খেলাখেলা

মাঝে মাঝে সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে থাকে খেলার মরসুম। বাইরে তখন শীতঘুম। সাদা কাপড়ে মোড়া শীতবুড়ি। চালিয়ে দিয়েছে ছোরা, ঋণাত্মক কুড়ি।

শুনেছি প্রাণী মধ্যে mammals বা স্তন্যপায়ীরা সবচেয়ে কৌতুকপূর্ণ বা playful । এ কথা একদমই নয় ভুল। কিন্তু থাক সেসব ইকড়িমিকড়ি। জীববিদ্যা ফেলে চলুন আমরা গল্পে ফিরি।

বাড়ির কনিষ্ঠতম সদস্যা চোখে আলো জ্বেলে বলে ওঠে, বাবা কি খেলবে? হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু প্লে। বাট আই রিয়েলি ডোন্ট হ্যাভ এ সে। আমায় ভাবার সুযোগ না দিয়েই বলে, হাইড অ্যান্ড সীক। আমি চোখের তারায় জোনাকি জ্বেলে বলি, ঠিক ঠিক। তাথৈ বলে, ওকে বাবা, ইউ কাউন্ট। আমি দেওয়ালের দিকে ফিরে হাত চোখে করি মাউন্ট। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে গুনতে থাকি, এক দুই তিন চার… তর সয় না তার। “বাবা আমি হাইড করেছি”। ব্যাস আমিও চোখ খুলে ফেলেছি। আর কাউন্ট করে কি কাজ, থাক। তাথৈ সোনাকে খোঁজা যাক। তা লুকিয়েছে সে, যেখানে কাউন্ট করছি সেখান থেকেই ফুট চারেক দূরে, সোফার আড়ালে। সেখান থেকে তার আওয়াজ আসছে যেমন করে আওয়াজ আসে কলে ইঁদুর পড়লে। উত্তেজনায় তার ছোটো শরীর থরো থরো। কিন্তু অমনি খুঁজে বের করলে কি ভাল দেখায় বড়ো? তাই বাবা এদিক যায়, ওদিক যায়। “তাথৈ তুমি কোথায়? আই অ্যাম কাআআমিং। তোমায় খুঁজে বের করা খুব শক্ত হচ্ছে ইদানীং”। এই সব বলি। সময় কিছু নষ্ট করে পৌঁছই সোফার কানাগলি। তাথৈ বলে ধাপ্পাআআ, আওয়াজ শোনা যায় রামতলা থেকে রাজারাপ্পা। অমনি আমিও করি, চমকে ওঠার ভানটি। সে সরলা তাই দেখে হেসেই কুটিপাটি।

এবার তার কাউন্ট করার পালা। কিন্তু একটাই ঝামেলা। আমার লুকোনোর স্পটটা সেই ঠিক করে দেয়…খুঁজে পেতে যাতে তার না হয় কষ্ট। তাথৈ এই সব ব্যাপারে খুব স্পষ্ট। “বাবা এইখানে বোসো, পা মোড়ো।” “আ মোলো। তুই যেখানে ঢুকতে পারিস সেখানে কি আমি ঢুকতে পারি, ছাই।” কিন্তু তর্ক করা বৃথাই। তার খেলার ভুবনে বাকবিতণ্ডার স্থান নাই। যাক বাবা, ঝামেলায় কাজ নাই। বেশি গোলমাল করলে তাথৈ বাজাবে সানাই। জুড়ে দেবে কান্না। বাবা তা চান না। কোনোভাবে বডিফ্রেম সেইখানে গুঁজে রাখি। নট-সো-টোনড মধ্যপ্রদেশ অর্থাৎ ভুঁড়িটিকে বলি, জাঁহাপন, মাফ করো গুস্তাখী। এই তো শুধু কাউন্ট টু টেন। তারপরই স্বাধীন হবেন। তাথৈ কাউন্ট শুরু করে। ওয়ান…টু…থ্রী…ফোর…ফাইভ…সিক্স…এইট। আমি বলি, “সেভেন সেভেন, তাথৈ সিক্সের পর সেভেন”। মাফ করবেন। ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙেন, তেমনি বাবা কিম্বা মা হাইড অ্যান্ড সীকের মাঝেও শেখান, ওয়ান টু টেন। তাথৈ আবার গোনে, প্রথম থেকে, ওয়ান টু টেন। পুরো এক থেকে দশ। আমার পেট বলে, এবার ছেড়ে দে বস। তারপর তিনি আমায় খুঁজে পেতে আসেন যেখানে আগেই আমায় লুক্কায়িত রেখেছেন!! কিন্তু তাতে খেলা হয় না মাটি। ধাপ্পা দিলেই তাথৈ আবার হেসেই কুটিপাটি।

এই খেলাই রিপিট হতে থাকে দশবার বিশবার। প্রতিবারই তার কাছে একইরকম মজাদার। পুনরাবৃত্তি বোর করে আপনাকে আমাকে। কিন্তু হারায় নি সে চিন্তাস্রোতে জীবন পথের বাঁকে। সে যাই হোক, বাবা অর্থাৎ আমিও প্রতিবার মজা পাওয়ার অ্যাক্টো করি। ছোটো মানুষটাকে খিলখিলিয়ে হাসতে দেখে বুকের মধ্যে কুলু কুলু ধানসিঁড়ি।

জীববিদ্যা বলেছে কিনা, স্তন্যপায়ীরা হল গিয়ে ক্রীড়ামোদী! এইভাবেই রুনু ঝুনু বয়ে চলে জীবননদী। এইভাবেই দৈনন্দিন একঘেঁয়েমি হয়ে ওঠে যাদুবাস্তব, নিরবধি।

কবি কি দেখছেন?

এক দিদি বললেন, তোমরা যারা লেখো, তোমাদের মাথার তন্ত্রীগুলো অন্য সুরে বাঁধা। আমি দড় কোনও লেখক নই। তবে লেখকের মাথা সম্বন্ধে দু এক কথা জানি। লেখকের মাথা অন্য তন্ত্রীতে বাঁধা? সত্যি কি তাই? লেখক/কবি কি ভাবে দেখে? কোন্‌ ঘটনা বা অঘটনকে সে করে নেয় কথকতার উপাদান? কেমনে সে ক্রমাগত গল্প খুঁজে পায় দৈনন্দিন একঘেঁয়েমি আর ক্লিন্নতায়? 

কারণ অন্যে যেখানে জীবন দেখে, লেখক সেখানে যাপন দেখে। অন্যে যেখানে গন্তব্য দেখে, লেখক কেবল দেখে একটা পথ মাত্র যা আদতে কোথাও যায় না। এক শাশ্বত বর্তমানে সে পথ অনন্তকাল ধরে শুধুই থেমে আছে। শুধুই থেমে আছে। অন্যে যখন দেখে বস্তুনিচয়, লেখক দেখে একটি প্রবাহ মাত্র। পরম শূন্য থেকে নিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, পরম শূন্যেই স্থিত হচ্ছে আর সেই পরম শূন্যেই নিশ্চিতভাবে বিলীন হচ্ছে সেই সব বস্তু ছায়াপ্রতিমারা। অন্যে যখন দেখে কঠোর বাস্তব, কবি দেখেন প্রপঞ্চ। কবি বোঝেন, এ সকলই সতত পরিবর্তনশীল, অন্তঃসারশূন্য এবং স্বাধীন সত্তাবিহীন। ছায়ার মত চিদাকাশে ফুটে উঠছে নিয়ত আর নিয়ত অপসৃত হচ্ছে।। অন্যে যেখানে ক্রমাগত একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির খোঁজে সঙ্গ খুঁজে ফেরে অন্তর্জালে, সমাজমাধ্যমে, কবি সেখানে অনেকের সঙ্গে মিশেও সর্বতোভাবে অসঙ্গ। অন্যে যেখানে নিজের ব্যক্তিগত গল্পনদীর মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে, কবি দেখতে পাচ্ছে জীবন নদীবক্ষ আর নিরন্তর উৎসারিত ঊর্মিমালা। ঢেউ উঠছে, ঢেউ ভাঙছে। ঢেউ উঠছে, ঢেউ ভাঙছে। থুপ থুপ থুপ। আদি ও অনন্ত জল থেকে ঢেউ হয়ে জন্ম নিচ্ছে নাম-রূপ আর ক্ষণিক বাদে জল হয়ে মিশে যাচ্ছে তার সৃষ্টি উৎসে। তখন সে নামহীন, রূপাতীত। এক মুহূর্তে পৃথক অস্তিত্ব, অপৃথক পরমুহূর্তে। অন্যে যেখানে সারবত্তা খুঁজে পেতে মাথা খুঁড়ছে, কবি দেখছেন সংসার। সংসার কি? যা ক্রমাগত সরে সরে যায়, সেই তো সংসার। অন্য অর্থে যা চক্রাকারে আবর্তিত হয়, তাই সংসার। সেই সংসারে সং সাজা যায়, কিন্তু সার খুঁজে পাবে কেমন করে? 

সার খোঁজা শেষ হলে তবে সার খুঁজে পাওয়া যায়। এই অস্তি এমনই স্ববিরোধী। তাই কবি/শিল্পী/লেখক শব্দে, তুলিতে, আলোছায়ায়, সুরে ধরে রাখে এই নিয়ত পরিবর্তনশীল শাশ্বত বর্তমানের ঠিক যতটুকু ধরে রাখা যায়। সেই শব্দরতিও ক্ষণিকের। সে শব্দমালাও ডুবে যাবে এক কৃষ্ণগহ্বরে যার নাম মহাকাল। মহাকালের গর্ভে বিলীন হবে সব যা দৃশ্য ও অদৃশ্য, সব যা শ্রুত ও অশ্রুত, সব প্রেম, সব আবিষ্ট থিরি থিরি কাঁপা অধর, সব যুথীমালা, সব অবাধ্য কবরীগুচ্ছ, সব বংশলতিকা, সব রাজপাট, সব চক্রান্ত, সব অসূয়া, সব নীহারিকা, সব নক্ষত্র, সব পাখি, সব নদী, এমনকি সব কবিতা। যা থেকে যাবে সে এক আদিম কবিতা। সে কবিতার রচয়িতৃ এক সন্ন্যাসিনী যে সঞ্চয় করতে শেখে নি।

রাজনীতিবিদ

স্ত্রী কহিলেন, জানো সানাই খুব মিথ্যে কথা বলতে শিখেছে।

আমি নিরুত্তর রহিলাম।

স্ত্রী কহিলেন, ওকে জিগ্যেস করলাম ভাত খাওয়ার পর কুলকুচি করেছিস কিনা। কনফিডেন্টলি বলল, হ্যাঁ। একটু চেপে ধরতেই ছুটল কুলকুচি করতে।

আমি বলিলাম, বেশ বেশ।

বেশ? মিথ্যে বলছে সেটা ভাল?

আমি বলিলাম, তুমি তো বলো, ও কোনো কম্মের না। সব কাজেই লবডঙ্কা। এই একটা কাজ তো ঠিক করে করছে। এই যে মিথ্যে বলাটা আয়ত্ত করেছে – এর ফলে দুটো কেরিয়ার পাকা।

কি কেরিয়ার?

রাজনীতিবিদ ওরফে দুর্নীতিবিদ আর উকিল।

জীবনের রঙ্গমঞ্চে সানাই নামক কুশীলবের প্রতিপক্ষ হিসেবেই অবতীর্ণ হতে হয় অধিকাংশ সময়। কারণ খাওয়া, পড়া, স্নান করা, দাঁত মাজা সবেতেই তার ঘোরতর আপত্তি। শুধু বিকেলবেলা স্কুল থেকে ফিরলে অনেকক্ষণের অদেখায় হয় ক্ষণিকের মধুমাস। তা আজ তেমনই বিকেলবেলা জড়িয়ে ধরে জিগ্যেস করলাম,

সানাই তুমি চলে যাবে বড় হলে আমাকে ছেড়ে।

সানাই জোড়ে জোড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, না।

আরও একটু সঘন হয়ে বললাম, কেন? বাবা তো তোমায় বকে। তোমার কথায় বাবা তো মীন? (হ্যাঁ, আজকাল স্কুল থেকে mean কথাটা শিখে এসেছে এবং যথেচ্ছ ও লাগামছাড়া প্রয়োগ করছে। তবে আমায় মীন বললে আমি বলি, আমি মীন হলে তুমি মিডিয়ান। খুব রেগে গেলে বলি তুমি তাহলে স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশান। মিডিয়ান কি স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশান যত ভারি কথা হয় সানাই ভাবে বাবা তত ভারি গালাগালি করছে এবং জোড়ে জোড়ে কত্থক স্টাইলে পা ঠুকতে থাকে।)

সানাই বলল, না ছেড়ে যাবো না।

আমি বললাম, কেন, বাবা বকে তো?

সানাই বলল, হ্যাঁ আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলল, কিন্তু তুমি আমাকে ফোন দাও……

শুধু ফোনের জন্য। চল ভাগ।

নিজের আত্মবিশ্বাস কড়াত শব্দে ভেঙ্গে গেছে। শুধু ফোন দি বলে ফন্দী করছে আমার সাথে থাকার…ভাবুন। সংসার সংসার। এ জন্যই তথাগত বলেছেন, শূন্যম শূন্যম সর্বম শূন্যম। সাধে শ্যামাসংগীত বলেছে,

ভেবে দেখ মন কেউ কারু নয়, মিছে ভ্রম ভূ-মন্ডলে।

বই প্রকাশ

যযাতির ঝুলি নিয়মিত পড়েন এরকম পাঠকের সংখ্যা ১০০ এর বেশি। তা আমাদের গুগল স্ট্যাট দেখলেই জানা যায়। নিষ্ঠা ভরে যযাতির ঝুলিটি উল্টে পাল্টে দেখার জন্য সকল পাঠকবর্গকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। বিশ্বাস করুন পাঠকের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে অনুরণন তুলতে পেরেছি এই আশা নিয়েই আজও লিখি দু এক কলম।

আপনার যারা যযাতির ঝুলির একনিষ্ঠ পাঠক, আপনাদের সাথে একটি সুখবর ভাগ করে নিতে চাই। কবিতা আশ্রমের প্রকাশনায় লেখক স্বর্ভানু সান্যালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “বনধুতরোর ফুল”। পত্রভারতী থেকে লেখকের প্রথম গল্প গুচ্ছ বেরিয়েছিল ২০১৯ বইমেলায়। “যযাতির ঝুলি” বইটি পাঠককুলে সমাদৃত। এ বছর কলকাতা বইমেলায় ২৫২ নম্বর স্টলে পাওয়া যাবে কাব্য গ্রন্থ “বনধুতরোর ফুল”। পরে পাওয়া যাবে অনলাইন ও কলেজ স্ট্রিটে। পাঠকের ভালবাসা এবারেও পাব এই আশা রাখি। সবিনয়ে অনুরোধ বইটিকে আপনার নিজস্ব সংগ্রহে স্থান দেবেন।

বইমেলা পরবর্তী সময়ে পাওয়া যাবে কলেজ স্ট্রীটে কবিতা আশ্রমের নিজের দোকানে অথবা দেশ বা ধ্যানবিন্দুতে। অনলাইন পাওয়া যাবে এই লিঙ্কে

https://kabitaashram.com/shop/

বর্ষারাতে

লাজুক হাওয়া আলগা ছুঁল চুল
নরম বালিশ চিবুক ছুঁয়ে থাক
না হয় তুমি গল্পে মশগুল
আঙুল ছুঁল আঙুল অযথা
.
পলাশ তোমায় দিক, রাঙিয়ে দিক
আশমানী রঙ অঙ্গশোভা হোক
বৃষ্টি নামুক, অন্ধ দিকবিদিক
কথারা আজ থামুক, অনর্থক
.
বেতস লতা শিউরে উঠে চুপ
পদ্মডাঁটা আবেশে থির থির…
আলগা খোঁপা কখন যে তছরুপ
ভাঙুক না পাড় জোছনা নদীটির
.
আঝোর ধারায় ভিজুক বনফুল
পথিক চিনুক অচেনা পথঘাট
নকশি-কাঁথা বুনুক কাঁটা-উল
সাক্ষী থাকুক ভুবনডাঙার মাঠ

woman wearing blue and white skirt walking near green grass during daytime

সহচরী

আমি তোমায় ভালোবাসি।
দেবদারু গাছের নিচে বাতাস কেঁদে মরে
চাঁদ ধোয়া জল পরিত্যক্ত নোনা ধরা নৌকায় ঘাই মারে
তোমার আমার মাঝে অনন্ত জলরাশি।

একলা বন্দর। আমি বসে থাকি ঠায়
আমার আত্মা ধুয়ে যায় আকাশগঙ্গায়।
নিস্তব্ধ চারিধার
সমুদ্রের জান্তব গর্জনও প্রত্নতত্ত্বের মত নীরব।
সাদা ফ্যাটফেটে রংহীন পৃথিবী
তুমি শুধু একটু পলাশ।

আমি তোমায় ভালবাসি।
তবু দিগন্ত তোমায় চুরি করে নিয়ে যায়।
দিকভ্রান্ত মুমূর্ষু জাহাজে করে
আমার তোমাকে না-লেখা-চিঠিরা ভাসে অনির্দেশে

পরম আশ্চর্য সন্ধ্যা নামে।
তোমার আয়ত চোখ ধার নিয়ে চেয়ে থাকে সন্ধেতারা নির্নিমেষ
আমি সহবাসে তৃপ্ত নাগরের মত নিদ্রা যাই।
ভুলে যাওয়া গানের কলির মত তখন
তুমি ফিরে ফিরে আসো সহচরী।

বাগেদের বাগাড়ম্বর

তা হয়েছে কি শীত গিয়ে বসন্ত এসে পড়েছে। ফাগুন হাওয়ায় দুলে দুলে নতুন ফোটা ফুলের গরবে গরবিনী, সদ্য যুবতী গাছগুলো নিজেদে মধ্যে চুপকথা শুরু করে দিয়েছে। রতিদেবী ঘুরে ঘুরে পুষ্পশর ছুঁড়ছেন আপন খেয়ালে। আর তার ফলে পোকা মাকড়েরা ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি করে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে চলেছে। তা আপনি জিজ্ঞেস করবেন তা তোমার বাপু তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। পোকামাকড়েরা যা করছে করুক, তোমার তাতে কি?

কথা ঠিক, কিন্তু এ কথা আমার ছোটকন্যাকে বোঝায় কে? তাকে কিছুদিন হল বাগে পেয়েছে। অর্থাৎ কিনা সে বাড়ির বিভিন্ন প্রত্যন্ত অংশে মানে ধরুন খাটের নিচে, সোফা ও কফিটেবিলের মাঝের অতি সংকীর্ণ পরিসরে, সিলিঙে, টবে বসানো গাছের গোড়ায় ছোট বড় মাঝারি, সবুজ লাল গেরুয়া, একলা কিম্বা সমবেত, স্থির কিম্বা চলমান পোকা এবং মাকড়দের খুঁজে বের করছে আর বাড়িতে ডাকাত পড়লে লোকে যেভাবে তারস্বরে চিৎকার করে, সেইভাবে চিৎকার করছে, “বাবা বাগ।” বিবাগী হয়ে যেতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।

তাকে যতই বলি বাগেদের কেউ কোনোদিনই বাগে আনতে পারে নি, তারা পরব্রহ্মের মত সর্বভূতে ও সর্বস্থানে বিরাজমান কে শোনে কার কথা? তারা নিজগুণেই এত জলদি নিজেদের জ্ঞাতিগুষ্টিকে ডেকে আনে, যে তাদের গুনে শেষ করে, সাধ্য কার। কিন্তু কন্যা শুনলে তো? সৃষ্টি পূর্বে শ্রীবিষ্ণু অনন্ত শয্যায় ছিলেন। আমি সেই আদিপুরুষের দ্বারাই সম্ভবত অনুপ্রাণিত হয়ে এবং আমার দ্বারা কোনোকিছু সৃষ্টি সম্ভবপর নয় জেনে যোগনিদ্রায় শরীর এলিয়ে রাখা পছন্দ করি। কিন্তু তাথৈইয়ের বাগ সন্দর্শন হলেই  প্রথমে চিৎকার করে বাবা বাগ। সেই চিৎকারে আমার যোগনিদ্রা টলাতে না পেরে ছুটে এসে তার খুদে আঙুল আঙুলে জড়িয়ে টানতে থাকে। মানে আমাকেও গিয়ে দেখতে হবে। আরে দেখে হবেটা কি ছাতা? তারা মোটেই আমায় ডরায় না। আমার নাকের ডগা দিয়ে তারা সকলে “আমরা সবাই ড্যাং ড্যাং” করে চলে যাবে।

বাগেদের কে কবে বাগড়া দিতে পেরেছে? পোকাদের কে কবে বোকা বানাতে পেরেছে? মাকড়দের কান পাকড় করে বাড়ি থেকে বের করে দিতে কে কবে পেরেছে? বাগান থেকে বেগুণ, বাগে কাটা নান থেকে বাগনান, গোলাপবাগ থেকে আরামবাগ সর্বত্র বাগেদের অবাধ বিস্তার। প্রবল প্রতাপশালী  ডাইনোসররাই যাদের ঠিকানা লাগাতে পারে নি, তাদের আমি ঠেকাই কি করে? বাগেদের ওপর রাগ করে করবই বা কি, তারা আমার রক্তচক্ষুর পরোয়া করে না। সমস্ত রকম বাগ স্প্রে ট্রাই করে ফেলেছি। তাদের নিকেশ করা তো দূরের কথা, তাদের কেশকর্ষণ (এর খারাপ বাংলাটা আর বললাম না। সমঝদারের জন্য ইশারাই যথেষ্ট) পর্যন্ত করতে পারি নি। বাগেদের ওপর রাগ করার থেকে বাগেশ্রী রাগ শিখে ফেলা সোজা। বাগদেবীর দেখা পাওয়া যদি বা সম্ভব হয় বাগেদের বাগে আনা নেহাত অসম্ভব। বাগদের ওপর রাগ করে আপনার রক্ত টগবগ ফুটতেই পারে, কিন্তু তাতে বাগবাহিনীর কিছু যায় আসে না। তারা জাঁক ভরে ঘুরে বেড়াবে বাড়িময়। বাগেদের ডিবাগ করার থেকে ব্যাগাডুলি খেলা ঢের সোজা। তর্কবাগীশকেও তর্কে হারাতে পারবেন, কিন্তু বাগেদের টর্কে (torque) আপনি নাজেহাল হবেন নি।

কথায় আছে না, নরকের কীট। নরকেই যারা মহা আনন্দে উৎসব করে, এই মর্ত্যে তাদের প্রভাব ও আধিপত্য যে অপ্রতিম হবে তাতে আর আশ্চর্য কি? কীটেদের ঢিঁট করতে পারে এমন কিরীটী মর্ত্যলোকে নেই। কীটেদের হারায় এমন হিরো কেই বা আছে? যাক গে আর বাগবিতণ্ডায় গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু আমাদের তাথৈশ্রী বাগুলার বাগপ্রীতি কমায় সাধ্য কার?

পুজোর গান

তোমার আমার দেখা হবে সন্ধ্যা হলে আলোক নদীর পারে…
কথারা সব নিভবে, উজান
আনবে বয়ে অপূর্ব গান
আমার সকল অপূর্ণতা মিশবে তোমার অসীম অন্ধকারে।।


তোমার হাতে হাতটি রেখে হাঁটব আমি অমৃত পথ ধরে…
তোমার দু চোখ অশ্রু সজল,
আমার যত পথের ফসল
সকল গিয়ে মিশবে তোমার অনন্তমূল বিশ্বপরিসরে।।


তোমার সুরে সুর মেলাবো সুমন্দ্রিত অলোক বন্দিশে…
চোখের পাতায় ঘুম জড়াবে,
সকল অহং ঠিক মেলাবে
আমার সকল কর্কশতা মধুর হবে তোমার সুরে মিশে।।


আমার খাঁচার অচিন পাখি যেদিন যাবে অনন্ত উড়ানে…
তোমার চোখে চোখটি রেখে,
সূর্যসলিল বক্ষে মেখে
মিশব জানি, মোহন, তোমার অলীক সুতোর অঙ্গ পরিধানে।।

শুভ শারদীয়া

চল্লিশের জন্মদিনে…

ফিরতে আমার রাত্রি হতে পারে
ঘুমিয়ে তুমি পড়বে না তো মা?
আমার অনেক কথা বলা বাকি
তুমি কিন্তু শয্যা নিও না

তোমার পাশে পাশে হেঁটেছিলাম
ভোরের নরম শিশির ভেজা ঘাসে
এখন ধুলোয় ওষ্ঠাগত প্রাণ
আমার বুঝি সন্ধ্যা নেমে আসে

তোমার আঁচল অমনি পাতা আছে
বুকের মাঝে নদীর ছলো ছলো
পথে পথে অনেক ঘুরে ঘুরে
আজ কিভাবে পথ খুঁজে পাই বলো?

আমার ফিরতে রাত্রি হতে পারে
একটু আলো জ্বালিয়ে রেখো ঘরে
ভালই ছিলাম গর্ভে, অন্ধকারে…
এখন আঁধার দেখলে ভয় করে

দেখেছো, বলতে ভুলেই গেছিলাম
যতবারই গিয়েছি নদীতীরে
দেখেছি হংস ঐ সুদূরে যায়
নিস্তরঙ্গ জলের বুক চিরে