সানাই রাত্রি সারে এগারটার সময় ডাক ছেড়ে সানাই ধরলো। মটকা এতে কার না সটকে যায় বলুন? কি না তার মাম্মা তার সাথে কথা বলবে না বলেছে! মাম্মার কথাটা যে গুরুতর অনৃত বাচন, মানে বাংলায় বললে নেহাত বাজে হুমকি, সে কথা বোঝানোর ব্যাপারে যত্নশীল হয়ে ব্যর্থ হলাম। মানে কোন মা আর মেয়ের সাথে কথা না বলে…তাও বিশেষতঃ কন্যা যখন জামাই সহকারে বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে বলে নি যে, “কালীঘাটে আড়াইশ টাকা প্যাকেজে বিয়েটা সেরে এসেছি, এই তোমার জামাই, একে আশীর্বাদ করো।” আমার কন্যাটি নেহাত অর্বাচীন, মাত্র পাঁচখানি বসন্ত পার করেছে। ঘটার মধ্যে ঘটেছে, ওয়েল যারা সানাই নামক বিচিত্র প্রাণীকে জানেন তারা অনুমান করে নিয়েই থাকবেন, যে তিনি নৈশাহার বা বাংলায় যাকে বলে ডিনার সেটি যথেষ্ট পরিমাণে আত্মস্থ করতে অরাজী হয়েছেন। খাদ্যরসিকের বিপরীত শব্দ যদি খাদ্য-বেরসিক হয়, তবে সানাইকে খাদ্য বেরসিক বললে শব্দটির ওপর যথেষ্ট দায়ভার অর্পণ করতে হয়। কারণ যে কোনো খাবারের প্রতি সানাইয়ের যেটা আছে সেটা হল অবিমিশ্র ঘৃণা (শুধু ক্যান্ডি, চকলেট এবং বেরী বাদ দিয়ে)। পলান্ন অর্থাৎ কিনা পোলাও-এর মত উপাদেয় খাদ্য যা আমি “লাও লাও” করে কেজি দুয়েক সাবড়ে দিলাম এবং সর্বোপরি যা কিনা আমার এগার বছরের সাত পাকে বাঁধা বৌ নিজ হস্তে পাকিয়েছেন সেটা যখন সর্বসাকুল্যে তিন গ্রাস খেয়ে সানাই স্বমূর্তি ধারণ করল, অর্থাৎ কিনা পরের গ্রাস মুখে নিয়ে দাঁতের চারপাশে মাজনের মত জড়ো করে রেখে দিল এবং শত অনুরোধ, উপরোধ, অনুনয়, বিনয়, উপদেশ, আদেশেও দাঁত নামক হামান-দিস্তাটাকে চালানো থেকে বিরত থাকল, তখন যে মেজাজের চড়াই উতরাই হয় সেটা বাবা মা মাত্রই জানেন। তবে তার দুই বৎসর বয়সী সহোদরার দেখলাম বেশ সহৃদয় পরান। গালে টোবলা করে খাবার নিয়ে ঘুরছে আর মাঝে মাঝে এসে তার ক্রন্দনরতা দিদিকে তার খুদে খুদে হাত দিয়ে আদর জাতীয় কিছু একটা করে যাচ্ছে। নিষ্ঠুর প্রাণ বাবা ও মায়ের কাছে খাওয়ানোর নামে বিজাতীয় যন্ত্রণা পেয়ে সানাই মনোযোগ সহকারে বোনের আদর গ্রহণ করছে এবং সেই সুযোগে বোনুর সাথে একটু খেলেও নিচ্ছে। কিন্তু বোনু ব্যস্ত মানুষ। তাকে বিবিধ কার্য সমাধা করতে হয় যেমন দেওয়ালে রঙ পেন্সিল দিয়ে শিল্প কর্ম করা, সোফার ওপর থেকে টারজান স্টাইলে ঝাঁপানো, বাবার চটি জুতো মহারাজ ভরতের স্টাইলে মাথায় করে ঘুরে বেরানো ইত্যাদি। কর্ম না বলে সেগুলোকে অপকর্ম বলাই ভাল কিন্তু বাসুদেব বলে গেছেন শুধু কর্মতেই আমাদের অধিকার, ফলে নয়। ফলে ফলেই বোনু কর্ম করে যায় ফলের চিন্তা না করে। তাই তার দিদিকে সান্ত্বনা দান সাময়িক। সে নিজকার্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই সানাই আবার ডুকরে কেঁদে উঠছে। আমি নেহাত হৃদয়হীনের মতই বলে ফেলি সানাই আইদার কাঁদো, নয় খেলো, দুটো একসাথে কোরো না। শুনে সানাইয়ের কান্নার লয় এবং তান দুই দ্বিগুণ হল।

সানাই খেতে কেন চায় না, ক্যাটরিনা কি করিনার মত ছিপকলি থাকার অভিপ্রায়ে না বাবা মাকে পেরেন্টিং-এ ব্যর্থতার দোষিমন্যতার নরককুণ্ডে নিক্ষেপ করতে তা জানি না কিন্তু সানাইয়ের সানাইয়ের বিস্তারে কানে তালা লাগার জোগার। এমন কি অমন সহৃদয় সহোদরাটিও সান্ত্বনা জানাতে কাছে ঘেঁষছে না আর। দুই সন্তানের পিতৃপদ লাভ করার পর থেকেই আমি ব্রহ্মপদ লাভ করে গেছি অর্থাৎ কিনা নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত হয়ে গেছি। তবে কিনা বুদ্ধদেবকে তো সংসার করতে হয় নি, তাই এমন কাকচিল তাড়ানো চিৎকারে তার ধৈর্যচ্যুতি যে ঘটতই না, এমনটা হলফ করে বলা যায় না। আমি সানাইকে বলি সানাই কাঁদতে হলে গ্যারেজে গিয়ে কাঁদো। এও নেহাত হুমকি। আমি পাষণ্ড ঠিকই তবে এতটাও নই যে আমার ধনাত্মক পাঁচের বাচ্চাকে ঋণাত্মক বারোতে গ্যারেজে ছেড়ে আসব। কিন্তু এই নেহাত হুমকিতেও হিটে বিপরীত হল। আজ্ঞে না, ওটা টাইপো নয়, আমি হিতে বিপরীত নয়, হিটে বিপরীতই লিখেছি। সানাই এসে আমায় গুমগাম দু ঘা হিট করে তারপর এমন শোকাকুলা হল যে মেঘনাদবধ হওয়ার পর পঞ্চসতীর-এক-সতী দেবী মন্দোদরী অত শোকাকুলা হয়েছিলেন কিনা সন্দেহ হয়। বোনু দুটো গাল টোপাকুল করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনিও দিদির পদাঙ্ক অনুসরণ করে আহার্যসামগ্রী গলাধঃকরণ করার বদলে গালের দুদিকে সঞ্চয় করে রাখতেই বেশী পছন্দ করেন। এবং সব থেকে ছোট হওয়ার ট্রাম্প কার্ড থাকায় এমন গর্হিত অপরাধ করেও খুব বেশি বকুনি খান না। তো তিনিও ত্রস্তভঙ্গিতে মাঝে মাঝে দিদির দিকে তাকাচ্ছেন কিন্তু কাছে ঘেঁষছেন না। আমি সংসার প্রতিপালন করতে কেন নেমেছি ভেবে নিজের কপালকে দুষছি, এমন সময় ওপর থেকে দেবীকণ্ঠ শ্রুত হল মানে আমার স্ত্রীয়ের গলা আর কি।

সানাই তোমায় আর খেতে হবে না, না কেঁদে মুখ ধুয়ে শুয়ে পরো, কাল সরস্বতী পুজোতে তোষানির বাড়ি যেতে হবে।

দেবী হংসবাহিনী বেদজ্ঞা এবং পরমার্থলাভে সহায়িকা জানা ছিল কিন্তু তিনি যে এমন সংসারে শান্তিবিধানকারী তা জানা ছিল না। সরস্বতী পুজোয় যাওয়া হবে (এবং খেতে হবে না) শুনেই শোকাকুলা সানাই চোখ টোক মুছে বলয়ে ফেললে, ইয়েয়ে সরস্বতী পুজো। যে অকল্পনীয় দ্রুততায় চোখের তরল বাষ্পীভূত হয়ে গেল, কান্নার ভুত যেভাবে ভুতপূর্ব হয়ে গেল, যেভাবে শ্রাবণের মেঘ সরে গিয়ে চোখে রোদ্দুর ফুটল, তাতে সেই রোদনাশ্রুর অথেনটিসিটি নিয়ে যদি আমার চল্লিশ বছরের বৃদ্ধ মনে সংশয় জেগে থাকে, তবে তার জন্য নেহাৎ আমার বার্ধক্যকেই দুষতে হবে। যাই হোক,

আমি মনে মনে বললাম,

জয় জয় দেবি চরাচর সারে
কুচজুগ শোভিত মুক্তা হরে
বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে
ভগবতী ভারতী দেবি নমস্তে।