হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে

পৃথিবীর আদিমতম সত্য নারী পুরুষের ভালবাসা। পুরুষ কি চায় সে কন্দর্পদেবও জানেন কিনা জানি না, নারী চায় ভালবাসার সরব উদযাপন। ব্যতীক্রমী নারী থাকবেই কিন্তু ব্যতিক্রমই নিয়মকে প্রমাণ করে। আর সেই প্রেমের উদযাপন করতেই আসে ভ্যালেন্টাইন্স ডে। তাই একটা কার্ড, একটা নরম টেডি, আর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ইলু ইলু। ইলু কা মতলব আই লাভ ইউ। প্রাণের ঠাকুরের পুজোর উপকরণ যেমন গাঁদা,জবা প্রেমের ঠাকুরের পুজোর উপকরণ গোলাপ। তাই ফেব্রুয়ারী চতুর্দশী তিথিতে বাড়ি আসার সময় দেখি রাশি রাশি গোলাপ ফুটেছে ট্রেন জুড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে, “এই যা। ভুলেছি।” অতএব সেই মানুষটাকে টেক্সট করে বলে দাও হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে। যা থাকে কপালে। প্রাচিত্তির এই প্রকার।

কিন্তু প্রেম পুজোর গোলাপের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে আমাজন ওয়েব সার্ভিস। কেন? একটু খোলসা করি। আমাজনের অরণ্যে বিক্রিবাটা হয়। কিন্তু বিক্রিবাটার প্রধান সময় থ্যাঙ্কস গিভিং সপ্তাহান্ত। সেই সময় তার অনেক সার্ভার লাগে। বাকি সময় সেই সার্ভারগুলো করে কি? অতএব সেগুলোকে তারা ভাড়ায় দেয় অন্যকে। এই থেকেই তৈরী আমাজন ওয়েব সার্ভিস। পাড়ার ডেকরেটর যেমন প্যান্ডেল করতে ভাড়া দেয় বাঁশ, কাপড়, আমাজন ভাড়া দেয় হার্ডওয়ার। সে যাকগে। গোলাপের কথা হচ্ছিল। প্রেমপুজোর দিনে গোলাপের খুব চাহিদা আমাজনের থ্যাঙ্কস গিভিং উইকএন্ডের মত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গোলাপ গাছের ভ্যালেন্টাইন নেই। তাই নির্দিষ্ট দিনে তার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে না। তাই ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের ভজকট রুল মেনে বাড়ে গোলাপের দাম। দাম বাড়তে বাড়তে আকাশ ছোঁয়। আকাশে তখন “সুরজ হুয়া মধ্যম”। প্রেমিকার হাতে চুড়ি গলিয়ে দিয়ে গলির শাহরুখ খান বলে ওঠে “কুছ রিস্তে জিসকা কোই নাম নেহি হোতা, সিরফ অ্যাহেসাস হোতা। চুক তো নেহি রাহা”। বাতাস আদর পেয়ে বাঁদর। গলির কাজলের দু এক গোছা অবাধ্য চুল এসে পড়ে কপালে। বাতাসের বাঁদরামিতে।

গলির কাজলের কাজলচোখের গহনে বিকেল হারায়। সন্ধে নামে। চাঁদ তখন বাড়াবাড়ি রকমের নির্লজ্জ হয়ে ওঠে। গলে গলে নামে পৃথিবীর শহরঅরণ্যে জ্যোৎস্না হয়ে। তারপর গলির শাহ্রুখ আর কাজল কি কাণ্ড করে তা আমি দেখি না। চোখ মুদে থাকি। সে গোপন কম্ম ব্রহ্মা জানেন। আমি শুধু জানি, ভালবাসায় ঊষর মঙ্গল গ্রহও সবুজ হয়ে উঠবে একদিন। আমি শুধু বিশ্বাস করতে চাই, এ শহরে ভালবাসায় হেরে যে ছেলেটা আজ অ্যাসিড নিক্ষেপকারী, তার হৃদয়েও গোলাপ ফুটবে একদিন। জানি এ আমার অক্ষম কবিমনের কষ্টকল্পনা। তবু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। আর যে মেয়েটা পোড়া চামড়া নিয়েও করছে জীবন উদযাপন, বিশ্বাস করেছে তার জন্যও আছে এ পৃথিবীর জল, নদী, ফুল, পাখি, আকাশ, তাকে বলি,

হে অগ্নিবর্ণা, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে।

তোমার কথা

তোমার কথা বলে বেভুল অমলতাস ফুল
নবীন আকাশ, হিরন্ময় জল
তোমার কথা বলে অনর্গল

তোমায় খোঁজে কৃষ্ণ আঁখি রাতচরা এক পাখি
হেমন্তের হিমেল হাহাকার তোমায় খোঁজে
একলা দুপুর বোঝে তোমায় বোঝে

তোমায় জানে বনমর্মর, নয়ানজুলির চর
বর্ষামুখর ঝিঁঝিঁ ডাকার রাত
জানে তোমার নীরব সংঘাত

তোমায় ছুঁয়ে থাকে কথা, মেদুর বিষণ্ণতা
ভোরের বাতাস পাথরকুচি পাতা
তোমায় ছোঁয়ার ছলেই উদ্গতা

কবিতা প্রত্যেকে

কবিতাটি শুনতে চাইলে

শ্যামল রাত্রি তুমি এসো
আমায় নিয়ে যাও আগুনঝোরার বনে
যেখানে কোনো এক দুরন্ত ফাল্গুনে
ফুটেছিল রাশি রাশি অমলতাস ফুল।
ফুটেছিল? নাকি সে আমার মনের ভুল?
জানি না..জানি না ফুলেদের মৃতদেহ ঝরে
কেন ঘাসেদের চাদরে আদরে,
কেন মর্মব্যথা জেগে থাকে
পৃথিবীর বিজন প্রান্তরে,
কেন রুদ্ধ সঙ্গীত বাজে অন্তরে অন্তরে?
ক্ষুধা জেগে থাকে বুভুক্ষু মনে
মন পোড়ে, পোড়ে মন তুষের আগুনে।
রাতচরা পাখিদের গান
আর বুকভরা নীরব অভিমান
লেগে থাকে শিশিরের গায়,
আমি শুধু বসে থাকি ঠায়।
খোলা পরে থাকে সাদা পাতা
ব্যর্থ কোনো ব্যর্থ প্রেমগাথা
শরীর পেতে চায়। এক প্রাচীন পাখির
কণ্ঠে বিঁধে থাকে তীর,
রক্ত ঝরে বিধুর সঙ্গীতে।
বিষাক্ত কীটের মত দংশাতে
আসে কোনো বিষধর সাপ –
ঠোঁটে লেগে থাকে তার
সহস্র বছরের পুরাতন পাপ,
রক্ত মাংস মজ্জা মেদ
জুড়ে থাকে স্তূপীকৃত ক্লেদ।

ক্লিন্ন পৃথিবী, হে ক্লিন্ন পৃথিবী
রাত্রি সর্বজ্ঞ নয় এ আমার একান্ত বিশ্বাস।
প্রতি নিশ্বাসে তাই অভিসার অনাগত দিনে
যেখানে অরণ্যের গহনে গহীনে
অমল অরূপ এক আলো খেলা করে।
গাছেদের একান্ত জঠরে
জীবনের স্বাদ মাখামাখি জড়াজড়ি।
এইখানে এইখানে নিহত শর্বরী
এইখানে এসে আমি দুদন্ড বসি, খেলা করি।
অনলস ঝরে পরে অজস্র মেহুল।
তান ওঠে, ঐকতান, সুগভীর নাভীমূল থেকে –
“একা নই একা নই আমরা তো সুমধুর কবিতা প্রত্যেকে”

Beauty and the Beast

আমার তিন বছরের কন্যার ভারি টিভি দেখার নেশা বেড়ে যাচ্ছে। তাই আদর্শ বাবার মত ঠিক করলাম ওকে একটু বই পড়ে শোনাতে হবে। আমেরিকানরা তো সন্তানের জন্ম থেকেই বাচ্চার ঘুমোনোর আগে তাকে বই পড়ে শোনায়, তাতে নাকি সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুদের vocabulary বাড়ে। আমি সেই দুঃসাহস করি নি। কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে সানাইকে একটু স্টোরি রীড করে শোনাতে সচেষ্ট হই। তো আজকের গল্প Beauty and the Beast।


বেশ অনেকটা পড়ে ফেলেছি গল্পটা। এক ডাইনি রাজপুত্রকে অভিশাপ দিয়ে কদাকার পশুমানবে, অর্থাৎ একটা Beast-এ পরিণত করেছে। এদিকে Beauty-র বাবার খুব দুঃসময়। ঝড়ে জাহাজডুবি হয়ে ভাঁড়ে-মা-ভবানী হয়ে গেছে। তাও আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া। জাহাজ উদ্ধার করতে গিয়ে ফেরার পথে Beast-এর প্রাসাদে আশ্রয় নেয়। ভুড়িভোজ খেয়েটেয়ে, রাত্রে নরম বিছানায় ঘুমিয়ে টুমিয়ে সকালে যখন Beauty-র জন্য Beast-এর গোলাপ বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়ে নিয়েছে তখন Beast-এর মাথা যাকে বলে একেবারে ভিসুভিয়াস। Beauty-কে পাঠিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি দিয়েছে ওর বাবাকে। রুদ্ধশ্বাস ব্যাপার। বাড়িতে এসে সব ঘটনা বলায় Beauty স্বেচ্ছায় Beast-এর প্রাসাদের উদ্দেশে যাত্রা করছে। Beauty কাঁদছে। Beauty-র বাবা কাঁদছে। আকাশ বাতাস পাখি নদী সবাই কাঁদছে। সমস্ত ক্রন্দসী কাঁদছে বলা চলে। এরকম একটা ভয়ানক বিষণ্ণ মুহূর্তে সানাই জিজ্ঞেস করে বসল, Beauty কাঁদছে কেন বাবা? ও কি ভাতু খায় নি? মাম্মা বকেছে?
লে… সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি? ভাতু-না-খাওয়া-জনিত-মাম্মার-বকা ছাড়াও যে মানুষের দুঃখের আরো কারণ হয় বোঝাতে চেষ্টা করি। সিকুয়েন্স অফ ইভেন্টটা আবার একবার রিপিট মারি। কিন্তু সানাই অলরেডি Beauty-র কান্নার কারণ জানার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। শেয়ার মার্কেটের থেকেও তড়িৎ গতিতে মনের মতি বদলায় ওর। অতএব চরৈবেতি। পরে কি হল জানতে চায়। বাকি গল্পটুকুও পড়ে ফেললাম। Beast-এর Beauty-র প্রতি সহৃদয় ব্যবহার (সুন্দরী মেয়ে পেলে কে আর extra nice ব্যবহার করে না – মনে মনে ভাবছি)। কয়েকদিন Beast-এর প্রাসাদে থাকার পরে Beauty-র বাবার জন্য মন খারাপ। Beast Beauty-কে বাড়ি আসতে অনুমতি দেয়। Beauty বিরহে Beast-এর এই যায় সেই যায় অবস্থা। Beauty-র প্রত্যাবর্তন আর তার চোখের জলে Beast-এর শনির দশা কেটে আবার রাজকুমারে রূপান্তর। অতঃপর Beauty আর রাজপুত্রের বিয়ে-সাদি-সানাই (ইয়ে মানে এটা বাদ্যযন্ত্র সানাই। কথাযন্ত্র সানাই না) । গল্পটা সবাই জানে। কিন্তু মুস্কিল হল গল্পশষে সানাইয়ের প্রশ্নগুলোতে।

সব শুনেটুনে সানাই বলল বাবা, প্রিন্সের মাম্মা কই? খুব-ই চাপের প্রশ্ন। গল্পের লেখক ও পাঠককুল কেউ কোনদিন Beast-cum-রাজপুত্রের বাবা মা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। আগডুম বাগডুম একটা বললাম। পরের প্রশ্নগুলো এইরকম –


বিউটির বাবা কই?
বাড়িতে আছে।
কেন?
কারণ Beauty Beast-এর রাজপ্রাসাদে গেছে তাই।
রাজপ্রাসাদে গেছে। ও। কেন?
কারণ Beast-এর শরীর খারাপ হয়ে গেছে ( গল্পপাঠকালীন কিছুই বোঝাতে পারিনি ভেবে আমার রক্তচাপ বাড়ছে) ।
ও শরীর খারাপ? Beast ডক্করের কাছে যাবে? ইনজেকশান দেবে ডক্কর?
“সেটা দিতেও পারে। কিন্তু এখানে সেরকম লেখা নেই।” গল্পে ডাক্তার বদ্যি আমদানী হবার আগেই আমি তাড়াতাড়ি আর একবার ঘটনাপ্রবাহ বলে দিই। “Beauty-র বাবা Beast-এর বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়েছিল তো। তাই Beast রেগে গিয়ে Beauty কে আসতে বলেছিল।”
বাবা গোলাপ ছিঁড়েছিল? কেন?
আরে Beauty একটা red rose চেয়েছিল না? এই যেমন তুমি কিছু চাইলে বাবা এনে দেয় না?
Beauty red rose কেন চেয়েছে বাবা?
আরে বললাম না, বিউটির বাবা ওকে জিগেস করল, তুমি কি গিফট্ নেবে। তখন ও একটা রক্তগোলাপ চাইল।
ক্রিস্টমাস গিফট্?
হ্যাঁ, ক্রিস্টমাস গিফট্।
Oh. I see.
যাক বুঝেছে। গল্পটা বোঝাতে পেরেছি ভেবে আমি মনে মনে গর্বিত বোধ করি যাকে বলে basking in glory. পরে সানাই-এর থেকে শুনে দেখলাম, গল্পটা আসলে এরকম।


Beauty ভাতু খায় নি। তাই Beauty-কে তার মাম্মা বকেছে। তাই বিউটি কাঁদু করেছে। তখন বিউটির বাবা christmas gift দেবে বলেছে। Beauty-র বাবা Beast-এর বাড়ি গিয়ে ফুল ছিঁড়েছে। তাই Beast বিউটিকে timeout দিয়েছে (যাঃ বাবা, টাইম আউটের কথা বললাম কোথায়? Beauty and the beast-এর গল্পের সঙ্গে এ যে দেখছি নিজের original creation punch করে দিচ্ছে)। বিউটি timeout পেয়ে কাঁদু করেছে। Tears লেগে Beast প্রিন্স হয়ে গেছে। তখন প্রিন্স-এর মাম্মা এসেছে। এসে বিউটিকে ঠিক করে ভাতু খেয়ে নিতে বলেছে (যাক বাবা এটা বলে নি প্রিন্স-এর মাম্মা এসে প্রিন্সকে বলেছে Beauty-র সারা জীবনের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে)।

……এতক্ষণের পণ্ডশ্রমের কথা ভেবে ততক্ষণে আমার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।

আবার যদি ফিরে আসি

আবার যদি ফিরে আসি,
আমায় নিয়ে যাবে তোমার ভুবনডাঙার মাঠে?
যেখানে রোজ সন্ধেবেলা রিক্ত প্রহর কাটে
মগ্নতারা একলা জাগে নদীর ঘাটে ঘাটে।

আবার যদি ফিরে আসি,
তোমার খোঁপায় জড়িয়ে দেব বনধুতরোর ফুল।
বাতাস তোমার গন্ধে আকুল
প্রিয়া তোমায়, ইতস্তত ছুঁয়ে যাবে সামান্য লজ্জায়।
আমি তখন একলা শুয়ে তোমার জলে..অনন্ত শয্যায়।।

Phoolon ke Rang se…

গীতিদি এবং পার্থদা বলে এক দম্পতি আছেন যাঁরা এখানকার যেকোনো মহতী বাঙালি উদ্যোগে একজন আশ্রয়ী বটবৃক্ষের মত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। ওনাদের ৪৩ তম বিবাহবার্ষিকিতে শুভানুধ্যায়ীরা একটা প্রীতিভোজের আয়োজন করেছিলেন। সাথে একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। আমায় অনুষ্ঠান সঞ্চালকের দায়িত্ব দেওয়ায় বিভিন্ন শিল্পীরা যে গানগুলি গাইবেন শুনে দেখছিলাম। নতুন করে প্রেমে পড়ে গেলাম সেই অমর কালজয়ী গানটির – “Phoolon Ke Rang Se Dil Ki Kalam Se”। এতটাই প্রেমে পড়ে গেলাম মনে হল গানটি অনুবাদ করি। কবি শ্রীজাতর কথায় অনুবাদ অনেকটা একটা শিশি থেকে অন্য শিশিতে আতর ঢালার মত। স্থানান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় কিছু সুগন্ধ উবে যাবেই যাবে। তাই প্রচেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব সুবাস ধরে রাখতে, যতটা সম্ভব ধ্বনিমাধুর্য অক্ষুণ্ণ রাখতে।

তোমায় চিঠি লিখেছি রোজ ফুলের মরমে মনের কলমে প্রিয়া
কেমন করে বলি, তোমার তরেই জ্বলে আমার হৃদয় দিয়া
তোমার স্বপ্ন নিয়েই বাঁচা তোমার স্মৃতিই জাগা
তোমার কথাই ভাবছে বসে এ মন হতভাগা
তোমার আমার প্রেম যেন এক শ্রাবণ রাতের মেঘ মিঁয়া মল্লার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার
তোমার আমার প্রেম যেন এক শিউলি ভোরের কোমল গান্ধার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার
আমার হৃদয় তন্ত্রীতে আমার মনের বীণটিতে তোমার সুরই বাজে
তোমার ছবি আছে রাখা কস্তুরী সুঘ্রাণ মাখা হৃদয় দেরাজে
তোমায় খুঁজেছি জনান্তিকে তোমায় খুঁজেছি নিয়ন আলোর ভিড়ে
তোমার কথা পড়লে মনে এক লহমায় একলা নদীতীরে
তোমার আমার প্রেম যেন এক শ্রাবণ রাতের মেঘ মিঁয়া মল্লার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার
তোমার আমার প্রেম যেন এক শিউলি ভোরের কোমল গান্ধার
তোমায় ভালবাসতে প্রিয়া জন্মাবো আর বার

Original Song

Phoolon Ke Rang Se Dil Ki Kalam Se Tujhko Likhi Roz Paati
Kaise Bataaoon Kis Kis Tarah Se Pal Pal Mujhe Tu Sataati
Tere Hi Sapne Lekar Ke Soya Teri Hi Yaadon Mein Jaaga
Tere Khayaalon Mein Uljha Raha Yoon Jaise Ki Maala Mein Dhaaga
Haan Badal Bijli Chandan Pani Jaisa Apna Pyar
Lena Hoga Janam Humein Kayi Kayi Baar
Haan Itna Madir Itna Madhur Tera Mera Pyar
Lena Hoga Janam Hameh Kayi Kayi Baar

Sanson Ki Sargam Dhadkan Ki Beena Sapnon Ki Geetanjali Tu
Man Ki Gali Mein Mehke Jo Hardum Aisi Juhi Ki Kali Tu
Chhota Safar Ho Lamba Safar Ho Sooni Dagar Ho Ya Mela
Yaad Tu Aaye Man Ho Jaaye Bheed Ke Beech Akela
Haan Badal Bijli Chandan Pani Jaisa Apna Pyar
Lena Hoga Janam Humein Kayi Kayi Baar
Haan Itna Madir Itna Madhur Tera Mera Pyar
Lena Hoga Janam Hameh Kayi Kayi Baar

নির্বাক

আমাদের আর কোনো কথা নেই…
নেই সন্ধ্যা শ্রাবণ, জ্যোৎস্না প্লাবন,
নেই কোনো বনপলাশীর চরে চপল রণন।
আছে শুধু উদাসীন ব্যথাতুর আড়াআড়ি ভেঙে যাওয়া মন।

থাকে শুধু উদাসীন ব্যথাতুর আড়াআড়ি ভেঙে যাওয়া মন…
ভীড় করে থাকে তার আশেপাশে মৃত্যু গহন।

এ প্রহর নিবিড় প্রহর
এ এক অদ্ভুত অচঞ্চল অলীক মৃত্যুলেখা ভোর
ভালবাসা, বলো সখী, কবেই বা জোর করে, জোর?
মানুষেরা সকলেই ছেড়ে যাওয়া গ্রাম-বন্দর।।

লাথি ঝাঁটা

শুনেছি বয়সকালে ছেলেমেয়ের কাছে লাথি ঝাঁটা খেতে হয়। আমার “বয়সকাল” হয়েছে কিনা জানি না কিন্তু কালে কালে বয়স তো কম হল না। বয়সকাল হয়েছে না বয়সটাই কাল হয়েছে বলতে পারব না, আর ঝাঁটাটা ভবিষ্যতে বরাদ্দ হবে কিনা জানি না কিন্তু লাথি বরাদ্দ হচ্ছে এখন থেকেই।

আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য, বয়সে নেহাতই নবীন। তিনি পৃথিবীকে অনুগ্রহ করার পর থেকে একটাই বছর ঘুরেছে, মানে তাঁর বয়স এই মাত্র এক বছর। কিন্তু হলে কি হবে, নিশ্চয়ই আগের জন্মে লিটল বম্ব  তাথৈ দেবী চুনি গোস্বামী থেকে থাকবেন কারণ পা দুটি পুরো ফুটবল-বলিষ্ঠ। ক্ষুদ্র বলিয়া তুচ্ছ নই এই নীতিকথা অনুসরণ করে তিনি সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে, মানে যাকে বলে পাখি ডাকা ভোর থেকে (আমার জন্য অবশ্যই অর্ধেক রাত্রি) পদাঘাত করতে শুরু করেন মানে কাঁচা বাংলায় লাথি মারতে শুরু করেন। বক্তব্যটা হল আমার যখন ঘুম ভেঙেই গেছে তখন তোমরা ঘুমোও কোন অধিকারে? উনি তো সুযোগ সুবিধে মতই একটু গড়িয়ে নেন, আমি হয়তো সপ্তাহান্তের পার্টি প্রেসার সামলে, ধেই ধেই করে নেচে, ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির বাপ বাপান্ত করে, সোনালি তরলের ঘুমঘোর মোহে দেশের দুঃখদুর্দশার কথা বন্ধু সহযোগে তর্কাতর্কি করে, ফেসবুকীয় বিপ্লব সেরে রাত্রি দ্বিপ্রহরে বডি বিছানাতে ফেলেছি। তাই শরীরের বিশ্রামের প্রয়োজনেই এবং মনের বিশ্রামের অধিকারেই ঘুমোই। কিন্তু এ যুক্তি তার কাছে প্লেস করার সুযোগ নেই কারণ যে দু তিনটে ভাষায় আমার সামান্য দখল আছে, আমাদের বাড়ির নবীনতম সদস্য এখনো সেই ভাষায় বাক্যালাপ করতে বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করে নি। তাঁর স্টাইল পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিক। নিজের সুবিধা-অসুবিধা প্রয়োজন-অপ্রয়োজন উঁচুস্বরে নির্দ্বিধায় অন্যের সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি জানান দেন। হিটলার মুসোলিনিও লজ্জা পাবে সেই অথরিটেটিভ স্টাইল দেখে। ধরুন আপনি সকালবেলার প্রথম পটি – না না সকাল সকাল বাজে কথা নাই বা বললাম – ধরুন সকালবেলার প্রথম চা-টা হাতে নিয়ে সোফায় “রাতভর ঘুমোনো ক্লান্ত শরীরটা” একটু এলিয়ে দিয়েছেন এমন সময় বাজ পড়ার মত বাজখাঁই গলায় চিৎকার। আপনি ভাবছেন এই তো সবে ডাইপার চেঞ্জ করে দুধ খাইয়ে সব প্রয়োজন মিটিয়ে দিলাম। কথা হচ্ছে সে প্রয়োজন ছিল শরীরের। এখন তার আত্মার প্রয়োজন আর সেটা হল বাবার কোলে উঠে একটু মর্নিং ওয়াক করা। পিতাপুত্রীর সুসম্পর্ক সাধনের সদিচ্ছা নিয়েই সে সাশ্রু নয়নে জানাবে এই দাবী। কোলে তুলে নিলেই যে দু পাটি দাঁত বের করে এমন নিখাদ স্মাইলটি দেবে দেখেই মনে হবে আগের কান্নাটা ছিল কুমীরকান্না। দু পাটি দাঁত বের কথাটা একটু অত্যুক্তি হয়ে গেল কারণ দু চার খানা দাঁতেরই শুভাগমন হয়েছে সে মুখে। 

যাকগে যাক, কথা হচ্ছিল লাথি ঝাঁটা খাওয়ার। তা হ্যাঁ, লাথিটা নিয়ম করেই খাচ্ছি। তিন বছর আগে খেতাম বড় মেয়ের কাছে। কিন্তু সে এখন রেগে গেলে রাম চিমটি, লক্ষ্মণ কিল ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে (ওর মায়ের কাছে হেভি ঝাড় খাওয়ার সম্ভাবনাটা কনসিডার করে নিজের পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে)। কিন্তু ছোট মেয়ের সে আপদ নেই। এই এক বছর ধরে হোম স্কুলিং-এ বাংলা ভাষা শিক্ষা করে নিশ্চয়ই  ভাষাটাকে তার খুব ফানি ল্যাঙ্গুয়েজ লেগে থাকবে নয়তো তার মা তার ওপরে গলা চড়ালেই দু পাটি না-হওয়া দাঁত বের করে ফ্যাকফ্যাক করে হাসবে কেন? বকাঝকা ভীতির উদ্রেক না করলে বকার উৎসাহ, উদ্যম দুটোই চলে যায়। তো যা বলছিলাম, তিনি বকাঝকার তোয়াক্কা না করেই লাগাতার লাথি মেরে ছটার মধ্যে আমার ঘুমের দফারফা করে দিয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকেন। খিদের মুখে যেমন পৃথিবী গদ্যময়, ঘুমের মুখে তেমনি পৃথিবী রাত্রিময়। থুড়ি ঘুমের চোখে পৃথিবী শত্র‌ুময়। আর সেই শত্র‌ুই যখন ফোকলা দাঁতের হাসি দিয়ে মনজয় করার চেষ্টা করে তখন মনে গৌতমবুদ্ধসুলভ সদ্ভাবনার উদ্ভব হয় না এ কথা অকপটে স্বীকার করাই যায়। তবুও ভদ্রতার খাতিরে মুখে দেঁতো হাসি লাগিয়ে পুতুল সাইজের প্রাণীটাকে জড়িয়ে ধরে সেকেন্ড রাউন্ড ঘুমোনোর চেষ্টা করি। প্রাণপণ। 

সময় চলিয়া যায়

আজ ছিল আমার দ্বিতীয় কন্যার প্রথম জন্মদিন। দিনটা ওদের কাছাকাছি কাটাব বলে দিনভর বাড়ি থেকে কাজ করেছি। কাজের মাঝে মাঝে শিশু কন্যার স্পর্শসুখ। ওর হাতের মুঠির মধ্যে আমার আঙুল যখন আশ্রয় পায়, মনে হয়, শুধু এই সুখটুকুর জন্য আরো হাজার জন্ম নেওয়া যায়। আজ ওর জন্মদিন। আজ ওর জন্য একটু বেশি আদর। আজ ওর সাথে একটু বেশি খেলা। মনে মনে হয়তো বা বলা – “আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা, প্রিয় আমার, ওগো প্রিয়।” 

সঙ্কর প্রজাতি আমরা। সকাল বেলা বাঙালি মতে পায়েস আর ওর মায়ের পরম যত্নে রান্না করা পঞ্চব্যাঞ্জন আর সন্ধেবেলা বিলিতি মতে একটু কেক। ছিমছাম একটা আনন্দের দিন। কিন্তু দিন…সে তো শেষ হয়। সন্ধ্যা আসে। রাত্রি নামে। জেগে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে প্রতি রাতেই আমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটা। আজকেও ব্যতিক্রম হল না। ওর ঘুমিয়ে পড়া ছোট্ট, ভীষণ ছোট্ট শরীরটা দেখলে মনে হয় কোথা থেকে যেন একটুকরো প্রাণের কণা বসন্তের মলয় সমীরে উড়ে আমাদের মাঝে এসে পড়েছে। অনেকটা মানুষ মানুষ কিন্তু ঠিক মানুষ না। যেন একটা খেলনা মানুষ। জীবনের পরীক্ষাগারে আরও একটা ছোট্ট মডেল, আরো নতুন কিছু সম্ভাবনা। 

ওকে বিছানায় শুইয়ে দিতে এসে হঠাৎ বুকের মধ্যে ছাঁত করে উঠল। তাহলে একটা বছর ঘুরে গেল ওর জীবনের। সূর্যের বাহুলগ্না হয়ে যে ব্যালে ড্যান্স শেষ হাজার কোটি বছর ধরে করে চলেছে পৃথিবী, তার আর একটা অধ্যায় সমাপ্ত হল। সূর্যকে ঘিরে মহাশুন্যপথে পুরো এক পাক ঘুরে নিল নীলগ্রহ। ওর অজান্তেই ওর বয়স এখন এক। অসীম নিষ্ঠা ভরে এই বারো মাসে শিখে নিয়েছে অনেক কিছু। মাতৃস্তন্য পান থেকে শুরু করে উবুড় হওয়া, তারপর হামাগুড়ি দেওয়া আর সর্বশেষে টলোমলো পায়ে হাঁটতে চলার এক বছরের নিবিড় জীবনপাঠ। জীবনের রসদ প্রাণপণে ঠুসে নিচ্ছে নিজের ক্ষুদ্র শরীরে। এখন শুধুই নেওয়ার পালা। স্নেহ সঞ্চয়, জীবনের রসদ সঞ্চয়। কিন্তু দেওয়ার বেলাও আসবে। কুঁড়ি মানুষটা যে সম্ভাবনাগুলোর সমষ্টি, তার কতটা রূপায়িত হল সেটা জানার জন্য গুঁড়ি মেরে অপেক্ষা করছে মহাকাল। 

আমি ভাবি, ওর জীবনের আরো একটা বছরের সূচনা হয়ে গেল অথচ কোনো ওয়ার্নিং বেল বাজল না, কোনো ঘন্টি বাজল না, কোন মহাপ্রাণ এসে কানে কানে বলে গেল না “সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়, যে জন না বোঝে তারে ধিক, শত ধিক।” টিক টিক টিক। ঘড়ির কাঁটার অনিবার্য ঘূর্ণন যা প্রতিনিয়ত আমাদের জীর্ণ করে, আমাদের ছায়াকে দীর্ঘতর করে তার চলন এতই ধীরে যে তা বুঝতে বুঝতেই অনেক কটা গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত পার করে এখন আমি জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। মহাকাল। পাহাড়ি দস্যুর মত বজ্র মুষ্টি তার অথচ ভোরের শিউলির মত নিঃশব্দ পদসঞ্চালন। আবার খুব হীনবৃত্তি নিন্দুকের মতই judgemental, ছিদ্রান্বেষী। সে চলে যাবে আপন তালে। বলবে না, “একটু তাড়াতাড়ি পা চালাও ভাই। তোমার তো সন্ধ্যা নেমে এল।” অথচ প্রতিটা মানুষকে তার শেষ স্টেশানে নামিয়ে দেবার দিনে করবে চুলচেরা বিচার। বিচার করবে যে,  সে মানুষটার লোটা কম্বল, জীবনের সঞ্চয় বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, নাকি তার সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই শ্রেয়। কালের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গহ্বরে তাকে নিক্ষেপ করে চলে যাবে, নাকি ক্ষীণ একটা বাতি ধরে দিয়ে যাবে যাতে ভবিষ্যত তার খবর পায় – সেই বিচার। মহাকাল। জীবৎকালে নীরব সাক্ষী, মরণকালে চুলচেরা বিচারক। আমার ফেলে আসা বছরগুলোর দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে তাই বলতে ইচ্ছে করে, “সে চলে গেল, বলে গেল না। সে কোথায় গেল ফিরে এল না। সে যেতে যেতে চেয়ে গেল। কি যেন গেয়ে গেল। তাই আপন মনে বসে আছি…”। আপন মনে বসে আছি…আপন মনে বসে আছি…

আমার এই যে হাসি, এই যে কান্না, এই যে প্রেম, এই যে বিরহ, এই যে স্নেহ, এই যে ঘৃণা, এই যে রমণ ইচ্ছা, এই যে মহোত্তমের খোঁজ – জানি জানি তুমি কিছু নেবে না এ সবের। জানি তুমি আমাকে নেবে না। শুধু যে কটি ফুল ফুটিয়েছিলাম মনের উঠোনে, হে নির্দয় মহাকাল, সে ফুলের সাজি রাখবে কি তোমার অক্ষয় মালঞ্চে?

কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৪

May 25, 2019, Morning

ব্লগটা লেখা যখন শুরু করেছিলাম বছর তিনেক আগে, ভাবি নি সেটা এতো পাঠকের চোখ পাবে। তবু পেল যখন তখন যযাতির ঝুলিকে মুদ্রিত মাধ্যমে নিয়ে আসার কথা মাথায় এলো স্বভাবতই। আমার কলমকে কালি দিল পত্রভারতী। বইমেলায় বইটি বেরিয়েছে এবং অনেকেই সংগ্রহ করেছে। তাই বাকি দু-দশ কপি যা পড়ে আছে সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়লাম কলেজ স্ট্রীটের দিকে। গন্তব্য পত্রভারতীর অফিস। এই কপি কখানা আমার ইউ এস এর কিছু সুহৃদ্‌ বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাব। আমার একা কোথাও যাওয়ার থাকলে সাধারণত ট্রামে বাসে যাই, জীবন দেখতে দেখতে। পত্রভারতীর যে আধিকারিক আসতে বলেছেন তার নির্দেশ অনুযায়ী রামরাজাতলার থেকে হুগলি সেতু দিয়ে যাওয়াটাই তাড়াতাড়ি হবে। বাকসাড়া মোড় অব্দি টোটোয় গিয়ে একটা গরম বাসের জঠরে সেঁধিয়ে গেলাম। মাতৃ জঠরে থাকার অভিজ্ঞতাটা মনে নেই। তবে আন্দাজ করতে পারি এই বাসের পেটের মতই হবে। ঠাসা, গরম আর ভেজা ভেজা। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচনী আসর জমে উঠেছে। বাসের গরমে ইলেকশানের বাজার আরও সরগরম হয়ে উঠেছে। হাত জোড় করে ভিক্ষাপাত্র থুড়ি ভোটপাত্র হাতে দাঁড়িয়ে জননেতারা, পোস্টারে, পোস্টারে। নির্বাচনী আসরে, বাসের গরমে, গরম আলোচনা হচ্ছে অফিসযাত্রীদের মধ্যে। এই একটাই সময়ে মানুষ এই জননেতাদের মাটিতে টেনে নামায়। 

জানলা পথে একটা বিজ্ঞাপন দেখে মনে মনে একটু তারিফ না করে পারলাম না। ওরিপ্লাস্ট বলে একটা ব্রান্ড অ্যাড দিয়েছে, “দরের থেকে কদর বেশি”। আমরা যারা পানাসক্ত অর্থাৎ পানিং-এ আসক্ত এমন সুন্দর pun দেখলে মুখে এক চিলতে হাসি চলে আসে বৈকি। রবীন্দ্রসদনে বাস থেকে নেমে আমার পাতাল প্রবেশ। অর্থাৎ পাতাল রেল ধরব। “তুমি কি শুনেছ মোর বাণী, হৃদয়ে নিয়েছ তারে টানি / জানি না তোমার নাম, তোমারেই সঁপিলাম আমার ধ্যানের ধনখানি।” – লেখা আছে মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে। আহা কি কথা। ঠিক যেন tailor made আজকের এই ক্ষণখানির জন্য। আমাকেই সঁপেছেন, একটা গোটা শতাব্দীর ওপার থেকে শুধু আমাকেই সঁপেছেন কবিবর তাঁর ধ্যানের ধনখানি, তাঁর সুললিত শব্দভান্ডার। সার্থক কবি আপনি, হে রবীন্দ্রনাথ। এতদিন পরেও বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরোনোর পর থেকেই নতুন প্রজন্ম এক অনিবার্য আকর্ষণ বোধ করে আপনার বাণীর প্রতি। কিছু নির্বোধ আঁতেল নিশ্চয় আপনাকে খাদারে ফেলে দিতে চায় তবে তাদের লেখা বছর পার করতে পারে না। আপনি তো শতবর্ষের পরেও অমলিন। রবি ঠাকুরের দেশ থেকে আমি যাব গান্ধীজীর দেশে। অর্থাৎ কিনা রবীন্দ্রসদনে উঠে আমার মেট্রোমুক্তি মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে। তাঁকে মহাত্মা নামটা ঘটনাচক্রে এই রবীন্দ্রনাথই দিয়েছিলেন। মেট্রো রেলের দরজা বন্ধ হতেই নিশ্চিন্তি। কলকাতার যানজটের তোয়াক্কা না করে সাঁই সাঁই করে এগিয়ে চললাম আমার গন্তব্যের দিকে। 

“স্টেশান রবীন্দ্র সেডান, পরবর্তী স্টেশান ময়ডান।” কৃত্রিম অ্যাক্সেন্ট মেরে ঘোষণা করে এক নারীকণ্ঠ। সত্যি সেডান-ই বটে। সদন কথাটা মোটেই যুগোপোযোগী নয়, ম্যাদামারা মিয়নো বিস্কুটের মত। তার থেকে সেডান “একেবারে কড়ক আছে”। বাংলা ভাষার ‘ত’ থেকে ‘ধ’ অব্দি অক্ষরগুলো ব্যান করে দেওয়া উচিত। ‘ট’ থেকে ‘ঢ’ অব্দি তো আছেই। আমাদের দু-শ বছরের পলিটিকাল মাস্টাররা ‘ত, থ’ বলতে পারে না যখন তখন ওই বর্ণ কখানার নিশ্চয়ই অস্তিত্বসঙ্কট।  

বার বার পকেটের মধ্যে মেট্রো রেলের প্লাস্টিক টিকিট হাৎড়াই। ওইটা ছাড়া বেরোতে পারব না। আর জিনিসপত্র হারানোর ব্যাপারে আমার মেলা বদনাম আছে। বছরে গোটা তিনেক ছাতা আর একখানা অন্তত মানিব্যাগ আমি পরার্থে পথে দান করে আসি। কিন্তু টিকিট হারালে পাতালজীবন থেকে মুক্তি পেতে টিকি মাথায় উঠবে। 

মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে নেমে অটো ধরার নির্দেশ দেওয়া ছিল। আমার কোনদিকে যেতে হবে একে তাকে জিগেস করতেই সুলুক সন্ধান পাওয়া গেল। কলকাতার এই এক সুবিধে। অন্ধের জষ্টির মত পথচারীরা আছেন যাঁরা পথের সুলুক সন্ধান দেবে। দেবেই দেবে। চড়ে পড়লাম অটোতে। অটোটা যখন আরো যাত্রী তোলার জন্য গড়িমসি করছে আমি দেখছিলাম ঝুড়ি ঝুড়ি ঝুড়ি-মানুষ। সেটা কি? সেটা হল কিছু প্রকাণ্ড ঝুড়ি। সার সার রাখা আছে। আর তার ভেতরে গুটলি পাকিয়ে শুয়ে রোদ-গরমে বিশ্রাম নিচ্ছে ঝুড়ির মালিক বোধ করি। ঝুড়ি পিছু একজন। যে ঝুড়ি তার জীবিকা সেই ঝুড়িই তার বিশ্রামাগার। এমন চমৎকার দৃশ্য, ঝুড়ির এমন অভিনব ব্যবহার কলকাতা ছাড়া কোথায় দেখতে পাবো? খুব লোভ হচ্ছিল ঝুড়ি মানুষের কাছে একটা বিড়ি টিড়ি চাওয়ার অছিলায় একটু আড্ডা মেরে নিতে। বহুবার করেছি। নস্টালজিয়া খুব পাওয়ারফুল ড্রাইভার। দেশ-গাঁয়ের কথা বললেই এনারা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। এদের মধ্যে যা গল্প আছে তা দিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায় সহজেই। কিন্তু আজ সময় নেই। সময়ে পৌঁছনর একটা বদনাম আছে আমার। ঝুড়ি মানুষদের পেছনে ফেলে আমাদের অটো এগিয়ে চলল। 

যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে সেটা ঝাঁ চকচকে কলকাতা নয়। “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণা” যত্রতত্র অর্থাৎ কিনা পলিটিকাল পোস্টার। সারা কলকাতা যেন একটা ফলাও দিদি এ্যালবাম। পাশেই অবিশ্যি কাস্তে-হাতুড়ির ত্রিকোণ পতাকা। সোনালি স্বপ্নের দিন নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতাদের হাত জোড় করে ভোট ভিক্ষা। নেতাগণ, নেতৃগণ আর কত বছর, আর কত যুগ অপেক্ষা করবে বাঙালি সেই সোনাঝরা দিনের জন্য? রাস্তার কল দিয়ে মোটা ধারায় জল পড়ছে আর সেই জলে পথশিশুরা স্নান সারছে। এই গরমে জলকেলি করতে পেরে তাদের মুখে পরম পরিতৃপ্তি। একটা কাক, সেও গরমে কাহিল, একটু গা ধুতে চায়। একবার করে উড়ে এসে সে-ও একটু জলে ঝটপট করে নিচ্ছে ডানা। আবার তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে। এ শহরের পাখি বলতে ওই এক কাক। দেখে নিন। প্রাণ ভরে দেখে নিন তার চিকণ শ্যামল গা। কান ভরে শুনে নিন তার কর্কশ সঙ্গীত। কারণ, পঞ্চাশ বছর পরে এরাও থাকবে না। মানুষ ছাড়া আর কারু বাঁচার অধিকার নেই, এ আমাদের মানবজাতির দৃপ্ত ঘোষণা। জরাজীর্ণ বাড়ি, তাতে বট গাছ মাথা তুলেছে কার্নিশে। দ্বিপ্রাহরিক আজান ভেসে আসছে কাছেই কোনো দেবস্থল থেকে। দুপুরের গনগনে আগুনে পান বিড়ির দোকানে বসে খদ্দেরের অভাবে ঢুলছে দোকানদার। আমার ছোকরা অটো ড্রাইভার বেশ চড়া ভলিউমে কাওয়ালি লাগিয়েছে তার বাহনের স্টিরিও সিস্টেমে। “আল্লাহ জানে ক্যা হ্যায় মহম্মদকা মারতাবা”। সত্যি-ই যেভাবে মানব সভ্যতার অকল্পনীয় বিস্তার হয়েছে শেষ বিশ বছরে, তাতে আল্লাহ্ই জানে কোথায় গিয়ে ইতিচিহ্ন টানা হবে, ঈশ্বরের সন্তানের স্থান এখন ঠিক কোথায় বলা মুস্কিল। গানের তালে তালে ছোকরা মাথা নাড়ছে। পথশ্রম তুচ্ছ করে, রোজকার দৈনন্দিনতার ক্লেশ তুচ্ছ করে সঙ্গীতের সঞ্জীবনী তাকে উজ্জীবিত করছে। আর একটু যেতেই অটোচালক ছোকরাটি নামিয়ে দিল যেখানে সেখান থেকে কলেজ স্ট্রীট পায়ে হাঁটা দূরত্বে। 

অদ্ভুত এই বইপাড়া এই কলেজে স্ট্রীট। সারা পৃথিবীতে এরকম একটা সারস্বত সাধনার জায়গা আর একটিও নেই। বইয়ের ভারে ন্যুব্জ আর জ্ঞানভারে মন্থর। কাশির গলির মত অপ্রশস্ত পথ। একদিকে প্রতিষ্ঠিত দোকান আর একদিকে স্টল করে বই বিক্রি করছে খুচরো ব্যাবসায়ী। পুরীতে যেমন পান্ডারা ছেঁকে ধরে সেরকমই এই পথ দিয়ে গেলেই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কানে আসবে “দাদা, আপনার কি বই চাই বলুন না”। আর এদের অদ্ভুত বইয়ের জ্ঞান। যেকোনো বইয়ের নাম বললেই হয় আনিয়ে দেবে নয় বলে দেবে কোন দোকানে পাওয়া যাবে। আমি মূলত এসেছি আমার প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছেছি। কলেজ স্ট্রীট এসেছি আর লোভী মৌমাছির মত বইয়ের খোঁজে গলিতে গলিতে ঘুরব না তা কি হয়? দু একটা বইয়ের খোঁজে ছিলাম। লেখালেখি সামান্য করি কিন্তু আমি মূলত পাঠক। দেজ-এর কাউন্টারে গিয়ে আমার লিস্টি থেকে বইগুলো বলছি আর প্রদীপের দৈত্যর মত বইগুলো সামনে এনে ফেলছে একটা অল্পবয়সী ছেলে। যেন কতদিন ধরেই জানতো এই বইগুলো আমি চাইব। সে যা হোক কলেজ স্ট্রীটের একটা ব্যাপার হল, হরেক ধরণের পাঠক দেখা যায় এ চত্বরে। এক বৃদ্ধা মহিলা নজরুলের একটি বিশেষ গানের খোঁজে এসেছেন। নজরুলের গানের যত সঙ্কলনই দেখাক তিনি বলছেন না এতে ঐ গান নেই। তবু ক্লান্তি নেই দোকানের কর্মচারীদের। এক এক করে দেখাচ্ছে অন্য অন্য সঙ্কলন। আমি আমার বই কটার দাম দিয়ে ঝোলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার আমার প্রকাশকের সঙ্গে বসব আমার প্রকাশিত বইটার ভবিষ্যৎ নিয়ে।

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

পর্ব ৩ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/