যযাতির বাড়ি বদল – রম্যরচনা

যযাতি কিন্তু পুরো দস্তুর বাঙ্গালি। তাই প্রথমেই মাথায় হনুমান টুপিটা পরে নিয়েছে। মাঙ্কি ক্যাপ হচ্ছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। শীত পড়ুক না পড়ুক, ফুল ফুটুক না ফুটুক, বসন্ত আসুক না আসুক, হাওয়ায় হাল্কা শিরশিরানি আসলেই বাঙালি মাঙ্কি ক্যাপটা চড়িয়ে নেবে। তো যযাতিও সেই মত মাথায় হনুমান টুপি, হাতে দস্তানা পড়ে, গায়ে আলোয়ান জড়িয়ে রেডি। কারণ যযাতি বাড়ি বদলাচ্ছে। অনেকদিন ধরেই বাড়ি খুঁজছিলেন। শেষমেশ siteground শহরে একটা মনোমত বাড়ি পেয়েছেন। এখনও ঢেলে সাজান হয় নি বাড়ি, কিন্তু সেসব আস্তে আস্তে হবে খন। আগে ঠিকানা ছিল দশ নম্বর ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম লেন। এখন ঠিকানা হল ১১/১ siteground স্ট্রীট। তবে আপনারা যারা যযাতির সাথে মাঝে মাঝে আড্ডা মারতে আসেন, যযাতির ননসেন্স সেন্স করতে আসেন তাদের জন্য সুখবর হল যযাতির ভার্চুয়াল ঠিকানা একই থাকছে। যযাতির সব যজমানদেরও নতুন ঠিকানায় ইম্পোর্ট করা হয়েছে।

এবারে একটু খোলসা করে বলি যযাতির ঝুলি wordpress.com থেকে siteground hosting service-এ সরান হয়েছে। কিন্তু domain name একই থাকছে – https://jojatirjhuli.net । আর যযাতির ঝুলির follower-দের import করা হয়েছে। সুধী পাঠকপাঠিকারা আপনারা যদি http://jojatirjhuli.wordpress.com -এ এসে যযাতির লেখা কেন পাচ্ছেন না ভেবে মাথা খুঁড়ছেন, দয়া করে https://jojatirjhuli.net address-এ আসুন। যযাতির ভাট বকা প্রাণ ভরে উপভোগ করুন। যযাতির ঝুলির wordpress follower-রা wordpress account-এ ঢুকলে নতুন পোস্টের খবর পাবেন। অবশ্য আপনি যদি যযাতির ঝুলির পোস্টের ই-মেল নোটিফিকেশান পেতে অভ্যস্ত, তাহলে যতদূর সম্ভব আপনাকে এই নতুন wordpress account-এ আবার করে follow করতে হবে। যযাতির এই নতুন বাড়ি ঢেলে সাজানো হবে শিগগিরি। Social networking site-এর সাথে integration আরও মজবুত করা হবে। আপনার browsing-এর সুবিধের জন্য sticky menu ইত্যাদি দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে যযাতির এই নতুন অবতার আরও বেশি মনোগ্রাহী হবে। তাই যযাতির সঙ্গে থাকুন। যযাতির লেখাতে মন্তব্য রাখুন। যযাতির লেখা শেয়ায়র করুন। যযাতির ঝুলিকে এত জনপ্রিয় করে তোলার জন্য আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।

সেল্ফি স্বরূপ

selfie

স্ব-বাবু মহারাজ যযাতিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মহারাজ এই যে দিন-রাত অনবরত সকলের মুখে একটাই শব্দ শুনতে পাচ্ছি। “সেল্ফি”। এটি কি রূপ? এটি খায় না অঙ্গে মর্দন করে?”

মহারাজ যযাতি বললেন –

উত্তম প্রশ্ন বৎস। খুবই রুচিকর আর আকর্ষণীয় এই বস্তু। ইহার পেছনে ইতিহাসও অতি মনোরঞ্জক। ধরাধামে কলিকালে এক ধরনের প্রাণির উদ্ভব হয়েছে যারা নিজেদের মানুষ বলে দাবি করে। আকৃতিগত ভাবে মানুষদের সাথে সাদৃশ্য থাকলেও বাকি সকলই ভীষণরকম বিসদৃশ। আসল মানুষ যেখানে ফুল, পাখি, গাছ, পাহাড়, নদী দেখতে ভালবাসত এই মনুষ্য-সদৃশ জীব শুধু নিজেদেরই দেখতে ভালোবাসে। আমার অনুমান এরা বেদান্তের “আত্মানং বিদ্ধি” অর্থাৎ “নিজেকে জানো” এই মহান শ্লোকটির অনুসারি। তাই এরা নিজেকে জানার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন কোণ থেকে, বিভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে দেখতে উৎসাহী। এই নতুন প্রজাতির মানুষকে উত্তরমানব বা প্রায়-মানব বলা হয়। নিজেকে জানার এই ইচ্ছা এদের মধ্যে ক্রমে ক্রমে প্রবল থেকে প্রবলতর এবং অনধিক্রম্য হয়। প্রথম প্রথম এরা নিজেকে দেখার সাধ পুর্ণ করতে চিত্রকরকে দিয়ে নিজেদের চিত্রিত করাতো। অর্থাৎ নিজের ছবি আঁকাত। কিন্তু সে অতি সময় সাপেক্ষ ও ব্যায়-বহুল বলে বেশিরভাগ প্রায়-মানবকেই আয়ানায় নিজের মুখ দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হত। পরে এরা এদের উর্বর মস্তিষ্ক খাটিয়ে এক ধরনের যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলে যার নাম “চিত্র বন্দি যন্ত্র”। অর্থাৎ এটা এক ধরণের ছবি ধরার ফাঁদ। এই অত্যাশ্চর্য যন্ত্রের সাহায্যে যে কোন দৃশ্যকে ফাঁদে ফেলে বাক্স-বন্দি করা যায়। কোন কিছুর দিকে এই যন্ত্র তাক করে একটি বোতাম টিপলেই ব্যাস। সুড় সুড় করে সে দৃশ্য এসে বাক্সের মধ্যে ঢুকে যাবে, সাথে সাথে বাক্সের দরজা বন্ধ আর ছবি বাক্স-বন্দি। সে ছবি তখন বাক্সের মধ্যে যতই ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার করুক না কেন, বাক্স থেকে বেরোনর কোন পথ নেই।

কোন কিছুর দিকে এই যন্ত্র তাক করে একটি বোতাম টিপলেই ব্যাস। সুড় সুড় করে সে দৃশ্য এসে বাক্সের মধ্যে ঢুকে যাবে, সাথে সাথে বাক্সের দরজা বন্ধ আর ছবি বাক্স-বন্দি। সে ছবি তখন বাক্সের মধ্যে যতই ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার করুক না কেন, বাক্স থেকে বেরোনর কোন পথ নেই।

কিন্তু প্রথম প্রথম সে যন্ত্র আয়তনে বৃহৎ হওয়ায় নিজের দিকে তাক করে বোতাম টেপার সুবিধে হত না। তখন সাগরে, পাহাড়ে জাদুঘরে, বাজারে সর্বত্র যেকোন চেনা-অচেনা-অর্ধচেনা লোক দেখলেই এই প্রায়-মানবদের বলতে শোনা যেত “দাদা, আমার একটা ছবি তুলে দিন না” বলে তার অনুমতির অপেক্ষা না করেই সেই ছবি বন্দি করার কলটা তার হাতে তুলে দিয়ে হাসিমুখে, ঘাড় বেঁকিয়ে বিভিন্ন নৃত্য বিভঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ত। এই ভাবেই কিছুকাল ধরে এরা নিজেকে দেখার এবং জানার তৃষ্ণা মেটাচ্ছিল। কিন্তু অপরের সাহায্যের প্রয়োজন থাকায় সর্বতোভাবে নিজেকে জানতে পারছিল না অর্থাৎ যথেস্ট পরিমাণে নিজের ছবি তুলতে পারছিল না এবং তদহেতু অবসাদে ভুগছিল। ক্রমে ক্রমে এই যন্ত্র ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে একটি আঙ্গুর ফলের মত ছোট হল। এবং প্রায়-মানবদের আর এক আবিষ্কার দুরভাস যন্ত্রের মধ্যে স্থান পেল। তখন ঐ যন্ত্র নিজের দিকে তাক করেও নিজের চিত্র বাক্স-বন্দি করা সম্ভব হল। তখন প্রায়-মানবেরা সর্বপ্রকারে নিজেকে জানতে প্রয়াসী হল। সময়-অসময়, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নায় এরা নিজেদের পানে ঐ যন্ত্র তাক করে নিজেদের ছবি তুলতে লাগল। ইহাই “সেল্ফি”। অন্যের সাহায্য ব্যাতিরেকে নিজের স্বরুপ উদঘাটন করতে পেরে ইহাদের আনন্দের অবধি থাকল না। তখন মন্ত্রিমশাই থেকে মুচি-কসাই, টাটা-বিড়লা থেকে গরিব চা-ওয়ালা, রাজনীতিকার থেকে চোর পকেটমার, রাজা-গজা থেকে ভুমিহার প্রজা, কেস্ট-বিস্টু থেকে পটল, কেয়া, মিস্টু সকলেই ঘুমনোর সময়টুকু ছাড়া সর্বক্ষন সেল্ফি তুলতে থাকল।

তখন মন্ত্রিমশাই থেকে মুচি-কসাই, টাটা-বিড়লা থেকে গরিব চা-ওয়ালা, রাজনীতিকার থেকে চোর পকেটমার, রাজা-গজা থেকে ভুমিহার প্রজা, কেস্ট-বিস্টু থেকে পটল, কেয়া, মিস্টু সকলেই ঘুমনোর সময়টুকু ছাড়া সর্বক্ষন সেল্ফি তুলতে থাকল।

এমনকি কিছু কিছু প্রায়-অতিমানব গতিমান ট্রেন-এর সামনে বা উঁচু ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে সেল্ফি দ্বারা নিজেকে জানার প্রয়াস করে হাসি মুখে প্রাণ বিসর্জন দিতেও পিছপা হল না। শুধু তাই নয়, ইহারা এই পর্বত প্রমাণ সেল্ফি বা নিজস্বি সকলকে ইহাদের আর একটি আবিষ্কার আন্তর্জালের মাধ্যমে মুহুর্তের মধ্যে মর্তলোকের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে একই সাথে এরা সকল ভুভাগে দৃশ্যমান হল। এবং এক ধরনের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সবাই একে অপরকে অপূর্ব সুন্দর কিম্বা সুন্দরী বলে বাহবা দিয়ে নিজেদের আত্মগরিমা পুনঃ পুনঃ উজ্জীবিত করতে থাকল। তখন প্রায়-মানবেরা স্বোহম অর্থাৎ “আমিই সেই ব্রহ্ম” সেই পরম বোধে উত্তীর্ণ হয়ে আত্মজ্ঞানী হল। সচ্চিদানন্দের কৃপায় সৎ অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে নিজের চিৎশক্তি অর্থাৎ ইচ্ছাশক্তির সহায়তায় সেল্ফি আবিষ্কার করে এই প্রায়-মানবেরা আনন্দ লাভ করল এবং অনন্ত-আনন্দ-কারণ-সাগরে নিমজ্জিত হল।