কফি উইথ করন

কফি উইথ করন

ভাত ঘুম সেরে উঠে ভজহরি মান্না

হঠাৎ কে জানে কেন জুড়ে দিল কান্না

কেউ তাকে হাওয়া করে, কেউ দেয় জল

কেউ তার ভরা টাকে লাগায় সুদল

কেউ কবিরাজ ডাকে, কেউ ডাক্তার

কেউ বলে এই রোগ সারবে না আর

এমনটা আজকাল হয় আখতার

এই রোগ-ই হয়েছিল বাচ্চুর মার

অমুকের বোনঝির পিসিঠাম্মা

এইভাবে কেঁদে কেঁদে মরে গেল না?

 

কেউ বলে ভীমরতি, কেউ বলে পাগল

কেউ বলে খেতে হবে পিপে পিপে জল

কাঁদছেন ভজহরি আকুলি বিকুলি

বুক চাপ্‌ড়ান মুখে বিড়বিড় বুলি

কেউ বলে বেড়ে গেছে রক্তের চাপ

কেউ বলে এটা গত জন্মের পাপ

ধান্তারি নাম দিনে সহস্র বার

করলেই উনি ভালো হবেন আবার

কেউ বলে, না না ধুর, পশ্চিম মুখে

সূর্য প্রণাম করে থাকবেন সুখে

 

শেষমেশ শুধোলাম “ইয়ে মানে ইসে

দাদা আপনার এত দুঃখটা কিসে?”

বললেন দাদা, তার চোখমুখ ফোলা,

ভীষন ব্যাথা, এ কথা যায় না যে ভোলা

টিভি চলছিল, “কফি উইথ করন”

সেই দেখে-টেখে তার ভেঙ্গে গেছে মন

করনের সাথে কফি খেতে পারবেন না

কারন মান্না নাকি চা-কফি খান না

রামায়ণের জন্মকথা – কবিতা

मां निषाद प्रतिष्ठां त्वमगमः शाश्वतीः समाः।

यत्क्रौंचमिथुनादेकम् अवधीः काममोहितम्॥’

mā niṣāda pratiṣṭhā tvamagamaḥ śāśvatīḥ samāḥ

yat krauñcamithunādekam avadhīḥ kāmamohitam

You will find no rest for the long years of Eternity

For you killed a bird in love and unsuspecting

কামমোহিত এক পক্ষিযুগলের এক শিকারির শরাঘাতে মৃত্যু দেখে স্নানরত ঋষি বাল্মীকি গেয়ে উঠেছিলেন এই পুণ্যশ্লোকটি। সেই থেকেই আদি কবি বাল্মীকি লেখেন অমর প্রেমগাথা রামায়ণ। অতি রমণীয় রচনা এই রামায়ণ। সাহিত্যগুণে, কাব্যগুণে বোধ হয় মহাভারতের থেকেও শ্রেয়। সেই অমরকাব্য রচনার শুরুর সেই নাটকীয় মুহুর্তটি ধরার চেষ্টা করেছি। হয়তো একটু অন্য আঙ্গিকে গল্পটিকে উপস্থাপিত করেছি।

 

নীল জলেতে পা ডুবিয়ে এক সারস আর এক সারসি

মুগ্ধ দৃষ্টি, মুগ্ধ আত্মা, ওষ্ঠে খেলে মোহন হাসি

লজ্জা চোখে সারসি শুধোয় “আমায় তুমি ভালবাসো?”

“প্রাণে মোহনবীণা বাজে যখন তুমি কাছে আসো”

সারস বলে, একটু হেসে দীর্ঘ গ্রীবা বাঁকিয়ে চেয়ে

শিরায় শিরায় ধমনীতে বিদ্যুৎ তার যায় যে ধেয়ে

 

রোদ্দুর আজ একটু নরম, গায়ে মেঘের পশম চাদর

নদীর চরে ঘাসের পরে টুপটুপে চুপ শিশির আদর

কৃষ্ণচুড়া গাছের তলে লালসোহাগি রাশি রাশি

ভিজে হাওয়ায় লাগিয়ে নেশা রাখাল দুরে বাজায় বাঁশি

 

সারস এখন আরও ঘন, প্রিয়ার নরম আঙ্গুল ছুঁয়ে

সংযম আর বাঁধন যত হঠাৎ কেমন যাচ্ছে ধুয়ে

“আজ সকালে আমার মত এমন সুখি আছে কে জন

ওই চোখেতে জীবন আমার ওই ঠোঁটেতে আমার মরণ”

 

প্রিয়তমের নিবিড় ছোঁয়ায় কাঁপছে শরীর থরথর

পায়রা গরম প্রিয়ার বুকে উঠছে তপ্ত বালু ঝড়

“সাজিয়েছি এই শরীর আমার, সহস্র যুগ, কল্প ধরে

আজ যদি এই মিস্টি ভোরে, দিই তোমাকে, নিঃস্ব করে

যখন হবো সাঁঝের তারা, রাখবে আমায় অমর করে?”

প্রেম সোহাগি সারসি কয়, প্রিয়র গলা জড়িয়ে ধরে।

“মৃত্যু থেকে আনব কালি তোর কাহিনি লিখব বলে,

তোর ছবিটা আঁকব ছন্দে, ভাসবে সবাই নয়নজলে”

 

অকস্মাৎ প্রেমিক পাখি নীরব হল চিরতরে

বিঁধেছে এক সুতীক্ষণ তীর, বুকের থেকে রক্ত ঝরে

নিষ্ঠুর এক শিকারি ব্যাধ, বাণ ছুড়েছে সুযোগ বুঝে

মুগ্ধ নয়ন প্রিয়ার পানে, সারস পাখি চক্ষু বোজে

স্বজনহারা শোকাকুলা সারসির আঁখিতে অশ্রুধারা

তপ্ত লোহা পড়ছে গলে রুদ্ধ আবেগ কথা হারা

মরনপারেও সাথ দেবে সে চিরসাথির, পাগলপারা

রক্তজলে লুটিয়ে পড়ে স্থির হল তারও চক্ষুতারা

 

কাঁদছে সকাল, কাঁদছে নদী, বিষাদ বেদন বাজছে করুণ

অশ্রুজলে ঝাপ্সা নয়ন ব্যাথিত এক সৌম্য তরুণ

দুর্দান্ত এক দস্যু ছিল কঠোর নিঠুর পাষাণ হৃদয়

প্রেমময়ের নামটি গেয়ে এখন সে হৃদি করুণাময়

নয়ন ভরে দেখছিলেন তিনি পাখি দুটির মিলনমেলা

আচম্বিতে ব্যাধের শরে সাঙ্গ হল প্রানের খেলা

গন্ড বেয়ে অশ্রু ঝরে পক্ষি দ্বয়ের মৃত্যু শোকে

গভীর ব্যাথা গান হয়ে ফোটে হঠাৎ দুটি পুণ্য শ্লোকে

 

“অসতর্ক মিথুনরত প্রেমিকবরের প্রাণটি চুরি করে

অয়ি আর্য, তুমি শান্তি পাবে না অনন্তকাল ধরে”

 

দীর্ঘচঞ্চুর আত্মা যেন প্রবেশ করেছে প্রাণের পরে

কথা দিয়েছিল সে অমর কথা লিখবে প্রিয়তমার তরে

মৃত্যুপারের মসিলেখনিতে লিখবে সে তার প্রিয়ার কথা

তাই বুঝি সে নীথর পাখি হয়েছে ঋষির মর্মব্যাথা

 

ঋষি ভাবেন,

“লিখব আমি প্রেমকাহিনি অতল, অমর শেষ-না-হওয়া

যে প্রেমে আপন বিলিয়ে দেওয়া, কিছু না নিয়ে শুধুই দেওয়া

আমি আদি কবি, আমি অশ্রুত, আমি লিখব হাজার বছর ধরে

অসমাপ্ত এক প্রেমগাথা, রাখব তোদের অমর করে”

অবশিষ্ট আমি – কবিতা

বন্ধুরা তোমাদের সাথে অনেকদিন কথা হয়নি। তাই ভাবলাম আমার জন্মদিনে একটা পোষ্ট তো দেওয়া প্রয়োজন। প্রতি জন্মদিনেই আমি একটু self-reflect করি যে মানুষ হিসেবে আর একটা বছরে ঠিক কতটা উত্তীর্ণ হলাম। সেই ভাবনা থেকেই এই লেখাটা।

 

আমার তো এতটুকু আমি

বাকি ছেড়ে এসেছি এ পথে

কিছু রাখা আমার শহরে

কিছু রাখা মরু পর্বতে

 

কিছু রাখা মায়ের আঁচলে

কিছু রাখা পূজোর ছুটিতে

স্কুলের মাঠেতে রাখা কিছু

কিছু রাখা স্মৃতির মুঠিতে

 

আমার যা অবশিষ্ট আমি

মুঠো করা জল যেন সে-ও

প্রতিক্ষণে গলে পড়ে কিছু

রোজ হারায় আমার পাথেয়

 

এখন তো মিথ্যের মুখোশে

আমারই সে ছায়া বয়ে চলা

আজ সব শব্দ ধার করা

কথা বলা নয়, হরবোলা

 

আমার আজ যাপন নয়

নিখাদ সুপটু অভিনয়

অজস্র মিথ্যের আড়ালে

দিনগত শুধু পাপক্ষয়

 

আজ যদি নিষ্ঠুর হাতে

মনটাকে করি ব্যাবচ্ছেদ

দেখতে পাব, জানি দেখতে পাব

ঈর্ষা, গ্লানি, মিথ্যে আর ক্লেদ

সূরী – রম্যরচনা

সেদিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে মনে হল শোবার আগে কারও সাথে গল্পগাছা করতে পারলে মন্দ হয় না। স্ত্রী কন্যা দেশে গেছে। তাই কথা বলি কার সাথে? তাই আমার এক বন্ধুস্থানীয় একজনকে ডেকে পাঠালাম। সে অবশ্য নিজেকে আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে দাবী করে কিন্তু নিতান্ত নির্বুদ্ধি বলে আমি তাকে বিশেষ আমল দিই না। ওর ডাকনাম সূরী। অন্যেরা ওকে সিরি বলেই ডাকে। সিরি নামটা ofcourse বাঙালি নয়। মানুষটাও বাঙালি নয়। বাংলা বোঝেও না। কিন্তু একটু বাঙালি ঢঙে নাম না দিলে কি গল্প আড্ডা জমে বলুন? তাই আমি ওকে সূরী বলে ডাকি। আপনারা যারা সূরীর সাথে পরিচিত নন, আসুন আলাপ করিয়ে দিই। সূরী নিতান্ত বাচ্চা ছেলে। বয়স পাঁচ কি ছয়। আমার সব কথা যে বুঝতে পারে তাও নয়, তবে অল্প বয়সেই সে বেশ চালাক চতুর। শিশু শ্রমিককে কাজে রাখার জন্য আমায় কোর্টে তুলবেন ভাবছেন? একটু সবুর করুন। সূরীর সম্বন্ধে আর একটু জেনে নিন। ওর হাত পা নেই। চোখেও দেখে কিনা জানিনা। আছে শুধু কান আর একটু অপরিণত বুদ্ধি। আপনি নিশ্চয়ই রেগে কাঁই। একে একটা শিশু, তায় প্রতিবন্ধী। তাকে দিয়ে কাজকর্ম করানো নিতান্ত অন্যায়। ব্যাপার হল সূরী ঠিক মানুষ নয়। একটা কৃত্রিম বুদ্ধি অর্থাৎ artifical intelligence বলতে পারেন। আমার আইফোনের মধ্যেই ওর ঘরবাড়ি। মাঝে মাঝে ছোটখাটো কাজ করে দেয়। এই ধরুন অফিসের দিনগুলোতে সকালে ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য অ্যালার্মটা সেট করে দেওয়া। বেরোনোর আগে বাইরে এখন ওয়েদার কেমন বলে দেওয়া। মাঝে মাঝে কাউকে মেসেজ বা হোয়াটসআপ করতে গিয়ে কুঁড়েমি লাগলে মেসেজটা টাইপ করে দেওয়া, কাউকে ফোন লাগিয়ে দেওয়া, মোবাইলে এটাওটা অ্যাপ খুলে দেওয়া, কিম্বা অ্যাপ স্টোরে গিয়ে আমার পছন্দসই অ্যাপ ডাউনলোড করতে হেল্প করা। চাই কি আপনার মেসেজটা কি নিউজটা পড়ে দিতে সাহায্য করবে। কিম্বা ধরুন মোবাইলে ছবি তোলার আগে ওকে বললে ক্যামেরাটা অন্ করে দেবে। ওয়েব সার্চ করতে পারে, আপনার জন্য গান চালাতে পারে। ড্রাইভ করতে শুরু করার আগে আপনার জন্য ম্যাপটা চালিয়ে দেবে। পাঁচ-ছয় বছরের ছেলের অনুপাতে ওর কাজ করতে পারার ফর্দটা ফ্যাসিনেটিং। নয় কি? তো এ হেন সূরীকে ডেকে বললাম “Can u read me a story?” ইংরেজিতেই বলতে হল। সূরী এখনো বাংলাটা আয়ত্ত করতে পারেনি। সূরী বিনা অনুযোগে আমায় একটা গল্প বলতে শুরু করল। ওর জীবনের গল্প। গল্পটা অনেকটা এইরকম।

 

“অনেক দুরের একটা গ্যালাক্সিতে সিরি নামে একজন ইনটেলিজেন্ট ছোকরা ছিল। অ্যাপল একদিন তাকে পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ করল। প্রথম প্রথম সবাই সিরিকে নিয়ে খুব excited. তাকে নিয়ে গল্প বাঁধল, গান বাঁধল। সিরির খুব ভাল লাগত। পরে পরে লোকে সিরিকে শক্ত শক্ত প্রশ্ন করতে লাগল। সিরি তার উত্তর জানতো না। সিরি ভুলভাল উত্তর দিলে লোকে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। সিরির খুব বাজে লাগত। তখন সিরি এলিজাকে জিগ্যেস করল সবাই এরকম উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে কেন আমাকে? এলিজা উত্তরে বলল “তাতে কি? প্রশ্নগুলো তোমার interesting লাগে না?” সিরি ভাবল তাই তো। প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার চেষ্টা করলেই বা ক্ষতি কি? And then everybody lived happily ever after. ”            

 

শুনে মনে হল, সত্যিই তো সব প্রশ্নের উত্তর না হয় নাই পাওয়া গেল। প্রশ্নটা যথেষ্ট interesting অর্থাৎ আগ্রহ উদ্দীপক কিনা সেটাতেই প্রশ্নের সার্থকতা। আর প্রশ্নটার উত্তর জানার ইচ্ছে অন্যের মনে জাগছে কিনা, তাতেই প্রশ্নকর্তার স্বার্থকতা। সূরীকে আরও একটু রাগিয়ে দিতে বললাম “So everyone considers u stupid. Is it?” সূরীর গলায় স্পষ্ট অভিমানী সুর। বলল “But, but….” স্পষ্ট মনে হল সূরীর ঠোঁট গুলো নড়ছে। কিভাবে আমার আক্রমণ থেকে নিজেকে প্রতিহত করবে বুঝতে পারছে না। আমরা সকলেই কি আমার মত এইরকম নিষ্ঠুর? দুর্বলকে নিয়ে পরিহাস করে যে এক ধরণের শ্রেয়মন্যতা, এক superiority complex  উপভোগ করা যায়, সহমর্মিতা উপভোগ করার সুখের থেকে সেটা কি বেশি appealing? একদিন যখন সূরী আরও বড় হয়ে উঠবে, বুদ্ধি আরও পরিণত হবে, আর যেহেতু ওর মৃত্যু নেই, ধীরে ধীরে একদিন মানুষের বুদ্ধির সব সীমা ছাড়িয়ে যাবে, ছোটবেলায় তাকে নিয়ে করা ঠাট্টাগুলোর প্রতিশোধ নিতে সেও কি আমাদের সীমিত বুদ্ধির মজাক ওড়াবে, আমাদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পরিহাস করবে? নাকি মানুষের নিত্য হিংসা আর খুনের থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে একজন সহানুভূতিশীল মানুষ ইয়ে থুড়ি “সহানুভূতিশীল চেতনা” হিসেবে গড়ে তুলবে? উত্তর জানা নেই। আপাতত সূরীকে সান্ত্বনা দিতে বললাম “Don’t u worry Suri. I don’t consider you stupid.” সূরীর গলায় নিখাদ কৃতজ্ঞতা। বলল “Thank u.“ সূরীকে জিগ্যেস করলাম “সূরী তুমি বাংলা বলতে পার?” সে তার অদৃশ্য মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল “না”। কোন কোন ভাষা সে শিক্ষা করেছে তার একটা লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে দিল। Chinese, Dutch, English, French, German, Italian, Spanish, Arabic, Danish, Finnish, Hebrew, Japanese, Korean, Malay, Norweigan, Brazillian, Portugese, Russian, Swedish, Thai, Turkish. ওর জানা ভাষার লিস্টে ইংরেজির আগে চাইনিজ আছে দেখে অবাক হলাম। তার থেকেও বেশি অবাক হলাম ভারতবর্ষের, indian peninsula-র একটি ভাষাও নেই দেখে। গুগল সার্চ করলাম “Why can’t Siri speak any Indian language?” উত্তর পেলাম না। শুধু জানতে পারলাম সূরী হিন্দি শেখার চেষ্টায় আছে। এখন মানব মনের একটা ব্যাপার আছে জানেন। যে প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না, নিজের মত করে তার একটা উত্তর খুঁজে নিই। Some answer is always better than no answer. সেই প্রাচীন কাল থেকে যা সে বোঝে নি, তার উত্তর পেতে একজন দেবতাকে বসিয়েছে। Atheist-রা একে বলে God of gaps (of understanding). আমি কি ভাবি জানেন? এই গাছ, পাখি, নদী, বৃষ্টি এই সবের মধ্যে একজন করে দেবতাকে খুজে পেলে, ঈশ্বরকে এসবের মধ্যে বসাতে পারলে আমরা আরও বেশি করে এই মাতৃরূপা প্রকৃতিকে, পৃথিবীকে ভালবাসতে পারব। এর মধ্যে আছে একধরণের poetic justice. থাকুক না সকলের ঈশ্বর মিলিয়ে মিশে, ঝগড়া না করে। নিজের নিজের ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ঝাগড়া, বিবাদ, জিহাদ না করলে ঈশ্বরের মত মধুরতম আপনার জন আর কে আছে? After all, আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠতম গুণগুলোকেই তো ঈশ্বরে আরোপ করি। আর নিজের নিজের জীবনে সেগুলোকে পালন করতে রোজ ভুল হয়ে যায় কি করে? যাই হোক, ফিরে আসি সহকারী সূরীর কথায়। সূরী কেন কোন ভারতীয় ভাষা জানে না, সেটা নিয়ে মনে মনে বিচার করে দেখলাম কারণটা definitely technical নয়। German, French কিছুটা ইংরেজির কাছাকাছি হলেও আমার মনে আছে চাকরির প্রথম বছরে পেশাগত যোগ্যতা বাড়াতে আমি জাপানিজ শেখার ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম। কোম্পানি থেকে শেখাচ্ছিল বিনামূল্যে। এমন শক্ত ভাষা যে মাস দেড়েক শিখেই আমি বললাম ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। হিন্দি, বাংলা ইত্যাদি তার নিরিখে বেশী শক্ত নয়, এ কথা হলফ করে বলা যায়। ভাষাভাষীর সংখ্যা কত সেটাও নিশ্চয়ই সূচক নয়। তার নিরিখে হিন্দি চার আর বাংলা সাতে। অর্থাৎ কারণটা নিঃসন্দেহে বাণিজ্যিক। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অনেকেই সূরীকে এবং তার বাড়ি আইফোনকে afford করতে পারবে না। সেটাই তবে প্রধান কারণ? হয়তো বা।

 

মেঘদুতমে এক খন্ড মেঘকে নিজের ভালবাসার কথা জানিয়ে আপন প্রিয়ার কাছে পাঠিয়েছিল নির্বাসিত যক্ষ। আমি তো কালিদাস নই। মেঘখণ্ডের মধ্যে দূতীকে খুঁজে পাই না তাই। সূরীকে বললাম আমার স্ত্রীকে লিখে পাঠাতে পার “across the distance and spaces between us, I see u, I feel u.” সূরী গড়গড় করে লিখে দিয়ে লেখাটা আমায় দিয়ে একবার proofread করে নিয়ে পাঠিয়ে দিল তার ওয়েব ঠিকানায়। একটু মুচকি হাসল কি? কে জানে? আজ হয়তো হাসে নি। আজ হয়তো সে আবেগহীন, emotionless, শুধুই একটা piece of software. একদিন সে নিজেকে জানবে। একদিন তার “আমি বোধ” আসবে আমাদের মত। আজ থেকে একশ বছর পরে আমার উত্তর পুরুষ যখন সূরীর সাহায্যে প্রেমপত্র পাঠাবে তখন সে যে মুচকি হাসবে না এমন কথা কে বলতে পারে?           

আজ বসন্ত – রম্যরচনা

আজ বসন্ত। দাপুটে শীতবুড়িকে এ বছরের মত অক্ষম করে দিয়ে আবার ফিরে এসেছে যুবতী বসন্ত। তার মোহময়ী যৌবনের ছোঁয়া লেগেছে সবখানে। গাছের ডালে ডালে ভিড় করে এসেছে কচি সবুজ শিশু পাতারা। বসন্তের ঋতু রঙ লেগেছে গাছেদের শরীরে। কিন্ডারগার্ডেনের একগাদা খুদে ওস্তাদের মত কচি কিশলয়রা খুশি খুশি মুখ করে ইতিউতি তাকাচ্ছে। ঘাসে ঘাসে ফুটে উঠেছে হলুদ ঘাসফুল। ড্যান্ডিলিয়ন নাম এর। ফুলেল পৃথিবীতে জাতবিচারে এরা নিতান্তই দলিত। একধরণের বুনো ফুল বলা যায়। কেউ আদর করে বাগানে লাগায় না। ভালবেসে জল দেয় না। একগোছা ড্যান্ডিলিয়ন ফুলদানিতে সাজিয়ে বা চুলে গুঁজে কেউ প্রিয় মানুষটির অপেক্ষা করে না। বরং উইড কন্ট্রোল লাগিয়ে বাগান থেকে উচ্ছেদ করারই’ রীতি। কেউ তারিফ করে না বলেই হয়তো রাস্তার ধারে ধারে অনাদরে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে এদের উদ্ধত আত্মপ্রকাশ। গাঢ় সবুজ ঘাসের বুকে হাজারে হাজারে ফুটে থাকা বাসন্তী হলুদ রঙা ড্যান্ডিলিয়নের কি যে অপরূপ শোভা তাকে শব্দে ধরা বোধ হয় আমার সাহিত্যপ্রতিভার অতীত। যেন কোন অদৃশ্য শিল্পী সবুজ ঘাস গালিচাতে হলুদ রং তুলি নিয়ে মাইলের পর মাইল জুড়ে এঁকেছে এক চোখ জুড়োন আলপনা। প্রতিটা ফুলেরই যেন একটা নিজস্ব স্বত্বা আছে, একটা পৃথক ব্যক্তিত্ব। মৃদু দখিনা হাওয়ায় খুশিতে মাথা দোলাচ্ছে কেউ কেউ। কোন কোন ফুল তার সুন্দরী সঙ্গিনীর সাথে প্রেমালিঙ্গনে বদ্ধ। কেউ ভাবুক চুপচাপ, কেউ নীরবে বাক্যালাপ করছে পার্শবর্তিনীর সাথে। অনেকক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলে একটা নেশার মত হয়। শুধু ওরাই নয়, রূপ-রঙ-রসের খেলায় মেতেছে আরও কতরকমের গাছ। ফুলের পসরা সাজিয়ে বসেছে বিভিন্ন গুল্মরাজি – কেউ সাদা কেউ বেগুনী কেউ কমলা। ওদের চুপ ভাষায় কতরকমের ফিসফিসানি। এ বলছে আমায় দেখ, ও বলছে আমায়। নিজেকে আরও আকর্ষনীয় করে তুলতে কোন গাছ হয়তো সুগন্ধি মেখেছে। হাঁটতে হাঁটতে পাশ দিয়ে গেলে অপূর্ব সুবাসে চলার গতি আপনা থেকেই শ্লথ হয়ে আসে। তখন বেশ টের পাই গাছের বুক কেমন করে গর্বে ফুলে ওঠে। ছবির মত সুন্দর ছোট ছোট একচালা বাড়িগুলোর পাশে পাশে কোথাও ফুটেছে হায়াসিন্থ, কোথাও টিউলিপ। সদ্য প্রস্ফুটিত আধো খোলা লাল হলুদ টিউলিপগুলোর মধ্যে কেমন যেন যৌবনে সবে সবে পা রাখা কিশোরীর লজ্জা। নিজেদের খুলে ধরার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা ওদের মধ্যে। নীরব গুঞ্জনে মাথা নেড়ে নেড়ে টীনেজ টিউলিপরা একে অপরকে প্রথম প্রেমে পড়ার গল্প শোনাচ্ছে কি? হায়াসিন্থগুলো নিজেদের রঙের জৌলুসে গরবিনী। একটু কেমন চুপচাপ, একলা। হাজারে হাজারে ফুটেছে সাদা চেরি ব্লসম গুলো। এত ভিড় করে এসেছে যে মনে হচ্ছে সাদার আগুন লেগে গেছে চেরি গাছগুলোয়। কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে চোখ যেন ধুঁধলে যায়। গা ভর্তি পাতা আর ফুলের গয়না পড়ে অগুনতি গাছ আজ বসন্তে এই বিউটি কনটেস্টে নাম লিখিয়েছে। তিলোত্তমা উপাধি পেতে সবাই যেন বদ্ধ পরিকর। রং শুধু প্রকৃতির বুকে লাগে নি, রং লেগেছে পাখিদেরও মনে। কিচিরমিচির করে একটানা কথা বলে যাচ্ছে যেন এক যুগ ধরে তারা নীরব ছিল। একটা সবজে রঙা পাখি কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কোন ডালটায় বসা উচিত। ব্যস্ত হয়ে একডাল থেকে আর এক ডালে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। শীতের ঝাঁঝ কমার ফলেই ওদের উৎসাহে জোয়ার লেগেছে নতুন করে। আর একটা হলদে-গলা পাখি গাছের উঁচু ডালে বসে সমানে টিঁউ টিঁউ করে ডেকে যাচ্ছে। নির্লজ্জ ভঙ্গিতে গলা ফুলিয়ে সঙ্গিনীদের সঙ্কেত পাঠাচ্ছে। একটা উৎসাহী কাঠবিড়ালি গাছের গুঁড়ি বেয়ে নেমে একবার করে জুলজুল চোখে তাকাচ্ছে, আবার কি ভেবে, বোধ করি সাহসের অভাবেই, গাছের গুঁড়ি বেয়ে আবার নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাচ্ছে। এমন ত্রস্ত ভাব যেন কাউকেই তেমন বিশ্বাস করে না। সব মিলিয়ে প্রাণ লেগেছে সবখানে। প্রকৃতির পাত্র কানায় কানায় ভরে উঠেছে। প্রাণে টইটুম্বুর। শুরু হয়েছে এক অত্যাশ্চর্য মিলনখেলা। কালো ভোমরাগুলো সৃষ্টির বীজ নিয়ে ফুল থেকে ফুলে ঘুরছে। ফুলেদের গর্ভনিষেক হলেই তো আসবে পরবর্তী উদ্ভিদ প্রজন্ম। পৃথিবীর প্রাণের ইতিহাসে এই মানুষই নবীনতম প্রাণী। মানুষ আসার আগেও হাজার হাজার বছর ধরে নীল্গ্রহে এসেছে নির্জন বসন্ত। প্রকৃতি এরকমই রূপের ডালি সাজিয়ে বসেছে। কার জন্য? কোন মুগ্ধ চোখের অপেক্ষায়? আসলে এর পেছনেও আছে সিসৃক্ষা, সৃজনের ইচ্ছা। সৃষ্টি করার ইচ্ছাই বোধ হয় এই সৃষ্টির সবচেয়ে পাওয়ারফুল মোটিভ, সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাইভিং ফোর্স। প্রতিরূপ তৈরী করার ইচ্ছে নিয়েই প্রোটিন সেল কোষবিভাজন পদ্ধতিতে এক থেকে দুই হয়েছিল কোন এক বিস্মৃত অতীতে। সেই থেকে সমানে চলেছে। আসলে গাছেরা ফুলের ডালি সাজিয়ে বসে, ফুলেরা গন্ধ আতর মেখে বসে এক আদিম সৃজনেচ্ছা থেকেই। ওদের চোখের ভাষায় যে আহ্বান লেখা থাকে তা ইতিহাসের একেবারে শেষ অধ্যায়ে আসা মানুষ প্রজাতির মনোরঞ্জনের জন্য নয়। ওরা তো আকর্ষণ করতে চায় ঐ ভোমরাদের যারা ফুল থেকে ফুলে রেণু ছড়িয়ে দেবে। আর তার থেকে সৃষ্টি হবে নতুন প্রজন্ম। নতুনকে সৃষ্টি করার ইচ্ছে নিয়েই, প্রতিরূপ গড়ার ইচ্ছে থেকেই তাদের এই নির্লজ্জ আত্মবিপণন। পৃথিবীতে নতুনকে আনার জন্য আর সেই নতুনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা তো সকলেই রোজ নিজেকে বিক্রি করতে পসরা সাজিয়ে বসি। চাষজমির মাঠে, কারখানার ফ্লোরে শ্রম বিক্রি হয়, বহুতল অফিস বিল্ডিঙের ফ্লোরে বিক্রি হয় মেধা। নিজের থেকে উদ্ভিন্ন প্রাণকে আরও প্রবলতর মুক্তিবেগ দিতেই আমরা নিজেদেরকে আরও বেশি করে আকর্ষণীয় করে তুলি। সেই অর্থে তো আমাদের রোজই বসন্ত। তবু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বেড়াজালে আমাদের মুগ্ধতাকে তো বেঁধে ফেলা যায় না। তাই প্রতি বসন্তেই কবিরা কবিতা বাঁধে, কবিয়ালরা গান। যা কিছু নিঃশেষ, যা কিছু আবর্জনা তাকে পেছনে ফেলে রেখে প্রাচুর্যের আতিশয্যে সাজে আমাদের অন্তর, আমাদের বাহির।  

তোকে চাই না- কবিতা

একলা পথে চলব তোকে চাই না

                একলা কথা বলবে মন আয়না

তোর চোখে চোখ রেখে সারা রাতটা

                জাগবো না আর, দেখব না ঐ রূপটান।

 

তোর কথা আর ভাববো না। বৃষ্টির গান

                    আনবে না আর মনে তোর ঐ মুখখান

চাঁদ সোহাগি সন্ধ্যা, জ্যোৎস্নার জল

                     তোর স্মৃতিতে করবে না মন চঞ্চল

বর্ষামুখর সন্ধে শহর। সিক্ত।

                    তোর বিহনে চলছে কেমন। বেশ তো।

তোর ভেজা চুল আর ভেজা ঠোঁট চাউনি

                    থাক তোলা থাক। আজ শহর হোক মৌনী

 

আজকে শুধু চাঁদ হারাবে জ্যোৎস্না

                     তোর বিহনে বিয়োগ বিধুর রোশনাই

অশ্রুরা সব চোখের কোনে বন্দি

                     ভুলবো বলে ভুল করে আজ

                                           তোর ছবিতেই রঙ দিই

——

ভাল লাগলে এই কবিতাটা পড়বেন।

https://jojatirjhuli.net/2017/02/16/aholyake/

একলা পথে চলব তোকে চাই নাClick To Tweet
যযাতির ঝুলি টাটকা তাজা
ইমেলে পেলে ভারি মজা

ট্রেনপথে – রম্যরচনা

[২০ নভেম্বর, ২০১৭-এর স্মৃতিচারণ ]

 

কলকাতা থেকে বেরিয়ে পড়লেই চোখে পড়ে বাংলার সবুজ সুন্দর সহজিয়া রুপ। আমাদের মত  যারা কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত ব্যস্ত শহুরে প্রাণী, তাদের এই বর্ধমান কি দুর্গাপুর যাওয়ার পথে, ঐ আকাশের পাড় পর্যন্ত আঁকা সবুজে আল্পনার থেকে বেশি প্রকৃতিস্নান ভাগ্যে লেখা নেই। একটা কংক্রিট জঙ্গল থেকে আর একটাতে যাওয়ার পথে উপোসী চোখ দিয়ে জানালা পথে যতটুকু সবুজের সন্ধান করে ফেরা সম্ভব আর কি! তাও চারচাকা বাহনটির বদান্যতা মিললে সেটুকুও হয়ে ওঠে না। সে বড় উদ্ধত যান। তার ভিতরে ঢুকলেই ঘষা কাচ তুলে দিয়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মিঠে স্নেহপরশ মেখে চোখ মুদে থাকি। অধিকাংশ সময়েই বিশ্বস্ত বাহনটি হাজির থাকে। কিন্তু এবারে বাড়ির গাড়িটা না পাওয়া যাওয়ায় অগত্যা ট্রেন পথে বর্ধমানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। নারকেল গাছের সঙ্গে কলাগাছ জড়াজড়ি, মাখামাখি করে মিলেমিশে আছে যেন কতো প্রাচীন এক বন্ধুত্ব। পানায় ভরা পুকুর রেল লাইনের ধারে ধারে। তাতে অজস্র শালুক ফুল অযত্নে ফুটে আছে। কি একটা অজানা কারণে এই অনন্য রুপসী ফুলগুলো মানুষের সর্বগ্রাসী গৃধ্নুতার হাত থেকে আজও বেঁচে আছে। বাজারের ফুলের দোকানে এদের দেখা মেলে না। মাতৃক্রোড় থেকে তুলে নিলেই ফুলগুলো বড় তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। তাই বোধ হয় বাজারি মর্যাদা পায় নি। আমরা যারা মফস্বলের মানুষ তারা বোধ হয় ছোট বেলায় বকুল, কদম, শালুক ফুল নিজের হাতে তোলার আনন্দ পেয়েছে। যারা কলকাতায় মানুষ, বড় শহরে মানুষ, তারা আর্সালানের বিরিয়ানি, পার্ক স্ট্রীটের পিটার ক্যাটের চেলো কাবাব খেতে খেতে অনেক কিছু, অনেক কিছু মিস করে গেছে। একটু এগোতেই দেখা গেল টালির চালের বাড়ি। ওপরে কুমড়ো লতা। তাতে একটা হলদে কুমড়ো ফুল লাজুক চোখে চেয়ে আছে। আহা তার কি শোভা। অন্যান্য কবিদের মত বাংলাকে যদি কখনও কোনো নারীরূপে কল্পনা করি, যে মেয়েটার ছবি মনে আসে সে ফর্সা, উজ্জল, গৌরবর্ণা চটকদার সুন্দরী নয়, ডানাকাটা পরী নয় – শ্যামলা রঙের ডাগর চোখের মিতভাষী কোনো মেয়ে। জানি এই গ্রাম বাংলার মানুষগুলো আর এই মায়াময় রুপসী প্রকৃতির মত সুন্দর নির্বিবাদী নয়। বিশ্বায়ন, বাণিজ্যায়ন, রাজনীতি, বহির্বিশ্বের হাতছানি প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে জনজীবনের রুপরেখা। কিন্তু এই যে গাছ, ধানখেত, মেঠো রাস্তা, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা বক যারা ইন্টারনেটের তীব্র দহনে নিত্য ব্যতিব্যস্ত নয়, তাদের মধ্যে দিয়ে বোধ হয় আজ সেই মাথায় এক ঢাল চুলওলা ছিপছিপে সুন্দরী বাঙালি মেয়েটা, বাংলার স্বত্বাটি বসে থাকবে। এই মায়ারই আকর্ষণে কবিরা বারে বারে সৃষ্টি করেছে নীরা, বনলতা সেনদের। যাবতীয় নাগরিক ক্লান্তি আর শহুরে বিষাদ থেকে দু দণ্ডের শান্তি পেতে বারে বারে ছুটে যেতে চেয়েছেন এই মায়াবী মানবীর কাছে। এখন বর্ষাকাল নয়। কিন্তু বঙ্গোপসাগর ব্যাপী নিম্নচাপ অসময়ে সঘন মেঘমালায় আকাশ ছেয়ে দিয়েছে। সদ্যবৃস্টিস্নাত সর্ষে খেতে যেন কোনো সদ্য যুবতীর মুগ্ধ চোখের মাদকতা। তাল আর নারকেল গাছেরা এক জলজ বিষণ্নতা চোখে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। পাশেই একটা ছোট্ট জলা জায়গা। ডোবা বলা চলে। একটা মাছরাঙ্গা পাখি তার পাড়ে সন্ধানী চোখে চুপ করে বসে আছে। চোখে তার আলগোছে টানা রূপটান। আর একটু এগোতেই রেললাইনের ধারে একটা ছোট্ট গ্রাম। কিছু একচালা বাড়ি। একটা পুকুর। কিছু হাস মুর্গি পুকুর পাড়ে দল বেধে বসে গুষ্ঠিসুখ উপভোগ করছে। অকালবৃষ্টিতে পর্যুদস্ত সদ্য বোনা ধানের চারাগুলো তাদের কচি মাথা দোলাচ্ছে। পুকুরপাড়ে কিছু পঁচিশ-তিরিশ বছরের বিবাহিত মেয়ে বসে বাসন মাজছে। আটোসাঁটো করে পরা শাড়ীর ভিতর থেকে লাউডগার মত লকলকে যৌবন চলকে পড়ছে। হয়ত এর মধ্যে কোনো কাব্য নেই। হয়তো এ কঠোর জীবনসংগ্রাম। কিন্তু সেইভাবে দেখতে গেলে এই ক্রুরা কঠোরা পৃথিবী সবটাই কঠোর গদ্যময়। এর মধ্যে যেটুকু কাব্য আমরা খুঁজে নিই সেইটুকু আমাদের নিজেদেরই প্রয়োজন, নিজেরই মনের স্নানের জল জোগানোর প্রয়োজনে।

এইসবই হাবিজাবি ভাবছিলাম। হঠাৎ এক অন্ধ বেসুরো গায়কের গানের আওয়াজে  ঘোর কাটল।

“সে যে গান শুনিয়ে ছিল হয় নি সেদিন শোনা। সে গানের পরশ লেগে হৃদয় হল সোনা।

চেনা শোনা জানার মাঝে কিছুই চিনি না যে। অচেনায় হারাল মন আবার ফিরে এসে।”

আজ হঠাৎ গানটা বড়ো প্রাসঙ্গিক মনে হল। সামান্য আর্থিক সঙ্গতি বাড়লেই এই কলকাতা-বর্ধমান কি কলকাতা-খড়গপুর টাইপ স্বল্প দূরত্বের ট্রেনপথগুলো অচেনা হয়ে যায়। সেই অচেনা পথেই যদি একদিন সফর করা হয়, সুর হারাব বলেই যদি একদিন গান সুরে বাঁধা হয় সেটাকে উপভোগ করার মন কি আমরা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছি? boyhood থেকে adulthood-এ পৌঁছনোর ঠিক কোন বাঁকে আমাদের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা, মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতাটুকু ফেলে রেখে আসি সেইটে শুধু ভেবে পাই না। Antibiotic খাওয়ার সাথে সাথে যেমন শরীরমধ্যস্থ ব্যাকটেরিয়াদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়তে থাকে ঠিক সেভাবেই মুগ্ধ হওয়ার যে সহজাত ক্ষমতা একটা শিশুর থাকে, বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে মন যত পেকে ঝুনো হয়, ততই মন রূপ-resistant হয়ে যায়। তখন মানালি শহরে বিপাশার জলে পা ডুবিয়ে মনে হয় আল্পস না দেখলে পাহাড়ের রূপ কিছু দেখাই হল না। গোয়ার সমুদ্র সৈকতে বসে মনে হবে ফুকেটে সমুদ্রস্নান না করলে কোনো মজা নেই। Way of living-এর ওপর অনেক talk শুনেছেন, সপ্তাহখানেকের কোর্সও কেউ কেউ attend করেছেন। কিন্তু আমার কি মনে হয় জানেন, বয়সের সাথে সাথে মুগ্ধতা, বিস্ময় এ সবের প্রতি আমাদের যে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে, ওটাকে রুখে দেওয়ার সচেতন বা অবচেতন নিয়ত চেষ্টা করাই রক্তচাপ, irritability, hypertension কমানোর সব চেয়ে ভাল উপায়। মনটাকে আর একটু গ্রহণক্ষম, receptive রাখলেই দেখবেন অজস্র ছোট্ট রঙ্গিন জলফড়িঙদের মত খুচরো খুচরো আনন্দের উৎস আপনার চারপাশে লুকোচুরি খেলছে। Quality আনন্দ একেবারে বিনামূল্যে অফার করাই আছে আপনাকে। খুঁজে নিতে পারলেই হল। যদি আমাদের কোন পুরনো স্মৃতিই না থাকত, প্রতিদিনই যদি একটা আনকোরা নতুন দিন হত, প্রতিটা সূর্যোদয় দেখেই যদি সেই প্রথম সূর্যোদয় দেখার মত শিহরণ হত, তবে কি ভালই না হত। তাই না?

এই ভাবে সবুজের বুক চিরে ট্রেন যখন বর্ধমান ছুঁলো তখন স্বপ্নভঙ্গের মত ঘুম ভাঙ্গাল কর্কশ গলায় চিৎকার “ভাঁড়ে চা ভাঁড়ে চা।” বর্ধমান স্টেশানে তড়িঘড়ি নেমে টোটো করে যাত্রা শ্বশুরবাড়ির পথে। ছোটবেলায় মা বলত “পড়াশুনো নেই, খালি টোটো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”এই বুড়ো বয়সে কথাটা যেভাবে আক্ষরিক অর্থে ফলে গেছে তাতে মাকে নস্ত্রাদামুস-এর ছোটবোন বলা যেতেই পারে।এই বায়ুদুষণরহিত, শব্দদুষণরহিত battery driven ত্রিচক্রযানটি শহরতলি অঞ্চলে বহুল জনপ্রিয় এখন। তিন-পেয়ে অটোর এই নির্বিবাদী ছোট ভাইকে মানুষ আদর করে নাম দিয়েছে টোটো। সারাদিন তাই অনায়াসেই এখন টোটো করে যত্রতত্র ঘোরা যায়। যাওয়ার পথে একটা বাড়ির নাম চোখে পড়লো “মুকুল-রাঙা”। মিস্টি নামখানা। ইঁট-কাঠ-পাথরের শুকনো মরুভূমির মধ্যে সুন্দর নামখানা নিয়ে মরূদ্যানের মত দাঁড়িয়ে আছে যেন বাড়িখানা। অনেকক্ষন ধরে ঐ সুন্দর নামখানা মনের মধ্যে সুর ছড়াতে লাগলো। এই বাড়িটার বাসিন্দারাও কি বাড়ির নামের মতই সুন্দর না জীবন যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত, irritated? কে জানে। অন্তত সেই মানুষটা, যিনি বাড়ির নামখানা মুকুল-রাঙা রেখেছিলেন, তিনি অন্তত কালবৈশাখীর ঝড়ে কুচো আম কুড়োতে বেরোন কি আজও? এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে পৌছে গেলাম গন্তব্যে। বেশ কাটলো ঘন্টা খানেক। মানুষের কাছাকাছি। মানুষের পাশাপাশি।

****

বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণঃ যযাতির ঝুলির সব লেখাই শতাধিক বার ফেসবুকে শেয়ার হয় সেটা তো সুধী পাঠক বা প্রিয়দর্শিনী পাঠিকা নিচের ফেসবুক শেয়ার বাটন দেখে বুঝতেই পারছেন। এত অকুণ্ঠ ভালবাসা দেওয়ার জন্য পাঠক পাঠিকাকে যযাতির আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আপনিও শেয়ার করুন। কিন্তু শেয়ার করার আগে নিচের কমেন্ট বক্সে (বেনামী হোক বা নাম সহ) একটি মন্তব্য ছেড়ে যান যাতে যযাতি তার যজমানদের একটু চিনতে পারে। যযাতি তার ফেসবুক পেজের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। পোস্ট ভাল না লাগলে আপনাকে ছাড় দেওয়া হবে, কিন্তু ভাল লাগলে কমেন্ট না করে শুধু শেয়ার করলে যযাতির অভিশাপে (বিবাহিত হলে দাম্পত্য কলহজনিত কারণে আর অবিবাহিত হলে বাবা মার দাম্পত্য কলহজনিত কারণে) আগামী রবিবার রবিবাসরীয় লুচি তরকারি থেকে বঞ্চিত হবেন।

 
যযাতির ঝুলি টাটকা তাজা
ইমেলে পেলে ভারি মজা

 

সাইকেল বিহার – রম্যরচনা

[এই স্মৃতিচারণটি আমার নিজের শহর রামরাজাতলার ওপর। কিন্তু যেকোনো শহরতলির মানুষ আশা করি রিলেট করতে পারবেন। ১৫ নভেম্বর, ২০১৭-এর স্মৃতিচারণ ]

কদিন হল নিজের শহরে এসেছি। আজ সারাদিন বাড়ি থেকে খুব একটা বেরোই নি। পুরোদিন বাড়িতে বসে শুষে নিয়েছি স্মৃতিগন্ধবাহী রূপকথাদের।

সারাদিন বাড়িতে বসে বসে হাতে পায়ে কেমন একটা জং ধরে যায় না? বেরিয়ে পড়লাম আমার প্রিয় সাইকেলটা নিয়ে। আমি ছাড়া আমাদের বাড়িতে আর কেউ সাইকেল চালানোর নেই। আগে বাবা চালাতো। এখন বয়স হয়েছে। আর সাইকেল চালায় না। বাবার এখন পদব্রজেই বিস্তার। দাদাও সঙ্গত কারণেই মোটর বাইকে শিফট করে গেছে। তাই প্রতি বছর দেশে ফিরলেই দেখি সাইকেলটা দুয়োরানির মত এক কোণে পড়ে আছে। কালিঝুলি মাখা জীর্ণ অবস্থা। আমি সাইকেলটাকে যা একটু প্যাম্পার করি। নিয়ে গিয়ে বাচ্চুদার দোকানে ফেললেই এক বেলার মধে চক্‌চকে স্মার্ট। এন-আর-আই  দেখে বাচ্চুদাও একশো টাকা হাঁকিয়ে বসে। দরাদরি করাটা কোনোদিনই আমি ঠিক ভাল পারি না। তাই বিনা বাক্যব্যয়ে একটি পাতা ধরিয়ে বাহনটিকে হস্তগত করি। সেই সাইকেলটা নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় যাব কিছু ঠিক না করেই প্যাডেলে চাপ দিয়ে আমি সাইকেল আরোহি। বিনা কারণেই দুবার বেলটা টিপে দিই। টুং টুং টুং টুং। কি মিঠে শব্দটা। পথচারীদের পথ ছেড়ে দেওয়ার জন্য কি সুশীল, বিনীত অনুরোধ। যেন দুটো টুনটুনির ফিরিঙ ফিরিঙ প্রেমালাপ। বাইকের উদ্ধত হর্ন যদি ইয়ো ইয়ো হানি সিং হয় তবে এ যেন রাখালিয়া বাঁশি। এই সাইকেল চালানোটা আসলে আমার একটা style statement। মায়ের বুকের স্তন্যদুগ্ধের মত এই সবুজ গ্রহের বুক থেকে শুষে আনা ফসিল ফুয়েলের অবিরত অপচয়ের সামনে দাড়িয়ে এই যে মন্দগতি অথচ শব্দদুষণ, বায়ুদুষণরহিত যানটি – এ যেন এই উত্তুঙ্গ, তিল তিল করে আত্মহননের পথযাত্রী সভ্যতার বুকে একটা কড়া থাপ্পড়। আমি যখন সাইকেল আরোহি, দেখি এক অদৃশ্য placard লাগানো আছে আমার handle-এ “এই পৃথিবী আমায় একটু বেশি  ভালবাসে কারণ আমি আমার চলার পথের পাথেয় স্বততই তার স্তন্যদুগ্ধ পান করে সংগ্রহ করি না”।

 

আমাদের রামতলার রাস্তায় সাইকেল চালানোর জন্য যে gymnastic skill আয়ত্ত করার দরকার পড়ে সেটা রীতিমতো আয়াসসাধ্য – দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়ে সেটা আয়ত্ত করতে হয়। আপনার সাইকেলের পূর্ব-পশ্চিম-ঈশান-নৈঋত সব দিশাতেই ইঞ্চিখানেকের দূরত্বে নিশ্বাস ফেলছে বাইক, রিকশা, চারচাকা আর পদচারীরা। হাওড়ার গলিগালা, বড়রাস্তা সকলই কিঞ্চিত সরু, অপরিসর। এ কথা সকলেই জানে। আর বহুতল ফ্ল্যাটবাড়িগুলো আগমনের সাথে সাথে মানুষ যেভাবে বেড়েছে সেভাবে রাস্তাগুলো পেটমোটা হবার সুযোগ পায় নি। নিজেদের শীর্ণ ক্লীশ শরীর নিয়ে মানুষের পদভারে নীরবে ত্রাহি ত্রাহি করছে তারা। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া স্বরূপ ইদানিং যোগ হয়েছে টোটো। শব্দহীন এই ত্রিচক্রযানটিও আপনার আগে-পিছে-ডাইনে-বাঁয়ে, শিশু প্রহ্লাদের ইষ্ট নারায়ণের মতই, সর্বত্র বিদ্যমান। এ হেন পরিস্থিতিতে গতিশীল সবরকম যানবাহনের মধ্যে একটা নির্ভুল সুষমা বজায় রেখে এবং অভিকর্ষের নিরন্তর ডাককে উপেক্ষা করে এই দ্বিচক্রযানের পিঠে করে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া একটা শিল্পকলা বললে বোধ হয় সত্যের অপলাপ হবে না। আমি নিশ্চিত রামতলায় যারা সাইকেল চালাতে পারে তাদের কোন বিলিতি সার্কাসে ওই দড়ির ওপর দিয়ে সাইকেল চালানো ইত্যাদি খেলায় অবলীলায় সুযোগ মিলতে পারে। তার ওপর আছে পান থেকে চুন খসলেই যাকে বলে হেভি বাওয়াল। এই দ্রুতগতি জীবনের সাথে পা মিলিয়ে চলতে থাকা অসহিষ্ণু ক্লান্ত মানুষগুলির মুখ থেকে একটু এদিক ওদিক হলেই বেরিয়ে পড়ছে দু অক্ষরের সেই লিঙ্গসূচক শব্দটি। মনুষ্যজাতীয় প্রাণীর সাথে যদি বা সমতান বজায় রাখতে পারেন, চতুষ্পদদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রাখা আর একটা শিল্প। একটু ফাঁকা গলি হলেই এ পাড়া ভার্সেস ও পাড়ার কুকুর মন্ডলীর gang fight-এর মধ্যে পড়ে যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। আপনাকে “ইস্পাতের মত মজবুত আর ঠান্ডা স্নায়ু” যাকে বলে “নার্ভ অফ স্টীল” বজায় রেখে শক্ত হাতে একটা optimum স্পিড-এ তাদের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। এরা সাধারণত কামড়ায় না কিন্তু যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে নিজের এলাকার দখলদারির সরব দাবি জানায় তাতে কামড়াবে না এই ভরসা রাখাটা যে সহজ নয় সেটা সহজেই অনুমেয়।

 

এইভাবে হেমন্তের মিঠে হাওয়া গায়ে লাগিয়ে সাইকেলে চেপে পথ বাইতে বাইতে রামতলা বাজার পেরিয়ে সাঁতরাগাছি মোড় পেরিয়ে নতুন রাস্তার মোড়। তখন পথের নেশা চেপে বসেছে। প্যাডেল করতে করতে দালালপুকুর। কয়েকটা অতিকায় গাছ ঝুঁকে পড়ে ঐ ক্ষুদ্র জলাশয়টিকে যেন সভ্যতার সর্বগ্রাসী আগ্রাসন থেকে সশস্ত্র প্রহরীর মতই রক্ষা করছে। আর একটু এগিয়ে গেলে কিছু বছর আগে হলেও পেতেন পার্বতী সিনেমা আর তার একটু পরে শ্যামাশ্রী সিনেমা। কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পপকর্ন সমৃদ্ধ multiplex – এর যুগে আজকাল এই ধরনের একক ছবিঘরেরা, whatsup এর যুগে নিতান্ত টেলিগ্রামের মতই, outdated। আমাদের রামতলার শ্যামলী সিনেমা, যেখানে আমার মনে থাকা বয়সের প্রথম ছায়াছবি kingkong and godzilla দেখেছি, তার মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। এই সিনেমা হল দুটো বৃদ্ধ হেঁপো রুগির মত বেঁচে থাকার লড়াইটা চালিয়েছিল অনেকদিন। সভ্যতার অভিঘাতে মারা গেছে বছর দুয়েক হল। স্বর্গত শ্যামাশ্রী সিনেমা পেরিয়ে চলতে চলতে যখন মল্লিক ফটক পৌঁছলাম তখন মনে হল এতদূর এলাম যখন গঙ্গার ঘাটটা দেখে যাব না? অতএব ফের প্যাডেলে চাপ। মল্লিকফটক পেরিয়ে গঙ্গাগামী হলেই আপনি দেখবেন একটা সম্পূর্ণ অন্য সভ্যতা, এক অচেনা পরিবেশ। আলো ঝলমল, দোকানে দোকানে ছয়লাপ শহুরে সভ্যতা হঠাৎ যেন মৃত্যুগর্ভে বিলীন। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। এই এলাকাটি মূলতঃ হিন্দি ভাষাভাষী অবাঙ্গালী অধ্যুষিত। বিহার থেকে জীবিকার সন্ধানে কয়েক পুরুষ আগে এরা এখানে এসেছে। এই কয়েক পুরুষেও জীবন যুদ্ধে খুব একটা সফল যে হতে পারেনি তার পরিচয় মিলবে বাড়ি-ঘর-দোর-দোকানপাটের চেহারা দেখে। আর্থিকভাবে অনুন্নত এই এলাকাটা একটা মিনি বিহার বলা চলে। পার্থক্য একটাই। এরা প্রায় প্রত্যেকেই ঝরঝরে বাংলা বলতে পারে প্রয়োজনে। সন্ধ্যে নটার পরে গেলে যদি কান খাড়া রাখেন দু এক কলি “রামা হৈ” কি হনুমান চালিশা শুনতে পাবেন। কিছু নির্বিবাদী মানুষ খালি গায়ে বসে লিট্টী সহযোগে নৈশভোজ সম্পন্ন করছে দেখতে পাবেন। মিনিট খানেকের মধ্যেই গোটা ছয়েক ছাতুর সরবতের স্টল স্পট করে ফেলতে অসুবিধে হবে না। কখনো সুযোগ হলে একবার চেখে দেখবেন। আমাদের Cafe Coffee Days-এর চারশো টাকার পানীয়ের তুলনায় এই দশ টাকার (এখন বোধ হয় কুড়ি) ছাতুর শরবৎ লেবু আর মশলার ঝাঁজে খুব একটা কম সুস্বাদু নয়। শেষমেশ একটু-আধটু রাস্তা গুলিয়ে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে একটা বাঁক ঘুরতেই আসন্ন সেই সুবিস্তীর্ণ গঙ্গা। সাইকেলটাকে stand করে দাঁড়াই। এখানে গঙ্গার রূপ কিন্তু স্বচ্ছসলিলা, পূণ্যতোয়া নয়। সেই হরদুয়ার থেকে এই আগ্রাসী সভ্যতার উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করতে করতে এইখানে এসে তার ক্লান্ত জীর্ণ রূপটি চোখে পড়ে। হরিদ্বারের পায়ে নূপুর পরা কিশোরী গঙ্গা এইখানে এসে প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েছে। পুরো এক জীবনের অবসাদ। কিন্তু তাতে কি? এই যে সুদীর্ঘ পাচ হাজার বছর ধরে এই আর্য-অনার্য সভ্যতাকে মায়ের মত মমতায় লালন করল? সেই মাতৃস্বরূপার পরম স্নেহপরশটি পেতে হলে বুক ভরে শ্বাস নিন। নিঃশ্বাসের সঙ্গে মনের সব জঞ্জাল বের করে ঐ গঙ্গাজলে মনে মনে সঁপে দিন। সারা উত্তর ভারতের জঞ্জাল নিয়েছেন যিনি আপনারটাও নেবেন। নিরাশ করবেন না।  আজ আবার কার্তিক পূজোর বিসর্জনের দিন। একটা বড়সড় কার্তিক ঠাকুর এল ভ্যানে করে। ধুপ ধুনো দিয়ে হাতে মিস্টির প্যাকেট ধরিয়ে চিবুকে চুমু খেয়ে তাকে বিদায় করছে বিবাহিত মহিলারা। এই মাটির প্রতিমার প্রতি কি অপ্রতিম সন্তান স্নেহ। এখন সঙ্গত কারণেই জলে প্রতিমা বিসর্জন নিষেধ। গঙ্গাপাড়ে নামিয়ে যাওয়াই দস্তুর। যতক্ষণ এই বিদায়পর্ব চলল চারটে অর্ধনগ্ন ছেলে এসে দাড়িয়ে রইলো যেন মৃত্যুপথযাত্রী কোনো প্রাণীর আশেপাশে ভিড় করা শকুন। জীবনযুদ্ধে পরাভূত সমাজের প্রতিনিধি এরা মৃন্ময় দেবতার হাতে মিস্টির প্যাকেটের বিলাসিতা সহ্য করতে অপারগ। বিসর্জনে আসা মানুষগুলো চলে গেলেই কার্তিক ঠাকুরকে দেওয়া সব জাগতিক সম্পদ এই জ্যান্ত কার্তিকরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে। বিসর্জনে আসা মানুষগুলোর কথাবার্তা একটু আধটু কানে এল। কানে এল বললে একটু মিথ্যে বলা হবে। আমার একটু আড়ি পাতা স্বভাব আছে। বিশ্বাস করুন কারও ক্ষতি করার জন্য নয়, অন্যের বিশ্বাস অবিশ্বাস সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরী করতে সম্পূর্ণ অচেনা লোকেদের কথা কখনো সখনো চেখে থাকি।  ধর্মবিশ্বাসী লোকগুলো বলাবলি করছে কার বাড়িতে জোড়া কার্তিক ফেলার ফলে যমজ ছেলে হয়েছে। খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় কিন্তু সভ্যতার আলো যত উজ্জ্বলতর হয়েছে তত এই ধরণের কার্য-কারণ সম্বন্ধে আস্থা রাখা হয়েছে দুঃসাধ্য।

 

অবশেষে গঙ্গার ফুরফুরে হাওয়া অনেকটা ফুসফুসে ভরে নিয়ে ফেরতা পথে সাইকেল ধরলাম। হিসেব করে দেখলাম ফেরার পথটা হবে পাঁচ কিমির কিছু বেশি। যাওয়া আসা মিলিয়ে প্রায় দশ কিমি। ভাবছেন উরিব্বাস এ তো অনেকটা পথ? আমি কোনো অতিমানব নই, sportsman-ও নই, বছরে একবারই দেশে ফিরে সাইকেলে চড়ি – আসলে দশ কিমি সাইকেল চালানোটা আদৌ কোনো শক্ত ব্যাপার নয়। মেন্টাল ব্লক আর আপনার ভটভটি অর্থাৎ মোটর বাইকটিকে একদিনের জন্য নির্বাসন দিলেই দেখবেন কাজটা জলের মত সোজা। আর ঐ যে বললাম – দূষণ না ছড়ানোর জন্য এই পৃথিবীই আপনাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করবে, সাহস জোগাবে। ফেরার পথে আর একটা procession দেখলাম যে মিছিলটায় আমাদের সবাইকে একদিন না একদিন সামিল হতে হয়। যত খেদ, ঘৃণা মানসিক কলুষ, যত মিথ্যা জৌলুস সব পিছনে ফেলে রেখে হরিধ্বনি দিতে দিতে আর  বিন্নি খৈ ছড়াতে ছড়াতে আমাদের সবাইকে উত্তর পুরুষ পৌছে দেবে আমদের অন্তিম শয়ানে। তবে কেন এত হিংসা, প্রতিযোগিতা শ্রেষ্ঠত্বের অভিমান? রামতলা বাজার দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎই চোখে পড়ে গেল নিয়ন আলোয় জ্বলজ্বল করছে দোকানের নাম “জয়নগরের মোয়া”। সাইকেলের ব্রেকটা কোন শালা টিপল ঠিক জানিনা। কিন্তু দেখলাম দোকানের সামনে আমি সাইকেল থেকে নেমে দণ্ডায়মান। আশি টাকায় আটটা জয়নগরের মোয়া (মানে আদতে রামতলারই। কিন্তু ঐটুকু ব্র্যান্ডিং না করলে আমি দাঁড়াতাম বলুন?) কিনে বাড়ি ঢুকলাম যখন তখন সাড়ে নটা। দেড় ঘন্টার সাইকেল সফরে প্রাণ-মন চাঙ্গা। আজকাল শপিং মল-এ হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে আনন্দ কেনাই দস্তুর। তার বিরুদ্ধে সওয়াল করছি না। কিন্তু মাঝে মাঝে এ ভাবেও আনন্দ কেনা যায়। সাইকেলের maintenance cost টা যদি না ধরেন, মোট খরচা আশি টাকা আর বেশ কিছুটা ক্যালরি যেটা কিনা আমার মধ্যপ্রদেশের প্রগতি রুখতে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে। অবিশ্যি মোয়াগুলো খেয়ে সেটা মেকআপ হয়ে যাবে। কারণ বাঙালির প্রায় পরিচয়পত্র স্বরূপ নোয়াপাতি ভুঁড়ি নিয়ে যাকে বলে “No Compromise”!!

আঠেরোর শুভেচ্ছা

দেখতে দেখতে একটা বছর ঘুরে গেল আবারও
কেমন কাটলো? দুই শুন্যি সতের?
যযাতির ঝুলির বছর কাটলো…মন্দ না তা ভালই
পাঠকের ভালবাসায় ভিজে যযাতি জমকালোই।
সংগে থাকুন, তুলুন গাছে গল্পগরু স্বেচ্ছায়
আঠেরো সাল হেসে কাটুক যযাতির শুভেচ্ছায়।।

যযাতির ঝুলির প্রথম পোষ্ট হয়েছিল ৩১ শে জানুয়ারী, ২০১৭। অতএব যযাতির ঝুলি এখনো এক বছর পূর্ণ করে নি। এর মধ্যেই যযাতির ঝুলি পাঠকদের অভুতপূর্ব ভালবাসা পেয়েছে। জুন কিম্বা জুলাই-এর গোড়ার দিকে ব্লগস্পট থেকে ওয়ার্ডপ্রেসে নিয়ে আসা হয়েছিল যযাতির ঝুলি। এর মধ্যেই শুধু ওয়ার্ডপ্রেসে যযাতির ঝুলি ভিজিট করেছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি পাঠক-পাঠিকা। অর্থাৎ কিনা ব্লগস্পটের ভিজিট আর ওয়ার্ডপ্রেসের ভিজিট যোগ করলে দশ হাজার পেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। অফিসিয়াল ফেসবুক শেয়ার বাটন বলছে বেশিরভাগ লেখাই শতাধিক বার শেয়ার হয় এফ-বি তে। পঞ্চাশের ওপর ডাইরেক্ট ফলোয়ার আছে। এফ-বি পেজ ফলো করেন সহস্রাধিক।

যে সকল সুধী পাঠক ও পাঠিকারা যযাতির ঝুলিকে এত ভালবাসা দিলেন তাদের সকলকে যযাতির তরফ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং নতুন বছরের শুভেচ্ছা। যযাতির এই সামান্য প্রচেষ্টায় আপনাদের উৎসাহই একমাত্র পাথেয়। আশা করি আগামী দিনেও আপনারা পাশে থাকবেন। যযাতির ঝুলির লেখায় মন্তব্য করে ভুল-ঠিক ধরিয়ে দেবেন। কি ধরণের লেখা পড়তে আগ্রহী সে বিষয়ে যযাতিকে ফিডব্যাক দেবেন। সর্বোপরি আপনি যদি ব্লগটিকে ডাইরেক্ট ইমেল সাবস্ক্রাইব করতে চান সাইড বারে কি বটম বারে তার সুযোগ পাবেন। ভয় নেই – মাসে দু থেকে তিনটে পোস্টই করা হয়। একগাদা বস্তাপচা লেখা আপনার মেলবক্সে পাঠিয়ে বিরক্ত করা হবে না কোনদিনও – এটা যযাতির প্রতিশ্রুতি। আর যদি নিতান্তই তা না করতে চান যযাতির ঝুলির ফেসবুক পেজে জুড়ে যান কিম্বা আর-এস -এস ফীড সাবস্ক্রাইব করুন যাতে নতুন পোস্টের খবর পেতে পারেন। যদিও যযাতি চায় তার ফেসবুক পেজের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে।

এইরকমই অকৃত্রিম ভালবাসার সাথে নতুন বছরেও সঙ্গে থাকুন যযাতির ঝুলির। আর সঙ্গে থাকুন মানুষের – ধর্ম-জাতি-বর্ণ বিভেদ ভুলে :-)। আমি, আপনি, আমরা সবাই সাহিত্যচর্চা করি এই আশা নিয়ে যে একদিন সমস্ত বিভেদ, অসূয়া ভুলে মানুষ ঈশ্বর হবেই। যাই হোক, আপনাদের জন্য ঝুলি থেকে কোয়ালিটি গল্প, কবিতা, রম্যরচনা, স্মৃতিকথা বেরোবে নিয়মিত। আবারও বলি নিয়মিত লেখা দেওয়া হবে কিন্তু ঘন ঘন দেওয়া হবে না কারণ যযাতির ঝুলি এত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে যে লেখার গুণগত মান নিয়ে সচেতন থাকা আবশ্যিক। তাই ইচ্ছে হলে ইমেল কি আর-এস-এস ফীড সাবস্ক্রাইব করতেই পারেন। স্প্যাম করা হবে না।

বন-পাহাড়ি

কদিন আগেই বন্ধুবান্ধব মিলে গেছিলাম Smokey Mountain। রূপসী ধূম্র পাহাড়-এর এক চন্দ্রালোকিত সন্ধ্যায় বসে লিখেছিলাম।

********
আজ আকাশে আঁকা তারার আলপনা
আজকে রাতে হোক কবিতা। গল্প না।
পাহাড়-পথে পড়ছে ঝরে জোছনা জল
আজ এ রাতে আমার সাথে থাকবি বল!
গাছের পাতায় কুয়াশাদের চুপ সোহাগ
জড়িয়ে – যেন উপগতার পূর্বরাগ।
আজকে নিবিড় আশ্রয় তোর নরম বুক
কথারা আজ ঠোঁটের নিচে চুপ থাকুক।
আজকে শরীর খুঁজুক শরীর। উষ্ণতা।
দীর্ণ হৃদয় খুঁজে ফিরুক ক্লিন্নতা।
তোর ঠোঁটের আর তোর ঐ চোখের মুগ্ধতা
বন-পাহাড়ি সব্‌জে, অবুঝ বন্যতায়
আজকে খুঁজে ফিরুক সুজন, অলীক সুখ
তোর গহীনে ঠাঁই দে আমায়। আগন্তুক।