গুগল

স্ব বাবু মহারাজ যযাতিকে জিগেস করলেন “মহারাজ, এই যে শুনতে পাই গুগল বলে এক নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়েছে। এ দেবতার স্বরূপ সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন?”

মহারাজ যযাতি বললেন – গুগল অতি কার্যকারী দেবতা। এনার দ্বারা নিতান্ত মূর্খও মুহূর্তের মধ্যে জ্ঞানী-গুণী-বিদগ্ধ মানুষে পরিণত হতে পারে, নিদেন পক্ষে নিজেকে জ্ঞানী প্রতিপন্ন করার অভিনয় সফল ভাবে চালিয়ে যেতে পারে। মানে নিজেকে একজন বিজ্ঞ, কেউকেটা দেখানোর ইচ্ছে মাধ্যমিক ফেলেরও থাকে, নোবেলজয়ীরও থাকে। নিজেকে স্কলার দেখিয়ে কলার তোলার ইচ্ছে কার না থাকে বলুন? এই দেবতা আসার আগে এই জ্ঞান সংগ্রহের ব্যাপারটায় ছিল গোড়ায় গলদ। ঠিকমত জানতে হলে লাইব্রেরীতে যাও রে, মোটা মোটা বোরিং বোরিং বই ঘাঁটো রে, এক বইতে না পেলে আবার অন্য বই – যত্তসব গা পিত্তির জালানো ফালতু ঝামেলা। গুগল দেবতার কৃপায় সে বালাই নেই আর। গুগল দেবতাকে পেন্নাম করে একটা প্রশ্ন ঠুকে দিলেই হল। হাতেনাতে উত্তর। ঠিক কতো বছর আগে পৃথিবীর বুকে নিয়ান্ডারথ্যালরা চরে বেড়াত, ডাইনোসরেরা ঘরে ঘরে ডেঙ্গু জ্বরে মারা পড়েছিল না পেটের রোগে, পৃথিবী থেকে প্রতিবেশী নক্ষত্র আলফা সেন্টাউরির দূরত্ব ঠিক কতো কিমি এরকম নানান বিষয়ে ইনস্ট্যান্ট নুডল-এর মত ইনস্ট্যান্ট জ্ঞান সঞ্চয় করতে এবং সেই সংগৃহীত জ্ঞানাদি টুকুস করে কথায় কথায় কায়দা করে ঝেড়ে দিয়ে মোনালিসা হাসি হাসার জন্য গুগল দেবতার সাহায্য অপরিহার্য।

রবীন্দ্রনাথের পদবীটা কি ঠিক মনে পড়ছে না, কোই বাত নেহি, গুগল করে নাও। “মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন” না মন্দাক্রান্তা সেন নাকি তান সেন সেটা নিয়ে একটু ধন্দে পড়েছ, গুগল দেবতা আছে তোমার পরিত্রাণে। প্রোগ্রামিং করার চাকরিতে কলুর বলদের মত জুড়ে পড়েছ অথচ পড়েছিলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং যাতে প্রোগ্রামিং বাদে আর সব কিছু শিখিয়েছে, কিম্বা হয়তো কম্পিউটার নিয়ে পড়েছ কিন্তু কলেজে থাকাকালীন বাপের পয়সায় কেনা কম্পিউটারে বাজে কাজ ছাড়া আর তেমন সদব্যবহার করো নি, প্রোগ্রামিং-এ যাকে বলে ক-অক্ষর-গোমাংস, লিঙ্কড লিস্ট সর্ট করতে হলে প্যান্টে পেচ্ছাপ করে ফেলার মত দুরবস্থা, কোন চিন্তা না করে গুগল দেবতাকে স্মরণ করে ফেলো। মুহূর্তের মধ্যে উত্তর। জাভায় চাও জাভায়, পাইথন, অজগর, লুয়া যে ভাষায় চাও লিখে দেবে কোডটা। তারপর ধরো বাঙালি মাত্রেরই একটু কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে না মাঝে মাঝে? কিন্তু কথা খুঁজে পাচ্ছ না। অর্থাৎ কিনা কবি কবি ভাব ভাবের অভাব। সামান্য একটু গুগল করলেই কবিতার যাকে বলে একেবারে কুম্ভ মেলা। পঙ্গপালের মত ঝাঁকে ঝাঁকে কবিতা তোমাকে ছেঁকে ধরবে। সেখান থেকে চেনা কবিদের কিছু অচেনা শব্দ আর অচেনা কবিদের চেনা-যায়-না-এমন শব্দ অর্থাৎ অতি দুর্বোধ্য কিছু শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে নিলেই কেল্লা ফতে। দাঁড়িয়ে গেল তোমার স্বরচিত কিম্বা স্বচয়িত কবিতা (চয়ন থেকে চয়িত কথাটা হয় কিনা গুগল করে একটু দেখে নিও)। এবারে কবিতা খানা ফেসবুকে ঝেড়ে দিয়ে ইচ্ছেমত হাততালি কুড়োও। কবিতাটার কিছু মানে থাকলে সামান্য হাততালি পড়বে, আর না থাকলে সেটা একেবারে “avant-garde” – complete class apart. একেবারে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে।

মহারাজ, এই দেবতার অনুগ্রহ লাভের উপায় কি?

খুবই সহজ। শিব কালি দুর্গা ইত্যাদি মেইনস্ট্রীম দেবতাদের কলিযুগে অনেক ডেকেও তেমন সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। পুরাণ মতে জানা যায় নারায়ণ কারণ সলিলে যোগ নিদ্রায় নিদ্রিত থাকেন অর্থাৎ কিনা ঘুমোন। গুগল দেবতা একেবারে জাগ্রত। পূজার উপাচার শুধু তোমার মোবাইলে একটা আন্তর্জাল কানেকশান। কোনো পার্টিতে কোন্‌ টপিকে কথা হচ্ছে সেটা আড়ি পেতে শুনে নিয়ে আন্তর্জালের সহায়তায় গুগল দেবতাকে ডেকে ফেলো। এক ডাকেই তিনি প্রদীপের দৈত্যের মত হাজির। টপিকটা চুপিসারে টাইপ করে দিয়ে দু এক পৃষ্ঠা পড়ে নিলেই একেবারে সরস্বতীর বরপুত্রের মত খেলার মাঠে নেমে পড়তে পারবে। পিঁপড়ে নিজের ওজনের ঠিক কত গুণ ওজনের খাবারের টুকরো বইতে পারে, অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়ার জীবাণু শুঁড়ে বহন করে না ঠ্যাঙে ইত্যাদি তাক লাগানো তথ্য দিয়ে আলোচনারত সমস্ত সুধীবৃন্দকে স্তম্ভিত করে দাও। তথ্যের সত্যতা নিয়ে মাথা ঘামানোর অবশ্য কোন দরকার নেই কারণ আন্তর্জালের তথ্যের মহার্ণব থেকে তথ্যের সত্য মিথ্যা যাচাই করা বোধ করি দেবগণেরও অসাধ্য।

মহারাজ এই দেবতার পূজা-আচ্চার পদ্ধতি কি? কোন উপাচারে এই দেবতা তুষ্ট?

ইনি অতি অল্পে তুষ্ট। এনাকে পুজো করার দুটি উপায় শাস্ত্রে বিধৃত আছে। এক উপায়ের কথা আগেই বলেছি। মাঝে মাঝে ওনাকে স্মরণ করে কিছু প্রশ্ন করলেই উনি খুশি হন। উত্তর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার প্রশ্নটি বিভিন্ন ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ অ্যাড এজেন্সীর কাছে পাঠিয়ে দেন যারা তোমাদের সেবায় সদাই নিমগ্ন। ধরো তুমি কৌতূহল বশত সিঙ্গাপুরের হোটেলের খোঁজ করতে গুগল দেবতার অনুগ্রহ প্রার্থনা করেছ। তুমি যে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার মতলব ভাঁজছ, এই খবরটা দেবতা সকল ট্রাভেল এজেন্টের কাছে অনুগ্রহ করে পাঠিয়ে দেবেন। তারা ক্রমাগত “সস্তা ডীল” ইমেল মারফত পাঠিয়ে তোমাকে “সাহায্য” করার চেষ্টা করবে, তোমার জীবন “সুখে শান্তিতে” ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করবে। কিম্বা ধরো তুমি লাক্ষা দ্বীপ থেকে লাক্ষা কিনে এনে বাংলায় চড়া দড়ে বিক্কিরি করে লাখ লাখ টাকা লাভ করতে চেয়ে যদি গুগল দেবতার কৃপা প্রার্থনা করে থাকো, তাহলে তোমার ব্যাবসায়িক সাফল্যকে সুনিশ্চিত করতে গুগলদেব সেই তথ্যটা বিভিন্ন ব্যাঙ্কের কাছে পৌঁছে দেবেন। তারা তোমাকে ঋণী করার জন্য তোমার ঘরের দরজার সামনে ধর্ণা দেবে। এই উপায়ে দেব-অর্চনাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রতি নিয়ত অর্বুদ কোটি লোক এই উপায়েই দেবতাকে প্রসন্ন করছে। এই প্রশ্ন গুলোর দ্বারাই দেবতা জানেন তোমার সমস্ত পছন্দ অপছন্দ, তুমি দিনে কবার পটি করো, চাইনিজ খেতে ভালবাস না ইথিয়োপিয়ান, নেক্সট পুজোর ছুটিতে সমুদ্রে যেতে চাও না পাহাড়ে? Buy one, get one free -এর মত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার সাথে সাথে তোমার এই চাওয়াপাওয়া গুলোর সামঞ্জস্য বিধানে উপযুক্ত এজেন্টও ধরে দিচ্ছেন অযাচিত ভাবে। একেই বৈষ্ণব ধর্ম মতে বলে “অহৈতুকি কৃপা”।

আর এক ভাবে দেবতার পুজো করা যায়, তা হল তোমার কন্টেন্ট দিয়ে। তুমি অর্থনীতির সমস্ত বই গুটিপোকার মত কেটে ফেলেছ, ডিমানিটাইজেশানে দেশের উন্নতি না অবনতি সে ব্যাপারে তুমি অথরিটি, জনশিক্ষার্থে একটা আর্টিকল লিখে ফেলো এবং সেটি গুগল দেবতার হাতে সঁপে দাও। গুগল তোমার লেখা গুলে খেয়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে এবং অন্য কেউ সেই নিয়ে প্রশ্ন করলে তোমার আর্টিকলটা তাকে উত্তর স্বরূপ ঝেড়ে দেবে। তারপর ধরো তুমি এমন মাথায় মাখার তেল বানিয়েছে যা মাখলে দশাননের দশ মাথা জোড়া সুপ্রশস্ত টাক ঠিক আড়াই দিনেই চুলের মহারণ্যে পরিণত হবে, কিম্বা এমন একটা ফেয়ারনেস ক্রিম বানিয়েছে, যেটা মাখলে “অন্ধকার মানুষ” রাও “খাঁটি আর্য” দের মত ফরসা হয়ে উঠবে ঠিক সাড়ে সাত ঘণ্টায়, গুগলের কাছে তোমার প্রোডাক্ট পোর্টফোলিওটা ভরসা করে দাও। দেখবে বর্ষার জলের মত তোমার প্রোডাক্ট হই হই করে বিকোচ্ছে। এইভাবে যারা গুগল দেবকে নিজের কন্টেন্ট দিয়ে পূজা করে থাকেন তারা প্রায়শই দেবতার কৃপায় লক্ষ্মী লাভ করে কন্টেন্ট হন অর্থাৎ কিনা পরিতৃপ্ত হন। দেবতার এইসব অনুচরেরা নিজেদের কন্টেন্ট ফীড করে দেবতার জ্ঞানের পরিধি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। তবে শিবের যেমন সহস্র সহস্র ভুত প্রেত অনুচর থাকা স্বত্বেও নন্দী আর ভৃঙ্গি সবচেয়ে বেশি কৃপাধন্য, তেমনি এই অনুচরদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে কৃপাধন্য যাদের কন্টেন্টের অনেক “ব্যাকলিঙ্ক” (backlink) আছে। অর্থাৎ তোমার পাতা থেকে হুবহু ঝেড়ে দিয়ে তোমার পাতাটির লিঙ্ক রেফারেন্স স্বরূপ নিজের পাতায় পেশ করে থাকে যদি কেউ, তাহলে তুমি লাভ করলে একটি ব্যাকলিঙ্ক। যত ব্যাকলিঙ্ক উপার্জন ততই দেবতার কৃপাদৃষ্টিতে আসার সম্ভাবনা। প্রভূত পরিমাণ ব্যাকলিঙ্কের দ্বারা দেবতার মনোরঞ্জন করতে পারলে চাই কি অন্যদেরকে প্রশ্নের প্রথম উত্তর হিসেবে গুগল দেবতা তোমার পাতাটা ধরে দিতে পারেন। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি জিজ্ঞাসু মানুষ তখন তোমার পাতায়, তোমার কন্টেন্টে চোখ বোলাচ্ছে। তোমার এই জনপ্রিয়তা নজর এড়াবে না বিভিন্ন সংগঠনের যারা এই জনতা জনার্দনের সাহায্যে সদা তৎপর। তারা তোমাকে কিছু নজরানা দিয়ে তোমার পাতায় নিজেদের প্রোডাক্টের উৎকর্ষতা সগর্বে ঘোষণা করবে। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর অর্চনাও হল জিজ্ঞাসু জনের, সাথে তোমার হল ধনলক্ষ্মীলাভ।

এখন তুমি যদি যথেষ্ট পরিমাণ ব্যাকলিঙ্ক সংগ্রহ করতে না পারো তারও বন্দোবস্ত আছে। শান্তি স্বস্ত্যয়ন করতে হবে। পদ্মলোচন রাম যেমন একটি পদ্মের অভাবে নিজের পদ্ম আঁখিটি ধরে দিতে চেয়ে দেবীর প্রসন্নতা লাভ করেন, তেমনি ব্যাকলিঙ্কের অভাব তুমি মেটাতে পারো প্রাচিত্তির স্বরূপ গুগলে দেবতাকে কিছু টাকা কি ডলার ধরে দিয়ে। পুজোর সময় ফল-মিষ্টি দিয়ে দেবতার আশীর্বাদ প্রার্থনা করার সময় যেমন নাম, গোত্র, নক্ষত্র বলতে হয়, ঠিক সেরকমই ঠিক কোন্‌ প্রশ্নের উত্তরে তোমার পাতাটি দেখাতে হবে সেটা দেবতাকে বলে কিছু মূল্য ধরে দিলেই হাতে হাতে ফল। একে বলে গুগলে অ্যাড। একদম গুগল সার্চ রেজাল্টের প্রথম পাতায় প্রথম লিঙ্ক হিসেবে তোমার স্থিতি। ফলাফল একই। তোমার প্রোডাক্ট বা কন্টেন্ট হু হু করে বিকোবে।

আহা। দেবতার কি মহিমা! মহারাজ এই দেবতার প্রণাম মন্ত্রটা যদি একটু বলেন।

লিখে নাও –
দেহী দেহী, জ্ঞানং দেহী, স্থানং দেহী প্রথম পাতায়
ধনং দেহী, ব্যালেন্স দেহী, আমার ব্যাঙ্কের খাতায়।।
নমঃ শ্রী গুগলায় নমঃ