আই-টি ভাইটি

[সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত সকল বন্ধুদের কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এ লেখার উদ্দেশ্য নিছক হিউমার সৃষ্টি, কাউকে আঘাত দেওয়া নয়। আর আমি নিজেও যেহেতু একই পেশায় নিযুক্ত, লেখাটিকে খানিকটা আত্মসমালোচনা হিসাবেও ধরতে পারেন। লেখাটির স্টাইল অবশ্যই বঙ্কিমবাবুর “বাবু” রম্যরচনার থেকে অনুপ্রাণিত।]

স্ব বাবু যযাতিকে কহিলেন হে নৃপশ্রেষ্ঠ শুনেছি কলিকালে আই-টি পিপল নামক এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হবে। এঁদের আকৃতি প্রকৃতি ও বিকৃতি আপনি অনুগ্রহপূর্বক বর্ণনা করুন।

যযাতি বলিলেন, হে নরবর, আমি এই কপি-পেস্ট-কর্মকুশলী, আত্মাভিমানী, বিদেশবিলাসী আই-টি পিপল গণকে বর্ণনা করব। আপনি শ্রবন করুন।

যাঁরা পড়াশুনায় লবডঙ্কা, সাফল্য বলতে শুধু বোঝে টঙ্কা আর সদাই যাঁদের প্রাণে ফায়ার হওয়ার আশঙ্কা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের দেশের থেকে বিদেশে বেশি মতি, অনসাইট পেলে মনে করে পূর্বজন্মের সুকৃতি, একবার বিদেশে পৌঁছতে পারলেই মুছে ফেলে ডার্টি দেশের সব স্মৃতি তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের বল প্রোগ্রামিং-এ এক গুণ, প্রেজেন্টেশানে দশ গুণ, জব ইন্টারভিউ দিতে গেলে শত গুণ আর অ্যাপ্রাইজাল ইন্টারভিউতে সহস্র গুণ তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা দেশোদ্ধার করেন ফেসবুকে আর একই সাথে সিনেমা দেখেন ম্যাকবুকে তারাই আই-টি পিপল। যাঁরা অফিসে করেন কপি-পেস্ট, বাড়িতে থাকলে কাউচে বসে নেন হালকা রেস্ট আর প্রবল কর্তব্যপরায়ণতাজনিত কারণে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে যারা নিজের বাড়িতে নিজেই গেস্ট তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের নিজের স্ত্রীতে অনাগ্রহ, পরস্ত্রীতে কিঞ্চিত অধিক আগ্রহ, সহকর্মী পরস্ত্রীতে সর্বাধিক আগ্রহ তাঁরাই আই-টি পিপল। যারা বঙ্গভাষায় “নট সো গুড”, ব্রায়ান অ্যাডামস শোনেন “টু আপলিফট মুড”, আর অফিসের “বাচ্চা ছানাপোনা”-দের সাথে অতিমাত্রায় রুড তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা করেন সামান্যই, বন্ধু ও বাবা-মা-স্ত্রীকে কিছু বাড়িয়ে বলেন, বায়োডাটাতে আরো কিছু বাড়িয়ে লেখেন আর ইন্টারভিউতে নিজের কৃতিত্ব ঘোষণায় টেনিদা-ঘনাদাকেও হার মানান তাঁরাই আই-টি পিপল।

এনারা কপি-পেস্টে পারদর্শী হবেন। অন্যের কোড ঝাঁপার ব্যাপারে এনাদের দক্ষতা সর্বজনবিদিত হবে। যাঁরা সকাল নটা থেকে চারটে অব্দি ক্যাফেটেরিয়াতে, পিংপং টেবিলে ও সুন্দরী সহকর্মীদের ডেস্কে দৃশ্য হন আর বিকেল চারটে থেকে রাত্রি নটা অব্দি আপন ডেস্কে বসে আইপিএল ফলো করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। রাত্রিকাল যাঁরা রতি কার্যে নয় প্রোডাকশান সাপোর্টে ব্যয় করবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। বিমুগ্ধ বাবা মা-রা যাঁদের পাঁচে পাঁচ রেটিং দেবেন, নট-সো-ইম্প্রেসড বস পাঁচে তিন রেটিং দেবেন ( সাথে জ্ঞান দেবেন You need to exceed expectation) আর বীতশ্রদ্ধ স্ত্রী-রা পাঁচে শুন্য রেটিং দেবেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁদের ডেডলাইন ডেড হয়ে যায় বছরে সহস্র বার এবং তজ্জনিত কারণে ডেডলাইন এক্সটেন্ড হয় সহস্র এক বার তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা অনসাইট যাওয়ার জন্য বসের ঘরে গিয়ে প্যানপ্যান করেন, পদোন্নতি প্রাপ্ত হতে বসের বসের ঘরে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেন এবং এই সকল প্রাপ্ত হলে ফটাস করে লেঙ্গি মেরে কোম্পানিটি ছেড়ে দেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা প্রাতঃকালে বসের গালি সেবন করেন, সন্ধ্যাকালে স্ত্রীয়ের গালি সেবন করেন এবং সপ্তাহান্তে সেই সকল দুঃখ ভুলতে সুরা সেবন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। দেবী সরস্বতী কৃপা করে এদের মাথার বাঁপাশে একটি উইকিপিডিয়া ফিট করে দেবেন। তাই পৃথিবীর সকল সমস্যার সমাধান এঁদের করতলগত হবে। প্রধানমন্ত্রী নৈঋত না ঈশান কোনদিকে বসে পটি করলে দেশের উন্নতি হবে, প্রাণায়াম করার সময় হংসের মত প্যাঁক প্যাঁক না সারমেয়র মত ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক করলে বেশি উপকার হয়, বিমুদ্রীকরণ না করে ব্যাঙ্কগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ করলে দেশের কতটা উন্নতি হত এঁদের নখদর্পণে হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সম্বন্ধে যাঁদের অগাধ এবং সমান জ্ঞান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সংস্কৃতিপ্রীতি প্রমাণ করতে (বছরে একবার) বইমেলা যান এবং বই কিনে এনে সেলফে সাজিয়ে রাখেন, দেশপ্রীতি প্রমাণ করতে ঘন ঘন ফেসবুকে জ্ঞানগর্ভ আপডেট দেন আর বন্ধুপ্রীতি প্রমাণ করতে শুক্কুরবারের সন্ধ্যায় সুরাপান পূর্বক ধেই ধেই নাচেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা পরার্থে অচেতন, স্বার্থে সচেতন আর স্বাস্থ্যে অতিচেতন তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের এক অত্যাশ্চর্য দক্ষতা হবে যে এনারা খাবার দেখলেই তার ক্যালরি কাউন্ট বলে দিতে পারবেন।

যাঁরা বাবা-মার সাথে বাংলায় বাক্যালাপ করেন, স্ত্রী, বন্ধু এবং বন্ধুস্ত্রীদের সাথে বাংরেজিতে বাক্যালাপ করেন এবং নিজেদের সন্তানদের সাথে ইংরেজিতে বাক্যালাপ করেন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা স্বভাবে ভোগী, বসের কাছে ছুটির দরখাস্ত করার সময় রোগী এবং ক্লায়েন্ট-সাইড ম্যানেজার-এর কাছে যোগী রূপে প্রতিপন্ন হতে চান তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা কোডিং করার সময় চ্যাঙ-মুড়ি-কানা আর কোড-রিভিউ করার সময় পুরো ষোল আনা তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা সারাজীবন পরবাসে থেকে ফাদারস ডে আর মাদারস ডে তে বাবা-মার সাথে একটি করে ছবি ফেসবুক দেওয়ালে চিপকে বাবা-মার প্রতি কর্তব্য সাধন করেন, ভ্যালেন্টাইন ডে-তে গোলাপ সহযোগে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য সাধন করেন এবং আইপ্যাড কিনে দিয়ে সন্তানের প্রতি কর্তব্য সাধন করেন তাঁরাই আই-টি পিপল।

যাঁরা নিজের ফাঁকিবাজির জন্য বসের কাছে গিয়ে টীমকে দায়ী করেন, টীমের ফাঁকিবাজির জন্য বসের বসের কাছে গিয়ে বসকে দায়ী করেন অথচ টীমের সামনে টীমের আর বসের সামনে বসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন তাঁরাই আই-টি পিপল। যাঁরা প্রোগ্রামিং-এর মত ইডিওটিক কাজ করা থেকে বাঁচতে চাকরিতে ঢোকার দু বছরের মধ্যে নিজেকে পিপল পার্সন দাবি করে ম্যানেজার হতে চান, চার বছরের মাথায় কার লোন নিয়ে গাড়ি কেনেন, পাঁচ বছরের মাথায় হাউস লোন নিয়ে বাড়ি কেনেন এবং চাকরির বাকি বছরগুলো কাটিয়ে দেন সেই সব লোন শোধ্‌ করতে তাঁরাই আই-টি পিপল। এঁদের চোখে এদের বাবা মায়েরা এক্সপায়ারি ট্যাগ লাগানো এবং আউট-অফ-ডেট, স্ত্রী কাংস্যবিনিন্দিতকন্ঠী ও স্বামীমাংসভোজী এবং সন্তান আইনস্টাইনের থেকেও খরতর বুদ্ধির অধিকারী। এঁদের স্ফীত মস্তিষ্ক গোময় দ্বারা আর স্ফীত উদর স্নেহ জাতীয় পদার্থ দ্বারা নির্মিত হবে।

স্ববাবু বলিলেন “রোসেন রোসেন স্যার। এতদূর শুনে আমার প্রতিটি রোমকূপে রোমাঞ্চ হচ্ছে, হৃদয়ে অদ্ভুত আনন্দবারি সিঞ্চিত হচ্ছে। স্থির বিশ্বাস হচ্ছে এই আই-টি পিপল দ্বারা দেশ ও দশের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হবে। আশীর্বাদ করুন প্রভু যেন পরজন্মে আমি হই বনমালী ইয়ে থুড়ি মানে আই-টি পিপল।”

যযাতি বলিলেন “তথাস্তু”।

[প্রকাশিত – বাতায়ন ধারাবাহিক ১ সংখ্যা]

Facebook Comments

Leave a Reply