সুরপথ – রম্যরচনা

কয়েকদিন আগে একটা গানের আড্ডায় গেছিলাম। অনেক গায়েন আর বায়েনদের মেলা। বাগেশ্রী রাগে যন্ত্রসঙ্গীতের পরে আসছেন রবি কবি, রবীন্দ্রনাথের পরে আসছেন রফি সাহাব। হেমন্ত, কিশোর, ভুপেন হাজারিকা দিয়ে যাচ্ছেন ক্যামিও অ্যাপিয়ারেন্স। চন্দ্রবিন্দু বা হালচালের গীতিকার দেবদীপও সেখানে ব্রাত্য নয়। এই সুরের বাহারি বাগানের নাম সুরোধ্বনি। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম সঙ্গীত শিল্প মাধ্যমের কথা। মনে হল এই গান গাওয়ার সাথে আমি যে ফিল্ডে কাজ করি তার বোধ হয় বিশেষ সাদৃশ্য আছে। আমি কাজ করি ড্রাইভারলেস কার ইন্ডাস্ট্রীতে। মানুষের সাহায্য ছাড়াই একটা গাড়িকে তার গোমুখ থেকে সাগরের মোহনাতে পৌঁছে দেওয়া, তার শুরু থেকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল নিয়ে গবেষণা করা আমার কাজ। গান গাওয়ার ব্যাপারটাও কি অনেকটা সেরকম নয়? স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর মূল উপাদান দুটি। একটা নির্ভুল মানচিত্র – আমাদের ইন্ডাস্ট্রীতে একে বলে হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গাড়ির চাকাদের সময়মত ঘোরানো আর অন্যান্য সহযাত্রী গাড়িদের সাথে নির্ভুলভাবে সমাপতিত হতে সময়মত ব্রেক ও অ্যাক্সিলেটার প্রয়োগ করে গাড়ির গতি পরিবর্তন করা যাকে আমাদের পরিভাষায় বলে maneuver technique. স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে ছেড়ে দিয়ে আমরা আপাতত যদি মানুষচালিত গাড়ির কথা ভাবি, অনুরূপ দুটি জিনিসেরই দরকার হবে। মাথার মধ্যে থাকা বা মোবাইলের পর্দায় থাকা একটা হাই ডেফিনিশান ম্যাপ আর ম্যানুভারিং স্কিল। গাড়ি চালানো ভালভাবে জানা না থাকলে বা ম্যাপটা ভালভাবে জানা না থাকলে (ধরুন মোবাইলের সহায়তা পাচ্ছেন না, অত্যধিক ফেসবুক করে মোবাইল ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে 🙂 ) দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা। গায়ক বাদকদের ব্যাপারটাও অনেকটা সেরকম। সুর যেন একটা অদৃশ্য পথ। আর সেই পথে স্বররুপী গাড়িকে চালনা করতে হবে। সেটাই চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ পথ বড় বিপদসংকুল। প্রথম বিপদ হল, সঙ্গীতশিল্পীদের সাহায্য করার জন্য কোন ইলেক্ট্রনিক ম্যাপ নেই। হ্যাঁ, ইলেক্ট্রনিক সুরযন্ত্র, আবহ যন্ত্রসঙ্গীত ইত্যাদি মোটা পথটা বাতলে দিতে পারে কিন্তু ম্যাপের খুঁটিনাটিটা থাকতে হবে নিজেরই মাথার মধ্যে। ডুয়েট বা গ্রুপ সঙ গাওয়ার সময় সহগায়করা আর সোলো গাওয়ার সময় সহবাদকরা যেন সেই একই অদৃশ্য রাস্তায় চলতে থাকা অন্যান্য গাড়ি। ম্যাপটাকে একটু ভুল বুঝলেই সেই সহযাত্রীদের সাথে ঠোকাঠুকি, রক্তারক্তি হওয়ার সম্ভাবনা। আরও একটা বড় সমস্যা হল সুরের পথে আমাদের পার্থিব পথদের মত কয়েকটি মাত্র নির্দিষ্ট রুট নেই। প্রতিটা গানেই সুরকার তার সৃজনশীলতা দিয়ে পত্তন করেন একটা আনকোরা নতুন রাস্তা, একটা আনদেখা পথ। সঙ্গীতশিল্পীকে বুঝে নিতে হয় লেনটা ঠিক কেমনভাবে বিধৃত, ঠিক কতটা চওড়া, কতটা দৈর্ঘ অতিক্রম করার পর আচম্বিতে আসবে একটা মোড়। আমাদের হাইওয়েতে যেমন থাকে স্লো লেন, ফাস্ট লেন সেরকমই হঠাৎই কোন লাইনে কি স্ট্যাঞ্জায় বাড়াতে হবে গানের গতি। চারচাকা গাড়ি চালানোর সময় গতি দশ-মাইল-প্রতি-ঘণ্টা অব্দি উপরনিচ করার বিলাসিতা থাকে। এক্ষেত্রে সে গুড়ে বালি। যে গতি মেপে দেওয়া আছে, কাঁটায় কাঁটায় সেই গতিতেই গাড়ি চালাতে হবে। রাস্তা বরাবর সম দূরত্বে বসানো আছে একধরণের অদৃশ্য খুঁটি। সমান পরিমাণ সময় অন্তর অন্তর সেই খুঁটিটাকে ছুঁয়ে যেতে হবে – একে বলে তাল বা মিটার। যেন আপনার গতিবেগ ঠিক রাখার দক্ষতা ভুরু কুঁচকে মাপার জন্য সমান দূরত্ব অন্তর লাগানো আছে এক অদৃশ্য স্পীডোমিটার। তারপর আছে গানের স্কেল। গলার পিচ পরিবর্তন করে একই গান বিভিন্ন স্কেলে গাওয়া যায় যেন আপার মিশিগান ড্রাইভ আর লোয়ার মিশিগান ড্রাইভ দিয়ে একই গতিবেগে সমতানে গাড়ি চালানো। পথ এমনই অজস্র সমস্যা সঙ্কীর্ণ।
 
আমরা যারা লিফট-এ একা নামতে নামতে গলা খুলে গানের কলি ভাঁজি আর লিফটের দরজা খুললেই মুখে কুলুপ লাগাই অর্থাৎ আমরা যারা অ-গায়ক তাদের মধ্যে দু প্রকার লোক আছে। সুরের গোদা ম্যাপটা মোটামুটি সমস্ত মানুষই কম বেশি বুঝতে পারে। আমাদের মত সুর-নিরক্ষরদের মধ্যে এক প্রকার মানুষ হল যাদের সেই অদৃশ্য ম্যাপের সূক্ষ্মাতিসুক্ষ ব্যাপারগুলো, ফাইনার ডিটেলসগুলো ঠিক জানা থাকে না। তাই “সুর না সাজে ক্যা গাউঁ ম্যায়” অবস্থা। অন্য প্রকার এক ধরণের লোক আছে যারা সুরটা হয়তো বোঝে, অনাহত শব্দ বা অনুচ্চারিত শব্দ দিয়ে মাথার মধ্যে প্লে করতে পারে কিন্তু নিজের স্বর সাথ দেয় না। গলা দিয়ে গাইতে গেলেই দেখে রাস্তার কার্নিশে ধাক্কা খায় হামেশাই। গাড়ির এইখানটা তুবড়ে গেল, ওখানটায় স্ক্র্যাচ হল। অর্থাৎ কিনা ম্যাপটা জানে কিন্তু ম্যানুভার টেকনিকটা ভাল জানে না। স্বরসাধনা করা হয় নি। তাই নিজেই গেয়ে বুঝতে পারে ঠিক হচ্ছে না। আর একটা তৃতীয় প্রকার মানুষ অবশ্য আছে যাদের সুরের সেন্সও নেই, স্বরসাধনাও করা হয়নি। কিন্তু গানের গাড়ি চালালে এদিক ওদিক ধাক্কা যে খাচ্ছে সেটা বোঝার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তাদের কথা থাক। সুরের কথায় ফিরি। দুঃখের কথা হল এই সুরের সেন্সটা শ্রমসাধ্য নয়, কিছুটা জেনেটিক, কিছুটা জন্মসূত্রে পাওয়া। এর মানে এই নয় সুরের সেন্স ব্যাপারটা বাইনারি। হয় থাকে নয় থাকে না – এমন নয়। বিভিন্ন সঙ্গীতশিল্পীদের বিভিন্ন মাত্রায় সেটা থেকে থাকে। যার যত বেশি থাকে তারে তত স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্টেজ যেমন কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের ছিল আর কি! অনুশীলনের মাধ্যমে কিছুটা পরিশীলন করাও সম্ভব। কিন্তু একটা বেসিক সেন্স থাকতে হয়। আর সেই বেসিক সেন্সটা কিছুতেই train করে আনা যায় না। অপরদিকে ম্যানুভার টেকনিকটা স্বরাভ্যাস বা voice training-এর মাধ্যমে পুরোপুরি শেখা সম্ভব, ক্রমশ উৎকর্ষসাধন সম্ভব আর সেটাই সঙ্গীতসাধনা। আসল গাড়ি নিয়ে রাস্তায় গড়াতে লাগে মাস তিনেক। তিন মাসের ট্রেনিং যথেষ্ট। সুরের পথে গানের গাড়ি চালাতে শিখতে তিরিশ বছরও যথেষ্ট নয়। কোন সহযাত্রীর সাথে মনমানি না করে, হর্ন না খেয়ে, ট্র্যাফিক সিগনাল মেনে, রাস্তার ধারের অদৃশ্য কঠিন দেওয়ালগুলোকে চুমু না খেয়ে, তালের স্পীডোমিটারের কাছে টিকিট না খেয়ে অব্যর্থ দক্ষতায় গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়াটা একটা বিশাল গোলমেলে ব্যাপার। অভ্যাসের সাথে সাথে সেই ড্রাইভিংটাও মসৃণ হয়, কিন্তু তারপরেও যে আপনি একবারও ফাউল করবেন না এমন নয়। এমনকি আসল গাড়ি চালানোর সময় আর একটা যেটা খেয়াল রাখতে হয় সেটা অন্য কেউ ভুল গাড়ি চালাচ্ছে কিনা খেয়াল রাখা আর চালালে নিজেকে পুনর্বিন্যস্ত করা, সেই সহযাত্রীর সাথে adjust করা। গানের ক্ষেত্রেও তবলাবাদক কি গীটার বাদক ভুল করলে আপনাকে adjust করতে হবে। রাস্তার শোল্ডারে দাঁড়িয়ে সহবাদককে শুধরে দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্র্যাক শেষ করার আগে গান থামালে সুর তাল দুটোই কেটে যাবে। সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে ভাবের যেমন বিন্যস্ত প্রকাশ হয় তেমনটা বোধ হয় অন্য কোন শিল্পতে হয় না। সঙ্গীতশিল্পকে তাই অনেক উঁচুদরের শিল্প ধরা হয়। সঙ্গীতশিল্পীদের কাজটাও সেরকমই কঠিন। মুক্তির পথ সম্বন্ধে বলা হয় “ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া দুর্গম্ পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি” অর্থাৎ মুক্তির পথ ক্ষুরের ধারের মত তীক্ষ্ণ, দুরধিগম্য ও কঠিন। সুরের পথও বোধ হয় অনেকটা সেরকম। একটু ভুলচুক হলেই সেই ক্ষুরের ধারে কেটে গিয়ে রক্তপাতের সম্ভাবনা। গান যারা করতে পারে তাদের প্রতি আমার অপার মুগ্ধতার কথা অনেকেই জানেন। শিকাগোল্যান্ডের আর আমার চেনা জানা অন্য সব সঙ্গীতশিল্পীদের প্রতি থাকুক আমার টুপি খুলে অভিবাদন।

কাগজের নৌকো – রম্যরচনা

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

 

অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি বউ বাড়ি নেই। দূরভাষযোগে জানা গেল মিশিগান হ্রদের সৈকতে হাওয়া খেতে গেছে। শীতের দেশে এই গরম কালের চারটে মাস সকলেরই ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। আমার এই শহরতলিতে তখন ফুরফুরে হাওয়ে বইছে। মিঠে। বাতাসে প্রথম প্রেমে পড়ার শিরশিরানি। কোএড কোচিং-এ পড়তে যাওয়ার আগে দশ-ক্লাস-অব্দি-বয়েজ-স্কুলে-পড়া মনের উথালপাতাল মনে। বাড়ির বাইরে মেঘের নরম তুলোট আদরে ঢেকে থাকা সুয্যিমামার লাজুক হাসি। মনের মধ্যে শবেবরাতের সন্ধে নামার খুশি। সবে এক কাপ চা বানিয়ে এমন গোধূলি লগনটাকে উপভোগ করতে বারান্দায় বেরিয়েছি, কাপের গরম সবুজ তরলে ঠোঁটের আলগা স্নেহ ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই ঝুপুস বৃষ্টি নামলো। সারাদিনের ফ্যা ফ্যা রোদ্দুরে বাড়ি-লাগোয়া কাঠফাটা কাঠের  উঠোনে বৃষ্টিকণাদের লুটোপুটি আর হুল্লুড় শুরু বিনা নোটিশে। বড় বড় ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে মাটি। শুষে নিচ্ছে সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসাদ। মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলা। সেই খড়গপুরের ছোট্ট কোয়ার্টার। যেখানে জায়গা ছিল কম। শান্তি ছিল বেশি। মনে পড়ে যাচ্ছে হু হু রোদ-পোড়া দিনের শেষে কালবৈশাখী। ফটাফট্‌ অঙ্ক খাতার পাতা ছিঁড়ে সেই আয়তাকৃতি প্যাপিরাস দিয়ে বানিয়ে ফেলা কাগজের নৌকো। যেন কোন পূর্বজন্মের কথা। ভাঙাফাটা সিমেন্টের উঠোনের পশ্চিম দিকটা দিয়ে অঝোরে বয়ে যাচ্ছে জল। তখন আমার কাঁচা বয়স। অপু মন। সেই ঝরঝরিয়ে বয়ে চলা হঠাৎ-নির্ঝরিণীতে ভাসিয়ে দিচ্ছি পাটিগণিতের নৌকো। কেশব চন্দ্র নাগ দুলতে দুলতে ভেসে যাচ্ছে ঐ দূরে। এই জলে ভরে উঠল আমার মাঝিবিহীন কাগজের নৌকোর সংক্ষিপ্ত পরিসর। সে বেচারা ওপরের আর নিচের জলের চাপে পানকৌড়ি-ডুব দিল জলের মাঝে। আবার আর একটা নৌকো ছাড়লাম। এলোমেলো হাওয়া বয়ে চলেছে হরিণ শিশুর মত। সেই হাওয়ার অবিমৃষ্যকারিতায় একবার জলের ছাঁট এদিক থেকে আসে, তো পরের বার আসে ওদিক থেকে। তারে শুকোতে দেওয়া ভিজে জামা কাপড় ভিজে জাব। দে টান দে টান। সাগরের ওপার থেকে ভেসে আসছে মায়ের গলা- “বাবাই ঢুকিয়ে আন জামাকাপড় গুলো। সব ভিজে গেল রে। ঘরের সব জানলা বন্ধ কর রে”। তড়িঘড়ি ব্যস্ততা। কিন্তু সে সব মায়ের কাজ। আমার তাতে মন নেই। আমি আমার নৌকোর ভয়েজ দেখতে ব্যস্ত। ওই শুরু হল শিল পড়া। এক ছুট্টে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছের নিচে। ঘন গন্ধ নিয়ে কদম ফুল গুলো ঝরে ঝরে পড়বে। ঝরে পড়বে কৃষ্ণচূড়া কুঁড়ি। সেই পুষ্পবৃষ্টির মাঝে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। কোঁচড় ভরে কুড়িয়ে আনতে হবে। সারা সন্ধে ধরে বাড়িতে বসে আলতো নখের আদরে ফুটিয়ে তুলব ফুলগুলোকে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসবে খিচুড়ি-ডিমভাজার সুবাস আর একটা মা-মা গন্ধ। ওই তো ঝরঝরিয়ে শিল পড়া শুরু। তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মত কুড়োচ্ছি আর মুখে পুরছি। সত্যি, বরফেরও ওরকম স্বাদ হয়? পৃথিবীর আর এক প্রান্তে মৌরুসিপাট্টা জমিয়ে বসেছি। কিন্তু এই সাঁইত্রিশ বছরে দেখা চোদ্দটা ফ্রিজের কোনটার বরফে অতো স্বাদ পাইনি। কচরমচর করে চেবাও। মুখে অনাবিল আনন্দের ঝিলিক। বাড়িতে ঢুকেই শঙ্কিত-মায়ের-কড়া-বকুনির-সম্ভাবনার তৃপ্তি লেগে থাকে মুখে। একটা বড়সড় গোছের শিল মাথায় ঠাঁই করে পড়লেই ফুলে চাঁই। ওই যে শিউলিদের আম গাছটা থেকে টুকটাক করে পড়তে আরম্ভ করেছে শিশু ফল গুলো। ওদের অকালপ্রয়াণে আমার বালক মন আনন্দে শিহরিত। ছুট ছুট ছুট। আমগাছটার তলায় এসে ফটাফট্‌ দক্ষ হাতে কাঁচা আম কুড়োনোর বর্ষাপিয়াসী প্রসন্নতা। বাড়িতে ঢুকেই বৃষ্টি-অর্জিত সেই অমূল্য সম্পদগুলোকে ছাল ছাড়িয়ে হাল্কা নুনে জারিয়ে আমাদের সেই ছোট্ট ফ্রিজে শীতল শয়ন দেওয়া। আগামিকাল স্কুল থেকে ফিরে তার অম্লরসে জিভের স্বাদকোরকগুলোকে বিয়ে-বাড়ির-ফুর্তি-আর-রোশনাই প্রেরণ। সেই ছোট্টবেলার আমার শহরের জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচুড়া রাধাচূড়ার মত এই দূর প্রবাসেও আমার প্রতিবেশী, আমার দোরগোড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা চিরসখা দুটো দেবদারু গাছ। এখানে আদর করে ওদের বলে ক্রিস্টমাস ট্রি। কিন্তু সেই নামে ডাকলে আমার বাঙালি শহরতলীয় পরাণে কি দেবদারু নামের রোমান্টিকতা আসে? হাত-পা ছড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে গাছ দুটো একমনে। যেন এই মুহুর্তে বৃষ্টিতে ভেজাই ওদের একমাত্র কর্তব্য। পাতায় জলসিঞ্চন করা ছাড়া আর কোনো কাজেই তাদের উৎসাহ নেই।

 

হুড়ুদ্দুম করে ছপ্পড় ফাড়কে চিলগতিতে মিনিট পনের ধরে নেমে আসার পরে মেঘেদের ফাটল ফুড়ুত করে বন্ধ। আর তৎক্ষণাৎ শুরু এ পাড়ার পাখিদের বর্ষামঙ্গল গীতি। গোধূলির ঈষৎ রক্তিম আলোয় আর আর্দ্র মলয় সমীরে শরীর জুড়িয়ে গলা ফেড়ে একে অপরকে ডাকাডাকি। ওদের অবোধ্য ভাষায় ওরাও কি কাগজের নৌকোর কথাই বলছে? ভাবতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারলাম ছোটবেলার সেই কাগজের নৌকো বানানোর ম্যাজিক পদ্ধতিটা এই সুদীর্ঘ পথচলার কোনো বাঁকে ফেলে এসেছি, বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছি। এমন একটা প্রবাসী ক্ষণস্থায়ী কালবৈশাখী আমার জন্য অপেক্ষায় আছে জানলে কি ভুলতে পারতাম? যাই হোক কোই পরোয়া নেহি। পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডারের বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে গেছে। ইউটিউবে ঢুকে ওরিগামি বলে খোঁজ করলে কাগজের নৌকো বানানোটা কি আর একবার মনে করিয়ে দেবে না? হয়তো বা। এখানে বাড়ির উঠোনে জল জমে না। বৃষ্টি হলে উঠোন-বাগান খরস্রোতা নদী হয়ে ওঠে না। তাতে কি? নৌকোটা আজ না ভাসিয়ে যদি পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিই? যদি আমার ডানা লোকানো ছোট্ট পরী, আমার কন্যাকে উপহার দিই? নিশ্চয় ও ওর বড় বড় খুশির ঝিলিক-ওলা চোখ নিয়ে হাত পেতে নেবে আর মিনমিনে অশ্রুত-প্রায় আধোআধো গলায় বলবে “হ্যাঁ বোত”।

আহা রে মন আহা রে মন আহারে মন আহারে আহা।

[ছবির নৌকোটা কিন্তু আমার এই লেখার পরে ইউটিউব ঘেঁটে আজই বানানো]