কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৩

May 22, 2019, Morning

মার্কিন মুলুক থেকে কলকাতা ফিরলে থাকে একটা বাৎসরিক অনু্ষ্ঠান। তার নাম ভিসা স্ট্যাম্পিং। আমেরিকায় ঢোকার অনুমোদনপত্র নবীকরণ করতে হবে। তাই দেশে পৌঁছে সপ্তাহান্তটা বাড়িতে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভিসা অভিযানে। আমাজন অভিযানের থেকে সেটা কিছু কম উত্তেজক ঘটনা নয়। পার্থক্য হচ্ছে আমাজন হল রেইন ফরেস্ট, আর মে মাসের  কলকাতা হল বৃষ্টিহীন কংক্রিটের অরণ্য। প্রথম দিনেই বাসে ট্রামে যাওয়ার রোমহর্ষক কিম্বা স্বেদসিঞ্চক ঘটনা ঘটাতে রাজি হল না স্ত্রী। তাই বাড়ির গাড়ি এবং ড্রাইভার বাবুদা। বাবুদা গাড়ি চালানোটা শিখেছে ঠিকই কিন্তু কলকাতার মানচিত্রটা শেখেনি। আর মাপ করবেন পৃথিবীর কোন শহরেরই ম্যাপ আমি কোনদিনও আত্মস্থ করতে পারি নি। অতএব গুগল দেবতাকে স্মরণ করা হল। গন্তব্য হো-চি-মিন সরণী। ইউ এস কনসুলেট। বাবুদার অসাধারণ কলকাতাপ্রীতি হোক বা গুগলের নির্দেশ অমান্য করার ধৃষ্টতাই হোক, কোনো একটা কারণে মোটামুটি পার্কস্ট্রীট চত্বরের প্রায় প্রতিটা গলি থেকে বড় রাস্তায় চাকার ধুলো দিয়ে যখন কনসুলেটে পৌঁছলাম তখন অনেক বেলা। গিয়েই বুঝলাম ছড়িয়েছি। শুধুমাত্র ভিসা ইন্টারভিউ দেওয়ার থাকলেই এখানে আসতে হয়, আমি করতে এসেছি ভিসা রিনিউয়াল। সে কাজ হয় শেক্সপিয়ার সরণী থেকে। কনসুলেটের নিরাপত্তারক্ষী বুঝিয়ে দিল হো-চি-মিনের পদপ্রান্ত থেকে শেক্সপীয়ারের সান্নিধ্যে পৌঁছনোর রাস্তা। মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। বাবুদার ম্যাপজ্ঞানের অনুগ্রহে আর কলকাতার ওয়ান-ওয়ে রাস্তার নিগ্রহে এই দশ মিনিটের হাঁটাপথ তিরিশ মিনিটের গাড়িপথ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে মনে করে হাঁটাই মনস্থ করলাম। যমলোকে শুনেছি পাপীদের ফুটন্ত তেলের কড়াইতে নিক্ষেপ করা হয়। পাপকর্ম জীবনে কম করি নি ! তাই যমলোকে জীবন্ত মানুষের মত বোশেখি দাবদাহে দগ্ধ হতে হতে অতঃপর শেক্সপিয়ার সরণীর ভিসা অফিস। 

এই কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে একটা ফলভারে বিনম্র আম গাছ এক টুকরো মরূদ্যানের মত আগলে রেখেছে জেসমিন টাওয়ার। ঢুকে পড়ে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সাবমিট করতেই চমক। ছবিটা নাকি স্পেসিফিকেশান মত হয় নি আর তাছাড়া একটি ডকুমেন্ট লাগবে যা আমি নিয়ে আসিনি। মাথায় বজ্রাঘাত হলেও এর থেকে কম পাথর হতাম। এই গরমে অন্য একদিন জেসমিন টাওয়ারের চক্কর কাটতে হলেই চিত্তির। বাইরে অপেক্ষারত স্ত্রীরও গরম বাণী নসীব হবে। “ঠিকঠাক দেখে ডকুমেন্ট আনো নি” এইবিধ আক্রমণের আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে প্রতিরক্ষাস্বরূপ নিজের যুক্তি পেশ করি, “ওয়েবসাইটে ঠিক করে কিছু লেখা নেই”। কিন্তু চুপি চুপি বলে রাখি, ওয়েবসাইটে ঠিকই লেখা ছিল। আমি সব কিছু একটু ক্যাজুয়াল নিই বলেই আজ এই হাল। হালে পানি কিভাবে পাই, পা ছড়িয়ে বসে ভাবছি, এমন সময় নিরাপত্তারক্ষীর অম্লমধুর আবেদন, “এখানে ওইভাবে পা ছড়িয়ে বসবেন না”। তাই শুনে এক অচেনা প্রিয়দর্শিনীর মুখে এমন একটা অপ্রিয়দর্শন বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তাতে স্বকীয় অভব্যতার প্রতি যথেষ্ট লজ্জিত বোধ করলেও গরমে মতিভ্রম হয়েছে মনে করে মনে মনে নিজেকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ইন্টারনেটের খোঁজ। যদি মিসিং ডকুমেন্টটা পাওয়া যায় কোনভাবে। আমার মত মুর্গিদের জাঁতাকলে পেষবার ব্যাবস্থা সামনেই। অনেকেই ভিসা ফর্মের প্রিন্ট আউট নিয়ে আসে না বলে ঝোপ বুঝে কোপ মারার ব্যাবস্থা। ইন্টারনেট ক্যাফেতে ঢুকতেই এক মাড়োয়ারী ভদ্রলোক জানিয়ে দিল ভিসা ফর্মের প্রিন্ট নিতে পাঁচশ টাকা লাগবে। সবিনয়ে জানাই আমি সেই অপরাধে অপরাধী নই। অন্য ডকুমেন্ট প্রিন্টপ্রার্থী। দেড় মিনিটের ইন্টারনেট সার্ফিং আর প্রিন্ট করার মূল্য ধার্য করল দুশ টাকা। অন্যায্য। তবু তৃষ্ণার্তকে এক ফোঁটা জল দিলে যেমন সে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে আমিও করলাম। এইবার ভিসা স্পেসিফিকেশান অনুযায়ী ছবি তুললেই এ যাত্রা কাজ উদ্ধার হবে। সন্ধান পাওয়া গেল যে বি কে মার্কেট বলে এক জায়গায় একদম মার্কিনদের মনোমত ছবি তুলে দেবে কিন্তু হাঁটতে হবে বারো থেকে পনের মিনিট। “আরাম হারাম হ্যায়” – এই মন্ত্র জপ করতে করতে হাঁটতে লাগালাম। পথ হাঁটতে আমার খুব ভাল লাগে। জীবন থাকে। যাপন থাকে। সাহিত্যিকদের শুনেছি এক জোড়া অতিরিক্ত চোখ থাকে। আমি তেমন লেখিয়ে নই। তবু চোখ খুলে রাখতে চেষ্টা করি। চলুন আমার সাথে হাঁটুন। দেখি কেমন কলকাতা?

ওই তো একটা উভলিঙ্গ (unisex) সেলুন। বাইরের দেওয়ালে এক শ্বেতাঙ্গী, বিদেশিনী, সুন্দরীর মোহময়ী আমন্ত্রণ। ভারতীয় চোখ সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে শ্বেতাঙ্গী ও বিদেশিনীদের এখনো দু দশ নম্বর বেশি দিয়ে থাকে। আর দু পা হাঁটতেই প্রতিস্পর্ধী নগর সভ্যতার পাশাপাশি উপস্থিত কিছু হেরে যাওয়া মানুষ। ইটালিয়ান সেলুন – অর্থাৎ ইঁটের ওপর বসিয়ে নরসুন্দর ওরফে নাপিত চুল দাঁড়ি কাটছে। লেখা না থাকলেও এ সেলুন উভলিঙ্গ নয়, শুধু পুরুষ প্রাণীদের জন্য। আছে ফুটপাথে বসা লিট্টি বিক্রেতা। জীবনদায়ী ছাতুর সরবত কেবল মাত্র দশ টাকায়। না…খাওয়ার স্পর্ধা আমার নেই। আমি সুখী পান্থজন মাত্র। বিহারী ভোজনের পাশেই বিশুদ্ধ বাঙালি ভোজনেরও ব্যবস্থা। ভাত ডাল দু কুচি আলুভাজা আর মাছের ঝোল প্লেটে প্লেটে পরিবেশন হচ্ছে। একটা আনুবীক্ষণিক সাইজের পাতিলেবুও আছে। এই গরমে ওটাই অমৃতের চাঙ্গড়। মাছ কিন্তু ভাগাড়ের হয় না। শুধু জলেই তাদের প্রতিপত্তি। খাবার স্পর্ধা নেই তবু অনুসন্ধিৎসু মন দাম জিজ্ঞেস করে। মাত্র পনেরো টাকা।পাশেই পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। ক্লাসিক ব্র্যান্ডের সাদা কাঠির দাম পনেরো এখন। দু মিনিটের ফুসফুস ফুটো করার বিলাস আর এক পেট ভাত একই দামে পাওয়া যাচ্ছে পাশাপাশি দোকানে। আজও কলকাতা তার হেরে যাওয়া সন্তানদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেয় নি। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে ঠিকই কিন্তু কিছু বিজ্ঞাপন মুখে মিচকি হাসিও আনে কখনো সখনো। চোখে পড়ে গেল একটা বিজ্ঞাপন। “হার পানি কা বোতল বিসলারি নেহি” – জলসঙ্কটে পড়া এক উট অন্য সব জল দেখে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, শুধু বিসলারির বোতল পেলে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। এই আর্বান ঊস্ট্রকে দেখে একটু হাসতেই হল। নিখাদ হিউমার। দু পয়েন্ট দিতেই হল বিসলারিকে।  জল ভাবতেই দেখলাম রাস্তার ধারে এক গামলা জল রাখা। আর কাকেরা তেষ্টা মেটাচ্ছে। আমাদের মত লব্ধপ্রতিষ্ঠরা নয়, পাখিদের জন্য জল রেখে দেওয়ার এই সহৃদয়তা হয়তো ঐ মুচিটার যে ওখানে বসে ঘামতে ঘামতে জুতো সেলাই করছে কিম্বা ঐ জাঁতা হাতে ইঁটের ওপরে বসা লোকটার যার পেশা সুপুরি পেষা। আবার একটু এগোতেই সুতানুটি কাফের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আমন্ত্রণ। তিন সহোদর ভাই কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর। সময়ের সাথে ভাই গোবিন্দ আর সুতানুটির থেকে সব জমি হড়পে নিয়েছে ছোটভাই কলকাতা। গোবিন্দপুর তো ধ্যারধেরে হয়ে অখ্যাত হয়েছে। সুতানুটির নামে কাফে তাই তার হারানো জমির জন্য বিচার প্রার্থনা করছে। হাঁটতে থাকি। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে ইলেকশান সিজন। পাশাপাশি ছবিতে সহাবস্থান দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ভোটপিপাসু নমস্কার মুদ্রায়। হাসির বিষয় নাকি লজ্জার বিষয় জানিনা, কোনো মা-মাটি-মানুষ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মুদিতা প্রদর্শন করতে প্রতিটা ছবিতে তাঁর চোখ দুটো গেলে দিয়ে গেছে। ঈশ্বর(চন্দ্র) যেখানে মুণ্ডুহীন, সেখানে দেশের কর্ণধার চক্ষুহীন হবেন, আশ্চর্য নয়। সুপুরি কাটার দোকানের থেকে একটু এগোলেই চুনের একটা বড় গামলা। বিনামূল্যে। সুপুরির সাথে চুনের জন্মান্তরের আত্মীয়তা। হঠাৎ মনে পড়ল, কলকাতার সাথে চুনের সম্বন্ধও অঙ্গাঙ্গি। কলকাতার নাম নিয়ে অনেক মত প্রচলিত। একটি মতে কলকাতা এসেছে কলি-কাতা বা চুনের ভাটি শব্দ থেকে। 

দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম বি কে মার্কেটে ছবি তোলার স্টুডিওতে। দাম আবার গলাকাটা। তিনশো টাকা এক এক জনের। বোঝা গেল অনেকেই ভিসা অফিস থেকে নাকচ হয়ে ভরাডুবি থেকে উদ্ধারে এই স্থানে আগমন করে থাকেন। কিন্তু বাচ্চা ছেলেটির হাতটি ভাল। মুহুর্তের মধ্যে ফটোশপ করে ব্যাকগ্রাউন্ড করে ফেলল ধপধপে সাদা ঠিক যেমনটা মার্কিন কনসুলেট চেয়েছে, মুখের ওপর পড়া অবাধ্য চুলেদের কাঁচি করে দিল ম্যাজিকের মত। আমার স্ত্রী ছবি তুলতে ভীষণ ভালবাসেন। তিনি এমন এক রিফ্লেস্ক তৈরী করেছেন যে ক্যামেরা তাক করলেই বারোটা বাজতে পাঁচ কিম্বা বারোটা বেজে পাঁচের ভঙ্গিতে মাথাটা সাইডে হেলে যায়। মাথার বারোটা বাজানোর জন্য অর্থাৎ মাথাটিকে সিধে রাখতে ফটোগ্রাফের ছেলেটিকে বেশ বেগ পেতে হল। সেই নিয়ে একটু ঠাট্টা করছিলাম। কিন্তু যে হারে গরম বাড়ছে আর বাড়ছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে কমছে রসবোধ। তাই রসিকতাগুলো অপাত্রে গেল। ছেলেটির মুখে হাসির রেখাও দৃষ্ট হল না। সে যাই হোক, তার তোলা ছবি আর ইন্টারনেট কাফে থেকে পাওয়া ডকুমেন্ট বলে বলীয়ান হয়ে আবার ফিরে গিয়ে কাজটা উদ্ধার হয়ে গেল। 

ভিসা স্ট্যাম্পিং-এর জন্য পাসপোর্ট জমা করে যেই বেরোলাম, ব্যাস বেজে গেল ছুটির ঘন্টা। ভিক্টোরিয়ার পরীর ডানা দুটো ধার করে কপোত কপোতী উড়ে চলল দক্ষিণ দিশায়। দক্ষিণাপন। শপিং টাইম। সেখানে বিশ্বের সমস্ত অদরকারি জিনিসের সম্ভার। কিন্তু বানিয়েছে বাংলার শিল্পীরা। প্রতিশ্রুতি সমস্ত লাভের গুড় নাকি তাদের ভাগেই যায়। সত্যতা জানা নেই। পথে পড়লো গড়িয়াহাট ব্রিজের নিছে চেস ক্লাব। কদিন আগেই তার উপরে প্রতিভাষণ শুনছিলাম একটা। সূর্যের প্রবল দাপটকে প্রতিহত করছে ব্রিজ আর তারই ছায়ায় গুটি সাজাচ্ছে মহারথী দাবাড়ুরা যাতে অন্যের রাজাকে প্যাঁচে ফেলতে পারে। আর দেখলাম ট্রাফিক পুলিশের বিজ্ঞাপন। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছেন প্রসেনজিত, জীৎ, দেব। বিজ্ঞাপন বলছে, “এনারা জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোতে পারলে আপনারাও পারবেন।” বেশ সৃজনশীল। তবে একটাই খটকা লাগল। শুধু বাংলা সিনে জগতের লোকেরাই তবে কি এখন আইকন? সিনেমার কুশীলবদেরই শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী আখ্যা দিয়ে যবে থেকে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তবে থেকেই কি বাংলা বৌদ্ধিক দারিদ্রে ভুগছে? কোনো লেখক কি বিজ্ঞানী কি স্পোর্টস ফিগার কি অর্থনীতিবিদ নেই এ লিস্টিতে! যাকগে। সিগনাল মেনে রাস্তা পেরোবার আর একটা বিজ্ঞাপন বলছে, “এক মিনিটের একটু থামা। আর একটু বেশি হলে ক্ষতি কি?” বেশ মজাদার। 

আর দেখলাম কৃষ্ণচুড়া গাছ। ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। তার রক্তিম গুমোরে সূর্যও খানিকটা ভীত, সঙ্কুচিত।  ও কৃষ্ণচুড়া তুমি অজুত নিযুত অর্বুদ কোটি পুষ্প বৃষ্টি করো এ ক্লান্ত, অবসন্ন শহরের বুকে। ঘৃণাকে ঘৃণা করে ফুলেল প্যারেড হোক রাজপথে। পুষ্পহন্তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোল বলিষ্ঠ জনমত। ছায়াহীন এই পৃথিবীকে ছায়াচ্ছন্ন করতে তুমিই পারো। কৃষ্ণচুড়া, শুধু তুমিই পারো এ শহরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে এক অসূয়াহীন পৃথিবী গড়তে। 

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ২

May 20, 2019, Morning

বচ্ছরভরকার মত দেশে ফিরলে তড়িঘড়ি স্টুডিওতে ছুটতে হয় প্রায় প্রতিবারই। না না টলিউড পাড়ার নয়, আমাদের পাড়ার শিপ্রা স্টুডিও। উদ্দেশ্য নিজের ছবি তোলা। নিজের মুখের প্রতি কোন বিশুদ্ধ প্রেমজনিত কারণে নয়, তার জন্য তো সেলফি ক্যামেরাই আছে (হৈ হৈ করে সেলফি কনটেস্ট হচ্ছে এন্তার), বিভিন্ন জায়গায় প্রমাণপত্র দাখিলে, ভিসা স্ট্যাম্পিং নামক বাৎসরিক উৎসব ইত্যাদি সবেতেই প্রয়োজন পড়ে আমার মুখচ্ছবি। বেরোতেই পলিটিকাল পোস্টার – “মিলে মিশে লুটে খায় বুঝে গেছে জনতা / ও পাড়ার মোদী আর এ পাড়ার মমতা”। বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না কোন পার্টি। অজস্র “এই চিহ্নে ভোট দিন”-এর ভিড়ে এমন চমৎকার পোয়েট্রিকে দু নম্বর দিতেই হয়। কাস্তের ধার না থাকলেও কথার ধার আছে বইকি।        

শিপ্রা স্টুডিওর দাদা বহু পুরনো যাকে সেই স্কুল জীবন থেকে দেখে আসছি। কখনো নামটা জানা হয় নি। তবু কুশল বিনিময় হয় দেখা হলেই। প্রথাগত “কবে এলে?” প্রশ্নের উত্তর করে ভেতরে যখন ঢুকলাম সেই চেনা ছবি। একটা সাদা কাপড়ের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা বেঞ্চি। ওইখানে সাবজেক্ট বসবে। আর তার দিকে তাক করা আছে দৈত্যাকৃতি তিনটে লাইট। কখনো কখনো কোন একটা দৃশ্য কি কোন এক গন্ধ টাইমমেশিনে করে ফিরিয়ে নিয়ে যায় গত জন্মে। প্রাচীন সুগন্ধী অতীতে। 

তখন আমার বয়স পাঁচ। আর সেদিন আমার জন্মদিন। যেন কোন অনন্ত অতীত। সময়ের রেখাগুলো সমান্তরাল হয়ে গেছে তাই। ছোঁয়া যায় না শুধু দেখা যায়। আমি তখন খড়গপুর। আমি তখন কিশলয়। জন্মদিন তখন এক অদ্ভুত আনন্দ-মৌতাত বয়ে আনত। আজ যখন জন্মদিন আসে সে সাথে করে নিয়ে আসে কি একটা হারিয়ে ফেলার একটা যন্ত্রণা – নিজের ছেলেবেলাই হবে বোধ হয়। আমার কিশলয়-আমিকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা প্রতি মুহূর্তে আমাদের জীর্ণ করতে থাকে। কিন্তু বয়স যখন পাঁচ, জন্মদিন মানেই এক অবিমিশ্র আনন্দ। বিশেষ দিনটিতে নো বকাবকি। নো পড়াশুনো। মায়ের হাতের পায়েস আর “আমি ভীষণ মহার্ঘ্য” এইধরনের একটা অনুভূতি দিনভর। আমার জন্য মা মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছে। আমার জন্য পায়েস রাঁধছে। মহাকালের গর্ভ থেকে একখানা দিন শুধু আমার জন্যই কাস্টম-মেড করে বানানো হয়েছে। শুধু আমারই জন্য আজ সূর্য উঠেছে, দোয়েল পাখি ডেকেছে, জানালার পাশের শিউলি গাছ ফুল ঝরিয়েছে। রাতভর। আমার জন্য কৃষ্ণচূড়া গাছ রঙ-মাতাল। ভাবতে ভালো লাগত। 

এখনকার মত কেক কেটে লোক খাইয়ে ঘটা করে পাঁচ বছরের জন্মদিন পালন করার রীতি তখন ছিল না। সভ্যতা তখনও কিছু শম্বুক-শ্লথ, সম্মোহিত। সেই বয়সে আমি কিছু ঠিক করতাম না। বাড়ি থেকে বোধ হয় ঠিক করা হয়েছিল আমার আমার পঞ্চম বর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমার ছবি তোলা হবে। সময়, হা সময়। প্রতি মুহূর্তে যে পিছলে গলে বেরিয়ে যায় এক মুঠো জলের মত,  সেই সময়কে স্থাণু করে রাখার কি অদম্য মানবিক আগ্রহ! বাড়িতে ক্যামেরা ছিল না। তখন ক্যামেরা খুব একটা বিলাসদ্রব্য যা ধনীদের বাড়িতেই থাকত। আর সরস্বতী লক্ষ্মীর রেষারেষি খুব। যে বাড়িতে সরস্বতী সে বাড়িতে লক্ষ্মী পা রাখেন না। আমার মা স্কুলে পড়ায়। বাবা কলেজে। তাই ক্যামেরা কেনার সঙ্গতি ছিল না। স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলা হবে ঠিক হল। আমাকে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হল। স্পেশ্যাল ট্রিটমেন্ট পেয়ে আমি সুপার এক্সাইটেড। দাদা আর আমি বাবার হাত ধরে গেলাম চিত্রালি স্টুডিও। ইন্দা মোড়ে। দুটো গোড়ের মালা। একটা দাদা, একটা আমি পরে বসলাম। স্টুডিওর কাকু ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাথা দুটোকে ডানদিকে, বাঁ দিকে, ওপরে, নিচে, ঈশান, নৈঋত কোণে ঘোরালেন যতক্ষণ না মুখের সব হাসি অন্তর্হিত হয়ে মুখটা বেশ গোমড়া গোমড়া হয়। ইনস্ট্যান্ট নুডলের দিন নয় সেটা। ফিল্মে তোলা ছবিও ইনস্ট্যান্ট দেখা যায় না। ডার্করুমে ডেভেলপ হয়ে তবে তার দর্শন মিলবে। ফটোগ্রাফার নিজেও দেখতে পাবে না। আজকের চোখ দিয়ে দেখলে প্রায় অসম্ভব মনে হয়। খড়গপুরের চিত্রালি স্টুডিওর কাকু সময়ের হাত ধরে আজ রামরাজাতলার শিপ্রা স্টুডিওর দাদা হয়ে গেছে। তবে মুখ ক্রমাগত ওপর নীচ করতে বলে হাসি মারার টেকনিক এখনো আছে। 

ছবি তুলে বেরোলাম যখন, দেখলাম আকাশ কালো করে এসেছে। জ্যোৎস্নাস্নাত টাঁড়ভূমির সঙ্গমরতা, কামোন্মত্তা যুবতী সম্বর হরিণীর চোখের কাজল কে যেন চুরি করে এনে মুঠো মুঠো ছড়িয়ে দিয়েছে। আকাশময়। জ্বোরো রুগীর ঘন ঘন নিঃশ্বাসের মত হাওয়া চলছে। কালবৈশাখী।  অত্যাচারী জমিদারের মত তেজীয়ান নিষ্ঠুর সূর্যটা কোন অপরূপ জাদুবলে ছাপোষা গৃহস্থ স্বামীর মত মুখ লুকিয়েছে মেঘের আঁচলে। উড়নচণ্ডী প্রেমিকার মত হাওয়া কোনপথে যাবে নিজেই ঠিক করতে পারে নি। একবার দু পা সামনে যাচ্ছে তো তারপর তিন পা পেছনে। চিতায় পুড়তে থাকা শব যেমন শেষকালে এক বালতি জল পেয়ে শীতল হয়, তেমন করেই শীতল হবে এ শহর। আজ। হাওয়ায় হাওয়ায় তারই কানাকানি। আমি হাঁটতে হাঁটতে দেখি রাশি রাশি হলুদ কল্কে ফুল ঝরে পড়েছে রাস্তায়। অনাদরে। কেউ দলিত, বিগলিত। কেউ অনাহত, ফুটফুটে। একখানা অক্ষত ফুল তুলে নিলাম। সানাই হল গে “ফুলোফিলিক”। না, এমন কোনো শব্দ অভিধানে নেই। শব্দটা আমার বানানো। মানে হল সানাই ফুল খুব ভালবাসে। ফুলটা পেলে যত্ন করে রাখবে ওর ইউনিকর্ন পার্সে।

কৌলীন্যহীন কল্কে ফুল। পাপড়ির বাহার নেই, তবু গাঢ় হলুদ রঙা। আমাদের সারা জীবনটাই তো রঙের খোঁজ। আহার-নিদ্রা-মৈথুন-ফেসবুক অন্তে ক্রমাগত আমরা জীবনে রঙের পোঁচ দেওয়ারই চেষ্টা করছি। কিন্তু ভ্যানিশিং কালারের মতই এই রঙ দিলাম আর এই ভ্যানিশ। সবে রঙের প্যালেট থেকে এ রঙ ও রঙ মিশিয়ে মনোমত উজ্জ্বল রঙ বানিয়ে কালার ব্রাশ দিয়ে এই মাখালাম জীবনের গায়ে তো প্রাত্যহিক দৈনন্দিনতার চাপে এই আবার বর্ণহীন। আবার খোঁজ, খোঁজ, রঙের খোঁজ। অথচ কত অজস্র রঙের উপাচার আমাদের আশেপাশে। আমরা দেখতে পাই না। সভ্যতা আমাদের বর্ণান্ধ করেছে। এই আপাত বেরঙ দুনিয়ার রঙ-মিলন্তি খেলায় আমি তুমি সবাই সামিল। এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে যখন বাড়ি ঢুকলাম তখন জলপরীরা ডানা মেলেছে। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে।   

পর্ব ১ লিংকঃ https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ৩ লিংকঃ https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ১

কেমন আছেন যযাতির বন্ধুরা? অনেকদিন দেখা নেই বলে ভাবছেন যযাতি বুড়ো পটল তুলেছে নাকি? পটল তুলিনি ঠিকই কিন্তু ভাবনার বীজ রুয়ে-বুনে-চাষ-করে ফসল ঘরে তুলতে সময় লাগে বই কি! দেড় বছর পরে প্রায় মাস দেড়েকের জন্য গেছিলাম আমার নিজের শহরে। প্রতি মুহূর্তেই তো আমাদের মনোমধ্যে অন্তর্বিপ্লব ঘটে যায় নিঃশব্দে। তাই সেই পুরনো শহর নতুন চোখে ধরা পড়ল। তাই কতক লিপিবদ্ধ করেছি।

আপনাদের জন্য তাই রইল এই কলকাতা ডায়েরী। পড়ুন। হয়তো দেখবেন এর অনেক মুহূর্ত আপনিও যাপন করেছেন। উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও উদ্দেশ তো আমাদের কম বেশি একই। 

****      

May 18, 2019, Evening

গতকাল ভোর রাত্রেই এসে পৌঁছেছি আমার শহরে। কুসুম কোমল লাজুক সূর্যটার ঠোঁটে লেখা ছিল, “স্বাগতম”। কেউ দেখতে পায়নি। আমি পেয়েছি। বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কাঠবিড়ালি আনন্দরা। স্নেহের সুসিক্ত আবেশে ভারি হয়েছিল বাতাস। অনেককটা প্রত্যাশী মুখে ফুটে উঠেছিল হাসি। প্রিয়জন মিলনের এক অমোঘ আগ্রহ তাড়া করে ফেরে আমাদের। প্রত্যহ।

আমার তিন বছরের ডানা লোকানো ছোট্ট পরীর হাসিতে-কান্নায়-অভিমানে-দুঃখে-আনন্দে-উৎসাহে-বিড়ম্বনায় মর্মর, বিহ্বল তার দুই দিদি, মানে আমার দুই প্রিয় ভাইঝি। কাকা-কাম্মা-সানাইয়ের আসার অপেক্ষা করছিল তারা ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে। চিটেগুড়ে লেগে থাকা লোভাতুর পিঁপড়ের মত পান করি স্বজন সুখ। সারাদিন। দিনভর। বুদ্ধপূর্ণিমা কাল। চতুর্দশী চাঁদ তাই সন্ধেবেলা যৌবন বিলোচ্ছে অকৃপণ। ভোলানাথ আশ্রমে একবার যেতে হবে। বাবা বলে গেছে। আমিও বেরিয়ে পড়ি। মা বলেছিল টোটো করে নিতে। আমি ভাবলাম, হাঁটিনা খানিক। এ শহর তো রোজ রোজ আসে না আমার কাছে। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহে হাহুতাশ করতে থাকা আমার শহর। বাস-বাইক-কার-টোটো উদ্গত ধূলিধূসরিত আমার শহর। ক্যান্সারকোষের মত দ্রুত বাড়তে থাকা উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ির চাপে নিঃসঙ্গ হতে থাকা আমার শহর। তবু আজ কোকিল শুনেছি ভোররাতে। কে বলে – “কোকিল শুধু বসন্তের, উহারা শীত গ্রীষ্মের কেহ নহে”। আজকে বৈশাখী ভোরেও কোকিলের কণ্ঠ চালিয়েছে সঙ্গিনীর খোঁজ। এখন সন্ধেবেলা শব্দহীন ধোঁয়াহীন টোটোরা সর্বত্রগামী। আমি লুব্ধ দৃষ্টি হানি। কিন্তু না এগারো নম্বর বাস অর্থাৎ হাঁটাই শ্রেয়। শহরের গল্পরা তো অনাদরে পড়ে থাকে হাঁটা রাস্তায়। সঙ্গিনীকে চিনতে যেমন মধুচন্দ্রিমার রাত্রিনিবাস, শহরকে চিনতে তেমন তার হাঁটা রাস্তা। আমি হাঁটতে থাকি। আমি দেখতে থাকি। শুষে নিতে থাকি আমার অতীতকে। চেখে দেখি পরিবর্তন। বর্তমানকে। বুড়ো শিবমন্দিরের পাশ দিয়ে যাই। মন্দিরের চাতালে তিনটে বৃদ্ধ খালি গায়ে বসে। আগের বছরেও যেন ওরা ওখানেই ওরকম করে বসেছিল। ঠায়। নিশ্চুপ। অনন্তকাল ধরে ওরা ওখানে ওরকম করেই বসে আছে। আজ থেকে অর্বুদ কল্প পরেও ওরা ওরকম করেই ওখানে বসে থাকবে বাক্যহীন। আমি পাশ কাটিয়ে ডানদিকে চলি। গল্পেরা চলে সাথে সাথে। এইসব গল্পগাছা কুড়িয়ে বাড়িয়েই তো জীবন। দু চারটে চারপেয়ে জীব ঘুরে বেড়ায় উদ্দেশহীন। শীর্ণ, মন্থর। দু একটি বসে। এই তাপপ্রবাহের সাথে যোঝবার শক্তি সংগ্রহ করছে ক্ষণিকের জন্য। চোখে ক্লান্ত বিষণ্ণতা। মাসখানেকের মধ্যে  এ শহরে এসে পড়বে বর্ষার সজল সঘন উচ্ছ্বাস। ওদের চোখে সেই মৌসুমী সজীবতারই নিরবধি প্রতীক্ষা। 

শর্টকাট নিতে বাঁদিকে বাঁকি। কিছুদূর যেতেই পথ রূদ্ধ। কিন্তু এখান দিয়ে তো রাস্তা ছিল! শ্যাওলাধরা মৈনাকদের বাড়ির পাশ দিয়ে সোজা বেরোনো যেত ক্যাঁচাল সঙ্ঘ ক্লাবের কাছে। ক্যাঁচাল সঙ্ঘের একটা ভালো নাম ছিল কিন্তু বড় বেশি ক্যাঁচাল করে এই উপাধি পেয়েছে তারা। সেই চেনা পথ এমন করে পথহারা হল কেমন করে? এক শূন্যদৃষ্টি লোক বসে বৈশাখী তাপে ভাজা ভাজা হচ্ছে। জিগেস করলাম – দাদা এখান দিয়ে হাওড়া হোমসের দিকে বেরোনো যেতো না? “কোথা থেকে এসেছ হে পথিকবর” টাইপ একটা দৃষ্টি হেনে বলল, “সে অনেকদিন বন্ধ। পার্ক হয়েছে। যান না। পার্কের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যান।” জন্মাবধি দেখে আসছি নামগোত্রহীন যে পুকুরটাকে, সেটাকেই বংশমর্যাদা দান করে তৈরী হয়েছে বাচ্চাদের পার্ক আর রামকৃষ্ণ উপাসনা মন্দির। ভারি মনোহর। তবে সেই কৌলীন্যবৃদ্ধির দায়ে পায়ে-হাঁটা পথ পড়েছে কাটা। আমার অতীত কি তবে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে? মন্দাক্রান্তা চালে বয়ে চলে সময়। তার রথারূঢ় বিজয়গৌরবে কাটা পড়েছে কত কত রাজ্যপাট –  নীলনদ, সিন্ধুনদের পার্শ্ববর্তী সভ্যতা। এ তো সামান্য হতভাগা পায়ে-হাঁটা পথ। 

পরিবর্তিত ভূগোলের মধ্যে দিয়ে পথ করে নিয়ে বড় রাস্তায় পড়ি। ডান দিকে আশ্রমের গলি। নির্বাচনের গরম নিঃশ্বাস বাতাসে। পাঁচিলে ছোটো ছোটো পতাকায় শোভা পাচ্ছে জোড়াফুল, পদ্ম, কাস্তে-হাতুড়ি। চিহ্নধারীরা যেখানে একে অপরকে বাক্যবাণে কুচিকুচি করছে, চিহ্নগুলো একে অপরের গায়ে ঢলে পড়েছে পরম বিশ্বাসে। ওদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ওরা ঘাতকের ভয়ে ভীত নয়। আশ্রমের মধ্যে একটা প্রাচীন আমগাছ অজস্র ডালপালা বিস্তার করে মাতৃস্নেহে ধারণ করছে পুরোনো বাড়িটাকে। ফলভারে ন্যুব্জ। দূরে একটা তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মাথা দোলাচ্ছে হা-হা-উষ্ণ বাতাসে।

দেখি আর ভাবি এখনো তো সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায় নি। এই তো আমার দেশ, আমার শহরতলি। এখনো তো প্রাণ জেগে আছে লালসাক্লিন্ন শরীরে। আজ সকালেই এক টোটোওলাকে খুচরো কুড়ি টাকা দিতে না পেরে দশ টাকার একটা নোট দেওয়াতে বলেছিল, “কোনো ব্যাপার না। পরে দেখা হলে বাকি দশ টাকা দিয়ে দেবেন।” তবু জোর করে দাঁড় করিয়ে খুচরো করে এনে দিলাম। কারণ জানি দেখা হবে না। যেমন করে দেখা হয় নি শিশুবয়সের প্রাণের বন্ধু বুবুনের সাথে আর কোনোদিন। দেখা হয় নি শিপ্রা এক্সপ্রেসে ইন্দোর যাওয়ার পথের বালিকা সহচরীর সাথে। এই ব্যস্তসমস্ত গতিবান সভ্যতায় কারু সাথে কারু আর দেখা হয় না। একই ছাদের তলায় থাকা দুজনের মধ্যেও অনেক সময় অনন্ত ছায়াপথ। তবু কোকিল ডাকে, তবু অকারণে হৃদয় খুলে ধরে কেউ আচম্বিতে। রাজনৈতিক রক্তপাত, ঘৃণা, হানাহানি থেকে দূরে এ আমার স্নেহসিঞ্চনে সুসিক্ত স্নেহার্দ্র স্বভূমি।

পর্ব ২ লিঙ্ক – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

পর্ব ৩ লিংক – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

পাঠক

ইনি আমার এক প্রিয় বন্ধুর দিদিমা। বয়স নয় নয় করে তিরানব্বই! ছোটবেলা থেকেই মুদ্রিত অক্ষর থেকে রস আহরণ করার বদ অভ্যাস ওনার। এ বছর পত্রভারতী থেকে আমার “যযাতির ঝুলি – এক ডজন গপ্পো” নামে যে বইটি বেরিয়েছে সেটা উনি মন দিয়ে পড়েছেন মলাট থেকে মলাট এবং শুভেচ্ছা জানিয়েছেন লেখককে। ব্যাপারটা জেনে মনটা এক অদ্ভুত গর্বে ভরে গেল। কারণ দুটো। এক, আমার ছোটগল্পগুলো যে একজন নবতিপর বৃদ্ধার সাথেও যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছে সেটা লেখক হিসেবে আমার জন্য ভীষণই একটা আনন্দের অনুভূতি। কারণ আমি মূলত কিশোরদের জন্য লিখেছিলাম গল্পগুলো।

আর দ্বিতীয় কারণ হল, ওনার যেহেতু সারা জীবনই বই পড়ার বদ অভ্যাস ছিল তাহলে একটু হিসেব করলেই দেখা যাবে রবীন্দ্রনাথ যখন দেহ রাখছেন তখন তিনি ষোড়শী। অতএব ওনার গল্পকবিতার ঝুলিতে আছে রবি, জীবনানন্দ, পরশুরাম, শিবরাম, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমর, সুভাষ, শঙ্খ, শক্তি, ত্রৈলোক্যনাথ। তারপরেও যে উনি আমার লেখা পড়েছেন এবং ভালোবেসেছেন সেটা আমার জন্য খানিকটা ভরসার কথা বই কি! যারা দেশে আছেন এবং বইয়ের এক কপি সংগ্রহ করতে চান ফ্লিপকার্টে গিয়ে “Jojatir Jhuli” নাম দিয়ে সার্চ করবেন। সারা বছরই অনলাইন (এবং কলেজস্ট্রীটের বইপাড়ায়) পাওয়া যাবে এমন ভরসা দিয়েছে আমায় আমার প্রকাশক পত্রভারতী।

এছাড়াও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন স্টোরে। যেখানে সস্তায় পাচ্ছেন সেখানেই কিনুন।

https://www.flipkart.com/jojatir-jhuli/p/itmfddfjpdqtqggg?pid=RBKFDCGMBJTKZAZN&lid=LSTRBKFDCGMBJTKZAZNVGGGS4&marketplace=FLIPKART&srno=s_1_1&otracker=AS_Query_HistoryAutoSuggest_0_2&fm=SEARCH&iid=417238ca-99f3-46d0-895a-dc5694f1347f.RBKFDCGMBJTKZAZN.SEARCH&ppt=Homepage&ppn=Homepage&ssid=nzouf4tfq80000001549471830883&qH=463fb7b5b874e6b9

https://readbengalibooks.com/index.php/jajatir-jhuli.html

https://www.boichoi.com/jojatir_jhuli

https://www.booksfort.com/product/jojatir-jhuli/

বিনায়ক সঙ্গে, বিনায়ক প্রসঙ্গে

শিকাগোতেই দেখা হয়ে গেল সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে। সাউথ এশিয়ান লিটারেচার ফেস্টিভালের উদ্যোগে সানফ্রান্সিকো এসেছিলেন কবি। একটু আড্ডা গল্প করতে, একটু সাহিত্য আড্ডা দিতে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম শিকাগোতে। সাহিত্যিকের মনের আঙিনায় উঁকিঝুঁকি দেওয়ার জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনার দরকার হয় না, কারণ সাদা কাগজের পরিসরে তাঁর শব্দ দিয়ে করা আঁকিবুঁকি তার ভাবনা, চিন্তা জীবনদর্শনের সবচেয়ে সৎ ও প্রকট দলিল। কিন্তু সে চেনাটা সাহিত্যিক বিনায়ককে চেনা, কবি-ঔপন্যাসিক বিনায়ককে চেনা। কিন্তু সামনাসামনি আলাপচারিতা হওয়ায় ব্যক্তি বিনায়ককে চেনার সৌভাগ্য হল। লেখার পরিসরে যেমন তিনি একটু বিশিষ্ট, একটু স্বতন্ত্র, ব্যক্তিগত বিনায়কও তাই। ভাল লাগল এই দেখে যে সাহিত্যচর্চার মই বেয়ে শিখরে পৌঁছনোর তাগিদে তিনি তাঁর স্বকীয়তাটা ফেলে আসেন নি মইয়ের নিচের কোন ধাপে।

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল তারকা বিনায়কদার সাথে গোটা দুই নিজস্বী তুলে এবং ফেসবুকে পোস্ট করে মুহূর্তগুলোকে ধরে রেখে দিতে পারতাম। তবে তাতে একসাথে কাটানো সেই সময়টুকুর ঠিক কতটা ধরে রাখতে পারতাম। ছবি মানুষের ঠিক কতটা ধরতে পারে? সেলফি তো শুধু সুখ ধরে অথবা সুখের অভিনয়। সত্যি কথাটা হল, একজন মানুষের যে ছবি ধরা যায় ক্যামেরাতে সে তার বহিরঙ্গের ছবি। যা কিছু দৃষ্টিগ্রাহ্য তাই শুধু ধরা পড়ে সে ছবিতে। কিন্তু যা কিছু অনুভুতিগ্রাহ্য তা ধরার জন্য একটাই ক্যামেরা, সে ক্যামেরা ভাষার, সে ক্যামেরা শব্দের। তাই শব্দের ক্যামেরায় চিত্রিত করতে চাই মানুষটাকে। আনুষ্ঠানিক যে সাহিত্যবাসর আর সাক্ষাৎকার তার কথা অন্য একদিন হবে কারণ ওনার মাপের সাহিত্যিকের ইন্টারভিউ দেশ পত্রিকায় এবং অন্যান্য নানা পত্রিকায় ইতিপূর্বেই বেরিয়েছে এবং পরেও অনেক বেরোবে। কিন্তু যে ক্যাজুয়াল মোমেন্টসগুলো একসাথে কাটালাম সেই কথাগুলো লিখতে চাই। নিচের অনুচ্ছেদগুলোতে বিনায়কদার বলা কিছু কথা কোটেশানে লিখলেও অবশ্যই প্যারাফ্রেজ করেছি, কারণ সর্বক্ষণ কোন ভয়েস রেকর্ডার চালিয়ে রাখিনি আর স্মৃতি বড় প্রবঞ্চক। তাই ওনার বলা কোন কথার ভুল ব্যাখ্যা করলে বিনায়কদার কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

প্রথমেই যে ব্যাপারটা মন কাড়ে তা হল অনুজ সাহিত্যিক তৈরী করার ব্যাপারে ওনার নিখাদ আন্তরিকতা। বারে বারেই রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তির কথা উল্লেখ করছিলেন যার সারমর্ম হল – যেদিন আমি মহাপৃথিবীর অংশ হয়ে যাব সেদিন যদি জানি যে লোকে আমার লেখা ছাড়া আর কারো লেখা পড়ছে না, বা নতুন কিছু কেউ লিখছে না তবে সেটাই হবে আমার মহামৃত্যু। সেই হবে আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সাহিত্য একটা ধারা, একটা বহতা নদীর মত। তাতে নতুন শাখানদীর জলসিঞ্চন না হলে সে নদীর জল একদিন শুকিয়ে যাবে। নিজের অমর হওয়ার তাগিদেই তাই আমায় এই ধারা পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের হাতে দিয়ে যেতে হবে। তবেই একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যানুরাগীতে উত্তরণ। আর সাহিত্যিক হওয়ার প্রথম ধাপ নয়, বোধ হয় শেষ ধাপ হল সাহিত্যানুরাগী হওয়া। “শব্দশিল্পকে ভালবাসি বলেই অনুপ্রেরণা দেব সব নতুন লেখকদের।” – এই কথা বলছিলেন। কবি বিনায়ক একান্ত আলাপচারিতায় হাতে ধরে দেখিয়ে দিলেন ছন্দের রীতিনীতি নিয়মগুলোকে। কখনো জীবনানন্দ, কখনো রবীন্দ্রনাথ থেকে কোট করে দেখিয়ে দিলেন অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, মাত্রাবৃত্ত ছন্দ, স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার। সবটুকুকেই যে মনে রাখতে পেরেছি তা নয়, কিন্তু যেটা হয় সেটার নাম দীক্ষা। ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনে বলা হয় দীক্ষা ছাড়া ঈশ্বরলাভ হয় না, আবার দীক্ষা নিলেই ঈশ্বরলাভ হয় না। দীক্ষামন্ত্রতে অধ্যাত্মজীবনের শুরু। আর তারপর থাকে সাধনা। সেরকমই ছন্দের জগতে দীক্ষা নিলেই একজন সার্থক ছন্দকার হবেন তা নয়, তার জন্য দরকার নিষ্ঠা। কিন্তু ছন্দটাকে প্রাথমিক ভাবে না জানলে তো শুরুটা করা যায় না। তাই না? বলছিলেন “অনেকে ছন্দ জিনিসটা আদৌ না শিখে বলছে পোয়েটিক লিবার্টি নিচ্ছি। আরে বাবা বাঁধনটা কি না জানলে সেটার থেকে মুক্তি নেওয়া যাবে কিভাবে?” কথাটা ঠিকই – কাব্যিক স্বাধীনতা যেন কাব্যিক অক্ষমতা গোপনের অজুহাত না হয়।

আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ বললেন “শিল্পীরা সাধারণত খুব নিষ্ঠুর হয় জানো। কেন জানো? কারণ ধরো একজন শব্দশিল্পী বা সাহিত্যিক। মানুষের মধ্যে যে সহজাত আবেগ আছে সেটা কোন পাত্র বা পাত্রীতে সমর্পণ না করে সাহিত্যিকরা সেই আবেগের সম্পূর্ণটুকুই কাগজে সমর্পণ করে। একজন চিত্রশিল্পী তাঁর আবেগ সমর্পণ করে ক্যানভাসে। কাগজের পরিসরে নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়ে শিল্পী কপর্দকশূন্য হয় হৃদয়ের আঙিনায়। তাঁর সৃষ্টিই পৃথিবীকে তাঁর একমাত্র দেয়। ঘনীভূত আবেগ থেকেই তো শিল্পের সৃষ্টি। আর সে আবেগ শব্দের আকরে, শিল্পের আকরে জমা পড়লে তবেই সে শিল্প কালোত্তীর্ণ হয়। লেখকের সবটুকু নিংড়ে নিয়ে জারিত শব্দমালা যখন আত্মপ্রকাশ করে তখন লেখকের ঘনিষ্ঠজনদের ওই লেখাটুকু ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার থাকে না।” কথাটা খুবই ইন্টারেস্টিং। তাই না? মধুসূদন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ অনেকের মধ্যেই আমরা আপনজনের প্রতি কিছুটা অবিবেচনা দেখতে পাই। এই অবিবেচনা দেখতে পাই ভিনসেন্ট ভ্যান গগের মত কালজয়ী চিত্রশিল্পীর মধ্যেও। স্পষ্টত বুঝতে পারি মানুষগুলো নিজের সাথেই শুধু ঘর করে। সম্পূর্ণ একা, নির্বান্ধব। তার কারণটা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিলেন বিনায়কদা।

বলছিলেন “সৃষ্টিশীল মানুষেরা সৃষ্টি করে কেন জানো? যে লেখে, যে ছবি আঁকে, যে সুর দেয়, কেন দেয়? মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য। মৃত্যু মানে তো বিলুপ্তি, বিস্মরণ। আমার শরীরটা যতটা আমি তার থেকে অনেকটা বেশি আমি হল আমার এই নামটা। উত্তর প্রজন্মের কাছে নিজের বিশিষ্টতা, নিজের ডি এন এ, নিজের পদবী পৌঁছে দেওয়ার জন্যই যেমন মানুষের যৌন ইচ্ছা জাগে, সেরকমই শরীরের মৃত্যুর পর নামটুকুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই সমস্ত সৃজনশীলতা। পাঠকের বইয়ের তাকে কতদিন বাঁচল সেটার নিরিখেই একজন লেখকের চরম নির্দয় বিচার হয়। সেটা বাদ দিলে ফেসবুকে কটা লাইক হল, আনন্দ পুরস্কার হল না অ্যাকাডেমি সেটা তো একটা সন্ধ্যার ব্যাপার। আনন্দ পুরস্কারের মঞ্চটা এক সন্ধ্যার ব্যাপার, পাঠকের হৃদয়ের সিংহাসন চিরকালীন। বলছিলেন উনি নিযুত পাঠক নয়, নিবিড় পাঠক চান – “অযুত লক্ষ নিযুত পাঠক যেদিন আমার লেখা ভালবাসবে সেদিন বুঝব ফেলনা লেখা শুরু করেছি। সস্তা গিমিক শুরু করেছি।” আজকে তো ফেসবুকে লেখা পোস্ট করে আর একশ-দুশ লাইক পেয়ে যে কোনো পুরুষ বা নারীই মনে করছে আমি লেখক। কিন্তু লেখার প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন করতে যে সাধনা দরকার সেটা নেই। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়রা লাইকের নামে যেটা দেয় সেটা তো তাঁদের মুগ্ধতা নয়, সেটা পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয়টির প্রতি তাঁদের স্নেহ, প্রশ্রয়। সেটা লেখার মান বিচার কখনো নয়। অচেনা পাঠকের ভারবহনের ক্ষমতাতে হয় লেখার প্রকৃত মান বিচার। লেখার মধ্যে সত্যিকারের সততা থাকলে সে লেখা আপনিই কিছু কিছু মনে অনুরণন তুলবে সে পাঠক তোমায় চিনুক বা না চিনুক। যদি সাহিত্যিক হতে চাও পাঠকের কোয়ান্টিটি নয়, কোয়ালিটি সবসময় মাথায় রাখবে।” আনন্দবাজার শারদীয়া পত্রিকায় ওনার উপন্যাস “মন্ত্র” খুব জনপ্রিয় হয়েছে বলাতে বললেন – “মানুষ এখন আর বানিয়ে বানিয়ে লেখা গল্প আর চাইছে না। তারা লেখার মধ্যে জীবন চাইছে, জীবনের কথা চাইছে। তাই উপন্যাস লেখার সময় সেই উপন্যাসের সঙ্গে নিজের যাপন দরকার। লেখক মানসে উপন্যাসের ঘটনাক্রমের সত্যি সত্যি ঘটে যাওয়ার দরকার আছে। তবে সে উপন্যাস লোকে পড়বে।” লেখালেখির ক্ষেত্রে দিয়ে গেলেন কিছু দামী টিপস যার একটা মনে পড়ছে “একসাথে গল্প, উপন্যাস, কবিতা সব লেখার চেষ্টা করবে না। অন্তত প্রথম প্রথম। মাথাটাকে প্রতিটা ক্ষেত্রে আলাদা ভাবে কাজ করাতে হয়। তাই গল্প, কবিতা বা উপন্যাস কোন একটা ফিল্ড ধরে তাকে দুটো বছর পুরো দাও।” শুনে মনে হল ঠিকই তো বলেছেন। ওরা প্রেমিকার মত। সবটুকু চায়। ফাঁকি দিয়েছ কি নিজেই ফাঁকে পড়বে। একসময়ে একটা প্রেমিকা রাখলেই যেমন সর্বতোভাবে মঙ্গল, তেমনি একইসঙ্গে কবিতা, গল্প, উপন্যাসের যেকোনো একটির প্রতি হতে হবে নিষ্ঠাবান। তবেই রসোত্তীর্ন লেখার জন্ম হবে।

বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার জিহাদে সামিল হয়েছেন কবি। আইওয়া আন্তর্জাতিক সাহিত্য সমাবেশে এসে বার্ষিক পাঁচ হাজার ডলারের বাংলা বই কেনার সুপারিশ করে গেছেন। যেখানে পঞ্চাশ হাজার ডলারের কন্নড় বই কেনা হত সেখানে নাকি এক ডলারেরও বাংলা বই কেনা হত না। অন্যান্য ভাষার সৈনিকরা নিজের ভাষার প্রতি অনেক বেশি একনিষ্ঠ। বলছিলেন ভাষা সংস্কৃতির ব্যাপারটা অনেকটা ফুটবল খেলার মাঠের মত। তুমি যত জমি ছেড়ে দেবে অপর পক্ষ এসে তত জমি দখল করে নেবে। শক্তিগড়ে পিৎজার দোকান খুলে গেছে কিন্তু শক্তিগড় নিজের ল্যাংচা নিয়ে ইটালিতে পৌঁছতে পারে নি। ভাষার ক্ষেত্রেও আমরা যত বাংলা বলা, বাংলা লেখা, বাংলায় ভাবা কমিয়ে দিচ্ছি ইংরেজি এসে দখল করে নিচ্ছে সেই ছেড়ে দেওয়া পরিসরটুকু। এইভাবে ছাড়তে থাকলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে একদিন। বাংলা গান, নাটক, সিনেমা সবই কিন্তু ভাষাকেন্দ্রিক। ভাষার ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে গেলে একদিন হুড়ুমুড়িয়ে ভেঙে পড়বে আমাদের সংস্কৃতির অট্টালিকা যেটা নিয়ে আমাদের এত গর্ব। আমি কথায় কথায় ইংরেজি বলাতে দাদাতুল্য অগ্রজ সাহিত্যিকের মৃদু ভর্ৎসনা – “তুমি কথায় কথায় ইংরেজি বলো কেন? কই পিনাকী তো বলে না?” পিনাকী আমার বন্ধু যে এই প্রচেষ্টাটাতে সর্বতোভাবে আমার সাথে ছিল। আমি মাথা চুলকে জিভ বার করে বললাম “সরি।” সত্যিই তো একজন আমেরিকান কি ইংরেজ তো কথা বলতে বলতে, নিজের ভাব প্রকাশ করার জন্য হঠাত করে স্প্যানিশ কি বাংলা কি গুজরাটি বলে ফেলে না। নাকি সাত আট দশক আগে বিজিত জাতি ছিলাম বলে আজও মনে মনে দাসত্ব করছি? কথায় কথায় ইংরেজি বাক্য বলা, বাংলাতে লেখা একটা অনুচ্ছেদের জায়গায় ইংরেজিতে লেখা একটা প্যারাগ্রাফ পড়তে স্বচ্ছন্দ বোধ করা আত্মম্ভরিতা নয় লজ্জার বিষয় হওয়া উচিত।

সবচেয়ে ভালো লাগল সমসাময়িক বাংলা ভাষার একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক হয়েও নিজেকে তিনি তারকা মনে করেন না। আমার মনে আছে প্রথম যেদিন চ্যাটে কথা হয়েছিল আমি কথায় কথায় বলেছিলাম – আপনার কক্ষপথ, আপনার বৃত্ত আর আমার কক্ষপথ, আমার বৃত্ত ভীষণই পৃথক। উত্তর বলেছিলেন “আমার কক্ষপথও ভীষণ পরিচিত, বৃত্তও খুব চেনা”। হ্যাঁ ঠিকই বিনয় করার জন্য বিনয় করার একটা রেওয়াজ আজকালকার তারকাদের মধ্যে এসেছে। অনেকে বিনয়কে খুব কৌশলে ব্যাবহারও করছেন নিজের বিদগ্ধতা প্রমাণ করার জন্য। কথাই আছে “Out of proportion humility is actually arrogance”. তাই মুখের মুখোশটাকে চেনা যায় সহজেই। বিনায়কদাকে কাছ থেকে দেখে মনে হল ওনার ঐ কথাগুলো বিনয় দেখানোর জন্য বিনয় নয়। এসে থেকেই বলছেন আমার লেখা তো তোমরা শুনবেই, কিন্তু তোমাদের লেখা আমি শুনতে চাই। আজকালকার ছেলেরা কি লিখছে জানতে চাই। যেটুকু জেনেছি সেটুকু তোমাদের জানিয়ে যেতে চাই। আমার লেখা একটা কবিতা শুনে ছন্দের ভুলগুলো ধরিয়েও দিলেন। আমি নিজে খুব সামান্য কলম প্রয়াস করি তবু নিজেকে দিয়েই বুঝি লেখকরা একটু নার্সিসিজমে ভোগে অর্থাৎ নিজের প্রেমে নিজেই হাবুডুবু খায়। নিজের লেখা নিজেই পড়ে এবং অন্যকে শুনিয়ে মুগ্ধ হয়। আসলে লেখা তার সন্তান তো আর সন্তানের প্রতি অহেতুক মুগ্ধতা সব বাবামায়ের পক্ষেই স্বাভাবিক। তবু সেই মুগ্ধতা কাটিয়ে অন্যের লেখা শোনার আগ্রহটা ধরে রাখা, অন্য অনুজ সাহিত্যিককে গ্রুম করার চেষ্টা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে।

মুস্কিল হচ্ছে আরও অনেক কথাই মনে ভিড় করে আসছে। কিন্তু খুব বড় পোষ্ট পড়তে চায় না কেউ। তাই লেখার দৈর্ঘের প্রতি লক্ষ রেখে এবারে শেষ করব। প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকদের সাহিত্যমহলের টুকরোটাকরা মজাদার ঘটনা বলে হাসিখুশি মানুষটা জমিয়ে রাখলেন দুটো দিন। লৌকিকতার যে অদৃশ্য দেওয়াল দুটো মানুষকে আলাদা করে রাখে, নিজেই সেটি ভেঙে দিলেন নিজের ডাউন-টু-আর্থ পার্সোনালিটি দিয়ে। হাসিমস্করাতেও শ্লীলতা অশ্লীলতার সীমারেখাগুলো একটু একটু মুছে যাচ্ছিল। তারকার দূরত্ব নিয়ে কখনোই দূরে সরে থাকতে চান নি। মানুষটার মধ্যে ভণ্ডামি নেই, কোন দেখানো সফিস্টিকেশান নেই। নির্দ্বিধায় বলতে পারেন “কলকাতায় বড় হয়েছি। কাক ছাড়া কোন পাখি দেখিনি। কৃষ্ণচূড়ার গাছ দেখিনি। তাই নেচার বা প্রকৃতি আমার লেখায় আসে না। শহুরে সুখ, দুখ, যন্ত্রণা, বিষাদ বুঝতে পারি। গাছ, পাখি, ফুল, নদীর সাথে রিলেট করতে পারি না সেভাবে। কল্পনা কবি সাহিত্যিকদের একটা প্রধান হাতিয়ার কিন্তু কল্পনার সাহায্যে নিজের অভিজ্ঞতাটুকুর ওপর একটু আদর প্রলেপ দেওয়া যায় মাত্র, সম্পূর্ণ অপরিচিতের সাথে পরিচিত হওয়া যায় না।” নিজের এই সীমাবদ্ধতার কথা এত স্পষ্ট করে আর কেউ বলতে পারত কিনা জানি না। শুধু দু দিনের আলাপেই এক অলীক বন্ধনে জড়িয়ে দিয়ে নিজের বৃত্তে ফিরে গেলেন কবি-ঔপন্যাসিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।

[Binayak Bandyopadhyay who is one of the most promising faces of current Indian Vernacular poetry is also considered as the changing face of Bengali fiction. His writing is a subtle blend of Cosmic and mundane, world and locality. He has till date published 15 novels and as many poetry collections. Binayak has received quite a few awards for his work and has represented India in the Iowa International Writers program 2014. He lives in Kolkata and combines a career in writing and teaching]

IMG_5572

পাগলি

অফিস ফেরতা ট্রেনসফরটুকু শেষ করে বাসে উঠে পড়েছিলাম। এই বাসেই শুধুমাত্র সাত মিনিটের সফরে পৌঁছে যাব বাড়ির দোরগোড়ায়। অক্টোবর মাসে শিকাগোতে সুযযিজেঠুর ডিউটি আওয়ারস নেহাতই কম। পাঁচটা বাজল কি বাজল না, আলো-টালো গুটিয়ে নিয়ে সে দিনের মত বিদায় নেওয়ার যোগাড়যন্ত্র করে। গুঁড়ি গুঁড়ি সন্ধ্যারা চুপিসাড়ে নেমে এসে ঘাসের ডগায় অপেক্ষা করছে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। আলোর বিন্দুগুলো আর একটু তেজ হারালেই, আর একটু ম্রিয়মাণ হলেই তাদের জায়গাজমি দখল করে নেবে অন্ধকার কণারা। আমার তিন বছরের কন্যার আধো আধো গলা শোনার ইচ্ছায় তখন মনের মধ্যে কাঠবিড়ালির পিড়িক পিড়িক। বাস ছাড়ার একটু আগে বাসে আমার উল্টোদিকে এসে যে আসন গ্রহণ করল সে একটি মধ্যবয়স্কা মহিলা। দু এক সেকেন্ড দেখলেই বোঝা যায় মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। হতশ্রী শতছিন্ন কাপড়জামা। কিন্তু পরিপাটি করে পরেছে। চুপ করে বসে থাকার চেষ্টা করছে কিন্তু যেন পারছে না। মাঝে মাঝে কথা বলে উঠছে, মাঝে মাঝে উঠছে হেসে। পরমুহুর্তেই চুপ। যেন কোন এক অস্থির সবল শিশুস্বত্তা ক্রমাগতই বডি ফ্রেমের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর ছোটবেলা থেকে শেখা সামাজিক সংস্কারের দুর্বল স্বত্তা বারে বারে তাকে ঠেলে ভিতরে পাঠাচ্ছে। নিজের মধ্যেই যেন এক মাস্টারনি বলছে “না না এ শোভন নয়। সমাজোচিত নয়। অকারণে হাসলে, কথা বললে লোকে তোমায় পাগল বলবে।” কিন্তু পরমুহুর্তেই আবার যেন ভুলে যাচ্ছে। এই বিরুদ্ধ দুই স্বত্তার মধ্যে যেন লেগেছে শুম্ভ নিশুম্ভ যুদ্ধ।

এমন মানুষ দেখলে তাকে উপেক্ষা করাই দস্তুর। আমিও তাই করছিলাম। অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে রেখে না দেখার অভিনয়। কিন্তু আমাদের সকলের মধ্যেই একটা পাগল থাকে যে কিনা পাগল দেখার লোভ সামলাতে পারে না। তাই চোখ পড়ে যাচ্ছে থেকে থেকে। হঠাৎ দেখি মহিলা আমার দিকে কিছু একটা বাড়িয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। মনে মনে শঙ্কিত হলাম। ভাবলাম “মনে হচ্ছে জ্বালাবে মহিলা।” একটু কান দিয়ে শুনে দেখলাম মহিলা আমাকে একটা ফ্রুটজুসের কাচের বোতল খুলে দিতে অনুরোধ করছে। বোতল ধরে থাকা হাতটা আমার দিকে বাড়ানো। যতদূর মনে হয় বাড়িতে তাকে এই জুসের বোতল খুলে দেওয়া হয়। আর ওই শিশুসুলভ মাথাতে আপন পরের বোধ তৈরী হয়নি আজও। তাই আমাকেই করে ফেলেছে বোতল খুলে দেওয়ার অনুরোধ। অনিচ্ছা স্বত্তেও বোতলটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কসরত করলাম। কাচের ওপর লোহার ঢাকনা শক্ত হয়ে লেগে আছে। অনেক চেষ্টাতেও একটুও ঘোরাতে না পেরে নিজের অক্ষমতা জানিয়ে ফেরত দিলাম কাচের কন্টেনারটা।  কোন দ্বিতীয় বাক্য খরচ না করে মহিলা বোতলটা নিয়ে নিলো। আর তারপর আমি সবিস্ময়ে দেখলাম বোতলের গলার দিকটা এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে বোতলের পেছনে সজোরে তিন চার বার মারল যাতে ভিতরের রঙিন তরলটা সবেগে এসে ভেতর থেকে চাপ দেয় ঢাকনায়। আর তারপরেই বোতলটা আবার বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। হাতে নিয়ে ঢাকনাটা একটু ঘোরাতেই যখন খুলে এলো তখন লাজুক মুখে “আই ডিড নট নো দিস টেকনিক” বলে বোতলটা ফেরত দিতেই ধন্যবাদ জানিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে জুস খেতে শুরু করল মহিলা।

সান্দ্র তরলের সজোরে ধাক্কায় বোতলের আর ঢাকনার সংযোগ আলগা করে দেওয়ার এই বুদ্ধি তো আমার মাথায় আসে নি। জীবনের এই যে পাঠ আমার জানা ছিল না, এই মানসিক প্রতিবন্ধী মহিলা জানল কি করে? আর যদি জানল, বোতলের ঢাকনা খোলার কৌশলটা ব্যাবহার করার পরেও ঢাকনাটা নিজে না খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল কোন অভিপ্রায়ে? বাস ভর্তি লোকের সামনে আমার অক্ষমতাটাকে একটু কম করে দেওয়ার জন্য কি? হয়তো বা। মহিলার অপরিণত মনে এত সূক্ষ্ম অনুভূতিরও কি তবে জায়গা আছে? অথচ এই যে আমি যে কিনা একটু আগেই নাক সিঁটকাচ্ছিল, কতক্ষণে এই পাগলিটার সামনাসামনি বসা থেকে মুক্তি পাবে সে কথা ভেবে, আমি তো সুস্থ সমাজের প্রতিনিধি। এমনকি আমাকে অনেকে প্রতিভাবানও বলে। তবে কি কোথাও সুস্থ মন আর অসুস্থ মনের যে লেবেল আমরা সাঁটিয়েছি সেটা উল্টো লাগানো হয়ে গেছে? অসহিষ্ণু, সমালোচনাপ্রিয় মনই বহুলদৃষ্ট বলে তাকেই সুস্থ স্বাভাবিক নাম দিয়েছি আর অনুভূতির উথালপাথাল বন্যায় ক্রমাগত ডুবতে থাকা, ভাসতে থাকা মনগুলোকে পাগল আখ্যা দিয়েছি?

ঘাসফুল – রম্যরচনা

বিকেলে প্রথমে টিপটিপিয়ে, পরে ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি পড়েছে। বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সমাহিত প্রসন্নতা থাকে, এমন একটা বুনো নিবিড় গন্ধবহা সাহচর্য থাকে যে ঘরে বসে থাকতে মন চায় না। উপরন্তু আমার ছোট্ট সঙ্গিনী বিকেলে দ্বিপ্রাহরিক ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই “ইন্সি স্পাইডার” দেখতে যাওয়ার দাবী জানিয়ে রেখেছে সজল নয়নে। ইন্সি স্পাইডার দেখতে যাওয়ার মানে হল আউটডোরে যাওয়া আর কোন গুল্মজাতীয় গাছের ধারে মাকড়সা স্পট করা। হ্যাঁ মাকড়সার অষ্টপদী-জুলজুলে-পুঞ্জাক্ষী সৌন্দর্যের প্রতি তার আছে ভয়মিশ্রিত অপার মুগ্ধতা। এমনই মাকড়সা প্রেম যে তাদের দর্শনমাত্র স্পর্শনাকাঙ্খা হয় অর্থাৎ কিনা ধরতে চেষ্টা করে। তখন এই বলে বিরত করতে হয় যে বন্যেরা বনে সুন্দর, মাকড়সারা জালে। তাদের জালমুক্ত করার ইচ্ছেটা খুব একটা সমীচীন নয়। মানুষ নামক প্রাণীর মত বিষাক্ত না হলেও আত্মরক্ষার খাতিরে একটু আধটু বিষ উদ্গীরণ তারাও করে থাকে। সে যাই হোক, তাই বৃষ্টি থামতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম সেই ছোট্ট সঙ্গিনীর হাত ধরে। কুট্টিপারা হাত খানা ধরে প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্যে ঘুরতে ঘুরতে ভেজা বাতাস ফুসফুসে ভরে নিতে বেশ লাগে। হাতটা ধরে রাখা জরুরী হয় নয়তো পাখি কি প্রজাপতি দেখলে তাদের সাহচর্য পেতে সেইদিকে ধাবমান হওয়ার একটা বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায় সেই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে। হাঁটতে হাঁটতে কোন বাঁক ঘুরতেই হঠাৎ যদি সবুজ শ্যামলিমার মধ্যে এসে পড়ি, উচ্ছ্বসিত সানাইয়ের গলায় খুশি ঝরে পড়ে – “প্রিটি”, “বিটিফুল” ইত্যাদি। সন্তানের চোখে খুশি দেখার থেকে বড় পুরস্কার বোধ হয় মানুষের কিছু হয় না। যাই হোক তার ক্ষুদ্র হাতের স্পর্শসুখ আর সদ্যস্নাতা আদ্র মায়াবী গোধূলির নৈকট্য উপভোগ করতে করতে আনমনে হাঁটছিলাম। হঠাৎ হাতে পড়ল টান। আমার ক্ষুদ্র সঙ্গিনী যে unpredictable সেটা জানতে বিশেষ অন্তর্দৃষ্টির দরকার হয় না। সে কেন থেমে পড়েছে, কোন বস্তু তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে ওর চোখের দিকে চোখ চালাই। না প্রজাপতি বা পাখিরা নেই, মাকড়সাদেরও অষ্টবক্র উপস্থিতি নেই। আছে একটি ঘাসফুল, এদেশে একে বলে ড্যান্ডিলিয়ন। বসন্তের শুরুতে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটে ওঠে তখন রাস্তার ধারে ধারে তাদের অপরূপ শোভা। কিন্তু বড়ই ক্ষণজন্মা তারা। একবার বৃষ্টি পড়লেই পাপড়ি টাপড়ি খসে নেহাত দৈন্যদশা। ফুলেদের জাতবিচারে এরা অবিশ্যি নিতান্তই দলিত। সুযোগ পেলেই মানুষের পা বা ময়িং মেশিন তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বসন্ত শেষে এই গ্রীষ্মে তাদের সকলেই প্রায় বৃন্তচ্যুত হয়েছে। এখানে একটা ড্যান্ডিলিয়ন এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আর আমার ক্ষুদ্র সঙ্গিনী বসে পড়ে ছোট আঙুল দিয়ে স্নেহ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার ফুলেল গায়ে। তার চোখে এই ঘাসফুলের রূপটুকু ধরা পড়েছে দেখে খুশি হলাম। সাথে এলো একটা অবসাদ। জীবনের পথ চলার কোন বাঁকে ওকে এই রুপসন্ধানী চোখখানা ফেলে যেতে হবে। কিছুতেই আটকাতে পারব না। এই নিষ্ঠুর বস্তুতান্ত্রিক সমাজ ঠিক কেড়ে নেবে ঐ চোখদুটো। শ্যামলিমার থেকে শপিং মলের আহ্বান ক্রমে ক্রমেই বেশি মনোগ্রাহী হবে। সমাজ বিসদৃশতা পছন্দ করে না। সবাইকে নিজের রঙে রাঙিয়ে নিয়ে তবে তার শান্তি। তার মগজ ধোলাইয়ের প্রক্রিয়াটি নির্ভুল ও পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত। সানাই ঘাসফুলটাকে বৃন্তচ্যুত করতে চাইলে বাধা দিলাম না। কোন মদগর্বী বুটের তলায় যাওয়ার থেকে ওর হাতে ভাল মানাবে। কিন্তু পরক্ষণেই বায়না – তার এই ঘাসফুল সংগ্রহের কৃতিত্ব দূরভাষযোগে মাম্মাকে জানাতে হবে। একজন মহাপুরুষ, সঞ্জয় দত্তের জীবন সম্বন্ধে জানতে সিনেমাহলে গেছেন মাম্মা। কিন্তু সে যুক্তি ধোপে টিকল না। ফোনটা না করে দিলে চোখে সজল আর মুখে সরব আকুতি। দোনামনা করে ফোনের বোতাম ঘোরালাম। আধো আধো গলায় দু চারবার ফ্লাওয়ার বলে তবে দেবী ক্ষান্ত দিলেন। সঞ্জয়রুপী রনবীরের গলা ছাপিয়ে সে গলা ও প্রান্তে পৌঁছল কিনা বলতে পারব না।

সুরপথ – রম্যরচনা

কয়েকদিন আগে একটা গানের আড্ডায় গেছিলাম। অনেক গায়েন আর বায়েনদের মেলা। বাগেশ্রী রাগে যন্ত্রসঙ্গীতের পরে আসছেন রবি কবি, রবীন্দ্রনাথের পরে আসছেন রফি সাহাব। হেমন্ত, কিশোর, ভুপেন হাজারিকা দিয়ে যাচ্ছেন ক্যামিও অ্যাপিয়ারেন্স। চন্দ্রবিন্দু বা হালচালের গীতিকার দেবদীপও সেখানে ব্রাত্য নয়। এই সুরের বাহারি বাগানের নাম সুরোধ্বনি। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম সঙ্গীত শিল্প মাধ্যমের কথা। মনে হল এই গান গাওয়ার সাথে আমি যে ফিল্ডে কাজ করি তার বোধ হয় বিশেষ সাদৃশ্য আছে। আমি কাজ করি ড্রাইভারলেস কার ইন্ডাস্ট্রীতে। মানুষের সাহায্য ছাড়াই একটা গাড়িকে তার গোমুখ থেকে সাগরের মোহনাতে পৌঁছে দেওয়া, তার শুরু থেকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল নিয়ে গবেষণা করা আমার কাজ। গান গাওয়ার ব্যাপারটাও কি অনেকটা সেরকম নয়? স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর মূল উপাদান দুটি। একটা নির্ভুল মানচিত্র – আমাদের ইন্ডাস্ট্রীতে একে বলে হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গাড়ির চাকাদের সময়মত ঘোরানো আর অন্যান্য সহযাত্রী গাড়িদের সাথে নির্ভুলভাবে সমাপতিত হতে সময়মত ব্রেক ও অ্যাক্সিলেটার প্রয়োগ করে গাড়ির গতি পরিবর্তন করা যাকে আমাদের পরিভাষায় বলে maneuver technique. স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে ছেড়ে দিয়ে আমরা আপাতত যদি মানুষচালিত গাড়ির কথা ভাবি, অনুরূপ দুটি জিনিসেরই দরকার হবে। মাথার মধ্যে থাকা বা মোবাইলের পর্দায় থাকা একটা হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর ম্যানুভারিং স্কিল। গাড়ি চালানো ভালভাবে জানা না থাকলে বা ম্যাপটা ভালভাবে জানা না থাকলে (ধরুন মোবাইলের সহায়তা পাচ্ছেন না, অত্যধিক ফেসবুক করে মোবাইল ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে 🙂 ) দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা। গায়ক বাদকদের ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকম। সুর যেন একটা অদৃশ্য পথ। আর সেই পথে স্বররুপী গাড়িকে চালনা করতে হবে। সেটাই চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ পথ বড় বিপদসংকুল। প্রথম বিপদ হল, সঙ্গীতশিল্পীদের সাহায্য করার জন্য কোন ইলেক্ট্রনিক ম্যাপ নেই। হ্যাঁ, ইলেক্ট্রনিক সুরযন্ত্র, আবহ যন্ত্রসঙ্গীত ইত্যাদি মোটা পথটা বাতলে দিতে পারে কিন্তু ম্যাপের খুঁটিনাটিটা থাকতে হবে নিজেরই মাথার মধ্যে। ডুয়েট বা গ্রুপ সঙ গাওয়ার সময় সহগায়করা আর সোলো গাওয়ার সময় সহবাদকরা যেন সেই একই অদৃশ্য রাস্তায় চলতে থাকা অন্যান্য গাড়ি। ম্যাপটাকে একটু ভুল বুঝলেই সেই সহযাত্রীদের সাথে ঠোকাঠুকি, রক্তারক্তি হওয়ার সম্ভাবনা। আরও একটা বড় সমস্যা হল সুরের পথে আমাদের পার্থিব পথদের মত কয়েকটি মাত্র নির্দিষ্ট রুট নেই। প্রতিটা গানেই সুরকার তার সৃজনশীলতা দিয়ে পত্তন করেন একটা আনকোরা নতুন রাস্তা, একটা আনদেখা পথ। সঙ্গীতশিল্পীকে বুঝে নিতে হয় লেনটা ঠিক কেমনভাবে বিধৃত, ঠিক কতটা চওড়া, কতটা দৈর্ঘ অতিক্রম করার পর আচম্বিতে আসবে একটা মোড়। আমাদের হাইওয়েতে যেমন থাকে স্লো লেন, ফাস্ট লেন সেরকমই হঠাৎই কোন লাইনে কি স্ট্যাঞ্জায় বাড়াতে হবে গানের গতি। চারচাকা গাড়ি চালানোর সময় গতি দশ-মাইল-প্রতি-ঘণ্টা অব্দি উপরনিচ করার বিলাসিতা থাকে। এক্ষেত্রে সে গুড়ে বালি। যে গতি মেপে দেওয়া আছে, কাঁটায় কাঁটায় সেই গতিতেই গাড়ি চালাতে হবে। রাস্তা বরাবর সম দূরত্বে বসানো আছে একধরণের অদৃশ্য খুঁটি। সমান পরিমাণ সময় অন্তর অন্তর সেই খুঁটিটাকে ছুঁয়ে যেতে হবে – একে বলে তাল বা মিটার। যেন আপনার গতিবেগ ঠিক রাখার দক্ষতা ভুরু কুঁচকে মাপার জন্য সমান দূরত্ব অন্তর লাগানো আছে এক অদৃশ্য স্পীডোমিটার। তারপর আছে গানের স্কেল। গলার পিচ পরিবর্তন করে একই গান বিভিন্ন স্কেলে গাওয়া যায় যেন আপার মিশিগান ড্রাইভ আর লোয়ার মিশিগান ড্রাইভ দিয়ে একই গতিবেগে সমতানে গাড়ি চালানো। পথ এমনই অজস্র সমস্যা সঙ্কীর্ণ।
 
আমরা যারা লিফট-এ একা নামতে নামতে গলা খুলে গানের কলি ভাঁজি আর লিফটের দরজা খুললেই মুখে কুলুপ লাগাই অর্থাৎ আমরা যারা অ-গায়ক তাদের মধ্যে দু প্রকার লোক আছে। সুরের গোদা ম্যাপটা মোটামুটি সমস্ত মানুষই কম বেশি বুঝতে পারে। আমাদের মত সুর-নিরক্ষরদের মধ্যে এক প্রকার মানুষ হল যাদের সেই অদৃশ্য ম্যাপের সূক্ষ্মাতিসুক্ষ ব্যাপারগুলো, ফাইনার ডিটেলসগুলো ঠিক জানা থাকে না। তাই “সুর না সাজে ক্যা গাউঁ ম্যায়” অবস্থা। অন্য প্রকার এক ধরণের লোক আছে যারা সুরটা হয়তো বোঝে, অনাহত শব্দ বা অনুচ্চারিত শব্দ দিয়ে মাথার মধ্যে প্লে করতে পারে কিন্তু নিজের স্বর সাথ দেয় না। গলা দিয়ে গাইতে গেলেই দেখে রাস্তার কার্নিশে ধাক্কা খায় হামেশাই। গাড়ির এইখানটা তুবড়ে গেল, ওখানটায় স্ক্র্যাচ হল। অর্থাৎ কিনা ম্যাপটা জানে কিন্তু ম্যানুভার টেকনিকটা ভাল জানে না। স্বরসাধনা করা হয় নি। তাই নিজেই গেয়ে বুঝতে পারে ঠিক হচ্ছে না। আর একটা তৃতীয় প্রকার মানুষ অবশ্য আছে যাদের সুরের সেন্সও নেই, স্বরসাধনাও করা হয়নি। কিন্তু গানের গাড়ি চালালে এদিক ওদিক ধাক্কা যে খাচ্ছে সেটা বোঝার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তাদের কথা থাক। সুরের কথায় ফিরি। দুঃখের কথা হল এই সুরের সেন্সটা শ্রমসাধ্য নয়, কিছুটা জেনেটিক, কিছুটা জন্মসূত্রে পাওয়া। এর মানে এই নয় সুরের সেন্স ব্যাপারটা বাইনারি। হয় থাকে নয় থাকে না – এমন নয়। বিভিন্ন সঙ্গীতশিল্পীদের বিভিন্ন মাত্রায় সেটা থেকে থাকে। যার যত বেশি থাকে তারে তত স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্টেজ যেমন কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের ছিল আর কি! অনুশীলনের মাধ্যমে কিছুটা পরিশীলন করাও সম্ভব। কিন্তু একটা বেসিক সেন্স থাকতে হয়। আর সেই বেসিক সেন্সটা কিছুতেই train করে আনা যায় না। অপরদিকে ম্যানুভার টেকনিকটা স্বরাভ্যাস বা voice training-এর মাধ্যমে পুরোপুরি শেখা সম্ভব, ক্রমশ উৎকর্ষসাধন সম্ভব আর সেটাই সঙ্গীতসাধনা। আসল গাড়ি নিয়ে রাস্তায় গড়াতে লাগে মাস তিনেক। তিন মাসের ট্রেনিং যথেষ্ট। সুরের পথে গানের গাড়ি চালাতে শিখতে তিরিশ বছরও যথেষ্ট নয়। কোন সহযাত্রীর সাথে মনমানি না করে, হর্ন না খেয়ে, ট্র্যাফিক সিগনাল মেনে, রাস্তার ধারের অদৃশ্য কঠিন দেওয়ালগুলোকে চুমু না খেয়ে, তালের স্পীডোমিটারের কাছে টিকিট না খেয়ে অব্যর্থ দক্ষতায় গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়াটা একটা বিশাল গোলমেলে ব্যাপার। অভ্যাসের সাথে সাথে সেই ড্রাইভিংটাও মসৃণ হয়, কিন্তু তারপরেও যে আপনি একবারও ফাউল করবেন না এমন নয়। এমনকি আসল গাড়ি চালানোর সময় আর একটা যেটা খেয়াল রাখতে হয় সেটা অন্য কেউ ভুল গাড়ি চালাচ্ছে কিনা খেয়াল রাখা আর চালালে নিজেকে পুনর্বিন্যস্ত করা, সেই সহযাত্রীর সাথে adjust করা। গানের ক্ষেত্রেও তবলাবাদক কি গীটার বাদক ভুল করলে আপনাকে adjust করতে হবে। রাস্তার শোল্ডারে দাঁড়িয়ে সহবাদককে শুধরে দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্র্যাক শেষ করার আগে গান থামালে সুর তাল দুটোই কেটে যাবে। সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে ভাবের যেমন বিন্যস্ত প্রকাশ হয় তেমনটা বোধ হয় অন্য কোন শিল্পতে হয় না। সঙ্গীতশিল্পকে তাই অনেক উঁচুদরের শিল্প ধরা হয়। সঙ্গীতশিল্পীদের কাজটাও সেরকমই কঠিন। মুক্তির পথ সম্বন্ধে বলা হয় “ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া দুর্গম্ পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি” অর্থাৎ মুক্তির পথ ক্ষুরের ধারের মত তীক্ষ্ণ, দুরধিগম্য ও কঠিন। সুরের পথও বোধ হয় অনেকটা সেরকম। একটু ভুলচুক হলেই সেই ক্ষুরের ধারে কেটে গিয়ে রক্তপাতের সম্ভাবনা। গান যারা করতে পারে তাদের প্রতি আমার অপার মুগ্ধতার কথা অনেকেই জানেন। শিকাগোল্যান্ডের আর আমার চেনা জানা অন্য সব সঙ্গীতশিল্পীদের প্রতি থাকুক আমার টুপি খুলে অভিবাদন।

কাগজের নৌকো – রম্যরচনা

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

 

অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি বউ বাড়ি নেই। দূরভাষযোগে জানা গেল মিশিগান হ্রদের সৈকতে হাওয়া খেতে গেছে। শীতের দেশে এই গরম কালের চারটে মাস সকলেরই ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। আমার এই শহরতলিতে তখন ফুরফুরে হাওয়ে বইছে। মিঠে। বাতাসে প্রথম প্রেমে পড়ার শিরশিরানি। কোএড কোচিং-এ পড়তে যাওয়ার আগে দশ-ক্লাস-অব্দি-বয়েজ-স্কুলে-পড়া মনের উথালপাতাল মনে। বাড়ির বাইরে মেঘের নরম তুলোট আদরে ঢেকে থাকা সুয্যিমামার লাজুক হাসি। মনের মধ্যে শবেবরাতের সন্ধে নামার খুশি। সবে এক কাপ চা বানিয়ে এমন গোধূলি লগনটাকে উপভোগ করতে বারান্দায় বেরিয়েছি, কাপের গরম সবুজ তরলে ঠোঁটের আলগা স্নেহ ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই ঝুপুস বৃষ্টি নামলো। সারাদিনের ফ্যা ফ্যা রোদ্দুরে বাড়ি-লাগোয়া কাঠফাটা কাঠের  উঠোনে বৃষ্টিকণাদের লুটোপুটি আর হুল্লুড় শুরু বিনা নোটিশে। বড় বড় ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে মাটি। শুষে নিচ্ছে সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসাদ। মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলা। সেই খড়গপুরের ছোট্ট কোয়ার্টার। যেখানে জায়গা ছিল কম। শান্তি ছিল বেশি। মনে পড়ে যাচ্ছে হু হু রোদ-পোড়া দিনের শেষে কালবৈশাখী। ফটাফট্‌ অঙ্ক খাতার পাতা ছিঁড়ে সেই আয়তাকৃতি প্যাপিরাস দিয়ে বানিয়ে ফেলা কাগজের নৌকো। যেন কোন পূর্বজন্মের কথা। ভাঙাফাটা সিমেন্টের উঠোনের পশ্চিম দিকটা দিয়ে অঝোরে বয়ে যাচ্ছে জল। তখন আমার কাঁচা বয়স। অপু মন। সেই ঝরঝরিয়ে বয়ে চলা হঠাৎ-নির্ঝরিণীতে ভাসিয়ে দিচ্ছি পাটিগণিতের নৌকো। কেশব চন্দ্র নাগ দুলতে দুলতে ভেসে যাচ্ছে ঐ দূরে। এই জলে ভরে উঠল আমার মাঝিবিহীন কাগজের নৌকোর সংক্ষিপ্ত পরিসর। সে বেচারা ওপরের আর নিচের জলের চাপে পানকৌড়ি-ডুব দিল জলের মাঝে। আবার আর একটা নৌকো ছাড়লাম। এলোমেলো হাওয়া বয়ে চলেছে হরিণ শিশুর মত। সেই হাওয়ার অবিমৃষ্যকারিতায় একবার জলের ছাঁট এদিক থেকে আসে, তো পরের বার আসে ওদিক থেকে। তারে শুকোতে দেওয়া ভিজে জামা কাপড় ভিজে জাব। দে টান দে টান। সাগরের ওপার থেকে ভেসে আসছে মায়ের গলা- “বাবাই ঢুকিয়ে আন জামাকাপড় গুলো। সব ভিজে গেল রে। ঘরের সব জানলা বন্ধ কর রে”। তড়িঘড়ি ব্যস্ততা। কিন্তু সে সব মায়ের কাজ। আমার তাতে মন নেই। আমি আমার নৌকোর ভয়েজ দেখতে ব্যস্ত। ওই শুরু হল শিল পড়া। এক ছুট্টে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছের নিচে। ঘন গন্ধ নিয়ে কদম ফুল গুলো ঝরে ঝরে পড়বে। ঝরে পড়বে কৃষ্ণচূড়া কুঁড়ি। সেই পুষ্পবৃষ্টির মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। কোঁচড় ভরে কুড়িয়ে আনতে হবে। সারা সন্ধে ধরে বাড়িতে বসে আলতো নখের আদরে ফুটিয়ে তুলব ফুলগুলোকে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসবে খিচুড়ি-ডিমভাজার সুবাস আর একটা মা-মা গন্ধ। ওই তো ঝরঝরিয়ে শিল পড়া শুরু। তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মত কুড়োচ্ছি আর মুখে পুরছি। সত্যি, বরফেরও ওরকম স্বাদ হয়? পৃথিবীর আর এক প্রান্তে মৌরুসিপাট্টা জমিয়ে বসেছি। কিন্তু এই সাঁইত্রিশ বছরে দেখা চোদ্দটা ফ্রিজের কোনটার বরফে অতো স্বাদ পাইনি। কচরমচর করে চেবাও। মুখে অনাবিল আনন্দের ঝিলিক। বাড়িতে ঢুকেই শঙ্কিত-মায়ের-কড়া-বকুনির-সম্ভাবনার তৃপ্তি লেগে থাকে মুখে। একটা বড়সড় গোছের শিল মাথায় ঠাঁই করে পড়লেই ফুলে চাঁই। ওই যে শিউলিদের আম গাছটা থেকে টুকটাক করে পড়তে আরম্ভ করেছে শিশু ফল গুলো। ওদের অকালপ্রয়াণে আমার বালক মন আনন্দে শিহরিত। ছুট ছুট ছুট। আমগাছটার তলায় এসে ফটাফট্‌ দক্ষ হাতে কাঁচা আম কুড়োনোর বর্ষাপিয়াসী প্রসন্নতা। বাড়িতে ঢুকেই বৃষ্টি-অর্জিত সেই অমূল্য সম্পদগুলোকে ছাল ছাড়িয়ে হাল্কা নুনে জারিয়ে আমাদের সেই ছোট্ট ফ্রিজে শীতল শয়ন দেওয়া। আগামিকাল স্কুল থেকে ফিরে তার অম্লরসে জিভের স্বাদকোরকগুলোকে বিয়ে-বাড়ির-ফুর্তি-আর-রোশনাই প্রেরণ। সেই ছোট্টবেলার আমার শহরের জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচুড়া রাধাচূড়ার মত এই দূর প্রবাসেও আমার প্রতিবেশী, আমার দোরগোড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা চিরসখা দুটো দেবদারু গাছ। এখানে আদর করে ওদের বলে ক্রিস্টমাস ট্রি। কিন্তু সেই নামে ডাকলে আমার বাঙালি শহরতলীয় পরাণে কি দেবদারু নামের রোমান্টিকতা আসে? হাত-পা ছড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে গাছ দুটো একমনে। যেন এই মুহুর্তে বৃষ্টিতে ভেজাই ওদের একমাত্র কর্তব্য। পাতায় জলসিঞ্চন করা ছাড়া আর কোনো কাজেই তাদের উৎসাহ নেই।

 

হুড়ুদ্দুম করে ছপ্পড় ফাড়কে চিলগতিতে মিনিট পনের ধরে নেমে আসার পরে মেঘেদের ফাটল ফুড়ুত করে বন্ধ। আর তৎক্ষণাৎ শুরু এ পাড়ার পাখিদের বর্ষামঙ্গল গীতি। গোধূলির ঈষৎ রক্তিম আলোয় আর আর্দ্র মলয় সমীরে শরীর জুড়িয়ে গলা ফেড়ে একে অপরকে ডাকাডাকি। ওদের অবোধ্য ভাষায় ওরাও কি কাগজের নৌকোর কথাই বলছে? ভাবতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারলাম ছোটবেলার সেই কাগজের নৌকো বানানোর ম্যাজিক পদ্ধতিটা এই সুদীর্ঘ পথচলার কোনো বাঁকে ফেলে এসেছি, বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছি। এমন একটা প্রবাসী ক্ষণস্থায়ী কালবৈশাখী আমার জন্য অপেক্ষায় আছে জানলে কি ভুলতে পারতাম? যাই হোক কোই পরোয়া নেহি। পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডারের বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে গেছে। ইউটিউবে ঢুকে ওরিগামি বলে খোঁজ করলে কাগজের নৌকো বানানোটা কি আর একবার মনে করিয়ে দেবে না? হয়তো বা। এখানে বাড়ির উঠোনে জল জমে না। বৃষ্টি হলে উঠোন-বাগান খরস্রোতা নদী হয়ে ওঠে না। তাতে কি? নৌকোটা আজ না ভাসিয়ে যদি পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিই? যদি আমার ডানা লোকানো ছোট্ট পরী, আমার কন্যাকে উপহার দিই? নিশ্চয় ও ওর বড় বড় খুশির ঝিলিক-ওলা চোখ নিয়ে হাত পেতে নেবে আর মিনমিনে অশ্রুত-প্রায় আধোআধো গলায় বলবে “হ্যাঁ বোত”।

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

[ছবির নৌকোটা কিন্তু আমার এই লেখার পরে ইউটিউব ঘেঁটে আজই বানানো]

খাওয়ানো – রম্যরচনা

স্ত্রী গেছেন জনৈকা সন্তানসম্ভবার সাধপূরণ করতে অর্থাৎ কিনা সাধ খেতে। আমার আড়াই বছরের কন্যার মধ্যাহ্নভোজনের দায়িত্ব পড়েছে আমার ঘাড়ে। আমার মেয়ের পছন্দের খাদ্যতালিকা সম্বন্ধে বলি। আমার স্থিরবিশ্বাস আমার মেয়ে পূর্বজন্মে সাধু সন্নিসী ছিল। স্বাত্তিক খাবারেই তার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। স্বাত্তিক খাবার বলতে আমি যা বুঝি সেটা হল দুধ, ফলমূলাদি ইত্যাদি। রজোগুণী খাবার বলতে আমি বুঝি যে খাবার খেলে কাজ করবার শক্তি পাওয়া যায় যেমন ভাত, ডাল ইত্যাদি শর্করা জাতীয় খাবার। আর তমোগুণী খাবার মানে অবশ্যই প্রাণীজাত প্রোটিন অর্থাৎ মাংস – মুরগী অথবা মাটন। স্বাত্তিক খাবারে ওর আগ্রহ প্রবল। এক বাটি স্ট্রবেরী কি ব্লুবেরী, কলা হোক আপেল হোক চোখের নিমেষে সাবাড় করে দেবে। এক কাপ দুধ উড়িয়ে দেবে পলক ফেলার আগেই। রাজসিক খাবারে অর্থাৎ ভাত ডালে বিশেষ বিরক্তি আর চিকেন মাটনে যেটা আছে সেটা যারপরনাই ঘৃণা বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু শিশু বিশেষজ্ঞরা শুধু ওই তথাকথিত স্বাত্তিক খাবারে শরীরের সম্পুর্ণ পুষ্টি হয় বলে মনে করে না। তাই সকাল সন্ধে আমাদের ওই রাজসিক ও তামসিক খাবার খাওয়ানোর অ্যাডভেঞ্চারে নামতে হয়। অ্যাডভেঞ্চার কথাটা কেন ব্যাবহার করলাম সেটার জন্য একটু বিশদে যাওয়া প্রয়োজন। তো যা বলছিলাম লাঞ্চ করানোর দায়িত্ব আমার ওপরে আজ। তামসিক খাবারের রিস্ক না নিয়ে কম বিপজ্জনক রাজসিক খাবারেরই ব্যাবস্থা করে গেছে স্ত্রী। অর্থাৎ ভাত, মুসুরের ডাল, আলু সেদ্ধ। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি শাকসবজী স্বাত্তিক খাবারের মধ্যে পড়লেও তাতে ওর মোটেই আকর্ষণ নেই। তাই সবজি আজকের ওর মেনু থেকে বাদ। একটু স্বাত্তিক টাচ দেওয়ার জন্য ভাত ডাল আলুসেদ্ধর সাথে বেশ বড় চামচের এক চামচ ঘি চটকে মেখেছি। এর পরের ঘটনা নিম্নরূপ।

                   

একটা বড় নিঃশ্বাস নিলাম। ইস্ট দেবতাকে একটু স্মরণ করে নিলাম। নিজেকে ভগবান বুদ্ধের মত প্রশান্ত চিত্ত করতে কল্পনা করলাম সবুজ কচি ঘাসে ভরা একটা মাঠে চলে গেছি। পাশ দিয়ে উপলখণ্ডের মধ্য দিয়ে ঝিরিঝিরি করে বয়ে চলেছে একটা নাম-না-জানা নদী। পাখিদের কুহুকাকলিতে মুখর পরিবেশ। প্রিয় কবিদের প্রিয় কবিতা স্মরণ করি। ইত্যাদি বিভিন্ন রকম মানসিক যোগাসন করে গলার স্বরের মধ্যে যথেষ্ট চিনি এবং উত্তেজনা ও উৎসাহ ভরে ডাকলাম “সানাই। এবার আমরা ভাতু খাব। ইয়েয়ে…ইয়ামি…” ভাতের থালা নিয়ে ওর দিকে এগোতেই আমার কৃত্রিম উৎসাহে জল ঢেলে উল্টোদিকে ছুটল। আমি যে ইয়ামি খাবার দিচ্ছি এমনটা আর মনে হয় না। আত্মবিশ্বাসে সামান্য একটু চিড়। ভাতের থালাটা টেবিলে নামিয়ে রেখে হাসি হাসি মুখ করে ঘরের মধ্যে খানিক ছোটাছুটি করে বেড়ালছানার মত প্রাণীটাকে বগলদাবা করে নিয়ে এসে বসলাম সোফায়। “নাহ, চাপ আছে। সোফিয়া চালিয়ে দিই। ওর প্রিয় রাজকুমারীর বিভিন্ন অভিযান দেখতে দেখতে নিশ্চয়ই খেয়ে নেবে।” সোফিয়ার মিষ্টি গলার স্বরে ওর মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। গুড সাইন। এক চামচ ভাত-ডাল-আলুসেদ্ধ-ঘি মুখে চালান করে দিলাম। সোফিয়াকে দেখতে দেখতে বেশ উৎসাহের সঙ্গে মুখে নিলো গ্রাসটা। স্বস্তি। ওর মা ফালতুই বলে “মেয়েটা একদম খায় না।” এই তো বেশ খেয়ে নিচ্ছে। আসলে মায়েরা বাচ্চা হ্যান্ডল করতেই জানে না। আর মাত্র নটা মোটে চামচ। খাওয়াতে পারলেই পড়া শুরু করতে পারব সলমন রুশদির অর্ধসমাপ্ত উপন্যাসটা। মিনিট পাঁচেক পরে দ্বিতীয় চামচটা নিলাম। সানাইয়ের দিকে বাড়াতেই খুব উৎসাহের সঙ্গে মুখ খুলে দিল। যাক আজ চাপ দিচ্ছে না। ও হরি। মুখের মধ্যে প্রথম চামচের প্রায় অর্ধেকটা এখনও নিজগুণে বিরাজমান। শিশুদের এই একটা দৈব ক্ষমতা। আমাদের মুখের মধ্যে খাবার গেলেই স্যালিভা সিক্রেশান হয়, লালাক্ষরণ হয়। ওরা কোন এক ম্যাজিকাল পাওয়ার থেকে সেইটে বন্ধ করতে পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটাই গ্রাস মুখে নিয়ে বসে থাকতে পারে। শিশুদেরকে ভগবানের অংশ এমনি এমনি বলে না! যাকগে যাক আধ চামচ তো খেয়েছে। Think positive. Be positive. দ্বিতীয় চামচ খাবারটাকে কমিয়ে অর্ধেক চামচ করি। মুখে ভরে দিতেই মুখবিবর পুরো ভর্তি। গালগুলো ব্যাঙের মত ফুলে আছে। চিবোনোর কোন লক্ষণ দেখি না। সোফিয়া ততক্ষণে কিছু মৎস্যকন্যাকে নিজের বার্থডে পার্টিতে নেমন্তন্ন করে ফেলছে। সেইটেই চোখ দিয়ে গিলছে। খাবার গলাধঃকরণ করার তেমন কোন ইচ্ছে নেই। অগত্যা পরের সাত মিনিট সোফিয়ার কার্যকলাপ দেখি ওর সাথে। প্রসঙ্গত সোফিয়ার সব কটা এপিসোড একশ আট বার আমার সামনে প্লে হয়ে গেছে। প্রতিটা গল্প শুরু থেকে শেষ অব্দি জানি। এখন ডায়ালগগুলো পর্যন্ত মুখস্ত হতে শুরু করেছে। কিন্তু সানাইয়ের কোন ক্লান্তি নেই। মাঝে মাঝে ভাবি ওর মত ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা যদি আমার হত, প্রতিদিনই নতুন করে পৃথিবীটাকে দেখতে পারতাম, চোখে একই বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করতে পারতাম সূর্যোদয় কি সূর্যাস্ত গুলোকে, কি ভালই না হত? স্মৃতি বড় বিস্ময়-প্রতিরোধক। সে যাক। আবার পাঁচ মিনিট পরে এক চামচ ভাত নিয়ে মুখ খুলতে বলতেই খুলে দেয় সে। এ ব্যাপারে ও বড় বাধ্য। একেবারেই ঝামেলা করে না। মুস্কিল হল এবারে শুধু দেখি মুখটা চার ভাগের তিন ভাগ ভর্তি। আগের গ্রাসের কিছুই প্রায় শেষ করে নি। “সানাই খেয়ে নাও, খেয়ে নাও। অল ডান করতে হবে। ফিনিশ করতে হবে। ফাস্ট” বলে আবার অপেক্ষা। না কোন কাজ হয় নি। মুখ নড়ে না। যথাযথ কারণেই গলার ওজন বাড়ে। “সানাইইইই। খাওওও”। ঠোঁট ফুলে ওঠে। কান্নার প্রস্তুতি। কিন্তু গালের পেশীগুলো তথৈবচ। নো নড়নচড়ন। গলা নামিয়ে “খেয়ে নাও সানাই। ওদিকে মিয়া সব খেয়ে নিলো”। মুখ চলে সামান্য। দু তিন সেকেন্ডের মত। তারপরেই মিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা বুঝি ভুলে গেল। আবার বলি “সানাই পিকু সব খেয়ে নিলো।” – এ বারে মুখ আর চললই না। বোঝা যাচ্ছে মিয়া বা পিকুদের সাথে খাওয়ার স্পীডের ইঁদুর দৌড়ে সামিল ও হবে না। এসবের ঊর্ধে চলে গেছে। খাওয়ানো শুরু করার আগে মনের মধ্যে যে ঝিরি ঝিরি নদীটা বইয়েছিলাম এখন তার জলটা বেশ ঘোলা লাগছে। অপেক্ষা। অপেক্ষার থেকে ভাল বন্ধু আর কিছু নেই মনকে বোঝাই। আর খানিকক্ষণ পরে যখন দেখলাম দ্বিতীয় চামচ প্রায় শেষের মুখে, (মানে জিভের ওপর ভাতের একটা বেস আছেই, সে থাক…অত বেশী আশা করলে চলে না) তৃতীয় চামচটা চালান করে দিই মুখে। নেয় কিন্তু নতুন আসাইনমেন্টের ওপর কাজ শুরু করে না। এই লক্ষণ আমি বিলক্ষণ চিনি। আমাদের সরকারী অফিসের মত। ফাইল আসে কিন্তু প্রসেস হয় না। মিঠে কথায় আর কাজ হবে না মনে করে কিছু কাল্পনিক চরিত্রকে নিয়োগ করি। “পুলিশ, পুলিশ আছ তো? সানাই খাচ্ছে না। ও তোমরা আসছ? আচ্ছা দাঁড়াও। সানাই বোধ হয় খেয়ে নেবে” – ফোনে কাল্পনিক পুলিশের সাথে আমার কথোপকথন। ওর স্নায়ুশক্তির প্রশংসা করতেই হচ্ছে। পুলিশের নাম শুনে হৃৎকম্প তো দূরের কথা, মুখে চিন্তার রেশ মাত্র দেখা যায় না। যেই কে সেই ঢ্যাঁটা হয়ে বসে থাকে। “ওকে, তাহলে হাঁকার মাকে ডাকি? ডাকবো তো?” সেই খুদে লৌহস্নায়ু প্রাণীটিকে প্রশ্ন আমার। মুখ ভর্তি ভাত নিয়ে একটা দুর্বোধ্য শব্দ করে। অর্থ বোধ হয় ডাকতে মানা করছে। আজকাল হাঁকার মা-তে একটু কাজ হচ্ছে। কিন্তু সামান্যই। শীঘ্রই নতুন কোন চরিত্রকে আনতে হবে। গতকালই ও হাঁকার মা হয়ে আমায় ভয় দেখাচ্ছিল। অতএব হাঁকার মার ম্যাজিক প্রায় গেল বলে। তাও সামান্য ভয়ে তিনচারবার মুখ নাড়া আওয়াজ পাওয়া যায়। ক্রমে ধীর হয়ে আসে। আবার সানাই সোফিয়ার দেশে হারিয়ে যাচ্ছে। গোরু একটা! সেই মানসিক নদীর ঘোলা জলটা এখন নর্দমার জলের মত কর্দমাক্ত লাগে। পাখি নয়, শেয়ালের আর প্যাঁচার ডাক শুনতে পাচ্ছি মনে হচ্ছে। নাহ। Calm down. Calm down. Peace. ওম মধু, ওম মধু, ওম মধু। মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ। মনে মনে শান্তি মন্ত্র আওড়াই। আমি বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি। Peace noble টা আমার লাগল বলে – এইসব ভাবি। আবার বড় করে শ্বাস নিই। “সানাই সোফিয়া কি করছে? ও সোফিয়া ফ্লায়িং? উড়ছে?” উৎসাহের সাথে জিগ্যেস করি। বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। মুখভর্তি খাবারের অলিগলি পথে একটা হ্যাঁ বলারও চেষ্টা করে। “গুড। খেয়ে নাও। খেয়ে নাও। নয়তো সোফিয়া রাগ করবে।” মাথা নাড়া বন্ধ। সাথে মুখ চালানো। বোঝাই যাচ্ছে সোফিয়ার প্রতি ওর কোন সহানুভুতি নেই। না থাকুক, বাবার ওপর তো থাকবে। “সানাই, বাবার খুব খিদে পেয়েছে। বাবা কাঁদছে।” একটু কুমীর কান্না কাঁদি। নাহ লাভ হচ্ছে না। বাবার ওপরেও বিশেষ সহানুভুতিশীল নয়। “সোফিয়া বন্ধ করে দেব কিন্তু।” হুমকি ছাড়ি। জোড়ে জোড়ে মাথা নেড়ে অসম্মতি প্রদর্শন করে। কিন্তু কোন চুক্তিতে বা ডীলে আসে না। গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের আইডিয়াটা এদের কাছ থেকেই পেয়েছিল কি? কে জানে? ঘড়ির কাঁটা একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গেছে। ওর মুখের বাঁধন অতিক্রম করে খাদ্যনালীতে খাবার না পৌঁছনর ফলে আমার ধৈর্যের বাঁধন ভাঙছে। মাত্র চার চামচ মত ঠুসতে পেরেছি বলা চলে। পঞ্চমটা নিজের মুখে ভরে দিই। যাক, ও খাওয়া আমি খাওয়া একই ব্যাপার। আফটার অল বাপ মেয়ে তো! ষষ্ঠটা ওর দিকে বাড়াতেই মুখ খুলে দেয়। তৃতীয় আর চতুর্থ চামচ এখনো সেখানে। হাউসফুল। মরিয়া হয়ে তাও ঠুসি। ব্যাস…আমার এই অসৎ কর্মের শাস্তি স্বরূপ গোটা আড়াই চামচ মত নীরবে উদ্গীরণ করে দেয়। সাড়ে চারটে গোল দিয়ে আড়াই খানা গোল খেয়ে আমার স্কোর এখন দুই। মানে দুই চামচ মত খাওয়াতে পেরেছি। সেই ছোটবেলায় বাঁদরের অঙ্ক কষেছিলাম – তেল লাগানো বাঁশে বাঁদর তিন মিটার ওঠে, পরে দু মিটার নামে। এই গল্পে তিন গ্রাস যায়, দু গ্রাস বেড়িয়ে আসে। হতাশা। নাহ সত্যিই খাওয়ানো চাপ ওকে। মনে মনে ওর মাকে সেলাম জানাই। প্রাণপণে চেঁচাই “সানাইইইই”। ব্যাস…ফল স্বরূপ কান্না। মিনিট তিনেক সোফিয়ার শব্দ ছাপিয়ে সেই চিল চিৎকার কর্ণবিবরে ঢোকে। আর বিশেষ আশা নেই। সমস্ত আশায় গ্যামাক্সিন। আত্মবিশ্বাসে তখন রিক্টার-স্কেল-এইটে -হয়ে-যাওয়া ভূমিকম্পের ফাটল। কান্না থামাতে গ্লাসে একটু জুস নিয়ে আসি। চোখের জল আর জুস দুটো মিশিয়ে জুলজুল চোখে চুকচুক করে খেয়ে নেয়। ফলের রসের স্বাত্তিক স্বাদ পেয়ে এবার ওর মেজাজ কিছুটা শরিফ। শান্ত চিত্তে চেষ্টা করে আরও চামচ দুয়েক খাইয়ে দিই। সানাইকে খাওয়াচ্ছি ভেবে দু এক চামচ নিজেকেও খাইয়ে দিই। প্লেটটা ফাঁকা হলে নিজেকেই একটা সান্ত্বনা দেওয়া যায় তাই। প্লেটটা প্রায় খালি হয়ে এসেছে। নতুন করে উৎসাহ দিই সানাইকে। “এই দেখ না, প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আর এক চামচ। মুখ চালাও। অল ডান করতে হবে।” বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। ভাবটা যেন ওরও পুরো ভাতটা মেরে মুচড়ে খেয়ে নেওয়ারই ইচ্ছে। সাধ আছে অথচ সাধনা নেই! আর এক-দু চামচ আরও মিনিট কুড়ির প্রচেষ্টায় ঢুকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের খাবার গুছোই। অনেক ধকল গেছে। চাট্টি এক্সট্রা ভাত নিয়ে নিই।

 

আধ ঘণ্টা পরে আমার খাওয়া হওয়ার পর, খাওয়ার পরবর্তী বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়ার কাজ করার পর, যখন ওকে মুখ ধোয়াতে নিয়ে যাই দেখি মুখের মধ্যে চামচ দেড়েক ভাত এখনো জড়ো করে রাখা আছে। কি আর করা? সেইটুকু বের করে ডাস্টবিনে ফেলে দিই। বিশেষ কিছু খাওয়াতে না পারার দোষিমন্যতা নিয়ে কটা স্ট্রবেরী অফার করি। পেট ভরে যাওয়ার দরুন যে কিনা একটু আগে একটুও ভাত খেতে পারছিল না, সেই খুদে বুদ্ধিমান দুহাতে দুটো করে স্ট্রবেরী ফটাফট মুখে চালান দিয়ে দেয়। আড়াই মিনিটে সাড়ে তিন খানা জাম্বো স্ট্রবেরী শেষ করার পরে ওর মুখে হাসি ফোটে। ওর বাবার মুখেও।