আঠেরোর শুভেচ্ছা

দেখতে দেখতে একটা বছর ঘুরে গেল আবারও
কেমন কাটলো? দুই শুন্যি সতের?
যযাতির ঝুলির বছর কাটলো…মন্দ না তা ভালই
পাঠকের ভালবাসায় ভিজে যযাতি জমকালোই।
সংগে থাকুন, তুলুন গাছে গল্পগরু স্বেচ্ছায়
আঠেরো সাল হেসে কাটুক যযাতির শুভেচ্ছায়।।

যযাতির ঝুলির প্রথম পোষ্ট হয়েছিল ৩১ শে জানুয়ারী, ২০১৭। অতএব যযাতির ঝুলি এখনো এক বছর পূর্ণ করে নি। এর মধ্যেই যযাতির ঝুলি পাঠকদের অভুতপূর্ব ভালবাসা পেয়েছে। জুন কিম্বা জুলাই-এর গোড়ার দিকে ব্লগস্পট থেকে ওয়ার্ডপ্রেসে নিয়ে আসা হয়েছিল যযাতির ঝুলি। এর মধ্যেই শুধু ওয়ার্ডপ্রেসে যযাতির ঝুলি ভিজিট করেছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি পাঠক-পাঠিকা। অর্থাৎ কিনা ব্লগস্পটের ভিজিট আর ওয়ার্ডপ্রেসের ভিজিট যোগ করলে দশ হাজার পেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। অফিসিয়াল ফেসবুক শেয়ার বাটন বলছে বেশিরভাগ লেখাই শতাধিক বার শেয়ার হয় এফ-বি তে। পঞ্চাশের ওপর ডাইরেক্ট ফলোয়ার আছে। এফ-বি পেজ ফলো করেন সহস্রাধিক।

যে সকল সুধী পাঠক ও পাঠিকারা যযাতির ঝুলিকে এত ভালবাসা দিলেন তাদের সকলকে যযাতির তরফ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং নতুন বছরের শুভেচ্ছা। যযাতির এই সামান্য প্রচেষ্টায় আপনাদের উৎসাহই একমাত্র পাথেয়। আশা করি আগামী দিনেও আপনারা পাশে থাকবেন। যযাতির ঝুলির লেখায় মন্তব্য করে ভুল-ঠিক ধরিয়ে দেবেন। কি ধরণের লেখা পড়তে আগ্রহী সে বিষয়ে যযাতিকে ফিডব্যাক দেবেন। সর্বোপরি আপনি যদি ব্লগটিকে ডাইরেক্ট ইমেল সাবস্ক্রাইব করতে চান সাইড বারে কি বটম বারে তার সুযোগ পাবেন। ভয় নেই – মাসে দু থেকে তিনটে পোস্টই করা হয়। একগাদা বস্তাপচা লেখা আপনার মেলবক্সে পাঠিয়ে বিরক্ত করা হবে না কোনদিনও – এটা যযাতির প্রতিশ্রুতি। আর যদি নিতান্তই তা না করতে চান যযাতির ঝুলির ফেসবুক পেজে জুড়ে যান কিম্বা আর-এস -এস ফীড সাবস্ক্রাইব করুন যাতে নতুন পোস্টের খবর পেতে পারেন। যদিও যযাতি চায় তার ফেসবুক পেজের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে।

এইরকমই অকৃত্রিম ভালবাসার সাথে নতুন বছরেও সঙ্গে থাকুন যযাতির ঝুলির। আর সঙ্গে থাকুন মানুষের – ধর্ম-জাতি-বর্ণ বিভেদ ভুলে :-)। আমি, আপনি, আমরা সবাই সাহিত্যচর্চা করি এই আশা নিয়ে যে একদিন সমস্ত বিভেদ, অসূয়া ভুলে মানুষ ঈশ্বর হবেই। যাই হোক, আপনাদের জন্য ঝুলি থেকে কোয়ালিটি গল্প, কবিতা, রম্যরচনা, স্মৃতিকথা বেরোবে নিয়মিত। আবারও বলি নিয়মিত লেখা দেওয়া হবে কিন্তু ঘন ঘন দেওয়া হবে না কারণ যযাতির ঝুলি এত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে যে লেখার গুণগত মান নিয়ে সচেতন থাকা আবশ্যিক। তাই ইচ্ছে হলে ইমেল কি আর-এস-এস ফীড সাবস্ক্রাইব করতেই পারেন। স্প্যাম করা হবে না।

বন-পাহাড়ি

কদিন আগেই বন্ধুবান্ধব মিলে গেছিলাম Smokey Mountain। রূপসী ধূম্র পাহাড়-এর এক চন্দ্রালোকিত সন্ধ্যায় বসে লিখেছিলাম।

********
আজ আকাশে আঁকা তারার আলপনা
আজকে রাতে হোক কবিতা। গল্প না।
পাহাড়-পথে পড়ছে ঝরে জোছনা জল
আজ এ রাতে আমার সাথে থাকবি বল!
গাছের পাতায় কুয়াশাদের চুপ সোহাগ
জড়িয়ে – যেন উপগতার পূর্বরাগ।
আজকে নিবিড় আশ্রয় তোর নরম বুক
কথারা আজ ঠোঁটের নিচে চুপ থাকুক।
আজকে শরীর খুঁজুক শরীর। উষ্ণতা।
দীর্ণ হৃদয় খুঁজে ফিরুক ক্লিন্নতা।
তোর ঠোঁটের আর তোর ঐ চোখের মুগ্ধতা
বন-পাহাড়ি সব্‌জে, অবুঝ বন্যতায়
আজকে খুঁজে ফিরুক সুজন, অলীক সুখ
তোর গহীনে ঠাঁই দে আমায়। আগন্তুক।

মেঘ প্রতিশ্রুতি

শিকাগোতে আজ টুপ টুপ টুপ বৃষ্টি সকাল থেকে। তাই এই কবিতাটা আমার প্রিয় পাঠকদের জন্য। যারা তেমন পড়ার সময় পান না, তাদের কথা ভেবে কবিতাটা আবৃত্তিও করে দিলাম। সোজা নিচে গেলে লিঙ্কটা পাবেন। যারা পড়তে ভালবাসেন, তারাও আবৃত্তিটা শুনতে পারেন। আশা করি ভালোই লাগবে।

এক শ্রাবনী অন্ধকারে

কৃষ্ণ কালো মেঘের ঘটা আকাশ পরে – 

নির্নিমেষে চেয়ে থেকে প্রশ্ন করি, শুধাই তারে

ঘুরে বেড়াও উড়ে বেড়াও কিসের তরে?

আকাশ জুড়ে,

রঙ মাখা ঐ মেঘ চাদরে

মুখ ডুবিয়ে মন্দ্র স্বরে

কাকে ডাকো?

কোন সে চাতক চুপিসারে

তোমায় পাওয়ার লোভে চলে অভিসারে?

কোন সে আলো মুখ লুকিয়ে চুপ শরীরে

তোমায় ছুঁলো, মৃত্যু নিল শরীর জুড়ে?

কোন সে কবি এক দুপুরে

তোমায় নিয়ে লিখবে বলে

সারা বেলা রইলো বসে কলম ধরে…

মেঝের পরে রইলো পড়ে

ছিন্ন কিছু শব্দ কোন এক শেষ না হওয়া কণ্ঠহারে।

কোন এক মাঝি বৈঠা ধরে

পথ হারাল তোমার খোঁজে

সুর বাঁধলো বাউল সুরে?

জানালা পথে এক টুকরো তোমায় পেয়ে

কোন সে জনপদবধু রইলো পরে ঠোঁট কামড়ে?

শিয়াল কিছু আঁচড়ে কামড়ে

আশ্লেষে প্রান ভরিয়ে দিল। গলির মোড়ে

কোন সে অপু তোমায় দেখে বারে বারে

খেলা ছেড়ে রইলো চেয়ে

রইলো চেয়ে ঐ সুদূরে?

কোন সে গৃহবধু সেদিন দরজা ধরে

একলাটি প্রতীক্ষা করে

সেই সে জনের

যে জন কোথায় হারিয়ে গেছে বন পাহাড়ে?

কোন সে ডাহুক চুপিসারে

তোমার সাথে ভিজবে বলে দিগবলয়ের কাছে ওড়ে?

 

মেঘ বললে,

আমি আমার ভেলায় নিয়ে ফিরি আশা

ফেরি করি বৃস্টি-ভেজা-ভালবাসা।

অনাগত এক স্বপ্নমুলুক, সুলুক দিতে আমার আসা।

ভালবাসি বলছে শুধু, বলছে আমার মন্দ্র ভাষা।

ভালবাসার জোয়ারজলে ভাসিয়ে দেব সব নিরাশা –

ভিজিয়ে দেব গৃহবধূর বুকের আঁচল, সব তিয়াশা।

ঝড় তুলব সর্বনাশা –

সেই ঝড়েতে বিলীন হবে শীর্ণ শিথিল সব কুয়াশা।

নতুন জগৎ জন্ম নেবে, নতুন দিশা

আসবে সাথে, আসবে আবার নতুন করে ভালবাসা।।

 

শব্দের জন্ম

আজকে আপনাদের কিছু শব্দের জন্মকথা নিয়ে গল্প বলব। আমি, আপনি আমরা সকলেই তো এক একটা সতন্ত্র সত্ত্বা – সকলেরই একটা গল্প আছে। তেমন শব্দদেরও আছে এক একটা নিজস্ব শরীর, মন আর ইতিবৃত্ত। কিছু কিছু শব্দের জন্মকথা ভীষণ হৃদয়গ্রাহী বা ইন্টারেস্টিং। মানুষ যখন থেকে নিজের হাত পা আর মুখের বিভিন্ন পেশীর ওপর সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে তখন থেকেই তার অন্যদের সাথে যোগাযোগের শুরু। হাসি, কান্না, কোঁচকানো ভুরু, অঙ্গুলিনির্দেশ এ সবই শব্দ বা ওয়ার্ডের সাহায্য ছাড়াই যোগাযোগ সাধনে সমর্থ। মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ কি না বলা, হাত তুলে অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা, হাততালি দিয়ে সমর্থন বা উৎসাহ প্রদান, বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ বা বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কাউকে কাঁচকলা দেখানো এ সবের মাধ্যমে আমরা নিয়মিত শব্দ ছাড়াই ভাব প্রকাশ করে থাকি। তার ওপর ধরুন ক্রিকেটের মাঠে আম্পায়ার বা ফুটবল মাঠের রেফারি পুরো ম্যাচ জুড়েই কোন কথা না বলেই সাঙ্কেতিক ভাষায় নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে থাকে। কোন বিস্মৃত অতীতে এই সাঙ্কেতিক ভাষা থেকে মানুষ লিখিত বা কথ্য ভাষায় উত্তীর্ন হয়েছিল ইতিহাস তার উত্তর দিতে অসমর্থ। কিন্তু তাও কিছু কিছু শব্দের জন্ম বৃত্তান্ত সন্দেহাতীত ভাবে জানা যায়। যেমন ধরুন ইংরেজি শব্দ write এসেছে writan থেকে যার আদতে মানে হল আঁচড় কাটা। গাছের বাকলে বা পাথরে কোন ছুঁচোল জিনিস দিয়ে আঁচড় কেটেই প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা প্রথম লিখিত ভাবে নিজের ভাব প্রকাশের চেষ্টা করেছিল। আর প্যাপিরাস গাছের ছাল শুকিয়ে যে প্রথম পেপার তৈরী হয়েছিল এ তথ্য আপনাদের সকলেরই জানা। ল্যাটিন শব্দ penna যার আসল মানে হল পালক তার থেকেই pen শব্দটির উৎপত্তি সেটাও বোধ হয় আপনাদের অজানা নয়। শুকোনো পাখির পালকের ডগা দিয়েই মানুষের প্রথম সাহিত্য সৃষ্টি। কিন্তু আজ আমি কিছু অন্য ইংরেজি শব্দের গল্প বলব।

 

কিন্তু তার আগে ইংরেজি শব্দের প্রথম দুই আদ্যক্ষরের জন্মকথা একটু সেরে নিই। লেবানন, সিরিয়া, গাজা, ইজরায়েলের উর্বর অববাহিকা অঞ্চলে আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছিল সেমিটিক সভ্যতা। ভারতবর্ষে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে ওঠার কিছু পরে পরেই এই সভ্যতার পত্তন। সেই প্রাচীন ফোনেশিয়ান সভ্যতায় জাগতিক উন্নতি বা মেটিরিয়াল  প্রস্পারিটির সর্বপ্রধান সূচক ছিল Ox বা ষাঁড় যার তৎকালীন প্রতিশব্দ ছিল Aleph. এই Aleph থেকেই A শব্দের উৎপত্তি।  যেহেতু কৃষিপ্রধান সভ্যতায় ষাঁড়ের ব্যাবহারিক মূল্য ছিল অসীম, সুতরাং ইংরেজি বর্ণমালায় এটি যে আদ্যক্ষর হিসেবে স্থান পেয়েছে সেটি কিছু আশ্চর্য নয়। এমনকি শুরুর দিকে এটি লেখা হত V এর আদলে যেটা কিনা ছিল ষাঁড়ের শিং এর প্রতিরূপ। পরে গ্রীক সভ্যতায় অক্ষরটিকে উল্টে নেওয়া হয়। খাদ্য উৎপাদনের পরে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আশ্রয়। ফোনেশিয়ান ভাষায় Beth মানে তাঁবু বা বাড়ি। তাই থেকেই আমাদের আজকের B এর জন্ম। B তে যে দুটো অর্ধবৃত্ত বা চেম্বার আছে সেটা আদতে একটি ছেলেদের ঘর আর একটি মেয়েদের ঘর – মানে আজকের দিনে আমাদের টু বেডরুম ফ্ল্যাট আর কি! অক্ষর সম্বন্ধে আরও বেশি কিছু বললে বোর হয়ে যাবেন, তাই এবার একটু শব্দে যাওয়া যাক।

 

প্রথমেই  একটা clue দিই থুড়ি মানে clue শব্দ সম্বন্ধে বলি। একটি গ্রীক পৌরাণিক গল্প থেকে এর উৎপত্তি। ক্রীট দ্বীপে মিনোটার নামে একটা আধা-ষাঁড়-আধা-মানুষ দৈত্য একটা ভুলভুলাইয়ার মধ্যে লুকিয়ে ছিল। গল্পের নায়ক থিসিয়াস তাকে মারবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তার প্রেমিকা, রাজকন্যে অ্যারিয়াডনে তাকে একটা সুতো দিয়েছিল যেটার একটা প্রান্ত সে ধরে থাকবে আর সুতো ছাড়তে ছাড়তে থিসিয়াস সেই ভীষণাকার দৈত্যকে মারতে এগিয়ে যাবে যাতে দৈত্য হননের পর সে ঠিক মত বেরিয়ে আসতে পারে সেই maze বা ভুলভুলাইয়া থেকে। অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন তখন থেকেই মেয়েরা তার হবু বরের সুতোটি ধরে রেখেছে। সে যাই হোক, তখনকার ভাষায় সুতোকে clewe বলা হত। তাই থেকেই clue শব্দটি এসেছে যার মানে হল যা আমাদের কোন puzzle সমাধানে সাহায্য করে।                 

 

এবারে আপনাদের বলি নিকোলাসের গল্প। নেপোলিয়ানের সৈন্যবাহিনীতে Nicholas Chauvin বলে এক সৈন্য ছিল তার প্রভুভক্তি এতই প্রবল ছিল যে ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়ন বাজে ভাবে হেরে যাওয়ার পরও এই প্রচণ্ড ভাবে আহত মানুষটি সর্বত্র নেপোলিয়নের গুণগান করে ফিরত। শেষমেশ তার প্রভুভক্তি হাসির বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং নাট্যকার স্ক্রাইব তাকে নিয়ে ক্যারিকেচার করে একটি নাটক লেখেন। সেই থেকেই এসেছে শব্দ Chauvinism যার মানে হল কোন এক আইডিওলজি বা আদর্শর প্রতি অযৌক্তিক ও তীব্র আকর্ষণ।

 

এবার হোক জিন নিকোটের গল্প। ভাষাত্বত্ত্ববিদ এই ফরাসী মানুষটি যখন লিসবনে ফ্রান্সের অ্যাম্বাসাডার হিসেবে কাজ করতেন, তখন একটা অদ্ভুত গাছের বীজ নিয়ে এসেছিলেন যেটা কিনা একটা অতি আশ্চর্য জায়গা আমেরিকা থেকে লিসবনে এসেছে। সেই আশ্চর্য গাছের পাতার ব্যাবহার বন্ধ করতেই আজকের স্বাস্থ্যকর্মীদের যাকে বলে একেবারে নাভিশ্বাস। হ্যাঁ ওনার নামেই এই গাছের নাম দেওয়া হয় নিকোটিন।

তারপর ধরুন Assassin. আজ থেকে প্রায় আটশ বছর আগে আরবের পাহাড়ি মরুভূমিতে এক শেখ ছিল যার পোষা দুর্বৃত্তরা ওই পথ দিয়ে যাওয়া যেকোনো মানুষকে নির্দয় ভাবে হত্যা করত। আর সেই কাজের মানসিক প্রস্তুতি নিতে হ্যাসিস নামক এক ধরণের ড্রাগ নিত। এই খুনে ডাকাতদের বলা হত hassassin যার থেকে এসেছে শব্দ assassin যারা মানুষ মারার কাজ করে।

কমরেড শব্দ শুনলেই যদি আপনার কাস্তে-হাতুড়ি-তারা মনে পড়ে যায় কিম্বা মধ্যপ্রদেশের রেড করিডোর তাহলে জেনে রাখুন কমরেড শব্দের অর্থ খুবই সাধারণ আর তা হল রুমমেট অর্থাৎ যারা একই ছাদের তলায় থাকে। এসেছে ল্যাটিন শব্দ camera থেকে যার মানে হল রুম বা ঘর। ফ্রী শব্দ এসেছে freo থেকে যার আসল মানে হল কাছের মানুষ, সংস্কৃতে যা হল  প্রিয়া। তখনকার দিনে গ্রীসে দাসপ্রথার চল ছিল। অর্থাৎ প্রতি বাড়িতে ছিল কিছু কাছের মানুষ যারা কিনা  free আর কিছু দাস বা চাকর। আর কখনো যদি কোন দাস নিজের কাছের মানুষ হয়ে উঠত তাকে free করে দেওয়া হত বা প্রিয় মানুষের জায়গা দেওয়া হত। তাই থেকেই free শব্দের মানে হয় মুক্ত। পেশীর ইংরেজি প্রতিশব্দ muscle শব্দটা কিন্তু এসেছে mouse  থেকে। ঠিক ধরেছেন, কেউ যখন পেশী ফোলায় মনে হয় না একটা ছোট্ট ইঁদুর চামড়ার নিচে ওপর নিচে দৌড়াদৌড়ি করছে?  Favor শব্দের ইতিহাস খুব রোমান্টিক। মধ্যযুগে যখন নাইটরা বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টে অংশ গ্রহণ করত তখন মধ্য বয়সী মহিলারা কখনও চোখের কটাক্ষে, কখনো বা চুলের রিবন, পোশাকের অংশ, হাতের গ্লাভস ইত্যাদি দিয়ে উৎসাহিত করত এবং প্রেম নিবেদন করত। এই টোকেন গুলো নাইটেরা পোশাকের সাথে পড়ত। এগুলিকেই favor বলা হত। অর্থাৎ কিনা যার যত favor, মহিলা মহলে তিনি তত জনপ্রিয় মানে আজকের দিনে সুন্দরীদের সাথে ছবি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট করার মত আর কি!

 

সুন্দরীদের কথায় যখন এসে পড়েছি তখন কসমেটিকসের কথাটা বলে নিতে হয়। এসেছে গ্রীক শব্দ kosmos বা cosmos থেকে। মানে হল গিয়ে বিন্যাস বা order. এই বিশ্ব বা ইউনিভার্স ভীষণ নির্দিষ্ট ভাবে বিন্যস্ত বলে একে কসমস বলা হয়। অর্থাত কিনা, মেয়েরা যখন অধীর রক্তিম করে, চোখে লাগায় মাস্কারা (আর ছেলেরা তাই দেখে পায় আস্কারা… pardon my poor sense of humor 🙂 ) তখন মেয়েরা আসলে নিজেদের সুন্দর ভাবে বিন্যস্ত করছে।  

 

Ostracize কথার মানে কাউকে একঘরে করা। এর ইতিহাসটা বেশ ইন্টারেস্টিং। প্রাচীন এথেন্সে গণতন্ত্র ছিল। সেখানে রাজ্যবাসী যদি মনে করত কোন পাবলিক ফিগার বা নেতা নিজের দায়িত্ব প্রতিপালন করছে না, তারা শহরের এক জায়গায় জড়ো হয়ে মাটির তৈরি ছোত ছোট টালিতে তার নামে লিখে ভোট নিত। এই টালির নাম ostrakon। ছয় হাজার বিপক্ষ ভোট সংগৃহীত হলে তাকে রাজ্য থেকে পাঁচ বা দশ বছরের জন্য নির্বাসন দেওয়া হত। সেই থেকেই ওয়ার্ড ostracize. Laconic শব্দের উৎপত্তি বেশ হাসির। প্রাচীন গ্রীসে ল্যাকোনিয়া বলে একটা জেলা ছিল। সেখানকার মানুষজন খুব কম কথা বলত। কথিত আছে এক অ্যাথেনিক দূত এসে  যখন তাদের বলেছিল “If we come to your city, we will raze it to the ground.” অল্প কথার মানুষ ল্যাকোনিয়ানরা শুধু উত্তর দিয়েছিল “If”. সেই থেকেই কম কথার মানুষদের বলা হয় laconic. Calculate আর Calculus শব্দের জন্ম এক ধরণের ছোট্ট পাথর calculi থেকে যা দিয়ে প্রাচীন রোমের ব্যাবসায়ীরা লাভ ক্ষতির হিসেব করত।

 

Narcissus আর echo দুটো এমনিতে unrelated শব্দ কিভাবে সম্পর্কিত জানতে আবার ফিরে যাই গ্রীক মাইথোলজিতে।  বাতাস আর মাটির মিলনে জন্মায় পরমা সুন্দরী কন্যা  Echo. Echo বড় হয়ে স্বর্গের রাণী হেরার দেখাশুনোর গুরুদায়িত্ব পেল। কিন্তু রাণী তো। একটুতেই খাপ্পা। বেশী কথা বলার জন্য ইকোকে শাস্তি দিল যে সে অন্যের কথা পুনরাবৃত্তি করা ছাড়া আর কোন কথা বলতে পারবে না। তাই echo মানে প্রতিধ্বনি। এদিকে কথা বলার দিক থেকে প্রতিবন্ধী হয়েও নবযৌবনবতী echo narcissas নামে এক সলমন খান টাইপ্স হ্যান্ডু পাবলিকের প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খেতে লাগল। নার্সিসাস হল গে একটা নিম্ফের প্রেমে পড়ে নদী দেবতার গর্ভজাত সন্তান। প্রথমে নার্সিসাসের মনেও ইকোর জন্য একটু ইয়ে ইয়ে হয়েছিল কিন্তু কথা বলতে পারে না দেখে ইকোকে সে ঝেড়ে ফেলে দিল। ব্যাস মর্মাহত ইকো ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। শুধু তার গলার স্বরটা রয়ে গেল। পরের বার পাহাড়ে গিয়ে যখন জোরে চেঁচিয়ে নিজের গলার প্রতিধ্বনি শুনবেন, আমাদের পুওর প্রেমিকা ইকোকে একটু স্মরণ করে নেবেন। এদিকে ইকোর এই অকাল মৃত্যুতে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার দেবতা নেমেসিস একেবারে রেগে আগুন তেলে বেগুন। আর তখন তো রেগে গেলেই ফটাফট অভিশাপ দিয়ে দিত দেবতারা। নেমেসিস নার্সিসাসকে অভিশাপ দিল যে সে জলে নিজেরই ছায়ার প্রেমে পড়বে। আর বলতে না বলতেই ফল। নার্সিসাস জলে নিজের ছায়া দেখে নিজের রূপেই মুগ্ধ হয়ে আর মুখ ফেরাতে পারে না। প্রতিধ্বনি ইকোকে পাত্তা না দিয়ে এখন প্রতিচ্ছবির প্রেমে পড়ে একেবারে নাস্তানাবুদ। শেষমেশ বেচারা শুকিয়ে গিয়ে ফুল হয়ে গেল। সেই ফুলেরও নাম নার্সিসাস। দেখবেন ফুলটা ঘাড় ঘুরিয়ে নিজেকেই দেখতে ব্যস্ত। আমাদের সকলের মধ্যেই অল্পবিস্তর নার্সিসাস রয়েছে। আপনাদের কথা জানি না আমি সর্বদাই নিজের প্রেমে গদগদ।

 

যাকগে যাক এবারে একটু খাওয়া দাওয়াতে আসা যাক। বাঙালি আর যাই হোক খেতে ভারি ভালোবাসে। সকালে উঠেই নিশ্চয়ই ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল আর ধূমায়িত কফি আপনার রসনা তৃপ্ত করে। ৪৯৬ খৃষ্ট পুর্বাব্দে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষে রোমান গ্রামাঞ্চলে যখন অনেক লোক মারা যাচ্ছে তখন পুরোহিতরা এসে বলে এক নতুন দেবী Ceres এর আরাধনা করতে হবে, তবেই বৃষ্টি হবে আর ফসল ফলবে। সেই ফসলের দেবী Ceres আমাদের আজকের শব্দ Cereal এর জন্মদাতা। আর মোটামুটি নবম শতকে কাল্ডি নামে এক মেষপালক দেখে তার ভেড়াগুলো একটা গাছের পাতা খেয়ে অদ্ভুত আচরণ করছে। ব্যাপারটাকে সরেজমিনে তদন্ত করতে পাতা আর ফল বেটে সেও একটু খেয়ে দেখে বেড়ে জিনিস। ধীরে সেই বেরী গুলোকে শুকিয়ে নির্যাস বের করে পান পর্ব শুরু। আরবরা তার নাম দিল qahwe. দীর্ঘ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জেগে থাকার জন্য এর সদব্যাবহার হতে লাগল। ব্যাস ধর্মগুরুরা করে দিল ব্যান। সেই পানীয় আরব থেকে ফ্রান্সে এসে নাম নিলো cafe. তার থেকে coffee. এবারে আসি অন্য তরলে। রাত বাড়লে আপনার মন যদি একটু whiskey-র বোতলের দিকে ছুক ছুক করে লজ্জার কিছু নেই। নেক্সট টাইম বোতল খুলে বসার আগে ভেবে নেবেন সঞ্জীবনী জল খাচ্ছেন। না না প্রবোধ দিচ্ছি না। আক্ষরিক অর্থে ওর মানে হল water of life ওরফে সঞ্জীবনী জল। আসল শব্দটা ছিল uisge beatha. স্কচ আর আইরিশরা বানায় প্রথমে। রাজা অষ্টম হেনরি খেয়ে ভারি সুখ পান ও জনপ্রিয় করেন।  পরে ধীরে ধীরে সহবতি পরিবর্তিত হয়ে usquebaugh, শেষে whiskeybaugh হয়ে শুধু whiskey.   

 

আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক কিছু শব্দে আসা যাক। ব্যালট বা  ballot এসেছে বল (ball) থেকে। প্রাচীন গ্রীকরা কোন প্রার্থীকে সমর্থন করতে একটা বক্সে একটা সাদা বল ফেলত, আর বিরোধিতা করতে একটা কালো বল। bribe মানে শুধুমাত্র একটা পাউরুটির টুকরো যা কাউকে দেওয়া হত। কারও কাছ থেকে কিছু favor পেতে কিছু দেওয়া – এই negative connotation যুক্ত হয়েছে অনেক পরে। Curfew এসেছে couvre feu থেকে ফরাসী ভাষায় যার মানে হল cover the fire. রাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে রাস্তার ও বাড়ির সব বাতি নিভিয়ে দেওয়ার নিয়ম ছিল। হ্যাঁ energy conservation এর জন্য। সেই থেকেই এসেছে curfew. গ্রেনেড দেখেছেন? আহা ঘাবড়াবেন না, সত্যিকারের দেখে না থাকলেও সিনেমা থিয়েটারে তো দেখেছেন। দেখতে অনেকটা বেদানার মত না? ঠিক সেই জন্যই pomegranate থেকে এসেছে grenade.

 

আমাদের অ্যালজেবরা কিন্তু আসলে একটা সার্জিকাল টার্ম। আরবিক শব্দ al মানে The, jebr মানে যা ভেঙ্গে গেছে তাকে জোড়া। ভাঙ্গা হাড় জোড়ার ব্যাপারেই বেশি ব্যাবহৃত হত শব্দটা। পরে আরব গণিতজ্ঞরা সমীকরণের বীজ ভাঙ্গা জোড়াকে বোঝাতে নতুন শব্দ চয়ন করেন ilm al-jebr wa’l-muq-abalah. শব্দটা অত বড় থাকলে ক্লাস সেভেনেই উচ্চারণ করতে আমাদের একটি করে দাঁত ভেঙ্গে যেত। ভাগ্যের ব্যাপার ইটালিয়ানরা শব্দটা নেওয়ার সময় ওই দ্বিতীয় আর তৃতীয় অংশটুকুই নিয়েছে। ভাগ্যিস…কি বলেন?  Chemistry তো এসেছে al-kimia থেকে। alchemist বলে একদল লোক লোহাকে সোনা বানানোর জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলে উঠে পড়ে লেগেছিল। তারাই আজকের রসায়ন বিদ্যা বা কেমিস্ট্রির উদ্ভাবক। Honeymoon শব্দটা খুব মিষ্টি কিন্তু অর্থটা বেশ নিরাশাজনক। বেসিক্যালি এটা বিয়ের পরের এক মাসের প্রেম। moon মানে চাঁদ। প্রেমের সাথে চাঁদের সম্পর্ক চিরন্তন। ধরুন আপনার বিয়ের দিনটা পূর্ণিমা। আপনি আপনার significant other এর মুখ মিলনাকাঙ্খায় উন্মুখ। হৃদয়ে পূর্ণিমার জোছনা জলের পূর্ণ দীঘি। মন গুনগুন করছে “তেরি বিন্দিয়া রে”। পনের দিনের মধ্যেই সেই ভালবাসার রশনচৌকিতে বেসুরো সুর বাজবে। আপনার ভালবাসার রাজপ্রাসাদে অমাবস্যার অন্ধকার। চাঁদের বাড়া-কমার মতি দাম্পত্য প্রেম নিয়মিত বাড়ে কমে। চিন্তা করবেন না। আজ অমাবস্যা হলে কি হবে? আবার পনের দিন পরে পূর্ণিমা তো আসছেই।           

 

আর একটা শব্দের কথা বলেই আজকের মত আপনাদের ক্ষ্যামা দেব। Glamour শব্দটা এখন খুব চলে। Tollywood, bollywood, hollywood এবং আরও সব “wood” এই glam girl দের রমরমা। মেয়েরা, এমনকি ছেলেরাও লুকিয়ে লুকিয়ে পার্লারে গিয়ে ভালোই মাঞ্জা মারছে গ্ল্যামার বাড়ানোর জন্য। শব্দটা এসেছে বোরিং ওয়ার্ড grammar থেকে। বিশ্বাস হচ্ছে না? ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। প্রাচীন মিশরীয় পুরোহিতরা লেখা এবং পড়ার দক্ষতাকে সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে রাখত। ক্ষমতা বেদখল হওয়ার ভয়ে এবং নিজদের ক্যারিস্মা বজায় রাখতে গোপনে মন্দিরে গিয়ে বিদ্যাভ্যাস করত। এমন কি ষোড়শ শতাব্দীতে ইংলন্ডেও  অল্প সংখ্যক কিছু মানুষ নিজেদের মধ্যে ল্যাটিন ভাষায় কথা বলত যাতে ইংরেজি বলা সাধারণ মানুষ তাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে। অশিক্ষিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ মনে করত যারা ল্যাটিন গ্রামার জানে তাদের ম্যাজিকাল পাওয়ার বা যাদুবিদ্যা জানা আছে। সেই grammar থেকেই ভেঙ্গে উৎপত্তি glamour যার আসল অর্থ ছিল ম্যাজিকাল চার্ম। আজকের দিনেও গ্ল্যমারাস গার্ল হল সে যার মনমোহিনী রূপ বা ব্যক্তিত্ব আছে – মোটের ওপর যে পুরুষের মনের ওপর যাদু করতে পারে।  

 

আরও অনেক শব্দের জন্ম নিয়ে অনেক মনোগ্রাহী গল্প আছে। সব লিখতে গেলে আপনারা আমাকে টাটা বাই বাই করে কেটে পড়বেন। আপাতত ইংরেজি হল, অন্য একদিন বাংলা শব্দ নিয়েও বলা যাবে। আপাতত এখানেই ইতি টানছি। উপসংহারে বলি, শব্দ দিয়ে গল্প লিখি আমরা। আবার শব্দদেরও গল্প থাকে। ভাষা সম্বন্ধে লেখা হয় যে ভাষায় তাকে “অধিভাষা” বলে। শব্দ নিয়ে লেখা এই শব্দ গুলোকে অধিশব্দ বলা যাবে কি?

বাঁধন

মাস চারেক আগে যখন দেশে যাওয়ার টিকিটটা কেটেছিলাম তখন ভেবেছিলাম এক্সপিরিয়েন্সটা সুখকর হবে। আমার স্ত্রী আর আমার দু বছরের কন্যা সন্তান মহারাজার কাঁধে চেপে যাবে দিল্লি হয়ে কলকাতা। আর তার এক মাস পরেই আমি তাদের জয়েন করব আমার খুব কাছের সেই ছোট্ট শহরতলি রামরাজাতলায়। এ শহরে সরু সরু অলিতে গলিতে আমার ছোটবেলাগুলো সারা বছর আমার দেখা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। সেই বুড়ো শিবতলা, সেই বারোয়ারী মণ্ডপের পুজো, সেই জমিদার বাড়ির আদলে মৈনাকদের বাড়ি আজও আমার অভাবে খাঁ খাঁ করে – অন্তত এই দুর প্রবাসে বসে এমনটাই আমি মনে করি। স্ত্রী-কন্যা বিহনে আমি এই একটা মাস উপভোগ করতে পারব আমার হঠাত-করে-পাওয়া আইবুড়ো সময় বিশেষত এক মাস পরেই যেখানে নিছক ছুটি কাটাতে দেশে যাওয়া এবং সেই মানুষ দুটির সাথে পুনর্মিলন, সাথে পাব বাবা-মার আদর, আমার প্রিয় ভাইঝিদের সর্বক্ষণ ন্যাওটা হয়ে আমার সাথে লেগে থাকা। কিন্তু তার আগে এই একলা একটা মাস। সত্যি কথা বল্যতে কি আমার নিজের সঙ্গ আমার বেজায় পছন্দ। কোন এক মনীষী লিখে গেছেন “A Poet talks to himself only. Others just overhear it” – লেখালেখি করা যে কোন মানুষের ক্ষেত্রেই কথাটা প্রযোজ্য। আর এই নিজের সঙ্গে কথা বলতে কিছুটা নিজের সময়ের প্রয়োজন হয়। আমার ব্যাচেলরহুড মানে বেশি কিছু নয়, একটু হয়তো জিনিস যত্র তত্র ছড়িয়ে রাখা। কিচেনের দেরাজ হোক বা বইয়ের, যে বা যারা যেখান থেকে বেরোল তাদের স্বস্থানে প্রত্যাবর্তনের কোন তাড়া নেই। রাতের বেলা ভাত-রুটির বদলে এক প্যাকেট ম্যাগি। অফিস থেকে ফেরার নো তাড়া। ফেরার পথে কোন পথ চলতি রেস্তোরায় পা আটকে গিয়ে একটা কি দুটো সোনালি তরল যদি আত্মস্থ করে নিই তাহলেই বা ক্ষতি কি? টিভিতে ইয়াপ টিভিতে বাংলা সিরিয়ালের বদলে আমার প্রিয় গজল বা ভজন কি চন্দ্রবিন্দু কি ফসিল। মোটের ওপর কারু কাছে জবাবদিহি করার নেই। একটা মাস আমার শর্তে আমার জীবন বাঁচা। আর আপনারা যারা বিবাহিত তাদেরকে বোধ হয় বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না যে ছাপোষা বাঙালি হিসেবে আমাদের জীবনে দাম্পত্য ঝগড়া-বিবাদ-কলহ লেগেই থাকে। কথায় বলে ঘটি-বাটি একসাথে থাকলে ঠোকাঠুকি হয়। কিন্তু জড় হওয়ার সুবাদে সেই ঠোকাঠুকি কুরক্ষেত্র যুদ্ধের আকার নেয় না। কিন্তু সজীব বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যাপার আলাদা। এই ধরুন সবে একটা ব্লগের পাতায় একটু চোখ দিয়েছি কিম্বা একটা রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের নরম উত্তাপে নিজেকে একটু সেঁকে নিচ্ছি কি আমার শ্রীমতীর ডাক পড়বে “শোনো না সানাই-এর দুধটা গরম করে আনো না গো।” কিম্বা “বাসন গুলো মেজে দাও”। শুনে যদি মুখ বেঁকিয়েছ তাহলেই বাড়িতে শুরু হয়ে যাবে হার্ড মেটাল। না দাবী গুলো কোনটাই অন্যায় নয়। কিন্তু ন্যায্য দাবী হলে যে মেনে নেবই, নিজেকে এমন সবিশেষ মহাপুরুষ বলে দাবী আমি করছি না। বিশেষতঃ মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বার্থপর তো তার নিজের জনের ওপরেই হয়। প্রবাসে থাকলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সব কিছুই নিজেকে করতে হয়। কোন সাহায্যকারী মাসীর অভাবে আমাদের বাঙালি স্বত্তার একেবারে ত্রাহিমাম অবস্থা। আর তার ওপরে আছে সানাই-এর দেখভাল করার ভার। সানাই, আমার কন্যা সন্তানটিকে এক কথায় বর্ণনা করতে হলে বলতে হয় “আশাতীত”। অর্থাৎ কিনা ওর ওই ক্ষুদ্র মাথায় এই মুহূর্তে ঠিক কি প্ল্যানিং চলছে সেটা বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাও ঠিক ঠাহর করতে না পেরে এ যাত্রা সেই দায়িত্বটা তাই আমাদের ওপর বর্তে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নতুন সৃষ্টি কর্মে মেতেছেন। এই হয়তো দেখলেন দেবী মন দিয়ে কিষা দেখছে অর্থাৎ কিনা লিটল কৃষ্ণ দেখছে, আর সেই দেখে পায়ের ওপর পা তুলে আমি চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়েছি, চোখের নিমেষ ফেলবার আগেই তাকে হয়তো পাওয়া যাবে ডাইনিং টেবিলের তলায় চেয়ারের চক্রব্যূহে আটকা পড়ে তুমুল চিৎকারে এস-ও-এস পাঠাচ্ছে। অমন একটা জনমানবহীন জায়গায় ওর কি কাজ থাকতে পারে সে ব্যাপারে আমায় প্রশ্ন করবেন না। কারণ উত্তরটি আমি সম্যক অবগত নই। কিন্তু তাকে ওখান থেকে রেসকিউ করতে ওই সবুজ অমৃতের চাঙড়কে সেন্টার টেবিলে ঠকাং করে নামিয়ে আমাকেই যে মাঠে নামতে হবে সেটা বোধ হয় বলাই বাহুল্য। চায়ের আমেজের যাকে বলে এক্কেরে হাতে হ্যারিকেন। সেটাও যদি ছোট্ট গোপালের দুষ্টুমি দেখে অনুপ্রাণিত ভেবে ক্ষমা করে দেন, তবে দেখবেন রাত্তির সারে বারোটার সময় হঠাত করে আপনাকে হাত ধরে ঠাকুরের বেদীর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি ভেবে থাকেন ঠাকুর দেবতায় ভক্তি ভাল বই মন্দ না – তাহলে নিতান্ত ভুল করছেন। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে যে প্রবাদ শোনা যায় তা যে নেহাত অপবাদ নয় তার প্রমাণ হাতেনাতে পাবেন। চোখ টোখ বুজে একটি জোরদার প্রণাম ঠুকেই দেবীর দাক্ষিণ্য পেতে হাত বাড়িয়ে দেবে। অর্থাৎ কিনা প্রসাদ চাই। দেবী তখন প্রসন্ন হয়ে প্রসাদ দিতে চান কিনা ঠিক জানি না, কিন্তু আমার আপনার নিশ্চিত অপ্রসন্ন লাগবে সেটা স্বাভাবিক। আপনি যদি রাত্রি সাড়ে বারোটার সময় প্রসাদরুপী মিছরি না খেয়ে ঘুমনোটাই শ্রেয় কর্ম বলে উপদেশ দিয়ে তাকে বিছানায় পেড়ে ফেলার চেষ্টা করেন, তাহলে সানাই সপ্তম স্বরে যে সানাই ধরবে তাতে আক্ষরিক অর্থে পিলে চমকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রভূত। আলকাতরাজে নিয়ে গিয়ে থার্ড ডিগ্রী টর্চার করলেও কেউ এই ধারা চেঁচায় কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। তারপর ধরুন না সেদিন দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন যখন শিকাগোর ভারত সেবাশ্রমের ছোট্ট পরিসরে প্রায় গোটা আটশ লোক পুষ্পাঞ্জলি দিচ্ছে তখন হয়তো দেবী মুমুক্ষু হয়ে পড়লেন। মুমুক্ষু অর্থাৎ বাবার বাহু বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা। বাবার হাত হ্যাঁচকা টানে ছাড়িয়ে নিয়ে ভক্ত মণ্ডলীর থিকথিকে ভিড়ে মুহুর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তারপর মিনিট দশেক পর্যন্ত গোরু খোঁজা খুঁজে যখন বুকের মধ্যে আপনার হাপর পড়ছে, আপনার স্ত্রীয়ের চোখের অশ্রুগ্রন্থি গুলো সবে কাজে নামবে বলে মনঃস্থির করেছে সেই সময় কোন শুভাকাঙ্ক্ষী এসে যদি আপনার বাচ্চা ধরে দিয়ে যায় এবং বলে যায় “রাস্তায় হাঁটছিল। একটু খেয়াল রাখিস।” তখন নির্ভেজাল মুখ করে তাকে অজস্র ধন্যবাদ দিলেও মনে যে বড় আনন্দের উদ্রেক হয় না সেটা দুরন্ত বাচ্চার (মানে বাঁদরের ইউফেমিজম আর কি) বাপমা মাত্রেই অনুধাবন করতে পারবেন। এ হেন সানাইকে সামলানো মোটের ওপর স্ট্রেসফুল। আমার এক মার্কিন কলিগ আমায় একবার বলেছিল “With small kids, you have high moments and low moments. Where high moments are truly blissful, low moments are truly frequent.“ হাড়ে হাড়ে সেটা উপলব্ধি করি নিয়মিত।   

 

এর পরে আছে ধরুন আমার স্ত্রীয়ের পরিষ্কারের বাতিক ও তৎসম্বন্ধীয় পিটপিটানি। বেসিনের বেড থেকে বেডরুমের, কোথাও এতটুকু আঁচিল দেখলেই সেটা পরিষ্কার করে ফেলবে তৎক্ষণাৎ কিন্তু তার পরিবর্তে দুটো বাঁকা কথা আমার বরাদ্দ। আমি নিশ্চিত, স্বচ্ছ ভারত অভিযানে সামিল হলে ও একটা কেউকেটা কিছু হতে পারত। স্বচ্ছতায় ও একেবারে লেটার মার্ক্স আর আমি মেরেকেটে দুই কি তিন। অতএব লাগ লাগ লাগ ভেল্কি নারদ নারদ। তো এই বৌ-বাচ্চার যাঁতাকলে চাপা পড়া আমি নিরীহ মানুষ যদি এই এক মাসের মুক্তি একটু রেলিশ করি তাহলে সংসারী মানুষের পরীক্ষায় আমায় দশে শূন্য দিয়ে ক্লাসরুমের বাইরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে নিশ্চয়ই রাখবেন না। আচ্ছা এখানে একটা কথা না বলে রাখলে সত্যের অপলাপ হবে যে আমি নিরীহ মানুষ এই মতবাদটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত। আমার স্ত্রীয়ের মতবাদ হল আমার মত ঝগড়ুটে খিটখিটে মানুষ ত্রিভুবনে নেই।  

 

তাই টিকিট কাটার পরে প্রথম প্রথম আনন্দই হচ্ছিল এক মাসের পূর্ণ স্বাধীনতা আর তত পরবর্তী কলকাতায় গিয়ে স্ত্রী সন্তানের সাথে পুনর্মিলিত হওয়ার কথা ভেবে। ওদের কলকাতা যাত্রার দিনটা দুর্গাপূজার পরে। দেখতে দেখতে দুর্গাপুজা এসে পড়ল। শিকাগোয় পুজো বিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমরা দ্যাবা দেবী দুজনেই। কোথাও নাটকে অভিনয় করছি, কোথাও নাট্য নির্দেশনা সব মিলিয়ে একেবারে যাকে বলে শিকাগো সরগরম। প্রবাসী বাঙ্গালিদের মধ্যে বাঙ্গালিয়ানা ধরে রাখার যে চাড়টুকু থাকে গড়পড়তা কলকাতার বাঙালিদের মধ্যে সেটা থাকে না। কারণ কলকাতার বাঙালিরা এমনিই বাঙালি। কেউ তাদের বাঙ্গালিত্ব কষ্টি পাথরে যাচাই করতে আসে না। কিন্তু সেই সুবিধা দিল্লি কি শিকাগোর বাঙালির নেই। তাই প্রতি মুহুর্তেই ঝাঁপ দিতে হয় বাঙ্গালিত্বের অগ্নিপরীক্ষায়। তাই দুর্গাপুজো হোক বা নববর্ষ, বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাজি সাজিয়ে বসে পড়তে হয়। আর তাই এই দুর্গাপুজোর আগে আগে চোখে নাকে দেখতে পাওয়া যায় না। চওড়া কাঁধে দায়িত্ব নিয়ে দুর্গাপুজোটা যখন উতরে দিলাম তখন দেখলাম ওদের দেশে যাওয়ার দিনটা আর দুদিন পরে। আশ্চর্য ব্যাপার হল টিকিট কাটার দিনে মনের মধ্যে যে তিরতিরে গঙ্গা ফড়িংটা উড়ে বেড়াচ্ছিল সেটাকে আর অনেক খুঁজেও কোথাও পেলাম না। বিয়ের ভাঙ্গা আসরের মতই রশনচৌকি ঝুপ করে বন্ধ। বুকের ভেতরটায় কেমন যেন ফাঁকা। নিয়ন আলোয় ভরা ম্যাডিসন স্কোয়ারে যেন ঝুপ করে হয়ে গেছে লোডশেডিং। অথচ এই দিনটার প্রত্যাশাতেই বসে ছিলাম কিছুদিন আগেও। কিন্তু আজ যখন মানুষ দুটোর দেশে যাওয়ার দিন দুয়েক বাকি, আসন্ন আমার অখণ্ড স্বাধীনতা আর অবসর, অলক্ষ্যে অপলকে তাকিয়ে থাকি আমার দু বছরের ডানা লোকানো ছোট পরীটির ঘুমন্ত মুখের দিকে। মুখ ফুটে জিগ্যেস করতে পারি না কিন্তু হঠাতই অকারণে জানতে ইচ্ছে হয় আমার সাত বছরের সঙ্গিনীটি কলকাতা ট্রিপের হই হট্টগোলের মধ্যে আমায় মিস করবে কিনা। বিদায়ী মুহুর্তটিতে চোখে একটা অস্বস্তকর বিচ্ছিরি জ্বালাধরা ভাব। “ভাল ভাবে যেও” বলতে বলতে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয় কারণ চোখের মধ্যে অবাধ্য কিছু গ্ল্যান্ড সিক্রেশান শুরু করেছে। বিশ্বাস করুন আমি একেবারে কাঁদুনি ছিলাম না। কিন্তু আজকাল কারণ অকারণে হঠাৎ হঠাৎ চোখের পাতা কেমন ভারি হয়ে আসে। কোন ছায়াছবির করুণ রসাত্মক কোন দৃশ্য হোক বা কলকাতা থেকে ফেরার সময় এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা মার মুখের দিকে তাকিয়েই হোক চোখটা বড়ই নিয়ন্ত্রণ হারায় আজকাল। আসলে মায়া বড় প্রবঞ্চক। যত দিন যায় মানুষকে তার অদৃশ্য গুটিপোকার জালে আস্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। নিজের মুখ নিঃসৃত লালারসে বিজারিত করে কখন যে আমাদের সকলকে আমি থেকে আমরা করে দেয় টেরই পাওয়া যায় না।

 

যাই হোক বিদায়ী মুহুর্তটা কেটে যাওয়ার পরে সারাদিন অফিসের কর্তব্য সামলে সন্ধে বেলা যখন বাড়ি ফিরি দেখি আমার বাড়ির সব আসবাব, সকল সামগ্রী সেই মানুষ দুটির জন্য যেন নীরবে প্রতীক্ষা করছে। যে দুটো মানুষের হাঁকডাকে আমার স্বাধীনতা নিত্য বিপন্ন আজ এই শূন্য ঘরে তাদেরই গলার স্বর শুনতে মন হয়ে ওঠে উচাটন। পরিপাটি করে ভাঁজ করে রাখা জামা প্যান্টে, সেলফে গুছিয়ে রাখা চায়ের কাপে সর্বত্র খুঁজে পাই আমার স্ত্রীয়ের ছোঁয়া। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা পুতুল আর খেলনা গাড়িগুলোকে দেখলে সেই ছোট্ট দুরন্ত মানুষটার কচি আঙ্গুলগুলোকে ছুঁয়ে দেখার লোভে আমার আঙ্গুলগুলো ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শাস্ত্রে বলে “ত্রিয়া চরিত্রম দেবা ন জানতি” অর্থাৎ মেয়েদের বোঝা  দেবতাদেরও অসাধ্য।  কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হল পুরুষের মন জানাও বোধ হয় দেবতাদের অসাধ্য – শুধু দেবতাদের কেন নিজের পক্ষেও নিজের মন জানা মোটেই অনায়াসসাধ্য নয় এই উপলব্ধি আমার শিরায় উপশিরায় এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল।

নীল তিমি

ব্লু হোয়েল গেম নিয়ে পড়তে গিয়ে জানলাম যে যারা ডিপ্রেসড ইন্ডিভিজুয়াল বা নৈরাশ্যবাদী, সেরকম টিন এজাররা স্বাভাবিক কারণেই এই নীল তিমির খপ্পরে সবচেয়ে সহজে পড়ছে। গেমের আবিষ্কারকদের জীবন দর্শন হল এই যে এইসব নিরাশাবাদীরা এমনিই পৃথিবীর কোন কাজে আসে না। তো এদের শুরুতেই খরচা করে দিলে পৃথিবীর এবং মানুষ জাতির আখেরে লাভ। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত যুক্তিহীন মত কিন্তু পড়তে পড়তে হঠাত মনে হল এই মানুষ জাতির ইতিহাসে এই গেম বের হওয়ার অনেক আগে থেকেই, সভ্যতার আদি লগ্ন থেকেই এইরককম একটা প্রকাণ্ড নীল তিমি তার অদৃশ্য হাঁ নিয়ে ঠায় বসে আছে। যতক্ষণ তোমার এই সমাজকে, এই পৃথিবীকে কিছু দেওয়ার আছে, ততক্ষণই ওই আগ্রাসী হাঁ থেকে তোমার নিস্তার। যেদিন তোমার দেওয়া শেষ সেই দিনই ওই নীল তিমির প্রকাণ্ড জঠর গহ্বরের পথে তোমার মহাপ্রস্থান। এই সর্বগ্রাসী নীল তিমিই রোজ আমাদের প্রেরণা দেয়, রোজ আমাদের তাড়না দেয় নতুন কিছু করার। নিজেকে নতুন করে চেনার। সিন্দাবাদের মত জাহাজে করে নিজেরই মনের সাগরের বন্দরে, বন্দরে, কুলে, উপকূলে ঘুরে মনি, মুক্তো, রত্ন সংগ্রহ করে এনে এই সংসারকে শুল্ক স্বরূপ সবটুকু দিতে হবে। যেদিনই তোমার জাহাজের পাল ছিঁড়বে কি হাল ভাঙবে বা গতি হবে রুদ্ধ সেই মুহুর্তেই সেই নীল তিমির বিশাল হাঁয়ের মধ্যে তলিয়ে যাবে তুমি তোমার বিকল জাহাজ সমেত। সমাজরূপী সেই নিষ্ঠুর ট্রেজারার গুনে গেঁথে মেপে রেখে দেবে তোমার সবটুকু সঞ্চয়। “সোনার তরী” কবিতায় এমনটাই বলতে চেয়েছেন কবিবর। তবু আজ এই ব্লু হোয়েল গেম আমায় এক নতুন আঙ্গিকে চেনাল এই অদৃশ্য অথচ সর্বগ্রাসী নীল তিমিটিকে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ভার্চুয়াল নীল তিমিটাকে তো মারার সর্বতো প্রকার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু ওই চিরন্তন নীল তিমিটার নিরন্তর ভয় যেটা আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়, ফসল ফলিয়ে বেড়ায় সেটার বেঁচে থাকা বোধ হয় খুব জরুরী। ওই নীল তিমিটার আগ্রাসন থেকে বাঁচতেই তো আবিষ্কার আগুন, চাকা, ষ্টীম ইঞ্জিন, মাধ্যাকর্ষণ, আপেক্ষিকতাবাদ। পশু থেকে মানুষকে মানুষ করেছে এই নীল তিমি। একদিন এই নীল তিমিই হিংসা, ঘৃণা, কলুষ আর যত মিথ্যা জৌলুস কেড়ে নিয়ে মানুষকে দেবতা বানাবে। মানুষ ঈশ্বর হওয়ার আগে বোধ হয় ওই নীল তিমিটার হাঁ থেকে নিস্তার নেই।  

ত্রিয়া চরিত্রম

স্ববাবু মহারাজা যযাতিকে জিজ্ঞাসা করলেন “প্রভু, মহামতি মনু লিখেছেন ‘ত্রিয়া চরিত্রম দেবা ন জানতি কুতঃ মনুষ্যঃ’ – হেঁ হেঁ তখন থেকেই বুঝি টাইপো অর্থাৎ কিনা typographical error-এর জন্ম। উনি নিশ্চয়ই “স্ত্রিয়া চরিত্রম” লিখতে গিয়ে ছড়িয়ে ফেলেছেন। তাই না?

মহারাজ যযাতি বললেন “না হে বৎস। কালি-কলম ইত্যাদি কি-বোর্ড দিয়ে প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগে পর্যন্ত হতভাগ্য লেখকেরা বানান-টানান আর একটু সিরিয়াসলি নিত। ত্রিয়া মানে unnamedহল গিয়ে বুদ্ধি বা মতি। মতি তিনপ্রকার – গুর্মতি, মন্মতি আর দুর্মতি অর্থাৎ কিনা শুভ বুদ্ধি, নির্বুদ্ধি আর দুষ্ট বুদ্ধি। যেহেতু বুদ্ধি স্ত্রী-লিঙ্গাত্মক শব্দ, তাই কলিযুগে বাঙালি নামক ক্ষুরধার বুদ্ধিধর এক ধরনের প্রাণী এটিকে “স্ত্রীয়া চরিত্রম” করে নিয়েছে। বিয়ে-থা তো করেছ বৎস। তো বুঝতেই পারছ কথাটাকে “স্ত্রীয়া চরিত্রম” করে নিলেও সত্যের অপলাপ তেমন হয় না।”

তা যা বলেছেন স্যার। দেখুন না, দুগগা ঠাকুর দেখতে যাবে বলে আমার বেটার হাফ গোটা দশেক শাড়ি কিনে ফেললেন। জিগেস করলাম “পুজোর চারদিনে তো চারটেই শাড়ি লাগবে” – তাতে উত্তর দিলেন “আরে বাবা সকাল-সন্ধে পড়তে হবে না?” আমি বললাম “তাহলেও সর্বসাকুল্যে আটটা”। আমার স্ত্রী বললেন “বিসর্জন কবে হয় এখন তার ঠিক নেই। তাই দু-তিনটে বাফার শাড়ি রাখতে হবে না?”  বলুন স্যার এরপরেও যদি আমি বলি আমি আমার স্ত্রী-বুদ্ধি ইয়ে মানে আমার স্ত্রী-এর বুদ্ধির গতি এখনও বুঝতে পারিনি, কিছু ভুল বলা হবে স্যার?

যযাতি বললেন “ঠিক ঠিক। শাস্ত্র ছাড়, এই জন্যই কবিবরেরা বলে গেছেন – রমণীর মন বড় সাধনার ধন।” মানে নারীমন পেতে গেলে এবং বুঝতে হলে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে।    

“প্রভু, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বিচিত্রগতি কি তবে নারীদের মন?”

“তবে প্রভু, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বিচিত্রগতি কি তবে নারীদের মন?”

তার থেকেও বিচিত্রগতি হচ্ছে ইন্টার-ব্যালিস্টিক মিসাইল। কিম বাবু কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে কোরিয়া থেকে কুমায়ুন কিম্বা সাইবেরিয়া কি শিকাগো সফর করে। এই জন্যই বলিউডের কিং অব রোমান্স গেয়ে গেছেন “সফর কা হি থা ম্যায় সফর কা রাহা”। সে যাক। তবে এর থেকেও বিচিত্রগতি এক বস্তু আছে।

কি স্যার?

সেটি হল পাঠকের মন। আজ তোমার লেখা পড়ছে, কাল দুর-ছ্যা করবে। তাই ঠ্যাকায় পড়লেও কখনো পাঠককে ঠকাতে যেও না।

  

সুখ

এইখানে আজ আমি থাকি। এইখানে কাটে এই বিনিদ্র রজনী একাকি। এইখানে একান্তিকে আমার এই ভাঙ্গা মন্দির। চারিদিকে তুলেছি এক নিশ্ছিদ্র প্রাচীর। বাইরে হিংস্র উরগদের জান্তব চিৎকার। এই আঙিনাতে বসে শুনতে পাই না আর। চোখে শুধু এক স্বপ্ন লেগে থাকে – একদিন নির্জন বনবীথিকার কোনো বাঁকে ফুটবে পলাশ আর ফুটবে রক্ত কিংশুক। লাজুক পাপড়ি গুলো যেন কোনো কিশোরীর আনত চিবুক। গাছের পাতার ফাঁকে এক ফালি সোহাগি রোদ্দুর বলে যাবে “বিশ্বাসে মিলায় সুখ…..তর্কে বহুদূর।”

সন্ধে নামার প্রাক্কালে

বৈশাখী বিশীর্ণ বিকেলে

মেঘেদের মাধুকরী শেষ হলে পরে

বায়বীয় বিষণ্ণতা আকাশের চোখে লেগে থাকে

 

সন্ধে নামার প্রাক্কালে মনে হয়

পৃথিবীটা ভারি কাব্যময়

অন্তরালে ডালে ডালে শুকসারি চুপ বসে থাকে

দোয়েল চন্দনারা কোন এক বেদনসুরে গায়

পৃথিবীতে স্বপ্ন নামে, কবিতা নামে ধীর ভঙ্গিমায়

শিশির পেলব কথা জমে থাকে পথেদের বাঁকে

 

অবসান যত অঙ্ক, যত বোঝাপড়া

অবসান ছদ্মবেশ পড়া

ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমি ফিস্‌ফিসে রূপকথা বলে যায়

অন্তরে খেলা করে কোন এক গভীর অসুখ

গাছের ছায়াতে সব বিদেহীরা ভিড় করে মূক

মর্ত্য যেন জাদুমন্ত্রে মায়ালোক এক লহমায়

 

এক অদ্ভুত আলো খেলা করে গাছেদের কোলে

দীঘি-মাঠ-প্রান্তর জিনপরিদের কবলে

ঝিঁঝিঁ পোকাদের একান্ত আলাপচারিতা

নীড়ে ফেরা পাখিদের কুহু কাকলি

এক কল্পলোকের গল্প বয়ে আনে এ সকলই

অপূর্ব মায়ালোক গড়ে এই গাছ, মাটি, আঁধার আর সন্ধ্যা-স্নিগ্ধতা

রবিবাসরীয়

happy-sunday-quotes-sunday-humorরবিবার সকালবেলা কোথায় সদ্য ভাজা গরম মুচমুচে চিঁড়ে ভাজার মত আবহাওয়া থাকবে, কোথায় শরতের মেঘের মত হালকা খুশি ভাসবে বাতাসে, মার্চ মাসের ভোরের মত না-গরম-না-ঠান্ডা একটা ফুরফুরে মেজাজ বাড়িতে ঘুর ঘুর করবে তা না, সকাল থেকে শ্রাবণের জলদ গম্ভীর আকাশের মত হাল বাড়ির। বৃষ্টি কখন নামে তার ঠিক নেই। ইন্ডিয়া অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ আছে। শমীক টিভিটা খুলে দেখবে কিনা সেই নিয়ে বেশ খানিক চিন্তা করে আপাতত না দেখাই ঠিক হবে ডিসিশান নিয়েছে। মোবাইল খুলে অফিসের মেল চেক করার নাম করে ক্রিকইনফো ডট কম থেকে লেটেস্ট স্কোরটা দেখে নিচ্ছে। আর মুখটা যারপরনাই গম্ভীর রাখার চেষ্টা করছে। রবিবার দুপুরে একটু কচি পাঠার ঝোল খাবে বলে কাল থেকে মনের মধ্যে কাঠবিড়ালি টাইপস হালকা খুশি তিড়িক তিড়িক করে চড়ে বেড়াচ্ছিল। সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠেই বিল্টুর দোকান থেকে নিয়েও এসেছে। কিন্তু সেই মাংসের ব্যাগ রান্নাঘরের এক কোনায় পড়ে আছে। অনাদৃত। এতক্ষনে তাদের কড়াইতে পেয়াজ টোমাটোর কার্পেটে শুয়ে গরম তেলের জাকুজিতে হট বাথ নেওয়ার কথা। ছাল ছাড়ানো নুন মাখানো অবস্থায় পড়ে আছে মাংসের আলুরা। মানে যাদের মাংসের ঝোলে সিক্ত হয়ে মধ্যাহ্ন ভোজনে রসনার মধ্যে অদ্ভুত সঙ্গীত সৃষ্টি করবার কথা ছিল। বাবাই বই-এর পাতা খুলে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। শমীক জানে তার এখন এক বিন্দুও পড়ায় মন নেই। চুপচাপ বসে বাড়ির সিচুয়াশানটা জাজ করার চেষ্টা করছে। কারণ এতক্ষনে তার বারোয়ারি তলার মাঠে বল পিটতে যাওয়ার কথা। এমনকি চারপেয়ে ভুলোও কি বুঝে বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করছে না। আর এ বাড়ির হাইকমান্ড ওরফে হোমে মিনিস্টার ওরফে শমীকের স্ত্রী, অন্তরা, গম্ভীর মুখে বসে টিভিতে কি একটা সিরিয়াল দেখছে। চোখের কোনে একটু জল শুকিয়ে আছে। শমীক আড়চোখে একবার দেখে নিয়েছে। এটা সেই সিরিয়ালটা। একটা ভীষণ ভাল বউমা সংসারের সব কাজকর্ম বিনা বাক্যব্যয়ে করে ফেলছে। শাশুরি-ননদ সকলেই তার সাথে অত্যন্ত ঢ্যামনাগিরি করলেও বউমার সাত চড়ে মুখে রা নেই। দুদিন বাদে বাদেই তাকে গয়না চুরির অপবাদ দিলেও সে শুধু মাত্র সংসারের মঙ্গল চিন্তা করে। এমন সহমর্মিতার প্রতিমুর্তি দেখলে ভগবান বুদ্ধ-ও বোধ করি লজ্জা পেতেন। এমন ক্ষমার ক্ষমতা দেখে মেজাজ চটকে গিয়ে গান্ধিজীও বোধ হয় একটি চড় কষিয়ে দিতেন বউমাটিকে – মনে মনে ভাবে শমীক। নর্মাল দিনে সে সিরিয়াল চললে পাশ থেকে টিপ্পুনি কেটে থাকে। কিন্তু আজ সিচুয়েশান খুব চাপের। কি থেকে ঝামেলা শুরু হয় তার ঠিক নেই। তাই সে ক্রিক-ইনফোতে মনোনিবেশ করে আবার।

সকাল পর্যন্ত সব ঠিক-ই ছিল। ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাবাই এর সাথে অন্তরার “দাঁতটা মাজ না রে বাঁদর। দুধটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে না” টাইপস স্নেহ সম্ভাষণে বোঝা যাচ্ছিল একটা নর্মাল দিন। বাজারে যাওয়ার সময়েও অন্তরা বলল “একদম হাড়-ওলা মাংস আনবে না। আর শোনো মেটে নিয়ো তো।” শমীক বলল “কেউই যদি হাড়-ওলা মাংষ না নেয় তাহলে মাংসের দোকানদারদের এবার থেকে জেনেটিকালি মডিফায়েড বোনলেস পাঁঠা প্রোডিউস করার কথা ভাবতে হবে”। এটা শমীকের প্রি-ডিফেন্স। সে জানে সে যতই চেষ্টা করুক না কেন ঠিক হাড়ওলা মাংসই তার কপালে জুটবে। অন্তত অন্তরার সেরকমই বক্তব্য হবে। অন্তরা নিজে গিয়ে নিয়ে আসলে মাংসের গুণমান, কোয়ালিটি ইত্যাদি ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মত ঝকঝকে হয়ে যায় কেমন করে একটা। এই অব্দি সব ঠিক ছিল। বাজার থেকে ফিরে শুনলো কেস গড়বড়। অন্তরার তার কেটে গেছে। কেমন একটা তড়িৎপৃষ্ট মুখ। কি না সকালের ডেইলি এফ বি ডায়েট করতে গিয়ে অন্তরা দেখেছে ওর মা চন্দ্রানির এফবি স্ট্যাটাস

“শঙ্কুর পা মচকে গেছে। হাড় ভেঙ্গেছে কিনা জানা যাবে ডাক্তার দেখালে। ফীলিং স্যাড।”

শঙ্কু অন্তরার বাবার নাম। তখন থেকেই অন্তরার ভীষন দুশ্চিন্তা। দুবার ফোনও করেছে। কিন্তু মা ফোন ধরে নি। নিশ্চয়ই এখন ডাক্তার-হসপিটাল-নার্সিং হোম করছে। শমীক মনে মনে ভাবে, ভদ্রলোক আর দিন পেলেন না। থেকে থেকে এই রোব্বার সকালেই পা মচকালেন। এর জন্য মৃত পাঁঠা ওনাকে কোন দিন ক্ষমা করবে না। সোমবার কি মঙ্গল বার করে পা মচকালে বিশাল মহাভারত অশুদ্ধ হত? আর শাশুড়ি মার বলিহারি। সামান্য পা মচকেছে তাতে ঘটা করে স্ট্যাটাস আপডেট দেওয়ার দরকার কি? ডাক্তার দেখিয়ে পা ভেঙ্গেছে জেনে দিলে তাও একটা কথা ছিল। সব সময় মেয়েদের বাবা-মারাই বেশি স্মার্ট হয় কেন শামীক বোঝেনা। শত শত বার চেষ্টা করেও নিজের বাবা-মাকে স্মার্ট ফোন ধরাতে পারেনি। রোব্বার এই এগারটা নাগাদ দ্বিতীয় বার কফি খায় সে। অনেক চেষ্টা করেও কফিটা অন্তরার মত বানাতে পারে না। বিবাহোত্তর জীবন যে মেয়েরা  “জিনিয়াস” হয় এটা শমীক সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করে। কিন্তু আজ অন্তরার হাতের কফি তো দুরের কথা, নিজেও যে বানাতে যাবে, সেটাতেও ভরসা পাচ্ছে না। হঠাৎ যদি “আমার বাবার পা ভেঙ্গেছে তোমার কোন মাথা ব্যাথাই নেই” শুরু করে দেয় তাহলে নিজেকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে প্রবল মাথা ধরে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই সময় বিরাট কোহলি না খেলে রাহুল দ্রাবিড় খেলাই ভাল। বল আসলেই ডট। ডট। ডট। লম্বা খেলতে হলে দু একটা ওভার মেডেন ছাড়তেই হয়।

এই সময় বিরাট কোহলি না খেলে রাহুল দ্রাবিড় খেলাই ভাল। বল আসলেই ডট। ডট। ডট। লম্বা খেলতে হলে দু একটা ওভার মেডেন ছাড়তেই হয়।

এমন সময় ফোনটা এল। অন্তরার মায়ের ফোন।

কি রে ফোন করেছিলি নাকি? দু-তিনটে কল দেখলাম

বাবা এখন কি করছে? আমি তো চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছি।।

কি আবার করবে? যা করে এই সময়। বিন্দাস শুয়ে আছে। আর আমার হয়ে গেছে বাঁশ।

ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছ কখন?

দেখি দু-এক দিন পরে নিয়ে যাব। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।

এখনো নাও নি? তুমি কি গো? পড়ল কি করে?

সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নামছিল। ওটা তো ওরকমই। সারাক্ষণ ফুটছে।

এই বয়সে বাবা লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। বাবার কি ভীমরতি হল নাকি?

তোর বাবা কেন নামবে? নামছিল আমার নতুন সোনামোনাটা। ও তুই বোধ হয় একে দেখিস নি। মাস খানেক আগে একদিন রাস্তায় দেখলাম ডাস্টবিন ঘাঁটছে। খেতে না পেয়ে রোগা। গায়ে ঘা। আমি তো জানিস-ই পশুপ্রেমী। এই সব দেখলেই চোখে জল চলে আসে। তা কুকুরটাকে বাড়ি আনলাম। সবে খাইয়ে, ভেটেরিনারি ডাক্তার দেখিয়ে একটু সুস্থ করে তুলেছি, আজকে দেখ না পড়ে গিয়ে পা টা মচকে বসে আছে। লেংড়ে হাঁটছে। আমার কপাল। সারা জীবন অন্যদের সেবা শুশ্রুষা করেই গেল।

ঊফফ মা। এইটা ঘটা করে এফবি আপডেট দিয়েছ?

কেন? তুই দিস না। শমীকের জন্মদিনে একই ঘরে থেকেও এফ বি তে “হ্যাপি বার্থ ডে মাই লাভ” দিস না? তুই দিলে সেটা ফেসবুক স্ট্যাটাস আর আমি দিলে আদিখ্যেতা?

আঃ মা ঝগড়া কোরো না তো! কিন্তু তুমি শেষে বাবার নামে কুকুর পুষেছ? বাবার সাথে তোমার ঝগড়া-টগড়া এইভাবে পাবলিক করার কোন দরকার ছিল?

বাবার নামে কেন পুষতে যাব? ওই নামের একটা মানুষকে সামলাতেই সারা জীবন হিমসিম খেয়ে গেলাম। আবার আর একটা? আমি পাগল নাকি? ওর নাম তো রেখেছি বঙ্কু। আমাদের ছেলের মতই তো। তাই তোর বাবার নামের সাথে মিলিয়েই রাখলাম।

ঊফফ মা। তুমি না? মানে কিছু বলার নেই। তাহলে এফবি তে দিয়েছ কেন শঙ্কুর পা ভেঙ্গে গেছে বোধ হয়।

ও শঙ্কু লিখেছি বুঝি। ওটা বঙ্কু হবে। এই ফোনটাও বলিহারি? আগে ব্যাবহার করা ওয়ার্ড ফট করে রিপ্লেস করে দেয়।

অন্তরা মায়ের সাথে আরও কিছু ঝগড়া করে ফোন রাখল। মুখে হাসি ফুটেছে। টিভিতে তখন সেই সুপারলক্ষী বৌটি পরাধীন ফ্রান্সের সেই কিংবদন্তী কৃষককন্যা জোন অব আর্ক-এর মত তার শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী কোন এক দুষ্টু লোককে শাস্তি দিতে যুদ্ধ যাত্রা করেছে। রিমোটের একটা বাটনের আঘাতে সে ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে যায়। অন্তরা এবার রান্নাঘর মুখো। শমীক স্পষ্ট দেখতে পায় ব্যাগ-এর মধ্যে থাকা মাংসের টুকরোর মুখ উজ্জল হয়। মনে হচ্ছে দুটো-আড়াইটের মধ্যে মাংসের ঝোলটা দাঁড়িয়ে যাবে। বাবাইও সুযোগ বুঝে বলে ওঠে “মা আমি খেলতে যাই?” ভুলো লাফিয়ে সোফায় উঠে রাজার বেটা ঘুগনিওলার মত বসে পড়ে। শমীকও রিমোটটা নিয়ে টিভিটা চালিয়ে ফেলে। ম্যাচের বাকিটা এবার আরাম করে সোফায় বসে টিভিতেই দেখা যাবে। কোহলি ততক্ষণে পিটিয়ে ম্যাচটাকে প্রায় মেরে এনেছে।