শুনেছি বয়সকালে ছেলেমেয়ের কাছে লাথি ঝাঁটা খেতে হয়। আমার “বয়সকাল” হয়েছে কিনা জানি না কিন্তু কালে কালে বয়স তো কম হল না। বয়সকাল হয়েছে না বয়সটাই কাল হয়েছে বলতে পারব না, আর ঝাঁটাটা ভবিষ্যতে বরাদ্দ হবে কিনা জানি না কিন্তু লাথি বরাদ্দ হচ্ছে এখন থেকেই।

আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য, বয়সে নেহাতই নবীন। তিনি পৃথিবীকে অনুগ্রহ করার পর থেকে একটাই বছর ঘুরেছে, মানে তাঁর বয়স এই মাত্র এক বছর। কিন্তু হলে কি হবে, নিশ্চয়ই আগের জন্মে লিটল বম্ব  তাথৈ দেবী চুনি গোস্বামী থেকে থাকবেন কারণ পা দুটি পুরো ফুটবল-বলিষ্ঠ। ক্ষুদ্র বলিয়া তুচ্ছ নই এই নীতিকথা অনুসরণ করে তিনি সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে, মানে যাকে বলে পাখি ডাকা ভোর থেকে (আমার জন্য অবশ্যই অর্ধেক রাত্রি) পদাঘাত করতে শুরু করেন মানে কাঁচা বাংলায় লাথি মারতে শুরু করেন। বক্তব্যটা হল আমার যখন ঘুম ভেঙেই গেছে তখন তোমরা ঘুমোও কোন অধিকারে? উনি তো সুযোগ সুবিধে মতই একটু গড়িয়ে নেন, আমি হয়তো সপ্তাহান্তের পার্টি প্রেসার সামলে, ধেই ধেই করে নেচে, ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির বাপ বাপান্ত করে, সোনালি তরলের ঘুমঘোর মোহে দেশের দুঃখদুর্দশার কথা বন্ধু সহযোগে তর্কাতর্কি করে, ফেসবুকীয় বিপ্লব সেরে রাত্রি দ্বিপ্রহরে বডি বিছানাতে ফেলেছি। তাই শরীরের বিশ্রামের প্রয়োজনেই এবং মনের বিশ্রামের অধিকারেই ঘুমোই। কিন্তু এ যুক্তি তার কাছে প্লেস করার সুযোগ নেই কারণ যে দু তিনটে ভাষায় আমার সামান্য দখল আছে, আমাদের বাড়ির নবীনতম সদস্য এখনো সেই ভাষায় বাক্যালাপ করতে বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করে নি। তাঁর স্টাইল পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিক। নিজের সুবিধা-অসুবিধা প্রয়োজন-অপ্রয়োজন উঁচুস্বরে নির্দ্বিধায় অন্যের সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি জানান দেন। হিটলার মুসোলিনিও লজ্জা পাবে সেই অথরিটেটিভ স্টাইল দেখে। ধরুন আপনি সকালবেলার প্রথম পটি – না না সকাল সকাল বাজে কথা নাই বা বললাম – ধরুন সকালবেলার প্রথম চা-টা হাতে নিয়ে সোফায় “রাতভর ঘুমোনো ক্লান্ত শরীরটা” একটু এলিয়ে দিয়েছেন এমন সময় বাজ পড়ার মত বাজখাঁই গলায় চিৎকার। আপনি ভাবছেন এই তো সবে ডাইপার চেঞ্জ করে দুধ খাইয়ে সব প্রয়োজন মিটিয়ে দিলাম। কথা হচ্ছে সে প্রয়োজন ছিল শরীরের। এখন তার আত্মার প্রয়োজন আর সেটা হল বাবার কোলে উঠে একটু মর্নিং ওয়াক করা। পিতাপুত্রীর সুসম্পর্ক সাধনের সদিচ্ছা নিয়েই সে সাশ্রু নয়নে জানাবে এই দাবী। কোলে তুলে নিলেই যে দু পাটি দাঁত বের করে এমন নিখাদ স্মাইলটি দেবে দেখেই মনে হবে আগের কান্নাটা ছিল কুমীরকান্না। দু পাটি দাঁত বের কথাটা একটু অত্যুক্তি হয়ে গেল কারণ দু চার খানা দাঁতেরই শুভাগমন হয়েছে সে মুখে। 

যাকগে যাক, কথা হচ্ছিল লাথি ঝাঁটা খাওয়ার। তা হ্যাঁ, লাথিটা নিয়ম করেই খাচ্ছি। তিন বছর আগে খেতাম বড় মেয়ের কাছে। কিন্তু সে এখন রেগে গেলে রাম চিমটি, লক্ষ্মণ কিল ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে (ওর মায়ের কাছে হেভি ঝাড় খাওয়ার সম্ভাবনাটা কনসিডার করে নিজের পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে)। কিন্তু ছোট মেয়ের সে আপদ নেই। এই এক বছর ধরে হোম স্কুলিং-এ বাংলা ভাষা শিক্ষা করে নিশ্চয়ই  ভাষাটাকে তার খুব ফানি ল্যাঙ্গুয়েজ লেগে থাকবে নয়তো তার মা তার ওপরে গলা চড়ালেই দু পাটি না-হওয়া দাঁত বের করে ফ্যাকফ্যাক করে হাসবে কেন? বকাঝকা ভীতির উদ্রেক না করলে বকার উৎসাহ, উদ্যম দুটোই চলে যায়। তো যা বলছিলাম, তিনি বকাঝকার তোয়াক্কা না করেই লাগাতার লাথি মেরে ছটার মধ্যে আমার ঘুমের দফারফা করে দিয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকেন। খিদের মুখে যেমন পৃথিবী গদ্যময়, ঘুমের মুখে তেমনি পৃথিবী রাত্রিময়। থুড়ি ঘুমের চোখে পৃথিবী শত্র‌ুময়। আর সেই শত্র‌ুই যখন ফোকলা দাঁতের হাসি দিয়ে মনজয় করার চেষ্টা করে তখন মনে গৌতমবুদ্ধসুলভ সদ্ভাবনার উদ্ভব হয় না এ কথা অকপটে স্বীকার করাই যায়। তবুও ভদ্রতার খাতিরে মুখে দেঁতো হাসি লাগিয়ে পুতুল সাইজের প্রাণীটাকে জড়িয়ে ধরে সেকেন্ড রাউন্ড ঘুমোনোর চেষ্টা করি। প্রাণপণ। 

Leave a Reply