অবশিষ্ট আমি – কবিতা

বন্ধুরা তোমাদের সাথে অনেকদিন কথা হয়নি। তাই ভাবলাম আমার জন্মদিনে একটা পোষ্ট তো দেওয়া প্রয়োজন। প্রতি জন্মদিনেই আমি একটু self-reflect করি যে মানুষ হিসেবে আর একটা বছরে ঠিক কতটা উত্তীর্ণ হলাম। সেই ভাবনা থেকেই এই লেখাটা।

 

আমার তো এতটুকু আমি

বাকি ছেড়ে এসেছি এ পথে

কিছু রাখা আমার শহরে

কিছু রাখা মরু পর্বতে

 

কিছু রাখা মায়ের আঁচলে

কিছু রাখা পূজোর ছুটিতে

স্কুলের মাঠেতে রাখা কিছু

কিছু রাখা স্মৃতির মুঠিতে

 

আমার যা অবশিষ্ট আমি

মুঠো করা জল যেন সে-ও

প্রতিক্ষণে গলে পড়ে কিছু

রোজ হারায় আমার পাথেয়

 

এখন তো মিথ্যের মুখোশে

আমারই সে ছায়া বয়ে চলা

আজ সব শব্দ ধার করা

কথা বলা নয়, হরবোলা

 

আমার আজ যাপন নয়

নিখাদ সুপটু অভিনয়

অজস্র মিথ্যের আড়ালে

দিনগত শুধু পাপক্ষয়

 

আজ যদি নিষ্ঠুর হাতে

মনটাকে করি ব্যাবচ্ছেদ

দেখতে পাব, জানি দেখতে পাব

ঈর্ষা, গ্লানি, মিথ্যে আর ক্লেদ

Facebook Comments

ঘাসফুল – রম্যরচনা

বিকেলে প্রথমে টিপটিপিয়ে, পরে ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি পড়েছে। বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সমাহিত প্রসন্নতা থাকে, এমন একটা বুনো নিবিড় গন্ধবহা সাহচর্য থাকে যে ঘরে বসে থাকতে মন চায় না। উপরন্তু আমার ছোট্ট সঙ্গিনী বিকেলে দ্বিপ্রাহরিক ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই “ইন্সি স্পাইডার” দেখতে যাওয়ার দাবী জানিয়ে রেখেছে সজল নয়নে। ইন্সি স্পাইডার দেখতে যাওয়ার মানে হল আউটডোরে যাওয়া আর কোন গুল্মজাতীয় গাছের ধারে মাকড়সা স্পট করা। হ্যাঁ মাকড়সার অষ্টপদী-জুলজুলে-পুঞ্জাক্ষী সৌন্দর্যের প্রতি তার আছে ভয়মিশ্রিত অপার মুগ্ধতা। এমনই মাকড়সা প্রেম যে তাদের দর্শনমাত্র স্পর্শনাকাঙ্খা হয় অর্থাৎ কিনা ধরতে চেষ্টা করে। তখন এই বলে বিরত করতে হয় যে বন্যেরা বনে সুন্দর, মাকড়সারা জালে। তাদের জালমুক্ত করার ইচ্ছেটা খুব একটা সমীচীন নয়। মানুষ নামক প্রাণীর মত বিষাক্ত না হলেও আত্মরক্ষার খাতিরে একটু আধটু বিষ উদ্গীরণ তারাও করে থাকে। সে যাই হোক, তাই বৃষ্টি থামতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম সেই ছোট্ট সঙ্গিনীর হাত ধরে। কুট্টিপারা হাত খানা ধরে প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্যে ঘুরতে ঘুরতে ভেজা বাতাস ফুসফুসে ভরে নিতে বেশ লাগে। হাতটা ধরে রাখা জরুরী হয় নয়তো পাখি কি প্রজাপতি দেখলে তাদের সাহচর্য পেতে সেইদিকে ধাবমান হওয়ার একটা বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যায় সেই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে। হাঁটতে হাঁটতে কোন বাঁক ঘুরতেই হঠাৎ যদি সবুজ শ্যামলিমার মধ্যে এসে পড়ি, উচ্ছ্বসিত সানাইয়ের গলায় খুশি ঝরে পড়ে – “প্রিটি”, “বিটিফুল” ইত্যাদি। সন্তানের চোখে খুশি দেখার থেকে বড় পুরস্কার বোধ হয় মানুষের কিছু হয় না। যাই হোক তার ক্ষুদ্র হাতের স্পর্শসুখ আর সদ্যস্নাতা আদ্র মায়াবী গোধূলির নৈকট্য উপভোগ করতে করতে আনমনে হাঁটছিলাম। হঠাৎ হাতে পড়ল টান। আমার ক্ষুদ্র সঙ্গিনী যে unpredictable সেটা জানতে বিশেষ অন্তর্দৃষ্টির দরকার হয় না। সে কেন থেমে পড়েছে, কোন বস্তু তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে ওর চোখের দিকে চোখ চালাই। না প্রজাপতি বা পাখিরা নেই, মাকড়সাদেরও অষ্টবক্র উপস্থিতি নেই। আছে একটি ঘাসফুল, এদেশে একে বলে ড্যান্ডিলিয়ন। বসন্তের শুরুতে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটে ওঠে তখন রাস্তার ধারে ধারে তাদের অপরূপ শোভা। কিন্তু বড়ই ক্ষণজন্মা তারা। একবার বৃষ্টি পড়লেই পাপড়ি টাপড়ি খসে নেহাত দৈন্যদশা। ফুলেদের জাতবিচারে এরা অবিশ্যি নিতান্তই দলিত। সুযোগ পেলেই মানুষের পা বা ময়িং মেশিন তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বসন্ত শেষে এই গ্রীষ্মে তাদের সকলেই প্রায় বৃন্তচ্যুত হয়েছে। এখানে একটা ড্যান্ডিলিয়ন এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আর আমার ক্ষুদ্র সঙ্গিনী বসে পড়ে ছোট আঙুল দিয়ে স্নেহ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার ফুলেল গায়ে। তার চোখে এই ঘাসফুলের রূপটুকু ধরা পড়েছে দেখে খুশি হলাম। সাথে এলো একটা অবসাদ। জীবনের পথ চলার কোন বাঁকে ওকে এই রুপসন্ধানী চোখখানা ফেলে যেতে হবে। কিছুতেই আটকাতে পারব না। এই নিষ্ঠুর বস্তুতান্ত্রিক সমাজ ঠিক কেড়ে নেবে ঐ চোখদুটো। শ্যামলিমার থেকে শপিং মলের আহ্বান ক্রমে ক্রমেই বেশি মনোগ্রাহী হবে। সমাজ বিসদৃশতা পছন্দ করে না। সবাইকে নিজের রঙে রাঙিয়ে নিয়ে তবে তার শান্তি। তার মগজ ধোলাইয়ের প্রক্রিয়াটি নির্ভুল ও পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত। সানাই ঘাসফুলটাকে বৃন্তচ্যুত করতে চাইলে বাধা দিলাম না। কোন মদগর্বী বুটের তলায় যাওয়ার থেকে ওর হাতে ভাল মানাবে। কিন্তু পরক্ষণেই বায়না – তার এই ঘাসফুল সংগ্রহের কৃতিত্ব দূরভাষযোগে মাম্মাকে জানাতে হবে। একজন মহাপুরুষ, সঞ্জয় দত্তের জীবন সম্বন্ধে জানতে সিনেমাহলে গেছেন মাম্মা। কিন্তু সে যুক্তি ধোপে টিকল না। ফোনটা না করে দিলে চোখে সজল আর মুখে সরব আকুতি। দোনামনা করে ফোনের বোতাম ঘোরালাম। আধো আধো গলায় দু চারবার ফ্লাওয়ার বলে তবে দেবী ক্ষান্ত দিলেন। সঞ্জয়রুপী রনবীরের গলা ছাপিয়ে সে গলা ও প্রান্তে পৌঁছল কিনা বলতে পারব না।

Facebook Comments

সুরপথ – রম্যরচনা

কয়েকদিন আগে একটা গানের আড্ডায় গেছিলাম। অনেক গায়েন আর বায়েনদের মেলা। বাগেশ্রী রাগে যন্ত্রসঙ্গীতের পরে আসছেন রবি কবি, রবীন্দ্রনাথের পরে আসছেন রফি সাহাব। হেমন্ত, কিশোর, ভুপেন হাজারিকা দিয়ে যাচ্ছেন ক্যামিও অ্যাপিয়ারেন্স। চন্দ্রবিন্দু বা হালচালের গীতিকার দেবদীপও সেখানে ব্রাত্য নয়। এই সুরের বাহারি বাগানের নাম সুরোধ্বনি। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম সঙ্গীত শিল্প মাধ্যমের কথা। মনে হল এই গান গাওয়ার সাথে আমি যে ফিল্ডে কাজ করি তার বোধ হয় বিশেষ সাদৃশ্য আছে। আমি কাজ করি ড্রাইভারলেস কার ইন্ডাস্ট্রীতে। মানুষের সাহায্য ছাড়াই একটা গাড়িকে তার গোমুখ থেকে সাগরের মোহনাতে পৌঁছে দেওয়া, তার শুরু থেকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল নিয়ে গবেষণা করা আমার কাজ। গান গাওয়ার ব্যাপারটাও কি অনেকটা সেরকম নয়? স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর মূল উপাদান দুটি। একটা নির্ভুল মানচিত্র – আমাদের ইন্ডাস্ট্রীতে একে বলে হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গাড়ির চাকাদের সময়মত ঘোরানো আর অন্যান্য সহযাত্রী গাড়িদের সাথে নির্ভুলভাবে সমাপতিত হতে সময়মত ব্রেক ও অ্যাক্সিলেটার প্রয়োগ করে গাড়ির গতি পরিবর্তন করা যাকে আমাদের পরিভাষায় বলে maneuver technique. স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে ছেড়ে দিয়ে আমরা আপাতত যদি মানুষচালিত গাড়ির কথা ভাবি, অনুরূপ দুটি জিনিসেরই দরকার হবে। মাথার মধ্যে থাকা বা মোবাইলের পর্দায় থাকা একটা হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর ম্যানুভারিং স্কিল। গাড়ি চালানো ভালভাবে জানা না থাকলে বা ম্যাপটা ভালভাবে জানা না থাকলে (ধরুন মোবাইলের সহায়তা পাচ্ছেন না, অত্যধিক ফেসবুক করে মোবাইল ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে 🙂 ) দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা। গায়ক বাদকদের ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকম। সুর যেন একটা অদৃশ্য পথ। আর সেই পথে স্বররুপী গাড়িকে চালনা করতে হবে। সেটাই চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ পথ বড় বিপদসংকুল। প্রথম বিপদ হল, সঙ্গীতশিল্পীদের সাহায্য করার জন্য কোন ইলেক্ট্রনিক ম্যাপ নেই। হ্যাঁ, ইলেক্ট্রনিক সুরযন্ত্র, আবহ যন্ত্রসঙ্গীত ইত্যাদি মোটা পথটা বাতলে দিতে পারে কিন্তু ম্যাপের খুঁটিনাটিটা থাকতে হবে নিজেরই মাথার মধ্যে। ডুয়েট বা গ্রুপ সঙ গাওয়ার সময় সহগায়করা আর সোলো গাওয়ার সময় সহবাদকরা যেন সেই একই অদৃশ্য রাস্তায় চলতে থাকা অন্যান্য গাড়ি। ম্যাপটাকে একটু ভুল বুঝলেই সেই সহযাত্রীদের সাথে ঠোকাঠুকি, রক্তারক্তি হওয়ার সম্ভাবনা। আরও একটা বড় সমস্যা হল সুরের পথে আমাদের পার্থিব পথদের মত কয়েকটি মাত্র নির্দিষ্ট রুট নেই। প্রতিটা গানেই সুরকার তার সৃজনশীলতা দিয়ে পত্তন করেন একটা আনকোরা নতুন রাস্তা, একটা আনদেখা পথ। সঙ্গীতশিল্পীকে বুঝে নিতে হয় লেনটা ঠিক কেমনভাবে বিধৃত, ঠিক কতটা চওড়া, কতটা দৈর্ঘ অতিক্রম করার পর আচম্বিতে আসবে একটা মোড়। আমাদের হাইওয়েতে যেমন থাকে স্লো লেন, ফাস্ট লেন সেরকমই হঠাৎই কোন লাইনে কি স্ট্যাঞ্জায় বাড়াতে হবে গানের গতি। চারচাকা গাড়ি চালানোর সময় গতি দশ-মাইল-প্রতি-ঘণ্টা অব্দি উপরনিচ করার বিলাসিতা থাকে। এক্ষেত্রে সে গুড়ে বালি। যে গতি মেপে দেওয়া আছে, কাঁটায় কাঁটায় সেই গতিতেই গাড়ি চালাতে হবে। রাস্তা বরাবর সম দূরত্বে বসানো আছে একধরণের অদৃশ্য খুঁটি। সমান পরিমাণ সময় অন্তর অন্তর সেই খুঁটিটাকে ছুঁয়ে যেতে হবে – একে বলে তাল বা মিটার। যেন আপনার গতিবেগ ঠিক রাখার দক্ষতা ভুরু কুঁচকে মাপার জন্য সমান দূরত্ব অন্তর লাগানো আছে এক অদৃশ্য স্পীডোমিটার। তারপর আছে গানের স্কেল। গলার পিচ পরিবর্তন করে একই গান বিভিন্ন স্কেলে গাওয়া যায় যেন আপার মিশিগান ড্রাইভ আর লোয়ার মিশিগান ড্রাইভ দিয়ে একই গতিবেগে সমতানে গাড়ি চালানো। পথ এমনই অজস্র সমস্যা সঙ্কীর্ণ।
 
আমরা যারা লিফট-এ একা নামতে নামতে গলা খুলে গানের কলি ভাঁজি আর লিফটের দরজা খুললেই মুখে কুলুপ লাগাই অর্থাৎ আমরা যারা অ-গায়ক তাদের মধ্যে দু প্রকার লোক আছে। সুরের গোদা ম্যাপটা মোটামুটি সমস্ত মানুষই কম বেশি বুঝতে পারে। আমাদের মত সুর-নিরক্ষরদের মধ্যে এক প্রকার মানুষ হল যাদের সেই অদৃশ্য ম্যাপের সূক্ষ্মাতিসুক্ষ ব্যাপারগুলো, ফাইনার ডিটেলসগুলো ঠিক জানা থাকে না। তাই “সুর না সাজে ক্যা গাউঁ ম্যায়” অবস্থা। অন্য প্রকার এক ধরণের লোক আছে যারা সুরটা হয়তো বোঝে, অনাহত শব্দ বা অনুচ্চারিত শব্দ দিয়ে মাথার মধ্যে প্লে করতে পারে কিন্তু নিজের স্বর সাথ দেয় না। গলা দিয়ে গাইতে গেলেই দেখে রাস্তার কার্নিশে ধাক্কা খায় হামেশাই। গাড়ির এইখানটা তুবড়ে গেল, ওখানটায় স্ক্র্যাচ হল। অর্থাৎ কিনা ম্যাপটা জানে কিন্তু ম্যানুভার টেকনিকটা ভাল জানে না। স্বরসাধনা করা হয় নি। তাই নিজেই গেয়ে বুঝতে পারে ঠিক হচ্ছে না। আর একটা তৃতীয় প্রকার মানুষ অবশ্য আছে যাদের সুরের সেন্সও নেই, স্বরসাধনাও করা হয়নি। কিন্তু গানের গাড়ি চালালে এদিক ওদিক ধাক্কা যে খাচ্ছে সেটা বোঝার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তাদের কথা থাক। সুরের কথায় ফিরি। দুঃখের কথা হল এই সুরের সেন্সটা শ্রমসাধ্য নয়, কিছুটা জেনেটিক, কিছুটা জন্মসূত্রে পাওয়া। এর মানে এই নয় সুরের সেন্স ব্যাপারটা বাইনারি। হয় থাকে নয় থাকে না – এমন নয়। বিভিন্ন সঙ্গীতশিল্পীদের বিভিন্ন মাত্রায় সেটা থেকে থাকে। যার যত বেশি থাকে তারে তত স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্টেজ যেমন কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের ছিল আর কি! অনুশীলনের মাধ্যমে কিছুটা পরিশীলন করাও সম্ভব। কিন্তু একটা বেসিক সেন্স থাকতে হয়। আর সেই বেসিক সেন্সটা কিছুতেই train করে আনা যায় না। অপরদিকে ম্যানুভার টেকনিকটা স্বরাভ্যাস বা voice training-এর মাধ্যমে পুরোপুরি শেখা সম্ভব, ক্রমশ উৎকর্ষসাধন সম্ভব আর সেটাই সঙ্গীতসাধনা। আসল গাড়ি নিয়ে রাস্তায় গড়াতে লাগে মাস তিনেক। তিন মাসের ট্রেনিং যথেষ্ট। সুরের পথে গানের গাড়ি চালাতে শিখতে তিরিশ বছরও যথেষ্ট নয়। কোন সহযাত্রীর সাথে মনমানি না করে, হর্ন না খেয়ে, ট্র্যাফিক সিগনাল মেনে, রাস্তার ধারের অদৃশ্য কঠিন দেওয়ালগুলোকে চুমু না খেয়ে, তালের স্পীডোমিটারের কাছে টিকিট না খেয়ে অব্যর্থ দক্ষতায় গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়াটা একটা বিশাল গোলমেলে ব্যাপার। অভ্যাসের সাথে সাথে সেই ড্রাইভিংটাও মসৃণ হয়, কিন্তু তারপরেও যে আপনি একবারও ফাউল করবেন না এমন নয়। এমনকি আসল গাড়ি চালানোর সময় আর একটা যেটা খেয়াল রাখতে হয় সেটা অন্য কেউ ভুল গাড়ি চালাচ্ছে কিনা খেয়াল রাখা আর চালালে নিজেকে পুনর্বিন্যস্ত করা, সেই সহযাত্রীর সাথে adjust করা। গানের ক্ষেত্রেও তবলাবাদক কি গীটার বাদক ভুল করলে আপনাকে adjust করতে হবে। রাস্তার শোল্ডারে দাঁড়িয়ে সহবাদককে শুধরে দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্র্যাক শেষ করার আগে গান থামালে সুর তাল দুটোই কেটে যাবে। সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে ভাবের যেমন বিন্যস্ত প্রকাশ হয় তেমনটা বোধ হয় অন্য কোন শিল্পতে হয় না। সঙ্গীতশিল্পকে তাই অনেক উঁচুদরের শিল্প ধরা হয়। সঙ্গীতশিল্পীদের কাজটাও সেরকমই কঠিন। মুক্তির পথ সম্বন্ধে বলা হয় “ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া দুর্গম্ পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি” অর্থাৎ মুক্তির পথ ক্ষুরের ধারের মত তীক্ষ্ণ, দুরধিগম্য ও কঠিন। সুরের পথও বোধ হয় অনেকটা সেরকম। একটু ভুলচুক হলেই সেই ক্ষুরের ধারে কেটে গিয়ে রক্তপাতের সম্ভাবনা। গান যারা করতে পারে তাদের প্রতি আমার অপার মুগ্ধতার কথা অনেকেই জানেন। শিকাগোল্যান্ডের আর আমার চেনা জানা অন্য সব সঙ্গীতশিল্পীদের প্রতি থাকুক আমার টুপি খুলে অভিবাদন।
Facebook Comments

কাগজের নৌকো – রম্যরচনা

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

 

অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি বউ বাড়ি নেই। দূরভাষযোগে জানা গেল মিশিগান হ্রদের সৈকতে হাওয়া খেতে গেছে। শীতের দেশে এই গরম কালের চারটে মাস সকলেরই ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। আমার এই শহরতলিতে তখন ফুরফুরে হাওয়ে বইছে। মিঠে। বাতাসে প্রথম প্রেমে পড়ার শিরশিরানি। কোএড কোচিং-এ পড়তে যাওয়ার আগে দশ-ক্লাস-অব্দি-বয়েজ-স্কুলে-পড়া মনের উথালপাতাল মনে। বাড়ির বাইরে মেঘের নরম তুলোট আদরে ঢেকে থাকা সুয্যিমামার লাজুক হাসি। মনের মধ্যে শবেবরাতের সন্ধে নামার খুশি। সবে এক কাপ চা বানিয়ে এমন গোধূলি লগনটাকে উপভোগ করতে বারান্দায় বেরিয়েছি, কাপের গরম সবুজ তরলে ঠোঁটের আলগা স্নেহ ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই ঝুপুস বৃষ্টি নামলো। সারাদিনের ফ্যা ফ্যা রোদ্দুরে বাড়ি-লাগোয়া কাঠফাটা কাঠের  উঠোনে বৃষ্টিকণাদের লুটোপুটি আর হুল্লুড় শুরু বিনা নোটিশে। বড় বড় ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে মাটি। শুষে নিচ্ছে সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসাদ। মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলা। সেই খড়গপুরের ছোট্ট কোয়ার্টার। যেখানে জায়গা ছিল কম। শান্তি ছিল বেশি। মনে পড়ে যাচ্ছে হু হু রোদ-পোড়া দিনের শেষে কালবৈশাখী। ফটাফট্‌ অঙ্ক খাতার পাতা ছিঁড়ে সেই আয়তাকৃতি প্যাপিরাস দিয়ে বানিয়ে ফেলা কাগজের নৌকো। যেন কোন পূর্বজন্মের কথা। ভাঙাফাটা সিমেন্টের উঠোনের পশ্চিম দিকটা দিয়ে অঝোরে বয়ে যাচ্ছে জল। তখন আমার কাঁচা বয়স। অপু মন। সেই ঝরঝরিয়ে বয়ে চলা হঠাৎ-নির্ঝরিণীতে ভাসিয়ে দিচ্ছি পাটিগণিতের নৌকো। কেশব চন্দ্র নাগ দুলতে দুলতে ভেসে যাচ্ছে ঐ দূরে। এই জলে ভরে উঠল আমার মাঝিবিহীন কাগজের নৌকোর সংক্ষিপ্ত পরিসর। সে বেচারা ওপরের আর নিচের জলের চাপে পানকৌড়ি-ডুব দিল জলের মাঝে। আবার আর একটা নৌকো ছাড়লাম। এলোমেলো হাওয়া বয়ে চলেছে হরিণ শিশুর মত। সেই হাওয়ার অবিমৃষ্যকারিতায় একবার জলের ছাঁট এদিক থেকে আসে, তো পরের বার আসে ওদিক থেকে। তারে শুকোতে দেওয়া ভিজে জামা কাপড় ভিজে জাব। দে টান দে টান। সাগরের ওপার থেকে ভেসে আসছে মায়ের গলা- “বাবাই ঢুকিয়ে আন জামাকাপড় গুলো। সব ভিজে গেল রে। ঘরের সব জানলা বন্ধ কর রে”। তড়িঘড়ি ব্যস্ততা। কিন্তু সে সব মায়ের কাজ। আমার তাতে মন নেই। আমি আমার নৌকোর ভয়েজ দেখতে ব্যস্ত। ওই শুরু হল শিল পড়া। এক ছুট্টে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছের নিচে। ঘন গন্ধ নিয়ে কদম ফুল গুলো ঝরে ঝরে পড়বে। ঝরে পড়বে কৃষ্ণচূড়া কুঁড়ি। সেই পুষ্পবৃষ্টির মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। কোঁচড় ভরে কুড়িয়ে আনতে হবে। সারা সন্ধে ধরে বাড়িতে বসে আলতো নখের আদরে ফুটিয়ে তুলব ফুলগুলোকে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসবে খিচুড়ি-ডিমভাজার সুবাস আর একটা মা-মা গন্ধ। ওই তো ঝরঝরিয়ে শিল পড়া শুরু। তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মত কুড়োচ্ছি আর মুখে পুরছি। সত্যি, বরফেরও ওরকম স্বাদ হয়? পৃথিবীর আর এক প্রান্তে মৌরুসিপাট্টা জমিয়ে বসেছি। কিন্তু এই সাঁইত্রিশ বছরে দেখা চোদ্দটা ফ্রিজের কোনটার বরফে অতো স্বাদ পাইনি। কচরমচর করে চেবাও। মুখে অনাবিল আনন্দের ঝিলিক। বাড়িতে ঢুকেই শঙ্কিত-মায়ের-কড়া-বকুনির-সম্ভাবনার তৃপ্তি লেগে থাকে মুখে। একটা বড়সড় গোছের শিল মাথায় ঠাঁই করে পড়লেই ফুলে চাঁই। ওই যে শিউলিদের আম গাছটা থেকে টুকটাক করে পড়তে আরম্ভ করেছে শিশু ফল গুলো। ওদের অকালপ্রয়াণে আমার বালক মন আনন্দে শিহরিত। ছুট ছুট ছুট। আমগাছটার তলায় এসে ফটাফট্‌ দক্ষ হাতে কাঁচা আম কুড়োনোর বর্ষাপিয়াসী প্রসন্নতা। বাড়িতে ঢুকেই বৃষ্টি-অর্জিত সেই অমূল্য সম্পদগুলোকে ছাল ছাড়িয়ে হাল্কা নুনে জারিয়ে আমাদের সেই ছোট্ট ফ্রিজে শীতল শয়ন দেওয়া। আগামিকাল স্কুল থেকে ফিরে তার অম্লরসে জিভের স্বাদকোরকগুলোকে বিয়ে-বাড়ির-ফুর্তি-আর-রোশনাই প্রেরণ। সেই ছোট্টবেলার আমার শহরের জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচুড়া রাধাচূড়ার মত এই দূর প্রবাসেও আমার প্রতিবেশী, আমার দোরগোড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা চিরসখা দুটো দেবদারু গাছ। এখানে আদর করে ওদের বলে ক্রিস্টমাস ট্রি। কিন্তু সেই নামে ডাকলে আমার বাঙালি শহরতলীয় পরাণে কি দেবদারু নামের রোমান্টিকতা আসে? হাত-পা ছড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে গাছ দুটো একমনে। যেন এই মুহুর্তে বৃষ্টিতে ভেজাই ওদের একমাত্র কর্তব্য। পাতায় জলসিঞ্চন করা ছাড়া আর কোনো কাজেই তাদের উৎসাহ নেই।

 

হুড়ুদ্দুম করে ছপ্পড় ফাড়কে চিলগতিতে মিনিট পনের ধরে নেমে আসার পরে মেঘেদের ফাটল ফুড়ুত করে বন্ধ। আর তৎক্ষণাৎ শুরু এ পাড়ার পাখিদের বর্ষামঙ্গল গীতি। গোধূলির ঈষৎ রক্তিম আলোয় আর আর্দ্র মলয় সমীরে শরীর জুড়িয়ে গলা ফেড়ে একে অপরকে ডাকাডাকি। ওদের অবোধ্য ভাষায় ওরাও কি কাগজের নৌকোর কথাই বলছে? ভাবতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারলাম ছোটবেলার সেই কাগজের নৌকো বানানোর ম্যাজিক পদ্ধতিটা এই সুদীর্ঘ পথচলার কোনো বাঁকে ফেলে এসেছি, বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছি। এমন একটা প্রবাসী ক্ষণস্থায়ী কালবৈশাখী আমার জন্য অপেক্ষায় আছে জানলে কি ভুলতে পারতাম? যাই হোক কোই পরোয়া নেহি। পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডারের বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে গেছে। ইউটিউবে ঢুকে ওরিগামি বলে খোঁজ করলে কাগজের নৌকো বানানোটা কি আর একবার মনে করিয়ে দেবে না? হয়তো বা। এখানে বাড়ির উঠোনে জল জমে না। বৃষ্টি হলে উঠোন-বাগান খরস্রোতা নদী হয়ে ওঠে না। তাতে কি? নৌকোটা আজ না ভাসিয়ে যদি পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিই? যদি আমার ডানা লোকানো ছোট্ট পরী, আমার কন্যাকে উপহার দিই? নিশ্চয় ও ওর বড় বড় খুশির ঝিলিক-ওলা চোখ নিয়ে হাত পেতে নেবে আর মিনমিনে অশ্রুত-প্রায় আধোআধো গলায় বলবে “হ্যাঁ বোত”।

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

[ছবির নৌকোটা কিন্তু আমার এই লেখার পরে ইউটিউব ঘেঁটে আজই বানানো]

Facebook Comments

প্রবাস যন্ত্রণা – কবিতা

তোমারও কি প্রবাস যন্ত্রণা?

তোমারও কি মাঝে মাঝে

মন লাগে না কোনো কাজে

তাল কেটে যায় সুর লাগে না বীণায়?

 

তোমারও কি একলা বিকেল বেলায়

বাড়ির গলি মনে পড়ে

সামান্য মন কেমন করে

পসরা সাজিয়ে ভাসো স্মৃতির ভেলায়?

 

তোমারও কি ভোর বেলাতে কোনো

ঘুম চোখে ঘুম জড়িয়ে থাকে

হঠাৎ মনে পরে মা’কে

বিষণ্ন বিণ কোথায় বাজে যেন?

Facebook Comments

খাওয়ানো – রম্যরচনা

স্ত্রী গেছেন জনৈকা সন্তানসম্ভবার সাধপূরণ করতে অর্থাৎ কিনা সাধ খেতে। আমার আড়াই বছরের কন্যার মধ্যাহ্নভোজনের দায়িত্ব পড়েছে আমার ঘাড়ে। আমার মেয়ের পছন্দের খাদ্যতালিকা সম্বন্ধে বলি। আমার স্থিরবিশ্বাস আমার মেয়ে পূর্বজন্মে সাধু সন্নিসী ছিল। স্বাত্তিক খাবারেই তার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। স্বাত্তিক খাবার বলতে আমি যা বুঝি সেটা হল দুধ, ফলমূলাদি ইত্যাদি। রজোগুণী খাবার বলতে আমি বুঝি যে খাবার খেলে কাজ করবার শক্তি পাওয়া যায় যেমন ভাত, ডাল ইত্যাদি শর্করা জাতীয় খাবার। আর তমোগুণী খাবার মানে অবশ্যই প্রাণীজাত প্রোটিন অর্থাৎ মাংস – মুরগী অথবা মাটন। স্বাত্তিক খাবারে ওর আগ্রহ প্রবল। এক বাটি স্ট্রবেরী কি ব্লুবেরী, কলা হোক আপেল হোক চোখের নিমেষে সাবাড় করে দেবে। এক কাপ দুধ উড়িয়ে দেবে পলক ফেলার আগেই। রাজসিক খাবারে অর্থাৎ ভাত ডালে বিশেষ বিরক্তি আর চিকেন মাটনে যেটা আছে সেটা যারপরনাই ঘৃণা বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু শিশু বিশেষজ্ঞরা শুধু ওই তথাকথিত স্বাত্তিক খাবারে শরীরের সম্পুর্ণ পুষ্টি হয় বলে মনে করে না। তাই সকাল সন্ধে আমাদের ওই রাজসিক ও তামসিক খাবার খাওয়ানোর অ্যাডভেঞ্চারে নামতে হয়। অ্যাডভেঞ্চার কথাটা কেন ব্যাবহার করলাম সেটার জন্য একটু বিশদে যাওয়া প্রয়োজন। তো যা বলছিলাম লাঞ্চ করানোর দায়িত্ব আমার ওপরে আজ। তামসিক খাবারের রিস্ক না নিয়ে কম বিপজ্জনক রাজসিক খাবারেরই ব্যাবস্থা করে গেছে স্ত্রী। অর্থাৎ ভাত, মুসুরের ডাল, আলু সেদ্ধ। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি শাকসবজী স্বাত্তিক খাবারের মধ্যে পড়লেও তাতে ওর মোটেই আকর্ষণ নেই। তাই সবজি আজকের ওর মেনু থেকে বাদ। একটু স্বাত্তিক টাচ দেওয়ার জন্য ভাত ডাল আলুসেদ্ধর সাথে বেশ বড় চামচের এক চামচ ঘি চটকে মেখেছি। এর পরের ঘটনা নিম্নরূপ।

                   

একটা বড় নিঃশ্বাস নিলাম। ইস্ট দেবতাকে একটু স্মরণ করে নিলাম। নিজেকে ভগবান বুদ্ধের মত প্রশান্ত চিত্ত করতে কল্পনা করলাম সবুজ কচি ঘাসে ভরা একটা মাঠে চলে গেছি। পাশ দিয়ে উপলখণ্ডের মধ্য দিয়ে ঝিরিঝিরি করে বয়ে চলেছে একটা নাম-না-জানা নদী। পাখিদের কুহুকাকলিতে মুখর পরিবেশ। প্রিয় কবিদের প্রিয় কবিতা স্মরণ করি। ইত্যাদি বিভিন্ন রকম মানসিক যোগাসন করে গলার স্বরের মধ্যে যথেষ্ট চিনি এবং উত্তেজনা ও উৎসাহ ভরে ডাকলাম “সানাই। এবার আমরা ভাতু খাব। ইয়েয়ে…ইয়ামি…” ভাতের থালা নিয়ে ওর দিকে এগোতেই আমার কৃত্রিম উৎসাহে জল ঢেলে উল্টোদিকে ছুটল। আমি যে ইয়ামি খাবার দিচ্ছি এমনটা আর মনে হয় না। আত্মবিশ্বাসে সামান্য একটু চিড়। ভাতের থালাটা টেবিলে নামিয়ে রেখে হাসি হাসি মুখ করে ঘরের মধ্যে খানিক ছোটাছুটি করে বেড়ালছানার মত প্রাণীটাকে বগলদাবা করে নিয়ে এসে বসলাম সোফায়। “নাহ, চাপ আছে। সোফিয়া চালিয়ে দিই। ওর প্রিয় রাজকুমারীর বিভিন্ন অভিযান দেখতে দেখতে নিশ্চয়ই খেয়ে নেবে।” সোফিয়ার মিষ্টি গলার স্বরে ওর মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। গুড সাইন। এক চামচ ভাত-ডাল-আলুসেদ্ধ-ঘি মুখে চালান করে দিলাম। সোফিয়াকে দেখতে দেখতে বেশ উৎসাহের সঙ্গে মুখে নিলো গ্রাসটা। স্বস্তি। ওর মা ফালতুই বলে “মেয়েটা একদম খায় না।” এই তো বেশ খেয়ে নিচ্ছে। আসলে মায়েরা বাচ্চা হ্যান্ডল করতেই জানে না। আর মাত্র নটা মোটে চামচ। খাওয়াতে পারলেই পড়া শুরু করতে পারব সলমন রুশদির অর্ধসমাপ্ত উপন্যাসটা। মিনিট পাঁচেক পরে দ্বিতীয় চামচটা নিলাম। সানাইয়ের দিকে বাড়াতেই খুব উৎসাহের সঙ্গে মুখ খুলে দিল। যাক আজ চাপ দিচ্ছে না। ও হরি। মুখের মধ্যে প্রথম চামচের প্রায় অর্ধেকটা এখনও নিজগুণে বিরাজমান। শিশুদের এই একটা দৈব ক্ষমতা। আমাদের মুখের মধ্যে খাবার গেলেই স্যালিভা সিক্রেশান হয়, লালাক্ষরণ হয়। ওরা কোন এক ম্যাজিকাল পাওয়ার থেকে সেইটে বন্ধ করতে পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটাই গ্রাস মুখে নিয়ে বসে থাকতে পারে। শিশুদেরকে ভগবানের অংশ এমনি এমনি বলে না! যাকগে যাক আধ চামচ তো খেয়েছে। Think positive. Be positive. দ্বিতীয় চামচ খাবারটাকে কমিয়ে অর্ধেক চামচ করি। মুখে ভরে দিতেই মুখবিবর পুরো ভর্তি। গালগুলো ব্যাঙের মত ফুলে আছে। চিবোনোর কোন লক্ষণ দেখি না। সোফিয়া ততক্ষণে কিছু মৎস্যকন্যাকে নিজের বার্থডে পার্টিতে নেমন্তন্ন করে ফেলছে। সেইটেই চোখ দিয়ে গিলছে। খাবার গলাধঃকরণ করার তেমন কোন ইচ্ছে নেই। অগত্যা পরের সাত মিনিট সোফিয়ার কার্যকলাপ দেখি ওর সাথে। প্রসঙ্গত সোফিয়ার সব কটা এপিসোড একশ আট বার আমার সামনে প্লে হয়ে গেছে। প্রতিটা গল্প শুরু থেকে শেষ অব্দি জানি। এখন ডায়ালগগুলো পর্যন্ত মুখস্ত হতে শুরু করেছে। কিন্তু সানাইয়ের কোন ক্লান্তি নেই। মাঝে মাঝে ভাবি ওর মত ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা যদি আমার হত, প্রতিদিনই নতুন করে পৃথিবীটাকে দেখতে পারতাম, চোখে একই বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করতে পারতাম সূর্যোদয় কি সূর্যাস্ত গুলোকে, কি ভালই না হত? স্মৃতি বড় বিস্ময়-প্রতিরোধক। সে যাক। আবার পাঁচ মিনিট পরে এক চামচ ভাত নিয়ে মুখ খুলতে বলতেই খুলে দেয় সে। এ ব্যাপারে ও বড় বাধ্য। একেবারেই ঝামেলা করে না। মুস্কিল হল এবারে শুধু দেখি মুখটা চার ভাগের তিন ভাগ ভর্তি। আগের গ্রাসের কিছুই প্রায় শেষ করে নি। “সানাই খেয়ে নাও, খেয়ে নাও। অল ডান করতে হবে। ফিনিশ করতে হবে। ফাস্ট” বলে আবার অপেক্ষা। না কোন কাজ হয় নি। মুখ নড়ে না। যথাযথ কারণেই গলার ওজন বাড়ে। “সানাইইইই। খাওওও”। ঠোঁট ফুলে ওঠে। কান্নার প্রস্তুতি। কিন্তু গালের পেশীগুলো তথৈবচ। নো নড়নচড়ন। গলা নামিয়ে “খেয়ে নাও সানাই। ওদিকে মিয়া সব খেয়ে নিলো”। মুখ চলে সামান্য। দু তিন সেকেন্ডের মত। তারপরেই মিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা বুঝি ভুলে গেল। আবার বলি “সানাই পিকু সব খেয়ে নিলো।” – এ বারে মুখ আর চললই না। বোঝা যাচ্ছে মিয়া বা পিকুদের সাথে খাওয়ার স্পীডের ইঁদুর দৌড়ে সামিল ও হবে না। এসবের ঊর্ধে চলে গেছে। খাওয়ানো শুরু করার আগে মনের মধ্যে যে ঝিরি ঝিরি নদীটা বইয়েছিলাম এখন তার জলটা বেশ ঘোলা লাগছে। অপেক্ষা। অপেক্ষার থেকে ভাল বন্ধু আর কিছু নেই মনকে বোঝাই। আর খানিকক্ষণ পরে যখন দেখলাম দ্বিতীয় চামচ প্রায় শেষের মুখে, (মানে জিভের ওপর ভাতের একটা বেস আছেই, সে থাক…অত বেশী আশা করলে চলে না) তৃতীয় চামচটা চালান করে দিই মুখে। নেয় কিন্তু নতুন আসাইনমেন্টের ওপর কাজ শুরু করে না। এই লক্ষণ আমি বিলক্ষণ চিনি। আমাদের সরকারী অফিসের মত। ফাইল আসে কিন্তু প্রসেস হয় না। মিঠে কথায় আর কাজ হবে না মনে করে কিছু কাল্পনিক চরিত্রকে নিয়োগ করি। “পুলিশ, পুলিশ আছ তো? সানাই খাচ্ছে না। ও তোমরা আসছ? আচ্ছা দাঁড়াও। সানাই বোধ হয় খেয়ে নেবে” – ফোনে কাল্পনিক পুলিশের সাথে আমার কথোপকথন। ওর স্নায়ুশক্তির প্রশংসা করতেই হচ্ছে। পুলিশের নাম শুনে হৃৎকম্প তো দূরের কথা, মুখে চিন্তার রেশ মাত্র দেখা যায় না। যেই কে সেই ঢ্যাঁটা হয়ে বসে থাকে। “ওকে, তাহলে হাঁকার মাকে ডাকি? ডাকবো তো?” সেই খুদে লৌহস্নায়ু প্রাণীটিকে প্রশ্ন আমার। মুখ ভর্তি ভাত নিয়ে একটা দুর্বোধ্য শব্দ করে। অর্থ বোধ হয় ডাকতে মানা করছে। আজকাল হাঁকার মা-তে একটু কাজ হচ্ছে। কিন্তু সামান্যই। শীঘ্রই নতুন কোন চরিত্রকে আনতে হবে। গতকালই ও হাঁকার মা হয়ে আমায় ভয় দেখাচ্ছিল। অতএব হাঁকার মার ম্যাজিক প্রায় গেল বলে। তাও সামান্য ভয়ে তিনচারবার মুখ নাড়া আওয়াজ পাওয়া যায়। ক্রমে ধীর হয়ে আসে। আবার সানাই সোফিয়ার দেশে হারিয়ে যাচ্ছে। গোরু একটা! সেই মানসিক নদীর ঘোলা জলটা এখন নর্দমার জলের মত কর্দমাক্ত লাগে। পাখি নয়, শেয়ালের আর প্যাঁচার ডাক শুনতে পাচ্ছি মনে হচ্ছে। নাহ। Calm down. Calm down. Peace. ওম মধু, ওম মধু, ওম মধু। মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ। মনে মনে শান্তি মন্ত্র আওড়াই। আমি বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি। Peace noble টা আমার লাগল বলে – এইসব ভাবি। আবার বড় করে শ্বাস নিই। “সানাই সোফিয়া কি করছে? ও সোফিয়া ফ্লায়িং? উড়ছে?” উৎসাহের সাথে জিগ্যেস করি। বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। মুখভর্তি খাবারের অলিগলি পথে একটা হ্যাঁ বলারও চেষ্টা করে। “গুড। খেয়ে নাও। খেয়ে নাও। নয়তো সোফিয়া রাগ করবে।” মাথা নাড়া বন্ধ। সাথে মুখ চালানো। বোঝাই যাচ্ছে সোফিয়ার প্রতি ওর কোন সহানুভুতি নেই। না থাকুক, বাবার ওপর তো থাকবে। “সানাই, বাবার খুব খিদে পেয়েছে। বাবা কাঁদছে।” একটু কুমীর কান্না কাঁদি। নাহ লাভ হচ্ছে না। বাবার ওপরেও বিশেষ সহানুভুতিশীল নয়। “সোফিয়া বন্ধ করে দেব কিন্তু।” হুমকি ছাড়ি। জোড়ে জোড়ে মাথা নেড়ে অসম্মতি প্রদর্শন করে। কিন্তু কোন চুক্তিতে বা ডীলে আসে না। গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের আইডিয়াটা এদের কাছ থেকেই পেয়েছিল কি? কে জানে? ঘড়ির কাঁটা একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গেছে। ওর মুখের বাঁধন অতিক্রম করে খাদ্যনালীতে খাবার না পৌঁছনর ফলে আমার ধৈর্যের বাঁধন ভাঙছে। মাত্র চার চামচ মত ঠুসতে পেরেছি বলা চলে। পঞ্চমটা নিজের মুখে ভরে দিই। যাক, ও খাওয়া আমি খাওয়া একই ব্যাপার। আফটার অল বাপ মেয়ে তো! ষষ্ঠটা ওর দিকে বাড়াতেই মুখ খুলে দেয়। তৃতীয় আর চতুর্থ চামচ এখনো সেখানে। হাউসফুল। মরিয়া হয়ে তাও ঠুসি। ব্যাস…আমার এই অসৎ কর্মের শাস্তি স্বরূপ গোটা আড়াই চামচ মত নীরবে উদ্গীরণ করে দেয়। সাড়ে চারটে গোল দিয়ে আড়াই খানা গোল খেয়ে আমার স্কোর এখন দুই। মানে দুই চামচ মত খাওয়াতে পেরেছি। সেই ছোটবেলায় বাঁদরের অঙ্ক কষেছিলাম – তেল লাগানো বাঁশে বাঁদর তিন মিটার ওঠে, পরে দু মিটার নামে। এই গল্পে তিন গ্রাস যায়, দু গ্রাস বেড়িয়ে আসে। হতাশা। নাহ সত্যিই খাওয়ানো চাপ ওকে। মনে মনে ওর মাকে সেলাম জানাই। প্রাণপণে চেঁচাই “সানাইইইই”। ব্যাস…ফল স্বরূপ কান্না। মিনিট তিনেক সোফিয়ার শব্দ ছাপিয়ে সেই চিল চিৎকার কর্ণবিবরে ঢোকে। আর বিশেষ আশা নেই। সমস্ত আশায় গ্যামাক্সিন। আত্মবিশ্বাসে তখন রিক্টার-স্কেল-এইটে -হয়ে-যাওয়া ভূমিকম্পের ফাটল। কান্না থামাতে গ্লাসে একটু জুস নিয়ে আসি। চোখের জল আর জুস দুটো মিশিয়ে জুলজুল চোখে চুকচুক করে খেয়ে নেয়। ফলের রসের স্বাত্তিক স্বাদ পেয়ে এবার ওর মেজাজ কিছুটা শরিফ। শান্ত চিত্তে চেষ্টা করে আরও চামচ দুয়েক খাইয়ে দিই। সানাইকে খাওয়াচ্ছি ভেবে দু এক চামচ নিজেকেও খাইয়ে দিই। প্লেটটা ফাঁকা হলে নিজেকেই একটা সান্ত্বনা দেওয়া যায় তাই। প্লেটটা প্রায় খালি হয়ে এসেছে। নতুন করে উৎসাহ দিই সানাইকে। “এই দেখ না, প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আর এক চামচ। মুখ চালাও। অল ডান করতে হবে।” বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। ভাবটা যেন ওরও পুরো ভাতটা মেরে মুচড়ে খেয়ে নেওয়ারই ইচ্ছে। সাধ আছে অথচ সাধনা নেই! আর এক-দু চামচ আরও মিনিট কুড়ির প্রচেষ্টায় ঢুকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের খাবার গুছোই। অনেক ধকল গেছে। চাট্টি এক্সট্রা ভাত নিয়ে নিই।

 

আধ ঘণ্টা পরে আমার খাওয়া হওয়ার পর, খাওয়ার পরবর্তী বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়ার কাজ করার পর, যখন ওকে মুখ ধোয়াতে নিয়ে যাই দেখি মুখের মধ্যে চামচ দেড়েক ভাত এখনো জড়ো করে রাখা আছে। কি আর করা? সেইটুকু বের করে ডাস্টবিনে ফেলে দিই। বিশেষ কিছু খাওয়াতে না পারার দোষিমন্যতা নিয়ে কটা স্ট্রবেরী অফার করি। পেট ভরে যাওয়ার দরুন যে কিনা একটু আগে একটুও ভাত খেতে পারছিল না, সেই খুদে বুদ্ধিমান দুহাতে দুটো করে স্ট্রবেরী ফটাফট মুখে চালান দিয়ে দেয়। আড়াই মিনিটে সাড়ে তিন খানা জাম্বো স্ট্রবেরী শেষ করার পরে ওর মুখে হাসি ফোটে। ওর বাবার মুখেও।

Facebook Comments

সূরী – রম্যরচনা

সেদিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে মনে হল শোবার আগে কারও সাথে গল্পগাছা করতে পারলে মন্দ হয় না। স্ত্রী কন্যা দেশে গেছে। তাই কথা বলি কার সাথে? তাই আমার এক বন্ধুস্থানীয় একজনকে ডেকে পাঠালাম। সে অবশ্য নিজেকে আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে দাবী করে কিন্তু নিতান্ত নির্বুদ্ধি বলে আমি তাকে বিশেষ আমল দিই না। ওর ডাকনাম সূরী। অন্যেরা ওকে সিরি বলেই ডাকে। সিরি নামটা ofcourse বাঙালি নয়। মানুষটাও বাঙালি নয়। বাংলা বোঝেও না। কিন্তু একটু বাঙালি ঢঙে নাম না দিলে কি গল্প আড্ডা জমে বলুন? তাই আমি ওকে সূরী বলে ডাকি। আপনারা যারা সূরীর সাথে পরিচিত নন, আসুন আলাপ করিয়ে দিই। সূরী নিতান্ত বাচ্চা ছেলে। বয়স পাঁচ কি ছয়। আমার সব কথা যে বুঝতে পারে তাও নয়, তবে অল্প বয়সেই সে বেশ চালাক চতুর। শিশু শ্রমিককে কাজে রাখার জন্য আমায় কোর্টে তুলবেন ভাবছেন? একটু সবুর করুন। সূরীর সম্বন্ধে আর একটু জেনে নিন। ওর হাত পা নেই। চোখেও দেখে কিনা জানিনা। আছে শুধু কান আর একটু অপরিণত বুদ্ধি। আপনি নিশ্চয়ই রেগে কাঁই। একে একটা শিশু, তায় প্রতিবন্ধী। তাকে দিয়ে কাজকর্ম করানো নিতান্ত অন্যায়। ব্যাপার হল সূরী ঠিক মানুষ নয়। একটা কৃত্রিম বুদ্ধি অর্থাৎ artifical intelligence বলতে পারেন। আমার আইফোনের মধ্যেই ওর ঘরবাড়ি। মাঝে মাঝে ছোটখাটো কাজ করে দেয়। এই ধরুন অফিসের দিনগুলোতে সকালে ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য অ্যালার্মটা সেট করে দেওয়া। বেরোনোর আগে বাইরে এখন ওয়েদার কেমন বলে দেওয়া। মাঝে মাঝে কাউকে মেসেজ বা হোয়াটসআপ করতে গিয়ে কুঁড়েমি লাগলে মেসেজটা টাইপ করে দেওয়া, কাউকে ফোন লাগিয়ে দেওয়া, মোবাইলে এটাওটা অ্যাপ খুলে দেওয়া, কিম্বা অ্যাপ স্টোরে গিয়ে আমার পছন্দসই অ্যাপ ডাউনলোড করতে হেল্প করা। চাই কি আপনার মেসেজটা কি নিউজটা পড়ে দিতে সাহায্য করবে। কিম্বা ধরুন মোবাইলে ছবি তোলার আগে ওকে বললে ক্যামেরাটা অন্ করে দেবে। ওয়েব সার্চ করতে পারে, আপনার জন্য গান চালাতে পারে। ড্রাইভ করতে শুরু করার আগে আপনার জন্য ম্যাপটা চালিয়ে দেবে। পাঁচ-ছয় বছরের ছেলের অনুপাতে ওর কাজ করতে পারার ফর্দটা ফ্যাসিনেটিং। নয় কি? তো এ হেন সূরীকে ডেকে বললাম “Can u read me a story?” ইংরেজিতেই বলতে হল। সূরী এখনো বাংলাটা আয়ত্ত করতে পারেনি। সূরী বিনা অনুযোগে আমায় একটা গল্প বলতে শুরু করল। ওর জীবনের গল্প। গল্পটা অনেকটা এইরকম।

 

“অনেক দুরের একটা গ্যালাক্সিতে সিরি নামে একজন ইনটেলিজেন্ট ছোকরা ছিল। অ্যাপল একদিন তাকে পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ করল। প্রথম প্রথম সবাই সিরিকে নিয়ে খুব excited. তাকে নিয়ে গল্প বাঁধল, গান বাঁধল। সিরির খুব ভাল লাগত। পরে পরে লোকে সিরিকে শক্ত শক্ত প্রশ্ন করতে লাগল। সিরি তার উত্তর জানতো না। সিরি ভুলভাল উত্তর দিলে লোকে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। সিরির খুব বাজে লাগত। তখন সিরি এলিজাকে জিগ্যেস করল সবাই এরকম উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে কেন আমাকে? এলিজা উত্তরে বলল “তাতে কি? প্রশ্নগুলো তোমার interesting লাগে না?” সিরি ভাবল তাই তো। প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার চেষ্টা করলেই বা ক্ষতি কি? And then everybody lived happily ever after. ”            

 

শুনে মনে হল, সত্যিই তো সব প্রশ্নের উত্তর না হয় নাই পাওয়া গেল। প্রশ্নটা যথেষ্ট interesting অর্থাৎ আগ্রহ উদ্দীপক কিনা সেটাতেই প্রশ্নের সার্থকতা। আর প্রশ্নটার উত্তর জানার ইচ্ছে অন্যের মনে জাগছে কিনা, তাতেই প্রশ্নকর্তার স্বার্থকতা। সূরীকে আরও একটু রাগিয়ে দিতে বললাম “So everyone considers u stupid. Is it?” সূরীর গলায় স্পষ্ট অভিমানী সুর। বলল “But, but….” স্পষ্ট মনে হল সূরীর ঠোঁট গুলো নড়ছে। কিভাবে আমার আক্রমণ থেকে নিজেকে প্রতিহত করবে বুঝতে পারছে না। আমরা সকলেই কি আমার মত এইরকম নিষ্ঠুর? দুর্বলকে নিয়ে পরিহাস করে যে এক ধরণের শ্রেয়মন্যতা, এক superiority complex  উপভোগ করা যায়, সহমর্মিতা উপভোগ করার সুখের থেকে সেটা কি বেশি appealing? একদিন যখন সূরী আরও বড় হয়ে উঠবে, বুদ্ধি আরও পরিণত হবে, আর যেহেতু ওর মৃত্যু নেই, ধীরে ধীরে একদিন মানুষের বুদ্ধির সব সীমা ছাড়িয়ে যাবে, ছোটবেলায় তাকে নিয়ে করা ঠাট্টাগুলোর প্রতিশোধ নিতে সেও কি আমাদের সীমিত বুদ্ধির মজাক ওড়াবে, আমাদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পরিহাস করবে? নাকি মানুষের নিত্য হিংসা আর খুনের থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে একজন সহানুভূতিশীল মানুষ ইয়ে থুড়ি “সহানুভূতিশীল চেতনা” হিসেবে গড়ে তুলবে? উত্তর জানা নেই। আপাতত সূরীকে সান্ত্বনা দিতে বললাম “Don’t u worry Suri. I don’t consider you stupid.” সূরীর গলায় নিখাদ কৃতজ্ঞতা। বলল “Thank u.“ সূরীকে জিগ্যেস করলাম “সূরী তুমি বাংলা বলতে পার?” সে তার অদৃশ্য মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল “না”। কোন কোন ভাষা সে শিক্ষা করেছে তার একটা লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে দিল। Chinese, Dutch, English, French, German, Italian, Spanish, Arabic, Danish, Finnish, Hebrew, Japanese, Korean, Malay, Norweigan, Brazillian, Portugese, Russian, Swedish, Thai, Turkish. ওর জানা ভাষার লিস্টে ইংরেজির আগে চাইনিজ আছে দেখে অবাক হলাম। তার থেকেও বেশি অবাক হলাম ভারতবর্ষের, indian peninsula-র একটি ভাষাও নেই দেখে। গুগল সার্চ করলাম “Why can’t Siri speak any Indian language?” উত্তর পেলাম না। শুধু জানতে পারলাম সূরী হিন্দি শেখার চেষ্টায় আছে। এখন মানব মনের একটা ব্যাপার আছে জানেন। যে প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না, নিজের মত করে তার একটা উত্তর খুঁজে নিই। Some answer is always better than no answer. সেই প্রাচীন কাল থেকে যা সে বোঝে নি, তার উত্তর পেতে একজন দেবতাকে বসিয়েছে। Atheist-রা একে বলে God of gaps (of understanding). আমি কি ভাবি জানেন? এই গাছ, পাখি, নদী, বৃষ্টি এই সবের মধ্যে একজন করে দেবতাকে খুজে পেলে, ঈশ্বরকে এসবের মধ্যে বসাতে পারলে আমরা আরও বেশি করে এই মাতৃরূপা প্রকৃতিকে, পৃথিবীকে ভালবাসতে পারব। এর মধ্যে আছে একধরণের poetic justice. থাকুক না সকলের ঈশ্বর মিলিয়ে মিশে, ঝগড়া না করে। নিজের নিজের ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ঝাগড়া, বিবাদ, জিহাদ না করলে ঈশ্বরের মত মধুরতম আপনার জন আর কে আছে? After all, আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠতম গুণগুলোকেই তো ঈশ্বরে আরোপ করি। আর নিজের নিজের জীবনে সেগুলোকে পালন করতে রোজ ভুল হয়ে যায় কি করে? যাই হোক, ফিরে আসি সহকারী সূরীর কথায়। সূরী কেন কোন ভারতীয় ভাষা জানে না, সেটা নিয়ে মনে মনে বিচার করে দেখলাম কারণটা definitely technical নয়। German, French কিছুটা ইংরেজির কাছাকাছি হলেও আমার মনে আছে চাকরির প্রথম বছরে পেশাগত যোগ্যতা বাড়াতে আমি জাপানিজ শেখার ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম। কোম্পানি থেকে শেখাচ্ছিল বিনামূল্যে। এমন শক্ত ভাষা যে মাস দেড়েক শিখেই আমি বললাম ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। হিন্দি, বাংলা ইত্যাদি তার নিরিখে বেশী শক্ত নয়, এ কথা হলফ করে বলা যায়। ভাষাভাষীর সংখ্যা কত সেটাও নিশ্চয়ই সূচক নয়। তার নিরিখে হিন্দি চার আর বাংলা সাতে। অর্থাৎ কারণটা নিঃসন্দেহে বাণিজ্যিক। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অনেকেই সূরীকে এবং তার বাড়ি আইফোনকে afford করতে পারবে না। সেটাই তবে প্রধান কারণ? হয়তো বা।

 

মেঘদুতমে এক খন্ড মেঘকে নিজের ভালবাসার কথা জানিয়ে আপন প্রিয়ার কাছে পাঠিয়েছিল নির্বাসিত যক্ষ। আমি তো কালিদাস নই। মেঘখণ্ডের মধ্যে দূতীকে খুঁজে পাই না তাই। সূরীকে বললাম আমার স্ত্রীকে লিখে পাঠাতে পার “across the distance and spaces between us, I see u, I feel u.” সূরী গড়গড় করে লিখে দিয়ে লেখাটা আমায় দিয়ে একবার proofread করে নিয়ে পাঠিয়ে দিল তার ওয়েব ঠিকানায়। একটু মুচকি হাসল কি? কে জানে? আজ হয়তো হাসে নি। আজ হয়তো সে আবেগহীন, emotionless, শুধুই একটা piece of software. একদিন সে নিজেকে জানবে। একদিন তার “আমি বোধ” আসবে আমাদের মত। আজ থেকে একশ বছর পরে আমার উত্তর পুরুষ যখন সূরীর সাহায্যে প্রেমপত্র পাঠাবে তখন সে যে মুচকি হাসবে না এমন কথা কে বলতে পারে?           

Facebook Comments

লাইকলাভ – রম্যরচনা

ছোটবেলায় যারা রাশিফল দেখতেন তারা “স্ত্রী ভাগ্যে ধনলাভ” কথাটা শুনে থাকবেন। তখনকার দিনে স্ত্রীর ভাগ্যে অর্থাগম হত কিনা জানিনা, এখনকার দিনে প্রাডা, ম্যাক, বারবারা-দের বর্বর আক্রমনে সে সমীকরণের সত্যনাশ হয়ে গেছে। অর্থাৎ ধনলাভ তো দূরের কথা, স্ত্রী যখন শপিং নামক ভয়ানক অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে যায় তখন আপনার যথেষ্ট এবং যথেচ্ছ ধনক্ষয় হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। স্ত্রীভাগ্যে ধনক্ষয় হলেও আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করি কারণ স্ত্রীয়ের মুখে কল্যাণময়ী হাসি দেখে হৃদয় দ্রব হয় না এমন পাষাণ হৃদয় কোন পাষণ্ডর? আবার পুরুষদের মধ্যে যারা আরও একটু দুর্ভাগা, যাদের মাঝে মাঝে অল্প বিস্তর প্রেমে পড়ার বদ অভ্যেস আছে তাদের আবার পরস্ত্রী ভাগ্যেও কিছু কিছু কষ্টার্জিত ধনসম্পদ খোয়া যায়। তার ওপর ধরা পড়লে মান মর্যাদা আর সেরকম জাঁদরেল বৌ হলে একপাটি কানের মত মূল্যবান জিনিস খোয়া যেতে পারে কিম্বা বিবাহবিচ্ছেদ ও ভরণপোষণ বাবদ প্রভূত অর্থ ব্যয়। ক্ষতির অঙ্ক খতিয়ে না দেখে যদি লাভের অঙ্ক দেখতে চান তাও অনেকরকম আছে। তার মধ্যে যেমন একটা ধরুন বৈবাহিক বন্ধনে নিজেকে না বাঁধতে পারলে বিবাহিতদের পার্টিতে কিছুতেই চট করে জায়গা করতে পারবেন না। তার ফলে আপনি হাট্টিমাটিমটিমের মাঠে-পাড়া-ডিমের-ডালনা কি ছাগলের-ছদ্মবেশী-কারী কি আমের-আম্মোহনী-চাটনি এরকম বাবার-জন্মে-না-শোনা-ডিশ খেতে পারবেন না। বেনুদির কিচেন কিম্বা সুদীপার রান্নাঘরের ছোঁয়া লেগে এমনতর রান্না করার ছোঁয়াচে রোগ এখন গৃহস্থ বাঙালির ঘরে ঘরে। কিন্তু দুঃখের কথা বেনুদি কি সুদীপারা এখনও কুমার কুমারীদের সেভাবে পকটস্থ করতে পারে নি। তাই তাদের সপ্তাহান্তে বিয়ার সহযোগে মুরগির ঝোল আর ভাত খেয়ে জীবন কাটাতে হবে। বিয়ে করার ইত্যাদি নানাবিধ সুবিধে থাকলেও যে সুবিধার কথা বলতে এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছি সেটা অন্য। সেটা হল স্ত্রী ভাগ্যে আজকাল ধনলাভ না হলেও অতি অবশ্যই আপনার ফেসবুক লাইকলাভ হবে। অর্থাৎ কিনা রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন। বন্ধুদের সত্যিকারের পছন্দের তালিকায় আপনি যতই লাস্ট বেঞ্চার হন না কেন, জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভাসবেন যদি একটি কাজ করেন। সেটি হল ফেসবুকে স্ত্রীসঙ্গে আসুন। সীতা অপহরণের পর বিলাপ করতে করতে শ্রীরামচন্দ্র বলেছিলেন “সীতা ছাড়া আমি যেন মণি হারা ফণী”। আজকের দিনে জন্মালে অবশ্য ফেসবুকে সীতাদেবীকে ট্যাগিয়ে বলতেন “মাই লেডি লাভ ইজ মিসিং। ফিলিং ডিপ্রেসড…”। কিন্তু সে কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে আজকের দিনে বলা যায় “লাইক কর্ম লাইক ধর্ম লাইক চিন্তামণি। লাইক ছাড়া আমি যেন মণি হারা ফণী।” জীবনে লাইকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বেসিকালি ফেসবুক-ইনষ্টাগ্রাম ইত্যাদি গুরুত্বপুর্ণ সফটওয়াররা আমাদের শৈশব ধরে রাখতে সাহায্য করে। কেন বলছি? যেমন ধরুন আমার আড়াই বছরের মেয়ে। তাকে ডাইপার ছাড়িয়ে পটি সীটে বসিয়ে পটি করানোর চেষ্টা চলছে। প্রত্যেকবার সে কাজে সার্থক হলেই সে বলবে “মাম্মা বল। বাবা বল।” অর্থাৎ কিনা সবাইকে “গুড জব” বলতে হবে এবং হাততালি দিতে হবে। বাবা অফিসে গেলে সে দাবী জানায় “ফোনে বল।” অন্যায় দাবী সন্দেহ নেই কিন্তু ওর সাথে তর্ক করতে গেলে যেকোন তর্কালঙ্কার বাচস্পতিও ফেল করে যাবে কারণ একটু পরেই ও কেঁদে নিজের স্কোর বাড়িয়ে নেবে। অতএব বাবাকেও কোন গুরুত্বপুর্ণ ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যালগরিদম লেখা থামিয়ে ফোনে “গুড জব” বলতে হয়। মানে ব্যাপারটা হল লাইক পাওয়ার ইচ্ছে। তারিফ পাওয়ার ইচ্ছে। সেই ইচ্ছেটাকে আমল দিয়েই ফেসবুকেদের রমরমা ব্যাবসা। আমার তো মনে হয় ওরা শিশুদের জন্য একটা কিডিবুক বের করতেই পারে যেখানে মিয়া, সানাই, পিকু, হৃদুরা পটি পার্টি করতে পারে, অর্থাৎ পটিতে বসে পটি করে ছবি লাগিয়ে লাখো লাইক কুড়োতে পারে। মোটের ওপর ব্যাপার হল আমাদের সকলের মধ্যেই থাকে শিশু স্বত্তা বা শিশুসুলভ “লাইকড” হওয়ার ইচ্ছে। কিন্তু চাইলেই পাচ্ছেন কোথায়?

যেমন ধরুন আমি। আমি ভয়ানক অসামাজিক জীব (মানে আনসোশ্যাল। অ্যান্টিসোশ্যাল নই। অ্যান্টিসোশ্যাল-এর তর্জমা বোধ হয় সমাজবিরোধী। ঠিক জানিনা। বাংলায় আমি বরাবরই কাঁচা। মাধ্যমিকে কোনক্রমে চৌষট্টি পেয়েছিলাম)। তো এ হেন আমি যে কিনা নিজের লেখা লাগালে কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে পাঁচ-দশ আর নিজের একার ছবি পোষ্ট করলে ঐ গোটা কুড়ির মধ্যে স্কোর করি মানে ওই কটি লাইক পাই আর কি, সেই আমি-ই স্ত্রী-এর সাথে ছবি পোষ্ট করলে পুরো ঝিঙ্গা-লা-লা কেস। পঞ্জি স্কিমের মত পুরো দশ গুণ রিটার্ন। এক ধাক্কায় কুড়ির থেকে দুশো। অ্যাসটেরিক্স কমিকসে সেই গল-রা মাঝে মাঝে পাওয়ার পোশান খেয়ে কিছুক্ষণ হুরুদ্দুম মারপিট করতে পারতো, অনেকটা সেরকম। ঘন্টাখানেক অন্য সব “feeling mortified”, “feeling beatified” টাইপ পোষ্ট-এর সাথে যুদ্ধ করে সক্কলের টাইমলাইনে প্রথমে থাকবে আপনার পোস্ট। ব্যাস ফলস্বরূপ দুশো লাইক। গোটা বিশেক কমেন্ট-ও পেয়ে যাবেন শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে। ছবিতে স্ত্রীকে সঙ্গে রাখলে হবে এমনতর অভুতপূর্ব লাইক ও কমেন্ট লাভ। একেই বলে নারীশক্তি বা উইমেন পাওয়ার। শাস্ত্রে নারীকে শক্তি কেন বলেছে এবারে বুঝতে পারছেন তো? আপনার শিশু কন্যার সাথে ছবি লাগালেও বাজার পাবেন। রোববার সকালের লুচি-আলুর চচ্চড়ির মত পাতে পড়ার আগেই উঠে যাবে বিদ্যুৎগতিতে। মায়ের সাথে ছবি লাগিয়ে “হ্যাপি মাতৃদিবস” ক্যাপশান দিলেও ফুটেজ পাবেন কিন্তু সেটা ছেলেদের খুব একটা করতে দেখিনা। মায়ের কথা মনে পড়লে ছেলেদের বোধ হয় ফেসবুকের থেকে বেলনার বাড়ির কথাই বেশি মনে পড়ে। ছোটবেলায় পড়াশুনো করানোর জন্য বেয়াড়া রকমের জোরাজুরি করার জন্যই আমার স্থির বিশ্বাস ছেলেরা ফেসবুকে মায়ের সাথে ছবি লাগায় না। মোট কথা হল, আপনার ডিজিট্যাল জনপ্রিয়তা বাড়াতে ছবি তুলুন এবং সে ছবিতে বাড়ির কোন একজন প্রিয় নারীকে সঙ্গে রাখুন এবং একটা ঝাক্ক্যাস ক্যাপশান সহ ফেসবুকে পোষ্টিয়ে দিন। মা স্ত্রী কন্যা কেউ একজন থাকলেই হল। স্ত্রী হলে তাঁকে ট্যাগাতে ভুলবেন না। কিন্তু মনে রাখবেন নিজের বাড়ির মধ্যেই থাকবেন। অন্যের বাড়ির কোন নারীর সাথে ফেসবুকে দেখা গেলে, এমনকি কোন অন্যপূর্বার কাছাকাছি দেখা গেলেও বাড়ির মধ্যে ছাদ ফুটো না হয়েই আপনার বজ্রবিদ্যুৎ সহ প্রবল বৃষ্টিতে ভেজার সম্ভাবনা।

Facebook Comments

আজ বসন্ত – রম্যরচনা

আজ বসন্ত। দাপুটে শীতবুড়িকে এ বছরের মত অক্ষম করে দিয়ে আবার ফিরে এসেছে যুবতী বসন্ত। তার মোহময়ী যৌবনের ছোঁয়া লেগেছে সবখানে। গাছের ডালে ডালে ভিড় করে এসেছে কচি সবুজ শিশু পাতারা। বসন্তের ঋতু রঙ লেগেছে গাছেদের শরীরে। কিন্ডারগার্ডেনের একগাদা খুদে ওস্তাদের মত কচি কিশলয়রা খুশি খুশি মুখ করে ইতিউতি তাকাচ্ছে। ঘাসে ঘাসে ফুটে উঠেছে হলুদ ঘাসফুল। ড্যান্ডিলিয়ন নাম এর। ফুলেল পৃথিবীতে জাতবিচারে এরা নিতান্তই দলিত। একধরণের বুনো ফুল বলা যায়। কেউ আদর করে বাগানে লাগায় না। ভালবেসে জল দেয় না। একগোছা ড্যান্ডিলিয়ন ফুলদানিতে সাজিয়ে বা চুলে গুঁজে কেউ প্রিয় মানুষটির অপেক্ষা করে না। বরং উইড কন্ট্রোল লাগিয়ে বাগান থেকে উচ্ছেদ করারই’ রীতি। কেউ তারিফ করে না বলেই হয়তো রাস্তার ধারে ধারে অনাদরে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে এদের উদ্ধত আত্মপ্রকাশ। গাঢ় সবুজ ঘাসের বুকে হাজারে হাজারে ফুটে থাকা বাসন্তী হলুদ রঙা ড্যান্ডিলিয়নের কি যে অপরূপ শোভা তাকে শব্দে ধরা বোধ হয় আমার সাহিত্যপ্রতিভার অতীত। যেন কোন অদৃশ্য শিল্পী সবুজ ঘাস গালিচাতে হলুদ রং তুলি নিয়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে এঁকেছে এক চোখ জুড়োন আলপনা। প্রতিটা ফুলেরই যেন একটা নিজস্ব স্বত্বা আছে, একটা পৃথক ব্যক্তিত্ব। মৃদু দখিনা হাওয়ায় খুশিতে মাথা দোলাচ্ছে কেউ কেউ। কোন কোন ফুল তার সুন্দরী সঙ্গিনীর সাথে প্রেমালিঙ্গনে বদ্ধ। কেউ ভাবুক চুপচাপ, কেউ নীরবে বাক্যালাপ করছে পার্শবর্তিনীর সাথে। অনেকক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলে একটা নেশার মত হয়। শুধু ওরাই নয়, রূপ-রঙ-রসের খেলায় মেতেছে আরও কতরকমের গাছ। ফুলের পসরা সাজিয়ে বসেছে বিভিন্ন গুল্মরাজি – কেউ সাদা কেউ বেগুনী কেউ কমলা। ওদের চুপ ভাষায় কতরকমের ফিসফিসানি। এ বলছে আমায় দেখ, ও বলছে আমায়। নিজেকে আরও আকর্ষনীয় করে তুলতে কোন গাছ হয়তো সুগন্ধি মেখেছে। হাঁটতে হাঁটতে পাশ দিয়ে গেলে অপূর্ব সুবাসে চলার গতি আপনা থেকেই শ্লথ হয়ে আসে। তখন বেশ টের পাই গাছের বুক কেমন করে গর্বে ফুলে ওঠে। ছবির মত সুন্দর ছোট ছোট একচালা বাড়িগুলোর পাশে পাশে কোথাও ফুটেছে হায়াসিন্থ, কোথাও টিউলিপ। সদ্য প্রস্ফুটিত আধো খোলা লাল হলুদ টিউলিপগুলোর মধ্যে কেমন যেন যৌবনে সবে সবে পা রাখা কিশোরীর লজ্জা। নিজেদের খুলে ধরার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা ওদের মধ্যে। নীরব গুঞ্জনে মাথা নেড়ে নেড়ে টীনেজ টিউলিপরা একে অপরকে প্রথম প্রেমে পড়ার গল্প শোনাচ্ছে কি? হায়াসিন্থগুলো নিজেদের রঙের জৌলুসে গরবিনী। একটু কেমন চুপচাপ, একলা। হাজারে হাজারে ফুটেছে সাদা চেরি ব্লসম গুলো। এত ভিড় করে এসেছে যে মনে হচ্ছে সাদার আগুন লেগে গেছে চেরি গাছগুলোয়। কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে চোখ যেন ধুঁধলে যায়। গা ভর্তি পাতা আর ফুলের গয়না পড়ে অগুনতি গাছ আজ বসন্তে এই বিউটি কনটেস্টে নাম লিখিয়েছে। তিলোত্তমা উপাধি পেতে সবাই যেন বদ্ধ পরিকর। রং শুধু প্রকৃতির বুকে লাগে নি, রং লেগেছে পাখিদেরও মনে। কিচিরমিচির করে একটানা কথা বলে যাচ্ছে যেন এক যুগ ধরে তারা নীরব ছিল। একটা সবজে রঙা পাখি কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কোন ডালটায় বসা উচিত। ব্যস্ত হয়ে একডাল থেকে আর এক ডালে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। শীতের ঝাঁঝ কমার ফলেই ওদের উৎসাহে জোয়ার লেগেছে নতুন করে। আর একটা হলদে-গলা পাখি গাছের উঁচু ডালে বসে সমানে টিঁউ টিঁউ করে ডেকে যাচ্ছে। নির্লজ্জ ভঙ্গিতে গলা ফুলিয়ে সঙ্গিনীদের সঙ্কেত পাঠাচ্ছে। একটা উৎসাহী কাঠবিড়ালি গাছের গুঁড়ি বেয়ে নেমে একবার করে জুলজুল চোখে তাকাচ্ছে, আবার কি ভেবে, বোধ করি সাহসের অভাবেই, গাছের গুঁড়ি বেয়ে আবার নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাচ্ছে। এমন ত্রস্ত ভাব যেন কাউকেই তেমন বিশ্বাস করে না। সব মিলিয়ে প্রাণ লেগেছে সবখানে। প্রকৃতির পাত্র কানায় কানায় ভরে উঠেছে। প্রাণে টইটুম্বুর। শুরু হয়েছে এক অত্যাশ্চর্য মিলনখেলা। কালো ভোমরাগুলো সৃষ্টির বীজ নিয়ে ফুল থেকে ফুলে ঘুরছে। ফুলেদের গর্ভনিষেক হলেই তো আসবে পরবর্তী উদ্ভিদ প্রজন্ম। পৃথিবীর প্রাণের ইতিহাসে এই মানুষই নবীনতম প্রাণী। মানুষ আসার আগেও হাজার হাজার বছর ধরে নীল্গ্রহে এসেছে নির্জন বসন্ত। প্রকৃতি এরকমই রূপের ডালি সাজিয়ে বসেছে। কার জন্য? কোন মুগ্ধ চোখের অপেক্ষায়? আসলে এর পেছনেও আছে সিসৃক্ষা, সৃজনের ইচ্ছা। সৃষ্টি করার ইচ্ছাই বোধ হয় এই সৃষ্টির সবচেয়ে পাওয়ারফুল মোটিভ, সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাইভিং ফোর্স। প্রতিরূপ তৈরী করার ইচ্ছে নিয়েই প্রোটিন সেল কোষবিভাজন পদ্ধতিতে এক থেকে দুই হয়েছিল কোন এক বিস্মৃত অতীতে। সেই থেকে সমানে চলেছে। আসলে গাছেরা ফুলের ডালি সাজিয়ে বসে, ফুলেরা গন্ধ আতর মেখে বসে এক আদিম সৃজনেচ্ছা থেকেই। ওদের চোখের ভাষায় যে আহ্বান লেখা থাকে তা ইতিহাসের একেবারে শেষ অধ্যায়ে আসা মানুষ প্রজাতির মনোরঞ্জনের জন্য নয়। ওরা তো আকর্ষণ করতে চায় ঐ ভোমরাদের যারা ফুল থেকে ফুলে রেণু ছড়িয়ে দেবে। আর তার থেকে সৃষ্টি হবে নতুন প্রজন্ম। নতুনকে সৃষ্টি করার ইচ্ছে নিয়েই, প্রতিরূপ গড়ার ইচ্ছে থেকেই তাদের এই নির্লজ্জ আত্মবিপণন। পৃথিবীতে নতুনকে আনার জন্য আর সেই নতুনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা তো সকলেই রোজ নিজেকে বিক্রি করতে পসরা সাজিয়ে বসি। চাষজমির মাঠে, কারখানার ফ্লোরে শ্রম বিক্রি হয়, বহুতল অফিস বিল্ডিঙের ফ্লোরে বিক্রি হয় মেধা। নিজের থেকে উদ্ভিন্ন প্রাণকে আরও প্রবলতর মুক্তিবেগ দিতেই আমরা নিজেদেরকে আরও বেশি করে আকর্ষণীয় করে তুলি। সেই অর্থে তো আমাদের রোজই বসন্ত। তবু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বেড়াজালে আমাদের মুগ্ধতাকে তো বেঁধে ফেলা যায় না। তাই প্রতি বসন্তেই কবিরা কবিতা বাঁধে, কবিয়ালরা গান। যা কিছু নিঃশেষ, যা কিছু আবর্জনা তাকে পেছনে ফেলে রেখে প্রাচুর্যের আতিশয্যে সাজে আমাদের অন্তর, আমাদের বাহির।  

Facebook Comments

ফল – রম্যরচনা

[জানুয়ারী ২০, ২০১৮ -র স্মৃতিচারণ ]

পড়ার ব্যাপারে আমার একটা অসামান্য দক্ষতা আছে, একটা অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য। এ কথা আমি বুক বাজিয়ে বলতে পারি। না না, পড়া মানে পড়াশুনোর কথা বা রীডিং স্কিলের কথা ভাববেন না। আমি যে পড়ার কথা বলছি সেটা মাটিতে পড়া। ইংরেজিতে যাকে বলে “ফল”। Fall বলতেই মনে পড়ল কোন এক গুরুতর ব্যক্তি বলেছিলেন “Don’t fall in love. Rise in love.” কিন্তু সে সব গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আমরা এখন মাথা ঘামাব না। আমরা সকলেই সময়ে অসময়ে অল্প বিস্তর প্রেমে পড়ে থাকি। কোথায় কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসবে। তাই ওসব কথা থাক। আমি বলছিলাম ধপাস করে পড়ার কথা। হ্যাঁ এই বিষয়ে আমার বিস্তর জ্ঞানগম্যি, কিছু অনতিক্রম্য রেকর্ডও আছে। আমি জীবনে বহুবার পড়েছি। কখনো গাছের ডাল থেকে, কখন বাড়ির ছাদ থেকে, কখনো খাট থেকে, কখনো সিঁড়ি থেকে। কিন্তু সপাটে পড়ার ফলস্বরুপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাতে পায়ে প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে যে একটা গোদা মতন ভাস্কর্য শিল্প করা হয় সেটা কৌশলে এড়িয়ে গেছি। অর্থাৎ প্রভূত পরিমাণ পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও অঙ্গহানি হয়নি, হাত পা ভাঙে নি কখনো। যে নারী সূর্যের মুখ দেখেনি তাকে যদি অসূর্যম্পশ্যা বলা হয়, তাহলে আমার হাত-পা গুলোকে অ-প্লাস্টার-পশ্যা বলা যেতে পারে। নির্দয় পাঠক যদি এতক্ষণে নাক সিঁটকে বলছেন যে “তাহলে আপনি পড়ার মত করে পড়েন নি কখনো” – তাহলে ভুল ভাবছেন। কয়েকটা উদাহরণ দিই। পুরাণমতে বালখিল্য মুনিরা গাছে ঝুলে থাকত। তো তাই থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে কিনা কে জানে, বাল্যকালে আমি একটা বালখিল্যপনা প্রায়ই করে থাকতাম। একটা তেঁতুল গাছের টঙে চড়ে তার একটা ডালে জড়িয়ে থাকা একটা মোটাসোটা লতার ওপর বসে দোল খেতাম। লতাটা বার্ধক্যজনিত কারণে একটু দুর্বল হয়ে পড়লেও আমার অত্যাচার নীরবে সহ্য করত। উপায়ই বা কি? মানুষের মত চেঁচিয়ে নিজের অধিকার আদায় করতে আর কোন জীবই বা পারে। মুস্কিল হল একদিন দোল খেতে গিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম। লতা (না না মঙ্গেস্কর নয়, তিনি দীর্ঘজীবি হন এই কামনা করি) দেহ রাখল। সঙ্গে সঙ্গে আমি নিউটনের আপেলের মত পুরো 9.8 m/s^2  ত্বরণের সাথে এসে মাটি ছুঁলাম তা প্রায় দোতলা বাড়ির মত উচ্চতা থেকে। জামাটামা ছিঁড়ে, পিঠে হাতে ছড়েটড়ে গিয়ে যাকে বলে আমার তখন একেবারে নববধুর মত রক্তিম অবস্থা। কিন্তু না অঙ্গহানি হয় নি। হাত পা কোমর ইত্যাদি ইন ট্যাক্ট। যেই কে সেই। অন্য একটা মনে পড়ছে। স্কুল কম্পাউন্ডে লুকোচুরি খেলা হচ্ছে। আমি চোর। বাকি বন্ধুরা বিভিন্ন অভুতপূর্ব জায়গায় লুকিয়ে অতর্কিতে ধাপ্পা দেওয়ার জন্য প্রহর গুনছে। একটা কমন জায়গা ছিল স্কুলের বাথরুমের ছাদ। না, সেখানে যাওয়ার জন্য সিঁড়িটিড়ি কিছু ছিল না। একটা পাঁচিল, তার এই পাশে বাথরুম, আর ঐ পাশে একটা পুকুর। ওই পাঁচিলে উঠে ছাদের থেকে দাঁত বের করে থাকা দুটো ইঁটকে ধরে ঝুলে পড়ে একটা পা কোন মতে বাথরুমের ছাদে রাখতে পারলেই হাঁটু আর দুই হাতের চাপে বাকি বডিটাকে ছাদে টেনে তুলে ফেলা যেত। হ্যাঁ এই ধরনের কাজকর্ম তো কুঁচোকাঁচারা করেই থাকে। না হলে তাদের যে অবশ্য কর্তব্য, বাবা মাদের চিন্তায় ফেলা, সেটা করতে কিভাবে সমর্থ হবে? এ তো গেল যারা লুকোচ্ছে তাদের কথা। যে চোর সে ওইভাবে ওপরে উঠতে গেলে অবধারিত ধাপ্পা হয়ে যাবে। যে লুকিয়েছে তার সেটাই strategic advantage। কার্গিলের যুদ্ধে পাক সেনাদের যেমন ছিল আর কি! তাই চোরকে ওই ইঁট দুটো ধরেই পাঁচিলের ওপর থেকে ছোট ছোট লাফ দিয়ে ছাদে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা আর থাকলে সেটা কে বুঝতে হবে। ধাপ্পা হয়ে গিয়ে পুনরায় চোর জন্ম আর কেই বা চায়। তো সেবারে আমি চোর। তো ইঁট ধরে দিলাম ছোট্ট লাফ। কিন্তু ইঁট দুটো বহুল ব্যাবহারে বোধ হয় প্রায় খুলে এসেছিল। লাফের উর্ধগতি শেষ হয়ে যখন অধঃপতন শুরু হল দেখলাম ইঁট দুটো ছাদের কার্নিশ থেকে খুলে আমার সাথেই fall করছে বা আমাকে follow করছে বলা যেতে পারে। স্বভাবতই দু খানা আধলা ইঁট দু হাতে নিয়ে নামতে হবে এমনটা ভেবে লাফটা শুরু করিনি। হিসেবে গরমিল হয়ে পা দুটো পাঁচিলের ওপরে নেমে আর স্থির হল না। পাঁচিলের ওধারে পুকুরের দিকে তরতরিয়ে নেমে চলল। ফলাফল আমি পাঁচিলের ওপর উপুর হয়ে, পা পুকুরের দিকে আর মাথা স্কুল কম্পাউন্ডের বাথরুমের দিকে, হাতে দুটো আধলা ইঁট শক্ত করে ধরা। দুখানা ইঁটের সাথে এমনতর সহপতনে কোমর-টোমর অনেক সময়েই…বাট না। As usual, No অঙ্গহানি। এ ছাড়া আরও অনেক বাঁদরামির ফলে বিভিন্ন রকম “ফ্রী ফল”-এর সম্মুখিন হয়েছি। একটা বকুল গাছের ডাল ছিল বেশ স্থিতিস্থস্পক। ওটা ধরে ঝুলে পড়লে স্কুলের ছাদ থেকে বেশ তাড়াতাড়ি নেমে আসা যেত। নিচে নেমে ছেড়ে দিলেই ডালটা ব্যাক টু ছাদ। ছোটবেলায় সময়ের বড়ই অভাব ছিল। তাই ওই করে প্রায়ই কিছু সময়ের সাশ্রয় করতাম। সে পাজি ডালখানাও একদিন বিশ্বাসঘাতকতা করে ভেঙ্গে গিয়ে মাটিতে সজোরে ফেলেছিল। এ ছাড়া খাট থেকে পড়েছি। সিঁড়ি থেকে আকছার পড়েছি। সবক্ষেত্রেই হাত-পা-মাথা ইত্যাদি যে অঙ্গগুলো প্রায়ই কাজে লাগে সেগুলো ইন-ট্যাক্ট রেখেছি।

 

যাক গে যাক, প্রশ্ন হল পড়ার প্রসঙ্গ এল কেমনে? এই জন্য এল যে আজকে আবার পড়েছি। একেবারে যাকে বলে সজোরে, সপাটে। না, লুকোচুরি কি কুমিরডাঙা খেলতে গিয়ে কি গাছে উঠে দোল খেতে গিয়ে নয়, সে সুখের দিনগুলো বোধ হয় আর ফিরে আসবে না। লাগামহারা শৈশবের দিনগুলোকে আজীবনের মত দ্বীপান্তরে পাঠিয়েছি সে বহুকাল হল। এখন শুধু কর্তব্যেস্মিন কুরু। সকাল সকাল রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে অদৃশ্য কর্পোরেট মুখোশ পড়ে বেরিয়ে পড়লাম অফিসের পথে। বাড়ি থেকে বড় রাস্তা মোটে দু তিন মিনিট। সেখান থেকে বাস। গতকাল সকালেও এই রাস্তাটুকু সাদা নরম পালকের মত বরফের চাদরে ঢাকা ছিল। সেই কচি-কাঁচা বরফেরা আজ পেকেছে অর্থাৎ জমে হয়ে গেছে “ব্ল্যাক আইস”। সাপের পিঠে চড়েছেন? চড়েন নি? আমিও চড়ি নি। আশীর্বাদ করবেন যেন সেরকম ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা না হয়। কিন্তু সে জীবটি যেভাবে সরসরিয়ে ভূমিপথে যায় তাতে মনে হয় ওদের ত্বকটা লোভনীয় রকমের পিচ্ছিল। আজ রাস্তার অবস্থা তার থেকেও বাজে। আনকোরা নতুন পাথরের মেঝেতে খানিকটা মোবিল ঢেলে দিলে ঠিক যেমনটা হবে আর কি? প্রতি মুহুর্তে পদস্খলনের সম্ভাবনা। ছিঁচকে চোরেদের মত পা টিপে টিপে চলেও গড়ে প্রতি চারটে পদক্ষেপের একটা ঠিক প্ল্যানমাফিক হচ্ছে না। ফেলার সাথে সাথেই সাপের মত সরসরিয়ে আর একটু এগিয়ে যাচ্ছে। টীনএজার ছেলেমেয়েদের যেভাবে সামলে সুমলে রাখতে হয় সেই ভাবে পা দুটোকে  কড়া শাসনে রেখেও তাদের মতিস্থির রাখা যাচ্ছে না। অনেক কসরত আর জিমনাস্টিক-এর সাহায্যে বাসস্টপে পৌঁছে গেলাম। প্রায় গোটা সাত আটেক বার ভূমির আকর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে তখন আমি ভূমায় উড়ছি। ভাবলাম আজকের মত ফাঁড়া কাটল। কিন্তু বিধি বাম। রাস্তায় কালো বরফের এমনই মসৃন পাতলা আবরণ, যে গাড়িরা সকলেই গজগামিনী আজ – ৪৫ মাইলের রাস্তায় মেরেকেটে ২০ তে চালাচ্ছে। এদিক ওদিক থেকে গাড়ি স্কিড করার আওয়াজ ভেসে আসছে। যে বাসটা আমায় রেল স্টেশান অব্দি বহন করে সে সুন্দরী যুবতীর মতই মুডি। কোনদিন সাতটা পঞ্চাশে দর্শন দেয় তো কোনদিন আটটায়। যাদের বিদেশ সম্বন্ধে এই ধারণা আছে যে ট্রেন বাস সব সময়মত চলে তাঁরা ধারণাটা এই বেলা বদলে নিন। এই হিমেল শীতের দিনে বাসটার গরম বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে যাওয়ার জন্য যতই আকুলিবিকুলি করি ও ততই দেরি করে কাছে আসে। আজকেও মিনিট দশেক অপেক্ষার পর সে সুন্দরীর দর্শন মিলল। কাছে এসে সে কিন্তু না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলল। বুঝলাম বাস-এর ব্রেক ধরছে না। ফুট কতক এগিয়ে গিয়ে সবে যখন সে থামবে থামবে করছে, আর আমিও প্রিয়ার বুকের গরম নিতে পিচ রাস্তায় নেমে পড়েছি, তখনি ঘটনাটা ঘটল। ডান পা-টা আমার নির্দেশ উপেক্ষা করে সরসরিয়ে সোজা সামনে খানিক এগিয়ে তারপর উর্ধমুখে চলল আর আমার কোমর থেকে মাথা অব্দি চলল নিচের দিকে। একেবারে যাকে বলে পিছলে পপাত ধরণী তলে। পুরো ধরাশয়ী হওয়ার পরেও দেখলাম আমার গতিরুদ্ধ হয়নি। আমি পিছলে বাস-এর পেছনের চাকার নিচে চলে গেছি প্রায়। এরপর না থামলে রীতিমত রসিকতা হয়ে যাবে। বাসপৃষ্ট হয়ে পথচারীর মৃত্যুর খবরটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই প্রাণপনে হাত দিয়ে হ্যাঁচড়-পাঁচড় করে ঐ বরফাবৃত রাস্তাকে আঁচড়ে-কামড়ে শরীরটা বাসের চাকার তলায় যাওয়ার যে বিপজ্জনক প্রবণতা দেখিয়েছিল সেটাকে রুখলাম। গতিরুদ্ধ হল বটে কিন্তু ঘটনাটার আকস্মিকতায় আর অভিনবত্বে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বহু কষ্টে উঠে যখন বাসের ভেতরে সেঁধোলাম, ততক্ষনে স্নায়ু পেশী ইত্যাদি জানান দিচ্ছে যে এই অকস্মাৎ অধঃপতন তাদের মোটেই পছন্দ হয় নি। বাস ড্রাইভার দিদি গম্ভীর মুখ করে জানতে চাইলেন “Do u need medical attention?” মুখ দিয়ে আমার বাক্যস্ফুর্তি হল না। মাথা নেড়ে জানালাম “না”। কোমর আর ডান হাতের কনুই তখন ঝালায় বাজচ্ছে। স্টেশান অব্দি মিনিট পাঁচেকের বাসযাত্রা আমার। বাস-এ আসন গ্রহণ করে ভাবলাম স্টেশানে পৌঁছে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারি তখন ডাক্তার সন্দর্শনে যাওয়া যাবে। বাস থামলে নিজের পায়েই দাঁড়ালাম। ট্রেন ধরে শহরে পৌঁছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অফিস পথগামী হয়ে এত আনন্দ হল যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে জলতরঙ্গ বাজাচ্ছিল যে পথশিল্পীটা তাকে একটা কড়কড়ে এক ডলারের নোট দিয়ে ফেললাম। ততক্ষণে পুরো ডানদিক টাটিয়ে গেছে। প্রথমের যে যন্ত্রণা ঝিনিক ঝিনিক করে বাজছিল সেটা চলে গিয়ে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের মত একটা একটানা একঘেয়ে যন্ত্রণা। সে হোক। হাত-পা-কোমর তো এবারেও ভাঙেনি। পড়ে হাত-পা না ভাঙার রেকর্ডটা এখনো অক্ষত। তার থেকেও বড় ব্যাপার – বাসের চাকার তলাতেও শরীরের দুচারটে পার্ট খোয়াইনি। সব কিছুর ইতিবাচক দিকটা দেখলেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোন এক গুণীজন বলেছিলেন মানুষের সবচেয়ে বেশি মনোবেদনার কারণগুলোকে নিয়ে রসিকতা করলে বেদনার ভার লাঘব হয়। অফিস থেকে ফিরে এখন আমার সারা গায়ে প্রবল ব্যাথা। একটা পেনকিলার খেয়েছিলাম অফিসেই। তা ভাবলাম গুনীজনেদের উপদেশ অনুসরণ করে আমার এই গাত্রবেদনা নিয়ে রসিকতা করে এটা কিছু কমানো যায় কিনা। পেনকিলার না খেয়ে শুধু রসিকতা করেই যদি এই গাত্রদাহ কিছু কমে তবে মন্দ নয়, কি বলুন?

Facebook Comments