[2018 Summer]

ঘরে একা বসে আমার প্রায় ছবি বিশ্বাস হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। কেন বলি। আমার কন্যারত্নটি তো আছেই, সঙ্গে এক বন্ধুপুত্র। এই দুই বিস্ময়কর প্রাণীর বেবি সিটিং-এর দায়িত্ব আমার ওপর। একেবারে যাকে বলে ডবল ধামাকা। এমনিতে বাচ্চাদের সঙ্গ আমার মন্দ লাগে না। ওদের মনস্তত্ত্ব স্টাডি করে আমি বেজায় আনন্দ পাই। 

এ যাত্রায় প্রথমেই ওদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করে দিই। কারণ আমার স্থির বিশ্বাস বন্ধুপুত্র হৃদুকে আমার কন্যা সানাই কয়েক মুহুর্ত আগে যেরকম উৎসাহের সঙ্গে বিগলিত হয়ে আপ্যায়ন করেছিল সেইরকম গদগদ সম্পর্ক আধ ঘণ্টা পরে থাকবে না। কারণটা একটাই। রিসোর্স কনস্ট্রেইন্ট। যে জিনিসটা এর চাই সেইটাই সেই মুহূর্তে অন্য জনেরও দরকার হবে। বড়দের মধ্যেও একই বিবাদ হচ্ছে বড় বড় জিনিস নিয়ে। ওদের মধ্যেও হয় ছোট ছোট জিনিস নিয়ে। যেমন ধরুন একটা ম্যাজিক স্টিক্ বা জাদুকাঠি। এ যদি নিলো ওরও চাই। দু কপি থাকলে যে খুব একটা স্বস্তি পাবেন তা না। কারণ এ যে কপিটা নেবে, অন্যটা ফেলে দিয়ে ওরও সেই কপিটা চাই। এ জন্যই এক জ্ঞানীগুণী দাড়িওলা ভদ্রলোক লিখে গেছে “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই যাহা পাই তাহা চাই না।” 

তাই প্রথমেই প্রিয়েম্প্টিভ মেজ়ার হিসেবে ওদের বলি “তাহলে আমরা ফ্রেন্ডস্ রাইট? নো ঝগড়া, কেমন?” দুজনেই খুব বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। আমিও ওদের নিজেদের মত খেলতে দিয়ে একটা উপন্যাসে ডুব দিই। কিন্তু বিধি বাম। কিছুক্ষণ পর থেকেই একবার এর থেকে আর একবার ওর থেকে নালিশ আসতে থাকে “সানাই মারছে”, “রিদু মারছে” ইত্যাদি। অন্যমনস্ক ভাবে একটাই বাক্য ফাটা রেকর্ডের মত বাজাতে থাকি। “দুজনকেই বকব, দুজনকে দু ঘরে দিয়ে দেব,” ইত্যাদি হুমকি দিতে থাকি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবার ওদের সখ্যতা স্থাপিত হয়। তারপর আবার যে কে সেই। 

যখন নালিশ করছে না তখনো যে শান্তি তেমন নয়। কারণ নালিশ করছে না যদি তাহলে নির্লিপ্ত চিত্তে কিছু না কিছু একটা অকাজ, কুকাজ করছে ধরে নেওয়া যেতেই পারে। যেমন সোফায় উঠে উদম নৃত্য বা সোফার হাতল ধরে বিপজ্জনকভাবে ওঠানামা। সেগুলো থেকে মাঝে মাঝে বকাঝকা দিয়ে বিরত করছি। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম রীতিমত গোল বেধে গেছে। অজস্র আনাইডেন্টিফাইড্ ফ্লাইং অবজেক্ট বা ইউ-এফ-ও ঘুরছে আমাদের বসার ঘরের আকাশে। কিম জং উন-এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কিনা কে জানে সানাইয়ের খেলার ব্লক্সগুলো মিশাইলের মত সাঁই সাঁই করে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে চলেছে। টিভির আশেপাশে সেগুলো বিপজ্জনকভাবে ল্যান্ড করছে। একটা আমার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। কাচের জানলায় ঠকাস করে লেগে তারপর অধঃপতন।  “নো থ্রোয়িং” বলে চেঁচাই। কিছুক্ষণের বিরতি।  

তারপর আবার সেই একই খেলা। সাথে যোগ হল নালিশ। সানাই ছুঁড়লে হৃদু নালিশ করে “সানাই ছুলছে’ আর ভাইস ভার্সা। আবার হুমকি ছাড়ি। “দুজনকে দু ঘরে রেখে দেব কিন্তু”। এর উত্তরে সানাই বলে “রিদুকে বকো। রিদু ছুঁলেছে”। রিদু বলে “সানাইয়ের কান মলে দাও। ও ছুঁড়েছে।” আমি কিন্তু ফিজিক্যাল ভায়োলেন্সের পথ মাড়াই না। কান মুলে দিলে সানাই এখন যে সানাই ধরবে সেটা হয়ে যাবে গোদের ওপর বিষফোঁড়া। বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমি রাহুল দ্রাবিড়ের মত সেফ খেলার চেষ্টা করি। কোন সাইডই নিই না। দুজনকেই চোখ রাঙাই। 

কিন্তু মুস্কিলটা হল আমি আমার ছোটবেলাটাকে পুরোটা ভুলে উঠতে পারিনি। তাই ওদের এইসব বালখিল্যপনার মধ্যে নিজেরই ফেলে আসা দিনগুলোকে খুঁজে পাই। তাই সেই অর্থে কাউকেই বেশি বকে উঠতে পারি না। আর বড়দের মুড আর টোন জাজ করার ক্ষমতা ওদের অসীম। তাই দুজনের কেউই সে অর্থে ক্ষান্ত দেয় না। 

একটার পর একটা নতুন দুষ্টুমি বুদ্ধি উদ্ভাবন করে দক্ষযজ্ঞ টাইপ একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড চালাতে থাকে। মাঝে মাঝেই সানাই “মাইন মাইন” বলে চেঁচাতে থাকে। এ মাইন কিন্তু ল্যান্ড মাইন নয়। এর অর্থ mine অর্থাৎ আমার। আমার আড়াই বছরের শিশুকন্যাকে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ পড়াতে পারি নি এখনো। তাই “আমি ও আমার এইটেই অজ্ঞান” – এই জীবনদর্শনে ওর বিশেষ আস্থা নেই। তাও বলি “সানাই শেয়ার করতে হয়। রিদু তোমার বন্ধু না?” বলি বটে কিন্তু খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি না। সত্যিই তো, আমরাই বা আমাদের যা আছে তার ঠিক কতটা শেয়ার করি যাদের নেই তাদের সাথে যে ও করবে। শেষমেশ তিতিবিরক্ত হয়ে আমি উপন্যাস থেকে বেরিয়ে এসে বলি “চলো এবারে আমি গল্প পড়ে শোনাব”। হাতের সামনে “দ্য বিউটি এন্ড দ্য বীস্ট্” বইটা নিয়ে খুব নাটকীয়ভাবে রিডিং সেশন শুরু করি। দুজনেই কোল ঘেঁষে আসে। তারপরের ঘটনা নিম্নরূপ। 

আমি বলি “দেন এ বিগ স্টর্ম হ্যাপেনড। দ্য বোট ক্যাপসাইজ়ড্।” সানাই বোটের দিকে আঙুল দেখিয়ে “নৌকো নৌকো” বলে উৎসাহ প্রকাশ করতে থাকে। কানের থেকে চোখের আবেদন বেশি আমাদের কাছে। ওদের কাছেও তাই। গল্প শোনার থেকে গল্পের বইয়ের ছবি দেখাতেই বেশি আগ্রহ। দমে না গিয়ে বলি “হ্যাঁ বোট। তারপর কি হল শোনো”। এর মাঝেই রিদু প্রশ্ন করে বসে “গোলাপ। মেসো গোলাপ কেন?” লে হালুয়া। সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা রামের মাসি।  

“কি শুনলে তাহলে এতক্ষণ? বিউটির বাবাকে বিউটি একটা রক্তগোলাপ এনে দিতে বলেছিল। বললাম না আগে?” শুনে মাথা নাড়ে। ঠিক বুঝল বলে মনে হয় না আমার। সবে আবার রিডিং পড়তে পুরো দমে শুরু করেছি রিদু আমার কোন অনুমতি না নিয়েই নিতান্ত অবিবেচকের মত পাতাটা উল্টে দেয়। আগের পাতার গল্পে ওর আর বিশেষ উৎসাহ নেই। নো প্রব্লেম। ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে সিনেমা তো আমরাও দেখে থাকি – এই বলে মনকে প্রবোধ দিই। পরের পাতায় যা লেখা ছিল সেটাই উৎসাহের সাথে পড়তে শুরু করি। আমার উৎসাহ দেখে সানাই ততোধিক উৎসাহে বইটা একেবারে বন্ধ করে দেয়। হাসি হাসি মুখ করে বলে “অল ডান।” অর্থাৎ গল্প পড়া আপাতত মুলতুবি। 

গল্পটা ওদের জন্য তেমন উত্তেজনা উদ্দীপক হচ্ছে না। বলি “তোমরা ম্যাজিক দেখবে? ম্যাজিক?” আমরা সবাই জীবনে একটা ম্যাজিক চাই। ওরাও চায়। ম্যাজিক দেখার নামে গায়ের কাছে ঘন হয়ে আসে। আমি কোন পি সি সরকার নই। ম্যাজিকের ম জানিনা। সুবিধে হচ্ছে এই মুহূর্তে আমার অডিয়েন্সও তেমন সেয়ানা নয়। তাই একটা ব্লক হাতের তালুতে নিয়ে পরক্ষণেই পিছনে লুকিয়ে ফেলে বলি “ভ্যানিশ”। দুজনেরই চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা। উৎসাহ পেয়ে আবার করি। কিন্তু না ওদের খুলিতে খোল ভরা নেই। এই বারের বার হৃদু পেছন থেকে অদৃশ্য ব্লকটা বের করে নিয়ে এসে বলে “আমি করি?” বলে আমারই ম্যাজিক আমাকেই দেখিয়ে দেয়। 

এইসব নানারকম করে যখন বিধ্বস্ত ততক্ষণে হৃদুর বাবা, আমার বন্ধু বাড়ি চলে এসেছে। প্রাণে একটু বল পাই। মনে সাহস। এইবারে শুরু হয় ওদের খাওয়ানোর পালা। আর বাচ্চাদের খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা নিশ্চয়ই এক বাক্যে স্ব্বীকার করবেন যে সেটা ধর্মের পথে থাকার মতই শক্ত।