কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৩

May 22, 2019, Morning

মার্কিন মুলুক থেকে কলকাতা ফিরলে থাকে একটা বাৎসরিক অনু্ষ্ঠান। তার নাম ভিসা স্ট্যাম্পিং। আমেরিকায় ঢোকার অনুমোদনপত্র নবীকরণ করতে হবে। তাই দেশে পৌঁছে সপ্তাহান্তটা বাড়িতে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভিসা অভিযানে। আমাজন অভিযানের থেকে সেটা কিছু কম উত্তেজক ঘটনা নয়। পার্থক্য হচ্ছে আমাজন হল রেইন ফরেস্ট, আর মে মাসের  কলকাতা হল বৃষ্টিহীন কংক্রিটের অরণ্য। প্রথম দিনেই বাসে ট্রামে যাওয়ার রোমহর্ষক কিম্বা স্বেদসিঞ্চক ঘটনা ঘটাতে রাজি হল না স্ত্রী। তাই বাড়ির গাড়ি এবং ড্রাইভার বাবুদা। বাবুদা গাড়ি চালানোটা শিখেছে ঠিকই কিন্তু কলকাতার মানচিত্রটা শেখেনি। আর মাপ করবেন পৃথিবীর কোন শহরেরই ম্যাপ আমি কোনদিনও আত্মস্থ করতে পারি নি। অতএব গুগল দেবতাকে স্মরণ করা হল। গন্তব্য হো-চি-মিন সরণী। ইউ এস কনসুলেট। বাবুদার অসাধারণ কলকাতাপ্রীতি হোক বা গুগলের নির্দেশ অমান্য করার ধৃষ্টতাই হোক, কোনো একটা কারণে মোটামুটি পার্কস্ট্রীট চত্বরের প্রায় প্রতিটা গলি থেকে বড় রাস্তায় চাকার ধুলো দিয়ে যখন কনসুলেটে পৌঁছলাম তখন অনেক বেলা। গিয়েই বুঝলাম ছড়িয়েছি। শুধুমাত্র ভিসা ইন্টারভিউ দেওয়ার থাকলেই এখানে আসতে হয়, আমি করতে এসেছি ভিসা রিনিউয়াল। সে কাজ হয় শেক্সপিয়ার সরণী থেকে। কনসুলেটের নিরাপত্তারক্ষী বুঝিয়ে দিল হো-চি-মিনের পদপ্রান্ত থেকে শেক্সপীয়ারের সান্নিধ্যে পৌঁছনোর রাস্তা। মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। বাবুদার ম্যাপজ্ঞানের অনুগ্রহে আর কলকাতার ওয়ান-ওয়ে রাস্তার নিগ্রহে এই দশ মিনিটের হাঁটাপথ তিরিশ মিনিটের গাড়িপথ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে মনে করে হাঁটাই মনস্থ করলাম। যমলোকে শুনেছি পাপীদের ফুটন্ত তেলের কড়াইতে নিক্ষেপ করা হয়। পাপকর্ম জীবনে কম করি নি ! তাই যমলোকে জীবন্ত মানুষের মত বোশেখি দাবদাহে দগ্ধ হতে হতে অতঃপর শেক্সপিয়ার সরণীর ভিসা অফিস। 

এই কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে একটা ফলভারে বিনম্র আম গাছ এক টুকরো মরূদ্যানের মত আগলে রেখেছে জেসমিন টাওয়ার। ঢুকে পড়ে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সাবমিট করতেই চমক। ছবিটা নাকি স্পেসিফিকেশান মত হয় নি আর তাছাড়া একটি ডকুমেন্ট লাগবে যা আমি নিয়ে আসিনি। মাথায় বজ্রাঘাত হলেও এর থেকে কম পাথর হতাম। এই গরমে অন্য একদিন জেসমিন টাওয়ারের চক্কর কাটতে হলেই চিত্তির। বাইরে অপেক্ষারত স্ত্রীরও গরম বাণী নসীব হবে। “ঠিকঠাক দেখে ডকুমেন্ট আনো নি” এইবিধ আক্রমণের আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে প্রতিরক্ষাস্বরূপ নিজের যুক্তি পেশ করি, “ওয়েবসাইটে ঠিক করে কিছু লেখা নেই”। কিন্তু চুপি চুপি বলে রাখি, ওয়েবসাইটে ঠিকই লেখা ছিল। আমি সব কিছু একটু ক্যাজুয়াল নিই বলেই আজ এই হাল। হালে পানি কিভাবে পাই, পা ছড়িয়ে বসে ভাবছি, এমন সময় নিরাপত্তারক্ষীর অম্লমধুর আবেদন, “এখানে ওইভাবে পা ছড়িয়ে বসবেন না”। তাই শুনে এক অচেনা প্রিয়দর্শিনীর মুখে এমন একটা অপ্রিয়দর্শন বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তাতে স্বকীয় অভব্যতার প্রতি যথেষ্ট লজ্জিত বোধ করলেও গরমে মতিভ্রম হয়েছে মনে করে মনে মনে নিজেকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ইন্টারনেটের খোঁজ। যদি মিসিং ডকুমেন্টটা পাওয়া যায় কোনভাবে। আমার মত মুর্গিদের জাঁতাকলে পেষবার ব্যাবস্থা সামনেই। অনেকেই ভিসা ফর্মের প্রিন্ট আউট নিয়ে আসে না বলে ঝোপ বুঝে কোপ মারার ব্যাবস্থা। ইন্টারনেট ক্যাফেতে ঢুকতেই এক মাড়োয়ারী ভদ্রলোক জানিয়ে দিল ভিসা ফর্মের প্রিন্ট নিতে পাঁচশ টাকা লাগবে। সবিনয়ে জানাই আমি সেই অপরাধে অপরাধী নই। অন্য ডকুমেন্ট প্রিন্টপ্রার্থী। দেড় মিনিটের ইন্টারনেট সার্ফিং আর প্রিন্ট করার মূল্য ধার্য করল দুশ টাকা। অন্যায্য। তবু তৃষ্ণার্তকে এক ফোঁটা জল দিলে যেমন সে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে আমিও করলাম। এইবার ভিসা স্পেসিফিকেশান অনুযায়ী ছবি তুললেই এ যাত্রা কাজ উদ্ধার হবে। সন্ধান পাওয়া গেল যে বি কে মার্কেট বলে এক জায়গায় একদম মার্কিনদের মনোমত ছবি তুলে দেবে কিন্তু হাঁটতে হবে বারো থেকে পনের মিনিট। “আরাম হারাম হ্যায়” – এই মন্ত্র জপ করতে করতে হাঁটতে লাগালাম। পথ হাঁটতে আমার খুব ভাল লাগে। জীবন থাকে। যাপন থাকে। সাহিত্যিকদের শুনেছি এক জোড়া অতিরিক্ত চোখ থাকে। আমি তেমন লেখিয়ে নই। তবু চোখ খুলে রাখতে চেষ্টা করি। চলুন আমার সাথে হাঁটুন। দেখি কেমন কলকাতা?

ওই তো একটা উভলিঙ্গ (unisex) সেলুন। বাইরের দেওয়ালে এক শ্বেতাঙ্গী, বিদেশিনী, সুন্দরীর মোহময়ী আমন্ত্রণ। ভারতীয় চোখ সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে শ্বেতাঙ্গী ও বিদেশিনীদের এখনো দু দশ নম্বর বেশি দিয়ে থাকে। আর দু পা হাঁটতেই প্রতিস্পর্ধী নগর সভ্যতার পাশাপাশি উপস্থিত কিছু হেরে যাওয়া মানুষ। ইটালিয়ান সেলুন – অর্থাৎ ইঁটের ওপর বসিয়ে নরসুন্দর ওরফে নাপিত চুল দাঁড়ি কাটছে। লেখা না থাকলেও এ সেলুন উভলিঙ্গ নয়, শুধু পুরুষ প্রাণীদের জন্য। আছে ফুটপাথে বসা লিট্টি বিক্রেতা। জীবনদায়ী ছাতুর সরবত কেবল মাত্র দশ টাকায়। না…খাওয়ার স্পর্ধা আমার নেই। আমি সুখী পান্থজন মাত্র। বিহারী ভোজনের পাশেই বিশুদ্ধ বাঙালি ভোজনেরও ব্যবস্থা। ভাত ডাল দু কুচি আলুভাজা আর মাছের ঝোল প্লেটে প্লেটে পরিবেশন হচ্ছে। একটা আনুবীক্ষণিক সাইজের পাতিলেবুও আছে। এই গরমে ওটাই অমৃতের চাঙ্গড়। মাছ কিন্তু ভাগাড়ের হয় না। শুধু জলেই তাদের প্রতিপত্তি। খাবার স্পর্ধা নেই তবু অনুসন্ধিৎসু মন দাম জিজ্ঞেস করে। মাত্র পনেরো টাকা।পাশেই পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। ক্লাসিক ব্র্যান্ডের সাদা কাঠির দাম পনেরো এখন। দু মিনিটের ফুসফুস ফুটো করার বিলাস আর এক পেট ভাত একই দামে পাওয়া যাচ্ছে পাশাপাশি দোকানে। আজও কলকাতা তার হেরে যাওয়া সন্তানদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেয় নি। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে ঠিকই কিন্তু কিছু বিজ্ঞাপন মুখে মিচকি হাসিও আনে কখনো সখনো। চোখে পড়ে গেল একটা বিজ্ঞাপন। “হার পানি কা বোতল বিসলারি নেহি” – জলসঙ্কটে পড়া এক উট অন্য সব জল দেখে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, শুধু বিসলারির বোতল পেলে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। এই আর্বান ঊস্ট্রকে দেখে একটু হাসতেই হল। নিখাদ হিউমার। দু পয়েন্ট দিতেই হল বিসলারিকে।  জল ভাবতেই দেখলাম রাস্তার ধারে এক গামলা জল রাখা। আর কাকেরা তেষ্টা মেটাচ্ছে। আমাদের মত লব্ধপ্রতিষ্ঠরা নয়, পাখিদের জন্য জল রেখে দেওয়ার এই সহৃদয়তা হয়তো ঐ মুচিটার যে ওখানে বসে ঘামতে ঘামতে জুতো সেলাই করছে কিম্বা ঐ জাঁতা হাতে ইঁটের ওপরে বসা লোকটার যার পেশা সুপুরি পেষা। আবার একটু এগোতেই সুতানুটি কাফের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আমন্ত্রণ। তিন সহোদর ভাই কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর। সময়ের সাথে ভাই গোবিন্দ আর সুতানুটির থেকে সব জমি হড়পে নিয়েছে ছোটভাই কলকাতা। গোবিন্দপুর তো ধ্যারধেরে হয়ে অখ্যাত হয়েছে। সুতানুটির নামে কাফে তাই তার হারানো জমির জন্য বিচার প্রার্থনা করছে। হাঁটতে থাকি। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে ইলেকশান সিজন। পাশাপাশি ছবিতে সহাবস্থান দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ভোটপিপাসু নমস্কার মুদ্রায়। হাসির বিষয় নাকি লজ্জার বিষয় জানিনা, কোনো মা-মাটি-মানুষ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মুদিতা প্রদর্শন করতে প্রতিটা ছবিতে তাঁর চোখ দুটো গেলে দিয়ে গেছে। ঈশ্বর(চন্দ্র) যেখানে মুণ্ডুহীন, সেখানে দেশের কর্ণধার চক্ষুহীন হবেন, আশ্চর্য নয়। সুপুরি কাটার দোকানের থেকে একটু এগোলেই চুনের একটা বড় গামলা। বিনামূল্যে। সুপুরির সাথে চুনের জন্মান্তরের আত্মীয়তা। হঠাৎ মনে পড়ল, কলকাতার সাথে চুনের সম্বন্ধও অঙ্গাঙ্গি। কলকাতার নাম নিয়ে অনেক মত প্রচলিত। একটি মতে কলকাতা এসেছে কলি-কাতা বা চুনের ভাটি শব্দ থেকে। 

দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম বি কে মার্কেটে ছবি তোলার স্টুডিওতে। দাম আবার গলাকাটা। তিনশো টাকা এক এক জনের। বোঝা গেল অনেকেই ভিসা অফিস থেকে নাকচ হয়ে ভরাডুবি থেকে উদ্ধারে এই স্থানে আগমন করে থাকেন। কিন্তু বাচ্চা ছেলেটির হাতটি ভাল। মুহুর্তের মধ্যে ফটোশপ করে ব্যাকগ্রাউন্ড করে ফেলল ধপধপে সাদা ঠিক যেমনটা মার্কিন কনসুলেট চেয়েছে, মুখের ওপর পড়া অবাধ্য চুলেদের কাঁচি করে দিল ম্যাজিকের মত। আমার স্ত্রী ছবি তুলতে ভীষণ ভালবাসেন। তিনি এমন এক রিফ্লেস্ক তৈরী করেছেন যে ক্যামেরা তাক করলেই বারোটা বাজতে পাঁচ কিম্বা বারোটা বেজে পাঁচের ভঙ্গিতে মাথাটা সাইডে হেলে যায়। মাথার বারোটা বাজানোর জন্য অর্থাৎ মাথাটিকে সিধে রাখতে ফটোগ্রাফের ছেলেটিকে বেশ বেগ পেতে হল। সেই নিয়ে একটু ঠাট্টা করছিলাম। কিন্তু যে হারে গরম বাড়ছে আর বাড়ছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে কমছে রসবোধ। তাই রসিকতাগুলো অপাত্রে গেল। ছেলেটির মুখে হাসির রেখাও দৃষ্ট হল না। সে যাই হোক, তার তোলা ছবি আর ইন্টারনেট কাফে থেকে পাওয়া ডকুমেন্ট বলে বলীয়ান হয়ে আবার ফিরে গিয়ে কাজটা উদ্ধার হয়ে গেল। 

ভিসা স্ট্যাম্পিং-এর জন্য পাসপোর্ট জমা করে যেই বেরোলাম, ব্যাস বেজে গেল ছুটির ঘন্টা। ভিক্টোরিয়ার পরীর ডানা দুটো ধার করে কপোত কপোতী উড়ে চলল দক্ষিণ দিশায়। দক্ষিণাপন। শপিং টাইম। সেখানে বিশ্বের সমস্ত অদরকারি জিনিসের সম্ভার। কিন্তু বানিয়েছে বাংলার শিল্পীরা। প্রতিশ্রুতি সমস্ত লাভের গুড় নাকি তাদের ভাগেই যায়। সত্যতা জানা নেই। পথে পড়লো গড়িয়াহাট ব্রিজের নিছে চেস ক্লাব। কদিন আগেই তার উপরে প্রতিভাষণ শুনছিলাম একটা। সূর্যের প্রবল দাপটকে প্রতিহত করছে ব্রিজ আর তারই ছায়ায় গুটি সাজাচ্ছে মহারথী দাবাড়ুরা যাতে অন্যের রাজাকে প্যাঁচে ফেলতে পারে। আর দেখলাম ট্রাফিক পুলিশের বিজ্ঞাপন। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছেন প্রসেনজিত, জীৎ, দেব। বিজ্ঞাপন বলছে, “এনারা জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোতে পারলে আপনারাও পারবেন।” বেশ সৃজনশীল। তবে একটাই খটকা লাগল। শুধু বাংলা সিনে জগতের লোকেরাই তবে কি এখন আইকন? সিনেমার কুশীলবদেরই শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী আখ্যা দিয়ে যবে থেকে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তবে থেকেই কি বাংলা বৌদ্ধিক দারিদ্রে ভুগছে? কোনো লেখক কি বিজ্ঞানী কি স্পোর্টস ফিগার কি অর্থনীতিবিদ নেই এ লিস্টিতে! যাকগে। সিগনাল মেনে রাস্তা পেরোবার আর একটা বিজ্ঞাপন বলছে, “এক মিনিটের একটু থামা। আর একটু বেশি হলে ক্ষতি কি?” বেশ মজাদার। 

আর দেখলাম কৃষ্ণচুড়া গাছ। ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। তার রক্তিম গুমোরে সূর্যও খানিকটা ভীত, সঙ্কুচিত।  ও কৃষ্ণচুড়া তুমি অজুত নিযুত অর্বুদ কোটি পুষ্প বৃষ্টি করো এ ক্লান্ত, অবসন্ন শহরের বুকে। ঘৃণাকে ঘৃণা করে ফুলেল প্যারেড হোক রাজপথে। পুষ্পহন্তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোল বলিষ্ঠ জনমত। ছায়াহীন এই পৃথিবীকে ছায়াচ্ছন্ন করতে তুমিই পারো। কৃষ্ণচুড়া, শুধু তুমিই পারো এ শহরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে এক অসূয়াহীন পৃথিবী গড়তে। 

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

Facebook Comments

Leave a Reply