আজ ছিল আমার দ্বিতীয় কন্যার প্রথম জন্মদিন। দিনটা ওদের কাছাকাছি কাটাব বলে দিনভর বাড়ি থেকে কাজ করেছি। কাজের মাঝে মাঝে শিশু কন্যার স্পর্শসুখ। ওর হাতের মুঠির মধ্যে আমার আঙুল যখন আশ্রয় পায়, মনে হয়, শুধু এই সুখটুকুর জন্য আরো হাজার জন্ম নেওয়া যায়। আজ ওর জন্মদিন। আজ ওর জন্য একটু বেশি আদর। আজ ওর সাথে একটু বেশি খেলা। মনে মনে হয়তো বা বলা – “আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা, প্রিয় আমার, ওগো প্রিয়।” 

সঙ্কর প্রজাতি আমরা। সকাল বেলা বাঙালি মতে পায়েস আর ওর মায়ের পরম যত্নে রান্না করা পঞ্চব্যাঞ্জন আর সন্ধেবেলা বিলিতি মতে একটু কেক। ছিমছাম একটা আনন্দের দিন। কিন্তু দিন…সে তো শেষ হয়। সন্ধ্যা আসে। রাত্রি নামে। জেগে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে প্রতি রাতেই আমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটা। আজকেও ব্যতিক্রম হল না। ওর ঘুমিয়ে পড়া ছোট্ট, ভীষণ ছোট্ট শরীরটা দেখলে মনে হয় কোথা থেকে যেন একটুকরো প্রাণের কণা বসন্তের মলয় সমীরে উড়ে আমাদের মাঝে এসে পড়েছে। অনেকটা মানুষ মানুষ কিন্তু ঠিক মানুষ না। যেন একটা খেলনা মানুষ। জীবনের পরীক্ষাগারে আরও একটা ছোট্ট মডেল, আরো নতুন কিছু সম্ভাবনা। 

ওকে বিছানায় শুইয়ে দিতে এসে হঠাৎ বুকের মধ্যে ছাঁত করে উঠল। তাহলে একটা বছর ঘুরে গেল ওর জীবনের। সূর্যের বাহুলগ্না হয়ে যে ব্যালে ড্যান্স শেষ হাজার কোটি বছর ধরে করে চলেছে পৃথিবী, তার আর একটা অধ্যায় সমাপ্ত হল। সূর্যকে ঘিরে মহাশুন্যপথে পুরো এক পাক ঘুরে নিল নীলগ্রহ। ওর অজান্তেই ওর বয়স এখন এক। অসীম নিষ্ঠা ভরে এই বারো মাসে শিখে নিয়েছে অনেক কিছু। মাতৃস্তন্য পান থেকে শুরু করে উবুড় হওয়া, তারপর হামাগুড়ি দেওয়া আর সর্বশেষে টলোমলো পায়ে হাঁটতে চলার এক বছরের নিবিড় জীবনপাঠ। জীবনের রসদ প্রাণপণে ঠুসে নিচ্ছে নিজের ক্ষুদ্র শরীরে। এখন শুধুই নেওয়ার পালা। স্নেহ সঞ্চয়, জীবনের রসদ সঞ্চয়। কিন্তু দেওয়ার বেলাও আসবে। কুঁড়ি মানুষটা যে সম্ভাবনাগুলোর সমষ্টি, তার কতটা রূপায়িত হল সেটা জানার জন্য গুঁড়ি মেরে অপেক্ষা করছে মহাকাল। 

আমি ভাবি, ওর জীবনের আরো একটা বছরের সূচনা হয়ে গেল অথচ কোনো ওয়ার্নিং বেল বাজল না, কোনো ঘন্টি বাজল না, কোন মহাপ্রাণ এসে কানে কানে বলে গেল না “সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়, যে জন না বোঝে তারে ধিক, শত ধিক।” টিক টিক টিক। ঘড়ির কাঁটার অনিবার্য ঘূর্ণন যা প্রতিনিয়ত আমাদের জীর্ণ করে, আমাদের ছায়াকে দীর্ঘতর করে তার চলন এতই ধীরে যে তা বুঝতে বুঝতেই অনেক কটা গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত পার করে এখন আমি জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। মহাকাল। পাহাড়ি দস্যুর মত বজ্র মুষ্টি তার অথচ ভোরের শিউলির মত নিঃশব্দ পদসঞ্চালন। আবার খুব হীনবৃত্তি নিন্দুকের মতই judgemental, ছিদ্রান্বেষী। সে চলে যাবে আপন তালে। বলবে না, “একটু তাড়াতাড়ি পা চালাও ভাই। তোমার তো সন্ধ্যা নেমে এল।” অথচ প্রতিটা মানুষকে তার শেষ স্টেশানে নামিয়ে দেবার দিনে করবে চুলচেরা বিচার। বিচার করবে যে,  সে মানুষটার লোটা কম্বল, জীবনের সঞ্চয় বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, নাকি তার সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই শ্রেয়। কালের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গহ্বরে তাকে নিক্ষেপ করে চলে যাবে, নাকি ক্ষীণ একটা বাতি ধরে দিয়ে যাবে যাতে ভবিষ্যত তার খবর পায় – সেই বিচার। মহাকাল। জীবৎকালে নীরব সাক্ষী, মরণকালে চুলচেরা বিচারক। আমার ফেলে আসা বছরগুলোর দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে তাই বলতে ইচ্ছে করে, “সে চলে গেল, বলে গেল না। সে কোথায় গেল ফিরে এল না। সে যেতে যেতে চেয়ে গেল। কি যেন গেয়ে গেল। তাই আপন মনে বসে আছি…”। আপন মনে বসে আছি…আপন মনে বসে আছি…

আমার এই যে হাসি, এই যে কান্না, এই যে প্রেম, এই যে বিরহ, এই যে স্নেহ, এই যে ঘৃণা, এই যে রমণ ইচ্ছা, এই যে মহোত্তমের খোঁজ – জানি জানি তুমি কিছু নেবে না এ সবের। জানি তুমি আমাকে নেবে না। শুধু যে কটি ফুল ফুটিয়েছিলাম মনের উঠোনে, হে নির্দয় মহাকাল, সে ফুলের সাজি রাখবে কি তোমার অক্ষয় মালঞ্চে?