কলকাতা ডায়েরী – পর্ব ৪

May 25, 2019, Morning

ব্লগটা লেখা যখন শুরু করেছিলাম বছর তিনেক আগে, ভাবি নি সেটা এতো পাঠকের চোখ পাবে। তবু পেল যখন তখন যযাতির ঝুলিকে মুদ্রিত মাধ্যমে নিয়ে আসার কথা মাথায় এলো স্বভাবতই। আমার কলমকে কালি দিল পত্রভারতী। বইমেলায় বইটি বেরিয়েছে এবং অনেকেই সংগ্রহ করেছে। তাই বাকি দু-দশ কপি যা পড়ে আছে সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়লাম কলেজ স্ট্রীটের দিকে। গন্তব্য পত্রভারতীর অফিস। এই কপি কখানা আমার ইউ এস এর কিছু সুহৃদ্‌ বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাব। আমার একা কোথাও যাওয়ার থাকলে সাধারণত ট্রামে বাসে যাই, জীবন দেখতে দেখতে। পত্রভারতীর যে আধিকারিক আসতে বলেছেন তার নির্দেশ অনুযায়ী রামরাজাতলার থেকে হুগলি সেতু দিয়ে যাওয়াটাই তাড়াতাড়ি হবে। বাকসাড়া মোড় অব্দি টোটোয় গিয়ে একটা গরম বাসের জঠরে সেঁধিয়ে গেলাম। মাতৃ জঠরে থাকার অভিজ্ঞতাটা মনে নেই। তবে আন্দাজ করতে পারি এই বাসের পেটের মতই হবে। ঠাসা, গরম আর ভেজা ভেজা। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচনী আসর জমে উঠেছে। বাসের গরমে ইলেকশানের বাজার আরও সরগরম হয়ে উঠেছে। হাত জোড় করে ভিক্ষাপাত্র থুড়ি ভোটপাত্র হাতে দাঁড়িয়ে জননেতারা, পোস্টারে, পোস্টারে। নির্বাচনী আসরে, বাসের গরমে, গরম আলোচনা হচ্ছে অফিসযাত্রীদের মধ্যে। এই একটাই সময়ে মানুষ এই জননেতাদের মাটিতে টেনে নামায়। 

জানলা পথে একটা বিজ্ঞাপন দেখে মনে মনে একটু তারিফ না করে পারলাম না। ওরিপ্লাস্ট বলে একটা ব্রান্ড অ্যাড দিয়েছে, “দরের থেকে কদর বেশি”। আমরা যারা পানাসক্ত অর্থাৎ পানিং-এ আসক্ত এমন সুন্দর pun দেখলে মুখে এক চিলতে হাসি চলে আসে বৈকি। রবীন্দ্রসদনে বাস থেকে নেমে আমার পাতাল প্রবেশ। অর্থাৎ পাতাল রেল ধরব। “তুমি কি শুনেছ মোর বাণী, হৃদয়ে নিয়েছ তারে টানি / জানি না তোমার নাম, তোমারেই সঁপিলাম আমার ধ্যানের ধনখানি।” – লেখা আছে মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে। আহা কি কথা। ঠিক যেন tailor made আজকের এই ক্ষণখানির জন্য। আমাকেই সঁপেছেন, একটা গোটা শতাব্দীর ওপার থেকে শুধু আমাকেই সঁপেছেন কবিবর তাঁর ধ্যানের ধনখানি, তাঁর সুললিত শব্দভান্ডার। সার্থক কবি আপনি, হে রবীন্দ্রনাথ। এতদিন পরেও বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরোনোর পর থেকেই নতুন প্রজন্ম এক অনিবার্য আকর্ষণ বোধ করে আপনার বাণীর প্রতি। কিছু নির্বোধ আঁতেল নিশ্চয় আপনাকে খাদারে ফেলে দিতে চায় তবে তাদের লেখা বছর পার করতে পারে না। আপনি তো শতবর্ষের পরেও অমলিন। রবি ঠাকুরের দেশ থেকে আমি যাব গান্ধীজীর দেশে। অর্থাৎ কিনা রবীন্দ্রসদনে উঠে আমার মেট্রোমুক্তি মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে। তাঁকে মহাত্মা নামটা ঘটনাচক্রে এই রবীন্দ্রনাথই দিয়েছিলেন। মেট্রো রেলের দরজা বন্ধ হতেই নিশ্চিন্তি। কলকাতার যানজটের তোয়াক্কা না করে সাঁই সাঁই করে এগিয়ে চললাম আমার গন্তব্যের দিকে। 

“স্টেশান রবীন্দ্র সেডান, পরবর্তী স্টেশান ময়ডান।” কৃত্রিম অ্যাক্সেন্ট মেরে ঘোষণা করে এক নারীকণ্ঠ। সত্যি সেডান-ই বটে। সদন কথাটা মোটেই যুগোপোযোগী নয়, ম্যাদামারা মিয়নো বিস্কুটের মত। তার থেকে সেডান “একেবারে কড়ক আছে”। বাংলা ভাষার ‘ত’ থেকে ‘ধ’ অব্দি অক্ষরগুলো ব্যান করে দেওয়া উচিত। ‘ট’ থেকে ‘ঢ’ অব্দি তো আছেই। আমাদের দু-শ বছরের পলিটিকাল মাস্টাররা ‘ত, থ’ বলতে পারে না যখন তখন ওই বর্ণ কখানার নিশ্চয়ই অস্তিত্বসঙ্কট।  

বার বার পকেটের মধ্যে মেট্রো রেলের প্লাস্টিক টিকিট হাৎড়াই। ওইটা ছাড়া বেরোতে পারব না। আর জিনিসপত্র হারানোর ব্যাপারে আমার মেলা বদনাম আছে। বছরে গোটা তিনেক ছাতা আর একখানা অন্তত মানিব্যাগ আমি পরার্থে পথে দান করে আসি। কিন্তু টিকিট হারালে পাতালজীবন থেকে মুক্তি পেতে টিকি মাথায় উঠবে। 

মহাত্মা গান্ধী স্টেশানে নেমে অটো ধরার নির্দেশ দেওয়া ছিল। আমার কোনদিকে যেতে হবে একে তাকে জিগেস করতেই সুলুক সন্ধান পাওয়া গেল। কলকাতার এই এক সুবিধে। অন্ধের জষ্টির মত পথচারীরা আছেন যাঁরা পথের সুলুক সন্ধান দেবে। দেবেই দেবে। চড়ে পড়লাম অটোতে। অটোটা যখন আরো যাত্রী তোলার জন্য গড়িমসি করছে আমি দেখছিলাম ঝুড়ি ঝুড়ি ঝুড়ি-মানুষ। সেটা কি? সেটা হল কিছু প্রকাণ্ড ঝুড়ি। সার সার রাখা আছে। আর তার ভেতরে গুটলি পাকিয়ে শুয়ে রোদ-গরমে বিশ্রাম নিচ্ছে ঝুড়ির মালিক বোধ করি। ঝুড়ি পিছু একজন। যে ঝুড়ি তার জীবিকা সেই ঝুড়িই তার বিশ্রামাগার। এমন চমৎকার দৃশ্য, ঝুড়ির এমন অভিনব ব্যবহার কলকাতা ছাড়া কোথায় দেখতে পাবো? খুব লোভ হচ্ছিল ঝুড়ি মানুষের কাছে একটা বিড়ি টিড়ি চাওয়ার অছিলায় একটু আড্ডা মেরে নিতে। বহুবার করেছি। নস্টালজিয়া খুব পাওয়ারফুল ড্রাইভার। দেশ-গাঁয়ের কথা বললেই এনারা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। এদের মধ্যে যা গল্প আছে তা দিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায় সহজেই। কিন্তু আজ সময় নেই। সময়ে পৌঁছনর একটা বদনাম আছে আমার। ঝুড়ি মানুষদের পেছনে ফেলে আমাদের অটো এগিয়ে চলল। 

যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে সেটা ঝাঁ চকচকে কলকাতা নয়। “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণা” যত্রতত্র অর্থাৎ কিনা পলিটিকাল পোস্টার। সারা কলকাতা যেন একটা ফলাও দিদি এ্যালবাম। পাশেই অবিশ্যি কাস্তে-হাতুড়ির ত্রিকোণ পতাকা। সোনালি স্বপ্নের দিন নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতাদের হাত জোড় করে ভোট ভিক্ষা। নেতাগণ, নেতৃগণ আর কত বছর, আর কত যুগ অপেক্ষা করবে বাঙালি সেই সোনাঝরা দিনের জন্য? রাস্তার কল দিয়ে মোটা ধারায় জল পড়ছে আর সেই জলে পথশিশুরা স্নান সারছে। এই গরমে জলকেলি করতে পেরে তাদের মুখে পরম পরিতৃপ্তি। একটা কাক, সেও গরমে কাহিল, একটু গা ধুতে চায়। একবার করে উড়ে এসে সে-ও একটু জলে ঝটপট করে নিচ্ছে ডানা। আবার তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে। এ শহরের পাখি বলতে ওই এক কাক। দেখে নিন। প্রাণ ভরে দেখে নিন তার চিকণ শ্যামল গা। কান ভরে শুনে নিন তার কর্কশ সঙ্গীত। কারণ, পঞ্চাশ বছর পরে এরাও থাকবে না। মানুষ ছাড়া আর কারু বাঁচার অধিকার নেই, এ আমাদের মানবজাতির দৃপ্ত ঘোষণা। জরাজীর্ণ বাড়ি, তাতে বট গাছ মাথা তুলেছে কার্নিশে। দ্বিপ্রাহরিক আজান ভেসে আসছে কাছেই কোনো দেবস্থল থেকে। দুপুরের গনগনে আগুনে পান বিড়ির দোকানে বসে খদ্দেরের অভাবে ঢুলছে দোকানদার। আমার ছোকরা অটো ড্রাইভার বেশ চড়া ভলিউমে কাওয়ালি লাগিয়েছে তার বাহনের স্টিরিও সিস্টেমে। “আল্লাহ জানে ক্যা হ্যায় মহম্মদকা মারতাবা”। সত্যি-ই যেভাবে মানব সভ্যতার অকল্পনীয় বিস্তার হয়েছে শেষ বিশ বছরে, তাতে আল্লাহ্ই জানে কোথায় গিয়ে ইতিচিহ্ন টানা হবে, ঈশ্বরের সন্তানের স্থান এখন ঠিক কোথায় বলা মুস্কিল। গানের তালে তালে ছোকরা মাথা নাড়ছে। পথশ্রম তুচ্ছ করে, রোজকার দৈনন্দিনতার ক্লেশ তুচ্ছ করে সঙ্গীতের সঞ্জীবনী তাকে উজ্জীবিত করছে। আর একটু যেতেই অটোচালক ছোকরাটি নামিয়ে দিল যেখানে সেখান থেকে কলেজ স্ট্রীট পায়ে হাঁটা দূরত্বে। 

অদ্ভুত এই বইপাড়া এই কলেজে স্ট্রীট। সারা পৃথিবীতে এরকম একটা সারস্বত সাধনার জায়গা আর একটিও নেই। বইয়ের ভারে ন্যুব্জ আর জ্ঞানভারে মন্থর। কাশির গলির মত অপ্রশস্ত পথ। একদিকে প্রতিষ্ঠিত দোকান আর একদিকে স্টল করে বই বিক্রি করছে খুচরো ব্যাবসায়ী। পুরীতে যেমন পান্ডারা ছেঁকে ধরে সেরকমই এই পথ দিয়ে গেলেই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কানে আসবে “দাদা, আপনার কি বই চাই বলুন না”। আর এদের অদ্ভুত বইয়ের জ্ঞান। যেকোনো বইয়ের নাম বললেই হয় আনিয়ে দেবে নয় বলে দেবে কোন দোকানে পাওয়া যাবে। আমি মূলত এসেছি আমার প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছেছি। কলেজ স্ট্রীট এসেছি আর লোভী মৌমাছির মত বইয়ের খোঁজে গলিতে গলিতে ঘুরব না তা কি হয়? দু একটা বইয়ের খোঁজে ছিলাম। লেখালেখি সামান্য করি কিন্তু আমি মূলত পাঠক। দেজ-এর কাউন্টারে গিয়ে আমার লিস্টি থেকে বইগুলো বলছি আর প্রদীপের দৈত্যর মত বইগুলো সামনে এনে ফেলছে একটা অল্পবয়সী ছেলে। যেন কতদিন ধরেই জানতো এই বইগুলো আমি চাইব। সে যা হোক কলেজ স্ট্রীটের একটা ব্যাপার হল, হরেক ধরণের পাঠক দেখা যায় এ চত্বরে। এক বৃদ্ধা মহিলা নজরুলের একটি বিশেষ গানের খোঁজে এসেছেন। নজরুলের গানের যত সঙ্কলনই দেখাক তিনি বলছেন না এতে ঐ গান নেই। তবু ক্লান্তি নেই দোকানের কর্মচারীদের। এক এক করে দেখাচ্ছে অন্য অন্য সঙ্কলন। আমি আমার বই কটার দাম দিয়ে ঝোলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার আমার প্রকাশকের সঙ্গে বসব আমার প্রকাশিত বইটার ভবিষ্যৎ নিয়ে।

পর্ব ১ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-1/

পর্ব ২ – https://jojatirjhuli.net/free-flowing-essays/kolkata-diaries-2/

পর্ব ৩ – https://jojatirjhuli.net/reminiscence/kolkata-diaries-3/

ফল – রম্যরচনা

[জানুয়ারী ২০, ২০১৮ -র স্মৃতিচারণ ]

পড়ার ব্যাপারে আমার একটা অসামান্য দক্ষতা আছে, একটা অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য। এ কথা আমি বুক বাজিয়ে বলতে পারি। না না, পড়া মানে পড়াশুনোর কথা বা রীডিং স্কিলের কথা ভাববেন না। আমি যে পড়ার কথা বলছি সেটা মাটিতে পড়া। ইংরেজিতে যাকে বলে “ফল”। Fall বলতেই মনে পড়ল কোন এক গুরুতর ব্যক্তি বলেছিলেন “Don’t fall in love. Rise in love.” কিন্তু সে সব গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আমরা এখন মাথা ঘামাব না। আমরা সকলেই সময়ে অসময়ে অল্প বিস্তর প্রেমে পড়ে থাকি। কোথায় কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসবে। তাই ওসব কথা থাক। আমি বলছিলাম ধপাস করে পড়ার কথা। হ্যাঁ এই বিষয়ে আমার বিস্তর জ্ঞানগম্যি, কিছু অনতিক্রম্য রেকর্ডও আছে। আমি জীবনে বহুবার পড়েছি। কখনো গাছের ডাল থেকে, কখন বাড়ির ছাদ থেকে, কখনো খাট থেকে, কখনো সিঁড়ি থেকে। কিন্তু সপাটে পড়ার ফলস্বরুপ অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাতে পায়ে প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে যে একটা গোদা মতন ভাস্কর্য শিল্প করা হয় সেটা কৌশলে এড়িয়ে গেছি। অর্থাৎ প্রভূত পরিমাণ পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও অঙ্গহানি হয়নি, হাত পা ভাঙে নি কখনো। যে নারী সূর্যের মুখ দেখেনি তাকে যদি অসূর্যম্পশ্যা বলা হয়, তাহলে আমার হাত-পা গুলোকে অ-প্লাস্টার-পশ্যা বলা যেতে পারে। নির্দয় পাঠক যদি এতক্ষণে নাক সিঁটকে বলছেন যে “তাহলে আপনি পড়ার মত করে পড়েন নি কখনো” – তাহলে ভুল ভাবছেন। কয়েকটা উদাহরণ দিই। পুরাণমতে বালখিল্য মুনিরা গাছে ঝুলে থাকত। তো তাই থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে কিনা কে জানে, বাল্যকালে আমি একটা বালখিল্যপনা প্রায়ই করে থাকতাম। একটা তেঁতুল গাছের টঙে চড়ে তার একটা ডালে জড়িয়ে থাকা একটা মোটাসোটা লতার ওপর বসে দোল খেতাম। লতাটা বার্ধক্যজনিত কারণে একটু দুর্বল হয়ে পড়লেও আমার অত্যাচার নীরবে সহ্য করত। উপায়ই বা কি? মানুষের মত চেঁচিয়ে নিজের অধিকার আদায় করতে আর কোন জীবই বা পারে। মুস্কিল হল একদিন দোল খেতে গিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম। লতা (না না মঙ্গেস্কর নয়, তিনি দীর্ঘজীবি হন এই কামনা করি) দেহ রাখল। সঙ্গে সঙ্গে আমি নিউটনের আপেলের মত পুরো 9.8 m/s^2  ত্বরণের সাথে এসে মাটি ছুঁলাম তা প্রায় দোতলা বাড়ির মত উচ্চতা থেকে। জামাটামা ছিঁড়ে, পিঠে হাতে ছড়েটড়ে গিয়ে যাকে বলে আমার তখন একেবারে নববধুর মত রক্তিম অবস্থা। কিন্তু না অঙ্গহানি হয় নি। হাত পা কোমর ইত্যাদি ইন ট্যাক্ট। যেই কে সেই। অন্য একটা মনে পড়ছে। স্কুল কম্পাউন্ডে লুকোচুরি খেলা হচ্ছে। আমি চোর। বাকি বন্ধুরা বিভিন্ন অভুতপূর্ব জায়গায় লুকিয়ে অতর্কিতে ধাপ্পা দেওয়ার জন্য প্রহর গুনছে। একটা কমন জায়গা ছিল স্কুলের বাথরুমের ছাদ। না, সেখানে যাওয়ার জন্য সিঁড়িটিড়ি কিছু ছিল না। একটা পাঁচিল, তার এই পাশে বাথরুম, আর ঐ পাশে একটা পুকুর। ওই পাঁচিলে উঠে ছাদের থেকে দাঁত বের করে থাকা দুটো ইঁটকে ধরে ঝুলে পড়ে একটা পা কোন মতে বাথরুমের ছাদে রাখতে পারলেই হাঁটু আর দুই হাতের চাপে বাকি বডিটাকে ছাদে টেনে তুলে ফেলা যেত। হ্যাঁ এই ধরনের কাজকর্ম তো কুঁচোকাঁচারা করেই থাকে। না হলে তাদের যে অবশ্য কর্তব্য, বাবা মাদের চিন্তায় ফেলা, সেটা করতে কিভাবে সমর্থ হবে? এ তো গেল যারা লুকোচ্ছে তাদের কথা। যে চোর সে ওইভাবে ওপরে উঠতে গেলে অবধারিত ধাপ্পা হয়ে যাবে। যে লুকিয়েছে তার সেটাই strategic advantage। কার্গিলের যুদ্ধে পাক সেনাদের যেমন ছিল আর কি! তাই চোরকে ওই ইঁট দুটো ধরেই পাঁচিলের ওপর থেকে ছোট ছোট লাফ দিয়ে ছাদে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা আর থাকলে সেটা কে বুঝতে হবে। ধাপ্পা হয়ে গিয়ে পুনরায় চোর জন্ম আর কেই বা চায়। তো সেবারে আমি চোর। তো ইঁট ধরে দিলাম ছোট্ট লাফ। কিন্তু ইঁট দুটো বহুল ব্যাবহারে বোধ হয় প্রায় খুলে এসেছিল। লাফের উর্ধগতি শেষ হয়ে যখন অধঃপতন শুরু হল দেখলাম ইঁট দুটো ছাদের কার্নিশ থেকে খুলে আমার সাথেই fall করছে বা আমাকে follow করছে বলা যেতে পারে। স্বভাবতই দু খানা আধলা ইঁট দু হাতে নিয়ে নামতে হবে এমনটা ভেবে লাফটা শুরু করিনি। হিসেবে গরমিল হয়ে পা দুটো পাঁচিলের ওপরে নেমে আর স্থির হল না। পাঁচিলের ওধারে পুকুরের দিকে তরতরিয়ে নেমে চলল। ফলাফল আমি পাঁচিলের ওপর উপুর হয়ে, পা পুকুরের দিকে আর মাথা স্কুল কম্পাউন্ডের বাথরুমের দিকে, হাতে দুটো আধলা ইঁট শক্ত করে ধরা। দুখানা ইঁটের সাথে এমনতর সহপতনে কোমর-টোমর অনেক সময়েই…বাট না। As usual, No অঙ্গহানি। এ ছাড়া আরও অনেক বাঁদরামির ফলে বিভিন্ন রকম “ফ্রী ফল”-এর সম্মুখিন হয়েছি। একটা বকুল গাছের ডাল ছিল বেশ স্থিতিস্থস্পক। ওটা ধরে ঝুলে পড়লে স্কুলের ছাদ থেকে বেশ তাড়াতাড়ি নেমে আসা যেত। নিচে নেমে ছেড়ে দিলেই ডালটা ব্যাক টু ছাদ। ছোটবেলায় সময়ের বড়ই অভাব ছিল। তাই ওই করে প্রায়ই কিছু সময়ের সাশ্রয় করতাম। সে পাজি ডালখানাও একদিন বিশ্বাসঘাতকতা করে ভেঙ্গে গিয়ে মাটিতে সজোরে ফেলেছিল। এ ছাড়া খাট থেকে পড়েছি। সিঁড়ি থেকে আকছার পড়েছি। সবক্ষেত্রেই হাত-পা-মাথা ইত্যাদি যে অঙ্গগুলো প্রায়ই কাজে লাগে সেগুলো ইন-ট্যাক্ট রেখেছি।

 

যাক গে যাক, প্রশ্ন হল পড়ার প্রসঙ্গ এল কেমনে? এই জন্য এল যে আজকে আবার পড়েছি। একেবারে যাকে বলে সজোরে, সপাটে। না, লুকোচুরি কি কুমিরডাঙা খেলতে গিয়ে কি গাছে উঠে দোল খেতে গিয়ে নয়, সে সুখের দিনগুলো বোধ হয় আর ফিরে আসবে না। লাগামহারা শৈশবের দিনগুলোকে আজীবনের মত দ্বীপান্তরে পাঠিয়েছি সে বহুকাল হল। এখন শুধু কর্তব্যেস্মিন কুরু। সকাল সকাল রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে অদৃশ্য কর্পোরেট মুখোশ পড়ে বেরিয়ে পড়লাম অফিসের পথে। বাড়ি থেকে বড় রাস্তা মোটে দু তিন মিনিট। সেখান থেকে বাস। গতকাল সকালেও এই রাস্তাটুকু সাদা নরম পালকের মত বরফের চাদরে ঢাকা ছিল। সেই কচি-কাঁচা বরফেরা আজ পেকেছে অর্থাৎ জমে হয়ে গেছে “ব্ল্যাক আইস”। সাপের পিঠে চড়েছেন? চড়েন নি? আমিও চড়ি নি। আশীর্বাদ করবেন যেন সেরকম ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা না হয়। কিন্তু সে জীবটি যেভাবে সরসরিয়ে ভূমিপথে যায় তাতে মনে হয় ওদের ত্বকটা লোভনীয় রকমের পিচ্ছিল। আজ রাস্তার অবস্থা তার থেকেও বাজে। আনকোরা নতুন পাথরের মেঝেতে খানিকটা মোবিল ঢেলে দিলে ঠিক যেমনটা হবে আর কি? প্রতি মুহুর্তে পদস্খলনের সম্ভাবনা। ছিঁচকে চোরেদের মত পা টিপে টিপে চলেও গড়ে প্রতি চারটে পদক্ষেপের একটা ঠিক প্ল্যানমাফিক হচ্ছে না। ফেলার সাথে সাথেই সাপের মত সরসরিয়ে আর একটু এগিয়ে যাচ্ছে। টীনএজার ছেলেমেয়েদের যেভাবে সামলে সুমলে রাখতে হয় সেই ভাবে পা দুটোকে  কড়া শাসনে রেখেও তাদের মতিস্থির রাখা যাচ্ছে না। অনেক কসরত আর জিমনাস্টিক-এর সাহায্যে বাসস্টপে পৌঁছে গেলাম। প্রায় গোটা সাত আটেক বার ভূমির আকর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে তখন আমি ভূমায় উড়ছি। ভাবলাম আজকের মত ফাঁড়া কাটল। কিন্তু বিধি বাম। রাস্তায় কালো বরফের এমনই মসৃন পাতলা আবরণ, যে গাড়িরা সকলেই গজগামিনী আজ – ৪৫ মাইলের রাস্তায় মেরেকেটে ২০ তে চালাচ্ছে। এদিক ওদিক থেকে গাড়ি স্কিড করার আওয়াজ ভেসে আসছে। যে বাসটা আমায় রেল স্টেশান অব্দি বহন করে সে সুন্দরী যুবতীর মতই মুডি। কোনদিন সাতটা পঞ্চাশে দর্শন দেয় তো কোনদিন আটটায়। যাদের বিদেশ সম্বন্ধে এই ধারণা আছে যে ট্রেন বাস সব সময়মত চলে তাঁরা ধারণাটা এই বেলা বদলে নিন। এই হিমেল শীতের দিনে বাসটার গরম বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে যাওয়ার জন্য যতই আকুলিবিকুলি করি ও ততই দেরি করে কাছে আসে। আজকেও মিনিট দশেক অপেক্ষার পর সে সুন্দরীর দর্শন মিলল। কাছে এসে সে কিন্তু না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলল। বুঝলাম বাস-এর ব্রেক ধরছে না। ফুট কতক এগিয়ে গিয়ে সবে যখন সে থামবে থামবে করছে, আর আমিও প্রিয়ার বুকের গরম নিতে পিচ রাস্তায় নেমে পড়েছি, তখনি ঘটনাটা ঘটল। ডান পা-টা আমার নির্দেশ উপেক্ষা করে সরসরিয়ে সোজা সামনে খানিক এগিয়ে তারপর উর্ধমুখে চলল আর আমার কোমর থেকে মাথা অব্দি চলল নিচের দিকে। একেবারে যাকে বলে পিছলে পপাত ধরণী তলে। পুরো ধরাশয়ী হওয়ার পরেও দেখলাম আমার গতিরুদ্ধ হয়নি। আমি পিছলে বাস-এর পেছনের চাকার নিচে চলে গেছি প্রায়। এরপর না থামলে রীতিমত রসিকতা হয়ে যাবে। বাসপৃষ্ট হয়ে পথচারীর মৃত্যুর খবরটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই প্রাণপনে হাত দিয়ে হ্যাঁচড়-পাঁচড় করে ঐ বরফাবৃত রাস্তাকে আঁচড়ে-কামড়ে শরীরটা বাসের চাকার তলায় যাওয়ার যে বিপজ্জনক প্রবণতা দেখিয়েছিল সেটাকে রুখলাম। গতিরুদ্ধ হল বটে কিন্তু ঘটনাটার আকস্মিকতায় আর অভিনবত্বে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বহু কষ্টে উঠে যখন বাসের ভেতরে সেঁধোলাম, ততক্ষনে স্নায়ু পেশী ইত্যাদি জানান দিচ্ছে যে এই অকস্মাৎ অধঃপতন তাদের মোটেই পছন্দ হয় নি। বাস ড্রাইভার দিদি গম্ভীর মুখ করে জানতে চাইলেন “Do u need medical attention?” মুখ দিয়ে আমার বাক্যস্ফুর্তি হল না। মাথা নেড়ে জানালাম “না”। কোমর আর ডান হাতের কনুই তখন ঝালায় বাজচ্ছে। স্টেশান অব্দি মিনিট পাঁচেকের বাসযাত্রা আমার। বাস-এ আসন গ্রহণ করে ভাবলাম স্টেশানে পৌঁছে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারি তখন ডাক্তার সন্দর্শনে যাওয়া যাবে। বাস থামলে নিজের পায়েই দাঁড়ালাম। ট্রেন ধরে শহরে পৌঁছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অফিস পথগামী হয়ে এত আনন্দ হল যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে জলতরঙ্গ বাজাচ্ছিল যে পথশিল্পীটা তাকে একটা কড়কড়ে এক ডলারের নোট দিয়ে ফেললাম। ততক্ষণে পুরো ডানদিক টাটিয়ে গেছে। প্রথমের যে যন্ত্রণা ঝিনিক ঝিনিক করে বাজছিল সেটা চলে গিয়ে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের মত একটা একটানা একঘেয়ে যন্ত্রণা। সে হোক। হাত-পা-কোমর তো এবারেও ভাঙেনি। পড়ে হাত-পা না ভাঙার রেকর্ডটা এখনো অক্ষত। তার থেকেও বড় ব্যাপার – বাসের চাকার তলাতেও শরীরের দুচারটে পার্ট খোয়াইনি। সব কিছুর ইতিবাচক দিকটা দেখলেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোন এক গুণীজন বলেছিলেন মানুষের সবচেয়ে বেশি মনোবেদনার কারণগুলোকে নিয়ে রসিকতা করলে বেদনার ভার লাঘব হয়। অফিস থেকে ফিরে এখন আমার সারা গায়ে প্রবল ব্যাথা। একটা পেনকিলার খেয়েছিলাম অফিসেই। তা ভাবলাম গুনীজনেদের উপদেশ অনুসরণ করে আমার এই গাত্রবেদনা নিয়ে রসিকতা করে এটা কিছু কমানো যায় কিনা। পেনকিলার না খেয়ে শুধু রসিকতা করেই যদি এই গাত্রদাহ কিছু কমে তবে মন্দ নয়, কি বলুন?

বাঁধন

মাস চারেক আগে যখন দেশে যাওয়ার টিকিটটা কেটেছিলাম তখন ভেবেছিলাম এক্সপিরিয়েন্সটা সুখকর হবে। আমার স্ত্রী আর আমার দু বছরের কন্যা সন্তান মহারাজার কাঁধে চেপে যাবে দিল্লি হয়ে কলকাতা। আর তার এক মাস পরেই আমি তাদের জয়েন করব আমার খুব কাছের সেই ছোট্ট শহরতলি রামরাজাতলায়। এ শহরে সরু সরু অলিতে গলিতে আমার ছোটবেলাগুলো সারা বছর আমার দেখা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। সেই বুড়ো শিবতলা, সেই বারোয়ারী মণ্ডপের পুজো, সেই জমিদার বাড়ির আদলে মৈনাকদের বাড়ি আজও আমার অভাবে খাঁ খাঁ করে – অন্তত এই দুর প্রবাসে বসে এমনটাই আমি মনে করি। স্ত্রী-কন্যা বিহনে আমি এই একটা মাস উপভোগ করতে পারব আমার হঠাত-করে-পাওয়া আইবুড়ো সময় বিশেষত এক মাস পরেই যেখানে নিছক ছুটি কাটাতে দেশে যাওয়া এবং সেই মানুষ দুটির সাথে পুনর্মিলন, সাথে পাব বাবা-মার আদর, আমার প্রিয় ভাইঝিদের সর্বক্ষণ ন্যাওটা হয়ে আমার সাথে লেগে থাকা। কিন্তু তার আগে এই একলা একটা মাস। সত্যি কথা বল্যতে কি আমার নিজের সঙ্গ আমার বেজায় পছন্দ। কোন এক মনীষী লিখে গেছেন “A Poet talks to himself only. Others just overhear it” – লেখালেখি করা যে কোন মানুষের ক্ষেত্রেই কথাটা প্রযোজ্য। আর এই নিজের সঙ্গে কথা বলতে কিছুটা নিজের সময়ের প্রয়োজন হয়। আমার ব্যাচেলরহুড মানে বেশি কিছু নয়, একটু হয়তো জিনিস যত্র তত্র ছড়িয়ে রাখা। কিচেনের দেরাজ হোক বা বইয়ের, যে বা যারা যেখান থেকে বেরোল তাদের স্বস্থানে প্রত্যাবর্তনের কোন তাড়া নেই। রাতের বেলা ভাত-রুটির বদলে এক প্যাকেট ম্যাগি। অফিস থেকে ফেরার নো তাড়া। ফেরার পথে কোন পথ চলতি রেস্তোরায় পা আটকে গিয়ে একটা কি দুটো সোনালি তরল যদি আত্মস্থ করে নিই তাহলেই বা ক্ষতি কি? টিভিতে ইয়াপ টিভিতে বাংলা সিরিয়ালের বদলে আমার প্রিয় গজল বা ভজন কি চন্দ্রবিন্দু কি ফসিল। মোটের ওপর কারু কাছে জবাবদিহি করার নেই। একটা মাস আমার শর্তে আমার জীবন বাঁচা। আর আপনারা যারা বিবাহিত তাদেরকে বোধ হয় বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না যে ছাপোষা বাঙালি হিসেবে আমাদের জীবনে দাম্পত্য ঝগড়া-বিবাদ-কলহ লেগেই থাকে। কথায় বলে ঘটি-বাটি একসাথে থাকলে ঠোকাঠুকি হয়। কিন্তু জড় হওয়ার সুবাদে সেই ঠোকাঠুকি কুরক্ষেত্র যুদ্ধের আকার নেয় না। কিন্তু সজীব বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যাপার আলাদা। এই ধরুন সবে একটা ব্লগের পাতায় একটু চোখ দিয়েছি কিম্বা একটা রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের নরম উত্তাপে নিজেকে একটু সেঁকে নিচ্ছি কি আমার শ্রীমতীর ডাক পড়বে “শোনো না সানাই-এর দুধটা গরম করে আনো না গো।” কিম্বা “বাসন গুলো মেজে দাও”। শুনে যদি মুখ বেঁকিয়েছ তাহলেই বাড়িতে শুরু হয়ে যাবে হার্ড মেটাল। না দাবী গুলো কোনটাই অন্যায় নয়। কিন্তু ন্যায্য দাবী হলে যে মেনে নেবই, নিজেকে এমন সবিশেষ মহাপুরুষ বলে দাবী আমি করছি না। বিশেষতঃ মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বার্থপর তো তার নিজের জনের ওপরেই হয়। প্রবাসে থাকলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সব কিছুই নিজেকে করতে হয়। কোন সাহায্যকারী মাসীর অভাবে আমাদের বাঙালি স্বত্তার একেবারে ত্রাহিমাম অবস্থা। আর তার ওপরে আছে সানাই-এর দেখভাল করার ভার। সানাই, আমার কন্যা সন্তানটিকে এক কথায় বর্ণনা করতে হলে বলতে হয় “আশাতীত”। অর্থাৎ কিনা ওর ওই ক্ষুদ্র মাথায় এই মুহূর্তে ঠিক কি প্ল্যানিং চলছে সেটা বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাও ঠিক ঠাহর করতে না পেরে এ যাত্রা সেই দায়িত্বটা তাই আমাদের ওপর বর্তে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নতুন সৃষ্টি কর্মে মেতেছেন। এই হয়তো দেখলেন দেবী মন দিয়ে কিষা দেখছে অর্থাৎ কিনা লিটল কৃষ্ণ দেখছে, আর সেই দেখে পায়ের ওপর পা তুলে আমি চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়েছি, চোখের নিমেষ ফেলবার আগেই তাকে হয়তো পাওয়া যাবে ডাইনিং টেবিলের তলায় চেয়ারের চক্রব্যূহে আটকা পড়ে তুমুল চিৎকারে এস-ও-এস পাঠাচ্ছে। অমন একটা জনমানবহীন জায়গায় ওর কি কাজ থাকতে পারে সে ব্যাপারে আমায় প্রশ্ন করবেন না। কারণ উত্তরটি আমি সম্যক অবগত নই। কিন্তু তাকে ওখান থেকে রেসকিউ করতে ওই সবুজ অমৃতের চাঙড়কে সেন্টার টেবিলে ঠকাং করে নামিয়ে আমাকেই যে মাঠে নামতে হবে সেটা বোধ হয় বলাই বাহুল্য। চায়ের আমেজের যাকে বলে এক্কেরে হাতে হ্যারিকেন। সেটাও যদি ছোট্ট গোপালের দুষ্টুমি দেখে অনুপ্রাণিত ভেবে ক্ষমা করে দেন, তবে দেখবেন রাত্তির সারে বারোটার সময় হঠাত করে আপনাকে হাত ধরে ঠাকুরের বেদীর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি ভেবে থাকেন ঠাকুর দেবতায় ভক্তি ভাল বই মন্দ না – তাহলে নিতান্ত ভুল করছেন। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে যে প্রবাদ শোনা যায় তা যে নেহাত অপবাদ নয় তার প্রমাণ হাতেনাতে পাবেন। চোখ টোখ বুজে একটি জোরদার প্রণাম ঠুকেই দেবীর দাক্ষিণ্য পেতে হাত বাড়িয়ে দেবে। অর্থাৎ কিনা প্রসাদ চাই। দেবী তখন প্রসন্ন হয়ে প্রসাদ দিতে চান কিনা ঠিক জানি না, কিন্তু আমার আপনার নিশ্চিত অপ্রসন্ন লাগবে সেটা স্বাভাবিক। আপনি যদি রাত্রি সাড়ে বারোটার সময় প্রসাদরুপী মিছরি না খেয়ে ঘুমনোটাই শ্রেয় কর্ম বলে উপদেশ দিয়ে তাকে বিছানায় পেড়ে ফেলার চেষ্টা করেন, তাহলে সানাই সপ্তম স্বরে যে সানাই ধরবে তাতে আক্ষরিক অর্থে পিলে চমকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রভূত। আলকাতরাজে নিয়ে গিয়ে থার্ড ডিগ্রী টর্চার করলেও কেউ এই ধারা চেঁচায় কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। তারপর ধরুন না সেদিন দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন যখন শিকাগোর ভারত সেবাশ্রমের ছোট্ট পরিসরে প্রায় গোটা আটশ লোক পুষ্পাঞ্জলি দিচ্ছে তখন হয়তো দেবী মুমুক্ষু হয়ে পড়লেন। মুমুক্ষু অর্থাৎ বাবার বাহু বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা। বাবার হাত হ্যাঁচকা টানে ছাড়িয়ে নিয়ে ভক্ত মণ্ডলীর থিকথিকে ভিড়ে মুহুর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তারপর মিনিট দশেক পর্যন্ত গোরু খোঁজা খুঁজে যখন বুকের মধ্যে আপনার হাপর পড়ছে, আপনার স্ত্রীয়ের চোখের অশ্রুগ্রন্থি গুলো সবে কাজে নামবে বলে মনঃস্থির করেছে সেই সময় কোন শুভাকাঙ্ক্ষী এসে যদি আপনার বাচ্চা ধরে দিয়ে যায় এবং বলে যায় “রাস্তায় হাঁটছিল। একটু খেয়াল রাখিস।” তখন নির্ভেজাল মুখ করে তাকে অজস্র ধন্যবাদ দিলেও মনে যে বড় আনন্দের উদ্রেক হয় না সেটা দুরন্ত বাচ্চার (মানে বাঁদরের ইউফেমিজম আর কি) বাপমা মাত্রেই অনুধাবন করতে পারবেন। এ হেন সানাইকে সামলানো মোটের ওপর স্ট্রেসফুল। আমার এক মার্কিন কলিগ আমায় একবার বলেছিল “With small kids, you have high moments and low moments. Where high moments are truly blissful, low moments are truly frequent.“ হাড়ে হাড়ে সেটা উপলব্ধি করি নিয়মিত।   

 

এর পরে আছে ধরুন আমার স্ত্রীয়ের পরিষ্কারের বাতিক ও তৎসম্বন্ধীয় পিটপিটানি। বেসিনের বেড থেকে বেডরুমের, কোথাও এতটুকু আঁচিল দেখলেই সেটা পরিষ্কার করে ফেলবে তৎক্ষণাৎ কিন্তু তার পরিবর্তে দুটো বাঁকা কথা আমার বরাদ্দ। আমি নিশ্চিত, স্বচ্ছ ভারত অভিযানে সামিল হলে ও একটা কেউকেটা কিছু হতে পারত। স্বচ্ছতায় ও একেবারে লেটার মার্ক্স আর আমি মেরেকেটে দুই কি তিন। অতএব লাগ লাগ লাগ ভেল্কি নারদ নারদ। তো এই বৌ-বাচ্চার যাঁতাকলে চাপা পড়া আমি নিরীহ মানুষ যদি এই এক মাসের মুক্তি একটু রেলিশ করি তাহলে সংসারী মানুষের পরীক্ষায় আমায় দশে শূন্য দিয়ে ক্লাসরুমের বাইরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে নিশ্চয়ই রাখবেন না। আচ্ছা এখানে একটা কথা না বলে রাখলে সত্যের অপলাপ হবে যে আমি নিরীহ মানুষ এই মতবাদটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত। আমার স্ত্রীয়ের মতবাদ হল আমার মত ঝগড়ুটে খিটখিটে মানুষ ত্রিভুবনে নেই।  

 

তাই টিকিট কাটার পরে প্রথম প্রথম আনন্দই হচ্ছিল এক মাসের পূর্ণ স্বাধীনতা আর তত পরবর্তী কলকাতায় গিয়ে স্ত্রী সন্তানের সাথে পুনর্মিলিত হওয়ার কথা ভেবে। ওদের কলকাতা যাত্রার দিনটা দুর্গাপূজার পরে। দেখতে দেখতে দুর্গাপুজা এসে পড়ল। শিকাগোয় পুজো বিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমরা দ্যাবা দেবী দুজনেই। কোথাও নাটকে অভিনয় করছি, কোথাও নাট্য নির্দেশনা সব মিলিয়ে একেবারে যাকে বলে শিকাগো সরগরম। প্রবাসী বাঙ্গালিদের মধ্যে বাঙ্গালিয়ানা ধরে রাখার যে চাড়টুকু থাকে গড়পড়তা কলকাতার বাঙালিদের মধ্যে সেটা থাকে না। কারণ কলকাতার বাঙালিরা এমনিই বাঙালি। কেউ তাদের বাঙ্গালিত্ব কষ্টি পাথরে যাচাই করতে আসে না। কিন্তু সেই সুবিধা দিল্লি কি শিকাগোর বাঙালির নেই। তাই প্রতি মুহুর্তেই ঝাঁপ দিতে হয় বাঙ্গালিত্বের অগ্নিপরীক্ষায়। তাই দুর্গাপুজো হোক বা নববর্ষ, বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাজি সাজিয়ে বসে পড়তে হয়। আর তাই এই দুর্গাপুজোর আগে আগে চোখে নাকে দেখতে পাওয়া যায় না। চওড়া কাঁধে দায়িত্ব নিয়ে দুর্গাপুজোটা যখন উতরে দিলাম তখন দেখলাম ওদের দেশে যাওয়ার দিনটা আর দুদিন পরে। আশ্চর্য ব্যাপার হল টিকিট কাটার দিনে মনের মধ্যে যে তিরতিরে গঙ্গা ফড়িংটা উড়ে বেড়াচ্ছিল সেটাকে আর অনেক খুঁজেও কোথাও পেলাম না। বিয়ের ভাঙ্গা আসরের মতই রশনচৌকি ঝুপ করে বন্ধ। বুকের ভেতরটায় কেমন যেন ফাঁকা। নিয়ন আলোয় ভরা ম্যাডিসন স্কোয়ারে যেন ঝুপ করে হয়ে গেছে লোডশেডিং। অথচ এই দিনটার প্রত্যাশাতেই বসে ছিলাম কিছুদিন আগেও। কিন্তু আজ যখন মানুষ দুটোর দেশে যাওয়ার দিন দুয়েক বাকি, আসন্ন আমার অখণ্ড স্বাধীনতা আর অবসর, অলক্ষ্যে অপলকে তাকিয়ে থাকি আমার দু বছরের ডানা লোকানো ছোট পরীটির ঘুমন্ত মুখের দিকে। মুখ ফুটে জিগ্যেস করতে পারি না কিন্তু হঠাতই অকারণে জানতে ইচ্ছে হয় আমার সাত বছরের সঙ্গিনীটি কলকাতা ট্রিপের হই হট্টগোলের মধ্যে আমায় মিস করবে কিনা। বিদায়ী মুহুর্তটিতে চোখে একটা অস্বস্তকর বিচ্ছিরি জ্বালাধরা ভাব। “ভাল ভাবে যেও” বলতে বলতে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয় কারণ চোখের মধ্যে অবাধ্য কিছু গ্ল্যান্ড সিক্রেশান শুরু করেছে। বিশ্বাস করুন আমি একেবারে কাঁদুনি ছিলাম না। কিন্তু আজকাল কারণ অকারণে হঠাৎ হঠাৎ চোখের পাতা কেমন ভারি হয়ে আসে। কোন ছায়াছবির করুণ রসাত্মক কোন দৃশ্য হোক বা কলকাতা থেকে ফেরার সময় এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা মার মুখের দিকে তাকিয়েই হোক চোখটা বড়ই নিয়ন্ত্রণ হারায় আজকাল। আসলে মায়া বড় প্রবঞ্চক। যত দিন যায় মানুষকে তার অদৃশ্য গুটিপোকার জালে আস্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। নিজের মুখ নিঃসৃত লালারসে বিজারিত করে কখন যে আমাদের সকলকে আমি থেকে আমরা করে দেয় টেরই পাওয়া যায় না।

 

যাই হোক বিদায়ী মুহুর্তটা কেটে যাওয়ার পরে সারাদিন অফিসের কর্তব্য সামলে সন্ধে বেলা যখন বাড়ি ফিরি দেখি আমার বাড়ির সব আসবাব, সকল সামগ্রী সেই মানুষ দুটির জন্য যেন নীরবে প্রতীক্ষা করছে। যে দুটো মানুষের হাঁকডাকে আমার স্বাধীনতা নিত্য বিপন্ন আজ এই শূন্য ঘরে তাদেরই গলার স্বর শুনতে মন হয়ে ওঠে উচাটন। পরিপাটি করে ভাঁজ করে রাখা জামা প্যান্টে, সেলফে গুছিয়ে রাখা চায়ের কাপে সর্বত্র খুঁজে পাই আমার স্ত্রীয়ের ছোঁয়া। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা পুতুল আর খেলনা গাড়িগুলোকে দেখলে সেই ছোট্ট দুরন্ত মানুষটার কচি আঙ্গুলগুলোকে ছুঁয়ে দেখার লোভে আমার আঙ্গুলগুলো ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শাস্ত্রে বলে “ত্রিয়া চরিত্রম দেবা ন জানতি” অর্থাৎ মেয়েদের বোঝা  দেবতাদেরও অসাধ্য।  কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হল পুরুষের মন জানাও বোধ হয় দেবতাদের অসাধ্য – শুধু দেবতাদের কেন নিজের পক্ষেও নিজের মন জানা মোটেই অনায়াসসাধ্য নয় এই উপলব্ধি আমার শিরায় উপশিরায় এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল।