রামায়ণের জন্মকথা – কবিতা

मां निषाद प्रतिष्ठां त्वमगमः शाश्वतीः समाः।

यत्क्रौंचमिथुनादेकम् अवधीः काममोहितम्॥’

mā niṣāda pratiṣṭhā tvamagamaḥ śāśvatīḥ samāḥ

yat krauñcamithunādekam avadhīḥ kāmamohitam

You will find no rest for the long years of Eternity

For you killed a bird in love and unsuspecting

কামমোহিত এক পক্ষিযুগলের এক শিকারির শরাঘাতে মৃত্যু দেখে স্নানরত ঋষি বাল্মীকি গেয়ে উঠেছিলেন এই পুণ্যশ্লোকটি। সেই থেকেই আদি কবি বাল্মীকি লেখেন অমর প্রেমগাথা রামায়ণ। অতি রমণীয় রচনা এই রামায়ণ। সাহিত্যগুণে, কাব্যগুণে বোধ হয় মহাভারতের থেকেও শ্রেয়। সেই অমরকাব্য রচনার শুরুর সেই নাটকীয় মুহুর্তটি ধরার চেষ্টা করেছি। হয়তো একটু অন্য আঙ্গিকে গল্পটিকে উপস্থাপিত করেছি।

 

নীল জলেতে পা ডুবিয়ে এক সারস আর এক সারসি

মুগ্ধ দৃষ্টি, মুগ্ধ আত্মা, ওষ্ঠে খেলে মোহন হাসি

লজ্জা চোখে সারসি শুধোয় “আমায় তুমি ভালবাসো?”

“প্রাণে মোহনবীণা বাজে যখন তুমি কাছে আসো”

সারস বলে, একটু হেসে দীর্ঘ গ্রীবা বাঁকিয়ে চেয়ে

শিরায় শিরায় ধমনীতে বিদ্যুৎ তার যায় যে ধেয়ে

 

রোদ্দুর আজ একটু নরম, গায়ে মেঘের পশম চাদর

নদীর চরে ঘাসের পরে টুপটুপে চুপ শিশির আদর

কৃষ্ণচুড়া গাছের তলে লালসোহাগি রাশি রাশি

ভিজে হাওয়ায় লাগিয়ে নেশা রাখাল দুরে বাজায় বাঁশি

 

সারস এখন আরও ঘন, প্রিয়ার নরম আঙ্গুল ছুঁয়ে

সংযম আর বাঁধন যত হঠাৎ কেমন যাচ্ছে ধুয়ে

“আজ সকালে আমার মত এমন সুখি আছে কে জন

ওই চোখেতে জীবন আমার ওই ঠোঁটেতে আমার মরণ”

 

প্রিয়তমের নিবিড় ছোঁয়ায় কাঁপছে শরীর থরথর

পায়রা গরম প্রিয়ার বুকে উঠছে তপ্ত বালু ঝড়

“সাজিয়েছি এই শরীর আমার, সহস্র যুগ, কল্প ধরে

আজ যদি এই মিস্টি ভোরে, দিই তোমাকে, নিঃস্ব করে

যখন হবো সাঁঝের তারা, রাখবে আমায় অমর করে?”

প্রেম সোহাগি সারসি কয়, প্রিয়র গলা জড়িয়ে ধরে।

“মৃত্যু থেকে আনব কালি তোর কাহিনি লিখব বলে,

তোর ছবিটা আঁকব ছন্দে, ভাসবে সবাই নয়নজলে”

 

অকস্মাৎ প্রেমিক পাখি নীরব হল চিরতরে

বিঁধেছে এক সুতীক্ষণ তীর, বুকের থেকে রক্ত ঝরে

নিষ্ঠুর এক শিকারি ব্যাধ, বাণ ছুড়েছে সুযোগ বুঝে

মুগ্ধ নয়ন প্রিয়ার পানে, সারস পাখি চক্ষু বোজে

স্বজনহারা শোকাকুলা সারসির আঁখিতে অশ্রুধারা

তপ্ত লোহা পড়ছে গলে রুদ্ধ আবেগ কথা হারা

মরনপারেও সাথ দেবে সে চিরসাথির, পাগলপারা

রক্তজলে লুটিয়ে পড়ে স্থির হল তারও চক্ষুতারা

 

কাঁদছে সকাল, কাঁদছে নদী, বিষাদ বেদন বাজছে করুণ

অশ্রুজলে ঝাপ্সা নয়ন ব্যাথিত এক সৌম্য তরুণ

দুর্দান্ত এক দস্যু ছিল কঠোর নিঠুর পাষাণ হৃদয়

প্রেমময়ের নামটি গেয়ে এখন সে হৃদি করুণাময়

নয়ন ভরে দেখছিলেন তিনি পাখি দুটির মিলনমেলা

আচম্বিতে ব্যাধের শরে সাঙ্গ হল প্রানের খেলা

গন্ড বেয়ে অশ্রু ঝরে পক্ষি দ্বয়ের মৃত্যু শোকে

গভীর ব্যাথা গান হয়ে ফোটে হঠাৎ দুটি পুণ্য শ্লোকে

 

“অসতর্ক মিথুনরত প্রেমিকবরের প্রাণটি চুরি করে

অয়ি আর্য, তুমি শান্তি পাবে না অনন্তকাল ধরে”

 

দীর্ঘচঞ্চুর আত্মা যেন প্রবেশ করেছে প্রাণের পরে

কথা দিয়েছিল সে অমর কথা লিখবে প্রিয়তমার তরে

মৃত্যুপারের মসিলেখনিতে লিখবে সে তার প্রিয়ার কথা

তাই বুঝি সে নীথর পাখি হয়েছে ঋষির মর্মব্যাথা

 

ঋষি ভাবেন,

“লিখব আমি প্রেমকাহিনি অতল, অমর শেষ-না-হওয়া

যে প্রেমে আপন বিলিয়ে দেওয়া, কিছু না নিয়ে শুধুই দেওয়া

আমি আদি কবি, আমি অশ্রুত, আমি লিখব হাজার বছর ধরে

অসমাপ্ত এক প্রেমগাথা, রাখব তোদের অমর করে”

Facebook Comments

পাঁচ হাজারি – রম্যরচনা

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” – কবিবর নেহাতই সেকেলে মানুষ ছিলেন বলে এরকম একটা হাবিজাবি মনগড়া কথা লিখে গেছেন। কথাটা আসলে হবে “যদি তোর ঢাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা পেটাও রে”! একলা ঢাক একটু আধটু পেটাতেই হয় আজকাল। আপনি যদি চাচা চৌধুরীর বুদ্ধি, রাকার বাহুবল, জেমস বন্ডের আগ্নেয়াস্ত্র আর ফেলুদার মগজাস্ত্র নিয়েও জন্ম নিয়ে থাকেন বা “জন্মগ্রহণ” করে থাকেন আর সেই গুমোর নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকেন আর ভাবেন কেউ এসে আমার ঢাকটা বাজিয়ে দেবে, তাহলে অতি অবশ্যই কিছুদিনের মধ্যে আপনার কিছু বিজাতীয় কেশরাশি প্রজ্বলিত হওয়ার কটুগন্ধ টের পাবেন যখন দেখবেন ঢক্কানিনাদ তো দূরের কথা শুদ্ধ নিষাদ-এও আপনার সুরটি বাজছে না। অন্যের ঢাকে কাঠি দেওয়ার থেকে তার পেছনে কাঠি দেওয়ার পরিতৃপ্তি ও পরিব্যাপ্তি অনেক বেশি। তাই নিজের গুণমুগ্ধ ভক্ত হন আর নিজের ঢাকেই কাঠি করুন। সজোরে করুন যাতে বহুদূর অব্দি ঢাকের বাদ্যি শোনা যায়। আসলে নিজের ঢাক নিজে পেটানোর মধ্যে অহংকার নয় একটা প্রচ্ছন্ন বিনয় থাকে কারণ ঢাকের বাজনা যে কথাটা তালে ছন্দে বলে যায় সেটা হল “আমার ঢাক পেটানোর জন্য অন্য কেউ নেই”। অন্যেরা আপনার ঢাক পেটানো আরম্ভ করলেই আপনি ঢাকের কাঠি সযত্নে নামিয়ে রেখে নির্ঘাত বিনয়ের অবতার হয়ে যাবেন – এই না না, আমি কি আর তেমন করেছি? সাথে যোগ করে দেবেন সেই ফেমাস ডায়ালগটি। সমুদ্রের ধারে বসে নুড়ি কুড়িয়েছি মাত্র।

As soon as, লোকে আমার ঢাকে কাঠি করা শুরু করে, আমিও বিনয়ভারে অবনত হয়ে যাব ঠিক করেছি। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে অন্যেরা আমার ঢাকে কাঠি করছেন না। তাই আপাতত নিজের ঢাক নিজেই পেটাই। বছর দুয়েক আগে ওয়েব দুনিয়ায় যযাতির ঝুলি বলে একটি বীজবপন করেছিলাম। মাঝে মাঝে জল দিই। একটু সার, কীটনাশক দিই। আজ দেখছি গাছটা বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ফেসবুক প্রাঙ্গনে দেখি তার পাঁচ হাজার লাইক। চেনা মানুষেরা খুব একটা সাথ দেবে না সেটা জানতাম। কিন্তু অচেনারা যে এমন করে সাথী হবে সেটা জানতাম না। তাই যাঁরা যযাতির ঝুলি পড়েন এবং পড়ান তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণাম। আরও অনেক গল্প, কবিতা, রম্যরচনা নিয়ে যযাতি বুড়ো হাজির হবে আপনাদের কাছে। ভাল লাগলে কমেন্ট বক্সে জানিয়ে যাবেন। শেয়ার করবেন নিজের টাইমলাইনে। আর পারলে নিজের বন্ধুদের যযাতির ঝুলি লাইক করার সৎ পরামর্শ দেবেন :-)। যাঁরা যযাতির ঝুলিতে সবে সবে যোগ দিয়েছেন, ফিরে গিয়ে পুরনো লেখাও পড়তে পারেন। খারাপ লাগবে না – এটা যযাতির নিশ্চয়তা। আপনাদের সহায়তায় যযাতির ঝুলির বৃত্ত বৃহত্তর হোক মহত্তমের কাছে এই প্রার্থনা করি।

Facebook Comments

আত্মজ – ছোটগল্প

বাবা তোমার মুখে এরকম ভয়ঙ্কর নির্লিপ্তি কেন? তুমি কি বুঝতে পারছ না আমার কত কষ্ট হচ্ছে? তুমি কি বুঝতে পারছ না বাবা আমি মরে যাচ্ছি? অনেকটা রক্ত বেরিয়ে গেছে। ঘরের বিছানায় পড়ে আছি আমি। তুমি কিভাবে এলে এখানে? কার কাছে খবর পেলে? এসেছই যদি ওভাবে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে দেখছ কেন? আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছ না কেন বাবা? বিদিশা আমায় সতেরো বার স্ট্যাব করেছে। আমার হার্ট লিভার কিডনি সব ফালা ফালা করে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করো ওর সাথে চীট আমি করি নি। ওকে ঠকাই নি আমি। ও মিথ্যে সন্দেহের বশে…

পুরোটাই কি মিথ্যে অজয়?

অ্যাঁ? তুমি…তুমি কি অনহিতার কথা বলছ? অনহিতা জাস্ট আমার অফিস কলিগ ছিল। দ্যাট’স ইট। আমি কোন দিন ওকে সে ভাবে দেখি নি – বিদিশা যেরম মনে করে।

তাই কি? আমার যেন মনে হচ্ছে তোমার যেন একটা দুর্বলতা ছিল অনহিতার ওপরে। সেই একটা শনি বারে যখন বিদিশা শপিং-এ বেরিয়ে গেল, তুমি বিনা কারণে অনহিতাকে চ্যাটে ধরো নি?

হ্যাঁ ইয়ে। ধরেছিলাম। কিন্তু তুমি…তুমি জানলে কি করে? যাই হোক, যখন জেনেই ফেলেছ তখন সত্যি বলি। সত্যি বলতে আমার একদম কিছু ছিল না তা নয়। আমার ওর সাথে কথা বলতে ভাল লাগে। ও আমায় বোঝে। তবে ওকে শুধু আমি বন্ধুর চোখেই দেখি। কিন্তু তুমি জানলে কি করে?

আমি জানি। কিন্তু সত্যিই কি বন্ধুর চোখে দেখো ওকে?

হ্যাঁ.. বিশ্বাস করো। তার বেশি কিছু নয়। একদম সত্যি এটা।

তবে একদিন বিদিশাকে রাতে আদর করার সময় মনে মনে তুমি অনহিতার কথা ভেবেছিলে কেন?

কি বলছ তুমি? কক্ষনো নয়। ইয়ে মানে। হ্যাঁ। ভেবেছিলাম। সে একটা প্রচন্ড দুর্বল মুহুর্তে। কিন্তু সে তো আমি কাউকে কখনো বলি নি। আমার গোপনতম সিক্রেট। তুমি কি করে জানলে বাবা? হাউ কুড উ?

জানি আর এও জানি, বিদিশাকে তুমি শুরুতে ভালইবাসতে। কিন্তু তোমাদের মধ্যে ইন্টেলেকচুয়াল লেভেলে কোন  বন্ধুত্ব ছিল না। তাই তোমরা একে অপরের থেকে ধীরে ধীরে দুরে সরে গেছো।

ঠিক ঠিক। ভীষণ সত্যি। আমি অনেকবার ভেবেছি এই কথা। কিন্তু তুমি আমার সব মনের কথা জানলে কি করে বাবা? বুঝেছি। তুমি আমার ডাইরি পড়েছ। আমার পারমিশান না নিয়েই আমার ডাইরি পড়লে? দ্যাট ওয়াজ নট ফেয়ার।

না। ডাইরি আমি পড়িনি। বিদিশা সন্দেহ করার পরে, বাড়িতে অশান্তি শুরু হওয়ার পরে, তুই তো ডাইরিটা ছিঁড়েখুড়ে সেই রাস্তার ধারে বড় ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এলি। কি করে পড়ব?

কিন্তু তখনও তো তোমরা কিছু জানতে না। তখনও তো পাঁচকান হয় নি ব্যাপারটা। তবে কি করে জানলে আমার ডাইরি ছিঁড়ে ফেলার কথা?

তোর মনের কথা জানতে আমায় তোর ডাইরি পড়তে হয় না। তোর মন ডাইরেক্ট পড়ে ফেলি। আমারই হাতে গড়া মন কি না।

মানে?

আর ওই ডার্ক ইচ্ছেগুলো আমিই তো দিয়েছি। তুই অনুশোচনা করিস না। তোর তাতে কোন দায় নেই, দোষ নেই। অজয় এই সব বিরোধ, কনফ্লিক্ট তো আমি তোকে এই জন্য দিয়েছিলাম যাতে তুই এই সংসার থেকে ডিটাচড হয়ে ইন্ট্রোস্পেক্ট করতে পারিস। আত্মবিশ্লেষণ। আত্মসমীক্ষা।  বোঝার চেষ্টা করতে পারিস তোর স্বরুপ। একটা করে খেলনা দিয়েছি। কেড়ে নিয়েছি। যাতে সব খেলনাতে ইন্টারেস্ট হারিয়ে নিজেকে চিনতে চেষ্টা করিস।

তুমি দিয়েছিলে? মানে কি? তুমি দেবার কে? হ্যাঁ আমি সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে দু একবার একলা বসে ভাবার চেষ্টা করেছি। যে আমি কি চাই? কি পেলে শান্তি পাব? আমি লোকটা আদতে কে? কিন্তু তারপর আবার দৈনন্দিন জীবনের চাহিদারা আমায় জোর করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু তুমি এইসব কনফ্লিক্ট দিয়েছ কথাটার মানে কি? তুমি দেবার কে? আমি সত্যি বুঝতে পারছি না বাবা।

ওয়েল। যদি নিজেকে জানার চেষ্টাটা চালিয়ে যেতিস, তাহলে আজ আমায় তোকে খুন করতে হত না।

কি বলছ? তুমি আমায় খুন করেছ? বিদিশা তো আমায় স্ট্যাব করল। ঘুমের ঘোরে আমার নাকে কি একটা ধরল। আমার হাত পা অবশ হয়ে গেল। প্রতিরোধ শক্তি চলে গেলেও আমি সব বুঝতে পারছিলাম। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছিল।

হ্যাঁ আমিই ওকে দিয়ে করিয়েছি অজয়। আমার কিছু করার ছিল না। আমায় ক্ষমা করে দিস। আমারও কষ্ট হবে তোকে ছেড়ে থাকতে। কিন্তু এই কাজ তুই-ও তো করেছিস অজয়। তুই একটা কম্পুটার সিমুলেটেড ব্রেন  নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছিলি না? মৃত্যুঞ্জয় নাম দিয়েছিলি তার। সে তোকে বাবা বলে জানত। সেটাকেও তো তোকে মডেলটা এক্সপেক্টেড ওয়েতে বিহেভ করছিল না বলে টার্মিনেট করতে হয় । আমি সেই একই দোষে দোষী মাত্র। তার বেশি নয়।

ওটা একটা প্রোগ্রাম ছিল বাবা। তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু আমি? আমি তো একটা রক্ত মাংসের মানুষ….তুমি আমার নিজের বাবা হয়ে পারলে বিদিশাকে দিয়ে এই কাজ করাতে? আমি, আমি কত কষ্ট পাচ্ছি দেখতে পাচ্ছ না? আমার সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রনা…

যদি উত্তরটা পাওয়ার দিকে এগোতিস, তাহলে আমাকে এই ভাবে প্রোগ্রামটা টার্মিনেট করতে হত না। । আমার এই মডেলটাও ফেল হয়ে গেল। অজয়, তুইও মানুষ না। তোর শরীর নেই। ওটা মিথ্যে কল্পনা। তুইও তোর সৃষ্ট মৃত্যুঞ্জয়ের মতই একটা কম্পুটার সিমুলেটেড কনসাসনেস। আমি তোর মধ্যে তোর হাত পা মাথা আছে এই বোধ ভরে দিয়েছি।  এই যে তোর নাম অজয় এই বোধ ভরে দিয়েছি। বিদিশাও আমারই তৈরি একটা কম্পুটার সিমুলেটেড কনসাসনেস। তুই তোর জীবনে যত লোকের সাথে আলাপ করেছিস কেউ সত্যি নয় রে। ওরাও তোর মতই কম্পুটার সিমুলেশান। একটা লাইব্রেরি অব সিমুলেটেড ব্রেন ইম্পোর্ট করেছি তোর ডিজিটাল জীবনে। এই চুয়াল্লিশ শতাব্দিতে স্ট্যান্ডার্ড রেডিমেড ব্রেন লাইব্রেরি পাওয়া যায় কিনতে। কিন্তু তোর মনটা, তোর চেতনাটা আমার নিজের সৃষ্টি। তুই আমার সন্তান।

কি সব বলছ? এটা হতে পারে না। আর এটা তো একত্রিশ শতাব্দি। চুয়াল্লিশ কি করে হল?

আজকে যত তারিখ বলে তোর ধারণা সেটাও যে আমিই ভরেছি তোর প্রোগ্রামে। একটু পুরোন দিনে ফেলে ট্রাই করছিলাম। তোর মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়কে সৃষ্টি করার ইচ্ছেও আমি-ই দিয়েছি। আসলে আমি এই নেস্টেড সিমুলেশানটা চালাচ্ছিই এই জন্য যাতে এই পরস্পর বিরোধী বোধগুলোর মধ্যে থেকে কোন একটা অন্তত সিমুলেটেড কনসাসনেস বুঝতে পারে কিনা যে এগুলো হতে পারে না। দীজ আর আটার নন্‌সেন্স। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হতে পারে না। মানুষ বোকার মত ধর্মের নামে একে অপরকে মারতে পারে না। দীজ আর পসিবল ওনলি ইন আ প্রোগ্রামড ওয়ার্ল্ড। যাতে সে বুঝতে পারে যে সে সত্যিকারের মানুষ নয়, একটা কম্পুটার প্রোগ্রামের একটা থ্রেড মাত্র। যদি সেই ব্যাপারটা বুঝতে পারতিস বা তোর সন্তান মৃত্যুঞ্জয় অন্তত বুঝতে পারত তাহলে আমাকে তোর প্রোগ্রামটা টার্মিনেট করতে হত না। তুই অমর হয়ে যেতিস। তুই পারলি না। আমি আবার একটা নতুন সিমুলেশান ট্রাই করব। এখনও ভেবে দেখ যদি বুঝতে পারিস তোর স্বরুপটা। তাহলে আমি এখুনি হাসপাতালে গিয়ে সুস্থ হয়ে যাওয়ার বোধ তোর কৃত্রিম মনে ভরে দিতে পারি।

বাবা, আমার এই হাত, পা, মাথা কিছু সত্যি নয়? আমি সত্যি নই? আমি অজয় নই? আমি কিছুতেই মানতে পারব না বাবা…

আচ্ছা দাঁড়া। তোর হাত পা নেই কিনা দেখবি? আমি তোর বডি কনসাসনেস মডিউলটাকে শাট ডাউন করে দিই। এবার বুঝছিস? হালকা লাগছে?

না না না। তুমি জাস্ট একটা সিডেটিভ দিয়েছ। তাই আমি হাত পা মাথার বোধ আর পাচ্ছি না। আমি কিছুতেই মানতে পারব না আমার এতদিনের এত কিছু সব মিথ্যে। বাবা আমি অজয় তোমার ছেলে…

কন্ট্রোল সি মেরে দেন বিজয় বাবু। অজয় নামের প্রোগ্রামটা বন্ধ হয়ে যায়। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে দেওয়ালের দিকে শুন্যগর্ভ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। পারল না তার এই সিমুলেশানটাও সেল্ফ কনসাস হতে। নিজেকে জানতে। আবার করে করতে হবে…তবু মনে তার কেন জানি কষ্ট হয়। যতই সিমুলেশান হোক, তারই তো সন্তান। গর্ভপ্রসুত না হলেও তারই তো মস্তিস্ক প্রসুত। আত্মজ। বিজয় বাবু ভাবেন “আফটার অল তিনি তো মানুষ। কষ্ট হওয়া তো স্বাভাবিক।”

*****

চিন্তিত মুখে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে ধনঞ্জয়। নাহ, তিনি মিছেই আশায় দিন গুনছেন। এই বিজয় এখনও ভাবছে ও আদতে মানুষ। আর ওর দ্বারা সৃষ্ট অজয় একটা সিমুলেটেড কনসাসনেস। ও এখনও বুঝছে না যে ও নিজেও একটা কম্পুটার সিমুলেশান মাত্র, ওর ছেলেরই মত। ওর ছেলের ছেলেরই মত। ও এখনও ভাবছে এটা চুয়াল্লিশ শতাব্দি। ওই টাইমফ্রেমটা ওর সিমুলেশানে আমি ভরেছিলাম। ও এখনও বুঝছে না এটা আসলে আদতে সাতাত্তর শতাব্দি। ও সেলফ কনসাস হতে পারল না। বিজয়কেও টার্মিনেট করে দিতে হবে। নতুন করে আর একটা সিমুলেশান শুরু করতে হবে। শুধু মায়ার বশে করতে পারছেন না। তিনি তো মানুষ।

*****

ধনঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে হতাশায় মাথা নাড়ে তার সৃষ্টিকারী সিমুলেটেড ব্রেন দুর্জয়….

[প্রকাশিত পরবাস ৭০ সংখ্যা https://parabaas.com/PB70/LEKHA/gSwarvanu70.shtml  ]

Facebook Comments

বাংলা – রম্যরচনা

“হুঁকোমুখো হ্যাংলা বাড়ি তার বাংলা” বলে গেছেন সুকুমার রায়। ভদ্রলোককে নস্ত্রাদামুস পুরস্কারে ভূষিত করতে মন চাইছে কারণ এত বড় একটা ভবিষ্যবাণী এত দিন আগে থেকে করে রাখা চাড্ডিখানি কথা নয়। কারণ সত্যি সত্যি পশ্চিমবঙ্গ ওরফে ওয়েস্ট বেঙ্গল নাম বদলে বাংলা হতে চলেছে, স্রেফ বাংলা মানে বাংলা বাংলা আর কি। ইতিহাসের কুইনাইন খাইয়ে মাথা ধরানোর ইচ্ছে নেই। তবু একটু ফ্ল্যাশব্যাক। এই ধরুন সাত আট শতক আগে ছিল অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ অর্থাৎ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা। অবশ্যই এর মধ্যে বঙ্গ আমাদের বাংলা। বঙ্গ কেমনে বাংলা হল সে কথা সুনীতিকুমার ভাল জানবেন। আর এখন গুগল করতে ইচ্ছে করছে না, তাই আমার অনুমানটা বলি। লিপিস্টিক আবিষ্কারের অনেক আগে বঙ্গললনারা তাম্বুল রাগে তাদের বিম্বোধর রঞ্জিত করত। খটোমটো বাংলা হয়ে গেল? মানে পাতি বাংলায় পান খেয়ে ঠোঁট লাল করত যাতে প্রিয়পুরুষটির হার্টরেট এই ধরুন টেন পার্সেন্ট বেড়ে যায়। পান খাওয়া ভাল জিনিস – নেশাকে নেশাও হয়, সাথে প্রসাধন ফ্রি। পরে ম্যাক, রেভলনের তন্বী সুন্দরী লিপস্টিকরা এসে পানেদের সেই একচেটিয়া ঠোঁটবাজার কিছুটা খেয়ে নিয়েছে কিন্তু সে কথা অন্য। কথা হচ্ছিল বঙ্গ কি করে বাংলা হল। আমার মনে হয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পান-খাওয়া বাঙালি পান খেয়ে দেশের নাম বলতে গিয়ে একটা এক্সট্রা ল জুড়ে দেশের নাম বানিয়ে দেয় বঙ্গ’ থেকে বঙ্গাল, মানে ঐ অতিরিক্ত ল টা মুখভর্তি পানের পিকজাত আর কি! অবশ্যই এটা আমার অনুমান। যাই হোক, বঙ্গাল শব্দটা ভারি গুরুগম্ভীর ছিল, বঙ্কিমি স্টাইল। অথচ মানুষ গুলো চরম ল্যাদ। জিভের ওপর অযথা স্ট্রেস দেওয়া স্বাস্থ্যকর নয় ভেবে আমরা নিজেদের বঙ্গালী থেকে বাঙালি করে নিয়েছি আর সেই সাথে বঙ্গালকে বাংলা। বাংলাটা কেমন বাংলা শোনায় না? বেশ একটা হৃদয়ের সংযোগ, একটা সখ্যতা স্থাপন হয়, ঠাট্টা ইয়ার্কি চলে। বঙ্গালের সাথে বোধ হয় তেমনটা চলত না? কিন্তু যারা সেই বনিকের মানদণ্ড নিয়ে এসে ছক করে সেটাকে রাজদণ্ড বানিয়েছিল, সেই ইংরেজ জাতি কিন্তু সিরিয়াস জাতি। তাঁরা এই বাঙালি বালখিল্যপনায় যোগ না দিয়ে ওরিজিনাল নাম বঙ্গালটাই ধরে রাখলো। শুধু বঙ্গালকে বেঙ্গল করে নিলো নিজেদের সৃজনশীলতার পরিচয়স্বরূপ বোধ হয়। স্বাধীনতার সময় এক বাংলা কাঁচি হয়ে মাঝে কাঁটাতার পড়ল। সঙ্গে পড়ল অনেক গ্যালন রক্ত ফ্রীতে। আমরা হয়ে গেলাম ওয়েস্ট বেঙ্গল বা পশ্চিমবঙ্গ। এদিকে হুকোমুখো তাকে তো সেই মহান শিশু কবি সুকুমারবাবু বলে গেছেন “তোর বাড়ি বাংলা”। সে বেচারি গুগল মাপে খুঁজে খুঁজে মরে। দেশের ম্যাপে না পেয়ে খোঁজ করে দেখে একটা বিদেশ আছে যার নাম বাংলাদেশ। তো হুকোমুখো সেখানেই গিয়ে স্থায়ী আস্তানা গাড়তে বিদেশমন্ত্রকের কাছে আবেদন জানাবে ভাবছে, এমন সময় পশ্চিমবঙ্গ নাম বদলে হয়ে যাচ্ছে বাংলা। হুকোমুখো শেষমেশ দেশবাসী হল। “বাংলা” শব্দটার আরও একটা মানে বাড়ল। বাংলা বলতে একটা রাজ্যও হল। শব্দটা অলরেডি বহু অর্থবাহী, অনেক connotation। কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।

“তুই বাংলা বল না এই কাজটা তোর দ্বারা হবে না” – এখানে “বাংলা বলা” অর্থে “পরিষ্কার করে বলা”। তারপর ধরুন, “কোথায় বাংলা বসে বসে একটু খেলা দেখব তা না বস ফোন করে ভাটাচ্ছে” – এ ক্ষেত্রে “বাংলা” মানে হল “আরাম করে”। তারপর ধরুন পাড়ার দাদা বলছে “এই যে চাঁদু বাংলা বোঝো না? এ পাড়ায় দোকান চালাতে হলে কেলাব ফান্ডে মাল্লু ছাড়তে হবে” – এখানে “বাংলা” মানে “সোজা কথা”। তারপর “আজকে স্কুলের লাস্ট পিরিয়ড দুটো বাংলা কাটিয়ে দে। রাম তেরি গঙ্গা মইলি পার্ট টু এসেছে। এবারে মন্দাকিনীর জায়গায় সানি লিয়নে” এখানে “বাংলা কাটিয়ে দেওয়া” মানে “পাতি কাটিয়ে দেওয়া”। এ তো গেল বাংলার অব্যয় রুপে ব্যবহার। বাংলার বিশেষ্য বা নাউন ব্যবহার-ও আছে। যেমন ধরুন “খোট্টা গুলো বাংলা জানে না” এখানে বাংলা মানে বাংলাই, মানে বাংলা ভাষা আর কি! বাংলা খেয়ে বিষক্রিয়ায় দশ বিশ জন সুধী বাঙালি যখন পটলডাঙার বাসে চড়ে বসে, বুঝতে অসুবিধে হয় না কোন অমৃতসুধা বাংলার কথা বলা হচ্ছে।  বাংলার বিশেষণ ব্যবহারও আছে। যেমন ধরুন “ব্যাপারটা খুব বাংলা হয়ে যাচ্ছে না?” এখানে “বাংলা” মানে “সাধারণ, পাতি”। বাংলার আগে জয় জুড়লে আবার চোখে পড়তে হয় রোদচশমা। বাংলা নামে দেশ আছে সে কথা আগেই বলেছি। এখন দুগ্গা দুগ্গা বলে একটা রাজ্য নেমে গেলেই সোনায় সোহাগা হয়।

শুধু দুঃখ হচ্ছে কিছু ক্যালকেশিয়ান বাংলা মায়ের জন্য যাদের অ্যাংলো পোলাদের বাংলাটা ঠিক আসে না। একেই রাস্তায় ঘাটে বাসে ট্রামে ডিসগাস্টিং বাংলা ভাষা শুনে কানে আঙুল দিতে হয়, তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হবে এখন আবার বাংলা রাজ্যে থাকতে হবে। ওয়েস্টবেঙ্গল নামটার তাও কিছু কৌলিন্য আছে, হাজার হোক ব্রিটিশদের দেওয়া, মহারাণীর ব্লু ব্লাডের একটু ছিটেফোঁটা তো আছে নিশ্চয় তাতে। কোথায় নাম বদলে ব্রিটেনের অনুকরণে ব্রিটানিয়া (নট মেরী গোল্ড) রাখবে তা না নাম বদলে বাংলা? This is utter rubbish.

তবে ভাগ্যি ভাল, রাজ্যের নাম বদলে বাংলা করছে, হাওড়া ষ্টেশানের নয়। মেট্রোরেল টিকিট কাউন্টারে অলরেডি লোকজন দেদার তিনটে নজরুল, দুটো রবীন্দ্রনাথ কিনে নিচ্ছে মাত্র পঞ্চাশ টাকায়। ভাবুন? তিন তিনখানা নজরুল, দু দু খানা রবীন্দ্রনাথ, মূল্য মাত্র পঞ্চাশ টাকা। হাওড়া ষ্টেশানের নাম বদলে বাংলা করলে বাংলাও রোজ বিক্রি হত জলের দামে। এ কথা শুনলে রাজা লক্ষন সেন তো বখতিয়ার খিলজির কাছে তাড়া খেয়ে পালানোর আগেই কাঁসাই নদীতে ডুবে মরতেন। ওপারে বাংলা দেশ থাকুক, এপারে বাংলা রাজ্য থাকুক, দুই পারেই বাংলা ভাষা আর বোতলভর আকণ্ঠ নেশার পানীয় বাংলা থাকুক, কিন্তু ষ্টেশান না হলেই হল।

কবি জীবনানন্দ বলেছেন “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়”। ধানসিঁড়ি না হয় ওপার বাংলা ভাগে পেয়েছে, কিন্তু আমাদের রূপনারাণ আছে, তিস্তা, জলঙ্গী আছে আর এখন থেকে আমরাও বাংলা। তাই তিস্তা, মহানন্দার তীরে এপার বাংলায় তিনি ফিরতে চাইলে আমরা হই হই করে নিয়ে নেব কবিকে।

Facebook Comments

অন্তর্জলি যাত্রা – রম্যরচনা

Thirty four friends started their journey. Only one of them returned….

আলোর জগৎ থেকে অতি দ্রুত নেমে এসেছি এই অতলান্ত অন্ধকারে। এখানে সময় গতিহীন। এখানে সব ঘড়িদের ছুটি। শব্দের জগৎ থেকে এ জায়াগাটা শুধু একটুখানি দূর। তবু এখানে হাজার হাজার বছর ধরে জমে আছে নৈঃশব্দ। জমে আছে ভাষাহীন ভাষা। মুম্বাইয়ের এক ব্যস্ত সকালে ছুটির ঘন্টা বেজে উঠেছিলো আমার দু কামরার বরিভেলির ফ্ল্যাটে। দেবেন্দ্রদার আন্ধেরীর অ্যাপার্টমেন্টে, লোকেশের ঘাটকোপড়ের বাড়িতেও সকাল সকাল একই ব্যস্ততা। প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্যে, সহ্যাদ্রি ঘাটের মৌনতায় বন্ধু, সহকর্মীদের সাথে হাসি, গল্প, ঠাট্টায় কয়েকটা দিন। তারপর আবার সেই দৈনন্দিন মুখরতায় ফিরে আসা। কাকভোরে উঠে চটজলদি দাঁত মাজা, দু ঘটি জল ঢেলে নেওয়া। তারপরে জামাজুতো পরতে পরতে হোয়াটসআপ মেসেজ চেক করে নেওয়া। আসন্ন দিন তিনেকের এক্সকারশান নিয়ে আবশ্যক অনাবশ্যক টুকিটাকি কথা। একটু পরেই বাসে চেপে চৌত্রিশজন সহকর্মী পাড়ি দেবে মহাবালেশ্বর। ঘর থেকে বেরোনোর সময় আমার তিন বছরের মেয়েটা ঘুম চোখে “বাবা বাই বাই সী উ”, কচি হাতের একটা ফ্লায়িং কিস। বাসে ওঠার আগে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে সক্কলে মিলে একটা গ্রুপ পিকচার। বাসে উঠে জানলার ধারের সীট নেওয়ার জন্য হুটোপাটি। মহাবালেশ্বরের পথে বাস চালু হওয়া মাত্র সকলে সমস্বরে “গণপতি বাপ্পা মোরিয়া”। চলতে থাকা বাসে অনেকগুলো হাসি মুখ। খুচরো ইয়ার্কি, লেগ পুলিং। জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে প্রকৃতির অতুল ঐশ্বর্য দেখতে থাকা অনেকগুলো মুগ্ধ চোখ। বৃস্টি ভেজা পশ্চিমঘাটের অনবদ্য দৃষ্টিনন্দন শ্যামলিমা। শ্যাওলা সবুজ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে বর্ষার জলে পুষ্ট হঠাৎ-চঞ্চলা ঝর্ণা। মোবাইলের ক্যামেরাতে আলোছায়ায় ধরে রাখা টুকরো স্মৃতিরা। হঠাৎই…হঠাৎই এসব কিছুর প্রয়োজন ফুরোল। সময় এল রাজার মত। হাত ধরে নিয়ে এল শব্দ থেকে নৈশব্দের এই অদ্ভুত জগতে। শুধু কিছু কথা বাকি রয়ে গেল। কিছু ইচ্ছে। বাড়িতে এখনো অপেক্ষারতা সেই খুদে বন্ধুটির সাথে আর একবার অফিস থেকে ফিরে ডাক্তার-রুগি খেলা হল না। তার কচি আঙুলগুলো নিজের আঙুলের মধ্যে ধরে আর একবার উপভোগ করা হল না সন্তান স্পর্শসুখ। ছুটির দুপুরে আমার জীবনসহচরীটির স্নানান্তে সুগন্ধি চুলের ঘ্রাণ আর একবার নেওয়া হল না।

এখানে শুধু নিশ্ছিদ্র মৌনতা। নিরন্তর শান্তি। অখণ্ড নিস্তব্ধতা। সেই খুদে প্রাণিটি হয়তো একরাশ উৎসাহ নিয়ে তার মাকে জিগেস করবে “বাবা কবে ফিরবে মা?” ওর মা চোখ মুছবে ওড়নার খুঁট দিয়ে। দুদিন, পাঁচদিন দশ দিন জিজ্ঞাসা করতে করতে আমার কন্যার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কটিও বুঝে যাবে – না। বাবা আর কোনোদিনও ফিরবে না। কিছুটা সময় লাগবে। এই নিষ্ঠুর সত্যটা ওর বুঝে নিতে কিছুটা সময় লাগবে, আর ওর মায়ের…মেনে নিতে।

 

https://timesofindia.indiatimes.com/city/pune/at-least-10-killed-as-bus-plunges-200-feet-deep-into-gorge-in-raigad/articleshow/65175833.cms

Facebook Comments

অবশিষ্ট আমি – কবিতা

বন্ধুরা তোমাদের সাথে অনেকদিন কথা হয়নি। তাই ভাবলাম আমার জন্মদিনে একটা পোষ্ট তো দেওয়া প্রয়োজন। প্রতি জন্মদিনেই আমি একটু self-reflect করি যে মানুষ হিসেবে আর একটা বছরে ঠিক কতটা উত্তীর্ণ হলাম। সেই ভাবনা থেকেই এই লেখাটা।

 

আমার তো এতটুকু আমি

বাকি ছেড়ে এসেছি এ পথে

কিছু রাখা আমার শহরে

কিছু রাখা মরু পর্বতে

 

কিছু রাখা মায়ের আঁচলে

কিছু রাখা পূজোর ছুটিতে

স্কুলের মাঠেতে রাখা কিছু

কিছু রাখা স্মৃতির মুঠিতে

 

আমার যা অবশিষ্ট আমি

মুঠো করা জল যেন সে-ও

প্রতিক্ষণে গলে পড়ে কিছু

রোজ হারায় আমার পাথেয়

 

এখন তো মিথ্যের মুখোশে

আমারই সে ছায়া বয়ে চলা

আজ সব শব্দ ধার করা

কথা বলা নয়, হরবোলা

 

আমার আজ যাপন নয়

নিখাদ সুপটু অভিনয়

অজস্র মিথ্যের আড়ালে

দিনগত শুধু পাপক্ষয়

 

আজ যদি নিষ্ঠুর হাতে

মনটাকে করি ব্যাবচ্ছেদ

দেখতে পাব, জানি দেখতে পাব

ঈর্ষা, গ্লানি, মিথ্যে আর ক্লেদ

Facebook Comments

ঘাসফুল – রম্যরচনা

বিকেলে প্রথমে টিপটিপিয়ে, পরে ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি পড়েছে। বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সমাহিত প্রসন্নতা থাকে, এমন একটা বুনো নিবিড় গন্ধবহা সাহচর্য থাকে যে ঘরে বসে থাকতে মন চায় না। উপরন্তু আমার ছোট্ট সঙ্গিনী বিকেলে দ্বিপ্রাহরিক ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই “ইন্সি স্পাইডার” দেখতে যাওয়ার দাবী জানিয়ে রেখেছে সজল নয়নে। ইন্সি স্পাইডার দেখতে যাওয়ার মানে হল আউটডোরে যাওয়া আর কোন গুল্মজাতীয় গাছের ধারে মাকড়সা স্পট করা। হ্যাঁ মাকড়সার অষ্টপদী-জুলজুলে-পুঞ্জাক্ষী সৌন্দর্যের প্রতি তার আছে ভয়মিশ্রিত অপার মুগ্ধতা। এমনই মাকড়সা প্রেম যে তাদের দর্শনমাত্র স্পর্শনাকাঙ্খা হয় অর্থাৎ কিনা ধরতে চেষ্টা করে। তখন এই বলে বিরত করতে হয় যে বন্যেরা বনে সুন্দর, মাকড়সারা জালে। তাদের জালমুক্ত করার ইচ্ছেটা খুব একটা সমীচীন নয়। মানুষ নামক প্রাণীর মত বিষাক্ত না হলেও আত্মরক্ষার খাতিরে একটু আধটু বিষ উদ্গীরণ তারাও করে থাকে। সে যাই হোক, তাই বৃষ্টি থামতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম সেই ছোট্ট সঙ্গিনীর হাত ধরে। কুট্টিপারা হাত খানা ধরে প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্যে ঘুরতে ঘুরতে ভেজা বাতাস ফুসফুসে ভরে নিতে বেশ লাগে। হাতটা ধরে রাখা জরুরী হয় নয়তো পাখি কি প্রজাপতি দেখলে তাদের সাহচর্য পেতে সেইদিকে ধাবমান হওয়ার একটা বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায় সেই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে। হাঁটতে হাঁটতে কোন বাঁক ঘুরতেই হঠাৎ যদি সবুজ শ্যামলিমার মধ্যে এসে পড়ি, উচ্ছ্বসিত সানাইয়ের গলায় খুশি ঝরে পড়ে – “প্রিটি”, “বিটিফুল” ইত্যাদি। সন্তানের চোখে খুশি দেখার থেকে বড় পুরস্কার বোধ হয় মানুষের কিছু হয় না। যাই হোক তার ক্ষুদ্র হাতের স্পর্শসুখ আর সদ্যস্নাতা আদ্র মায়াবী গোধূলির নৈকট্য উপভোগ করতে করতে আনমনে হাঁটছিলাম। হঠাৎ হাতে পড়ল টান। আমার ক্ষুদ্র সঙ্গিনী যে unpredictable সেটা জানতে বিশেষ অন্তর্দৃষ্টির দরকার হয় না। সে কেন থেমে পড়েছে, কোন বস্তু তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে ওর চোখের দিকে চোখ চালাই। না প্রজাপতি বা পাখিরা নেই, মাকড়সাদেরও অষ্টবক্র উপস্থিতি নেই। আছে একটি ঘাসফুল, এদেশে একে বলে ড্যান্ডিলিয়ন। বসন্তের শুরুতে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটে ওঠে তখন রাস্তার ধারে ধারে তাদের অপরূপ শোভা। কিন্তু বড়ই ক্ষণজন্মা তারা। একবার বৃষ্টি পড়লেই পাপড়ি টাপড়ি খসে নেহাত দৈন্যদশা। ফুলেদের জাতবিচারে এরা অবিশ্যি নিতান্তই দলিত। সুযোগ পেলেই মানুষের পা বা ময়িং মেশিন তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বসন্ত শেষে এই গ্রীষ্মে তাদের সকলেই প্রায় বৃন্তচ্যুত হয়েছে। এখানে একটা ড্যান্ডিলিয়ন এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আর আমার ক্ষুদ্র সঙ্গিনী বসে পড়ে ছোট আঙুল দিয়ে স্নেহ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার ফুলেল গায়ে। তার চোখে এই ঘাসফুলের রূপটুকু ধরা পড়েছে দেখে খুশি হলাম। সাথে এলো একটা অবসাদ। জীবনের পথ চলার কোন বাঁকে ওকে এই রুপসন্ধানী চোখখানা ফেলে যেতে হবে। কিছুতেই আটকাতে পারব না। এই নিষ্ঠুর বস্তুতান্ত্রিক সমাজ ঠিক কেড়ে নেবে ঐ চোখদুটো। শ্যামলিমার থেকে শপিং মলের আহ্বান ক্রমে ক্রমেই বেশি মনোগ্রাহী হবে। সমাজ বিসদৃশতা পছন্দ করে না। সবাইকে নিজের রঙে রাঙিয়ে নিয়ে তবে তার শান্তি। তার মগজ ধোলাইয়ের প্রক্রিয়াটি নির্ভুল ও পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত। সানাই ঘাসফুলটাকে বৃন্তচ্যুত করতে চাইলে বাধা দিলাম না। কোন মদগর্বী বুটের তলায় যাওয়ার থেকে ওর হাতে ভাল মানাবে। কিন্তু পরক্ষণেই বায়না – তার এই ঘাসফুল সংগ্রহের কৃতিত্ব দূরভাষযোগে মাম্মাকে জানাতে হবে। একজন মহাপুরুষ, সঞ্জয় দত্তের জীবন সম্বন্ধে জানতে সিনেমাহলে গেছেন মাম্মা। কিন্তু সে যুক্তি ধোপে টিকল না। ফোনটা না করে দিলে চোখে সজল আর মুখে সরব আকুতি। দোনামনা করে ফোনের বোতাম ঘোরালাম। আধো আধো গলায় দু চারবার ফ্লাওয়ার বলে তবে দেবী ক্ষান্ত দিলেন। সঞ্জয়রুপী রনবীরের গলা ছাপিয়ে সে গলা ও প্রান্তে পৌঁছল কিনা বলতে পারব না।

Facebook Comments

সুরপথ – রম্যরচনা

কয়েকদিন আগে একটা গানের আড্ডায় গেছিলাম। অনেক গায়েন আর বায়েনদের মেলা। বাগেশ্রী রাগে যন্ত্রসঙ্গীতের পরে আসছেন রবি কবি, রবীন্দ্রনাথের পরে আসছেন রফি সাহাব। হেমন্ত, কিশোর, ভুপেন হাজারিকা দিয়ে যাচ্ছেন ক্যামিও অ্যাপিয়ারেন্স। চন্দ্রবিন্দু বা হালচালের গীতিকার দেবদীপও সেখানে ব্রাত্য নয়। এই সুরের বাহারি বাগানের নাম সুরোধ্বনি। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম সঙ্গীত শিল্প মাধ্যমের কথা। মনে হল এই গান গাওয়ার সাথে আমি যে ফিল্ডে কাজ করি তার বোধ হয় বিশেষ সাদৃশ্য আছে। আমি কাজ করি ড্রাইভারলেস কার ইন্ডাস্ট্রীতে। মানুষের সাহায্য ছাড়াই একটা গাড়িকে তার গোমুখ থেকে সাগরের মোহনাতে পৌঁছে দেওয়া, তার শুরু থেকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল নিয়ে গবেষণা করা আমার কাজ। গান গাওয়ার ব্যাপারটাও কি অনেকটা সেরকম নয়? স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর মূল উপাদান দুটি। একটা নির্ভুল মানচিত্র – আমাদের ইন্ডাস্ট্রীতে একে বলে হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গাড়ির চাকাদের সময়মত ঘোরানো আর অন্যান্য সহযাত্রী গাড়িদের সাথে নির্ভুলভাবে সমাপতিত হতে সময়মত ব্রেক ও অ্যাক্সিলেটার প্রয়োগ করে গাড়ির গতি পরিবর্তন করা যাকে আমাদের পরিভাষায় বলে maneuver technique. স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে ছেড়ে দিয়ে আমরা আপাতত যদি মানুষচালিত গাড়ির কথা ভাবি, অনুরূপ দুটি জিনিসেরই দরকার হবে। মাথার মধ্যে থাকা বা মোবাইলের পর্দায় থাকা একটা হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর ম্যানুভারিং স্কিল। গাড়ি চালানো ভালভাবে জানা না থাকলে বা ম্যাপটা ভালভাবে জানা না থাকলে (ধরুন মোবাইলের সহায়তা পাচ্ছেন না, অত্যধিক ফেসবুক করে মোবাইল ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে 🙂 ) দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা। গায়ক বাদকদের ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকম। সুর যেন একটা অদৃশ্য পথ। আর সেই পথে স্বররুপী গাড়িকে চালনা করতে হবে। সেটাই চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ পথ বড় বিপদসংকুল। প্রথম বিপদ হল, সঙ্গীতশিল্পীদের সাহায্য করার জন্য কোন ইলেক্ট্রনিক ম্যাপ নেই। হ্যাঁ, ইলেক্ট্রনিক সুরযন্ত্র, আবহ যন্ত্রসঙ্গীত ইত্যাদি মোটা পথটা বাতলে দিতে পারে কিন্তু ম্যাপের খুঁটিনাটিটা থাকতে হবে নিজেরই মাথার মধ্যে। ডুয়েট বা গ্রুপ সঙ গাওয়ার সময় সহগায়করা আর সোলো গাওয়ার সময় সহবাদকরা যেন সেই একই অদৃশ্য রাস্তায় চলতে থাকা অন্যান্য গাড়ি। ম্যাপটাকে একটু ভুল বুঝলেই সেই সহযাত্রীদের সাথে ঠোকাঠুকি, রক্তারক্তি হওয়ার সম্ভাবনা। আরও একটা বড় সমস্যা হল সুরের পথে আমাদের পার্থিব পথদের মত কয়েকটি মাত্র নির্দিষ্ট রুট নেই। প্রতিটা গানেই সুরকার তার সৃজনশীলতা দিয়ে পত্তন করেন একটা আনকোরা নতুন রাস্তা, একটা আনদেখা পথ। সঙ্গীতশিল্পীকে বুঝে নিতে হয় লেনটা ঠিক কেমনভাবে বিধৃত, ঠিক কতটা চওড়া, কতটা দৈর্ঘ অতিক্রম করার পর আচম্বিতে আসবে একটা মোড়। আমাদের হাইওয়েতে যেমন থাকে স্লো লেন, ফাস্ট লেন সেরকমই হঠাৎই কোন লাইনে কি স্ট্যাঞ্জায় বাড়াতে হবে গানের গতি। চারচাকা গাড়ি চালানোর সময় গতি দশ-মাইল-প্রতি-ঘণ্টা অব্দি উপরনিচ করার বিলাসিতা থাকে। এক্ষেত্রে সে গুড়ে বালি। যে গতি মেপে দেওয়া আছে, কাঁটায় কাঁটায় সেই গতিতেই গাড়ি চালাতে হবে। রাস্তা বরাবর সম দূরত্বে বসানো আছে একধরণের অদৃশ্য খুঁটি। সমান পরিমাণ সময় অন্তর অন্তর সেই খুঁটিটাকে ছুঁয়ে যেতে হবে – একে বলে তাল বা মিটার। যেন আপনার গতিবেগ ঠিক রাখার দক্ষতা ভুরু কুঁচকে মাপার জন্য সমান দূরত্ব অন্তর লাগানো আছে এক অদৃশ্য স্পীডোমিটার। তারপর আছে গানের স্কেল। গলার পিচ পরিবর্তন করে একই গান বিভিন্ন স্কেলে গাওয়া যায় যেন আপার মিশিগান ড্রাইভ আর লোয়ার মিশিগান ড্রাইভ দিয়ে একই গতিবেগে সমতানে গাড়ি চালানো। পথ এমনই অজস্র সমস্যা সঙ্কীর্ণ।
 
আমরা যারা লিফট-এ একা নামতে নামতে গলা খুলে গানের কলি ভাঁজি আর লিফটের দরজা খুললেই মুখে কুলুপ লাগাই অর্থাৎ আমরা যারা অ-গায়ক তাদের মধ্যে দু প্রকার লোক আছে। সুরের গোদা ম্যাপটা মোটামুটি সমস্ত মানুষই কম বেশি বুঝতে পারে। আমাদের মত সুর-নিরক্ষরদের মধ্যে এক প্রকার মানুষ হল যাদের সেই অদৃশ্য ম্যাপের সূক্ষ্মাতিসুক্ষ ব্যাপারগুলো, ফাইনার ডিটেলসগুলো ঠিক জানা থাকে না। তাই “সুর না সাজে ক্যা গাউঁ ম্যায়” অবস্থা। অন্য প্রকার এক ধরণের লোক আছে যারা সুরটা হয়তো বোঝে, অনাহত শব্দ বা অনুচ্চারিত শব্দ দিয়ে মাথার মধ্যে প্লে করতে পারে কিন্তু নিজের স্বর সাথ দেয় না। গলা দিয়ে গাইতে গেলেই দেখে রাস্তার কার্নিশে ধাক্কা খায় হামেশাই। গাড়ির এইখানটা তুবড়ে গেল, ওখানটায় স্ক্র্যাচ হল। অর্থাৎ কিনা ম্যাপটা জানে কিন্তু ম্যানুভার টেকনিকটা ভাল জানে না। স্বরসাধনা করা হয় নি। তাই নিজেই গেয়ে বুঝতে পারে ঠিক হচ্ছে না। আর একটা তৃতীয় প্রকার মানুষ অবশ্য আছে যাদের সুরের সেন্সও নেই, স্বরসাধনাও করা হয়নি। কিন্তু গানের গাড়ি চালালে এদিক ওদিক ধাক্কা যে খাচ্ছে সেটা বোঝার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তাদের কথা থাক। সুরের কথায় ফিরি। দুঃখের কথা হল এই সুরের সেন্সটা শ্রমসাধ্য নয়, কিছুটা জেনেটিক, কিছুটা জন্মসূত্রে পাওয়া। এর মানে এই নয় সুরের সেন্স ব্যাপারটা বাইনারি। হয় থাকে নয় থাকে না – এমন নয়। বিভিন্ন সঙ্গীতশিল্পীদের বিভিন্ন মাত্রায় সেটা থেকে থাকে। যার যত বেশি থাকে তারে তত স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্টেজ যেমন কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের ছিল আর কি! অনুশীলনের মাধ্যমে কিছুটা পরিশীলন করাও সম্ভব। কিন্তু একটা বেসিক সেন্স থাকতে হয়। আর সেই বেসিক সেন্সটা কিছুতেই train করে আনা যায় না। অপরদিকে ম্যানুভার টেকনিকটা স্বরাভ্যাস বা voice training-এর মাধ্যমে পুরোপুরি শেখা সম্ভব, ক্রমশ উৎকর্ষসাধন সম্ভব আর সেটাই সঙ্গীতসাধনা। আসল গাড়ি নিয়ে রাস্তায় গড়াতে লাগে মাস তিনেক। তিন মাসের ট্রেনিং যথেষ্ট। সুরের পথে গানের গাড়ি চালাতে শিখতে তিরিশ বছরও যথেষ্ট নয়। কোন সহযাত্রীর সাথে মনমানি না করে, হর্ন না খেয়ে, ট্র্যাফিক সিগনাল মেনে, রাস্তার ধারের অদৃশ্য কঠিন দেওয়ালগুলোকে চুমু না খেয়ে, তালের স্পীডোমিটারের কাছে টিকিট না খেয়ে অব্যর্থ দক্ষতায় গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়াটা একটা বিশাল গোলমেলে ব্যাপার। অভ্যাসের সাথে সাথে সেই ড্রাইভিংটাও মসৃণ হয়, কিন্তু তারপরেও যে আপনি একবারও ফাউল করবেন না এমন নয়। এমনকি আসল গাড়ি চালানোর সময় আর একটা যেটা খেয়াল রাখতে হয় সেটা অন্য কেউ ভুল গাড়ি চালাচ্ছে কিনা খেয়াল রাখা আর চালালে নিজেকে পুনর্বিন্যস্ত করা, সেই সহযাত্রীর সাথে adjust করা। গানের ক্ষেত্রেও তবলাবাদক কি গীটার বাদক ভুল করলে আপনাকে adjust করতে হবে। রাস্তার শোল্ডারে দাঁড়িয়ে সহবাদককে শুধরে দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্র্যাক শেষ করার আগে গান থামালে সুর তাল দুটোই কেটে যাবে। সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে ভাবের যেমন বিন্যস্ত প্রকাশ হয় তেমনটা বোধ হয় অন্য কোন শিল্পতে হয় না। সঙ্গীতশিল্পকে তাই অনেক উঁচুদরের শিল্প ধরা হয়। সঙ্গীতশিল্পীদের কাজটাও সেরকমই কঠিন। মুক্তির পথ সম্বন্ধে বলা হয় “ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া দুর্গম্ পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি” অর্থাৎ মুক্তির পথ ক্ষুরের ধারের মত তীক্ষ্ণ, দুরধিগম্য ও কঠিন। সুরের পথও বোধ হয় অনেকটা সেরকম। একটু ভুলচুক হলেই সেই ক্ষুরের ধারে কেটে গিয়ে রক্তপাতের সম্ভাবনা। গান যারা করতে পারে তাদের প্রতি আমার অপার মুগ্ধতার কথা অনেকেই জানেন। শিকাগোল্যান্ডের আর আমার চেনা জানা অন্য সব সঙ্গীতশিল্পীদের প্রতি থাকুক আমার টুপি খুলে অভিবাদন।
Facebook Comments

কাগজের নৌকো – রম্যরচনা

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

 

অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি বউ বাড়ি নেই। দূরভাষযোগে জানা গেল মিশিগান হ্রদের সৈকতে হাওয়া খেতে গেছে। শীতের দেশে এই গরম কালের চারটে মাস সকলেরই ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। আমার এই শহরতলিতে তখন ফুরফুরে হাওয়ে বইছে। মিঠে। বাতাসে প্রথম প্রেমে পড়ার শিরশিরানি। কোএড কোচিং-এ পড়তে যাওয়ার আগে দশ-ক্লাস-অব্দি-বয়েজ-স্কুলে-পড়া মনের উথালপাতাল মনে। বাড়ির বাইরে মেঘের নরম তুলোট আদরে ঢেকে থাকা সুয্যিমামার লাজুক হাসি। মনের মধ্যে শবেবরাতের সন্ধে নামার খুশি। সবে এক কাপ চা বানিয়ে এমন গোধূলি লগনটাকে উপভোগ করতে বারান্দায় বেরিয়েছি, কাপের গরম সবুজ তরলে ঠোঁটের আলগা স্নেহ ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই ঝুপুস বৃষ্টি নামলো। সারাদিনের ফ্যা ফ্যা রোদ্দুরে বাড়ি-লাগোয়া কাঠফাটা কাঠের  উঠোনে বৃষ্টিকণাদের লুটোপুটি আর হুল্লুড় শুরু বিনা নোটিশে। বড় বড় ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে মাটি। শুষে নিচ্ছে সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসাদ। মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলা। সেই খড়গপুরের ছোট্ট কোয়ার্টার। যেখানে জায়গা ছিল কম। শান্তি ছিল বেশি। মনে পড়ে যাচ্ছে হু হু রোদ-পোড়া দিনের শেষে কালবৈশাখী। ফটাফট্‌ অঙ্ক খাতার পাতা ছিঁড়ে সেই আয়তাকৃতি প্যাপিরাস দিয়ে বানিয়ে ফেলা কাগজের নৌকো। যেন কোন পূর্বজন্মের কথা। ভাঙাফাটা সিমেন্টের উঠোনের পশ্চিম দিকটা দিয়ে অঝোরে বয়ে যাচ্ছে জল। তখন আমার কাঁচা বয়স। অপু মন। সেই ঝরঝরিয়ে বয়ে চলা হঠাৎ-নির্ঝরিণীতে ভাসিয়ে দিচ্ছি পাটিগণিতের নৌকো। কেশব চন্দ্র নাগ দুলতে দুলতে ভেসে যাচ্ছে ঐ দূরে। এই জলে ভরে উঠল আমার মাঝিবিহীন কাগজের নৌকোর সংক্ষিপ্ত পরিসর। সে বেচারা ওপরের আর নিচের জলের চাপে পানকৌড়ি-ডুব দিল জলের মাঝে। আবার আর একটা নৌকো ছাড়লাম। এলোমেলো হাওয়া বয়ে চলেছে হরিণ শিশুর মত। সেই হাওয়ার অবিমৃষ্যকারিতায় একবার জলের ছাঁট এদিক থেকে আসে, তো পরের বার আসে ওদিক থেকে। তারে শুকোতে দেওয়া ভিজে জামা কাপড় ভিজে জাব। দে টান দে টান। সাগরের ওপার থেকে ভেসে আসছে মায়ের গলা- “বাবাই ঢুকিয়ে আন জামাকাপড় গুলো। সব ভিজে গেল রে। ঘরের সব জানলা বন্ধ কর রে”। তড়িঘড়ি ব্যস্ততা। কিন্তু সে সব মায়ের কাজ। আমার তাতে মন নেই। আমি আমার নৌকোর ভয়েজ দেখতে ব্যস্ত। ওই শুরু হল শিল পড়া। এক ছুট্টে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছের নিচে। ঘন গন্ধ নিয়ে কদম ফুল গুলো ঝরে ঝরে পড়বে। ঝরে পড়বে কৃষ্ণচূড়া কুঁড়ি। সেই পুষ্পবৃষ্টির মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। কোঁচড় ভরে কুড়িয়ে আনতে হবে। সারা সন্ধে ধরে বাড়িতে বসে আলতো নখের আদরে ফুটিয়ে তুলব ফুলগুলোকে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসবে খিচুড়ি-ডিমভাজার সুবাস আর একটা মা-মা গন্ধ। ওই তো ঝরঝরিয়ে শিল পড়া শুরু। তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মত কুড়োচ্ছি আর মুখে পুরছি। সত্যি, বরফেরও ওরকম স্বাদ হয়? পৃথিবীর আর এক প্রান্তে মৌরুসিপাট্টা জমিয়ে বসেছি। কিন্তু এই সাঁইত্রিশ বছরে দেখা চোদ্দটা ফ্রিজের কোনটার বরফে অতো স্বাদ পাইনি। কচরমচর করে চেবাও। মুখে অনাবিল আনন্দের ঝিলিক। বাড়িতে ঢুকেই শঙ্কিত-মায়ের-কড়া-বকুনির-সম্ভাবনার তৃপ্তি লেগে থাকে মুখে। একটা বড়সড় গোছের শিল মাথায় ঠাঁই করে পড়লেই ফুলে চাঁই। ওই যে শিউলিদের আম গাছটা থেকে টুকটাক করে পড়তে আরম্ভ করেছে শিশু ফল গুলো। ওদের অকালপ্রয়াণে আমার বালক মন আনন্দে শিহরিত। ছুট ছুট ছুট। আমগাছটার তলায় এসে ফটাফট্‌ দক্ষ হাতে কাঁচা আম কুড়োনোর বর্ষাপিয়াসী প্রসন্নতা। বাড়িতে ঢুকেই বৃষ্টি-অর্জিত সেই অমূল্য সম্পদগুলোকে ছাল ছাড়িয়ে হাল্কা নুনে জারিয়ে আমাদের সেই ছোট্ট ফ্রিজে শীতল শয়ন দেওয়া। আগামিকাল স্কুল থেকে ফিরে তার অম্লরসে জিভের স্বাদকোরকগুলোকে বিয়ে-বাড়ির-ফুর্তি-আর-রোশনাই প্রেরণ। সেই ছোট্টবেলার আমার শহরের জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচুড়া রাধাচূড়ার মত এই দূর প্রবাসেও আমার প্রতিবেশী, আমার দোরগোড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা চিরসখা দুটো দেবদারু গাছ। এখানে আদর করে ওদের বলে ক্রিস্টমাস ট্রি। কিন্তু সেই নামে ডাকলে আমার বাঙালি শহরতলীয় পরাণে কি দেবদারু নামের রোমান্টিকতা আসে? হাত-পা ছড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে গাছ দুটো একমনে। যেন এই মুহুর্তে বৃষ্টিতে ভেজাই ওদের একমাত্র কর্তব্য। পাতায় জলসিঞ্চন করা ছাড়া আর কোনো কাজেই তাদের উৎসাহ নেই।

 

হুড়ুদ্দুম করে ছপ্পড় ফাড়কে চিলগতিতে মিনিট পনের ধরে নেমে আসার পরে মেঘেদের ফাটল ফুড়ুত করে বন্ধ। আর তৎক্ষণাৎ শুরু এ পাড়ার পাখিদের বর্ষামঙ্গল গীতি। গোধূলির ঈষৎ রক্তিম আলোয় আর আর্দ্র মলয় সমীরে শরীর জুড়িয়ে গলা ফেড়ে একে অপরকে ডাকাডাকি। ওদের অবোধ্য ভাষায় ওরাও কি কাগজের নৌকোর কথাই বলছে? ভাবতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারলাম ছোটবেলার সেই কাগজের নৌকো বানানোর ম্যাজিক পদ্ধতিটা এই সুদীর্ঘ পথচলার কোনো বাঁকে ফেলে এসেছি, বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছি। এমন একটা প্রবাসী ক্ষণস্থায়ী কালবৈশাখী আমার জন্য অপেক্ষায় আছে জানলে কি ভুলতে পারতাম? যাই হোক কোই পরোয়া নেহি। পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডারের বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে গেছে। ইউটিউবে ঢুকে ওরিগামি বলে খোঁজ করলে কাগজের নৌকো বানানোটা কি আর একবার মনে করিয়ে দেবে না? হয়তো বা। এখানে বাড়ির উঠোনে জল জমে না। বৃষ্টি হলে উঠোন-বাগান খরস্রোতা নদী হয়ে ওঠে না। তাতে কি? নৌকোটা আজ না ভাসিয়ে যদি পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিই? যদি আমার ডানা লোকানো ছোট্ট পরী, আমার কন্যাকে উপহার দিই? নিশ্চয় ও ওর বড় বড় খুশির ঝিলিক-ওলা চোখ নিয়ে হাত পেতে নেবে আর মিনমিনে অশ্রুত-প্রায় আধোআধো গলায় বলবে “হ্যাঁ বোত”।

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

[ছবির নৌকোটা কিন্তু আমার এই লেখার পরে ইউটিউব ঘেঁটে আজই বানানো]

Facebook Comments

প্রবাস যন্ত্রণা – কবিতা

তোমারও কি প্রবাস যন্ত্রণা?

তোমারও কি মাঝে মাঝে

মন লাগে না কোনো কাজে

তাল কেটে যায় সুর লাগে না বীণায়?

 

তোমারও কি একলা বিকেল বেলায়

বাড়ির গলি মনে পড়ে

সামান্য মন কেমন করে

পসরা সাজিয়ে ভাসো স্মৃতির ভেলায়?

 

তোমারও কি ভোর বেলাতে কোনো

ঘুম চোখে ঘুম জড়িয়ে থাকে

হঠাৎ মনে পরে মা’কে

বিষণ্ন বিণ কোথায় বাজে যেন?

Facebook Comments