আমার তিন বছরের কন্যার ভারি টিভি দেখার নেশা বেড়ে যাচ্ছে। তাই আদর্শ বাবার মত ঠিক করলাম ওকে একটু বই পড়ে শোনাতে হবে। আমেরিকানরা তো সন্তানের জন্ম থেকেই বাচ্চার ঘুমোনোর আগে তাকে বই পড়ে শোনায়, তাতে নাকি সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুদের vocabulary বাড়ে। আমি সেই দুঃসাহস করি নি। কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে সানাইকে একটু স্টোরি রীড করে শোনাতে সচেষ্ট হই। তো আজকের গল্প Beauty and the Beast।


বেশ অনেকটা পড়ে ফেলেছি গল্পটা। এক ডাইনি রাজপুত্রকে অভিশাপ দিয়ে কদাকার পশুমানবে, অর্থাৎ একটা Beast-এ পরিণত করেছে। এদিকে Beauty-র বাবার খুব দুঃসময়। ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে ভাঁড়ে-মা-ভবানী হয়ে গেছে। তাও আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া। জাহাজ উদ্ধার করতে গিয়ে ফেরার পথে Beast-এর প্রাসাদে আশ্রয় নেয়। ভুড়িভোজ খেয়েটেয়ে, রাত্রে নরম বিছানায় ঘুমিয়ে টুমিয়ে সকালে যখন Beauty-র জন্য Beast-এর গোলাপ বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়ে নিয়েছে তখন Beast-এর মাথা যাকে বলে একেবারে ভিসুভিয়াস। Beauty-কে পাঠিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি দিয়েছে ওর বাবাকে। রুদ্ধশ্বাস ব্যাপার। বাড়িতে এসে সব ঘটনা বলায় Beauty স্বেচ্ছায় Beast-এর প্রাসাদের উদ্দেশে যাত্রা করছে। Beauty কাঁদছে। Beauty-র বাবা কাঁদছে। আকাশ বাতাস পাখি নদী সবাই কাঁদছে। সমস্ত ক্রন্দসী কাঁদছে বলা চলে। এরকম একটা ভয়ানক বিষণ্ণ মুহূর্তে সানাই জিজ্ঞেস করে বসল, Beauty কাঁদছে কেন বাবা? ও কি ভাতু খায় নি? মাম্মা বকেছে?
লে… সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি? ভাতু-না-খাওয়া-জনিত-মাম্মার-বকা ছাড়াও যে মানুষের দুঃখের আরো কারণ হয় বোঝাতে চেষ্টা করি। সিকুয়েন্স অফ ইভেন্টটা আবার একবার রিপিট মারি। কিন্তু সানাই অলরেডি Beauty-র কান্নার কারণ জানার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। শেয়ার মার্কেটের থেকেও তড়িৎ গতিতে মনের মতি বদলায় ওর। অতএব চরৈবেতি। পরে কি হল জানতে চায়। বাকি গল্পটুকুও পড়ে ফেললাম। Beast-এর Beauty-র প্রতি সহৃদয় ব্যবহার (সুন্দরী মেয়ে পেলে কে আর extra nice ব্যবহার করে না – মনে মনে ভাবছি)। কয়েকদিন Beast-এর প্রাসাদে থাকার পরে Beauty-র বাবার জন্য মন খারাপ। Beast Beauty-কে বাড়ি আসতে অনুমতি দেয়। Beauty বিরহে Beast-এর এই যায় সেই যায় অবস্থা। Beauty-র প্রত্যাবর্তন আর তার চোখের জলে Beast-এর শনির দশা কেটে আবার রাজকুমারে রূপান্তর। অতঃপর Beauty আর রাজপুত্রের বিয়ে-সাদি-সানাই (ইয়ে মানে এটা বাদ্যযন্ত্র সানাই। কথাযন্ত্র সানাই না) । গল্পটা সবাই জানে। কিন্তু মুস্কিল হল গল্পশষে সানাইয়ের প্রশ্নগুলোতে।

সব শুনেটুনে সানাই বলল বাবা, প্রিন্সের মাম্মা কই? খুব-ই চাপের প্রশ্ন। গল্পের লেখক ও পাঠককুল কেউ কোনদিন Beast-cum-রাজপুত্রের বাবা মা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। আগডুম বাগডুম একটা বললাম। পরের প্রশ্নগুলো এইরকম –


বিউটির বাবা কই?
বাড়িতে আছে।
কেন?
কারণ Beauty Beast-এর রাজপ্রাসাদে গেছে তাই।
রাজপ্রাসাদে গেছে। ও। কেন?
কারণ Beast-এর শরীর খারাপ হয়ে গেছে ( গল্পপাঠকালীন কিছুই বোঝাতে পারিনি ভেবে আমার রক্তচাপ বাড়ছে) ।
ও শরীর খারাপ? Beast ডক্করের কাছে যাবে? ইনজেকশান দেবে ডক্কর?
“সেটা দিতেও পারে। কিন্তু এখানে সেরকম লেখা নেই।” গল্পে ডাক্তার বদ্যি আমদানী হবার আগেই আমি তাড়াতাড়ি আর একবার ঘটনাপ্রবাহ বলে দিই। “Beauty-র বাবা Beast-এর বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়েছিল তো। তাই Beast রেগে গিয়ে Beauty কে আসতে বলেছিল।”
বাবা গোলাপ ছিঁড়েছিল? কেন?
আরে Beauty একটা red rose চেয়েছিল না? এই যেমন তুমি কিছু চাইলে বাবা এনে দেয় না?
Beauty red rose কেন চেয়েছে বাবা?
আরে বললাম না, বিউটির বাবা ওকে জিগেস করল, তুমি কি গিফট্ নেবে। তখন ও একটা রক্তগোলাপ চাইল।
ক্রিস্টমাস গিফট্?
হ্যাঁ, ক্রিস্টমাস গিফট্।
Oh. I see.
যাক বুঝেছে। গল্পটা বোঝাতে পেরেছি ভেবে আমি মনে মনে গর্বিত বোধ করি যাকে বলে basking in glory. পরে সানাই-এর থেকে শুনে দেখলাম, গল্পটা আসলে এরকম।


Beauty ভাতু খায় নি। তাই Beauty-কে তার মাম্মা বকেছে। তাই বিউটি কাঁদু করেছে। তখন বিউটির বাবা christmas gift দেবে বলেছে। Beauty-র বাবা Beast-এর বাড়ি গিয়ে ফুল ছিঁড়েছে। তাই Beast বিউটিকে timeout দিয়েছে (যাঃ বাবা, টাইম আউটের কথা বললাম কোথায়? Beauty and the beast-এর গল্পের সঙ্গে এ যে দেখছি নিজের original creation punch করে দিচ্ছে)। বিউটি timeout পেয়ে কাঁদু করেছে। Tears লেগে Beast প্রিন্স হয়ে গেছে। তখন প্রিন্স-এর মাম্মা এসেছে। এসে বিউটিকে ঠিক করে ভাতু খেয়ে নিতে বলেছে (যাক বাবা এটা বলে নি প্রিন্স-এর মাম্মা এসে প্রিন্সকে বলেছে Beauty-র সারা জীবনের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে)।

……এতক্ষণের পণ্ডশ্রমের কথা ভেবে ততক্ষণে আমার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।