বিস্ময় মনের অতি উচ্চভাব আর উচ্চ বলিয়াই সহজলভ্য নয়। সত্যকার বিস্ময়ের স্থান অনেক ওপরে – বুদ্ধি যাহার খুব প্রশস্ত ও উদার, মন সবসময় সতর্ক – নূতন ছবি নূতন ভাব গ্রহণ করিবার ক্ষমতা রাখে, সেই প্রকৃত বিস্ময়রসকে ভোগ করিতে পারে। যাদের মনের যন্ত্র অলস, মিনমিনে, বিস্ময়ের মতো উচ্চ মনোভাব তাদের অপরিচিত থাকিয়া যায়।
— বিভূতি বাবু লিখেছেন অপরাজিত উপন্যাসে।
পড়তে পড়তে মনে হলো এর থেকে বেশি সত্য বুঝি আর নেই। নাট্যশাস্ত্রের নবরস অনুযায়ী বিস্ময় রস হলো “অদ্ভুত রস”, feeling of awe or wonder or marvel. পৃথিবীর সমস্ত মহান সৃষ্টির মূলে প্রেরণা হিসেবে আছে একে গভীর বিস্ময়। এই মহান বিস্ময় থেকেই আঁকা হয় আলতামিরা গুহায় পলায়নরত বাইসনের দৃপ্ত দেহ ভঙ্গিমা, এই বিস্ময় রস থেকেই সৃষ্টি ইলোরার অদ্ভুত ভাস্কর্য, এই বিস্ময়ই ক্যানভাসে The Starry Night আঁকে, এই বিস্ময় রস থেকেই লেখা পথের পাঁচালী, এই বিস্ময় রস থেকেই লেখা হয় “রোড নট টেকেন” কিংবা “দ্য লিসনার্স” কিংবা “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”-এর মতো কবিতা। মাধ্যাকর্ষণ থেকে আপেক্ষিকতাবাদ আবিষ্কারের মূলেও সেই বিস্ময়। উপনিষদের আত্মানুসন্ধানের মূলেও সেই আদি বিস্ময়, আমি কে? বিজ্ঞান, দর্শন, অধ্যাত্মবাদের সকলেরই জননী এক, সকলই এই বিস্ময় প্রসূতা।
অধিকাংশ মানুষের মন মরে আসে বয়সের সাথে সাথে। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হয় লুপ্তপ্রায়। প্রতিটা বিস্ময় মুহূর্ত আসলে একটা আমি-লোপের মুহূর্ত। শিশুর আমি প্রচ্ছন্ন, তেমন প্রকট নয়, তাই সে বিস্মিত হতে জানে। বয়সের সাথে সাথে আমি যত প্রকট হয়, কমে বিস্ময় বোধ।
প্রথম যেদিন এক পেখম তোলা ময়ূর দেখে বলেছিলেন, আহা কী সুন্দর, সেই মুহূর্তে ক্ষণকালের জন্য আপনার আমি ডুবে গেছিল রূপের চিরন্তন বিশ্বজনীনতায়। সেই আমি যা আমাদের কয়েদ করে রাখে এই শরীর-মনের জেলখানায়। যে আমির শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারলেই মুক্তি, মোক্ষ। বিস্ময়বোধ সেই আমির বাহুপাশ থেকে আমাদের দেয় ক্ষণিকের নিস্তার। মন এবং তার ক্রমাগত চিন্তা স্রোতকে থামিয়ে দিয়ে বিস্ময় আমাদের নিয়ে আসে চিরন্তন বর্তমানে, eternal present-এ যা সমস্ত সৃজনশীলতার উৎস, যা নিজের স্বরূপকে জানার প্রথম পদক্ষেপ। বিশালের কাছে গেলে, তারা ভরা আকাশের নিচে দাঁড়ালে, সমুদ্রসৈকতে বসে সেই বিপুল অনন্ত জলরাশির দিকে তাকালে, সুউচ্চ পর্বত শিখরে দাঁড়িয়ে অনেক নিচের সবুজ উপত্যকার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া কোনো পাহাড়ি নির্ঝরিনীর দিকে তাকালে, মন সেই বিশালকে ধারণা করতে না পেরে থেমে যায়। we experience a moment of no-mind. বিস্ময় আমিত্ব নাশক।
কালের যাঁতাকলে ধরা দিতে না চাইলে মহৎ উদার শিশুসুলভ মনকে ধরে রাখতে হয়। আর শিশুমন মানেই বিস্মিত হওয়ার সহজাত ক্ষমতা। বিস্ময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলো স্মৃতি। আগে দেখা কোনো কিছুর সাথে এখন দেখা কিছুর তুলনা করা হলো বিস্ময়ের প্রধান বাধা। শিশু তুলনা করে না। প্রতি দেখাই তার প্রথম দেখা। প্রতি অনুভবই তার প্রথম অনুভব। বৃদ্ধ মন কেবল তুলনা করে আর তাই এমন কিছু খুঁজে পায় না যা নূতন, যা অভূতপূর্ব, যা বিস্ময়সূচক।
যে বড় হতে হতে বিস্মিত হতে ভুলে যায় নি, সে-ই শিল্পী, সে-ই বিজ্ঞানী, সে-ই দার্শনিক, সে-ই মুমুক্ষু, সে-ই আত্মসন্ধানী।
পিপু ফিশুর গল্পটা মনে আছে তো? দুই ভাই। মহা কুঁড়ে। যাকে বলে নড়ে ঘাস খায় না। আদর্শ বাঙালি আর কী। দুক্কুরবেলা ভাত ঘুম দিচ্ছে দুই ভাই। এমন সময় বাড়িতে আগুন লেগেছে। তো আগুনের যা ধর্ম। তাতাচ্ছে পোড়াচ্ছে। এক ভাই বলল, পিপু। মানে হলো, পিঠ পুড়ছে। খুব কুঁড়ে কিনা। তাই গোটা “পিঠ পুড়ছে” বলে জিভ আর কণ্ঠনালীর ওপর অযথা চাপ দিতে চায় না। তাই বলছে, পিপু। ছোট ভাইও কুঁড়েমিতে কম যায় না। উত্তর দিচ্ছে ফিশু। মানে, ফিরে শুই। অর্থাৎ কিনা, পিঠ পুড়ছে তো কী আর করা যাবে, ফিরে শুই। আগুনের দাহিক শক্তিকে এর থেকে বেশি সম্মান জানানো সম্ভব না কুঁড়ে ব্রাদারের পক্ষে।
তা হয়েছে কি, কুঁড়েমিতে আমিও কিছু কম যাই না। পিপুফিশুকেও কমপ্লেক্স দিতে পারি। আমাদের এখানে গত রাতে এসেছিল টর্নেডো। আজ্ঞে যেমন তেমন টর্নেডো নয়, রীতিমতো গাছ উপড়ানো টর্নেডো। মোবাইলে এলার্ট ছাড়াও শহরে ঘুরে ঘুরে পুরসভার গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে বলে গেল, হালকা ভাবে নিলে পুরো ছবি হয়ে যাবেন। অতএব চ্যাংড়ামি না। যিনি আসছেন তিনি কুম্ভকর্ণের মতো গোটা গোটা বাড়িঘরদোর তুলে সাত গুটি খেলতে পারেন। কিন্তু আমায় নাড়ায় কার সাধ্যি। গ্যাঁট হয়ে বসে দন্তবিকশিত করছি। আর একটা রস মালাই জাতীয় নতুন আমদানি মিষ্টির দিকে লুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছি আর ভাবছি,
এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরোঝরে তপনহীন ঘন বরষায়, এমন দিনে তারে খাওয়া যায়..
হোয়াটসআপ বাহিত খবর এলো বন্ধুবান্ধবরা সব বেসমেন্টে আশ্রয় নিয়েছে। শরীর নাড়িয়ে এরকম একটা অঘটন ঘটাতে হবে? কি আপদ। কিন্তু যে ধরণের ভিডিও তারপর আসতে লাগল, টর্নেডোর সে তড়কা দেখে চোখে তাক লেগে যায়। অগত্যা বললাম সকলকে, চলো বেসমেন্টেই যাই।
কুড়িয়ে বাড়িয়ে বাড়ির সকল সদস্যকে নিয়ে তা গেলাম বেসমেন্টে। ভূগর্ভে আমরা সুরক্ষিত। কিন্তু আমার বাড়ি? একতলা? দোতলা? টর্নেডোর নাচন শেষ হওয়ার পর সেই না-চিজ থাকবে তো? মাম, মনে আমার স্ত্রী বললো, আমাদের ডকুমেন্টসগুলো ওপরে রয়ে গেল…সে যাক। কথায় আছে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। কিন্তু মাম কথা ফেলা মাত্র দেখলাম, আমার বড় মেয়ে, সে বয়সে নেহাতই অর্বাচীন, স্প্রিং এর মতো ছিটকে উঠে তড়িৎগতিতে ওপরে চলে গেলো। ভাবলাম জ্ঞানগম্যি হয়েছে। বাবা মার দুশ্চিন্তা দূর করতে ডকুমেন্টস আনতে গেছে। যেমন দৌড়ে দৌড়ে গেল, সেরকমই নাচতে নাচতে ফিরে এলো। এমন দায়িত্বশীল কন্যা থাকলে টর্নেডো কেন টর্পেডোরও সামনা করা যায়, ভেবে একতু গর্ব করবো ভাবছি, দেখি, ও হরি! ডকুমেন্টস তো আনে নি। একটা ঢাউস ট্র্যাশ ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে নিজের সমস্ত সফ্ট টয়! জিগেস করায় বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, টর্নেডোতে আমাদের বাড়ি উড়ে গেলেও সফ্ট টয় গুলো থাকবে, কারণ ওগুলো নাকি ভীষণ এক্সপেনসিভ। নেহাত অলরেডি বেসমেন্টে ছিলাম, নয়তো কুঁয়ো খুঁড়ে ডুবে মরতে ইচ্ছে করছিল! 🙂 🙂
ততক্ষণে ওপরে ক্রুদ্ধ বাতাসেরা মত্ত যূথ দলের মতো তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছে..
এক বন্ধু বলছিল, তুমি তো এত ভাল গল্প লেখো, তবে কবিতার বই প্রকাশ করলে কেন? কবিতা তো কেউ পড়ে না। আমি বললাম, ধরো, যদি ঠিক সেই জন্যই। যাতে হ্যাজাকের সূর্যসম প্রভায় নরম কথাগুলো ঝলসে না যায়, যাতে জয়ী হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল না হয়ে পরম সুখে পরাজিত হতে পারে আমার আত্মকথন, যাতে যুক্তিবাদী ও মস্তিষ্কসর্বস্ব মানুষের পরখ-করা-নখের নিষ্পেষণে রক্তাক্ত হতে না হয়, যাতে অষ্টমীর জগন্নাথ ঘাটের ফুলের বাজারে ফুলের মত মূল্য নির্ধারণ করার জন্য পাঠক ও পঠিতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি দরাদরি না হয়…
বইটি পাওয়া যাবে কবিতা আশ্রমের স্টল 252 তে। 6 নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে সোজা গিয়ে লাস্ট স্টল। এটিই বইমেলার শেষ সপ্তাহান্ত। যদি বন্ধুদের কেউ স্বপ্ন সাজাও, যদি বন্ধুদের কেউ বইমেলায় যাও, ঘুরে দেখো কবিতা আশ্রমের স্টলটি। এর বেশি মার্কেটিং আমি করতে জানি না। বরং একটা কবিতা দিই আমার সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “বনধুতরোর ফুল” থেকে। এ বইয়ে আমার কথা লেখা আছে। হ্যাঁ এ আমারই কথা। কোনো পাতায় হয়তো বা ধরা আছে কোকিলকূজিত নয়ানজুলির চর, কোথাও বা পলাশ রাঙানো বনমর্মর, কোথায় আমার চোখে ধরা পড়া সন্ধে নামার ক্ষণ, কোথাও আমারই আহত হৃদয় ক্রন্দন।
অভিমান
তুমি আমার কসাইখানা দেখতে পেলে খুঁজে পেলে আমার হর্ম্যপ্রাসাদ তোমার চোখে চেয়ে দু দণ্ড বাসর জাগল আমার চিলেকোঠা ছাদ
কিন্তু আমার মরু প্রান্তরের সন্ধান পেলে না আমার হাত ধরে ঝিনুকের দেশে গেলে না সহস্র বছরের একটানা বর্ষার পর শোনা যায় যে ঝিল্লী মর্মর আমার বুকের মধ্যে তার ধ্বনি অনুক্ষণ সুপ্রিয়ে, কান পেতে শুনো কোনো দিন…
যযাতির ঝুলি নিয়মিত পড়েন এরকম পাঠকের সংখ্যা ১০০ এর বেশি। তা আমাদের গুগল স্ট্যাট দেখলেই জানা যায়। নিষ্ঠা ভরে যযাতির ঝুলিটি উল্টে পাল্টে দেখার জন্য সকল পাঠকবর্গকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। বিশ্বাস করুন পাঠকের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে অনুরণন তুলতে পেরেছি এই আশা নিয়েই আজও লিখি দু এক কলম।
আপনার যারা যযাতির ঝুলির একনিষ্ঠ পাঠক, আপনাদের সাথে একটি সুখবর ভাগ করে নিতে চাই। কবিতা আশ্রমের প্রকাশনায় লেখক স্বর্ভানু সান্যালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “বনধুতরোর ফুল”। পত্রভারতী থেকে লেখকের প্রথম গল্প গুচ্ছ বেরিয়েছিল ২০১৯ বইমেলায়। “যযাতির ঝুলি” বইটি পাঠককুলে সমাদৃত। এ বছর কলকাতা বইমেলায় ২৫২ নম্বর স্টলে পাওয়া যাবে কাব্য গ্রন্থ “বনধুতরোর ফুল”। পরে পাওয়া যাবে অনলাইন ও কলেজ স্ট্রিটে। পাঠকের ভালবাসা এবারেও পাব এই আশা রাখি। সবিনয়ে অনুরোধ বইটিকে আপনার নিজস্ব সংগ্রহে স্থান দেবেন।
বইমেলা পরবর্তী সময়ে পাওয়া যাবে কলেজ স্ট্রীটে কবিতা আশ্রমের নিজের দোকানে অথবা দেশ বা ধ্যানবিন্দুতে। অনলাইন পাওয়া যাবে এই লিঙ্কে
In the field of writing fiction, unbiased feedbacks are hard to get. I write for different magazines both printed and digital without a clue if anyone has ever read any of my body of works. It is hard work to make a palatable story, so feedback motivates. All authors, famous or rarely read (like me), have to resort to social media to promote his work. We put our stories verbatim in our facebook wall in order to earn some readership. Most of your friends and families ignore. Some reacts with a word of praise or two. But you are never sure if that appreciation is colored based on your social status, personal warmth or your chemistry with the person. An objective evaluation of art can never be done if the art connoisseur knows the artist personally.
But rarely, very rarely, comes moments which rekindles your passion of writing. Today was such a day. I keep checking google ranking of my literary website “Jojatir Jhuli” from time to time. This motivates me because google’s world class ranking algorithm consistently attributes a fairly good page index to my website.
Today while searching for google rank of my website “Jojatir Jhuli”, I found that I got an entry in goodreads August, last year. A person named Ranjan Ganguly who apparently read my published short story collection “Jojatir Jhuli: Baro Kahon” gave a feedback in goodreads. Ranjan, I dont know you and may be I will never know you but that is precisely why your word of appreciation truly motivates me. I don’t know if some of my stories are as good as Ray’s or not but I will leave it to posterity to judge that.
কতদূর থেকে আমি এই অব্যয় শরীর নিয়ে ভেসে ভেসে এসেছি তোমাদের সাগর সঙ্গমে। তোমাদের নগর কীর্তনে সং সেজে দু হাত তুলে ববম ববম নৃত্য করেছি। তারপর সমাচ্ছন্ন রাত্রি নদী বেয়ে মৃত শব্দদের ক্লান্তিকর সমাবেশে গেছি। আমাকে চার দিক থেকে আবহ সঙ্গীতের মত ছেঁকে ধরেছে অন্ধকার। সুখী বেড়ালেরা এসে শরীর ঘষেছে শরীরে। আহা কি নরম! আহা কি প্রমত্ত বেদনা! নীড় ভাঙা পাখিদের বিধুর সঙ্গীত আমি মজলিশি আড্ডায় বসে শুনেছি একাকী। ভীড় করে এসেছে সাপেরা। নীলের ছোবল আমি সানন্দে নিয়েছি জিভ পেতে। মহা তিমির অর্ণব সন্তরণ করে এসে আমি বেলাভূমিতে শরীর এলিয়ে দিয়েছি। নরম নক্ষত্রেরা আমার নির্মোক শরীর চেখে দেখেছে নেহাত কৌতূহলবশে। মধ্যযামে ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের সাথে রমণ করেছি আমি কত কত বার। পথের দিশারী বৃদ্ধ কাছিমেরা শুন্য দৃষ্টি মেলে লেহন করেছে আমার সবুজ। আমার সমস্ত আরব্ধ কর্ম সাঁত করে গিলে নিতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটা অন্ধকার ব্যাঙ। প্রতিদিন ক্লিন্ন হচ্ছি। প্রতিদিন চুরি যাচ্ছে প্রত্যয়।
সন্ধেতারা জ্বলে ওঠা মরা বিকেলে তাই আমি ঝুমকোলতাদের মত ভীড় করে করছি আকণ্ঠ সূর্যপান। আমার শরীর জুড়ে শুষে নিচ্ছি কবেকার পুরাতন আলো। হে প্রেম, হে অপ্রেম, জ্বালো আমায় জ্বালো। প্রদীপের মত দীপ্ত করো আমার এই শরীর সমিধ।
শুনেছি বয়সকালে ছেলেমেয়ের কাছে লাথি ঝাঁটা খেতে হয়। আমার “বয়সকাল” হয়েছে কিনা জানি না কিন্তু কালে কালে বয়স তো কম হল না। বয়সকাল হয়েছে না বয়সটাই কাল হয়েছে বলতে পারব না, আর ঝাঁটাটা ভবিষ্যতে বরাদ্দ হবে কিনা জানি না কিন্তু লাথি বরাদ্দ হচ্ছে এখন থেকেই।
আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য, বয়সে নেহাতই নবীন। তিনি পৃথিবীকে অনুগ্রহ করার পর থেকে একটাই বছর ঘুরেছে, মানে তাঁর বয়স এই মাত্র এক বছর। কিন্তু হলে কি হবে, নিশ্চয়ই আগের জন্মে লিটল বম্ব তাথৈ দেবী চুনি গোস্বামী থেকে থাকবেন কারণ পা দুটি পুরো ফুটবল-বলিষ্ঠ। ক্ষুদ্র বলিয়া তুচ্ছ নই এই নীতিকথা অনুসরণ করে তিনি সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে, মানে যাকে বলে পাখি ডাকা ভোর থেকে (আমার জন্য অবশ্যই অর্ধেক রাত্রি) পদাঘাত করতে শুরু করেন মানে কাঁচা বাংলায় লাথি মারতে শুরু করেন। বক্তব্যটা হল আমার যখন ঘুম ভেঙেই গেছে তখন তোমরা ঘুমোও কোন অধিকারে? উনি তো সুযোগ সুবিধে মতই একটু গড়িয়ে নেন, আমি হয়তো সপ্তাহান্তের পার্টি প্রেসার সামলে, ধেই ধেই করে নেচে, ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির বাপ বাপান্ত করে, সোনালি তরলের ঘুমঘোর মোহে দেশের দুঃখদুর্দশার কথা বন্ধু সহযোগে তর্কাতর্কি করে, ফেসবুকীয় বিপ্লব সেরে রাত্রি দ্বিপ্রহরে বডি বিছানাতে ফেলেছি। তাই শরীরের বিশ্রামের প্রয়োজনেই এবং মনের বিশ্রামের অধিকারেই ঘুমোই। কিন্তু এ যুক্তি তার কাছে প্লেস করার সুযোগ নেই কারণ যে দু তিনটে ভাষায় আমার সামান্য দখল আছে, আমাদের বাড়ির নবীনতম সদস্য এখনো সেই ভাষায় বাক্যালাপ করতে বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করে নি। তাঁর স্টাইল পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিক। নিজের সুবিধা-অসুবিধা প্রয়োজন-অপ্রয়োজন উঁচুস্বরে নির্দ্বিধায় অন্যের সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি জানান দেন। হিটলার মুসোলিনিও লজ্জা পাবে সেই অথরিটেটিভ স্টাইল দেখে। ধরুন আপনি সকালবেলার প্রথম পটি – না না সকাল সকাল বাজে কথা নাই বা বললাম – ধরুন সকালবেলার প্রথম চা-টা হাতে নিয়ে সোফায় “রাতভর ঘুমোনো ক্লান্ত শরীরটা” একটু এলিয়ে দিয়েছেন এমন সময় বাজ পড়ার মত বাজখাঁই গলায় চিৎকার। আপনি ভাবছেন এই তো সবে ডাইপার চেঞ্জ করে দুধ খাইয়ে সব প্রয়োজন মিটিয়ে দিলাম। কথা হচ্ছে সে প্রয়োজন ছিল শরীরের। এখন তার আত্মার প্রয়োজন আর সেটা হল বাবার কোলে উঠে একটু মর্নিং ওয়াক করা। পিতাপুত্রীর সুসম্পর্ক সাধনের সদিচ্ছা নিয়েই সে সাশ্রু নয়নে জানাবে এই দাবী। কোলে তুলে নিলেই যে দু পাটি দাঁত বের করে এমন নিখাদ স্মাইলটি দেবে দেখেই মনে হবে আগের কান্নাটা ছিল কুমীরকান্না। দু পাটি দাঁত বের কথাটা একটু অত্যুক্তি হয়ে গেল কারণ দু চার খানা দাঁতেরই শুভাগমন হয়েছে সে মুখে।
যাকগে যাক, কথা হচ্ছিল লাথি ঝাঁটা খাওয়ার। তা হ্যাঁ, লাথিটা নিয়ম করেই খাচ্ছি। তিন বছর আগে খেতাম বড় মেয়ের কাছে। কিন্তু সে এখন রেগে গেলে রাম চিমটি, লক্ষ্মণ কিল ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে (ওর মায়ের কাছে হেভি ঝাড় খাওয়ার সম্ভাবনাটা কনসিডার করে নিজের পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে)। কিন্তু ছোট মেয়ের সে আপদ নেই। এই এক বছর ধরে হোম স্কুলিং-এ বাংলা ভাষা শিক্ষা করে নিশ্চয়ই ভাষাটাকে তার খুব ফানি ল্যাঙ্গুয়েজ লেগে থাকবে নয়তো তার মা তার ওপরে গলা চড়ালেই দু পাটি না-হওয়া দাঁত বের করে ফ্যাকফ্যাক করে হাসবে কেন? বকাঝকা ভীতির উদ্রেক না করলে বকার উৎসাহ, উদ্যম দুটোই চলে যায়। তো যা বলছিলাম, তিনি বকাঝকার তোয়াক্কা না করেই লাগাতার লাথি মেরে ছটার মধ্যে আমার ঘুমের দফারফা করে দিয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকেন। খিদের মুখে যেমন পৃথিবী গদ্যময়, ঘুমের মুখে তেমনি পৃথিবী রাত্রিময়। থুড়ি ঘুমের চোখে পৃথিবী শত্রুময়। আর সেই শত্রুই যখন ফোকলা দাঁতের হাসি দিয়ে মনজয় করার চেষ্টা করে তখন মনে গৌতমবুদ্ধসুলভ সদ্ভাবনার উদ্ভব হয় না এ কথা অকপটে স্বীকার করাই যায়। তবুও ভদ্রতার খাতিরে মুখে দেঁতো হাসি লাগিয়ে পুতুল সাইজের প্রাণীটাকে জড়িয়ে ধরে সেকেন্ড রাউন্ড ঘুমোনোর চেষ্টা করি। প্রাণপণ।