মে মাসটা আমেরিকায় বৃষ্টিমাস। সকাল থেকে প্রায় দিনই ঝিরি ঝিরি করে ঝরতে থাকে শ্রাবণ। সূর্যের আলসেমি ছড়িয়ে যায় নিজের শরীরেও। চোখ খুলতে চায় না। কম্বলের তলায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে বর্ষার চপল পায়ের নিক্কণ শুনি। আবার এক এক দিন হয়তো প্রকৃতির সঙ্গলাভের ইচ্ছায় জ্যাকেট চড়িয়ে বাড়ির বারান্দায়। সারারাত বৃষ্টি হয়ে সবে হয়তো আকাশ একটু ফর্সা। সদ্যস্নাতা প্রকৃতির কি যে অদ্ভুত মাদকতা সে কেমনে ভাষায় ধরি? আমার যদি “শক্তি” থাকতো বলতাম, “এখানে মেঘ গাভীর মত চরে”। সত্যি আসন্নপ্রসবা নারীর মত সময় যেন শ্লথ হয়ে আসে। সময়। যা প্রতিদিন ছল করে আমায় আমার থেকে দূরে করে দিতে থাকে, যে প্রতিদিন আমায় মিথ্যে আশ্বাস দেয়, একদিন নীড়ে ফেরা হবে, সে যেন থমকে দাঁড়ায়। সে যে কি অনুভূতি, ঠিক বলা যায় না। ভাষা তুমি এত অসম্পূর্ণ কেন? শব্দ তুমি এত অপারগ কেন? অক্ষর তুমি এত সীমাবদ্ধ কেন? ভাবি। ভাবি আর দেখি একটা ত্রিমাত্রিক কুয়াশার মিহি জাল ঝুলে আছে আলগোছে। তার মধ্যে ঘুমে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে ভেজা বাতাস আর ঠান্ডার অদৃশ্য কোরক। আর থাকে পাখিদের কুহুগিতালী।  যে কল্পনাপ্রবণ কবিমন পাখিদের ডাকে প্রভাত রাগিণী খুঁজে পায় সে আমি নই। আমি দেখি ওদের মধ্যে লেশমাত্র হিউমান সিভিলিটি নেই। কেউ কারু কথা শোনার জন্য দু দন্ড চুপ থাকছে না। অনর্গল শুধু নিজের কথা। সবাই মিলে একসাথে বকর বকর করে এমন একটা শোরগোল তৈরী করেছে যে কারুর কথাই ঠাহর হয় না। আন্দাজে বুঝে নিতে হয় ওই বুঝি কোনো মা তার ছানাটিকে ওড়ার সহজপাঠ দিচ্ছে। ওইখানে কোনো নবীন প্রেমিক তার সদ্যপ্রেমিকাকে একটু মির্জা গালিব শুনিয়ে দিচ্ছে। ওইখানে হয়তো কয়েকটা ছোট ছোট পাখি-ছেলে-মেয়ে জীবনের পাঠ নিতে বসে অনর্গল নিজেদের মধ্যেই বকে চলেছে। সব মিলিয়ে মাছের বাজার। না। পাখির বাজার বলা চলে। এক অপার্থিব, অনাস্বাদিত, অলীক পাখির বাজার। জীবনের এমন কলরোল শুনতে শুনতে বুঁদ হয়ে আসি। 

আমার এক নামকরা কবি বন্ধুকে একবার এদেশের গাছ চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি উৎসাহিত হন নি তেমন। প্রথমে মনে হয়েছিল, এ কেমনে সম্ভব? কবি অথচ প্রকৃতিপ্রেমী নয়? পরে ভেবে দেখেছি, সে তাঁর দোষ নয়। নগর কলকাতায় বড় হয়ে ওঠায় তাঁর কখনো প্রকৃতির সাথে সখ্যতাই স্থাপিত হয় নি। আমার অন্য এক কবিবন্ধু বলেছিলেন, কলকাতায় বড় হয়ে ওঠায় তিনি গাছ বলতে দেখেছেন মানি প্ল্যান্ট আর পাখি বলতে দেখেছেন কাক। মফস্বলের কবিরা দেখি গাছ বাঁচানোর অ্যাক্টিভিজিমের সঙ্গে যুক্ত। সত্যি, এ হিসেবে আমরা যারা মফস্বলে মানুষ তারা কিছুটা গৌরব করতে পারি। আমেরিকার বৃষ্টিভেজা এক ভোরে কিচিরমিচির পাখিদের ডানায় ভর করে ছোটবেলায় উড়ে গিয়ে দেখি, বর্ষাকাল। এক প্রকান্ড কদম গাছ ফুলভারে নত। মাটিতে আলগোছে পড়ে কদম ফুল। তার পুষ্পিত কেশরগুলো নবঘন শ্যাম দর্শনে শ্রীরাধিকার মতই শিহরিত। ওই তো পাশেই একটা কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচুড়া জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। এখন তাদের ফুল নেই। গ্রীষ্মে ছিল তাদের পুষ্পগৌরব। লাল আর হলুদের আশ্চর্য হোলিখেলা শেষ হয়েছে বটে কিন্তু তাদের ভেজা ভেজা সঘন আচ্ছাদন কিছু কম মনোহর নয়। ওই তো, এক বিশাল বকুল গাছ এক প্রাচীন চিলের মত ডানা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বকুলের গন্ধ আরামদায়ক ঈষদোষ্ণ আলোয়ানের মত ছড়িয়ে আছে গাছের নীচে। এখনও দেশে গেলে যাই ছোটবেলার শহর খড়গপুরে। কিন্তু সে স্থানের সে রূপ আর নেই। আর পাঁচটা উঠতি শহরের মতই সে ঝরিয়ে নিয়েছে বৃক্ষমেদ। ইঁট-কাঠ-সুড়কির পেশী আস্ফালন দেখা যায় সর্বত্রই। এখন শহর আর শহরতলির পার্থক্য ঘুচছে। আসলে বোধ হয় সব প্রকার পার্থক্যই ঘুচেছে। লন্ডন প্যারিসের পার্থক্য ঘুচছে। আমেরিকা ভারতের পার্থক্য ঘুচছে। সভ্যতা যেন এক আত্মধ্বংসী সুষমার খোঁজে ছুটে চলেছে। দ্রুত। 

সে যাই হোক, পৃথিবীর একমাত্র দ্বিপেয় প্রাণীর চাপ কিছুটা কম বলেই হয়তো এখনও এ দেশে, আমেরিকায়, কিছুটা সবুজ আছে। এখনো ডালপালার শামিয়ানা টাঙিয়ে কিছু গাছ আছে। সে গাছে গাছে এখনও কিছু বাচাল অবিমৃষ্য পাখি আছে। আর এমন বৃষ্টি ভেজা দিনের ঘুমঘোর আছে। প্রকৃতির স্নেহময় বাহুডোর আছে। আর সবুজ কমে আসছে আমার শৈশবের ঘরে। ক্যাক্টাসের সেই গানটা আজ বোধ হয় প্রাসঙ্গিক। “কথা ছিল সব সবুজ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে আমি দেব অমৃতের সন্ধান।” সবুজ ফুরিয়ে আসছে। কবি কবে আর, কবে আর, অমৃতের সন্ধান দেবে? 

Leave a Reply