কবি কি দেখছেন?

এক দিদি বললেন, তোমরা যারা লেখো, তোমাদের মাথার তন্ত্রীগুলো অন্য সুরে বাঁধা। আমি দড় কোনও লেখক নই। তবে লেখকের মাথা সম্বন্ধে দু এক কথা জানি। লেখকের মাথা অন্য তন্ত্রীতে বাঁধা? সত্যি কি তাই? লেখক/কবি কি ভাবে দেখে? কোন্‌ ঘটনা বা অঘটনকে সে করে নেয় কথকতার উপাদান? কেমনে সে ক্রমাগত গল্প খুঁজে পায় দৈনন্দিন একঘেঁয়েমি আর ক্লিন্নতায়? 

কারণ অন্যে যেখানে জীবন দেখে, লেখক সেখানে যাপন দেখে। অন্যে যেখানে গন্তব্য দেখে, লেখক কেবল দেখে একটা পথ মাত্র যা আদতে কোথাও যায় না। এক শাশ্বত বর্তমানে সে পথ অনন্তকাল ধরে শুধুই থেমে আছে। শুধুই থেমে আছে। অন্যে যখন দেখে বস্তুনিচয়, লেখক দেখে একটি প্রবাহ মাত্র। পরম শূন্য থেকে নিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, পরম শূন্যেই স্থিত হচ্ছে আর সেই পরম শূন্যেই নিশ্চিতভাবে বিলীন হচ্ছে সেই সব বস্তু ছায়াপ্রতিমারা। অন্যে যখন দেখে কঠোর বাস্তব, কবি দেখেন প্রপঞ্চ। কবি বোঝেন, এ সকলই সতত পরিবর্তনশীল, অন্তঃসারশূন্য এবং স্বাধীন সত্তাবিহীন। ছায়ার মত চিদাকাশে ফুটে উঠছে নিয়ত আর নিয়ত অপসৃত হচ্ছে।। অন্যে যেখানে ক্রমাগত একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির খোঁজে সঙ্গ খুঁজে ফেরে অন্তর্জালে, সমাজমাধ্যমে, কবি সেখানে অনেকের সঙ্গে মিশেও সর্বতোভাবে অসঙ্গ। অন্যে যেখানে নিজের ব্যক্তিগত গল্পনদীর মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে, কবি দেখতে পাচ্ছে জীবন নদীবক্ষ আর নিরন্তর উৎসারিত ঊর্মিমালা। ঢেউ উঠছে, ঢেউ ভাঙছে। ঢেউ উঠছে, ঢেউ ভাঙছে। থুপ থুপ থুপ। আদি ও অনন্ত জল থেকে ঢেউ হয়ে জন্ম নিচ্ছে নাম-রূপ আর ক্ষণিক বাদে জল হয়ে মিশে যাচ্ছে তার সৃষ্টি উৎসে। তখন সে নামহীন, রূপাতীত। এক মুহূর্তে পৃথক অস্তিত্ব, অপৃথক পরমুহূর্তে। অন্যে যেখানে সারবত্তা খুঁজে পেতে মাথা খুঁড়ছে, কবি দেখছেন সংসার। সংসার কি? যা ক্রমাগত সরে সরে যায়, সেই তো সংসার। অন্য অর্থে যা চক্রাকারে আবর্তিত হয়, তাই সংসার। সেই সংসারে সং সাজা যায়, কিন্তু সার খুঁজে পাবে কেমন করে? 

সার খোঁজা শেষ হলে তবে সার খুঁজে পাওয়া যায়। এই অস্তি এমনই স্ববিরোধী। তাই কবি/শিল্পী/লেখক শব্দে, তুলিতে, আলোছায়ায়, সুরে ধরে রাখে এই নিয়ত পরিবর্তনশীল শাশ্বত বর্তমানের ঠিক যতটুকু ধরে রাখা যায়। সেই শব্দরতিও ক্ষণিকের। সে শব্দমালাও ডুবে যাবে এক কৃষ্ণগহ্বরে যার নাম মহাকাল। মহাকালের গর্ভে বিলীন হবে সব যা দৃশ্য ও অদৃশ্য, সব যা শ্রুত ও অশ্রুত, সব প্রেম, সব আবিষ্ট থিরি থিরি কাঁপা অধর, সব যুথীমালা, সব অবাধ্য কবরীগুচ্ছ, সব বংশলতিকা, সব রাজপাট, সব চক্রান্ত, সব অসূয়া, সব নীহারিকা, সব নক্ষত্র, সব পাখি, সব নদী, এমনকি সব কবিতা। যা থেকে যাবে সে এক আদিম কবিতা। সে কবিতার রচয়িতৃ এক সন্ন্যাসিনী যে সঞ্চয় করতে শেখে নি।

Leave a Reply