খাওয়ানো – রম্যরচনা

স্ত্রী গেছেন জনৈকা সন্তানসম্ভবার সাধপূরণ করতে অর্থাৎ কিনা সাধ খেতে। আমার আড়াই বছরের কন্যার মধ্যাহ্নভোজনের দায়িত্ব পড়েছে আমার ঘাড়ে। আমার মেয়ের পছন্দের খাদ্যতালিকা সম্বন্ধে বলি। আমার স্থিরবিশ্বাস আমার মেয়ে পূর্বজন্মে সাধু সন্নিসী ছিল। স্বাত্তিক খাবারেই তার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। স্বাত্তিক খাবার বলতে আমি যা বুঝি সেটা হল দুধ, ফলমূলাদি ইত্যাদি। রজোগুণী খাবার বলতে আমি বুঝি যে খাবার খেলে কাজ করবার শক্তি পাওয়া যায় যেমন ভাত, ডাল ইত্যাদি শর্করা জাতীয় খাবার। আর তমোগুণী খাবার মানে অবশ্যই প্রাণীজাত প্রোটিন অর্থাৎ মাংস – মুরগী অথবা মাটন। স্বাত্তিক খাবারে ওর আগ্রহ প্রবল। এক বাটি স্ট্রবেরী কি ব্লুবেরী, কলা হোক আপেল হোক চোখের নিমেষে সাবাড় করে দেবে। এক কাপ দুধ উড়িয়ে দেবে পলক ফেলার আগেই। রাজসিক খাবারে অর্থাৎ ভাত ডালে বিশেষ বিরক্তি আর চিকেন মাটনে যেটা আছে সেটা যারপরনাই ঘৃণা বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু শিশু বিশেষজ্ঞরা শুধু ওই তথাকথিত স্বাত্তিক খাবারে শরীরের সম্পুর্ণ পুষ্টি হয় বলে মনে করে না। তাই সকাল সন্ধে আমাদের ওই রাজসিক ও তামসিক খাবার খাওয়ানোর অ্যাডভেঞ্চারে নামতে হয়। অ্যাডভেঞ্চার কথাটা কেন ব্যাবহার করলাম সেটার জন্য একটু বিশদে যাওয়া প্রয়োজন। তো যা বলছিলাম লাঞ্চ করানোর দায়িত্ব আমার ওপরে আজ। তামসিক খাবারের রিস্ক না নিয়ে কম বিপজ্জনক রাজসিক খাবারেরই ব্যাবস্থা করে গেছে স্ত্রী। অর্থাৎ ভাত, মুসুরের ডাল, আলু সেদ্ধ। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি শাকসবজী স্বাত্তিক খাবারের মধ্যে পড়লেও তাতে ওর মোটেই আকর্ষণ নেই। তাই সবজি আজকের ওর মেনু থেকে বাদ। একটু স্বাত্তিক টাচ দেওয়ার জন্য ভাত ডাল আলুসেদ্ধর সাথে বেশ বড় চামচের এক চামচ ঘি চটকে মেখেছি। এর পরের ঘটনা নিম্নরূপ।

                   

একটা বড় নিঃশ্বাস নিলাম। ইস্ট দেবতাকে একটু স্মরণ করে নিলাম। নিজেকে ভগবান বুদ্ধের মত প্রশান্ত চিত্ত করতে কল্পনা করলাম সবুজ কচি ঘাসে ভরা একটা মাঠে চলে গেছি। পাশ দিয়ে উপলখণ্ডের মধ্য দিয়ে ঝিরিঝিরি করে বয়ে চলেছে একটা নাম-না-জানা নদী। পাখিদের কুহুকাকলিতে মুখর পরিবেশ। প্রিয় কবিদের প্রিয় কবিতা স্মরণ করি। ইত্যাদি বিভিন্ন রকম মানসিক যোগাসন করে গলার স্বরের মধ্যে যথেষ্ট চিনি এবং উত্তেজনা ও উৎসাহ ভরে ডাকলাম “সানাই। এবার আমরা ভাতু খাব। ইয়েয়ে…ইয়ামি…” ভাতের থালা নিয়ে ওর দিকে এগোতেই আমার কৃত্রিম উৎসাহে জল ঢেলে উল্টোদিকে ছুটল। আমি যে ইয়ামি খাবার দিচ্ছি এমনটা আর মনে হয় না। আত্মবিশ্বাসে সামান্য একটু চিড়। ভাতের থালাটা টেবিলে নামিয়ে রেখে হাসি হাসি মুখ করে ঘরের মধ্যে খানিক ছোটাছুটি করে বেড়ালছানার মত প্রাণীটাকে বগলদাবা করে নিয়ে এসে বসলাম সোফায়। “নাহ, চাপ আছে। সোফিয়া চালিয়ে দিই। ওর প্রিয় রাজকুমারীর বিভিন্ন অভিযান দেখতে দেখতে নিশ্চয়ই খেয়ে নেবে।” সোফিয়ার মিষ্টি গলার স্বরে ওর মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। গুড সাইন। এক চামচ ভাত-ডাল-আলুসেদ্ধ-ঘি মুখে চালান করে দিলাম। সোফিয়াকে দেখতে দেখতে বেশ উৎসাহের সঙ্গে মুখে নিলো গ্রাসটা। স্বস্তি। ওর মা ফালতুই বলে “মেয়েটা একদম খায় না।” এই তো বেশ খেয়ে নিচ্ছে। আসলে মায়েরা বাচ্চা হ্যান্ডল করতেই জানে না। আর মাত্র নটা মোটে চামচ। খাওয়াতে পারলেই পড়া শুরু করতে পারব সলমন রুশদির অর্ধসমাপ্ত উপন্যাসটা। মিনিট পাঁচেক পরে দ্বিতীয় চামচটা নিলাম। সানাইয়ের দিকে বাড়াতেই খুব উৎসাহের সঙ্গে মুখ খুলে দিল। যাক আজ চাপ দিচ্ছে না। ও হরি। মুখের মধ্যে প্রথম চামচের প্রায় অর্ধেকটা এখনও নিজগুণে বিরাজমান। শিশুদের এই একটা দৈব ক্ষমতা। আমাদের মুখের মধ্যে খাবার গেলেই স্যালিভা সিক্রেশান হয়, লালাক্ষরণ হয়। ওরা কোন এক ম্যাজিকাল পাওয়ার থেকে সেইটে বন্ধ করতে পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটাই গ্রাস মুখে নিয়ে বসে থাকতে পারে। শিশুদেরকে ভগবানের অংশ এমনি এমনি বলে না! যাকগে যাক আধ চামচ তো খেয়েছে। Think positive. Be positive. দ্বিতীয় চামচ খাবারটাকে কমিয়ে অর্ধেক চামচ করি। মুখে ভরে দিতেই মুখবিবর পুরো ভর্তি। গালগুলো ব্যাঙের মত ফুলে আছে। চিবোনোর কোন লক্ষণ দেখি না। সোফিয়া ততক্ষণে কিছু মৎস্যকন্যাকে নিজের বার্থডে পার্টিতে নেমন্তন্ন করে ফেলছে। সেইটেই চোখ দিয়ে গিলছে। খাবার গলাধঃকরণ করার তেমন কোন ইচ্ছে নেই। অগত্যা পরের সাত মিনিট সোফিয়ার কার্যকলাপ দেখি ওর সাথে। প্রসঙ্গত সোফিয়ার সব কটা এপিসোড একশ আট বার আমার সামনে প্লে হয়ে গেছে। প্রতিটা গল্প শুরু থেকে শেষ অব্দি জানি। এখন ডায়ালগগুলো পর্যন্ত মুখস্ত হতে শুরু করেছে। কিন্তু সানাইয়ের কোন ক্লান্তি নেই। মাঝে মাঝে ভাবি ওর মত ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা যদি আমার হত, প্রতিদিনই নতুন করে পৃথিবীটাকে দেখতে পারতাম, চোখে একই বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করতে পারতাম সূর্যোদয় কি সূর্যাস্ত গুলোকে, কি ভালই না হত? স্মৃতি বড় বিস্ময়-প্রতিরোধক। সে যাক। আবার পাঁচ মিনিট পরে এক চামচ ভাত নিয়ে মুখ খুলতে বলতেই খুলে দেয় সে। এ ব্যাপারে ও বড় বাধ্য। একেবারেই ঝামেলা করে না। মুস্কিল হল এবারে শুধু দেখি মুখটা চার ভাগের তিন ভাগ ভর্তি। আগের গ্রাসের কিছুই প্রায় শেষ করে নি। “সানাই খেয়ে নাও, খেয়ে নাও। অল ডান করতে হবে। ফিনিশ করতে হবে। ফাস্ট” বলে আবার অপেক্ষা। না কোন কাজ হয় নি। মুখ নড়ে না। যথাযথ কারণেই গলার ওজন বাড়ে। “সানাইইইই। খাওওও”। ঠোঁট ফুলে ওঠে। কান্নার প্রস্তুতি। কিন্তু গালের পেশীগুলো তথৈবচ। নো নড়নচড়ন। গলা নামিয়ে “খেয়ে নাও সানাই। ওদিকে মিয়া সব খেয়ে নিলো”। মুখ চলে সামান্য। দু তিন সেকেন্ডের মত। তারপরেই মিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা বুঝি ভুলে গেল। আবার বলি “সানাই পিকু সব খেয়ে নিলো।” – এ বারে মুখ আর চললই না। বোঝা যাচ্ছে মিয়া বা পিকুদের সাথে খাওয়ার স্পীডের ইঁদুর দৌড়ে সামিল ও হবে না। এসবের ঊর্ধে চলে গেছে। খাওয়ানো শুরু করার আগে মনের মধ্যে যে ঝিরি ঝিরি নদীটা বইয়েছিলাম এখন তার জলটা বেশ ঘোলা লাগছে। অপেক্ষা। অপেক্ষার থেকে ভাল বন্ধু আর কিছু নেই মনকে বোঝাই। আর খানিকক্ষণ পরে যখন দেখলাম দ্বিতীয় চামচ প্রায় শেষের মুখে, (মানে জিভের ওপর ভাতের একটা বেস আছেই, সে থাক…অত বেশী আশা করলে চলে না) তৃতীয় চামচটা চালান করে দিই মুখে। নেয় কিন্তু নতুন আসাইনমেন্টের ওপর কাজ শুরু করে না। এই লক্ষণ আমি বিলক্ষণ চিনি। আমাদের সরকারী অফিসের মত। ফাইল আসে কিন্তু প্রসেস হয় না। মিঠে কথায় আর কাজ হবে না মনে করে কিছু কাল্পনিক চরিত্রকে নিয়োগ করি। “পুলিশ, পুলিশ আছ তো? সানাই খাচ্ছে না। ও তোমরা আসছ? আচ্ছা দাঁড়াও। সানাই বোধ হয় খেয়ে নেবে” – ফোনে কাল্পনিক পুলিশের সাথে আমার কথোপকথন। ওর স্নায়ুশক্তির প্রশংসা করতেই হচ্ছে। পুলিশের নাম শুনে হৃৎকম্প তো দূরের কথা, মুখে চিন্তার রেশ মাত্র দেখা যায় না। যেই কে সেই ঢ্যাঁটা হয়ে বসে থাকে। “ওকে, তাহলে হাঁকার মাকে ডাকি? ডাকবো তো?” সেই খুদে লৌহস্নায়ু প্রাণীটিকে প্রশ্ন আমার। মুখ ভর্তি ভাত নিয়ে একটা দুর্বোধ্য শব্দ করে। অর্থ বোধ হয় ডাকতে মানা করছে। আজকাল হাঁকার মা-তে একটু কাজ হচ্ছে। কিন্তু সামান্যই। শীঘ্রই নতুন কোন চরিত্রকে আনতে হবে। গতকালই ও হাঁকার মা হয়ে আমায় ভয় দেখাচ্ছিল। অতএব হাঁকার মার ম্যাজিক প্রায় গেল বলে। তাও সামান্য ভয়ে তিনচারবার মুখ নাড়া আওয়াজ পাওয়া যায়। ক্রমে ধীর হয়ে আসে। আবার সানাই সোফিয়ার দেশে হারিয়ে যাচ্ছে। গোরু একটা! সেই মানসিক নদীর ঘোলা জলটা এখন নর্দমার জলের মত কর্দমাক্ত লাগে। পাখি নয়, শেয়ালের আর প্যাঁচার ডাক শুনতে পাচ্ছি মনে হচ্ছে। নাহ। Calm down. Calm down. Peace. ওম মধু, ওম মধু, ওম মধু। মধুবাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ। মনে মনে শান্তি মন্ত্র আওড়াই। আমি বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি। Peace noble টা আমার লাগল বলে – এইসব ভাবি। আবার বড় করে শ্বাস নিই। “সানাই সোফিয়া কি করছে? ও সোফিয়া ফ্লায়িং? উড়ছে?” উৎসাহের সাথে জিগ্যেস করি। বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। মুখভর্তি খাবারের অলিগলি পথে একটা হ্যাঁ বলারও চেষ্টা করে। “গুড। খেয়ে নাও। খেয়ে নাও। নয়তো সোফিয়া রাগ করবে।” মাথা নাড়া বন্ধ। সাথে মুখ চালানো। বোঝাই যাচ্ছে সোফিয়ার প্রতি ওর কোন সহানুভুতি নেই। না থাকুক, বাবার ওপর তো থাকবে। “সানাই, বাবার খুব খিদে পেয়েছে। বাবা কাঁদছে।” একটু কুমীর কান্না কাঁদি। নাহ লাভ হচ্ছে না। বাবার ওপরেও বিশেষ সহানুভুতিশীল নয়। “সোফিয়া বন্ধ করে দেব কিন্তু।” হুমকি ছাড়ি। জোড়ে জোড়ে মাথা নেড়ে অসম্মতি প্রদর্শন করে। কিন্তু কোন চুক্তিতে বা ডীলে আসে না। গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের আইডিয়াটা এদের কাছ থেকেই পেয়েছিল কি? কে জানে? ঘড়ির কাঁটা একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গেছে। ওর মুখের বাঁধন অতিক্রম করে খাদ্যনালীতে খাবার না পৌঁছনর ফলে আমার ধৈর্যের বাঁধন ভাঙছে। মাত্র চার চামচ মত ঠুসতে পেরেছি বলা চলে। পঞ্চমটা নিজের মুখে ভরে দিই। যাক, ও খাওয়া আমি খাওয়া একই ব্যাপার। আফটার অল বাপ মেয়ে তো! ষষ্ঠটা ওর দিকে বাড়াতেই মুখ খুলে দেয়। তৃতীয় আর চতুর্থ চামচ এখনো সেখানে। হাউসফুল। মরিয়া হয়ে তাও ঠুসি। ব্যাস…আমার এই অসৎ কর্মের শাস্তি স্বরূপ গোটা আড়াই চামচ মত নীরবে উদ্গীরণ করে দেয়। সাড়ে চারটে গোল দিয়ে আড়াই খানা গোল খেয়ে আমার স্কোর এখন দুই। মানে দুই চামচ মত খাওয়াতে পেরেছি। সেই ছোটবেলায় বাঁদরের অঙ্ক কষেছিলাম – তেল লাগানো বাঁশে বাঁদর তিন মিটার ওঠে, পরে দু মিটার নামে। এই গল্পে তিন গ্রাস যায়, দু গ্রাস বেড়িয়ে আসে। হতাশা। নাহ সত্যিই খাওয়ানো চাপ ওকে। মনে মনে ওর মাকে সেলাম জানাই। প্রাণপণে চেঁচাই “সানাইইইই”। ব্যাস…ফল স্বরূপ কান্না। মিনিট তিনেক সোফিয়ার শব্দ ছাপিয়ে সেই চিল চিৎকার কর্ণবিবরে ঢোকে। আর বিশেষ আশা নেই। সমস্ত আশায় গ্যামাক্সিন। আত্মবিশ্বাসে তখন রিক্টার-স্কেল-এইটে -হয়ে-যাওয়া ভূমিকম্পের ফাটল। কান্না থামাতে গ্লাসে একটু জুস নিয়ে আসি। চোখের জল আর জুস দুটো মিশিয়ে জুলজুল চোখে চুকচুক করে খেয়ে নেয়। ফলের রসের স্বাত্তিক স্বাদ পেয়ে এবার ওর মেজাজ কিছুটা শরিফ। শান্ত চিত্তে চেষ্টা করে আরও চামচ দুয়েক খাইয়ে দিই। সানাইকে খাওয়াচ্ছি ভেবে দু এক চামচ নিজেকেও খাইয়ে দিই। প্লেটটা ফাঁকা হলে নিজেকেই একটা সান্ত্বনা দেওয়া যায় তাই। প্লেটটা প্রায় খালি হয়ে এসেছে। নতুন করে উৎসাহ দিই সানাইকে। “এই দেখ না, প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আর এক চামচ। মুখ চালাও। অল ডান করতে হবে।” বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। ভাবটা যেন ওরও পুরো ভাতটা মেরে মুচড়ে খেয়ে নেওয়ারই ইচ্ছে। সাধ আছে অথচ সাধনা নেই! আর এক-দু চামচ আরও মিনিট কুড়ির প্রচেষ্টায় ঢুকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের খাবার গুছোই। অনেক ধকল গেছে। চাট্টি এক্সট্রা ভাত নিয়ে নিই।

 

আধ ঘণ্টা পরে আমার খাওয়া হওয়ার পর, খাওয়ার পরবর্তী বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়ার কাজ করার পর, যখন ওকে মুখ ধোয়াতে নিয়ে যাই দেখি মুখের মধ্যে চামচ দেড়েক ভাত এখনো জড়ো করে রাখা আছে। কি আর করা? সেইটুকু বের করে ডাস্টবিনে ফেলে দিই। বিশেষ কিছু খাওয়াতে না পারার দোষিমন্যতা নিয়ে কটা স্ট্রবেরী অফার করি। পেট ভরে যাওয়ার দরুন যে কিনা একটু আগে একটুও ভাত খেতে পারছিল না, সেই খুদে বুদ্ধিমান দুহাতে দুটো করে স্ট্রবেরী ফটাফট মুখে চালান দিয়ে দেয়। আড়াই মিনিটে সাড়ে তিন খানা জাম্বো স্ট্রবেরী শেষ করার পরে ওর মুখে হাসি ফোটে। ওর বাবার মুখেও।

তোকে চাই না- কবিতা

একলা পথে চলব তোকে চাই না

                একলা কথা বলবে মন আয়না

তোর চোখে চোখ রেখে সারা রাতটা

                জাগবো না আর, দেখব না ঐ রূপটান।

 

তোর কথা আর ভাববো না। বৃষ্টির গান

                    আনবে না আর মনে তোর ঐ মুখখান

চাঁদ সোহাগি সন্ধ্যা, জ্যোৎস্নার জল

                     তোর স্মৃতিতে করবে না মন চঞ্চল

বর্ষামুখর সন্ধে শহর। সিক্ত।

                    তোর বিহনে চলছে কেমন। বেশ তো।

তোর ভেজা চুল আর ভেজা ঠোঁট চাউনি

                    থাক তোলা থাক। আজ শহর হোক মৌনী

 

আজকে শুধু চাঁদ হারাবে জ্যোৎস্না

                     তোর বিহনে বিয়োগ বিধুর রোশনাই

অশ্রুরা সব চোখের কোনে বন্দি

                     ভুলবো বলে ভুল করে আজ

                                           তোর ছবিতেই রঙ দিই

——

ভাল লাগলে এই কবিতাটা পড়বেন।

https://jojatirjhuli.net/2017/02/16/aholyake/

একলা পথে চলব তোকে চাই নাClick To Tweet
যযাতির ঝুলি টাটকা তাজা
ইমেলে পেলে ভারি মজা

বাঘ দেখে এলুম – হালুম

পরিবার ধর্ম পালন করতে শীতের রাত্তিরে বাঘ দেখতে গেলাম। শীতল শিকাগোর বড় পর্দায় চড়েছে “এক যে ছিল বাঘ” ছবিটির সিকুয়েল “বাঘ এখনও বেঁচে আছে”। বাইরে তখন কুচি কুচি বরফ পড়ছে। পারদ বলছে তাপমাত্রা ঋনাত্মক বারো। যাই হোক বাঘ দেখতে গেলে একটু আধটু কষ্ট তো সহ্য করতেই হয়। তাই গেলাম। ছবিটা চমৎকার। একটু বিশদে যেতে হচ্ছে তাই।

প্রথমেই বলি মানুষের নাম বাঘ, সিংহ, হাতি, গরু, ছাগল ইত্যাদি মনুষ্যেতর জীব হোক – এ আমার ঘোরতর অপছন্দ। তাই আপনাদের অনুমতি নিয়ে টাইগার ওরফে বাঘবাবুকে আমি এখন থেকে বাগবাবু বলে ডাকব। বেশ একটা বাঙ্গালি বাঙ্গালি নাম হবে। সিরিয়ার বর্ডারে তখন ভীষণ সিরিয়াস কেস। পঁচিশ জন ভারতীয় আর পনেরটা পাকিস্তানি সেবিকাকে দিয়ে নিজের সেবা করিয়ে নিচ্ছেন বাগের দাদি, আই মীন, বাগদাদি। উনি যে সে কেউ নন, আই-এস-সি বলে এক সন্ত্রাস সংস্থার পুরপ্রধান। না না আই-এস-সি মানে ইন্ডিয়ান স্কুল সার্ভিস টাইপ্স কিছু নয়, এটা গল্প লেখকের উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত আইসিস-এর ছদ্মনাম। এদিকে মার্কিন মন্ত্রক মাত্র সাত দিন সময় দিয়েছে। সাত দিন পরে বোম মেরে পুরো শহর উড়িয়ে দেবে। সাতদিনের মধ্যে উদ্ধার করতে না পারলে বন্দী নার্সরা সব ছবি হয়ে যাবে। তো আমাদের বাগবাবু হলেন গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা raw-এর এজেন্ট। তবে প্রাক্তন আর কি! এখন চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় উনি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আই-এস-আই-এর এক প্রাক্তন এজেন্ট এক ক্ষীণকটি সুন্দরীকে সাত পাকে বেঁধে মানে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করে ইউরোপের কোন এক “ছবির মত সুন্দর” শহরে কিঞ্চিত দাম্পত্য অশান্তিতে আর কিঞ্চিত সুন্দরীসঙ্গলাভ জনিত সুখে কালাতিপাত করছিলেন। বাগদাদির কবলে পড়া নার্সদের দুর্গতি দূর করতে আমাদের বাগবাবু ছাড়া তো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার গতি নেই। তাই তলব পড়ে তাঁর। ওদিকে বাগবাবু তখন “বাঘের বাচ্চা”-কে নিয়ে অর্থাত কিনা জুনিয়র টাইগারকে নিয়ে পাহাড়ে স্কিয়িং করতে গিয়ে নেকড়ের কবলে পড়ে সিংহ বিক্রমে (“বাঘবিক্রমে” বলে কথা হয় কি? হলে সেটাই উপযুক্ত হবে) লড়াই করে শেষমেশ গোটা দশেক (সংখ্যাটা ভুল হলে মাপ করবেন, ঠিক গুনিনি) নেকড়েকে মেরে ফ্ল্যাট করে দিলেন। “লাস্ট বাট নট দি লীস্ট নেকড়ে”-টাকে যখন গাড়িবন্দি করে ফেললেন ততক্ষণে রক্ত পুরো গরম যাকে বলে পিয়োর অ্যাড্রিনালিন রাস। ওদিকে ওনার ক্ষীণকটি সুন্দরী সহধর্মিণী কিছু কম ক্যারিস্মাটিক নন। সি সি টি ভি ক্যামেরা একদিক থেকে আর একদিকে ঘুরে তাঁর দিকে ফিরে আসতে যতটুকু সময় লাগে সেইটুকু সময়ের মধ্যে গোটা চারেক ছিনতাইকারীকে পিটিয়ে ঠাণ্ডা করে ফেললেন একটা মুদিখানার দোকানে। সি-সি-টি-ভি তে সুন্দরীর জিরো ফুটেজ। নো এভিডেন্স। প্রাক্তন হোক কি বর্তমান, এজেন্ট যখন তখন কিছু গোপনীয়তা তো বজায় রাখতেই হবে। তাই এই তৎপরতা। যাই হোক শেষমেশ বাগবাবু পঁচিশটা নার্সকে উদ্ধার করার অ্যাসাইনমেন্টটা নিয়েই ফেললেন। পরে তাঁর ভুবনমোহিনী স্ত্রীটিও পাকিস্তানি নার্সদের বাঁচাতে অকুস্থলে পৌঁছে যায়। তারপরে সে ভীষণ গোলমাল। ধুন্ধুমার কাণ্ড। প্ল্যান হল বাগবাবু সহ বাকি ভারতীয় এজেন্টরা তেল পরিশোধনাগারে চাকরি নেবেন এবং তারপরে একটি “কন্ট্রোল্ড ব্লাস্ট” অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ করে তাতে পুড়ে যাওয়ার অভিনয় করবেন। না না বাগবাবু ও তার টীম আসলে পুড়বেন না। মোটা করে অ্যান্টি ফায়ার জেল মেখে বিন্দাস থাকবেন। শুধু সেই সুযোগে ঐ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ঢুকে পড়বেন যেখানে বাকি সব রুগী রুগিনিদের ঝেঁটিয়ে বের করে দিয়ে বাগদাদিবাবু নার্সদের দিয়ে নিজের নার্সিং করাচ্ছেন। একবার হাসপাতালে ঢুকতে পারলেই কেল্লা ফতে। গোটা পঞ্চাশেক আর্মড ম্যানকে পঞ্চত্ব প্রাপ্তি করানো বাগবাবুকা “বাঁয়ে হাত কা খেল”। শুধু একটাই মুস্কিল। তাঁর স্ত্রীকেও ওই পনেরখানা পাকিস্তানি সেবিকাকে উদ্ধার করতে দিতে হবে। তাই বাগবাবু অসাধ্য সাধন করলেন। ওনার ক্যালিবারের লোকের পক্ষেই এরকম ডিপ্লোম্যাটিক ফিট অ্যাচীভ করা সম্ভব। উনি একেবারে যাকে বলে সাপে নেউলে সম্পর্ক RAW আর ISI কে একসাথে কাজ করতে রাজি করিয়ে ফেললেন। জয়েন্ট অপারেশান হলে দু দলেরই লক্ষলাভ হবে। কোন দেশেরই বিদেশ মন্ত্রকের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হল না। অফ কোর্স আমাদের বাগবাবুর ওপর সারা দেশ ভরসা করে, বিদেশ মন্ত্রক কোন ছাড়! যাই হোক অপারেশানটা শুরু হওয়ার আগেই একটু কেঁচে গেল। আইসিসের তরফে তের বছরের একটা বাচ্চা ছেলে, হিউমান বম্ব হিসেবে ভরা বাজারে নিজেকে ওড়াতে গিয়ে পড়বি তো পড় পড়ে গেল বাগবাবুর সামনে। অপারেশান নার্সোদ্ধার গেল ভার মে। আমাদের বাগবাবু “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নেই” বাণীতে বিশ্বাসী। উনি লেগে পড়লেন হিউম্যান বম্ব হাসানকে উদ্ধার করতে। আইসিস-এর জঙ্গিরাই বা ছাড়বে কেন? ব্যাস উদম ক্যাঁচাল শুরু হল। হেভি মারামারি কাটাকাটি। সেই গোলমালে raw-এর ইরাকস্থিত একজন “deep asset” (কি যেন নাম ভুলে গেছি) খরচা হয়ে গেল। গেল তো গেল। বাগবাবু তো আছে। কোই পরোয়া নেহি। ভেবেছিলাম এর ফলে প্ল্যানে অন্তত কোন পরিবর্তন হবে কারণ “সিক্রেট raw এজেন্ট”-এর গোপনীয়তা তখন প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। ততক্ষণে শ দেড়েক জঙ্গির সাথে গান ফাইট, হাতাহাতি, ম্যান্ডেটরি কার চেজ সবই করে ফেলেছেন বাগবাবু। একেবারে খুলে আম করেছেন। অমন সুন্দর মুখ তিনি ঢাকতে যাবেনই বা কেন? কিন্তু ফরচুনেটলি বাগবাবুর প্রকৃত পরিচয় মোটেই টের পায় না জঙ্গি সংগঠন। সেটা বাগবাবুর ম্যাজিকাল চার্মও হতে পারে, আইসিস-এর বিরাট ইন্টেলিজেন্স ফেলিয়োরও বলতে পারেন, কিম্বা গল্পলেখকের মাথায় আসে নি সেটাও হতে পারে। যাই হোক প্ল্যানমাফিক তেলকলে বিস্ফোরণ করতে গিয়েও ভারতীয় দল প্রায় ধরা পড়ে যায় আর কি? বাধা দিতে আসলে আবার জঙ্গিদেরকে মেরে তুলোধোনা করে দেন বাগবাবু। তাতেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় মোটেই উদ্ঘাটন হয় না। আইসিসের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড বাবু যখন তেলকলে আগুন লাগানোর দায়ে ভারতীয় দলের সব সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিতে যায় তখন আর এক ছদ্মবেশী র এজেন্টের ছলাচাতুরীতে রক্ষা পায় বাগ অ্যান্ড কোং। তারপর পোড়ার ক্ষতর চিকিৎসা করতে ঢুকে পড়ে হাসপাতালে। যদিও হেঁটে হেঁটে যেভাবে “শান সে” ভারতীয় গোয়েন্দারা হাসপাতালে ঢুকলেন, তাতে মনে হল কোনরকম চিকিৎসা না হলেও দিব্যি চলে যেত তাঁদের। যাই হোক এবার দরকার হাসপাতালের একটা নক্সা। আই-এস-আই-এর এজেন্ট, বাগবাবুর সেই সুন্দরী পত্নী, সে দায়িত্ব পালন করলেন চওড়া কাঁধে। সেখানেও তিনি হেভি পেটালেন জঙ্গিদের। সিটি হল থেকে সেই ম্যাপ যোগাড় করতে গিয়ে আলুর দোষ যুক্ত আইসিসের সেই সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ডকে খরচা করে দিলেন। এবারে কিন্তু তিনি সেই মুদিখানার দোকানে গুণ্ডা পেটানোর মত ভাগ্যবতী ছিলেন না। সি-সি-টি-ভি ফুটেজে ধরা পড়ে বাগদাদির হাতে বন্দী হলেন। ওদিকে আমাদের হিরো বাগবাবু ততক্ষণে ম্যাচ প্রায় মেরে এনেছেন। ফুড পয়জনিং করিয়ে, ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অর্ধেক জঙ্গিকে ঘুম পাড়িয়ে আর অর্ধেক জঙ্গিকে আমেরিকান সেনাবাহিনীকে টাইট দিতে অন্যত্র পাঠিয়ে বাসে করে নার্সদের নিয়ে প্রায় শহর থেকে বেরিয়ে গেছেন, এমন সময় দেখলেন বাগদাদি তাঁর সুন্দরী প্রাণাধিকাকে বেঁধে-টেধে ভরা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন। একেবারে বাসন্তী স্টাইলে পরিবেশিত আমাদের সকলের চোখের মনি ক্যাটরিনা। তাঁর ক্যাট আইয়ের সম্মোহন বাগবাবু রিয়েল লাইফেও অস্বীকার করতে পারেন নি, রীল লাইফেও পারলেন না। অতএব নার্স উদ্ধার টেম্পোরারিলি মায়ের ভোগে। বৌকে বাঁচাতে সমস্ত নার্সসহ, ইন্ডিয়ান আর পাকিস্তানি এলীট গোয়েন্দাসহ ধরা দিলেন বাগদাদীর হাতে। মেয়েরা চিরকালই গণ্ডগোল পাকিয়েছে। রামায়ণ, মহাভারতের মত দুটো মহাযুদ্ধ হয়ে গেল নারীর সম্মান রক্ষার্থে। এখানেও সেই সুন্দরীই গেরো হয়ে দাঁড়ালো। যাই হোক, বাগদাদী কিন্তু ওদের প্রাণে মারলেন না। দয়ার শরীর তাঁর। একটা অসউইজের গ্যাস চেম্বার টাইপ্স কিছু একটার মধ্যে বাগবাবুকে ফেলে দিয়ে তাঁর সুন্দরী বৌকে নিয়ে চলে গেলেন। কিছু একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে টুঁড়ে গেলেন মনে হয়। বাগবাবুও ছুঁড়লেন পালটা চ্যালেঞ্জ। এদিকে আজকেই সপ্তম দিন। সময় কমে আসছে। মার্কিনিরা মাত্র আধ ঘণ্টা সময় দিয়েছে। তারপরেই বোম মেরে সকলকে হালকা করে দেবে। তাই আবার শুরু ফাটাফাটি মারপিট। বাগবাবু খালি গায়ে প্রচুর জঙ্গিদের আবার প্রচুর মারধোর করলেন। শোনা যায় বাগবাবু ওরফে সল্লু ভাই ছবিতে পুরো অভিনয়ের জন্য অর্ধেক টাকা নেন আর জামা খোলার জন্য বাকি অর্ধেক। তার নিযুত কোটি অনুরাগিণীরা তার বডি-সডি দেখতে শুনেছি ভীষণ ভালবাসেন। সে অন্য কথা। শেষমেশ বাগ দাদা বাগদাদীকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেললেন। তারপর সব নার্স, হোস্টেজ সকলকে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি এজেন্টদের হাতে দিয়ে বাগ দাদা গেলেন বৌকে বাঁচাতে। মার্কিনি মিসাইলের ধ্বংসলীলা শুরু হওয়ার মিনিট খানেক আগে ফাইনালি বাস ভর্তি সকলে সেফ জোনে পৌঁছে যান বাগবাবুকে ছাড়াই। সেখানে ইন্ডিয়ান পাকিস্তানি এজেন্টদের একেবারে গলাগলি মাখামাখি ভাব। ISI-এর এজেন্ট ভারতের পতাকা তুলছে, RAW-এর এজেন্টরা  পাকিস্তানি পতাকা তুলতে উৎসাহ দিচ্ছে – সে একেবারে জমে ক্ষীর। বাগবাবু এদিকে তাঁর ক্যাট-আই প্রাণাধিকাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন হাসপাতালের গোপন গহ্বরে। পরিচালক অবশ্যই বাগবাবুকে মেরে ফেলে আপামর ভারতবাসীকে চোখের জলে ভাসাতে চান নি। তাছাড়া প্রযোজকবাবু নিশ্চয়ই আর একটা “ব্লক ব্লাস্টার সিকুয়েল”-এর স্বপ্ন দেখছিলেন। তবে হুড়মুড় করে বোম পড়তে থাকা শহর থেকে বাগবাবু কিভাবে উদ্ধার পাবেন সেটা দেখানোর চাপ পরিচালক মশাই অবিশ্যি আর নেননি। ভালই হয়েছে। অলরেডি বাগবাবুর বিক্রম দেখে ফেলেছি প্রায় ঘণ্টা তিনেক। আরও দেখলে গুরুপাক হয়ে যেত। শুধু বছর ঘুরলে দেখা যায় সস্ত্রীক বাগবাবু অন্য এক ইউরোপিয়ান শহরে নদীর জলে পা ডুবিয়ে ফুর্তি করছেন। ছবি সমাপ্ত।

নাম দেখানোর সময় একটু নাচাগানা হল। ক্যাটরিনাদেবী সারা বছর ধরে দিনে শুধু দুটো করে লঙ্কা পোড়া খেয়ে অমন মোহিনী শরীর বানিয়েছেন, অমন লোভনীয় পাতলি কোমর বানিয়েছেন – তা ওনারও তো একটু সখ হতে পারে একটু গানের তালে কোমর দোলানোর। তাছাড়া নার্সরাও সব উদ্ধার পেয়ে গেছে। অতঃপর ঢিঙ্কা চিকা।

সব মিলিয়ে ভীষণই মনোরঞ্জক ছবি – টাইগার জিন্দা হ্যায়। শুধু টাইগারবাবু হেভি গান ফাইটের সময় একটু বুলেট প্রুফ টুফ পরে নিলে, আইসিস-এর একেবারে খোদ মুলুকে গিয়ে শুরু থেকেই হাঙ্গামা না মাচিয়ে আর একটু গোপনীয়তা অবলম্বনের চেষ্টা করলে এমনকি সন্ত্রাস সংস্থার প্রধান বাগদাদীবাবু যিনি কিনা মার্কিন গুপ্তচর সংস্থার জন্য একেবারে “হাই ভ্যালু টার্গেট” তিনি যদি একেবারে খুলে-আম রাস্তায় না ঘুরতেন, একটু গোপনীয়তা অবলম্বনের চেষ্টা করতেন তবে হয়তো ছবিটা আরেকটু সহ্য করা যেত।      

****   

বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণঃ যযাতির ঝুলির সব লেখাই শতাধিক বার ফেসবুকে শেয়ার হয় সেটা তো সুধী পাঠক বা প্রিয়দর্শিনী পাঠিকা নিচের ফেসবুক শেয়ার বাটন দেখে বুঝতেই পারছেন। এত অকুণ্ঠ ভালবাসা দেওয়ার জন্য পাঠক পাঠিকাকে যযাতির আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আপনিও শেয়ার করুন। কিন্তু শেয়ার করার আগে নিচের কমেন্ট বক্সে (বেনামী হোক বা নাম সহ) একটি মন্তব্য ছেড়ে যান যাতে যযাতি তার যজমানদের একটু চিনতে পারে। যযাতি তার ফেসবুক পেজের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। পোস্ট ভাল না লাগলে আপনাকে ছাড় দেওয়া হবে, কিন্তু ভাল লাগলে কমেন্ট না করে শুধু শেয়ার করলে যযাতির অভিশাপে (বিবাহিত হলে দাম্পত্য কলহজনিত কারণে আর অবিবাহিত হলে বাবা মার দাম্পত্য কলহজনিত কারণে) আগামী রবিবার রবিবাসরীয় লুচি তরকারি থেকে বঞ্চিত হবেন। 🙂 🙂

মুক্তি

প্রণবেশ সাধু ঘুম থেকে উঠেই দেখলেন মাথার কাছে একটা লোক হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে। অন্য কেউ হলে হয়তো চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করত কিমবা পুলিশকে টেলিফোন করার জন্য সেন্টার টেবিল হাতড়াত, কিন্তু প্রণবেশ সাধুর নামটা গালভারী হলেও মেজাজটা নেহাতই অমায়িক। কোনো কিছুতেই অধিক উত্তেজিত বা আনন্দিত অথবা যারপরনাই দুঃখিত হন না। যাকে বলে একেবারেই “দুঃখেষুনুদবিগ্নমনা সুখেষুবিগতস্পৃহ”। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে পাশে অচেনা কাউকে বসে থাকতে দেখলে চা-শরবত দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করার রীতি নেই। তাই চোখ পড়া মাত্র ধড়মড় করে উঠে বসতে যাবেন, লোকটা বলল “এ হে হে, সাম্‌লে কত্তা সাম্‌লে। এই বয়সে অতো দৌড় ঝাঁপ করবেন না।”

তা তুমি বাপু কে? বিরক্ত হলেও ভদ্রতার মাত্রা অতিক্রম না করে বললেন সাধু বাবু।

“কে জানে? সে বহুকাল আগের ব্যাপার যখন আমি একটা কিছু ছিলাম। এখন মনে টনে নেই। আর মনে রাখার দরকারও তেমন পড়ে না। আমি কে সেই নিয়ে আমাদের এ তল্লাটে তেমন কারু মাথা ব্যাথা নেই। যে যার নিজের মতো আছে। বুঝলেন কিনা। আমাকে স্রেফ হাওয়া বলতে পারেন।” বলে লোকটা একটা বিচ্ছিরি পান খাওয়া দাঁত নিয়ে হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলো।

সাধুবাবু এর মধ্যে বিশেষ হাসির কিছু পেলেন না। কথাটার মানেও যে বিশেষ বুঝলেন তা নয়। বিশেষত “এই তল্লাটের” ব্যাপারটা।

রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বললেন “আহ বাপু বিনা কারণে হাসছ কেন? তো আমার এখানে কি দরকার? বিশেষত আমার বেডরুম-এ। চোর-টোর নও তো?

লোকটা এক হাত জিভ কেটে বলল “আজ্ঞ্যে না কত্তা। কি যে বলেন। আমি এক্কেরে যাকে বলে কুলীন বামুন। অ্যাই অ্যাই দেখুন পৈতে। পুরো দেড় হাত। কথায় বলে পৈতের দৈর্ঘ দেখে বামুনের ব্রহ্মতেজ বোঝা যায়” বলেই লোকটা আবার হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলো।

মাঝ রাত্তিরে এরকম বাজে রসিকতা সাধু বাবুর একেবারেই পছন্দ হল না। বললেন “দেখ বাপু ঠিকঠাক বলো তুমি কে নয়ত কিন্তু …” কিন্তু যে কি করা উচিৎ নিতান্ত নিরীহ সাধু বাবু সেটা কিছুতেই ভেবে উঠতে পারলেন না।

এই “নয়ত কিন্তু” তে কিন্তু বোধ হয় একটু কাজ হল। লোকটা মুখটা নিতান্ত দুখি দুখি করে বলল “মাইরি বলছি, আমার পিতৃদত্ত নামটা আমার আজকাল একদম মনে পড়ে না। আসলে কেউ কাউকে নাম ধরে ডাকে না যে। আপনিও বছর কয়েক আমার তল্লাটে থেকে দেখুন, দেখবেন আপনার নাম ধাম বংশপরিচয় সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

“আমি খামোকা তোমাদের তল্লাটে গিয়ে থাকতে যাব কেন? আমি আমার পৈত্রিক বাড়িতে গিন্নি সমেত বেশ আছি।”

“ও হো আপনি এখনো বুঝতে পারেন নি। তাই না?” বলেই লোকটা আবার ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লাগলো।

“তুমি আমার বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করেছ আর মাঝরাত্তিরে বিনা কারণে হেসে আমার হাড় ভাজা ভাজা করছো। এতে আর বোঝবার কি আছে?”

“হে, হে এমনটা সক্কলের হয়। আমারই হয়েছিল জানেন। শুধু শরীরটা একটু হাল্কা লাগত। আর বিশেষ কিছুই তফাত ধরতে পারিনি প্রথমটায়। কখন বুঝলাম জানেন? যখন দেখলাম  মানুষগুলো আস্তে আস্তে ঝাপসা থেকে ঝাপসাতর হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। বৌ বাচ্ছা সব। আর নতুন লোক যাদের দেখতে পাচ্ছিলাম তারা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হল। আসলে ভূতেদের নামে মিছেই নিন্দা মন্দ করে মানুষেরা। ভূতেরা তো আদতে মানুষদের দেখতেই পায় না। আর মানুষ যেমন ভুত দেখে চম্‌কে ওঠে, ভূতেরাও হঠাৎ করে কোনভাবে মানুষ দেখতে পেয়ে গেলে রীতিমতো খাবি খায়।”

“থামো থামো, কি-কি-কি আবোলতাবোল বকছ? তু-তুমি বলছ আ-আমি ম-মরে গেছি” এবার যৎসামান্য উত্তেজনায় তোতলাতে থাকেন সাধু বাবু।

“তা বলে নিজেকে চিমটি কেটে দেখবেন না যেন। প্রথম প্রথম চিমটি কাটলে ঠিক-ই লাগবে। যারা বলে মরে গেছি কিনা দেখতে নিজেকে চিমটি কেটে দেখা উচিৎ, তারা নিতান্তই নির্বোধ। আসলে অনেকদিনের অভ্যাস তো ওগুলো। সহজে যাবে না। শরীরবোধটা আস্তে আস্তে যাবে।”

“যত সব ঢ-ঢ-ঢপবাজি। একটা বর্ণ-ও বিশ্বাস করি না।”

“আপনি বরং এক কাজ করেন কত্তা। দুধ কা দুধ পানি কা পানি হয়ে যাবে। ওই জানলার গরাদগুলো আমি খুলে আনছি। ওই পথে এই দোতলা থেকে সোজা একটা ঝাঁপ দিয়ে দেন। মাটিতে পড়লে একটু লাগবে, অনেক দিনের অভ্যাস তো। কিন্তু দেখবেন আদতে একটুও লাগে নি। গট গট করে আবার দেওয়াল বেয়ে উঠে ঐ জানলা পথে ঘরে ফিরে আসুন।”

“না না। ও ও সব আমি পারব না। মরেছি কিনা প্রমাণ পেতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণটা খোয়াই আর কি।” এইবার সাধুবাবু একটু ভয় পেয়েছেন। বিশেষত জানলার লোহার গরাদটা এই বেয়াক্কেলে লোকটা কি করে খুলে আনল সে কথা ভেবে।

“হুম্ম্। আপনার দেখছি সময় লাগবে। এই এই দেখুন আমি করে দেখাচ্ছি।” বলেই লোকটা কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জানলা পথে অদৃশ্য হয়ে গেল। আবার বাইরের দেওয়াল বেয়ে উঠে এসে জানলায় পা ঝুলিয়ে বসে ফ্যাক ফ্যাক  করে সেই বিরক্তিকর হাসিটা হাসতে লাগলো।

“এইবার বলুন কত্তা। বেঁচে থাকাকালীন আমার মত অশরীরীর দেখা কখনো পেয়েছেন? আমায় দেখেছেন কি মরেছেন।”

কথাটা যুক্তি সঙ্গত। সারা জীবন শুনেছেন অনেক, কিন্তু ভুতের দেখা তো কখনো পান নি।

“তবে আপনি ভাগ্যবান। ঘুমের মধ্যেই হৃদয়ে সামান্য দোলাচল আর আপনি সোজা অক্কা। আপনি সাধু টাইপ মানুষ বলে শরীরটা সহজে ছাড়তে পেরেছেন। অনেকের দেখি খুব ভোগান্তি হয়। যাকগে যাক। আপনার এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস হয় নি তো। আসেন। এইখানটায় এসে দাঁড়ান। এবার পা দুটোকে মাটি থেকে ওপরে তুলে শূন্যে ভেসে থাকার চেষ্টা করুন। পারছেন না তো? হুম্ম্। প্রথম প্রথম পারবেন না। আপনার মনে এখনো অভিকর্ষের প্রভাব। এই দেখুন?” বলেই লোকটা হাত দুয়েক শূন্যে উঠে ভাসতে লাগলো আর ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লাগলো।

সাধুবাবু নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরও একবার চেষ্টা করে ফেললেন এবং ব্যর্থ হলেন। কিন্তু এই মানুষটা তো শূন্যে ভেসে থেকেছে মিনিট খানেক। স্বচক্ষে দেখেছেন তিনি। একটু ধন্দে পরে যান। তবে কি এ সত্যি না-মানুষ? সত্যি কি তবে তিনি মরে গেছেন?

“এখনও বিশ্বাস হয় নি তো আপনার? আচ্ছা বলুন এ বাড়িতে এই মুহুর্তে আর কে কে আছে? আসলে আজকাল আমি আর মানুষ দেখতে পাই না। আপনি সদ্য সদ্য দেহ ছেড়েছেন। আপনি পাবেন।”

“কেন আমার স্ত্রী আছেন। ওই তো, ঐ তো ঘুমিয়ে আছেন বিছানায়। তাছাড়াও আমার চারপেয়ে assistant ভুলু। নিচের তলায়।”

“আপনি যদি একটা জবরদস্ত প্রমাণ খুজছেন যে আপনি শরীর ছেড়েছেন, এক কাজ করুন আপনার স্ত্রীকে ঘুম থেকে তুলে একটু খাস গপ্প করার চেষ্টা করে দেখুন কত্তা। দেখবেন আপনি ওনাকে তুলতেই পারবেন না। আসলে আপনার শরীর নেই তো। গলার স্বরও নেই।”

সাধু বাবু তখুনি উচ্চ স্বরে “ওগো শুনছো” বার কয়েক চেঁচিয়ে, হাত ধরে টেনে, নাকে পায়ে সুড়সুড়ি কোনভাবেই স্ত্রীকে জাগাতে পারলেন না।

“এইবার ভুলোকেও একবার চেষ্টা করে দেখবেন নাকি কত্তা?”

“না থাক” হাল ছেড়ে দেন সাধুবাবু। তাঁর এবার বেশ বিশ্বাস হচ্ছে তিনি মরেই গেছেন।

“শরীর গেছে বলে দুঃখ করবেন না। আপনার তো সেই অর্থে পিছুটান বলে তেমন কিছু ছিল না। এবার ঠিক করুন। থাকবেন না যাবেন?”

“মা-মানে? কোথায় যাব?”

“না মানে আপনি এ বাড়িতেও গেঁড়ে বসে থাকতে পারেন, আবার ও পারে চলেও যেতে পারেন। আমি আসলে যাকে বলে ঘোর সংসারী ছিলাম। তাই আর ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হয় নি। এখানেই ঘুরে ঘুরে বেড়াই। দেশ দুনিয়া দেখি। আপনি চাইলে ওপারে চলেও যেতে পারেন। এক যদি কোনো কিছুর প্রতি প্রবল আকর্ষণ না থেকে থাকে।”

সাধু বাবু একটু ভেবে বললেন “হ্যাঁ মানে চলে যেতে পারলে মন্দ হয় না। এই রোজকার ঝঞ্ঝাটের থেকে মুক্তি পেতে কে না চায়? জাগতিক আকর্ষন বলতে আমার ঐ বিয়ের আংটি, সোনার বোতাম আর রোলেক্স ঘড়িটা..আর ঠাকুর্দা আমায় আমার ১৮ বছরের জন্মদিনে দিয়েছিলেন একটা সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো ছিলিম…সেইটে। ওই আলমারিতে আছে।”

“হুম্ম্ মুস্কিল। এ জগৎ মায়া প্রপঞ্চময়। মায়ার বাঁধন তাই খুব বাধা দেবে আপনাকে। আপনি যেই ছেড়েছুড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, অমনি টেনে নামিয়ে আনবে। ঐ আলমারিটার আশেপাশে ঘুর ঘুর করবেন। সে ভারী যন্ত্রণা।”

“তাহলে আমার এখন কি করা উচিৎ?”

“কি যে করবেন? টান মেরে যে কোথাও গিয়ে ফেলে আসবেন তার জো নেই। সেখানেই আপনার অ-শরীরটা ঘুর ঘুর করবে। এক কাজ করেন। ও গুলো আমায় দিয়ে দেন। আমার শরীর তো এই জাগতিক ফাঁদে আটকা পড়েই আছে, আমি বরং দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসি। আপদগুলোর হদিস না জানলে দেখবেন মায়া কাটাতে আপনার সুবিধে হবে।”

সাধুবাবু খানিক ভেবে দেখলেন আইডিয়াটা মন্দ না। আংটি, বোতাম, ঘড়ি আর ঠাকুর্দার ছিলিম তিনি আলমারি খুলে বের করে লোকটার হাতেই তুলে দিলেন। দিতেই মনটা বেশ হাল্কা আর প্রসন্ন হয়ে উঠল। যাক আর কোনো পিছুটান রইলো না। “নিয়ে যাও বাপু। অনেক উপকার করলে। এবার মনে হচ্ছে হাত পা ছড়িয়ে পরপারে যেতে পারব।”

“এই বার শুয়ে পড়ুন। শুয়ে শুয়ে চেষ্টা করুন। অনেক সময় কিন্তু ততক্ষনাত যাওয়া যায় না। দু-এক দিন লাগে। সেই দু-এক দিনে দেখবেন অনেকরকম জাগতিক বাধা এসে আপনার পথ রোধ করবে। দেখবেন আপনার স্ত্রী ঘটি ঘটি চোখের জল ফেলছে, আপনার বোতাম, ঘড়ি চুরি যে হয়েছে তার অকাট্য প্রমাণ দাখিল করছে। ওসবে একদম ঘাবড়াবেন না। আপনি ঠান মেরে রাখুন আপনাকে মুক্তি পেতেই হবে। বোঝলেন কিনা…নয়তো কিন্তু আমার মত অশরীরী হয়ে ঘুরঘুর করতে হবে কত্তা..” বলেই লোকটা সুরুত করে জানালা পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।

*********

সকাল বেলা হৈ হৈ রই রই রব। পাড়া প্রতিবেশী সব হাজির। সাধনবাবুর বাড়িতে রাত্তির বেলা আলমারি খুলে  সোনার আংটি, বোতাম, ছিলিম, ঘড়ি সব নিয়ে গেছে চোরে। সংগে একটা চিঠি রেখে গেছে

সাধু বাবু,

এখনও আপনি না মরলেও, অচিরেই একদিন শরীর ছাড়তে হবে। তখন এই মায়া গুলো বড় আটকাবে আপনাকে মুক্তির পথে। তাই আপনার মুক্তির পথটা সুগম করতেই এ কটা নিয়ে গেলাম। গ্রন্থিগুলো ছিন্ন করে গেলাম। আমরা বংশ পরম্পরায় চোর। তাই দোতলা থেকে লাফ দেওয়া, দেওয়াল বেয়ে ওঠা এগুলো ভালই জানা আছে। আর আমার পিসি ছিল এক ডাকিনী, আজকের দিনে যাদের ডাইনি বলে আর কি। তার কাছ থেকে ঐ শূন্যে ভাসার দৃষ্টি বিভ্রম তৈরী করার কৌশলটা শিখেছিলাম। আর বেড-সাইড টেবিল-এ ঘুমের ওষুধের কৌটো দেখেই বুঝলাম আজ রাত্তিরে আপনার স্ত্রীকে শত ডাকলেও উঠবেন না। আর জানলার লোহার গরাদ তো কেটে ঐ পথেই ঢুকেছিলাম। ভালবাসা নেবেন।

                              আপনার অনুগত,

                                       স্রেফ হাওয়া

সাধুবাবুর স্ত্রী শেফালি বরকে শাপশাপান্ত করে বাড়ি মাথায় করছে। “শেষমেশ বুড়ো বয়সে তোমার এই ভীমরতি ধরলো গো? নিজের হাতে করে একটা ছিঁচকে চোরের হাতে সোনার আংটি, বোতাম তুলে দিলে?” ইত্যাদি ইত্যাদি…

*********

পাড়াপ্রতিবেশীর মতামত, বৌ-এর ধাঁতানি অনেক্ষণ ধরে বসে ভ্যাবলাকান্তের মত খেয়ে বাথরুমে ঢুকলেন সাধুবাবু। দরজাটা লক করে দিয়েই চট করে একবার শূন্যে ভাসার চেষ্টা করলেন। ব্যর্থ হলেন।

“হবে হবে। লোকটা তো বলেই গেছে এরকম অনেক বাধাবিপত্তি আসবে মুক্তির পথে। বাইরে যা চিতকার চেচাঁমেচি হচ্ছে, এ সবই তাঁর মানসিক বিভ্রম। এগুলোতে বিশ্বাস করেছেন কি ঠকেছেন। ওই লোকটার মত আটকে থেকে যাবেন তাহলে। আসলে তাঁর শরীর ছাড়া হয়ে গেছে কাল রাত্তিরেই।” স্থির নিশ্চিত সাধুবাবু।

নিজেকে চিমটি কেটে দেখলেন। হ্যাঁ এখন অনেকটা কম লাগছে। আর একটা ব্যাপার-ও তো সত্যি। পাড়া প্রতিবেশী, স্ত্রী সবাইকে অলরেডি ঝাপসা দেখছেন তিনি। আর সবচেয়ে ভাল ব্যাপার ঐ ঘড়ি-আংটির মায়া ত্যাগ করতে পেরে তাঁর শরীর-মন দুটোই এখন বেশ ফুরফুরে হাল্কা লাগছে। শূন্যে ভাসতে পারার আর বেশি দেরি নেই।

 

theif

মেঘ প্রতিশ্রুতি

শিকাগোতে আজ টুপ টুপ টুপ বৃষ্টি সকাল থেকে। তাই এই কবিতাটা আমার প্রিয় পাঠকদের জন্য। যারা তেমন পড়ার সময় পান না, তাদের কথা ভেবে কবিতাটা আবৃত্তিও করে দিলাম। সোজা নিচে গেলে লিঙ্কটা পাবেন। যারা পড়তে ভালবাসেন, তারাও আবৃত্তিটা শুনতে পারেন। আশা করি ভালোই লাগবে।

এক শ্রাবনী অন্ধকারে

কৃষ্ণ কালো মেঘের ঘটা আকাশ পরে – 

নির্নিমেষে চেয়ে থেকে প্রশ্ন করি, শুধাই তারে

ঘুরে বেড়াও উড়ে বেড়াও কিসের তরে?

আকাশ জুড়ে,

রঙ মাখা ঐ মেঘ চাদরে

মুখ ডুবিয়ে মন্দ্র স্বরে

কাকে ডাকো?

কোন সে চাতক চুপিসারে

তোমায় পাওয়ার লোভে চলে অভিসারে?

কোন সে আলো মুখ লুকিয়ে চুপ শরীরে

তোমায় ছুঁলো, মৃত্যু নিল শরীর জুড়ে?

কোন সে কবি এক দুপুরে

তোমায় নিয়ে লিখবে বলে

সারা বেলা রইলো বসে কলম ধরে…

মেঝের পরে রইলো পড়ে

ছিন্ন কিছু শব্দ কোন এক শেষ না হওয়া কণ্ঠহারে।

কোন এক মাঝি বৈঠা ধরে

পথ হারাল তোমার খোঁজে

সুর বাঁধলো বাউল সুরে?

জানালা পথে এক টুকরো তোমায় পেয়ে

কোন সে জনপদবধু রইলো পরে ঠোঁট কামড়ে?

শিয়াল কিছু আঁচড়ে কামড়ে

আশ্লেষে প্রান ভরিয়ে দিল। গলির মোড়ে

কোন সে অপু তোমায় দেখে বারে বারে

খেলা ছেড়ে রইলো চেয়ে

রইলো চেয়ে ঐ সুদূরে?

কোন সে গৃহবধু সেদিন দরজা ধরে

একলাটি প্রতীক্ষা করে

সেই সে জনের

যে জন কোথায় হারিয়ে গেছে বন পাহাড়ে?

কোন সে ডাহুক চুপিসারে

তোমার সাথে ভিজবে বলে দিগবলয়ের কাছে ওড়ে?

 

মেঘ বললে,

আমি আমার ভেলায় নিয়ে ফিরি আশা

ফেরি করি বৃস্টি-ভেজা-ভালবাসা।

অনাগত এক স্বপ্নমুলুক, সুলুক দিতে আমার আসা।

ভালবাসি বলছে শুধু, বলছে আমার মন্দ্র ভাষা।

ভালবাসার জোয়ারজলে ভাসিয়ে দেব সব নিরাশা –

ভিজিয়ে দেব গৃহবধূর বুকের আঁচল, সব তিয়াশা।

ঝড় তুলব সর্বনাশা –

সেই ঝড়েতে বিলীন হবে শীর্ণ শিথিল সব কুয়াশা।

নতুন জগৎ জন্ম নেবে, নতুন দিশা

আসবে সাথে, আসবে আবার নতুন করে ভালবাসা।।

 

বাঁধন

মাস চারেক আগে যখন দেশে যাওয়ার টিকিটটা কেটেছিলাম তখন ভেবেছিলাম এক্সপিরিয়েন্সটা সুখকর হবে। আমার স্ত্রী আর আমার দু বছরের কন্যা সন্তান মহারাজার কাঁধে চেপে যাবে দিল্লি হয়ে কলকাতা। আর তার এক মাস পরেই আমি তাদের জয়েন করব আমার খুব কাছের সেই ছোট্ট শহরতলি রামরাজাতলায়। এ শহরে সরু সরু অলিতে গলিতে আমার ছোটবেলাগুলো সারা বছর আমার দেখা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। সেই বুড়ো শিবতলা, সেই বারোয়ারী মণ্ডপের পুজো, সেই জমিদার বাড়ির আদলে মৈনাকদের বাড়ি আজও আমার অভাবে খাঁ খাঁ করে – অন্তত এই দুর প্রবাসে বসে এমনটাই আমি মনে করি। স্ত্রী-কন্যা বিহনে আমি এই একটা মাস উপভোগ করতে পারব আমার হঠাত-করে-পাওয়া আইবুড়ো সময় বিশেষত এক মাস পরেই যেখানে নিছক ছুটি কাটাতে দেশে যাওয়া এবং সেই মানুষ দুটির সাথে পুনর্মিলন, সাথে পাব বাবা-মার আদর, আমার প্রিয় ভাইঝিদের সর্বক্ষণ ন্যাওটা হয়ে আমার সাথে লেগে থাকা। কিন্তু তার আগে এই একলা একটা মাস। সত্যি কথা বল্যতে কি আমার নিজের সঙ্গ আমার বেজায় পছন্দ। কোন এক মনীষী লিখে গেছেন “A Poet talks to himself only. Others just overhear it” – লেখালেখি করা যে কোন মানুষের ক্ষেত্রেই কথাটা প্রযোজ্য। আর এই নিজের সঙ্গে কথা বলতে কিছুটা নিজের সময়ের প্রয়োজন হয়। আমার ব্যাচেলরহুড মানে বেশি কিছু নয়, একটু হয়তো জিনিস যত্র তত্র ছড়িয়ে রাখা। কিচেনের দেরাজ হোক বা বইয়ের, যে বা যারা যেখান থেকে বেরোল তাদের স্বস্থানে প্রত্যাবর্তনের কোন তাড়া নেই। রাতের বেলা ভাত-রুটির বদলে এক প্যাকেট ম্যাগি। অফিস থেকে ফেরার নো তাড়া। ফেরার পথে কোন পথ চলতি রেস্তোরায় পা আটকে গিয়ে একটা কি দুটো সোনালি তরল যদি আত্মস্থ করে নিই তাহলেই বা ক্ষতি কি? টিভিতে ইয়াপ টিভিতে বাংলা সিরিয়ালের বদলে আমার প্রিয় গজল বা ভজন কি চন্দ্রবিন্দু কি ফসিল। মোটের ওপর কারু কাছে জবাবদিহি করার নেই। একটা মাস আমার শর্তে আমার জীবন বাঁচা। আর আপনারা যারা বিবাহিত তাদেরকে বোধ হয় বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না যে ছাপোষা বাঙালি হিসেবে আমাদের জীবনে দাম্পত্য ঝগড়া-বিবাদ-কলহ লেগেই থাকে। কথায় বলে ঘটি-বাটি একসাথে থাকলে ঠোকাঠুকি হয়। কিন্তু জড় হওয়ার সুবাদে সেই ঠোকাঠুকি কুরক্ষেত্র যুদ্ধের আকার নেয় না। কিন্তু সজীব বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যাপার আলাদা। এই ধরুন সবে একটা ব্লগের পাতায় একটু চোখ দিয়েছি কিম্বা একটা রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের নরম উত্তাপে নিজেকে একটু সেঁকে নিচ্ছি কি আমার শ্রীমতীর ডাক পড়বে “শোনো না সানাই-এর দুধটা গরম করে আনো না গো।” কিম্বা “বাসন গুলো মেজে দাও”। শুনে যদি মুখ বেঁকিয়েছ তাহলেই বাড়িতে শুরু হয়ে যাবে হার্ড মেটাল। না দাবী গুলো কোনটাই অন্যায় নয়। কিন্তু ন্যায্য দাবী হলে যে মেনে নেবই, নিজেকে এমন সবিশেষ মহাপুরুষ বলে দাবী আমি করছি না। বিশেষতঃ মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বার্থপর তো তার নিজের জনের ওপরেই হয়। প্রবাসে থাকলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সব কিছুই নিজেকে করতে হয়। কোন সাহায্যকারী মাসীর অভাবে আমাদের বাঙালি স্বত্তার একেবারে ত্রাহিমাম অবস্থা। আর তার ওপরে আছে সানাই-এর দেখভাল করার ভার। সানাই, আমার কন্যা সন্তানটিকে এক কথায় বর্ণনা করতে হলে বলতে হয় “আশাতীত”। অর্থাৎ কিনা ওর ওই ক্ষুদ্র মাথায় এই মুহূর্তে ঠিক কি প্ল্যানিং চলছে সেটা বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাও ঠিক ঠাহর করতে না পেরে এ যাত্রা সেই দায়িত্বটা তাই আমাদের ওপর বর্তে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নতুন সৃষ্টি কর্মে মেতেছেন। এই হয়তো দেখলেন দেবী মন দিয়ে কিষা দেখছে অর্থাৎ কিনা লিটল কৃষ্ণ দেখছে, আর সেই দেখে পায়ের ওপর পা তুলে আমি চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়েছি, চোখের নিমেষ ফেলবার আগেই তাকে হয়তো পাওয়া যাবে ডাইনিং টেবিলের তলায় চেয়ারের চক্রব্যূহে আটকা পড়ে তুমুল চিৎকারে এস-ও-এস পাঠাচ্ছে। অমন একটা জনমানবহীন জায়গায় ওর কি কাজ থাকতে পারে সে ব্যাপারে আমায় প্রশ্ন করবেন না। কারণ উত্তরটি আমি সম্যক অবগত নই। কিন্তু তাকে ওখান থেকে রেসকিউ করতে ওই সবুজ অমৃতের চাঙড়কে সেন্টার টেবিলে ঠকাং করে নামিয়ে আমাকেই যে মাঠে নামতে হবে সেটা বোধ হয় বলাই বাহুল্য। চায়ের আমেজের যাকে বলে এক্কেরে হাতে হ্যারিকেন। সেটাও যদি ছোট্ট গোপালের দুষ্টুমি দেখে অনুপ্রাণিত ভেবে ক্ষমা করে দেন, তবে দেখবেন রাত্তির সারে বারোটার সময় হঠাত করে আপনাকে হাত ধরে ঠাকুরের বেদীর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি ভেবে থাকেন ঠাকুর দেবতায় ভক্তি ভাল বই মন্দ না – তাহলে নিতান্ত ভুল করছেন। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে যে প্রবাদ শোনা যায় তা যে নেহাত অপবাদ নয় তার প্রমাণ হাতেনাতে পাবেন। চোখ টোখ বুজে একটি জোরদার প্রণাম ঠুকেই দেবীর দাক্ষিণ্য পেতে হাত বাড়িয়ে দেবে। অর্থাৎ কিনা প্রসাদ চাই। দেবী তখন প্রসন্ন হয়ে প্রসাদ দিতে চান কিনা ঠিক জানি না, কিন্তু আমার আপনার নিশ্চিত অপ্রসন্ন লাগবে সেটা স্বাভাবিক। আপনি যদি রাত্রি সাড়ে বারোটার সময় প্রসাদরুপী মিছরি না খেয়ে ঘুমনোটাই শ্রেয় কর্ম বলে উপদেশ দিয়ে তাকে বিছানায় পেড়ে ফেলার চেষ্টা করেন, তাহলে সানাই সপ্তম স্বরে যে সানাই ধরবে তাতে আক্ষরিক অর্থে পিলে চমকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রভূত। আলকাতরাজে নিয়ে গিয়ে থার্ড ডিগ্রী টর্চার করলেও কেউ এই ধারা চেঁচায় কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। তারপর ধরুন না সেদিন দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন যখন শিকাগোর ভারত সেবাশ্রমের ছোট্ট পরিসরে প্রায় গোটা আটশ লোক পুষ্পাঞ্জলি দিচ্ছে তখন হয়তো দেবী মুমুক্ষু হয়ে পড়লেন। মুমুক্ষু অর্থাৎ বাবার বাহু বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা। বাবার হাত হ্যাঁচকা টানে ছাড়িয়ে নিয়ে ভক্ত মণ্ডলীর থিকথিকে ভিড়ে মুহুর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তারপর মিনিট দশেক পর্যন্ত গোরু খোঁজা খুঁজে যখন বুকের মধ্যে আপনার হাপর পড়ছে, আপনার স্ত্রীয়ের চোখের অশ্রুগ্রন্থি গুলো সবে কাজে নামবে বলে মনঃস্থির করেছে সেই সময় কোন শুভাকাঙ্ক্ষী এসে যদি আপনার বাচ্চা ধরে দিয়ে যায় এবং বলে যায় “রাস্তায় হাঁটছিল। একটু খেয়াল রাখিস।” তখন নির্ভেজাল মুখ করে তাকে অজস্র ধন্যবাদ দিলেও মনে যে বড় আনন্দের উদ্রেক হয় না সেটা দুরন্ত বাচ্চার (মানে বাঁদরের ইউফেমিজম আর কি) বাপমা মাত্রেই অনুধাবন করতে পারবেন। এ হেন সানাইকে সামলানো মোটের ওপর স্ট্রেসফুল। আমার এক মার্কিন কলিগ আমায় একবার বলেছিল “With small kids, you have high moments and low moments. Where high moments are truly blissful, low moments are truly frequent.“ হাড়ে হাড়ে সেটা উপলব্ধি করি নিয়মিত।   

 

এর পরে আছে ধরুন আমার স্ত্রীয়ের পরিষ্কারের বাতিক ও তৎসম্বন্ধীয় পিটপিটানি। বেসিনের বেড থেকে বেডরুমের, কোথাও এতটুকু আঁচিল দেখলেই সেটা পরিষ্কার করে ফেলবে তৎক্ষণাৎ কিন্তু তার পরিবর্তে দুটো বাঁকা কথা আমার বরাদ্দ। আমি নিশ্চিত, স্বচ্ছ ভারত অভিযানে সামিল হলে ও একটা কেউকেটা কিছু হতে পারত। স্বচ্ছতায় ও একেবারে লেটার মার্ক্স আর আমি মেরেকেটে দুই কি তিন। অতএব লাগ লাগ লাগ ভেল্কি নারদ নারদ। তো এই বৌ-বাচ্চার যাঁতাকলে চাপা পড়া আমি নিরীহ মানুষ যদি এই এক মাসের মুক্তি একটু রেলিশ করি তাহলে সংসারী মানুষের পরীক্ষায় আমায় দশে শূন্য দিয়ে ক্লাসরুমের বাইরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে নিশ্চয়ই রাখবেন না। আচ্ছা এখানে একটা কথা না বলে রাখলে সত্যের অপলাপ হবে যে আমি নিরীহ মানুষ এই মতবাদটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত। আমার স্ত্রীয়ের মতবাদ হল আমার মত ঝগড়ুটে খিটখিটে মানুষ ত্রিভুবনে নেই।  

 

তাই টিকিট কাটার পরে প্রথম প্রথম আনন্দই হচ্ছিল এক মাসের পূর্ণ স্বাধীনতা আর তত পরবর্তী কলকাতায় গিয়ে স্ত্রী সন্তানের সাথে পুনর্মিলিত হওয়ার কথা ভেবে। ওদের কলকাতা যাত্রার দিনটা দুর্গাপূজার পরে। দেখতে দেখতে দুর্গাপুজা এসে পড়ল। শিকাগোয় পুজো বিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমরা দ্যাবা দেবী দুজনেই। কোথাও নাটকে অভিনয় করছি, কোথাও নাট্য নির্দেশনা সব মিলিয়ে একেবারে যাকে বলে শিকাগো সরগরম। প্রবাসী বাঙ্গালিদের মধ্যে বাঙ্গালিয়ানা ধরে রাখার যে চাড়টুকু থাকে গড়পড়তা কলকাতার বাঙালিদের মধ্যে সেটা থাকে না। কারণ কলকাতার বাঙালিরা এমনিই বাঙালি। কেউ তাদের বাঙ্গালিত্ব কষ্টি পাথরে যাচাই করতে আসে না। কিন্তু সেই সুবিধা দিল্লি কি শিকাগোর বাঙালির নেই। তাই প্রতি মুহুর্তেই ঝাঁপ দিতে হয় বাঙ্গালিত্বের অগ্নিপরীক্ষায়। তাই দুর্গাপুজো হোক বা নববর্ষ, বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাজি সাজিয়ে বসে পড়তে হয়। আর তাই এই দুর্গাপুজোর আগে আগে চোখে নাকে দেখতে পাওয়া যায় না। চওড়া কাঁধে দায়িত্ব নিয়ে দুর্গাপুজোটা যখন উতরে দিলাম তখন দেখলাম ওদের দেশে যাওয়ার দিনটা আর দুদিন পরে। আশ্চর্য ব্যাপার হল টিকিট কাটার দিনে মনের মধ্যে যে তিরতিরে গঙ্গা ফড়িংটা উড়ে বেড়াচ্ছিল সেটাকে আর অনেক খুঁজেও কোথাও পেলাম না। বিয়ের ভাঙ্গা আসরের মতই রশনচৌকি ঝুপ করে বন্ধ। বুকের ভেতরটায় কেমন যেন ফাঁকা। নিয়ন আলোয় ভরা ম্যাডিসন স্কোয়ারে যেন ঝুপ করে হয়ে গেছে লোডশেডিং। অথচ এই দিনটার প্রত্যাশাতেই বসে ছিলাম কিছুদিন আগেও। কিন্তু আজ যখন মানুষ দুটোর দেশে যাওয়ার দিন দুয়েক বাকি, আসন্ন আমার অখণ্ড স্বাধীনতা আর অবসর, অলক্ষ্যে অপলকে তাকিয়ে থাকি আমার দু বছরের ডানা লোকানো ছোট পরীটির ঘুমন্ত মুখের দিকে। মুখ ফুটে জিগ্যেস করতে পারি না কিন্তু হঠাতই অকারণে জানতে ইচ্ছে হয় আমার সাত বছরের সঙ্গিনীটি কলকাতা ট্রিপের হই হট্টগোলের মধ্যে আমায় মিস করবে কিনা। বিদায়ী মুহুর্তটিতে চোখে একটা অস্বস্তকর বিচ্ছিরি জ্বালাধরা ভাব। “ভাল ভাবে যেও” বলতে বলতে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয় কারণ চোখের মধ্যে অবাধ্য কিছু গ্ল্যান্ড সিক্রেশান শুরু করেছে। বিশ্বাস করুন আমি একেবারে কাঁদুনি ছিলাম না। কিন্তু আজকাল কারণ অকারণে হঠাৎ হঠাৎ চোখের পাতা কেমন ভারি হয়ে আসে। কোন ছায়াছবির করুণ রসাত্মক কোন দৃশ্য হোক বা কলকাতা থেকে ফেরার সময় এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা মার মুখের দিকে তাকিয়েই হোক চোখটা বড়ই নিয়ন্ত্রণ হারায় আজকাল। আসলে মায়া বড় প্রবঞ্চক। যত দিন যায় মানুষকে তার অদৃশ্য গুটিপোকার জালে আস্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। নিজের মুখ নিঃসৃত লালারসে বিজারিত করে কখন যে আমাদের সকলকে আমি থেকে আমরা করে দেয় টেরই পাওয়া যায় না।

 

যাই হোক বিদায়ী মুহুর্তটা কেটে যাওয়ার পরে সারাদিন অফিসের কর্তব্য সামলে সন্ধে বেলা যখন বাড়ি ফিরি দেখি আমার বাড়ির সব আসবাব, সকল সামগ্রী সেই মানুষ দুটির জন্য যেন নীরবে প্রতীক্ষা করছে। যে দুটো মানুষের হাঁকডাকে আমার স্বাধীনতা নিত্য বিপন্ন আজ এই শূন্য ঘরে তাদেরই গলার স্বর শুনতে মন হয়ে ওঠে উচাটন। পরিপাটি করে ভাঁজ করে রাখা জামা প্যান্টে, সেলফে গুছিয়ে রাখা চায়ের কাপে সর্বত্র খুঁজে পাই আমার স্ত্রীয়ের ছোঁয়া। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা পুতুল আর খেলনা গাড়িগুলোকে দেখলে সেই ছোট্ট দুরন্ত মানুষটার কচি আঙ্গুলগুলোকে ছুঁয়ে দেখার লোভে আমার আঙ্গুলগুলো ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শাস্ত্রে বলে “ত্রিয়া চরিত্রম দেবা ন জানতি” অর্থাৎ মেয়েদের বোঝা  দেবতাদেরও অসাধ্য।  কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হল পুরুষের মন জানাও বোধ হয় দেবতাদের অসাধ্য – শুধু দেবতাদের কেন নিজের পক্ষেও নিজের মন জানা মোটেই অনায়াসসাধ্য নয় এই উপলব্ধি আমার শিরায় উপশিরায় এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল।

নীল তিমি

ব্লু হোয়েল গেম নিয়ে পড়তে গিয়ে জানলাম যে যারা ডিপ্রেসড ইন্ডিভিজুয়াল বা নৈরাশ্যবাদী, সেরকম টিন এজাররা স্বাভাবিক কারণেই এই নীল তিমির খপ্পরে সবচেয়ে সহজে পড়ছে। গেমের আবিষ্কারকদের জীবন দর্শন হল এই যে এইসব নিরাশাবাদীরা এমনিই পৃথিবীর কোন কাজে আসে না। তো এদের শুরুতেই খরচা করে দিলে পৃথিবীর এবং মানুষ জাতির আখেরে লাভ। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত যুক্তিহীন মত কিন্তু পড়তে পড়তে হঠাত মনে হল এই মানুষ জাতির ইতিহাসে এই গেম বের হওয়ার অনেক আগে থেকেই, সভ্যতার আদি লগ্ন থেকেই এইরককম একটা প্রকাণ্ড নীল তিমি তার অদৃশ্য হাঁ নিয়ে ঠায় বসে আছে। যতক্ষণ তোমার এই সমাজকে, এই পৃথিবীকে কিছু দেওয়ার আছে, ততক্ষণই ওই আগ্রাসী হাঁ থেকে তোমার নিস্তার। যেদিন তোমার দেওয়া শেষ সেই দিনই ওই নীল তিমির প্রকাণ্ড জঠর গহ্বরের পথে তোমার মহাপ্রস্থান। এই সর্বগ্রাসী নীল তিমিই রোজ আমাদের প্রেরণা দেয়, রোজ আমাদের তাড়না দেয় নতুন কিছু করার। নিজেকে নতুন করে চেনার। সিন্দাবাদের মত জাহাজে করে নিজেরই মনের সাগরের বন্দরে, বন্দরে, কুলে, উপকূলে ঘুরে মনি, মুক্তো, রত্ন সংগ্রহ করে এনে এই সংসারকে শুল্ক স্বরূপ সবটুকু দিতে হবে। যেদিনই তোমার জাহাজের পাল ছিঁড়বে কি হাল ভাঙবে বা গতি হবে রুদ্ধ সেই মুহুর্তেই সেই নীল তিমির বিশাল হাঁয়ের মধ্যে তলিয়ে যাবে তুমি তোমার বিকল জাহাজ সমেত। সমাজরূপী সেই নিষ্ঠুর ট্রেজারার গুনে গেঁথে মেপে রেখে দেবে তোমার সবটুকু সঞ্চয়। “সোনার তরী” কবিতায় এমনটাই বলতে চেয়েছেন কবিবর। তবু আজ এই ব্লু হোয়েল গেম আমায় এক নতুন আঙ্গিকে চেনাল এই অদৃশ্য অথচ সর্বগ্রাসী নীল তিমিটিকে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ভার্চুয়াল নীল তিমিটাকে তো মারার সর্বতো প্রকার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু ওই চিরন্তন নীল তিমিটার নিরন্তর ভয় যেটা আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়, ফসল ফলিয়ে বেড়ায় সেটার বেঁচে থাকা বোধ হয় খুব জরুরী। ওই নীল তিমিটার আগ্রাসন থেকে বাঁচতেই তো আবিষ্কার আগুন, চাকা, ষ্টীম ইঞ্জিন, মাধ্যাকর্ষণ, আপেক্ষিকতাবাদ। পশু থেকে মানুষকে মানুষ করেছে এই নীল তিমি। একদিন এই নীল তিমিই হিংসা, ঘৃণা, কলুষ আর যত মিথ্যা জৌলুস কেড়ে নিয়ে মানুষকে দেবতা বানাবে। মানুষ ঈশ্বর হওয়ার আগে বোধ হয় ওই নীল তিমিটার হাঁ থেকে নিস্তার নেই।  

ত্রিয়া চরিত্রম

স্ববাবু মহারাজা যযাতিকে জিজ্ঞাসা করলেন “প্রভু, মহামতি মনু লিখেছেন ‘ত্রিয়া চরিত্রম দেবা ন জানতি কুতঃ মনুষ্যঃ’ – হেঁ হেঁ তখন থেকেই বুঝি টাইপো অর্থাৎ কিনা typographical error-এর জন্ম। উনি নিশ্চয়ই “স্ত্রিয়া চরিত্রম” লিখতে গিয়ে ছড়িয়ে ফেলেছেন। তাই না?

মহারাজ যযাতি বললেন “না হে বৎস। কালি-কলম ইত্যাদি কি-বোর্ড দিয়ে প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগে পর্যন্ত হতভাগ্য লেখকেরা বানান-টানান আর একটু সিরিয়াসলি নিত। ত্রিয়া মানে unnamedহল গিয়ে বুদ্ধি বা মতি। মতি তিনপ্রকার – গুর্মতি, মন্মতি আর দুর্মতি অর্থাৎ কিনা শুভ বুদ্ধি, নির্বুদ্ধি আর দুষ্ট বুদ্ধি। যেহেতু বুদ্ধি স্ত্রী-লিঙ্গাত্মক শব্দ, তাই কলিযুগে বাঙালি নামক ক্ষুরধার বুদ্ধিধর এক ধরনের প্রাণী এটিকে “স্ত্রীয়া চরিত্রম” করে নিয়েছে। বিয়ে-থা তো করেছ বৎস। তো বুঝতেই পারছ কথাটাকে “স্ত্রীয়া চরিত্রম” করে নিলেও সত্যের অপলাপ তেমন হয় না।”

তা যা বলেছেন স্যার। দেখুন না, দুগগা ঠাকুর দেখতে যাবে বলে আমার বেটার হাফ গোটা দশেক শাড়ি কিনে ফেললেন। জিগেস করলাম “পুজোর চারদিনে তো চারটেই শাড়ি লাগবে” – তাতে উত্তর দিলেন “আরে বাবা সকাল-সন্ধে পড়তে হবে না?” আমি বললাম “তাহলেও সর্বসাকুল্যে আটটা”। আমার স্ত্রী বললেন “বিসর্জন কবে হয় এখন তার ঠিক নেই। তাই দু-তিনটে বাফার শাড়ি রাখতে হবে না?”  বলুন স্যার এরপরেও যদি আমি বলি আমি আমার স্ত্রী-বুদ্ধি ইয়ে মানে আমার স্ত্রী-এর বুদ্ধির গতি এখনও বুঝতে পারিনি, কিছু ভুল বলা হবে স্যার?

যযাতি বললেন “ঠিক ঠিক। শাস্ত্র ছাড়, এই জন্যই কবিবরেরা বলে গেছেন – রমণীর মন বড় সাধনার ধন।” মানে নারীমন পেতে গেলে এবং বুঝতে হলে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে।    

“প্রভু, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বিচিত্রগতি কি তবে নারীদের মন?”

“তবে প্রভু, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বিচিত্রগতি কি তবে নারীদের মন?”

তার থেকেও বিচিত্রগতি হচ্ছে ইন্টার-ব্যালিস্টিক মিসাইল। কিম বাবু কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে কোরিয়া থেকে কুমায়ুন কিম্বা সাইবেরিয়া কি শিকাগো সফর করে। এই জন্যই বলিউডের কিং অব রোমান্স গেয়ে গেছেন “সফর কা হি থা ম্যায় সফর কা রাহা”। সে যাক। তবে এর থেকেও বিচিত্রগতি এক বস্তু আছে।

কি স্যার?

সেটি হল পাঠকের মন। আজ তোমার লেখা পড়ছে, কাল দুর-ছ্যা করবে। তাই ঠ্যাকায় পড়লেও কখনো পাঠককে ঠকাতে যেও না।

  

সুখ

এইখানে আজ আমি থাকি। এইখানে কাটে এই বিনিদ্র রজনী একাকি। এইখানে একান্তিকে আমার এই ভাঙ্গা মন্দির। চারিদিকে তুলেছি এক নিশ্ছিদ্র প্রাচীর। বাইরে হিংস্র উরগদের জান্তব চিৎকার। এই আঙিনাতে বসে শুনতে পাই না আর। চোখে শুধু এক স্বপ্ন লেগে থাকে – একদিন নির্জন বনবীথিকার কোনো বাঁকে ফুটবে পলাশ আর ফুটবে রক্ত কিংশুক। লাজুক পাপড়ি গুলো যেন কোনো কিশোরীর আনত চিবুক। গাছের পাতার ফাঁকে এক ফালি সোহাগি রোদ্দুর বলে যাবে “বিশ্বাসে মিলায় সুখ…..তর্কে বহুদূর।”