খেলা

২০১৭ ডিসেম্বর

আজকের এই যে দিনটা, এই দিনটা আগামী কাল কোথায় থাকবে? আজ যে দিনটাকে এত সত্যি মনে হচ্ছে, বাস্তব মনে হচ্ছে কাল কি সেটা শুধুই একটা স্মৃতিকথা, একটা অলীক কল্পনা? আমরা প্রতি মুহূর্তে এই দিনটাকে, এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চাই। আর মুঠো করে জল ধরতে চাওয়ার মতই আমাদের সবরকম চেষ্টাকে কাঁচকলা দেখিয়ে, আমাদের বজ্রমুষ্টি ছাড়িয়ে সুখমুহূর্তগুলো পালিয়ে যায়। তাই আমরা অনবরতই তাকে still picture কিম্বা video photography করে ধরে রাখতে চাই। আমাদের স্মৃতি বড় প্রতারক। আজকে বেড়াতে এসে যে জায়গাটা, যে দ্রষ্টব্যটা ভীষণ ভাল লাগছে, কদিন পরে হয়তো সেটার নাম মনে করতে পারি না। তাই আমরা ডিজিটাল ফ্রেমে ধরে রাখার চেষ্টা করি সেই ছবি, সেই নাম। কিন্তু সেই ক্ষণটার যে সমগ্র অনুভবটা, total experience-টা সেটা কতটা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী রাখা যায় সে আমার সুধী পাঠক পাঠিকারাই বলতে পারবেন, আপাতত আমি ভাবছিলাম আমার দুই বছরের কন্যা সন্তানের কথা। তার হাসিমুখ প্রায়শই তো ডিজিটাল পিকচারে, শূন্য-একের ভাষায়, ধরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু তাতে তার এই শিউলি ফুলের মত স্নিগ্ধ শৈশব যতটা চাই, ঠিক ততটা ধরে রাখতে পারি না বোধ হয় । তাই ভাবলাম ঐ আলো আর ছায়ার, ঐ শূন্য আর একের লিমিটেড অভিধানের বাইরে এসে ভাষার সাহায্য নিই। অক্ষর আর শব্দদের সাহায্য নিয়ে এঁকে রাখি আমার দু বছরের ডানা লুকোনো পরীর ছবি।            

স্ত্রী দুপুরবেলা থেকে গেছিল শপিং-এ। অতএব সানাইকে সামলানোর দায়িত্ব পড়েছিল আমার ভাগে। ওর বয়স দুই। ওর সব খেলারই সঙ্গী আমি। প্রথমে কিছুক্ষণ চলল রান্নাবাটি খেলা। ওর খেলাঘরে রান্না হওয়া সব খাবারই আমায় টেস্ট করতে হয়।  শুধু “খাও” আর “ভাল?” ছাড়া রান্না বিষয়ক আর কোন শব্দ এখনও আয়ত্তে আসে নি তার। তাই প্রতিবার একটাই রাবারের টুকরো টেস্ট করে ভাল বলার আগে আমিই কষ্টকল্পনা করে বলতে থাকি “এটা ইলিশের পাতুরি”, “এটা চিংড়ির মালাইকারি” ইত্যাদি। 

রান্নাবাটু খেলা শেষে কিছুক্ষণ “লিটল কৃষ্ণ” দেখা হল computer-এ। সেটা দেখারও সঙ্গী আমি। বালকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ একা দেখতে আমার কন্যাসন্তান মোটেই পছন্দ করেন না। কালীয়দমন থেকে বকাসুর বধ পর্যন্ত সব লীলাখেলা দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয়ে, মুখে হাত রেখে বিস্ময়সূচক শব্দ করে, অনবরত বলবে “বাবা দেখো”। অগত্যা আমাকেও কিছু বিস্ময়সূচক শব্দ বের করতে হয় মুখে। অন্তত শ দুয়েকবার দেখে ফেলেও বালক কৃষ্ণের দস্যিপনায় ওর সমান উৎসাহ। 

কৃষ্ণের দাপাদাপি কিছুটা প্রশমিত হলে শুরু হবে  “কালাল কলা” অর্থাৎ কালার করা অর্থাৎ coloring. তাতে আমায় এই পাখিটা, মাছটা, ডগিটা এঁকে দিতে হয়। উনি তাতে রঙের পোঁচ মারেন। আমি ছোটবেলায় কিছুদিন আঁকা শিখেছিলাম। তবু ঐ বিষয়ে আমার প্রতিভা একদমই সহজাত নয়। আর এখন তো সে বিদ্যা একেবারেই ভুলেছি। তো পাখি বা মাছ আঁকলে যেটা দাঁড়ায় সেটা আমার দু বছরের পুত্রী ক্ষমা ঘেন্না করে নেয় বলেই নিশ্চিন্তি। প্রাপ্তবয়স্ক তো ছেড়েই দিলাম পাখি বা মাছেদেরও সে ছবির জাজ হিসেবে দাঁড় করালে দশে শুন্য পেতাম সে ব্যাপারে আমি শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত। কিন্তু সানাই সেই মাছ, পাখি দেখেই অত্যুৎসাহিত হয়ে তাতে রঙ করতে শুরু করে। কিন্তু দু এক পোঁচ রঙ চাপিয়েই উৎসাহ হারিয়ে অন্য কিছু এঁকে দিতে বলে। দশমিকের পরে পৌনপনিকের মত আমি একই জিনিস ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আঁকতে থাকি। কারণ আঁকার ব্যাপারে আমার ভোকাবুলারি যথেষ্ট লিমিটেড। ছোটবেলায় সেই একটাই সীনারী আঁকতাম আমরা সবাই। একটা কুঁড়ে ঘর, একটা রাস্তা চলে গেছে সামনে দিয়ে। পাশে একটা গাছ। পেছনে পাহাড়, পাহাড়ের কোলে সূর্য আর কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে দিকভ্রান্ত। ওরকম দু একটা জিনিসেরই নক্সা বানাতে পারি। 

কিছুক্ষণ রঙ করে তারপর অন্য খেলা। আমায় বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। আর ও প্রায় WWF-এর স্টাইলে বিভিন্ন কোণ থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর। সে ভারি গোলমেলে খেলা। কোনোভাবে চোখ-নাক-মুখ ইত্যাদি ভাইটাল অর্গানগুলো বাঁচিয়ে সে অত্যাচার সহ্য করতে হবে। প্রতিবার ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর অকারণ খিল খিল করে হাসি। আসলে ওদের হাসার জন্য কোনো কারণের দরকার হয় না। ছোট থেকে বড় হওয়ার কোনো এক পথের বাঁকে আমাদের এই অকারণে হাসির ক্ষমতাটা ফেলে আসতে হয়। 

ঠিক সাড়ে তিন মিনিট পরে সেই খেলাটায় বোর হয়ে গিয়ে আবার অন্য খেলা। কিছু কিছু খেলা আমার এই বুড়ো হাড়ে যথেষ্ট স্ট্রেসফুল। একটা যেমন কোন একটা কাল্পনিক ভুতের ভয়ে ক্রমাগত দৌড়ন। সানাই “ভুত আচছে, ভুত আচছে” বলে ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে আর আমার কাজ হল সেই ভুতের ভয়ে ওর সাথে ছুটতে থাকা। মাঝে মাঝে ঢিলে দিলেই ভাগ্যে জুটছে বকুনি। “বাবা ভুত” বলে চিল চিৎকারে কানের পর্দার দফারফা করে দেবে। 

আর একটা আছে ঘুম ঘুম খেলা। ওর ছোট্ট একটা খেলনা বিছানায় এসে দুজনে মিলে শুতে হবে আর নাক ডাকতে হবে। যদি মনে করেন এই খেলাটায় অ্যাক্টিভিটি কিছু কম, আমাদের মত কুঁড়ে মানুষদের জন্য বাঞ্ছনীয় তাহলে খুব ভুল ভাবছেন কারণ খেলাটাকে ইন্টারেস্টিং করার জন্য প্রত্যেক তিরিশ সেকেন্ড পরে পরে উঠে একটা কাল্পনিক লাইটের সুইচ বন্ধ করতে হয় আর হ্যাঁ আপনি ঠিকই ধরেছেন – ওই সুইচ বন্ধ করার গুরুদায়িত্ব আমার ওপরেই পড়ে। মাঝে মাঝেই বলে উঠবে “বাবা, লাইট বন্ন”। “এই মাত্র তো লাইট অফ করলাম সানাই। বন্ধ লাইট তো আর আপনা আপনি জ্বলে উঠবে না” ইত্যাদি টাইপের যুক্তি খুব একটা কাজে দেয় না। সেই কাল্পনিক লাইট আবারও অফ করানোর জন্য চেঁচিয়ে মাথা ধরিয়ে দেবে। অগত্যা একবার করে শোয়া আর উঠে উঠে গিয়ে মিছিমিছি লাইট অফ করে আসা। সব মিলিয়ে বাবাকে স্লিম আর ফিট রাখার দায়িত্ব চওড়া কাঁধে নিয়েছে আমার কন্যা। 

এর থেকেও গোলমেলে খেলা আছে। যেমন ডাইনিং টেবিলের তলাটা ওর হট ফেভারিট। এবং ওর আদেশে ওর পেছন পেছন আমাকেও ঢুকতে হয় সেই অপরিসর জায়গাটাতে। ওর দু ফুটের শরীর তো দিব্যি ফিট হয়ে যায় কিন্তু আমার ওখানে ঢুকতে আর বেরোতে রীতিমত কসরত করতে হয়। ভেতরে বসে থাকার সময়টাও খুব একটা আনন্দদায়ক নয়। কিন্তু কি আর করা? ওর মুখে হাসি দেখার জন্য কেন যেন মনে হয় সব কিছু করা যায়। 

মাঝে মাঝে ভাবি বোধ হয় ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুযায়ী “যোগ্যতমের উদবর্তন”-ই এর জন্য দায়ী? আমাদের মানুষদের এই অপরিসীম অপত্যস্নেহ এটাই কি আমাদের বাঁদর থেকে মানুষ করেছে? সন্তানস্নেহই কি আমাদের অন্য পশুদের থেকে যোগ্যতর করেছে? ওর সাথে খেলতে খেলতে মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায় ঠাকুরের দু কলি গান – “তুমি মোর আনন্দ হয়ে ছিলে আমার খেলায়/আনন্দে তাই ভুলেছিলেম কেটেছে দিনবেলা”। কখনো কখনো ওর মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে চোখে জল নিয়ে যখন আমার কোলে এসে ওঠে তখন একটা অদ্ভুত গর্বে বুক ফুলে ওঠে। নিজেকে ঈশ্বর মনে হয়। অফিস থেকে বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই চা খাওয়ার অবসর না দিয়েই সে টেনে নিয়ে যায় তার খেলার ঘরে। বিরক্ত লাগে। কিন্তু তবু পরের দিন বাড়ি ফেরতা ট্রেনে মনে পড়ে যায় সেই প্রতীক্ষারত প্রিয় মুখটা। আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে ওকে রক্ষা করতে হবে, ওকে একজন মানুষের মত মানুষ, একজন দরদী মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে – নীরবে এই প্রতিশ্রুতি করি মনে মনে।

ঘাতক

ঘাতক বসেছে হোথা অন্ধকারে ―
দিন গিলে খায়।
কথা জমে জমে ওঠে। শব্দভারে
তরী ডুবে যায়।

সানাইয়ের সানাই

সানাই রাত্রি সারে এগারটার সময় ডাক ছেড়ে সানাই ধরলো। মটকা এতে কার না সটকে যায় বলুন? কি না তার মাম্মা তার সাথে কথা বলবে না বলেছে! মাম্মার কথাটা যে গুরুতর অনৃত বাচন, মানে বাংলায় বললে নেহাত বাজে হুমকি, সে কথা বোঝানোর ব্যাপারে যত্নশীল হয়ে ব্যর্থ হলাম। মানে কোন মা আর মেয়ের সাথে কথা না বলে…তাও বিশেষতঃ কন্যা যখন জামাই সহকারে বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে বলে নি যে, “কালীঘাটে আড়াইশ টাকা প্যাকেজে বিয়েটা সেরে এসেছি, এই তোমার জামাই, একে আশীর্বাদ করো।” আমার কন্যাটি নেহাত অর্বাচীন, মাত্র পাঁচখানি বসন্ত পার করেছে। ঘটার মধ্যে ঘটেছে, ওয়েল যারা সানাই নামক বিচিত্র প্রাণীকে জানেন তারা অনুমান করে নিয়েই থাকবেন, যে তিনি নৈশাহার বা বাংলায় যাকে বলে ডিনার সেটি যথেষ্ট পরিমাণে আত্মস্থ করতে অরাজী হয়েছেন। খাদ্যরসিকের বিপরীত শব্দ যদি খাদ্য-বেরসিক হয়, তবে সানাইকে খাদ্য বেরসিক বললে শব্দটির ওপর যথেষ্ট দায়ভার অর্পণ করতে হয়। কারণ যে কোনো খাবারের প্রতি সানাইয়ের যেটা আছে সেটা হল অবিমিশ্র ঘৃণা (শুধু ক্যান্ডি, চকলেট এবং বেরী বাদ দিয়ে)। পলান্ন অর্থাৎ কিনা পোলাও-এর মত উপাদেয় খাদ্য যা আমি “লাও লাও” করে কেজি দুয়েক সাবড়ে দিলাম এবং সর্বোপরি যা কিনা আমার এগার বছরের সাত পাকে বাঁধা বৌ নিজ হস্তে পাকিয়েছেন সেটা যখন সর্বসাকুল্যে তিন গ্রাস খেয়ে সানাই স্বমূর্তি ধারণ করল, অর্থাৎ কিনা পরের গ্রাস মুখে নিয়ে দাঁতের চারপাশে মাজনের মত জড়ো করে রেখে দিল এবং শত অনুরোধ, উপরোধ, অনুনয়, বিনয়, উপদেশ, আদেশেও দাঁত নামক হামান-দিস্তাটাকে চালানো থেকে বিরত থাকল, তখন যে মেজাজের চড়াই উতরাই হয় সেটা বাবা মা মাত্রই জানেন। তবে তার দুই বৎসর বয়সী সহোদরার দেখলাম বেশ সহৃদয় পরান। গালে টোবলা করে খাবার নিয়ে ঘুরছে আর মাঝে মাঝে এসে তার ক্রন্দনরতা দিদিকে তার খুদে খুদে হাত দিয়ে আদর জাতীয় কিছু একটা করে যাচ্ছে। নিষ্ঠুর প্রাণ বাবা ও মায়ের কাছে খাওয়ানোর নামে বিজাতীয় যন্ত্রণা পেয়ে সানাই মনোযোগ সহকারে বোনের আদর গ্রহণ করছে এবং সেই সুযোগে বোনুর সাথে একটু খেলেও নিচ্ছে। কিন্তু বোনু ব্যস্ত মানুষ। তাকে বিবিধ কার্য সমাধা করতে হয় যেমন দেওয়ালে রঙ পেন্সিল দিয়ে শিল্প কর্ম করা, সোফার ওপর থেকে টারজান স্টাইলে ঝাঁপানো, বাবার চটি জুতো মহারাজ ভরতের স্টাইলে মাথায় করে ঘুরে বেরানো ইত্যাদি। কর্ম না বলে সেগুলোকে অপকর্ম বলাই ভাল কিন্তু বাসুদেব বলে গেছেন শুধু কর্মতেই আমাদের অধিকার, ফলে নয়। ফলে ফলেই বোনু কর্ম করে যায় ফলের চিন্তা না করে। তাই তার দিদিকে সান্ত্বনা দান সাময়িক। সে নিজকার্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই সানাই আবার ডুকরে কেঁদে উঠছে। আমি নেহাত হৃদয়হীনের মতই বলে ফেলি সানাই আইদার কাঁদো, নয় খেলো, দুটো একসাথে কোরো না। শুনে সানাইয়ের কান্নার লয় এবং তান দুই দ্বিগুণ হল।

সানাই খেতে কেন চায় না, ক্যাটরিনা কি করিনার মত ছিপকলি থাকার অভিপ্রায়ে না বাবা মাকে পেরেন্টিং-এ ব্যর্থতার দোষিমন্যতার নরককুণ্ডে নিক্ষেপ করতে তা জানি না কিন্তু সানাইয়ের সানাইয়ের বিস্তারে কানে তালা লাগার জোগার। এমন কি অমন সহৃদয় সহোদরাটিও সান্ত্বনা জানাতে কাছে ঘেঁষছে না আর। দুই সন্তানের পিতৃপদ লাভ করার পর থেকেই আমি ব্রহ্মপদ লাভ করে গেছি অর্থাৎ কিনা নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত হয়ে গেছি। তবে কিনা বুদ্ধদেবকে তো সংসার করতে হয় নি, তাই এমন কাকচিল তাড়ানো চিৎকারে তার ধৈর্যচ্যুতি যে ঘটতই না, এমনটা হলফ করে বলা যায় না। আমি সানাইকে বলি সানাই কাঁদতে হলে গ্যারেজে গিয়ে কাঁদো। এও নেহাত হুমকি। আমি পাষণ্ড ঠিকই তবে এতটাও নই যে আমার ধনাত্মক পাঁচের বাচ্চাকে ঋণাত্মক বারোতে গ্যারেজে ছেড়ে আসব। কিন্তু এই নেহাত হুমকিতেও হিটে বিপরীত হল। আজ্ঞে না, ওটা টাইপো নয়, আমি হিতে বিপরীত নয়, হিটে বিপরীতই লিখেছি। সানাই এসে আমায় গুমগাম দু ঘা হিট করে তারপর এমন শোকাকুলা হল যে মেঘনাদবধ হওয়ার পর পঞ্চসতীর-এক-সতী দেবী মন্দোদরী অত শোকাকুলা হয়েছিলেন কিনা সন্দেহ হয়। বোনু দুটো গাল টোপাকুল করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনিও দিদির পদাঙ্ক অনুসরণ করে আহার্যসামগ্রী গলাধঃকরণ করার বদলে গালের দুদিকে সঞ্চয় করে রাখতেই বেশী পছন্দ করেন। এবং সব থেকে ছোট হওয়ার ট্রাম্প কার্ড থাকায় এমন গর্হিত অপরাধ করেও খুব বেশি বকুনি খান না। তো তিনিও ত্রস্তভঙ্গিতে মাঝে মাঝে দিদির দিকে তাকাচ্ছেন কিন্তু কাছে ঘেঁষছেন না। আমি সংসার প্রতিপালন করতে কেন নেমেছি ভেবে নিজের কপালকে দুষছি, এমন সময় ওপর থেকে দেবীকণ্ঠ শ্রুত হল মানে আমার স্ত্রীয়ের গলা আর কি।

সানাই তোমায় আর খেতে হবে না, না কেঁদে মুখ ধুয়ে শুয়ে পরো, কাল সরস্বতী পুজোতে তোষানির বাড়ি যেতে হবে।

দেবী হংসবাহিনী বেদজ্ঞা এবং পরমার্থলাভে সহায়িকা জানা ছিল কিন্তু তিনি যে এমন সংসারে শান্তিবিধানকারী তা জানা ছিল না। সরস্বতী পুজোয় যাওয়া হবে (এবং খেতে হবে না) শুনেই শোকাকুলা সানাই চোখ টোক মুছে বলয়ে ফেললে, ইয়েয়ে সরস্বতী পুজো। যে অকল্পনীয় দ্রুততায় চোখের তরল বাষ্পীভূত হয়ে গেল, কান্নার ভুত যেভাবে ভুতপূর্ব হয়ে গেল, যেভাবে শ্রাবণের মেঘ সরে গিয়ে চোখে রোদ্দুর ফুটল, তাতে সেই রোদনাশ্রুর অথেনটিসিটি নিয়ে যদি আমার চল্লিশ বছরের বৃদ্ধ মনে সংশয় জেগে থাকে, তবে তার জন্য নেহাৎ আমার বার্ধক্যকেই দুষতে হবে। যাই হোক,

আমি মনে মনে বললাম,

জয় জয় দেবি চরাচর সারে
কুচজুগ শোভিত মুক্তা হরে
বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে
ভগবতী ভারতী দেবি নমস্তে।

সান্টা

বাবা, তুমি জানো, সান্টা রেড ড্রেস পরে? ভীষণ ভীষণ ভীষণ রেড..আর ব্ল্যাক শু পরে। আর ওর হোয়াইট বার্ড আছে। সানাই বলছিল।

আজ রাতে চিমনি পথে সান্টা নেমে আসবে। তার শুভ্র শ্বশ্রূ, শুভ্র কেশ। কাঁধে উপহারের প্রকাণ্ড ঝোলা আর মুখে প্রাণখোলা হো হো হাসি। আজ রাতে সান্টা ক্রিস্টমাস ট্রী-এর নীচে রেখে যাবে ক্রিস্টমাস প্রেজেন্ট। সানাই ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ে চলে যাবে ক্রিস্টমাস ট্রী-এর কাছে। লাল সাদা গিফট্ র‍্যাপারে মোড়া উপহারগুলো দেখে নিয়ে পরের এক ঘন্টা থাকবে এক্সট্রা নাইস যতক্ষণ না গিফট্ খোলা হচ্ছে। যে জিনিসটা ও মাম্মার সামনে সান্টাকে উইশ করেছিল সেটা হয়তো বা পেয়ে যাবে। হয়তো বা পাবে না। সান্টাকে তো সমস্ত কিডদের গিফট দিতে হয়। তাই সব সময় উইশ মতন গিফট দিয়ে উঠতে পারে না। উইশ অনুযায়ী গিফট পাওয়া বা না পাওয়ার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে চোখ। গিফট্ খোলা হয়ে গেলে উৎসাহে দু চারবার লাফিয়ে নেবে সানাই। চিনি ঢালা গলায় বার বার বলবে, থ্যাঙ্ক উ সান্টা। আই লাভ ইউ। 

কয়েকটা বছর। ব্যাস আর কয়েকটা বছর শুধু থাকবে এই মধুর বিশ্বাস। বাইরের জলহাওয়া লাগলেই একদিন সন্দেহের বীজ প্রোথিত হবে। অবিশ্বাসের বীজ ধীরে ধীরে চারাগাছ হবে। তার পর বৃক্ষ মহীরুহ। বড় হয়ে ওঠা আসলে বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ারই নামান্তর। বড় হতে হতে হতে মাথা যখন আকাশ ছোঁয় তখন আর কিছু থাকে না যা পরম নির্ভরতা দেয়। কোনো দেওয়াল থাকে না যাতে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো যায় বিকেলবেলায়, কোনো চৌকাঠ থাকে না যেখানে এসে দু দন্ড মুগ্ধচোখে বসে থাকা যায়, কোনো আকাশ থাকে না যার পানে চেয়ে যুক্তকরে চাওয়া যায় এক মুঠো নীল, কোনো কবিতা থাকে না যা গুঁড়ো গুঁড়ো চাঁদ হয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায় ঝুপুস, কোনো দ্রোহকালের স্বপ্ন থাকে না যা দৃপ্ত অঙ্গারের মত রোমে রোমে আগুন জ্বালায়। আমাদের সমগ্র জীবন, আমাদের সমগ্র যাপন আসলে একটা আলগোছে পড়ে থাকা পথ যা আমাদের নিয়ে যায় বিশ্বাসহীনতার অনন্ত রৌরবের প্রবেশদ্বারে।

অনন্ত সন্ধান

আমাকে যতটা তুমি চিনেছ প্রবাল
তার থেকে আরও বেশি নীল আমি দীর্ণ ব্যাথাতুর
সন্ধেতারার মত চুপ করে চেয়ে আছি পৃথিবীর পানে
ক্লিন্ন হতে থাকা দিনান্তের সূর্যেরা জানে
কত ভগ্ন জীর্ণ মন্দিরের গোপন চাতালে
ভিক্ষা পাত্র নিয়ে দাঁড়িয়েছি আমি। শালে ও পিয়ালে
দীর্ঘতম ছায়ার শরীর দিয়ে ঢেকেছে আমার
মৃত্যু ও মিথ্যা। মরা কথাদের ক্লান্ত সমাহার
ভীড় করে এসেছে আমায় ছুঁতে
অযুতে নিযুতে
কনকচন্দন সুবাসিত সুরম্য শরীরে
মরা তারাদের অর্থহীন ভিড়ে
হেঁটে গেছি ছায়ার মতন

খুঁড়ে দেখো প্রবাল খুঁড়ে দেখ এ হৃদয় গহন
হয়তো খুঁজে পাবে চেনা বাস্তুসাপ
কিম্বা সহস্র বছরের পুরোনো জলছাপ
যে সকল গোপন কোটর
শব্দেরা ছোঁয় নি কখনো, রাত্রিভর
সেইসব অনুভব খুঁজে ফিরি আমি।
জানে, সে কথা জানে আমার অন্তর্যামী।
আমার শুধুই খোঁজা, কেবল সন্ধান
অনন্ত রাত্রি ধরে আমার অলীক শম্পান
শব্দ ফিরি করে ফেরে জীবনের বন্দরে বন্দরে
মৌন মুখর আমি একা জাগি রাত্রি নদী চরে।

প্রতীক্ষায়

কয়েকটা ক্ষণ থমকে গেল…বাকি ভেসে গেল জীবন নায়
সময় সকল চলে গেল…মুহূর্তরা থেমে রইলো ঠায়

স্বপ্ন দেখি আজও আমি, স্বপ্ন দেখি আজও তোমারই
আমার চোখে আজও টানো মেখলা তুমি স্মৃতির কাজরী

জীবন অনেক দিলো আবার জীবন অনেক ফিরিয়ে নিলো। হায়
মিলন মেলা সাঙ্গ। কাটে হেমন্ত দিন অলস প্রতীক্ষায়।

 

 

পঞ্চবর্ষীয়া

২৫ আগাস্ট, ২০২০

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। কোভিডের অদৃশ্য প্রহরা না থাকলে হয়তো বড় করেই জন্মদিনের পার্টি হত। কিন্তু এ বছরটা আর পাঁচটা বছরের থেকে আলাদা। তাই সকালে পায়েস, পাঁচভাজা, মাছ, পায়েস আর রাত্রে অল্প কেক কাটা, কিছু পুরনো বন্ধু ও ভাতৃস্থানীয় স্বজন।

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। আজ থেকে ঠিক পাঁচটা বছর আগে এক মাথাচুল আর দু চোখে বিস্ময় নিয়ে আমি এই নিজেরই হাতে মায়ের নাড়ি কেটে ওকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলাম। নাড়ি কাটার পর শুনেছি বাচ্চারা চিল চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। একদম ভুল। একটুও কাঁদে নি। বরং হাবভাবটা এরকম ছিল, এ আবার কোথায় এলাম? এত আলো? সেই থেকে শুরু। তারপর থেকে জুঁই ফুলের মত সেই ছোট্ট প্রাণটার একটা করে পাপড়ি খুলে যাওয়া…জীবনের এক একটা অধ্যায়…প্রথম উবুড় হওয়া, প্রথম হামাগুড়ি, প্রথম হাঁটতে শেখা টলোমলো পায়ে, প্রথম বাবা, মাম্মা বলা…যেন এক স্মৃতির চোরাকুঠুরি। কত হাসি, কত কান্না, কত মান অভিমানের পালা বাবা-মেয়ের – সে লিখতে বসলে বুঝি শেষ হবে না। এই হয়তো মুখে খাবার নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে বকুনি খেয়ে কিম্বা মাঝে মাঝে ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে দু এক ঘা খেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে “বাজে বাবা” বলে চলে গেল তো পরমুহূর্তেই ও বিউটি হলে আমি বীস্ট। কিম্বা আমি ঘোড়া আর ও ঘোড়সওয়ার।

আজ সানাইয়ের পাঁচ হল। হ্যাঁ আনন্দের দিন। কিন্তু সকাল থেকে আমার মনটা খারাপ। খালি মনে হচ্ছে পাঁচ হয়ে গেল। আর বড়জোড় পাঁচ কি দশ। কত অল্প, কত খসে-পড়া-তারার মত স্বল্পায়ু এই সময়। পৃথিবীর কোনো মহার্ঘ জিনিসই বোধ হয় অপরিমিত নয়। “গুপি বাঘা ফিরে এলো” ছবিতে আচার্য ব্রহ্মানন্দ শেষ দৃশ্যে যেমন দু হাত দিয়ে রত্নগুলোকে মুঠি করে ধরছিল আর হাত খুলতেই দেখছিল সে রত্ন গায়েব, ঠিক সেরকমই দু হাত দিয়ে মুঠো করে ধরতে চেয়েছি দিনগুলো। আর কখন মুঠোর ফাঁক দিয়ে গলে বেরিয়ে গেছে। অসহায়ের মত অভিশম্পাত করেছি মহাকালকে।

মহাকাল। সে টর্পেডোর মত চুপি চুপি এসে সমস্ত সঘন মুহূর্তকে বিস্মৃতির অতলান্তিকে ডুবিয়ে দেয়।

আসলে সকল কন্যা সন্তানের বাবার জীবনেই আসলে একদিন “রহমত আলি” মুহূর্ত আসে। সেই মিনির কাবুলিওয়ালা? যে অনেক কটা বছর জেল খেটে এসে একদিন দেখল তার কন্যাসম মিনি অনেক বড় হয়ে গেছে। সেই পুরনো সুর আর বাজছে না। কোথায় যেন সম্পর্কের এসরাজ বাজছে অচেনা সুরে। সেরকম সব বাবাই সময়ের স্রোতে ভেসে চলতে চলতে একদিন হঠাত অনুভব করে তার মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। হয়তো যোগাযোগের নতুন সূত্র খুঁজে পায়, কিন্তু তার শিশু কন্যাটিকে আবার নতুন করে চিনতে হয়। নতুন করে আলাপ করতে হয় নিজেরই মেয়ের সাথে।

আচার্য ব্রহ্মানন্দের মত প্রাণপণে ধরে রাখতে চেষ্টা করি আমার ছোট শিশুকন্যার আধো আধো কথা, তার অভিমানী চোখের জল, তার দুদিকের বিনুনি, তার অবাধ্যতা, আমার বকুনি, আমার আদর, ওর ছোট ছোট হাত হাতে নিয়ে পথ হাঁটার অপার্থিব স্পর্শসুখ কিন্তু পারি না। আলোছায়ায় ধরি, চলচ্চিত্রে ধরি, ছন্দে ধরি, শব্দে ধরি। তবু ধরা যায় না। তবু মনে হয় ওই আসল মুহূর্তগুলোর কাছে ওই ক্যামেরায় ধরা ছবি, ছায়া কি নিষ্ঠুর রকমের অকিঞ্চিৎকর। আমাদের প্রতি মুহূর্তের যে এক্সপিরিয়েন্স, যে অনুভব কোনো রেকর্ড বাটন টিপে তাকে যদি ধরে রাখা যেত আর আমাদের আগত সেই হলুদ বিকেলবেলায়, আমাদের সন্ধে নাম্বার আগের বিষণ্ণ ক্ষণে যদি রিপ্লে করে দেখা যেত, না না দেখা নয়, আবার করে যদি যাপন করা যেত, কি ভালই না হত? তাই না?

আমাদের সমস্ত মহার্ঘ ক্ষণ চুরি করে নিয়ে চলে যায় মহাকাল। আমরা অসহায় চোখে দেখি। কত অভিসম্পাত করি। কিন্তু সে চলে যায় রাজার চালে। তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

বাংলার ইতিবৃত্ত

আমি একটু আধটু বাংলা লিখি বলে কদিন ধরে আমায় দু একজন বন্ধু/আত্মীয় একটি পোস্ট ফরোয়ার্ড করছেন এবং ফেসবুকেও পোস্টটি দেখলাম বেশ কয়েকজনের ওয়ালে। বুঝলাম পোস্ট বাবাজীবন ভাইরাল হয়েছেন। ভাইরাস ছাড়া অন্য যেকোনো জিনিস ভাইরাল হোক তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। তা পোস্টটির মূল বক্তব্য হল, বাঙালি বাংলা ভুলে যাচ্ছে। চারটি ধাপের বাঙালি…তিন নম্বর ধাপ থেকে বাঙালি বাংলা বলা ছাড়া শুরু করে আর চার নম্বর ধাপে বাঙালি বিদেশে। বাংলা তখন শুধুই স্টাইল স্টেট্মেন্ট, শুক্রবার বিকেলে বিদেশি মদের আড্ডায় বসে মায়ের আঁচলের হলুদের গন্ধ মনে পড়ে যদিও সন্তানের সাথে চোস্ত ইঞ্জিরিতে কথা বলেন তিন…ইত্যাদি ইত্যাদি। লেখাটি ঝরঝরে এবং বক্তব্য উপস্থাপনের মুন্সিয়ানা আছে। তবে ওই চার নম্বর ধাপের বাঙালির সাথে প্রবাসী বাঙালিদের জুড়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় লেখকের অভিজ্ঞতার দীনতা প্রকাশ পায়। আজ থেকে দশ কুড়ি বছর আগে নিশ্চয়ই পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, কিন্তু ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর থেকে আমরা সত্যিই একটা বিশ্বগ্রাম, একটা গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হচ্ছি। অতি দ্রুত। বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষা আমি কলকাতাতেও যেরকম দেখি শিকাগোতেও সেরকমই। যদি সামান্য কিছু কম বেশি থাকে সে আমার দাঁড়িপাল্লায় ধরা পড়ে না। লেখক হয়তো বিদেশে থাকেন নি। তাই তিনি ক্ষমার্হ।

তবে আমার বক্তব্য অন্য। যারা এ ধরণের লেখা পড়ে ও ফরোয়ার্ড করে আহা উহু করছেন আমি ধরে নিতে পারি তাঁদের বাংলা ভাষার প্রতি দরদ আছে। অনেকে ওপর ওপর পড়েন কিন্তু সুধী পাঠক মন দিয়ে যদি পড়ে থাকেন দেখবেন এই লেখাটির শেষের দিকে একটি লাইন আছে – “বাংলা বই এখনো amazon kindle -এ পাওয়া যায় না। পরের প্রজন্মে ছাপা বাংলা বইও পাওয়া যাবে না।” যত মানুষ ফরোয়ার্ড করে করে এই পোস্টটিকে ভাইরাল করলেন তাঁর অর্ধেক মানুষও যদি বাংলা বই কিনতেন ও পড়তেন তবে শ্রীজাতর মত বিখ্যাত কবিকে “আপনি সিনেমার গান কেন লেখেন” প্রশ্নের উত্তরে বলতে হত না, বই বিক্রি করে আমার পেন কেনারও পয়সা জোটে না। লক্ষ করবেন সেই অর্থে বাংলায় কোনো ফুল টাইম লেখক নেই (যিনি শুধুই কবিতা কি ফিকশান লেখা ছাড়া আর কোনোভাবে অর্থোপার্জন করেন না) কারণ থেকে থাকলে তিনি এতদিনে অনাহারে মারা গেছেন।

amazon kindle প্রসঙ্গে বলি আমি কদিন আগে আমার একটি kindle book প্রকাশ করেছিলাম। দশ কপি বিক্রি হয়েছে। হ্যাঁ ইন্ডিয়া আর ইউ এস এ মিলে দশ কপি। রয়ালটি হিসেবে আমাজন থেকে দশ ডলার মত পেয়েছি। তুলনা করার জন্য বলি, সানাইএর স্কুলের টুইশান ফী হাজার ডলার। তাই লজ্জায় সে বইয়ের লিঙ্ক আর দিলাম না। কেউ যদি চান যোগাযোগ করবেন। যারা আমার লেখার প্রশংসা করেন তারা প্রশ্রয় হিসেবেই করেন ঠিকই, বুঝি। তবে সেই প্রশ্রয় দিয়েই যদি বাংলা বই মাঝে মাঝে সংগ্রহ করেন তবে হয়তো বাংলা ছাপা বই বা বৈদ্যুতিন বই আরো কিছুদিন বেঁচে যেতে পারে।

আর একটু বলি, বইমেলায় আমার বইটি দেখে আমায় একজন মেসেজ করেছিলেন, আপনার বইটি দেখলাম। কিন্তু দাম কিছু বেশি লাগল। আমি তাঁকে বলেছিলাম, হ্যাঁ দাম কিছু বেশি আছে। দয়া করে আপনি সংগ্রহ করবেন না। সে যাই হোক 🙂 , দাম কত ছিল বইটির? ১৫০ টাকা ভারতীয় মুদ্রা। কলকাতার যেকোনো ভাল রেস্টুরেন্টে খেয়ে আপনি যদি তিন থেকে চার হাজার টাকার নিচে বিল করতে পারেন তবে আপনি নেহাত মিতব্যয়ী আর মিতভোজী। অতএব কি দাঁড়ালো? এই দাঁড়ালো যে এক সন্ধের পান আসরে আমরা অনায়াসে চার হাজার টাকা ওড়াতে পারি, কিন্তু বইএর দাম ১৫০ টাকা হলে আমাদের গায়ে লাগে। নো ওয়ান্ডার
প্রকাশকরা বলেন, জানেনই তো বাংলা বই বিক্রি হয় না। তাই বই প্রকাশের খরচ আপনাকেই দিতে হবে। আপনি কি জানেন, বাংলা প্রকাশনা বেঁচে আছে লেখকের টাকায়, কারণ বাংলা বইয়ের ক্রেতা নেই? ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে দয়া করে ভাষার কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখুন। আর বাংলা ভাষার নামে এই লেখাটি শেয়ার করুন না।

কথা ছিল

তোমার কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
সন্ধ্যা যখন সঞ্চারিত,
রৌদ্রকণা মৃত্যু ভীত,
গোপন ব্যথায় জর্জরিত
চুপপ্রহরে প্রিয়ম্বদা
তোমার কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
.
তোমার কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
বিষণ্ণ এক শর্বরীতে,
আলগা খোঁপার আলগা শ্রী তে
নরম তোমার ওষ্ঠ ছুঁতে
শুকশরীরে প্রিয়ম্বদা
তোমার কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
.
তোমার কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
অলস কোনো দুপুরবেলায়
মানসশরীর স্মৃতির ভেলায়
আকাশ মাটির মিলনমেলায়
আচম্বিতে প্রিয়ম্বদা
তোমার কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
.
তোমার কাছে যাওয়ার কথা আছে।
খাক লেলিহান চিতায় পুড়ে,
তীব্র দহন শরীর জুড়ে
বুকফাটা দিকশূন্যপুরে
শেষের দিনে প্রিয়ম্বদা
তোমার কাছে যাওয়ার কথা আছে।

কিনডেলে কেলেঙ্কারি

আপনারা যারা “যযাতির ঝুলি” পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য এবার একটা মস্ত খবর আছে। ২০১৯-এ পত্রভারতী প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত “যযাতির ঝুলি” গল্প সঙ্কলন বইটির কপি দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার কারণে আমার বহু বন্ধু ও সুহৃদ বইটি সংগ্রহ করতে পারেন নি। পৃথিবীর যে কোনো কোণায় একটিও মানুষ যদি আমায় পড়তে চান, আমি কৃতজ্ঞ বোধ করি। আর তাই এই বইটিকে, ঠিক এই এক ডজন গপ্পো এবারে নিয়ে এসেছি ডিজিটাল মাধ্যমে। অ্যামাজন কিনডেলে এবং অ্যাপল বুকে পাওয়া যাচ্ছে বইটি।

আপনারা যারা বারংবার যযাতির ঝুলি থেকে প্রকাশিত লেখা পড়ে এক রাশ মুগ্ধতা জানিয়েছেন, আপনাদের যাদের যযাতির হিউমার পড়ে পেটে খিল ধরেছে, আপনারা যারা যযাতির মধ্যেকার গল্পবুড়োকে কুর্নিশ জানিয়েছেন, আর সর্বোপরি যারা আমার প্রিন্টেড বুকের কপি শেষ হয়ে যাওয়ায় সংগ্রহ করতে পারেন নি তাদের সকলকে বলি বইটির এক কপি সংগ্রহ করুন। বারো খানা গল্প, দাম তিন ডলার কিম্বা ৫০ টাকা ভারতীয় মুদ্রা। হ্যাঁ, দুটো ব্রেডের দামে। চলচ্চিত্র মাধ্যমে গল্প পরিবেশনার জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে ছাপার অক্ষরের গল্পের বিপণন ক্ষমতা তত কমেছে। তবু এটাও ঠিক, যে গল্প-লিখিয়েরা অক্ষরেই গল্প লেখেন। পরে তাকে চলচ্চিত্র বানান অন্য কেউ। এই কিনডেল বুকটির গল্পগুলো কেমন জানতে amazon-e “Look Inside” button ক্লিক করে দেখতে পারেন। পড়লে হতাশ হবেন না এটা যযাতির প্রতিশ্রুতি।

আপনার গল্পজিভে যাতে চড়া না পড়ে যায় তাই প্রতিটা গল্প ভিন্ন স্বাদের রাখা হয়েছে। পড়ে দেখুন। আর হ্যাঁ, পড়া হয়ে গেলে প্লীজ কেমন লাগল জানাবেন। কারণ আপনাদের উৎসাহই যযাতির পথ চলার মাধুকরী। ২০১৯-এ মুদ্রিত সংস্করণে যে সহায়তা ও সমর্থন পেয়েছিলাম, আমি নিশ্চিত সেই সাপোর্ট আবারও পাবো।

বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী আমার এক প্রিয় দিদি, সুলেখিকা এবং সম্পাদিকা Mousumi Mondal Debnath.

“Jojatir Jhuli Baro Kahon” Kindle Edition Amazon India Link is here.

“Jojatir Jhuli Baro Kahon” Kindle Edition Amazon USA Link is here.

যাঁরা কখনো kindle book পড়েন নি তাদের জন্যঃ

যদিও ছাপা বই পড়ার মজাই আলাদা, কিন্তু কখনো সখনো বিশেষ করে ট্র্যাভেল করার সময় আমি মুঠো ফোনের কম্ফোর্ট থেকে ডিজিটাল বই পছন্দ করি। ইপাব ফরম্যাটে ডিজিটাল বইও অনেকটা ছাপা বইয়ের মত। পাতা উল্টোনো যায়। বুকমার্ক করা যায়। আমার মনে হয় এটা কিনডেলে আসা প্রথম বাংলা বই। এর আগে কিছু বই তার মুদ্রিত কপির স্ক্রীনশট থেকে কিনডেল এডিশান বানিয়েছে বটে তবে তা পড়ার জন্য চোখের পক্ষে বেদনাদায়ক। আমি প্রপার বাংলা হরফে বই প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি। পড়ে দেখুন। অসুবিধে হবে না। আর বলে রাখি, kindle book পড়তে কোনো স্পেশাল ডিভাইস লাগে না। Amazon will download kindle app for you once you purchase. আমেরিকায় Amazon.com আর ভারতে যারা আছেন Amazon.in ওয়েবসাইট বা Amazon app-এ অথবা Apple Device-এর books অ্যাপে “Jojatir Jhuli” বলে সার্চ করলে বইটি পাবেন। উপরে লিঙ্কও দিয়েছি।