যিই তো, আমরাই বা আমাদের যা আছে তার ঠিক কতটা শেয়ার করি যাদের নেই তাদের সাথে যে ও করবে। শেষমেশ তিতিবিরক্ত হয়ে আমি উপন্যাস থেকে বেরিয়ে এসে বলি “চলো এবারে আমি গল্প পড়ে শোনাব”। হাতের সামনে “দ্য বিউটি এন্ড দ্য বীস্ট্” বইটা নিয়ে খুব নাটকীয়ভাবে রিডিং সেশন শুরু করি। দুজনেই কোল ঘেঁষে আসে। তারপরের ঘটনা নিম্নরূপ। 

আমি বলি “দেন এ বিগ স্টর্ম হ্যাপেনড। দ্য বোট ক্যাপসাইজ়ড্।” সানাই বোটের দিকে আঙুল দেখিয়ে “নৌকো নৌকো” বলে উৎসাহ প্রকাশ করতে থাকে। কানের থেকে চোখের আবেদন বেশি আমাদের কাছে। ওদের কাছেও তাই। গল্প শোনার থেকে গল্পের বইয়ের ছবি দেখাতেই বেশি আগ্রহ। দমে না গিয়ে বলি “হ্যাঁ বোট। তারপর কি হল শোনো”। এর মাঝেই রিদু প্রশ্ন করে বসে “গোলাপ। মেসো গোলাপ কেন?” লে হালুয়া। সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি।  

“কি শুনলে তাহলে এতক্ষণ? বিউটির বাবাকে বিউটি একটা রক্তগোলাপ এনে দিতে বলেছিল। বললাম না আগে?” শুনে মাথা নাড়ে। ঠিক বুঝল বলে মনে হয় না আমার। সবে আবার রিডিং পড়তে পুরো দমে শুরু করেছি রিদু আমার কোন অনুমতি না নিয়েই নিতান্ত অবিবেচকের মত পাতাটা উল্টে দেয়। আগের পাতার গল্পে ওর আর বিশেষ উৎসাহ নেই। নো প্রব্লেম। ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে সিনেমা তো আমরাও দেখে থাকি – এই বলে মনকে প্রবোধ দিই। পরের পাতায় যা লেখা ছিল সেটাই উৎসাহের সাথে পড়তে শুরু করি। আমার উৎসাহ দেখে সানাই ততোধিক উৎসাহে বইটা একেবারে বন্ধ করে দেয়। হাসি হাসি মুখ করে বলে “অল ডান।” অর্থাৎ গল্প পড়া আপাতত মুলতুবি। 

গল্পটা ওদের জন্য তেমন উত্তেজনা উদ্দীপক হচ্ছে না। বলি “তোমরা ম্যাজিক দেখবে? ম্যাজিক?” আমরা সবাই জীবনে একটা ম্যাজিক চাই। ওরাও চায়। ম্যাজিক দেখার নামে গায়ের কাছে ঘন হয়ে আসে। আমি কোন পি সি সরকার নই। ম্যাজিকের ম জানিনা। সুবিধে হচ্ছে এই মুহূর্তে আমার অডিয়েন্সও তেমন সেয়ানা নয়। তাই একটা ব্লক হাতের তালুতে নিয়ে পরক্ষণেই পিছনে লুকিয়ে ফেলে বলি “ভ্যানিশ”। দুজনেরই চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা। উৎসাহ পেয়ে আবার করি। কিন্তু না ওদের খুলিতে খোল ভরা নেই। এই বারের বার হৃদু পেছন থেকে অদৃশ্য ব্লকটা বের করে নিয়ে এসে বলে “আমি করি?” বলে আমারই ম্যাজিক আমাকেই দেখিয়ে দেয়। 

এইসব নানারকম করে যখন বিধ্বস্ত ততক্ষণে হৃদুর বাবা, আমার বন্ধু বাড়ি চলে এসেছে। প্রাণে একটু বল পাই। মনে সাহস। এইবারে শুরু হয় ওদের খাওয়ানোর পালা। আর বাচ্চাদের খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা নিশ্চয়ই এক বাক্যে স্ব্বীকার করবেন যে সেটা ধর্মের পথে থাকার মতই শক্ত।  

নবীনগঞ্জ

শীত মানেই ভীড় করে আসে এক গুচ্ছ স্মৃতি। এক ঝাঁক বকম বকম পায়রার মতন অর্থহীন সংলাপে ভরে ওঠে মনের উঠোন। ছোটবেলায় শীত মানেই ছিল মায়ের হাতে উলের কাঁটায় বোনা উলটো ঘর। ব্যাডমিন্টন খেলতে থাকা সারা সন্ধে ভর। ছুটির দুপুরে বাবার হাত ধরে পৌঁছে যেতাম কখনো চিড়িয়াখানা, কখন বইমেলা। বয়সটা ছিল পড়া পড়া খেলার। শীত মানেই মনে পড়ে নতুন গুড়ের স্বাদ। ছুটির দুপুর একলা পেলেই ফেলুদা হাতে চিলেকোঠার ছাদ।

সরস্বতী পূজোর আগে কুল খেলে দেবী পাপ দেবেন সেই ভয়ে কক্ষনো চেখে দেখতাম না পাকড়াশি স্যার-এর বাগানের টোপা টোপা নারকোলি কুল। একটু বড় হবার পর বড়জোর একটা দুটো। মা কালির দিব্যি, পুজোর আগে তার বেশি কক্ষনো খাইনি…তাও মনে মনে দেবী হংসবাহিনীর কাছে মার্জনা ভিক্ষা করে। কুল খাওয়ায় দেবীর নিষেধ থাকলেও কুল চুরি করায় ছিল না। তাই এন্তার কুল চুরি করতাম আমি বাবু আর অনুপম মিলে। আমি ছিলাম বৃক্ষ বিশারদ। অর্থাৎ চোখের পলক ফেলতেই গাছে উঠে ফটাফট্‌ কুল ঝেড়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাকে বলে বামাল হাওয়া হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া থুড়ি মানে পাড়াজোড়া। তাই পাড়ার কুল পিপাসুরা শীত পড়লেই চুড়মুড়টা, চুরনটা দিয়ে আমায় যে হাতে রাখার চেষ্টা করত সে কি আর বুঝতাম না! কুল চুরি করে ধরা কখনো পড়িনি ঠিকই, তবে একবার প্রায় মারা পড়েছিলাম। আমাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পাকড়াশি স্যার এক পিস কেঁদো বাঘের বাচ্চা থুড়ি মানে অ্যালসেশিয়ান কুকুর এনেছিল কিন্তু আমার চুড়মুড় সাপ্লায়াররা সে খবর আমায় এনে দিতে পারে নি। তাই যেই না পাকড়াশি স্যার-এর গাছে ওঠা, সেই চতুষ্পদ মূর্তিমান মৃত্যুর কর্ণকুহরে সেই মধুর আওয়াজ প্রবেশ করল। তারপরে যা হয় আর কি..গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে আমিও দৌড়চ্ছি আর হাত পাঁচেক পেছনে আমায় দিয়ে আজকের লাঞ্চটা সেরে নেবার তাগিদে তিনিও দৌড়চ্ছেন। দৌড়তে দৌড়তে ভুবন ডাঙার মাঠ এল। নিশ্চিন্দিপুর এল..গোঁসাই বাগান এল। তারপর পাকড়াশি স্যার-এর কুকুরটা টিনটিনের সঙ্গী snowy হয়ে গেল..রাজলক্ষ্মী এল..ইন্দ্রনাথ..সাঁওতাল রাজকন্যা ভানুমতি এল.. কতবার প্রেমে পড়লাম.. কতবার কতবার মিঠে রোদ্দুরের ওম নিতে নিতে লেবুর খোসা ছাড়ালাম। কত শীতের দুপুরে স্নান না করার জন্য বায়না করলাম আর বাবার ধাঁতানি খেয়ে স্নান করতে গেলাম। আজ হয়তো কোনো ছুটির দুপুরে স্নান করি না। কিন্তু স্নান করতে বলার লোকগুলো কাছে নেই…

বড়বেলা, হে আমার ক্লান্ত বড়বেলা, আমায় নবীনগঞ্জে ফিরিয়ে দাও।

Beauty and the Beast

আমার তিন বছরের কন্যার ভারি টিভি দেখার নেশা বেড়ে যাচ্ছে। তাই আদর্শ বাবার মত ঠিক করলাম ওকে একটু বই পড়ে শোনাতে হবে। আমেরিকানরা তো সন্তানের জন্ম থেকেই বাচ্চার ঘুমোনোর আগে তাকে বই পড়ে শোনায়, তাতে নাকি সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুদের vocabulary বাড়ে। আমি সেই দুঃসাহস করি নি। কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে সানাইকে একটু স্টোরি রীড করে শোনাতে সচেষ্ট হই। তো আজকের গল্প Beauty and the Beast।


বেশ অনেকটা পড়ে ফেলেছি গল্পটা। এক ডাইনি রাজপুত্রকে অভিশাপ দিয়ে কদাকার পশুমানবে, অর্থাৎ একটা Beast-এ পরিণত করেছে। এদিকে Beauty-র বাবার খুব দুঃসময়। ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে ভাঁড়ে-মা-ভবানী হয়ে গেছে। তাও আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া। জাহাজ উদ্ধার করতে গিয়ে ফেরার পথে Beast-এর প্রাসাদে আশ্রয় নেয়। ভুড়িভোজ খেয়েটেয়ে, রাত্রে নরম বিছানায় ঘুমিয়ে টুমিয়ে সকালে যখন Beauty-র জন্য Beast-এর গোলাপ বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়ে নিয়েছে তখন Beast-এর মাথা যাকে বলে একেবারে ভিসুভিয়াস। Beauty-কে পাঠিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি দিয়েছে ওর বাবাকে। রুদ্ধশ্বাস ব্যাপার। বাড়িতে এসে সব ঘটনা বলায় Beauty স্বেচ্ছায় Beast-এর প্রাসাদের উদ্দেশে যাত্রা করছে। Beauty কাঁদছে। Beauty-র বাবা কাঁদছে। আকাশ বাতাস পাখি নদী সবাই কাঁদছে। সমস্ত ক্রন্দসী কাঁদছে বলা চলে। এরকম একটা ভয়ানক বিষণ্ণ মুহূর্তে সানাই জিজ্ঞেস করে বসল, Beauty কাঁদছে কেন বাবা? ও কি ভাতু খায় নি? মাম্মা বকেছে?
লে… সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি? ভাতু-না-খাওয়া-জনিত-মাম্মার-বকা ছাড়াও যে মানুষের দুঃখের আরো কারণ হয় বোঝাতে চেষ্টা করি। সিকুয়েন্স অফ ইভেন্টটা আবার একবার রিপিট মারি। কিন্তু সানাই অলরেডি Beauty-র কান্নার কারণ জানার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। শেয়ার মার্কেটের থেকেও তড়িৎ গতিতে মনের মতি বদলায় ওর। অতএব চরৈবেতি। পরে কি হল জানতে চায়। বাকি গল্পটুকুও পড়ে ফেললাম। Beast-এর Beauty-র প্রতি সহৃদয় ব্যবহার (সুন্দরী মেয়ে পেলে কে আর extra nice ব্যবহার করে না – মনে মনে ভাবছি)। কয়েকদিন Beast-এর প্রাসাদে থাকার পরে Beauty-র বাবার জন্য মন খারাপ। Beast Beauty-কে বাড়ি আসতে অনুমতি দেয়। Beauty বিরহে Beast-এর এই যায় সেই যায় অবস্থা। Beauty-র প্রত্যাবর্তন আর তার চোখের জলে Beast-এর শনির দশা কেটে আবার রাজকুমারে রূপান্তর। অতঃপর Beauty আর রাজপুত্রের বিয়ে-সাদি-সানাই (ইয়ে মানে এটা বাদ্যযন্ত্র সানাই। কথাযন্ত্র সানাই না) । গল্পটা সবাই জানে। কিন্তু মুস্কিল হল গল্পশষে সানাইয়ের প্রশ্নগুলোতে।

সব শুনেটুনে সানাই বলল বাবা, প্রিন্সের মাম্মা কই? খুব-ই চাপের প্রশ্ন। গল্পের লেখক ও পাঠককুল কেউ কোনদিন Beast-cum-রাজপুত্রের বাবা মা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। আগডুম বাগডুম একটা বললাম। পরের প্রশ্নগুলো এইরকম –


বিউটির বাবা কই?
বাড়িতে আছে।
কেন?
কারণ Beauty Beast-এর রাজপ্রাসাদে গেছে তাই।
রাজপ্রাসাদে গেছে। ও। কেন?
কারণ Beast-এর শরীর খারাপ হয়ে গেছে ( গল্পপাঠকালীন কিছুই বোঝাতে পারিনি ভেবে আমার রক্তচাপ বাড়ছে) ।
ও শরীর খারাপ? Beast ডক্করের কাছে যাবে? ইনজেকশান দেবে ডক্কর?
“সেটা দিতেও পারে। কিন্তু এখানে সেরকম লেখা নেই।” গল্পে ডাক্তার বদ্যি আমদানী হবার আগেই আমি তাড়াতাড়ি আর একবার ঘটনাপ্রবাহ বলে দিই। “Beauty-র বাবা Beast-এর বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়েছিল তো। তাই Beast রেগে গিয়ে Beauty কে আসতে বলেছিল।”
বাবা গোলাপ ছিঁড়েছিল? কেন?
আরে Beauty একটা red rose চেয়েছিল না? এই যেমন তুমি কিছু চাইলে বাবা এনে দেয় না?
Beauty red rose কেন চেয়েছে বাবা?
আরে বললাম না, বিউটির বাবা ওকে জিগেস করল, তুমি কি গিফট্ নেবে। তখন ও একটা রক্তগোলাপ চাইল।
ক্রিস্টমাস গিফট্?
হ্যাঁ, ক্রিস্টমাস গিফট্।
Oh. I see.
যাক বুঝেছে। গল্পটা বোঝাতে পেরেছি ভেবে আমি মনে মনে গর্বিত বোধ করি যাকে বলে basking in glory. পরে সানাই-এর থেকে শুনে দেখলাম, গল্পটা আসলে এরকম।


Beauty ভাতু খায় নি। তাই Beauty-কে তার মাম্মা বকেছে। তাই বিউটি কাঁদু করেছে। তখন বিউটির বাবা christmas gift দেবে বলেছে। Beauty-র বাবা Beast-এর বাড়ি গিয়ে ফুল ছিঁড়েছে। তাই Beast বিউটিকে timeout দিয়েছে (যাঃ বাবা, টাইম আউটের কথা বললাম কোথায়? Beauty and the beast-এর গল্পের সঙ্গে এ যে দেখছি নিজের original creation punch করে দিচ্ছে)। বিউটি timeout পেয়ে কাঁদু করেছে। Tears লেগে Beast প্রিন্স হয়ে গেছে। তখন প্রিন্স-এর মাম্মা এসেছে। এসে বিউটিকে ঠিক করে ভাতু খেয়ে নিতে বলেছে (যাক বাবা এটা বলে নি প্রিন্স-এর মাম্মা এসে প্রিন্সকে বলেছে Beauty-র সারা জীবনের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে)।

……এতক্ষণের পণ্ডশ্রমের কথা ভেবে ততক্ষণে আমার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।

লাথি ঝাঁটা

শুনেছি বয়সকালে ছেলেমেয়ের কাছে লাথি ঝাঁটা খেতে হয়। আমার “বয়সকাল” হয়েছে কিনা জানি না কিন্তু কালে কালে বয়স তো কম হল না। বয়সকাল হয়েছে না বয়সটাই কাল হয়েছে বলতে পারব না, আর ঝাঁটাটা ভবিষ্যতে বরাদ্দ হবে কিনা জানি না কিন্তু লাথি বরাদ্দ হচ্ছে এখন থেকেই।

আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য, বয়সে নেহাতই নবীন। তিনি পৃথিবীকে অনুগ্রহ করার পর থেকে একটাই বছর ঘুরেছে, মানে তাঁর বয়স এই মাত্র এক বছর। কিন্তু হলে কি হবে, নিশ্চয়ই আগের জন্মে লিটল বম্ব  তাথৈ দেবী চুনি গোস্বামী থেকে থাকবেন কারণ পা দুটি পুরো ফুটবল-বলিষ্ঠ। ক্ষুদ্র বলিয়া তুচ্ছ নই এই নীতিকথা অনুসরণ করে তিনি সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে, মানে যাকে বলে পাখি ডাকা ভোর থেকে (আমার জন্য অবশ্যই অর্ধেক রাত্রি) পদাঘাত করতে শুরু করেন মানে কাঁচা বাংলায় লাথি মারতে শুরু করেন। বক্তব্যটা হল আমার যখন ঘুম ভেঙেই গেছে তখন তোমরা ঘুমোও কোন অধিকারে? উনি তো সুযোগ সুবিধে মতই একটু গড়িয়ে নেন, আমি হয়তো সপ্তাহান্তের পার্টি প্রেসার সামলে, ধেই ধেই করে নেচে, ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির বাপ বাপান্ত করে, সোনালি তরলের ঘুমঘোর মোহে দেশের দুঃখদুর্দশার কথা বন্ধু সহযোগে তর্কাতর্কি করে, ফেসবুকীয় বিপ্লব সেরে রাত্রি দ্বিপ্রহরে বডি বিছানাতে ফেলেছি। তাই শরীরের বিশ্রামের প্রয়োজনেই এবং মনের বিশ্রামের অধিকারেই ঘুমোই। কিন্তু এ যুক্তি তার কাছে প্লেস করার সুযোগ নেই কারণ যে দু তিনটে ভাষায় আমার সামান্য দখল আছে, আমাদের বাড়ির নবীনতম সদস্য এখনো সেই ভাষায় বাক্যালাপ করতে বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করে নি। তাঁর স্টাইল পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিক। নিজের সুবিধা-অসুবিধা প্রয়োজন-অপ্রয়োজন উঁচুস্বরে নির্দ্বিধায় অন্যের সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি জানান দেন। হিটলার মুসোলিনিও লজ্জা পাবে সেই অথরিটেটিভ স্টাইল দেখে। ধরুন আপনি সকালবেলার প্রথম পটি – না না সকাল সকাল বাজে কথা নাই বা বললাম – ধরুন সকালবেলার প্রথম চা-টা হাতে নিয়ে সোফায় “রাতভর ঘুমোনো ক্লান্ত শরীরটা” একটু এলিয়ে দিয়েছেন এমন সময় বাজ পড়ার মত বাজখাঁই গলায় চিৎকার। আপনি ভাবছেন এই তো সবে ডাইপার চেঞ্জ করে দুধ খাইয়ে সব প্রয়োজন মিটিয়ে দিলাম। কথা হচ্ছে সে প্রয়োজন ছিল শরীরের। এখন তার আত্মার প্রয়োজন আর সেটা হল বাবার কোলে উঠে একটু মর্নিং ওয়াক করা। পিতাপুত্রীর সুসম্পর্ক সাধনের সদিচ্ছা নিয়েই সে সাশ্রু নয়নে জানাবে এই দাবী। কোলে তুলে নিলেই যে দু পাটি দাঁত বের করে এমন নিখাদ স্মাইলটি দেবে দেখেই মনে হবে আগের কান্নাটা ছিল কুমীরকান্না। দু পাটি দাঁত বের কথাটা একটু অত্যুক্তি হয়ে গেল কারণ দু চার খানা দাঁতেরই শুভাগমন হয়েছে সে মুখে। 

যাকগে যাক, কথা হচ্ছিল লাথি ঝাঁটা খাওয়ার। তা হ্যাঁ, লাথিটা নিয়ম করেই খাচ্ছি। তিন বছর আগে খেতাম বড় মেয়ের কাছে। কিন্তু সে এখন রেগে গেলে রাম চিমটি, লক্ষ্মণ কিল ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে (ওর মায়ের কাছে হেভি ঝাড় খাওয়ার সম্ভাবনাটা কনসিডার করে নিজের পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে)। কিন্তু ছোট মেয়ের সে আপদ নেই। এই এক বছর ধরে হোম স্কুলিং-এ বাংলা ভাষা শিক্ষা করে নিশ্চয়ই  ভাষাটাকে তার খুব ফানি ল্যাঙ্গুয়েজ লেগে থাকবে নয়তো তার মা তার ওপরে গলা চড়ালেই দু পাটি না-হওয়া দাঁত বের করে ফ্যাকফ্যাক করে হাসবে কেন? বকাঝকা ভীতির উদ্রেক না করলে বকার উৎসাহ, উদ্যম দুটোই চলে যায়। তো যা বলছিলাম, তিনি বকাঝকার তোয়াক্কা না করেই লাগাতার লাথি মেরে ছটার মধ্যে আমার ঘুমের দফারফা করে দিয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকেন। খিদের মুখে যেমন পৃথিবী গদ্যময়, ঘুমের মুখে তেমনি পৃথিবী রাত্রিময়। থুড়ি ঘুমের চোখে পৃথিবী শত্র‌ুময়। আর সেই শত্র‌ুই যখন ফোকলা দাঁতের হাসি দিয়ে মনজয় করার চেষ্টা করে তখন মনে গৌতমবুদ্ধসুলভ সদ্ভাবনার উদ্ভব হয় না এ কথা অকপটে স্বীকার করাই যায়। তবুও ভদ্রতার খাতিরে মুখে দেঁতো হাসি লাগিয়ে পুতুল সাইজের প্রাণীটাকে জড়িয়ে ধরে সেকেন্ড রাউন্ড ঘুমোনোর চেষ্টা করি। প্রাণপণ।