বিস্ময়

বিস্ময় মনের অতি উচ্চভাব আর উচ্চ বলিয়াই সহজলভ্য নয়। সত্যকার বিস্ময়ের স্থান অনেক ওপরে – বুদ্ধি যাহার খুব প্রশস্ত ও উদার, মন সবসময় সতর্ক – নূতন ছবি নূতন ভাব গ্রহণ করিবার ক্ষমতা রাখে, সেই প্রকৃত বিস্ময়রসকে ভোগ করিতে পারে। যাদের মনের যন্ত্র অলস, মিনমিনে, বিস্ময়ের মতো উচ্চ মনোভাব তাদের অপরিচিত থাকিয়া যায়।

— বিভূতি বাবু লিখেছেন অপরাজিত উপন্যাসে।

পড়তে পড়তে মনে হলো এর থেকে বেশি সত্য বুঝি আর নেই। নাট্যশাস্ত্রের নবরস অনুযায়ী বিস্ময় রস হলো “অদ্ভুত রস”, feeling of awe or wonder or marvel. পৃথিবীর সমস্ত মহান সৃষ্টির মূলে প্রেরণা হিসেবে আছে একে গভীর বিস্ময়। এই মহান বিস্ময় থেকেই আঁকা হয় আলতামিরা গুহায় পলায়নরত বাইসনের দৃপ্ত দেহ ভঙ্গিমা, এই বিস্ময় রস থেকেই সৃষ্টি ইলোরার অদ্ভুত ভাস্কর্য, এই বিস্ময়ই ক্যানভাসে The Starry Night আঁকে, এই বিস্ময় রস থেকেই লেখা পথের পাঁচালী, এই বিস্ময় রস থেকেই লেখা হয় “রোড নট টেকেন” কিংবা “দ্য লিসনার্স” কিংবা “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”-এর মতো কবিতা। মাধ্যাকর্ষণ থেকে আপেক্ষিকতাবাদ আবিষ্কারের মূলেও সেই বিস্ময়। উপনিষদের আত্মানুসন্ধানের মূলেও সেই আদি বিস্ময়, আমি কে? বিজ্ঞান, দর্শন, অধ্যাত্মবাদের সকলেরই জননী এক, সকলই এই বিস্ময় প্রসূতা।

অধিকাংশ মানুষের মন মরে আসে বয়সের সাথে সাথে। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হয় লুপ্তপ্রায়। প্রতিটা বিস্ময় মুহূর্ত আসলে একটা আমি-লোপের মুহূর্ত। শিশুর আমি প্রচ্ছন্ন, তেমন প্রকট নয়, তাই সে বিস্মিত হতে জানে। বয়সের সাথে সাথে আমি যত প্রকট হয়, কমে বিস্ময় বোধ।

প্রথম যেদিন এক পেখম তোলা ময়ূর দেখে বলেছিলেন, আহা কী সুন্দর, সেই মুহূর্তে ক্ষণকালের জন্য আপনার আমি ডুবে গেছিল রূপের চিরন্তন বিশ্বজনীনতায়। সেই আমি যা আমাদের কয়েদ করে রাখে এই শরীর-মনের জেলখানায়। যে আমির শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারলেই মুক্তি, মোক্ষ। বিস্ময়বোধ সেই আমির বাহুপাশ থেকে আমাদের দেয় ক্ষণিকের নিস্তার। মন এবং তার ক্রমাগত চিন্তা স্রোতকে থামিয়ে দিয়ে বিস্ময় আমাদের নিয়ে আসে চিরন্তন বর্তমানে, eternal present-এ যা সমস্ত সৃজনশীলতার উৎস, যা নিজের স্বরূপকে জানার প্রথম পদক্ষেপ। বিশালের কাছে গেলে, তারা ভরা আকাশের নিচে দাঁড়ালে, সমুদ্রসৈকতে বসে সেই বিপুল অনন্ত জলরাশির দিকে তাকালে, সুউচ্চ পর্বত শিখরে দাঁড়িয়ে অনেক নিচের সবুজ উপত্যকার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া কোনো পাহাড়ি নির্ঝরিনীর দিকে তাকালে, মন সেই বিশালকে ধারণা করতে না পেরে থেমে যায়। we experience a moment of no-mind. বিস্ময় আমিত্ব নাশক।

কালের যাঁতাকলে ধরা দিতে না চাইলে মহৎ উদার শিশুসুলভ মনকে ধরে রাখতে হয়। আর শিশুমন মানেই বিস্মিত হওয়ার সহজাত ক্ষমতা। বিস্ময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলো স্মৃতি। আগে দেখা কোনো কিছুর সাথে এখন দেখা কিছুর তুলনা করা হলো বিস্ময়ের প্রধান বাধা। শিশু তুলনা করে না। প্রতি দেখাই তার প্রথম দেখা। প্রতি অনুভবই তার প্রথম অনুভব। বৃদ্ধ মন কেবল তুলনা করে আর তাই এমন কিছু খুঁজে পায় না যা নূতন, যা অভূতপূর্ব, যা বিস্ময়সূচক।

যে বড় হতে হতে বিস্মিত হতে ভুলে যায় নি, সে-ই শিল্পী, সে-ই বিজ্ঞানী, সে-ই দার্শনিক, সে-ই মুমুক্ষু, সে-ই আত্মসন্ধানী।

Leave a Reply